নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
নির্লজ্জ_ভালোবাসা পর্ব ৬৭ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
[রোমান্টিক এলার্ট]
দুপুর ২:০০ টা। খান বাড়ি এখন এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বর নেহাল তার বিশাল বহর নিয়ে চলে এসেছে। সদর দরজায় গেট ধরার ধুমধাম শেষে নেহালকে বরণ করে নিয়ে গিয়ে সাজানো আসনে বসানো হয়েছে। ওদিকে অন্দরমহলে আরফাকে বঁধু বেশে সাজানোর শেষ মুহূর্তের তোড়জোড় চলছে রাজ্যের রূপবতী মেয়েরা আরফাকে ঘিরে রাজ্যের গল্পে মেতে আছে। তুরা আজ পরেছে কালো রঙের এক অপূর্ব জর্জেট গাউন। কালো রঙের সেই মায়াবী পোশাকে ওকে যেন কোনো রূপকথার অপ্সরা লাগছে। রৌদ্রও তুরার সাথে ম্যাচিং করে পরেছে কুচকুচে কালো এক পাঞ্জাবি। দুজনকে একসাথে দাঁড়ালে মনে হচ্ছে যেন কোনো ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ থেকে উঠে আসা মারাত্মক সুন্দর এক জুটি।
রৌদ্র আর আয়ান প্যান্ডেলে খাবারের তদারকিতে ব্যস্ত, মানুষের ভিড়ে ঘামছে। শিহাব আরশিকে সাথে নিয়ে পরিচিত অতিথিদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু এই আনন্দের মেলায় তুরার মনটা ভীষণ খারাপ। সবাই যার যার কাজে বা আড্ডায় এতই মগ্ন যে কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, যেন ও এই বাড়ির কেউ-ই না। অবহেলার যন্ত্রণায় তুরা গাল ফুলিয়ে এক কোণায় বুকে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ পেছন থেকে এক তীক্ষ্ণ মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল।
“হাই, আমি সৃজনী।”
তুরা সৃজনীর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে একটা শুকনো মুচকি হাসি দিয়ে জবাব দিল।
“আমি তুরা।”
সৃজনী এবার তার কালকের প্ল্যান করা বিষাক্ত চালটা চেলে হালকা স্বরে বলল।
“রৌদ্রের কাকাতো বোন, রাইট?”
মুহূর্তে তুরার বুকের ওপর ভাঁজ করা হাত দুটো শিথিল হয়ে নেমে এল। সৃজনীর সাথে তুরার এই মাত্র পরিচয় হলো, অথচ এই মেয়ে রৌদ্রের নামটা এত সহজভাবে নিচ্ছে কীভাবে এবং রৌদ্রকে চেনেই বা কিভাবে? তুরাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সৃজনী বুঝে নিল ঘাবলা তো নিশ্চয়ই আছে আর তার কথা তুরার তীরের নিশান একদম ঠিক জায়গায় লেগেছে। সৃজনী এবার আগুনে ঘি ঢেলে দিয়ে বলল।
“অবাক হচ্ছো তো আমি রৌদ্রকে কীভাবে চিনলাম? আসলে আমি একাই রৌদ্রকে চিনি না, রৌদ্রও আমাকে খুব ভালো করে চেনে। আমরা দুজন ঠিক কতটা ‘ক্লোজ’সেটা বলে বোঝাতে পারবো না।”
তুরার পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল, মাথার ভেতরটা এক নিমেষে চক্কর দিয়ে উঠল। সৃজনী তুরার ফ্যাকাশে মুখ দেখে নিশ্চিত হলো যে তার শিকার জালে ফেঁসেছে। সে এবার মিথ্যার জালটা আরও বিস্তার করে বলল।
“জানো, তোমার এই ভাইয়া রৌদ্র অনেক ভালো। আমি এইরকম হীরের টুকরো ছেলে খুব কমই দেখেছি। শুধু তাই না, রৌদ্র সেদিন আমাকে নিজে ড্রাইভ করে ভার্সিটিতে নামিয়ে দিয়ে এসেছিল।
তুরার কলিজাটা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই শূন্য হয়ে এক অসহ্য তীব্র জ্বালা শুরু হলো। তুরা তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ধরা গলায় প্রশ্ন করল।
“তুমি কে? আর তোমার সাথে রৌদ্রের পরিচয়টাই বা কীভাবে?”
