নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৬৪ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
[খান বাড়ি সকাল ৭:০০ টা]
খান বাড়ির সকালটা আজ অন্য এক রঙে সেজেছে। ঘড়িতে তখন সকাল সাতটা বাজলেও বাড়ির প্রতিটি কোণ কোলাহলে মুখর। চারদিকে মানুষের ব্যস্ততা, শিশুদের চঞ্চল দৌড়াদৌড়ি আর হাসাহাসিতে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কারণ আজ আরফার গায়ে হলুদ। সময় যে কতটা দ্রুত ডানায় ভর করে উড়ে যায়, তা বাড়ির সবাই আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। দেখতে দেখতে সেই আরফার বিয়ের দিন ঘনিয়ে এল।
বাড়ির পুরুষেরা বাইরের প্যান্ডেল আর গেটের তদারকিতে ব্যস্ত, অন্যদিকে মহিলারা ঘরের ভেতরে নানা আয়োজনে মগ্ন। রৌদ্র আর আয়ান নিজেরা দাঁড়িয়ে থেকে ডেকোরেশনের কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। এদিকে আরফাকে ঘিরে তার সখীরা রুমে বসে মেহেন্দি লাগাতে ব্যস্ত। সবাই ওকে নিয়ে হাসাহাসি আর দুষ্টুমি করছে যে, শেষমেশ এই চিরকাল সিঙ্গেল থাকা আরফারও বিয়ে হচ্ছে। আরশি আর শিহাবও চলে এসেছে। আরশি এখন পুরোপুরি সুস্থ, আর এটা সম্ভব হয়েছে একমাত্র শিহাবের জন্য। শিহাব নিজের জীবনের চেয়েও বেশি যত্ন দিয়ে আরশিকে আগলে রেখেছে।
তুরা, তিথি আর আরশি তিনজনে মিলে মেহেন্দি লাগাচ্ছে আর একে অপরের সাথে খুনসুটিতে মেতেছে। ঠিক সেই সময় রৌদ্র, আয়ান আর শিহাব ক্লান্ত শরীর নিয়ে ওদের রুমে ঢুকল। প্রচণ্ড গরমে আর খাটুনিতে রৌদ্রের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। রৌদ্র রুমে ঢুকেই কোনো দ্বিধা না করে সোজা তুরার পাশে গিয়ে বসল। তুরা তখন মেহেন্দি দিতে এতই মশগুল যে পাশে কে এসেছে খেয়ালই করেনি। রৌদ্র একদম বেহায়ার মতো তুরার কাঁধের ওড়নাটা টেনে নিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছতে শুরু করল।
আয়ান আর শিহাব একদম পাথরের মতো স্থির হয়ে রৌদ্রের এই কাণ্ড দেখছে। রুমের ভেতরে থাকা অনেক মেয়েই রৌদ্রের এই পাগলামি দেখে মুখ টিপে হাসছে। রৌদ্র শিহাব আর আয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।
“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমি নিজের পুরুষত্বের প্রমাণ দিলাম তাই বলে?”
তুরার হঠাৎ মনে হলো তার ওড়নাটা কেউ টানছে। সে তাকিয়ে দেখে রৌদ্র তার ওড়না দিয়ে ঘাম মুছে সেটা কুঁচকে ধরে আছে। তুরা অবাক হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“এটা কি হচ্ছে সবার সামনে আপনি আমার ওড়না দিয়ে ঘাম মুছলেন কেন?।”
রৌদ্র একদম নির্লিপ্তভাবে তুরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল।
“আমার বউয়ের ওড়না আমি ব্যবহার করব, তাতে কার কী? ঘাম মোছার জন্য এর চেয়ে আরামদায়ক আর কিছু হতে পারে না।”
রৌদ্রের কথা শুনে রুমে থাকা সব মেয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল। হাসির রোল এমনভাবে উঠল যে মনে হচ্ছে আরফার গায়ে হলুদের আনন্দ এখনই দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আরশি হাসতে হাসতে কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে রৌদ্রের উদ্দেশ্যে বলল।
“ভাইয়া তাহলে একটা কাজ করো! এইভাবে ওড়না দিয়ে ঘাম মুছার চেয়ে তুরার ওড়নাটা নিজের গলায় ঝুলিয়ে রাখো। যখনই ঘাম জমবে, সাথে সাথে ওড়না দিয়ে মুছে নেবে।”
আরশির কথা শুনে হাসির ধুম যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। মেয়েরা তো হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। রৌদ্র আরশির মাথায় হালকা করে একটা চড় মেরে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলল।
“তুই কি ভাবিস তোর ভাই ভীতু? আমি এটাও করতে পারব, দেখ তবে!”
