নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀
পর্ব_২৫
লেখকঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
[ বি:দ্র: নিষিদ্ধ রংমহল – উপন্যাসটির রচয়িতা আমি। এই পেইজ ছাড়া অন্য কোথাও যদি এই গল্পের কোনো পোস্ট দেখেন সেটা বানোয়াট কিংবা কপি। আশা করি, একজন বিচক্ষণ পাঠক হিসেবে আসল-নকল যাচাইকরণ এবং আমার লিখার ধরণ সম্পর্কে আপনারা অবগত। কাজেই, সাবধান ]
ঝোড়ো বাতাসের উন্মত্ততায় গজনবী মহলের বৃহৎ আঙিনার মশালগুলো নিভু নিভু হলেও সেই ম্লান আলোতে অশ্বারোহী তাইমুর গজনবীর অবয়ব এক ক্রুদ্ধ ও তেজস্বী দেবতার ন্যায় প্রতীয়মান হল। এখনো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বসে আছেন হেমাঙ্গিনী। যার আলুলায়িত কেশ আর লণ্ডভণ্ড সজ্জা এক প্রলয়ংকরী ঝড়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
এই দুঃসাহসিক সংবাদ বাতাসের আগে পৌঁছে গেল অন্দরমহলে। জমিদার সিকান্দার গজনবীর শ্রুতিগোচর হলো। তিনি তখন নিজ কক্ষে বসে হুক্কা টানছিলেন। পুত্রের এই অবিশ্বাস্য ধৃষ্টতার খবর পাওয়া মাত্রই তার রক্তবর্ণ চক্ষুদ্বয় ক্রোধে আরও প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠল। হাতের হুক্কাটি সশব্দে সরিয়ে দিয়ে তিনি বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন,
- এত বড় আস্পর্ধা! আমার ধমনীর রক্ত হয়ে আমারই আজ্ঞাকে পদদলিত করল তাইমুর? তাকে এখনই আমার সম্মুখে হাজির করো, দাউদ।
জমিদারের আজ্ঞামাত্রই দাউদ অন্দরমহলের দিকে ধাবিত হলো। পিতার তলব পেয়ে তাইমুর বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। তাইমুর অত্যন্ত ধীর ও গম্ভীর চরণে বৈঠকখানায় প্রবেশ করলেন। কক্ষের দেয়ালে ঝোলানো আদিপুরুষদের তৈলচিত্রগুলোও যেন এই সংঘাতের সাক্ষী হতে চাইল। ঝাড়লণ্ঠনের স্ফটিক হতে বিচ্ছুরিত আলোয় তাইমুরের কালো আচকানের রৌপ্যসূত্রগুলো জ্বলজ্বল করছিল।
সিকান্দার গজনবী নিজের রাজকীয় আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে ক্রোধোন্মত্ত স্বরে বললেন,
- আমি মনসুর আলীকে সশরীরে যে উপহার সোপর্দ করেছি, তুমি কোন সাহসে তা মাঝপথ হতে ছিনিয়ে আনলে? গজনবী বংশের ইতিহাসে এমন অবাধ্যতার নজির নেই। তুমি কি জানো এর পরিণাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে?