সৃজনী এবার আরও ধূর্ত হয়ে উঠল। সে এক রহস্যময় শয়তানি হাসি দিয়ে তুরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
“আরে তেমন কিছু না এমনি একটু আধটু পরিচয় যাই হোক বন্ধু হবে।”
সৃজনীর মুখে সেই রহস্যময় লজ্জার হাসি তুরার বুকের ভেতর যেন কালবৈশাখী ঝড় তুলে দিচ্ছে। এটাই তো স্বাভাবিক, পৃথিবীর কোনো নারীই সহ্য করতে পারে না তার স্বামীকে অন্য কারো পাশে । তুরা নিজের ভেতরের সবটুকু কষ্ট আর হাহাকার চেপে ধরে জোর করে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে সৃজনীর বাড়ানো হাতে হাত রেখে শুধু বলল।
“হুম।”
সৃজনী মুহূর্তে হাত দুলিয়ে একটা বিজয়ী মুচকি হাসি দিয়ে ভিড়ের মাঝে মিলিয়ে গেল। তুরা পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের ভেতর তখন অদ্ভুত এক ভয় আর সন্দেহের বিষ দানা বাঁধছে। রৌদ্র তাকে ভার্সিটি পৌঁছে দিয়েছে? ছিঃ ছিঃ! এসব ও কী ভাবছে।
পরক্ষণেই তুরা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। মনে মনে ভাবল না না,রৌদ্র এমনটা করতেই পারে না। হয়তো রাস্তাঘাটে কোনোভাবে দেখা হয়েছে, পরিচয় হতেই পারে। কারো সাথে পরিচয় হওয়া মানেই তো আর খারাপ কিছু না।এসব যুক্তিতে তুরা নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও, তার বুকের ভেতরটা তখনো অকারণে ধকধক করছে।
হঠাৎ রৌদ্র হাসতে হাসতে তুরার সামনে এসে দাঁড়াল। তপ্ত দুপুরে এক চিলতে শীতল বাতাসের মতো সে তুরার সামনে এসে আলতো করে তুরার গাল টেনে দিয়ে বলল।
“কী হয়েছে আমার বউটার? এভাবে গাল ফুলিয়ে আছে কেন?”
তুরা বিমূঢ় হয়ে রৌদ্রের সেই উজ্জ্বল চোখের দিকে তাকাল। যে চোখে কেবলই মায়া আর ভালোবাসা খেলা করছে। কিন্তু তুরার মনের গহীনে তখন সন্দেহের এক বিষাক্ত সাপ ফণা তুলছে। সে মনে মনে ভাবল এই রৌদ্র কি সত্যি বদলেছে? নাকি সে আগের মতোই আছে? আবারো কি সে পুরনো সেই নারী নেশায় ডুবে যাবে? তুরাকে এভাবে অদ্ভুত আর স্থিরভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রৌদ্র হালকা ভ্রু কুঁচকে শুধাল।
“কী হয়েছে তুরা? তোমায় দেখে মনে হচ্ছে কোনো একটা গভীর বিষয় নিয়ে তুমি খুব চিন্তিত।”
তুরা মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিল। বুকের ভেতরটা ধকধক করলেও মুখে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে থমথমে গলায় বলল।
“ক কই, না তো! আসলে আমি আপনাকে দেখছিলাম। আপনি কত সুন্দর, তাই ভাবছিলাম।”
রৌদ্র তুরার কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো লুকোছাপা ছিল না। সে আমুদে স্বরে বলল।
“হঠাৎ এই কথা বলছো যে? মনে হচ্ছে যেন আগে আমাকে কখনো দেখোনি।”
কথাটা বলার সাথে সাথেই অন্যপাশ থেকে রৌদ্রের ডাক পড়ল। কোনো এক জরুরি প্রয়োজনে কেউ তাকে খুঁজছে। সে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আবারও তুরার গালটা মায়ায় টেনে দিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“এভাবে তাকিয়ে থেকো না বউ, আমি সত্যি পাগল হয়ে যাই। আর জানোই তো, আমি পাগল হলে কী করে বসি।”
মুহূর্তে তুরার গাল দুটো লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠল, সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিল। রৌদ্র হালকা চালে হাসতে হাসতে আবারও মানুষের ভিড়ে মিশে গেল।
[খান বাড়ি সন্ধ্যা ৭:০০ টা]
