নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৭৩ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
আয়ান কোর্টে নামতেই তিথির বুকের ভেতরটা যেন ড্রাম পেটাতে শুরু করল। এই প্রথম সে আয়ানের খেলার মুখোমুখি, তাও আবার খেলার মাঠে! আয়ানকে সে চেনে, জানে সে খেলাধুলায় কতটা পারদর্শী, কিন্তু সামনাসামনি লড়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। তিথি কয়েকবার গভীর শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল।
আয়ান কোনো ভূমিকা ছাড়াই কগ ব্যাট দিয়ে এক ঝটকায় জোরালো শট করল। তিথিও প্রস্তুত ছিল, সে জানপ্রাণ দিয়ে কগটা ফিরিয়ে দিল। শুরু হলো এক ধন্ধুমার লড়াই। কগটা এপাশ থেকে ওপাশে যাতায়াত করছে বিদ্যুতের গতিতে। ব্যাটের সাথে কগের সেই ‘খোস খোস’ শব্দে পুরো ছাদ মুখরিত।
তিথির হাত কাঁপছে, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে আজ হার মানতে নারাজ। আয়ানও আজ অদ্ভুত এক জেদ নিয়ে খেলছে। সে তিথিকে একটুও ছাড় দিচ্ছে না। তিথির প্রতিটি শট সে খুব নিখুঁতভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছে আর বারবার তিথির চোখের দিকে তাকাচ্ছে। আয়ানের সেই শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তিথিকে যেন বিদ্ধ করছে।চারপাশে সবাই নিশ্চুপ হয়ে এই লড়াই দেখছে। শিহাব আর নেহাল তো অবাক তারা জানত না তিথি আর আয়ানের মধ্যে এমন কোনো গোপন যুদ্ধ চলছে।
আয়ান যেন আজ মাঠের খেলোয়াড় নয়, এক জেদি যোদ্ধা হয়ে উঠেছে। সে একটার পর একটা বিধ্বংসী শট দিচ্ছে, যেন তিথিকে আজ হাপিয়ে তুলেই ছাড়বে। কিন্তু তিথিও দমে যাওয়ার পাত্রী নয় প্রতিটি আক্রমণ সে নিজের শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে প্রতিহত করছে। এই লড়াইটা এখন আর শুধু ব্যাডমিন্টন কগের নেই, এটা যেন তাদের মনের জমানো সব অভিমানের যুদ্ধ।
হঠাৎ করেই ছন্দপতন ঘটল। আয়ানের দেওয়া একটা জোরালো শট হঠাৎ নিচু হয়ে নেটের ওপর দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে এল। তিথি ব্যাট চালানোর পর্যাপ্ত সময় পাওয়ার আগেই কগটা সোজা তার বাম চোখে গিয়ে লাগল। মুহূর্তেই ‘আল্লাহ!’ বলে চিৎকার দিয়ে তিথি হাতের ব্যাট ফেলে দিয়ে ছাদের ফ্লোরে বসে পড়ল। দুহাতে চোখ চেপে ধরল সে।
তিথির ওই আর্তনাদ শোনার সাথে সাথে আয়ানের ভেতরের সেই পাথর মানবটা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। নেট টপকানোর কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এক লাফে ওপাশে চলে এল। পাগলের মতো তিথির সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে তিথির হাত দুটো সরানোর চেষ্টা করতে করতে অত্যন্ত অস্থির গলায় বলল।
“তিথি! তিথি, অনেক বেশি লেগেছে? চোখ কি খুব জ্বলছে? দেখি, হাতটা সরা।”
আয়ানের কণ্ঠস্বরে এমন এক হাহাকার আর ভয় ছিল, যা তিথি আগে কখনো শোনেনি। তিথি ভয়েই চোখ বন্ধ করে বসে ছিল, কিন্তু আয়ানের ওই স্পর্শ আর আকুতি শুনে সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আসলে লেগেছে ঠিকই, তবে কগটা অতটা ভারী ছিল না যে মারাত্মক কিছু হবে। হঠাৎ চোখে এসে পড়ায় সে ভয় পেয়ে চিৎকার করে ফেলেছিল।
তিথিকে সুস্থ দেখে আর তার চোখে বড় কোনো আঘাত না পেয়ে আয়ান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার কানে এল চারপাশ থেকে ভেসে আসা সমবেত খুকখুক কাশির শব্দ। শিহাব, নেহাল এমনকি রৌদ্রও মিটিমিটি হেসে গলা খাঁকারি দিচ্ছে। আয়ানের হুঁশ ফিরল সে বুঝতে পারল যে রাগের আড়ালে রাখা তার ভালোবাসাটা আজ সবার সামনে উলঙ্গ হয়ে পড়েছে।
মুহূর্তেই আয়ানের মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল। কোনো কথা না বলে, সে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। তারপর আগের মতোই ভাবলেশহীন মুখ করে নিজের জায়গায় গিয়ে ব্যাট হাতে নিল। যেন কিছুই হয়নি, সে কেবল কগটা কুড়াতে ওপাশে গিয়েছিল!