কথাটা বলেই রৌদ্র কালক্ষেপণ না করে পাশে থাকা অন্য একটা ওড়না হাতে নিল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে তুরার গায়ের ওড়নাটা এক ঝটকায় কেড়ে নিয়ে অন্য ওড়নাটা তুরার দিকে ছুড়ে দিল। তুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রৌদ্র তার সেই ওড়নাটা নিজের গলার সাথে শক্ত করে পেঁচিয়ে নিল।
সব মেয়ে হাসতে হাসতে এবার সত্যি সত্যিই মেঝের ওপর গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা। তুরা লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে মাথা একদম নিচু করে ফেলল। তার মনে হচ্ছে মাটির নিচে যদি কোনো গর্ত থাকত, তবে সেখানেই সে এখন ঢুকে পড়ত। সে ভয়ে আর লজ্জায় কারো দিকে তাকাতেও পারছে না।
শিহাব আর আয়ান দুজন একে অপরের দিকে অসহায়ের মতো তাকাল। রৌদ্রের এই অসীম সাহস আর পাগলামি দেখে তারা যেন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়েই সংকটে পড়ে গেছে। দুজনেই বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যর্থ প্রেমিকের মতো সোফায় গা এলিয়ে দিল।
শিহাব কপালে হাত দিয়ে হতাশ কণ্ঠে বলল।
“আহ! শুধু আমরাই পারলাম না রৌদ্রের মতো এমন রোমান্টিক হাসবেন্ড হতে। হতাশ, খুবই হতাশ।”
আয়ান শিহাবের কথায় সায় দিয়ে করুণ সুরে বলল।
“ঠিক বলেছ ভাই। আমাদের কপালে মনে হয় আর এমন পুরুষত্বের প্রমাণ দেওয়া হবে না। আমরা তো শুধু দেখেই গেলাম, কাজের কাজ কিছুই করতে পারলাম না।”
রৌদ্র গলা থেকে ওড়নাটা একটু ঠিক করে নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল।
“তোদের দিয়ে কিচ্ছু হবে না! তোরা সারাজীবন আমার এই সব ট্যালেন্ট দেখেই যাবি। সাহসীগতা তোদের মধ্যে নেই।”
রৌদ্রের কথা শুনে শিহাব মুহূর্তের মধ্যে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখেমুখে তখন জেদ আর চ্যালেঞ্জের ছাপ স্পষ্ট।শিহাব বুক ফুলিয়ে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“কী বললি? আমাদের সাহস নেই? দাঁড়া, তোর থেকে ডাবল সাহসের প্রমাণ দিচ্ছি এখন, জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ!”
সবাই ভ্রু কুঁচকে কৌতূহল নিয়ে শিহাবের দিকে তাকাল। শিহাব দুই হাত কোমরের পেছনে মুঠো করে একদম শান্ত আর ভদ্র ছেলের মতো আরশির দিকে এগোতে লাগল। আরশি মনে মনে ভাবছে শিহাব এভাবে কেন আসছে, কিন্তু তার ভাবনার মাঝপথেই শিহাব ছোঁ মেরে আরশিকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। আরশির হাতে তখন কাঁচা মেহেন্দি, তাই সে ভয়ে তাড়াতাড়ি নিজের দুই হাত ছড়িয়ে দিল যাতে শিহাবের পরিষ্কার শার্টে রঙ না লেগে যায়।রুমের ভেতর থাকা সব মেয়ে এবার হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ল। রৌদ্রও হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, কারণ শিহাব সত্যিই সাহসের প্রমাণ দিয়েছে। আরশি লজ্জায় একদম লাল হয়ে শিহাবের দিকে তাকিয়ে বলল।
“কী করছেন কী? নামান বলছি! লজ্জা করছে না এভাবে সকলের সামনে আমাকে কোলে নিতে?”
শিহাব মোটেও দমে গেল না, বরং আরশিকে আরও শক্ত করে কোলে আঁকড়ে ধরে ঘরের মাঝখানে ঘুরতে ঘুরতে বলল।
“না সুইটহার্ট! তোমাকে নিয়ে সারা বিশ্ব ঘুরলেও আমার লজ্জা লাগবে না, আর এখানে তো ঘরের মানুষ!”