সন্ধ্যার পর খান বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করল। আরশি আর নেহালের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর সবাই নবদম্পতিকে ঘিরে মজা আর দুষ্টুমিতে মেতে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে মাইকের তীক্ষ্ণ শব্দে সবার নজর গেল মঞ্চের দিকে। এক তরুণ ছেলে হাসিমুখে মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল।
“শুভকামনা রইল নেহাল আর আরশির জন্য। আপনাদের আগামী দিনগুলো যেন সুখে আর হাসিতে ভরপুর থাকে, সেই দোয়াই করি। যাই হোক, এবার আসল কথায় আসি। গতকাল সিঙ্গেল ড্যান্স হয়েছে, তাই আজ আমরা চাই ধামাকা কাপল ড্যান্স! আর সেই ড্যান্স হবে এই বাড়ির তিন প্রিয় দম্পতিকে নিয়ে।”
পুরো প্যান্ডেলে তখন পিনপতন নীরবতা। ছেলেটি আবার বলতে শুরু করল।
“প্রথমে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি খান বাড়ির বড় ছেলে আব্রাহাম খান রৌদ্র এবং তার স্ত্রী তাবাসসুম ফিহা তুরাকে। তারপর মঞ্চে আসবে মেজো ছেলে আয়ান খান এবং তার স্ত্রী তিথি। সবশেষে আসবে খান বাড়ির একমাত্র জামাই শিহাব চৌধুরী এবং তার স্ত্রী আরশি খান। দয়া করে আপনারা মঞ্চে এসে নাচের জন্য প্রস্তুত হন!”
কথাটা শেষ হতে না হতেই চারদিকে তালি আর শিস দেওয়ার শব্দে কান পাতা দায় হয়ে পড়ল। কিন্তু এই উল্লাসের মাঝে সৃজনীর অবস্থা হলো দেখার মতো। তার চোখ দুটো রসগোল্লার মতো বড় বড় হয়ে গেল। সে কি ভুল শুনল? রৌদ্র বিবাহিত? আর যাকে সে রৌদ্রের বোন ভেবে অবজ্ঞা করছিল, সেই তুরাই রৌদ্রের স্ত্রী?
সৃজনীর মাথার ভেতরটা যেন ভনভন করে ঘুরতে লাগল। পায়ের তলার মাটি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। রৌদ্র বিবাহিত এই নির্মম সত্যটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। অস্থির হয়ে সে পাশে থাকা এক মহিলার কাছে গিয়ে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“এক্সকিউজ মি আন্টি, আসলে খান বাড়ির বড় ছেলে রৌদ্র কি সত্যি বিবাহিত?”
মহিলাটি হাসিমুখে জবাব দিলেন।
“হ্যাঁ মা, অনেক দিন আগেই তাদের বিয়ে হয়েছে।”
সৃজনী দুই পা পিছিয়ে গেল। যে মানুষকে নিয়ে সে এতো রঙিন স্বপ্ন বুনেছিল, সে বিবাহিত? আর তুরাকে সে কী না বলে ছোট করার চেষ্টা করেছে! অপমানে, কষ্টে আর হাহাকারে সৃজনীর বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছে। তার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে, কিন্তু এই উৎসবের মাঝে সে কেবল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
ধীরে ধীরে রৌদ্র আর তুরা মঞ্চে উঠে এল। চারদিকের উজ্জ্বল আলো আর শত শত মানুষের করতালিতে প্যান্ডেল তখন মুখরিত। রৌদ্র তুরার সামনে দাঁড়িয়ে ওর চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর খুব রাজকীয় ভঙ্গিতে নিজের হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল।
“লে’স ড্যান্স।”
তুরা কয়েক মুহূর্ত রৌদ্রের নেশাতুর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের কাঁপা কাঁপা হাতটা রৌদ্রের হাতের ওপর রাখল। ঠিক সেই মুহূর্তেই সাউন্ড বক্সে ভারী বেইজ আর নিখুঁত শব্দে বেজে উঠল সেই সুর Rab Kare Tujhko Bhi Pyar Ho Jaye। আকস্মিক সেই গগনবিদারী আওয়াজে তুরা সামান্য কেঁপে উঠলে রৌদ্র দেরি না করে শক্ত করে তুরার হাতটা নিজের মুঠোয় নিল। রৌদ্র তুরার এক হাত একটু উপরে তুলে ধরে অন্য হাত দিয়ে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল। এরপর বক্সের তালের সাথে তাল মিলিয়ে সে অতি সাবধানে পা মেলাতে শুরু করল।