তাইমুর বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তার শান্ত ও স্থির চাহনি সিকান্দার গজনবীর চক্ষুর ওপর নিবদ্ধ হলো। তিনি অত্যন্ত বিনম্র কণ্ঠে বললেন,
- পিতা, আমি আপনার আজ্ঞাকে অবমাননা করিনি, বরং গজনবী বংশের মর্যাদাকে এক কলঙ্কিত পতন হতে রক্ষা করেছি। মনসুর আলীর মতো একজন ব্যবসায়ী, যে কিনা আমাদের দাক্ষিণ্যে আজ এত বিত্তশালী হয়েছেন, তার আসরে আমাদের মহলের বাঈজীকে নর্তকী সাজিয়ে পাঠানো কি আপনার মতো জমিদারের পক্ষে শোভা পায়? প্রজারা কি ভাববে বলুন? গজনবী বংশ আজ এতটা শ্রীহীন যে এক তুলা ব্যবসায়ীর তোষামোদ করতে গজনবী মহলের বাঈজী-কে পাঠাতে হচ্ছে? আমি কেবল আমাদের বংশের সেই দম্ভ আর আভিজাত্যকে ধূলিসাৎ হতে দেই নি।
সিকান্দার গজনবী এবার আরও গর্জে উঠলেন,
- তর্ক করো না তাইমুর! তুমি আঁচ করেছো, আমি কেন তাকে পাঠিয়েছি। সুলতানার সাথে তোমার বিবাহের পথে আমি কোনো প্রতিবন্ধকতা রাখতে চাইনি। তবুও তুমি সেই কণ্টককেই পুনরায় কুড়িয়ে আনলে? তোমার এই হৃদয়ের দুর্বলতা গজনবী বংশের ধ্বংসের কারণ হবে।
তাইমুর এবার তার মোক্ষম চালটি চাললেন। ওষ্ঠাধরে এক রহস্যময় ও শীতল হাসি ফুটিয়ে বললেন,
- পিতা, আপনি ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েছেন। আমি হেমাঙ্গিনীকে আমার হৃদয়ের রাণী হিসেবে ফিরিয়ে আনি নি। বরং গজনবী এস্টেটের ‘ভাবী জমিদার’ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত আমানত রূপে ফিরিয়ে এনেছি। মনসুর আলীর কন্যার সাথে যখন আমার পরিণয় সুসম্পন্ন হবে, তখন সুলতানা হবেন এই মহলের ভাবী বেগম। আর একজন বেগমের ব্যক্তিগত দাসী এবং তার সর্বক্ষণিক মনরঞ্জনের জন্য হেমাঙ্গিনীর চেয়ে উপযুক্ত আর কেউ হতে পারে না। আমি কেবল আমার ভাবী বেগমের ব্যবহারের জন্যই তাকে ফেরত নিয়ে এসেছি। আপনি কি চান না আপনার পুত্রবধূ এই অঞ্চলের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পরিচারিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকুক?
’ভাবী বেগম’ এবং ‘সুলতানার খিদমত’ এই শব্দগুলো শোনা মাত্রই সিকান্দার গজনবীর ক্রোধের বহ্নিশিখা কিছুটা স্তিমিত হলো। তাইমুর সুযোগ বুঝে অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে আরও যোগ করলেন,
- তাছাড়া সুলতানার প্রতি আমার কোনো বিরাগ নেই পিতা। আজ অপরাহ্নে তিনি নিজ হস্তে আমার জন্য সুস্বাদু মিষ্টান্ন প্রস্তুত করেছিলেন। তার সেই পরিশীলিত আচরণ আর রন্ধনশৈলী আমাকে মুগ্ধ করেছে। এমন গুণবতী কন্যার মর্যাদা রক্ষা করাই তো আমার পরম কর্তব্য। আমি চাই সুলতানা যখন এই মহলে বেগম হয়ে আসবেন, তখন হেমাঙ্গিনী তার প্রতিটি আজ্ঞা পালন করবে। তাকে গীত শোনাবে। নৃত্য পরিবেশন করে মনোরঞ্জনের খোরাক হবে।
সিকান্দার গজনবী কুটিল চোখে পুত্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে বিদ্রোহী তাইমুর রাতারাতি এতটা অনুগত হয়ে গেছেন। তবুও সুলতানার প্রতি অনুরাগের কথা এবং ভাবী বেগমের দাসী হিসেবে হেমাঙ্গিনীর অবস্থানের যুক্তি শুনে তিনি আর বাক্যব্যয় করলেন না।
গম্ভীর স্বরে বললেন,
- বেশ! তোমার এই যুক্তি যদি সত্য হয়, তবে তো মঙ্গল। কিন্তু মনে রেখো তাইমুর, যদি কোনোদিন বুঝতে পারি তুমি আমাকে প্রতারিত করছ, তবে তোমার শাস্তি কেবল মৃত্যুদণ্ডই হবে।
তাইমুর নতমস্তকে কুর্নিশ জানিয়ে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
