নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৬৩ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
রাস্তার পিচ থেকে তখনো আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। তিথির বুকের ধকপকানি যেন কান ফাটানো শব্দের মতো নিজের কানেই বাজছে। ঘাম আর চোখের জলে একাকার হয়ে সে যখন দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই পায়ের স্যান্ডেলটা বিট্রে করল। পা হড়কে একদম মাঝরাস্তায় ধপাস করে আছাড় খেল সে। হাঁটুর ছাল উঠে গিয়ে জ্বালা শুরু করলেও সেই ব্যথার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো মনের ভয়।
তিথি কোনোমতে টাল সামলে ঘুরে তাকাতেই দেখল যমদূতের মতো আয়ান আসছে। ধীরস্থির পায়চারি, কোনো তাড়া নেই তার মধ্যে। কারণ সে জানে, তার শিকার তার হাতের মুঠোয়। তিথি রাস্তার ধুলোমাখা পিচেই বসে পড়ল। আয়ান যত এক পা দু পা করে এগিয়ে আসছে, তিথি ততই দুই হাতে মাটিকে আঁকড়ে ধরে পেছনের দিকে ঘষটে ঘষটে সরছে। তার চোখের মণি কাঁপছে আতঙ্কে।
কাঁপা কাঁপা ঠোঁটজোড়া এক করে তিথি মিনতি শুরু করল।
“প্লিজ আয়ান এইবারের মতো মাফ করে দাও! আমি কসম করে বলছি, আর কক্ষনো তোমাকে না বলে বাইরে আসব না। প্লিজ এবারের মতো ছেড়ে দাও।”
আয়ান ঠিক তার সামনে এসে থামল। খুব ধীরেসুস্থে নিজের পায়ের জুতোটা ঠিক করে পরে নিল সে, যেন কোনো বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একজোড়া রক্তবর্ণ চোখ নিয়ে তিথির দিকে তাকালো। রাস্তায় রোদের তীব্রতায় আয়ানের মাথার পেছন থেকে আসায় তার ছায়াটা দীর্ঘ হয়ে তিথির ওপর এসে পড়েছে, যা পরিবেশটাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।আয়ান পাথরের মতো কঠিন গলায় বলল।
“মাফ? তিথি, তুই কি জানিস না আয়ান খানের রাজ্যে ভুলের কোনো ক্ষমা নেই? আর সেখানে আসামী যখন আমার নিজের বউ, তখন ক্ষমার প্রশ্ন তো দূরে থাক সহানুভূতির ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট থাকে না।”
কথাটা বলেই আয়ান এক পা এগিয়ে তিথির একদম কাছে ঝুঁকে এল। তারপর শীতল কণ্ঠে হুকুম দিল।
“ওঠ রাস্তা থেকে! এই নোংরামির মধ্যে বসে নাটক করে আমার রাগ আর বাড়াস না।”
আয়ান কথাটা শেষ করেই এক ঝটকায় তিথির হাতটা ধরে দাঁতে দাঁত চেপে টেনে ওকে দাঁড় করিয়ে দিল। রাস্তার ধুলোমাখা অবস্থায় তিথি টাল সামলাতে সামলাতে কোনোমতে ওর ওড়নাটা টেনে ঠিক করল। ভয়ে তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, তবুও সে শেষবারের মতো মিনতি করে বলল।
“আ-আয়ান, প্লিজ এবারের মতো মাফ করো। আমি জাস্ট একটু ঘুরতে এসেছিলাম, এর বেশি কিছু না।”
কিন্তু আয়ান যেন কিছুই শুনল না। সে আরও কঠোর হয়ে তিথির হাতটা এমনভাবে মুচকে ধরল যে তিথি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল। আয়ান তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বলল।
“ঘুরতে এসেছিস বুঝলাম, কিন্তু আমার কাছ থেকে পারমিশন নিয়েছিস?।”
এতক্ষণ ভয়ে কুঁকড়ে থাকলেও ব্যথার চোটে তিথির ভেতর থেকে জেদটা বেরিয়ে এল। সে রেগে গিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল।
“আহহ আয়ান ভাই, ছাড়ো! ব্যথা লাগছে। আর কী বললে তুমি? তোমার কাছ থেকে অনুমতি নেব কেন? আমি তো আগেও কতবার বাসা থেকে বেরিয়েছি, একা ঘুরেছি। তখন তো কাউকে বলতে হয়নি, তাহলে আজ কেন তোমাকে বলে আসতে হবে?”