শিহাব ফিসফিস করে নেহালকে বলল।
“দেখলি তো? এটাকে বলে ‘মুখ মে রাম রাম, বগল মে ছুরি’র উল্টোটা! মুখে রাগ, কিন্তু মনে অগাধ মায়া! আমি বেশ জানি দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে।”
শিহাবের কথা শুনে নেহাল একদম তাচ্ছিল্যের একটা ভঙ্গি করল। সে শিহাবের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে বলল।
“তুই তো জানবিই! তুই তো মানুষের মনের ভেতর ঢুকে এমন সব বড় বড় আন্ডা পাড়িস যে মানুষের সব গোপন খবর তোর জানা। তোর চোখ কি এক্স-রে মেশিন নাকি রে?”
নেহালের এমন অদ্ভুত আর হাস্যকর কথা শুনে শিহাব প্রথমে কয়েক সেকেন্ড হা করে তাকিয়ে রইল। তারপরই হাসির দমক সামলাতে না পেরে সে নেহালের পিঠে ধুমধাম কয়েকটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল।
“শালা! আন্ডা পাড়ি মানে কী? আমি কি মুরগি নাকি? সব সময় এমন সব জঘন্য লজিক দিস কোত্থেকে বল তো?”
নেহাল কিল খেয়েও একটুও দমল না, বরং দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল।
“আরে ভাই, সত্যি কথাই তো বললাম! আয়ান ভাইয়ের মনের খবর তুই যেভাবে বের করলি, তাতে তো তোকে ‘মন বিশেষজ্ঞ’ উপাধি দেওয়া উচিত।
সত্যিই, এই অল্প সময়ের মধ্যেই শিহাব আর নেহাল যেন একে অপরের প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে যেন মনে হচ্ছে। তাদের খুনসুটি আর হাসাহাসিতে ছাদের গম্ভীর পরিবেশটা একদম হালকা হয়ে গেল।
খেলা শেষ হলো আর প্রত্যাশিতভাবেই ছেলেদের দলই জয়লাভ করল। নেহাল আর শিহাব তো এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন তারা অলিম্পিক জিতে এসেছে! তবে সবার শরীরেই ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। নিচে নেমে আসতেই রৌশনি খান সবাইকে সোফায় বসিয়ে ঠান্ডা পানির গ্লাস ধরিয়ে দিলেন। একে একে সবাই পানি খেয়ে নিজের নিজের রুমে গিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে চাইল।
রৌদ্র আর তুরাও তাদের রুমে এল। তুরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধছিল, এমন সময় রৌদ্র পেছন থেকে এসে ওর কাঁধে হাত রাখল। রৌদ্রের গম্ভীর চেহারা দেখে তুরা একটু অবাক হলো। রৌদ্র তুরাকে নিয়ে আলতো করে বিছানায় বসাল, তারপর ওর দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব সিরিয়াস মুখে বলল।
“তুরা, তোমার সাথে আমার একটা জরুরি কথা আছে।”
তুরা উৎসুক হয়ে তাকাল। রৌদ্র তুরার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল।
“শোনো, আমার একটা ইম্পর্ট্যান্ট মিটিং আছে, যার জন্য আমাকে পনেরো দিনের জন্য সুইজারল্যান্ড যেতে হবে।এই পনেরো দিন আমি থাকব না, তাই তোমাকে আগেভাগেই কিছু কথা কড়া করে বলে রাখছি। তুরা,তুমি যদি মাটিতেও ভুল করে পা রাখো অসাবধানে চলাফেরা করো, তাহলে কিন্তু আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না! আমি তুমি আর আমার সন্তানের গায়ে সামান্য আঁচড়ও লাগতে দিতে চাই না।”
রৌদ্রের গলায় যেমন শাসন ছিল, তার থেকেও বেশি ছিল এক অজানা আশঙ্কা আর ভালোবাসা। সে আরও একটু কাছে ঘেঁষে বসে বলল।
“সবসময় দেখে হাঁটবে, আশেপাশে খেয়াল রাখবে। কোনোভাবেই যেন বেখেয়ালে কিছু না হয়। আর যেকোনো দরকার হলে সাথে সাথে আমাকে ফোন দেবে। মনে থাকবে?”