গানের তাল বাড়ার সাথে সাথে রৌদ্র এক ঝটকায় তুরাকে নিজের শরীরের একদম কাছে টেনে নিল। রৌদ্রের বলিষ্ঠ বুকের স্পর্শে তুরার সারা শরীর যেন অবশ হয়ে এল। রৌদ্র তুরার কোমরে হাত রেখে ওকে নিয়ে মঞ্চের মাঝখানে চক্কর দিতে লাগল। বক্সে তখন গানের কলি বাজছে।
~রব করে তুঝকো ভি পেয়ার হো জায়ে~
~রব করে তুঝকো ভি পেয়ার হো জায়ে~
রৌদ্রের পা যেন মঞ্চের সাথে ছন্দ মেলাচ্ছে। সে একবার তুরাকে নিজের থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দিয়ে আবার এক টানে নিজের বাহুবন্দি করে ফেলল। রৌদ্রের তপ্ত নিঃশ্বাস তুরার কপালে আছড়ে পড়ছে। তুরা যখন রৌদ্রের বাহুবন্দি হয়ে শূন্যে হালকা পাক খেল, তখন প্যান্ডেলের পোলাপান শিস দিয়ে আর তালি বাজিয়ে পুরো এলাকা মাথায় তুলে ফেলল। রৌদ্র তুরার চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট মিলিয়ে গাইতে শুরু করল।
~তু আতা হ্যায় তু মোহাব্বত তু হ্যায় মেরা পেয়ার
হ্যায় ~
~ মারমিটা হুম মারমিটা হ্যায় মুখ ইকরা হ্যায়~
রৌদ্রের সেই গম্ভীর অথচ মায়াবী চাহনি দেখে তুরা যেন পৃথিবীর সব কিছু ভুলে গেল। মনের ভেতরের জমাট বাঁধা সব অভিমান আর প্রশ্ন যেন রৌদ্রের এই জাদুকরী স্পর্শে মুহূর্তেই ধুলোয় মিশে গেল। তুরা নিজের অজান্তেই রৌদ্রের কাঁধে হাত রেখে ওর তালে তাল মেলাতে লাগল। রৌদ্রের হাতের শক্ত বাঁধন যেন তুরাকে বারংবার মনে করিয়ে দিচ্ছে সে কেবলই রৌদ্রের, আর কারো নয়।
পুরো প্যান্ডেলের মানুষ তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই দম্পতির নিখুঁত রসায়ন দেখছে। গানের শেষ সুরটুকু পর্যন্ত ওরা যেন এক অন্য জগতে হারিয়ে গিয়েছে, যেখানে রৌদ্রের প্রতিটি স্পর্শ ছিল তুরার জন্য এক একটা নীরব প্রতিশ্রুতি।
ধীরে ধীরে রৌদ্র আর তুরার সেই মোহময় নাচ শেষ হলো। নাচ শেষ হতে না হতেই আয়ান আর তিথি মঞ্চে উঠে এল। ওরাও দারুণ এক কাপল ড্যান্স উপহার দিল সবাইকে। সবশেষে শিহাব আর আরশিও মারাত্মক কাপল ড্যান্স দিল। ওদের তিন জোড়ার নাচ যখন শেষ হলো, পুরো প্যান্ডেল করতালিতে ফেটে পড়ল। সবাই যখন খুশিতে আত্মহারা।
কিন্তু সৃজনীর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত বিষের মতো ঠেকছে।মঞ্চের ওপর রৌদ্র আর তুরার সেই নিবিড় রসায়ন সৃজনীর সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চারপাশের এই উৎসবের আমেজ, লোকজনের হাসি-ঠাট্টা সবই এখন তার কাছে অসহ্যকর বিরক্তির কারণ মনে হচ্ছে। সৃজনীর বুক ফেটে কান্না আসছে, কিন্তু এখানে সবার সামনে সে নিজেকে ভেঙে পড়তে দিতে চায় না।তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
সৃজনী আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কাউকে কিছু না বলে, কোনো বিদায় না জানিয়েই সে দ্রুত পায়ে প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে এল। চোখের জল কোনোমতে আটকে রেখে সে সোজা মেইন রোডের দিকে হাঁটা দিল। একটা খালি গাড়ি পেতেই তাতে উঠে বসল সে। গাড়ির জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সৃজনী মনে মনে বিষিয়ে উঠল। রৌদ্র যে তার ধরাছোঁয়ার বাইরে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
[রাত ১০: টা]