তিথির মুখে মুখে কথা বলাটা যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢেলে দিল। আয়ান মুহূর্তের মধ্যে এক ঝটকায় তিথিকে রাস্তার পাশের একটা পিলারের সাথে চেপে ধরল এবং নিজের কনুই দিয়ে তিথির গলায় হালকা চাপ দিয়ে তার কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে এল। আয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস তিথির কানে লাগছে, সে শান্ত কিন্তু বিষাক্ত গলায় ফিসফিস করে বলল।
“তখন তুই শুধু তিথি ছিলি, কিন্তু এখন তুই মিসেস তিথি আয়ানের ওয়াইফ! তাই এখন থেকে তোর প্রতিটা নিঃশ্বাস ফেলার আগেও আমার পারমিশন নিতে হবে। তুই একটা বার আমাকে বলে দেখতি, আমি তোকে যেতে দিতাম কি না! কিন্তু তা না করে তুই আমাকে পাত্তাই দিলি না? নিজের সাহস দেখিয়ে একা চলে এলি? এর জন্য তোকে এখন এমন শাস্তি দেব যা তুই সারা জীবন মনে রাখবি।”
কথাটা বলেই আয়ান আবার তিথির চোখের দিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসি হেসে পুনরায় বলল।
“তোর শাস্তিটা কী জানিস? এই যে সামনে রাস্তার মাঝখানটা দেখছিস? ওখানে গিয়ে সবার সামনে দাঁড়িয়ে দুই কান ধরবি আর এক পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবি। তারপর চিৎকার করে বলবি আমি অপরাধী! আমি আমার স্বামীর অবাধ্য হয়েছি, তাই এখন শাস্তি পাচ্ছি আর শিক্ষাও পাচ্ছি। আমি মিসেস তিথি খান কথা দিচ্ছি, আর কখনো এমন ভুল করব না এবং সবসময় আমার স্বামীর কথামতো চলব।”
আয়ানের মুখে এমন চরম উদ্ধত কথা শুনে তিথির চোখ দুটো বিস্ময় আর অপমানে ছানাবড়া হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল।
“অসম্ভব! আমি কক্ষনো পারব না।”
আয়ান এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে তিথিকে আরও শক্ত করে পিলারের সাথে চেপে ধরল। তার চোখের মণি দুটো যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। সে তিথির গলার কাছে নিজের মুখটা আরও নামিয়ে এনে ফিসফিস করে হাড়হিম করা হুমকি দিল।
“সোজা কথায় কান ধরে দাঁড়াবি? নাকি আমি ঠিক এই মুহূর্তেই সবার সামনে তোর ওই নরম ঠোঁটগুলো নিজের দখলে নিয়ে কমলার রস খাওয়ার মতো তৃপ্তি করে খেতে শুরু করব?।”
তিথি রাগে, লজ্জায় আর অপমানে সিঁটিয়ে গেল। আয়ানের এমন বেহায়াপনা কথা শুনে তার গা রি রি করে উঠল। লোকটার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। তিথি দাঁতে দাঁত চেপে আক্রোশের সুরে বলে উঠল।
“অসভ্য লোক একটা! সারারাত তো আমায় জ্বালিয়ে মারো, দিনেও কি একটু শান্তি দেবে না? তোমার মাথার সব চুল পড়ে যেন টাক হয়ে যায়! তোমার সব চুল উঠে তুমি টাকলা হয়ে যাবে দেখবে এইটা আমার মতো এক অসহায় তিথির অভিশাপ।”
আয়ান দমে যাওয়ার পাত্র তো নয়ই, উল্টো তার কথায় পৈশাচিক আনন্দ পেয়ে অট্টহাসি হেসে উঠল। যেন তিথির এই অভিশাপ তার কানে কোনো প্রেমের কবিতার মতো শোনাল। আয়ান হাসতে হাসতেই জবাব দিল।
“আরে, তাহলে তো তোরই ভালো! মানুষ দেখলেই বলবে তিথি, তোর স্বামী তো টাকলা! সবাই যখন এসব বলে তোকে খ্যাপাবে, তখন তুই রাগে লুচির মতো ফুলবি। আর সেই ফোলা লুচি ছিঁড়ে ছিঁড়ে আমি আয়েশ করে সবজি-ডাল দিয়ে খাব।”
কথাটা শেষ করেই আয়ানের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।সে চোয়াল শক্ত করে ঘড়ির দিকে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীর গলায় চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিল।