মেয়েরা হেসেই চলেছে, যেন কেউ তাদের কাতুকুতু দিচ্ছে। আরশি লজ্জায় কথা বলতে না পেরে চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে রাখল। এদিকে আয়ান বুঝল, সে যদি এখন চুপ করে বসে থাকে তবে তার নামের পাশে কাপুরুষের তকমা লেগে যাবে। আয়ান এবার সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে উঠে দাঁড়িয়ে গলা ঝেড়ে খাঁকারি দিয়ে বলল।
“উহুম উহুম! এবার আমার পালা। দেখি আমি কতটা সাহসিকতার প্রমাণ দিতে পারি।”
আয়ানের মতলব বুঝে তিথি মুহূর্তের মধ্যে উঠে দৌড় দিতে চাইল। কিন্তু আয়ান তার চেয়েও বেশি চালাক। তিথি পালানোর আগেই আয়ান এক টানে তিথির হাত ধরে নিজের কাছে টেনে আনল। তারপর সবার সামনে তিথির মাথাটা ধরে দুই গালে টপাটপ কয়েকটা চুমু খেয়ে ফেলল।সবাই এবার হাসতে হাসতে প্রায় পাগল হওয়ার জোগাড়। হাসির চোটে অনেকের চোখের পানি বের হয়ে এসেছে। রুমটা যেন এক আনন্দের সাগরে পরিণত হয়েছে। রৌদ্র শিহাব আর আয়ানের দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইশারায় সাবাসি দিল।
রুমের ভেতরে হাসির রোল যেন থামছেই না। একটি মেয়ে হাসতে হাসতে রৌদ্র আর শিহাবের উদ্দেশ্যে বলল।
“আপনারা যাই বলুন না কেন, এখানে কিন্তু সবথেকে বেশি সাহসিকতার প্রমাণ দিয়েছে আয়ান। সো, আয়ানকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া দরকার।”
শিহাব আয়ানের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করে মুচকি হেসে বলল।
“ছোটরা একটু বেশিই পাকনা হয় আর কি! ওর সাহস দেখে তো আমি নিজেই অবাক।”
রৌদ্র এতক্ষণ শান্ত থাকলেও এবার তুরার দিকে আড়চোখে একবার তাকাল। তারপর শিহাব আর আয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল।
“ভাই তোদের সাহস আছে মানছি, তবে একটা কথা বলি। আমি আমার বউকে যেমন ভালোবাসি তেমন ভয়ও পাই। দেখিস না ওড়নার জন্য কেমন করল? তোদের মতো কাণ্ড করলে এতক্ষণে আমাকে ঝাটা পেটা করত। বিশ্বাস করিস না? এই দেখ।”
কথাটা শেষ করেই রৌদ্র তুরার দিকে বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে গেল। তুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রৌদ্র ঈগলের মতো ছোঁ মেরে তুরার মাথাটা দুহাতে ধরল। তারপর সবার সামনে তুরার ঠোঁটে চট করে একটা চুমু খেয়েই দিল দৌড়। রৌদ্র খুব ভালো করেই জানে, এখন যদি সে এখানে এক মুহূর্ত দেরি করে তবে তুরা আজ তাকে মেরেই ফেলবে।
তুরা লজ্জায় আর অপমানে একদম নীল হয়ে গেল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে বসে রইল। রুমের বাতাস এখন হাসিতে ফেটে পড়ছে। শিহাব আর আয়ান রৌদ্রের এই অভাবনীয় কাণ্ড দেখে একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর তারা যখন নিজেদের বউ অর্থাৎ আরশি আর তিথির দিকে তাকাল, দেখল তারা দুজন একদম লাল চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চাহনি দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পরবর্তী টার্গেট এখন তারাই। শিহাব আর আয়ান আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না জীবন বাঁচানোর তাগিদে রৌদ্রের পিছু পিছু ওরাও রুম থেকে দিল এক দৌড়।
মেয়েরা হাসতে হাসতে নিজেদের সামলাতে পারছে না। তাদের মধ্যে একজন হাসির দমকে কুঁকড়ে গিয়ে বলল।
“ভেবেছিলাম আয়ান হয়তো নোবেল পুরস্কারটা পাবে, কিন্তু সেই পুরস্কারটাও তো রৌদ্র ভাই এক নিমিষেই কেড়ে নিল।”
তুরা মেহেন্দি মাখা হাতগুলো বাতাসে মেলে রেখেই রাগে গজগজ করতে করতে বলল।
“আসুক ও আজ রুমে, ওর হাড়গোড় যদি আমি আজ আস্ত রাখি তবে আমার নামও তুরা না।”
আরেকটা মেয়ে হাসতে হাসতে বলল।
“তাই তো! রৌদ্র ভাই সবাইকে বোকা বানিয়ে একদম শেষ মুহূর্তে ছক্কা মেরে গেল।”
[সন্ধ্যা ৭:০০ টা]