রাত তখন ১০:টা। প্যান্ডেলজুড়ে এক বিষণ্ণ নীরবতা নেমে এসেছে। আরফার বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে আসতেই চারপাশের আনন্দটুকু যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেল। আরফা তার বাবা আরিফুল খানকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। মেয়ের কান্নায় শক্ত সমর্থ মানুষ আরিফুল খানও আজ ভেঙে পড়েছেন।
তুরা,তিথি আর আরশিও নিজেদের চোখের জল ধরে রাখতে পারছে না তারা আরফাকে ঘিরে ধরে অঝোরে কাঁদছে। এক কথায়,পুরো বাড়ির সবাই যখন কান্নায় ভেঙে পড়েছে, কেবল রৌদ্র আর শিহাব দুই বন্ধু পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের চোখে পানি নেই, কিন্তু চোয়াল শক্ত হয়ে আছে বোনকে পর করে দেওয়ার এক গভীর নিরব যন্ত্রণা ওদের ভেতরেও খেলা করছে।
আরফা এবার আয়ানের দিকে এগিয়ে গেল। নিজের একমাত্র কলিজার ভাইটাকে জড়িয়ে ধরে সে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল। আয়ান এতক্ষণ নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলেও আরফার কান্না দেখে আর পারল না সে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলতে লাগল। ছোটবেলা থেকে যে বোনটা তার ছায়া হয়ে ছিল, আজ সে অন্য বাড়িতে চলে যাচ্ছে ভাবতেই আয়ানের কলিজাটা যেন ছিঁড়ে আসছে।
কান্নাকাটি আর সবার সাথে শেষ মুহূর্তের টুকটাক কথা বলে আরফাকে গাড়িতে তুলে দেওয়া হলো। গাড়িটা যখন ধীরে ধীরে চোখের আড়াল হতে শুরু করল, তখন সবার মনে হলো বাড়ির একটা অংশ যেন শূন্য হয়ে গেল। আরফা আজ আর কেবল আরফা নেই বাবার বাড়ির মায়া কাটিয়ে সে আজ একজনের স্ত্রী হয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে পাড়ি জমালো।
ক্লান্ত শরীরে আরশি কোনোমতে পা টেনে টেনে রুমে এলো। সারা দিনের ধকল আর আরফার বিদায়ের কান্না সব মিলিয়ে শরীর আর মন যেন ভেঙে আসছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। গয়নাগুলো এখন শরীরের ওপর ভারী বোঝার মতো মনে হচ্ছে। সে একে একে হাতের চুড়ি, কানের দুল খুলে ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখল।
সবশেষে যখন দুই হাত মাথার ওপর তুলে ঘাড়ের পেছনের নেকলেসের হুকটা খোলার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই ঘরটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আয়নায় তাকিয়ে আরশি কিছু বুঝে ওঠার আগেই অনুভব করল এক জোড়া তপ্ত হাত তার ব্লাউজের ফিতাটা টান দিয়ে আলগা করে দিল। আকস্মিক এই ছোঁয়ায় আরশির সারা শরীর দিয়ে যেন এক ঝলক বিদ্যুৎ খেলে গেল। আয়নায় চোখ পড়তেই দেখল পেছনে শিহাব দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখেমুখে আজ এক আদিম নেশা।
শিহাব আরশির ব্লাউজটা কাঁধ থেকে অনেকটা নামিয়ে দিয়ে নিজের ভিজে ঠান্ডা ঠোঁটজোড়া আরশির নগ্ন কাঁধে ছোঁয়াল। আরশি শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল, দুই হাতে নিজের শাড়িটা শক্ত করে খামচে ধরল সে। শিহাব ধীরে ধীরে আরশির কানের লতির কাছে মুখ নিয়ে এসে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল।
“আজ খাট ভাঙবে না বলে মিস্ত্রিকে দিয়ে ভালো করে টাইট দেওয়াইছি। চলো জান, শুরু করে দেই। কাল না হয় ঝাঁপে খাট ভেঙেছি, আজ আমি আমার আদরের তোড়ে খাট ভাঙব।”