“দেখ তিথি, আমার হাতে একদম সময় নেই, খুব তাড়া আছে। তুই কি এখন ওই রাস্তার মাঝখানে গিয়ে নিজের শাস্তি পালন করবি? নাকি আমি ঠিক এই প্রকাশ্য রাস্তাতেই আমার কাজ শুরু করে দেব?।”
তিথি বুঝতে পারল এই আয়ান লোকটা আসলে চরম নির্লজ্জ, সে যা বলে তা সত্যি সত্যিই করে ফেলে। তাই আর কোনো উপায় না দেখে তিথি এবার অত্যন্ত অসহায় গলায় বলল।
“ছাড়ো, আমি দাঁড়াচ্ছি।”
আয়ান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল।
“গুড।”
বলেই আয়ান তাকে ছেড়ে দিল। তিথি মুখ গোমড়া করে রাস্তার ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। আয়ান তাকে যেভাবে যেভাবে বলতে বলেছিল, সেভাবেই দুই কান ধরে এক পা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সব কথা বলতে শুরু করল। আয়ান রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে হাত ভাঁজ করে হাসতে হাসতে এই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগল। রাস্তার পথচারীরা যাওয়ার সময় আড়চোখে তিথির দিকে তাকাচ্ছে আর একে অপরকে কী যেন বলছে। অপমানে আর লজ্জায় তিথি এবার নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
[শিকদার বাড়ি রাত ৯:০০ টা]
সৃজনী তার রুমের বিছানায় শুয়ে মনের সুখে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তার হাতে ধরা ফোনটিতে সেই ছবিগুলো খোলা,যেগুলো তার বান্ধবী রৌদ্রের সাথে তুলেছিল। একেকটি ছবি দেখছে আর লজ্জায় বালিশে মুখ ঢাকছে। সৃজনী ফোনের ছবির দিকে তাকিয়ে আনমনে বলে উঠল।
“ইস! আপনি আগে কোথায় ছিলেন? আমার জীবনে আসতে আপনার এত দেরি হলো কেন? যাই হোক, দেরি করে এসেছেন তো কী হয়েছে, এখন যখন এসেছেন তখন এই সময়টাকেই আমি সারাজীবনের জন্য ধরে রাখতে চাই।”
বলেই সৃজনী খিলখিল করে হাসতে লাগল। তার মনের গহীনে প্রেমের হাওয়া লেগেছে। আসলে প্রেমের হাওয়া বললে ভুল হবে,সে রৌদ্রের প্রেমে একদম হাবুডুবু খাচ্ছে। হঠাৎ সৃজনীর মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে রৌদ্রের সাথে তোলা ছবিগুলো নিয়ে তার ফেসবুক পেইজে গেল। তবে রৌদ্রের মুখের ওপর আপাতত একটি ইমোজি বসিয়ে দিল, যাতে হুট করে রৌদ্রের সামনে এই পোস্ট পড়লে সে নিজেকে চিনতে না পারে। কারণ রৌদ্রের অনুমতি ছাড়া তার ছবি দিলে যদি সে রাগ করে বা মাইন্ড করে, এই ভয়ে সৃজনী মুখটা ঢেকে দিল।সব ঠিকঠাক করে সৃজনী ছবিটা পোস্ট করল আর ক্যাপশনে লিখল।
~ একাকিনী জীবনে আপনিই সেই পুরুষ, যে আমার একাকিত্বকে সরিয়ে দিয়ে আমার মনে প্রেম সমুদ্রের ভালোবাসায় তলিয়ে দিয়েছেন~
[রাত ১১:০০ টা, খান বাড়ি]
ব্যালকনির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে তুরা। তার দৃষ্টি গেটের দিকে একদম স্থির হয়ে আছে। রৌদ্র এখনো আসেনি। সময় যত বাড়ছে, তুরার মনের ভেতর জমে থাকা অভিমানটাও যেন তত ভারী হচ্ছে। আজ রৌদ্রের ওপর তার ভীষণ রাগ হয়েছে। অভিমানে সে ফোনটা কেটে দিয়েছিল, অথচ লোকটা একবারের জন্যও কল ব্যাক করেনি! তুরার মনে হচ্ছে, রৌদ্রের জন্য তার এই গভীর ভালোবাসা যেন তার বুক চিরে গলে গলে পড়ছে। অনেক বেশি খারাপ লাগছে তার, না চাইতেও দুচোখ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ছে। প্রিয় মানুষ যখন মনের অবস্থা বোঝে না, তখন সেই নিঃশব্দ কষ্টটা সহ্য করা বড় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দে তুরা চমকে উঠল। তাকিয়ে দেখল রৌদ্রের গাড়িটা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। ওকে দেখেও তুরা অভিমানে চোখ ফিরিয়ে নিল। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, আজ কিছুতেই রৌদ্রের সাথে আগে থেকে কথা বলবে না।