গায়ে হলুদের লগ্ন ঘনিয়ে এসেছে। খান বাড়ির বিশাল মাঠজুড়ে এলাহি কারবার। চারদিকে আলো ঝলমলে আলোকসজ্জা, যেন আকাশ থেকে তারারা নেমে এসেছে উঠোনে। বড় বড় বক্সে হলুদের গান বাজছে, আর সেই তালের সাথে পুরো বাড়ি যেন কাঁপছে। এক উৎসবমুখর আনন্দ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভেতরের রুমে আরফাকে সাজানো হচ্ছে। তুরা, তিথি আর আরশিও গায়ে হলুদের হলুদ রঙের লেহেঙ্গা পরে সেজেছে। কাঁচা গাঁদা ফুল আর গোলাপের গয়নায় তাদের রূপ যেন ফেটে পড়ছে। পার্লারের আন্টি তাদের এমন নিখুঁতভাবে সাজিয়েছে যে চার বোনকে একেকটা জান্নাতের পরী মনে হচ্ছে। তুরা আয়নায় নিজেকে একবার দেখে ভাবল, এই সাজে একা কয়েকটা ছবি তুললে দারুণ হতো। যেই ভাবা সেই কাজ, তুরা তার ভারী লেহেঙ্গাটা হাত দিয়ে সামলে ধরে নিজের রুমের দিকে যেতে লাগল।
কিন্তু করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তুরার হাত ধরে কেউ সজোরে টান মারল। তুরা আর্তনাদ করার সুযোগও পেল না, তার আগেই তাকে পাজা করে তুলে নিয়ে সোজা দেয়ালের সাথে চেপে ধরা হলো। তুরা চমকে উঠে চোখ মেলে দেখল সামনে রৌদ্র দাঁড়িয়ে।
রৌদ্রকে দেখে তুরা যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। রৌদ্রের পরনে জলপাই রঙের পাঞ্জাবি আর সাদা জিন্স প্যান্ট। গলায় এখনো তুরার সেই ওড়নাটা স্টাইল করে ঝোলানো। পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো, আর বাম হাতে দামী এক স্মার্ট ওয়াচ। সযত্নে আঁচড়ানো সিল্কি চুলগুলো কপালে আলতো করে ছুঁয়ে আছে। তুরা এই প্রথম রৌদ্রের দিকে একদম বেহায়ার মতো পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইল।
এদিকে রৌদ্রও যে তার দিকে এক ঘোরলাগা নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, সেদিকে তুরার কোনো খেয়াল নেই। রৌদ্রের তপ্ত নিশ্বাস তুরার মুখে এসে পড়ছে। দুজনের মাঝে কোনো কথা নেই, শুধু হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি যেন নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে।রৌদ্র এক হাত দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল।
“আজকের এই হলুদ পরীর দিকে তাকালে কি আর অন্য কিছুর দিকে তাকানো যায়”
তুরা রৌদ্রের নেশালো চোখের দিকে তাকিয়ে কোনোমতে ঢোক গিলে বলল।
“আপনি এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন কেউ দেখলে কী ভাববে ছাড়ুন আমাকে”
রৌদ্র তুরার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে আরও গাঢ় স্বরে বলল।
“কেউ দেখলে দেখুক আমি আমার বউকে ধরেছি তাতে কার কী?।”
রৌদ্র তুরাকে দেয়ালের সাথে দুই হাতের মাঝে আবদ্ধ করে ফেলল। তুরা রৌদ্রের শক্ত বুকের ওপর দুই হাত দিয়ে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল।
“ছাড়ুন না! আমাকে কয়েকটা ছবি তুলতে হবে। গায় হলুদ শুরু হয়ে যাবে তো।”
রৌদ্র তুরার কথা শুনে এক চিলতে মুচকি হাসল। সে নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করে তুরাকে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে টেনে নিল। তারপর ফোনটা উঁচিয়ে ধরে আদেশের সুরে বলল।
“স্মাইল দে।”
তুরা অপ্রস্তুত থাকলেও রৌদ্রের কথা ফেলতে পারল না। সে সাথে সাথেই রৌদ্রের সাথে তাল মিলিয়ে হাসল। রৌদ্র দেরি না করে কয়েকটা দারুণ ছবি তুলে ফেলল। তারপর আচমকা ফোনটা তুরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল।
“এইবার তুই তুল।”
বলেই রৌদ্র পেছন থেকে তুরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরা ফোনটা একটু উঁচিয়ে ধরে একের পর এক ছবি তুলতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তেই রৌদ্র হঠাৎ তুরার গালে গভীর করে একটা চুমু খেল। তুরা চমকে গেলেও সেই অসাধারণ মুহূর্তটা ফোনের ক্যামেরায় বন্দি হয়ে গেল। রৌদ্রের এমন পাগলামি আর তুরার লজ্জা মেশানো হাসির অনেকগুলো স্টাইলিশ ছবি তোলা হয়ে গেল।
তুরা গাল লাল করে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আপনার তো ছবি তোলার ছুতোয় শুধু অসভ্যতামী করার ধান্দা! এবার ছাড়ুন তো, লোকে দেখলে বলবে কী?”