রৌদ্রের যাওয়ার কথা শুনে তুরার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই আষাঢ়ের মেঘলা আকাশের মতো কালো হয়ে গেল। সাত দিন! তাও আবার দেশের বাইরে! তুরা কোনো কথা না বলে ছোট বাচ্চার মতো মুখ ঘুরিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে রইল। রৌদ্র তুরার মনের অবস্থাটা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে। সে তুরার দুই গালে হাত দিয়ে আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে খুব নরম সুরে বলল।
“দেখো তুরা, কর্মজীবনে এমন পরিস্থিতি সব পুরুষেরই আসে, বুঝছো? বিশ্বাস করো, আমি চেষ্টা করব যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ শেষ করে ফিরে আসার। তা ছাড়া তুমি যদি এই অবস্থায় না থাকতে, তবে নির্ঘাত তোমাকে আমার সাথেই নিয়ে যেতাম। কিন্তু এখন তুমি আর একা নও। তোমার ভেতরে এখন আমাদের একটা ছোট্ট পৃথিবী গড়ে উঠছে, যাকে নিয়ে আমি বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে চাই না। এই সময়টাতে মেয়েদের নিজের মায়েদের সান্নিধ্যে থাকা খুব প্রয়োজন, তাই আমি চাই তুমি সবসময় আম্মুদের সাথেই থাকো।”
রৌদ্র তুরাকে আবার নিজের বুকের মাঝে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পুনরায় বলল।
“রাগ করো না বউ আমার! আমি কথা দিচ্ছি, খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। তুমি রাগ করে থাকলে কিন্তু ওই দূর দেশে আমার একদমই মন টিকবে না।”
তুরা এবার রৌদ্রের বুক থেকে মাথা তুলে ঠোঁট উল্টে আদুরে গলায় জেদ ধরল।
“না! আমিও যাব। আমাকে প্লিজ সাথে নিয়ে যান।”
রৌদ্র এক মুহূর্তের জন্য তুরার এই আকুতি দেখে দুর্বল হয়ে পড়ল, কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে বলল।
“একদম না তুরা! তুমি বুঝতে পারছো না, ওইখানে আমি কাজের চাপে দম ফেলার সময় পাব না। আমার অবর্তমানে তোমার একটুও অযত্ন হোক সেটা আমি চাই না। আর লং জার্নি এই অবস্থায় তোমার জন্য একদমই সেফ না। প্লিজ সোনা আমার, একটু বোঝার চেষ্টা করো।”
তুরা এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো শান্ত হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকাল। তার চোখে তখনো অভিমানের রেশ লেগে থাকলেও রৌদ্রের যুক্তিগুলো সে মেনে নিয়েছে। সে খুব নরম গলায় বলল।
“ঠিক আছে, আপনি যখন বলছেন তখন আমি থাকব। তবে একটা শর্ত, যখনই একটু সময় পাবেন তখনই আমাকে কল করতে হবে, মনে থাকবে?”
রৌদ্র তুরার এই অবুঝ আবদার শুনে হেসে ফেলল। সে পরম আদরে তুরার দুই গাল টেনে দিয়ে বলল।
“ওরে আমার পাগলি বউ! কাজের ফাঁকে যদি আমি দুই সেকেন্ডের জন্যও ফ্রি হই, তবে ওই দুই সেকেন্ড আমি তোমাকেই কল দেব। বুঝলে আমার অনাগত বাবুর আম্মু?”
তুরা এবার লজ্জা পেয়ে রৌদ্রের শক্ত বুকে ছোট্ট ছোট্ট কিল মেরে আদুরে গলায় বলল।
“হুম বুঝেছি, আমার বাবুর আব্বু।”
রৌদ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না, সে তুরার কপালে গভীর এক ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিয়ে তাকে বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরা রৌদ্রের ওই প্রশান্তির বুকে চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে মিশে রইল। আহা! কী নিটোল ভালোবাসা এদের! এদের এই মাখোমাখো প্রেম দেখে তো আমার মতো লেখিকারও বড্ড হিংসে হচ্ছে! কপালে কি এমন একটা ‘বাবুর আব্বু’ জুটবে না রে।
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৭