ওদিকে বাঈজী মহলে তখন এক চরম উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগের ছায়া বিরাজমান। বিলকিস বানু জায়নামাজে বসে তসবিহ পাঠ করছিলেন। কিন্তু তার চিত্ত ছিল বড় অস্থির। যখনই সংবাদ এল যে হেমাঙ্গিনী ফিরে এসেছে, তার বুকের ভেতরকার পাথরটি যেন অপসারিত হলো।
হেমাঙ্গিনী যখন বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত অবস্থায় বিলকিস বানুর কক্ষে প্রবেশ করল, মুহুর্তেই বিলকিস তাকে জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে বললেন,
- কেমন করে ফিরলি বেটি? ওই নরককুণ্ড থেকে তোকে কে উদ্ধার করল? আমি তো আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম যে তোকে আর কোনোদিন দেখতে পাব।
হেমাঙ্গিনী কান্নায় ভেঙে পড়ল। সবটা খুলে বলল বিলকিস বানুকে। তাইমুরের সেই অবিশ্বাস্য বুদ্ধির চাল, অশ্বারোহণে সেই ঝোড়ো রাতের রোমাঞ্চ, পাঁজাকোলা করে অশ্বে তুলে নেওয়া আর বৈঠকখানায় তার সেই কঠোর ও নিপুণ মিথ্যার আশ্রয়। সবকিছুই সে সবিস্তারে বর্ণনা করল।
সে বলল কীভাবে তাইমুর মনসুর আলীকে বাণিজ্যের মিথ্যা টোপ দিয়ে তাকে ছিনিয়ে এনেছেন।
বিলকিস বানু অবাক বিস্ময়ে শুনলেন জমিদারপুত্রের বীরত্ব আর ভালোবাসার কাহিনী।
কক্ষটির দুয়ারের আড়ালে তখন এক কৃষ্ণছায়া দাঁড়িয়ে ছিল। সিমরান কান পেতে সবটা শুনছিল। হেমাঙ্গিনীর প্রতিটি স্বীকারোক্তি আর তাইমুরের নিগূঢ় সত্যটুকু সিমরানের হৃদয়ে এক বিষাক্ত ঈর্ষার জ্বালা ধরিয়ে দিল। সে অনুভব করল, জমিদারপুত্র বাঈজীর সম্মান রক্ষার জন্যই পুরো জগতের বিরুদ্ধে অলিখিত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
তার প্রতিটি শব্দ ছিল কেবল এক আবরণ, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল হেমাঙ্গিনীর প্রতি তার গভীর অনুরাগ।
সিমরান নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে গেল। তার চোখেমুখে পুনরায় জ্বলে উঠল প্রতিশোধের প্রখর আগুন। সে জানে সুলতানা কতখানি অহংকারী এবং তার প্রেমের অমর্যাদা তিনি সহ্য করবেন না।
এই নিদারুণ খবর সুলতানার কর্ণে পৌঁছালে গজনবী মহলে যে রক্তগঙ্গা বইবে, তা ভাবতেই সিমরান এক পৈশাচিক আনন্দ পেল। মনস্থির করল অন্ধকার পেরোলে সে সুলতানার কক্ষের দিকে ধাবিত হবে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ গজনবী মহলের শান্তির মূলে কুঠারাঘাত করবে।
তাইমুর তখন তার কক্ষে বাতায়নের পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ঝোড়ো বাতাস এখনো শান্ত হয়নি। কে জানে এ কিসের পূর্বাভাস?
তাইমুর জানতেন, আজকের এই রক্ষা কেবলমাত্র সাময়িক। তার পিতা সিকান্দার গজনবীকে তিনি যে প্রলোভন দিয়েছেন, তা পালন করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব। কিন্তু হেমাঙ্গিনীকে বাঁচাতে তিনি নিজের জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত!
তার বার বার মনে পড়ছিল অশ্বের পিঠে হেমাঙ্গিনীর সেই নিবিড় আলিঙ্গনের কথা। সেই ক্ষণিক সান্নিধ্য তার সমস্ত কঠোরতাকে ধুয়ে দিয়েছে।
তিনি বিড়বিড় করে বললেন,
- এই মহলের প্রতিটি ইট সাক্ষী, বাইজী সাহেবা। আপনাকে রক্ষা করতে আমার পুরো ছারখার করতেও আমি পিছপা হবো না।
আজকের টার্গেট ৪৩০০ লাইক এবং ৬০০ কমেন্টস। টার্গেট পূরণ হলেই আগামীকাল গল্প পেয়ে যাবেন। নকল গল্প হতে সাবধান।
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, নিষিদ্ধ রংমহল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৬
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৩