রৌদ্র তুরার কানের কাছে মুখ নিয়ে আলতো করে ফিসফিস করে বলল।
“লোকে যা বলে বলুক, আমার বউকে আজ এত সুন্দর লাগছে যে আমার ইচ্ছে করছে তোমায় নিয়ে পালিয়ে দূরে কোথাও চলে যায়।”
তুরা রৌদ্রের ছাড়া পাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করতে করতে বলল।
“থাক আর ন্যাকামি করতে হবে না। ছাড়ুন চলুন এখন নিচে যাই, সবাই বোধহয় আমাদেরই খুঁজছে।”
রৌদ্র তুরাকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। তুরার কাঁধের ভাজে মুখ গুঁজে দিয়ে নিজের গরম নিশ্বাস ফেলে একদম নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল।
“ও বউ শুনো না বড্ড বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে’ আই ওয়ান্ট টু বিকাম আ ফাদার’ আমি তোমায় আদ’র দিবো তুমি আমায় একটা বাবু গিফট করবে।”
রৌদ্রের এই অকপট স্বীকারোক্তি আর ঘাড়ের ওপর তার তপ্ত নিশ্বাসের ছোঁয়া লেগে তুরা থরথর করে কেঁপে উঠল। লজ্জায় তার চোখের পাতা বুজে এল, সারা শরীরে যেন এক আশ্চর্য শিহরণ বয়ে গেল। রৌদ্রের এই গভীর চাওয়ার বিপরীতে তুরা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না ঠিকই, কিন্তু তার নিজের ভেতরেও যে এক সুপ্ত বাসনা খেলা করছে তা সে অস্বীকার করতে পারছে না। তুরা শুধু মনে মনে ভাবল, সে নিজেও তো মা হতে চায়। প্রত্যেক নারীই তো তার ভালোবাসার মানুষের প্রতিচ্ছবিকে নিজের ভেতরে লালন করার স্বপ্ন দেখে।
রৌদ্র তুরার নীরবতা অনুভব করে তার চুলের মাঝে নিজের নাক ডুবিয়ে আবার বলল।
“রেডি থেকো বউ আজ রাতে আমাদের ছোট পৃথিবীটা আনার জন্য আমাদের ভালোবাসার প্রমাণ কে আনার জন্য।”
কথাটা বলেই রৌদ্র তুরার গালে শেষবারের মতো একটা আলতো পরশ বুলিয়ে দিল। তারপর তাকে সামনের দিকে ঘুরিয়ে কপালে লম্বা একটা চুমু খেয়ে দ্রুত পায়ে নিচে চলে গেল। তুরা রৌদ্রের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ঠোঁটের কোণে তখন স্নিগ্ধ এক চিলতে হাসি। তুরা বিড়বিড় করে আপনমনেই বলল।
“পাগল একটা! বাচ্চাদের মতো খালি আবদার করে।”
এদিকে বাড়ির বাইরের খোলা মাঠে তিথি একা একাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। সে কখনও গাল ফুলিয়ে আবার কখনও জিভ বের করে নানা ঢঙে সেলফি তুলছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই হঠাৎ কেউ একজন খুব উচ্চস্বরে গেয়ে উঠল।
~ও রূপসী মেকআপ লাগে যে বেশি, সেলফিটা তুলে সে হয়েছে খুশি~
আচমকা গানের সুর শুনে তিথি চমকে উঠে পেছনে তাকাল। দেখল আয়ান বুকে হাত ভাঁজ করে এক বাঁকা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ানকে দেখেই তিথি রেগে গিয়ে মুখ ভেংচি কেটে বলল।
“আমি মোটেও মেকআপ সুন্দরী না, বুঝেছো? আমার নিজেরই অনেক রূপ আছে।”
আয়ান এবার পা টিপে টিপে তিথির একদম কাছে চলে এল। তিথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আয়ান ঝট করে তার কোমর জড়িয়ে নিজের কাছে টেনে নিল। আয়ানের এমন হুটহাট আক্রমণে তিথি হকচকিয়ে গেল। আয়ান তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় গলায় বলল।
“তাই নাকি? তাহলে তো একটু ভালো করে পরীক্ষা করে দেখতে হয় মেকআপ কতটুকু আর আসল রূপ কতটুকু!”