শিহাবের এমন সরাসরি আর বেহায়া কথায় আরশি লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গেল। সে লজ্জা সইতে না পেরে ছিটকে সেখান থেকে দৌড়ে পালাতে চাইল, কিন্তু শিহাব আজ বড্ড চতুর। সে এক টানে আরশির শাড়ির আঁচল ধরে ফেলল। আরশি টাল সামলাতে না পেরে পিছু হটে সরাসরি শিহাবের শক্ত বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। শিহাব ওকে নিজের দুই বাহুর খাঁচায় শক্ত করে বন্দি করে কানের কাছে মুখ ঘষে বলল।
“পালাতে চাও? আজ আমি বড্ড বেসামাল আরশি, আজ আর রক্ষা নাই তোমার। আজ যদি খাট ভাঙে, তবে ফ্লোরেই বাসর হবে। ফ্লোর ভাঙলে পাতালে নামব, তবুও আমি আজ বাসর করেই ছাড়মু।”
শিহাবের দুহাতের শক্ত বাঁধন আর তার গলার সেই নেশাতুর স্বর আরশিকে পুরোপুরি অবশ করে দিল। সে আর কথা বলার শক্তি পেল না, কেবল শিহাবের চওড়া বুকে মুখ লুকিয়ে নিজের লজ্জা ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা করল। শিহাব তাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানার দিকে পা বাড়াল।
শিহাব অত্যন্ত কোমলতায় আরশিকে বিছানার নরম গদিতে শুইয়ে দিল। নিজের শরীরের পুরো ভরটা আরশির ওপর ছেড়ে দিয়ে শিহাব আলতো করে আরশির গলার সেই ভারী নেকলেসটা খুলে পাশে সরিয়ে রাখল। আরশির ললাটে অবাধ্য হয়ে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা চুল যত্ন করে কানের পিঠে গুঁজে দিল শিহাব। তারপর খুব ধীরলয়ে আরশির কপালে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ছোঁয়ালো। আরশি এক গভীর আবেশে চোখ বুজে সেই স্পর্শ নিজের অস্তিত্বে মিশিয়ে নিল।
পর মুহূর্তেই শিহাব আর কোনো দূরত্ব রাখল না। শিহাব আরশির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। এক উন্মত্ত নেশায় শিহাব আরশিকে নিজের করে নিতে লাগল। আরশিও আজ আর নিজেকে সরিয়ে রাখল না আরশির হাত দুটো শিহাবের চওড়া পিঠের ওপর বিচরণ করতে শুরু করল। দুজনে একে অপরের উত্তাপে যেন মোমের মতো গলে যেতে লাগল।
তাদের সেই মুহূর্তগুলো সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর থেকে গভীরে পৌঁছে গেল। শরীরের আবরণগুলো একে একে খসে পড়ে দুজনকে যেন একবিন্দুতে মিলিয়ে দিল। একে অপরের ঘন নিশ্বাসের শব্দ তখন রুমের নীরবতাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। শিহাবের প্রতিটি স্পর্শ, প্রতিটি আদর আরশির অস্তিত্বের এত গভীরে গিয়ে পৌঁছাল যে, আরশির চোখ দিয়ে সুখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। যা তাদের ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রইল।
আরশি ঠিক সেই চরম সুখের মুহুর্তে শিহাবকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। শিহাবের কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিশ্বাসে অস্ফুট স্বরে আরশি বলল।
“আই… লাভ… ইউ শিহাব।”
আরশির এই কথায় শিহাবের ভেতরের আবেগকে যেন আরও বাড়িয়ে দিল। শিহাব যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আরও বেশি উন্মত্ত হয়ে শিহাব আরশিকে ভালোবাসার জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে চলল। দীর্ঘদিনের সব মান অভিমান,সব দূরত্ব আজ ধুলোয় মিশে গেল। দুটি শরীর আর দুটি আত্মা আজ একে অপরের মাঝে বিলীন হয়ে ভালোবাসার এক অতল সাগরে হারিয়ে গেল। রাতের নিস্তব্ধতায় কেবল তাদের হৃদস্পন্দনের আওয়াজই সাক্ষী হয়ে রইল এই ভালোবাসার।
রানিং…!
অবশেষে শিহাব আরশিও বাসর করে ফেলল🙈🙈
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৯