রৌদ্র দ্রুত বাড়ির ভেতর ঢুকল। তার মুখভঙ্গি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সে কতটা ক্লান্ত আর কতটা চাপের মধ্য দিয়ে গেছে আজ। রুমে ঢুকে তুরাকে দেখতে না পেয়ে সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে মেয়েটা ব্যালকনিতেই আছে। রৌদ্রের সারা শরীর অবসাদে ভেঙে আসছে, মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে ব্যালকনিতে গিয়ে তুরাকে ডাকার মতো শক্তিটুকুও পাচ্ছিল না। তাই সে আগে শরীরটা একটু ঠিক করার সিদ্ধান্ত নিল। ঘড়ি আর শার্টটা আলগোছে খুলে বিছানায় রেখে তোয়ালে নিয়ে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। এই মুহূর্তে একটা ঠান্ডা পানির গোসল না করলে তার শরীর আর মাথার এই প্রচণ্ড অস্বস্তি কিছুতেই যাবে না।
তুরা এখনো ব্যালকনিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সময় যেন কাটছেই না। সে মনে মনে ভাবছে, রৌদ্র তো অনেকক্ষণ আগেই বাড়ির ভেতরে ঢুকেছে, তাহলে এখনো সে ব্যালকনিতে তার কাছে কেন এল না? বিরক্তি আর অভিমানে তুরার বুক ফেটে যাচ্ছে। শেষমেশ কৌতূহল আর জেদ সামলাতে না পেরে সে অনেকটা বিড়ালের মতো চুপি চুপি পা ফেলে রুমে ঢুকল।
রুমে ঢুকে তুরা দেখল ঘরটা একদম ফাঁকা। বিছানার ওপর রৌদ্রের শার্ট, দামি ঘড়ি আর টাইটা অগোছালোভাবে পড়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। তুরা চোখ তুলে তাকাতেই দেখল রৌদ্র বেরিয়ে আসছে, পরনে তার শুধু একটা সাদা তোয়ালে জড়ানো। হঠাৎ এমন অবস্থায় রৌদ্রকে দেখে তুরা থতমত খেয়ে গেল। ক্ষণিকের জন্য দুজনের চোখাচোখি হলেও তুরা দ্রুত নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। প্রচণ্ড অভিমানে মুখটা কুঁচকে সে কোনো কথা না বলে আবার গটগট করে হেঁটে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল।
এবার তুরার মনটা আগের চেয়েও বেশি বিষিয়ে উঠল। সে ভাবল, “লোকটার কি নূন্যতম কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? বাড়ি ফিরে আগে একবার এসে দেখা করবে, তা না করে সোজা গোসলে চলে গেল! একটু কথা বলার প্রয়োজনও বোধ করল না?” তুরা ঠিক করে নিল আজ রৌদ্রের সাথে কথাই বলবে না।
রৌদ্র তোয়ালে দিয়ে নিজের ভেজা চুলগুলো মুছতে মুছতে আড়চোখে দেখল তার পাগলি বউটা ব্যালকনিতে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ভালো করেই জানে, তুরা কতটা অভিমানী। রৌদ্র আর দেরি করল না; দ্রুত একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে সোজা ব্যালকনিতে গিয়ে হাজির হলো। তুরা তখনো বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নিজের কষ্টের সাথে লড়াই করছে। রৌদ্র নিঃশব্দে পেছন থেকে গিয়ে তুরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তুরা বুঝতে পারল রৌদ্র ওকে ধরেছে, কিন্তু তার মনটা আজ পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে। সে নড়ল না, কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাল না। রৌদ্র তুরার গালটা আলতো করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে টুস করে একটা পাপ্পি খেল, তারপর ওর কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“আমার পাগলি বউটা কি অনেক অভিমান করে আছে? শোনো না আমার সোনা বউ, আসলে আজকের মিটিংয়ের চাপটা অসহ্য ছিল। ডিলটা অনেক বড় ছিল তো, তাই আমাকে একাই সবকিছু সামলাতে হয়েছে। বিশ্বাস করো, এক মুহূর্তের জন্যও ফোনটা হাতে নেওয়ার সুযোগ পাইনি। আর শরীরটাও এত বেশি খারাপ লাগছিল যে আগে একটু গোসল করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম যাতে তোমার কাছে এলে মাথাটা শান্ত থাকে। এবার রাগটা ছাড়ো না সোনা।”
তুরা তবুও কোনো উত্তর দিল না। সে এখনো একদম কাঠের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, যেন রৌদ্রের এই আদুরে কথাগুলো তাকে একটুও স্পর্শ করছে না। রৌদ্র এবার হার মানার পাত্র নয়। সে তুরার ঘাড়ে নিজের মুখটা গুঁজল, যেন তার উষ্ণ নিঃশ্বাসে তুরার অভিমান গলে যায়। করুণ সুরে সে আবার বলল।
“ওই বউ, কথা বলো না কেন? আচ্ছা বাবা সরি! এবার অন্তত মাফ করে দাও, এমন ভুল আর হবে না। এরপর থেকে হাজার ব্যস্ত থাকলেও আমি তোমাকে কল করব। আর শরীর যতই খারাপ থাকুক, আগে এসে তোমার অভিমান ভাঙাবো। এবার অন্তত মুখটা খোল? কথা বললে কি তোমার খুব কষ্ট হবে?”
কিন্তু তুরা তবুও কথা বলল না তার অভিমান যেন পাহাড় সমান। রৌদ্র বুঝল এইভাবে কাজ হবে না, সে মুহূর্তে তুরাকে ছেড়ে দিয়ে নিজের কানে ধরে ওঠবস করতে শুরু করল। একদম বাচ্চাদের মতো মুখ করে বলতে লাগল।
“সরি বউ! এবারের মতো মাফ করো, একটু কথা বলো। এই দেখো কানে ধরছি, আর এমন হবে না বলছি তো। সারা দিন কাজের চাপে থাকার পর তোমার সাথে কথা না বললে আমার খুব খারাপ লাগে। দেখো শরীরটা অনেক দুর্বল, ক্ষুধায় পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়াচ্ছে! একটু দয়া করো তোমার এই অসহায় স্বামীর ওপর, প্লিজ।”
টানা পঞ্চাশবার ওঠবস করার পর তুরার মন যেন গলে গেল। সে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।
“নেকা নাটক করতে হবে না, সোজা হয়ে দাঁড়ান।”
তুরা কথা বলেছে দেখে রৌদ্র খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল। সে তুরাকে জড়িয়ে ধরে গালে পাগলের মতো অন্তত দশটা চুমু খেয়ে বলল।
“এই তো বউ কথা বলেছে! আমি জানতাম আমি অভিমান ভাঙানোর মিশনে সফল হবই।”
তুরা মুখ ভেংচি কেটে বলল।
“কচু আপনি! নিচে চলেন এবার।”
রৌদ্র আর তুরা দুজনেই নিচে নেমে এল। বাড়ির সবাই ততক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। ডাইনিং টেবিলে আগে থেকেই খাবার বেড়ে ঢাকা রাখা ছিল। তুরা আর রৌদ্র খেতে বসল। তুরা কোনো কথা না বলে নিজের মতো খেতে শুরু করল, কিন্তু রৌদ্র চুপচাপ বসে আছে, খাচ্ছে না। তুরা খেয়াল করে বলল।
“কী হলো, খাচ্ছেন না কেন?”
রৌদ্র আবদার সুরে বলল।
“খাইয়ে দাও না!”
তুরা সাথে সাথে উত্তর দিল।
“পারব না! নিজে খেতে পারলে খান, নয়তো না খেয়ে বসে থাকেন। কত বড় মানুষ, আমাকে বলে খাইয়ে দিতে! বাচ্চা নাকি?”
রৌদ্র এবার একদম ঠোঁটকাটা জবাব দিল।
“বাচ্চা না বউ, বাচ্চার বাবা হব! যাই হোক, খাইয়ে দিবা নাকি আমিই খেয়ে নেব?”
তুরা রৌদ্রের গূঢ় কথার মানে না বুঝেই বিরক্তির সুরে বলল।
“খান, না করছে কে?”