তিথি আয়ানের শক্ত বাঁধন থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করল। সে চারদিকে তাকাতে তাকাতে বিরক্তি আর ভয় মেশানো কণ্ঠে বলল।
“আয়ান ছাড়ো! বলছি কেউ দেখে ফেলবে?।”
আয়ান মোটেও ছাড়ার পাত্র নয়। সে তিথিকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে তার নাকের সাথে নিজের নাক ঘষে দিয়ে বলল।
“দেখলে দেখুক আমি আমার বউকে ধরেছি এতে কার কী?।”
তিথি এবার রাগে আর চরম বিরক্তিতে আয়ানকে সজোরে একটা ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল। রাগে তার শরীর কাঁপছে। তিথি একদম তীক্ষ্ণ আর ঝাঁজালো কণ্ঠে বলল।
“আয়ান! তোমাকে জাস্ট সহ্য হয় না আমার। ঘৃণা লাগে তোমাকে দেখলে!”
আয়ান মোটেও বিচলিত হলো না। সে যেন পাথরের মতো অটল। তিথির ধাক্কা সামলে নিয়ে সে আবারো এগিয়ে এল এবং দ্বিগুণ শক্তিতে তিথির কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। আয়ান তিথির চোখের গভীরে একদম সরাসরি তাকিয়ে শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে বলল।
“আমি একটা বারও বলছি না যে আমাকে তোর সহ্য করতে হবে বা ভালোবাসতে হবে। তুই ভালোবাসলেও আমার, আর না বাসলেও আমারই থাকবি।”
তিথি যেন এবার রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আয়ানের এমন নির্লিপ্ত ভাব তাকে আরও বেশি খেপিয়ে তুলল। সে নিজের শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে আয়ানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল এবং বুক চিরে আসা তীব্র আর্তনাদ নিয়ে বলল।
“তোমাকে আমি ঘৃণা করি! শত অবহেলা করার পরও কেন এত কাছে আসো? লজ্জা করে না তোমার? বেহায়া, নষ্ট পুরুষ কোথাকার!”
আয়ানের চোয়াল যেন এইবার মুহূর্তেই শক্ত হয়ে এল। অপমানের দহন আর ভালোবাসার জেদ মিলে তার দুচোখে তখন আগুনের ফুলকি। সে এবার ঝড়ের গতিতে তিথির কাছে গিয়ে ওর গাল দুটো সজোরে চেপে ধরল। তিথি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলেও আয়ান ছাড়ল না। আয়ান দাঁতে দাঁত চেপে চরম সত্যটা আজ স্বীকার করে নিয়ে বলল।
“না লজ্জা করে না! কারণ তোকে আমি ভালোবাসি। আর আমার ভালোবাসাটাই নির্লজ্জ ভালোবাসা, যেখানে এক টুকরোও লজ্জা নেই।”
কথাটা বলেই আয়ান মুহূর্তে তিথির গাল ছেড়ে দিল। কিন্তু তাকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে আবারো খপ করে তিথির কোমর জড়িয়ে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে ফেলল। তিথি নিজেকে ছাড়ানোর জন্য হাত-পা ছুড়লেও আয়ান আজ যেন কোনো এক আদিম জেদে মগ্ন। আয়ান তিথির চোখের খুব কাছে নিজের চোখ রেখে চরম জেদী গলায় বলল।
“শুনে রাখ, তুই যদি বিষ হস তাহলে সেই বিষাক্ত বিষ আমি পান করতেও রাজি।”
রানিং…!
ভিড়িওতে যারা সঠিক আন্সার দিয়েছো তাদেরকে আমার তরফ থেকে 🥘”আর যারা ভুল আন্সার দিয়েছো তাদের কে আমার তরফ থেকে🍼🍼
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা গল্পের লিংক
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৮