কথাটা বলেই তুরা তার নিজের জন্য মাখানো লোকমা ভাত মুখে নিতে যাবে, ঠিক তখনই রৌদ্র ছোঁ মেরে তুরার সেই হাতটা নিজের মুখে পুরে নিল এবং ভাতগুলো নিয়ে তৃপ্তি করে চিবুতে লাগল। তুরা চোখ রাঙিয়ে বলল।
“কী হলো এইটা? আমার হাত থেকে ভাত কেড়ে নিলেন কেন?”
রৌদ্র ভাতটুকু গিলে নিয়ে মুচকি হেসে বলল।
“বউ যখন শখ করে খাইয়ে দিচ্ছে না, তখন এভাবেই কেড়ে খেতে হয়। আহ্! তোমার হাতের ছোঁয়া লেগে ভাতটা যেন অমৃত হয়ে গেছে।”
তুরা মুখ ঝামটা দিয়ে বলল।
“আপনার কি নিজের থালায় ভাতের আকাল পড়েছে? অসভ্যতা করবেন না তো!”
রৌদ্র এবার চেয়ারটা তুরার আরও কাছে টেনে নিয়ে বসল। তুরার বাম হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে বলল।
“নিজের থালার ভাতের চেয়ে তোমার লোকমার স্বাদ অনেক বেশি। এখন কি ভালোয় ভালোয় নিজ হাতে খাইয়ে দিবে, নাকি আমি বারবার তোমার মুখ থেকে কেড়ে খাব? সিদ্ধান্ত তোমার।”
তুরা কয়েক মুহূর্ত রৌদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই জেদি লোকটার সাথে পারা অসম্ভব সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারবে তাকে। তুরা আবার এক লোকমা ভাত মেখে রৌদ্রের মুখের সামনে ধরল।
“এই নিন,হা করেন।”
রৌদ্র হা করে খাবারটা মুখে নিয়ে চিবুতে চিবুতে বলল।
“আহ! মনে হচ্ছে অমৃত খাচ্ছি। এত স্বাদ কেন বুঝতে পারছি না। রান্নায় জাদু আছে নাকি বউয়ের হাতে খাচ্ছি বলে স্বাদ লাগছে? ওহ্, অবশ্য বউয়ের হাতে খাচ্ছি বলেই এত স্বাদ লাগছে।”
তুরা রৌদ্রকে খাইয়ে দিতে দিতে বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল।
“এত কথা কেন বলেন আপনি?”
রৌদ্র বেহায়ার মতো উত্তর দিল।
“তোমার সমস্যা হলে কানে তুলো দিয়ে রাখো।”
তুরা আর কোনো কথা বলল না। সে জানেই যত কথা বাড়াবে, এই লোকটা ততই আরও বেশি করবে। তুরা চুপচাপ নিজেও খেতে লাগল আর রৌদ্রকেও খাইয়ে দিতে থাকল। ডাইনিং রুমের নিস্তব্ধতায় শুধু তাদের চিবানোর শব্দ আর রৌদ্রের তৃপ্তির হাসি শোনা যাচ্ছিল।
খাওয়া শেষে দুজনেই রুমে আসল। তুরা ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এল। রুমে ফিরে দেখে রৌদ্র এরই মধ্যে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। সারাদিনের ক্লান্তি যেন ওর চোখেমুখে লেগে আছে। তুরা গিয়ে ওর পাশে চুপচাপ শুতেই রৌদ্র এক হাত দিয়ে তুরাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে জড়িয়ে ধরল। রৌদ্রের সেই উষ্ণ আলিঙ্গনে তুরার সব অভিমান মুহূর্তেই ধুয়ে মুছে গেল।রৌদ্র শান্তিতে চোখ বন্ধ করল। তুরাও রৌদ্রের প্রশস্ত বুকে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে চোখ বন্ধ করল। এই বুকটাই যেন তার পৃথিবীর সবথেকে নিরাপদ আর সুখের জায়গা। সারাদিনের ঝগড়া, অভিমান আর রাগ সবই যেন এই একটি আলিঙ্গনে বিলীন হয়ে গেল।
রানিং…!
রীচেক দিতে পারেনি ঠান্ডার কারনে, কেও কিছু মনে করিও না গল্পে বানান ভুল হলে আসলে এমন ঠান্ডা লাগছে নাক চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ফোনের দিকেও বেশি খন তাকিয়ে থাকতে পারছি না৷ আবার গলাটাও অনেক ব্যথা করছে তবুও তোমাদের কথা ভেবে দিলাম প্লিজ খারাপ হলে কেউ কিছু মনে করিও না জানোই তো ঠান্ডা গলা ব্যথা বারলে কেমন লাগে😔
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