নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৬২ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
[পরের দিন সকাল ১০:০০ টা]
সূর্য বেশ তেতে উঠেছে। রৌদ্র স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হাতে নিজের পরিচিত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। গন্তব্য চট্টগ্রাম, সেখানে এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। অফিসের কাজে আজ আয়ান আছে, তাই রৌদ্রকে একাই বের হতে হয়েছে। ব্যস্ত রাস্তার একপাশে হঠাৎ তার নজর স্থির হলো। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে সৃজনী।
রৌদ্রের মাথায় চট করে একটা চিন্তা খেলে গেল। সেদিন সৃজনী যদি নেহালের কথা না বলত, তবে রৌদ্রের আদরের বোন আজ বেঁচে থাকত কি না সন্দেহ! কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মোক্ষম সুযোগ এটাই। রৌদ্র চট করে ব্রেক কষল। টায়ার আর পিচের ঘর্ষণে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে গাড়িটা ঠিক সৃজনীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
সৃজনী তার দুই বান্ধবীর সাথে গল্প করতে করতে ভার্সিটি যাচ্ছিল। হঠাৎ সামনে এই রাজকীয় গাড়ি আর ভেতরে রৌদ্রকে দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল। রৌদ্র গাড়ি থেকে নেমে ধীরপায়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঠোঁটের কোণে হালকা কিন্তু মার্জিত এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল।
“হাই বোন! আসলে সেদিনের পর তোমার সাথে আর ওভাবে কথাই হয়নি। তুমি যা করেছো, তার জন্য ‘ধন্যবাদ’ শব্দটা বড্ড ছোট। তবুও শুধু এইটুকুই বলবো তোমার মতো মেয়েরা যেন প্রতিটি মায়ের গর্ভে জন্ম নেয়। তুমি সত্যিই অনন্য।”
সৃজনী মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। রৌদ্রের মতো গম্ভীর মানুষের মুখে এমন প্রশংসা! সে সামলে নিয়ে বাঁকা এক চিলতে হেসে পাল্টা জবাব দিল।
“শুধু এটুকুই বললেন? এত বড় একটা উপকার করলাম, কোনো পাওনা দিবেন না?।”
সৃজনীর বান্ধবীরা তখন হাঁ হয়ে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। দামী ঘড়ি, ফিটেড শার্ট আর সুঠাম দেহের এই মানুষটার পার্সোনালিটি যেন চারপাশটা ছাপিয়ে যাচ্ছে। এক বান্ধবী সৃজনীর কানে কানে ফিসফিস করে বলল।
“কিরে! কে এই হট হিরো? পুরাই তো ফিদা হয়ে গেলাম! নতুন বয়ফ্রেন্ড নাকি? আমাদের তো বললি না।”
সৃজনী কটমট করে তাকাতেই বান্ধবী চুপ হয়ে গেল। রৌদ্র সৃজনীর আবদার শুনে একটু গম্ভীর হয়েই বলল।
“হ্যাঁ, অবশ্যই। বলো কী চাই তোমার? আমার সাধ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই দেব।”
সৃজনী এবার রৌদ্রের দামী গাড়িটার দিকে একবার তাকাল, তারপর একটু আড়চোখে রৌদ্রকে দেখে নিয়ে বলল।
“আপাতত তেমন কিছু চাই না। সময় হলে চেয়ে নেব। তবে এখন একটা সাহায্য করতে পারেন। আপনি তো এই রাস্তা দিয়েই যাচ্ছেন, আমাদের ভার্সিটিটা একটু সামনেই। ড্রপ করে দিলে খুব উপকার হতো।”
রৌদ্র কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সময়টা মেপে নিল। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল।
“অবশ্যই, এসো বোন। গাড়িতে ওঠো।”
সৃজনীর যেন খুশিতে আত্মহারা হওয়ার দশা! সে তড়িঘড়ি করে সামনের ডোর খুলে ড্রাইভিং সিটের ঠিক পাশের সিটটা দখল করে নিল। বান্ধবীরা হুড়মুড় করে পেছনে বসল। রৌদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গাড়ি স্টার্ট দিল। এসি-র ঠান্ডা বাতাসে একটা দামী পারফিউমের ঘ্রাণ মিশে আছে।
কিছুদূর যেতেই ছন্দপতন ঘটল। রাস্তার এক পাশের গর্ত এড়াতে গিয়ে রৌদ্রকে হঠাৎ হার্ড ব্রেক কষতে হলো। সৃজনী সিটবেল্ট পরা থাকলেও ঝোঁকটা সামলাতে পারল না, সরাসরি গিয়ে আছড়ে পড়ল রৌদ্রের সুঠাম বুকের ওপর। মুহূর্তের জন্য দুজনের নিঃশ্বাস যেন এক হয়ে গেল এমন পরিস্থিতি।
পেছন থেকে বান্ধবীরা এই সুযোগ হাতছাড়া করল না। দুষ্টুমি মেশানো হাসি দিয়ে টপাটপ কয়েকটা ছবি তুলে নিল মোবাইলে। রৌদ্র তড়িৎগতিতে সৃজনীকে সরিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে বসল। তার গম্ভীর কণ্ঠে অদ্ভুত এক কাঠিন্য।
“ঠিক আছো তুমি?”
সৃজনী লজ্জিত হয়ে চুলগুলো ঠিক করতে করতে মাথা নাড়াল।
“হ্যাঁ আমি ঠিক আছি।”
রৌদ্র আর একটি শব্দও খরচ করল না। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। বাইরের রোদের চেয়েও গাড়ির ভেতরের এই নীরবতা যেন সৃজনীর কাছে বেশি তপ্ত মনে হতে লাগল।
রৌদ্রের গাড়িটা সৃজনীর ভার্সিটির ঠিক সামনে এসে একটা তীব্র ঝটকায় থামল। সৃজনী আর তার বান্ধবীরা গাড়ি থেকে নেমে একটু গুছিয়ে নিয়ে রৌদ্রকে ধন্যবাদ দিতে যাবে, তার আগেই কোনো কথা না বলে রৌদ্র হাওয়ার গতিতে ধুলো উড়িয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। সৃজনী হতবাক হয়ে সেই ধাবমান ধুলিকণার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“যাহ বাবা! একটা ফর্মাল ধন্যবাদ পর্যন্ত দেওয়ার সুযোগ দিল না লোকটা।”
পর মুহূর্তেই সৃজনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। তার বান্ধবী বৃষ্টি সৃজনীর কাঁধে হালকা ধাক্কা দিয়ে কৌতূহলী গলায় বলল।
“কিরে, কোথায় হারালি? ওই হিরো চলে যাওয়ার রাস্তার দিকে তাকিয়ে এমন নির্লজ্জের মতো হাসছিস কেন? ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, তাই না?।”
সৃজনী যেন নিজের ভেতরেই হারিয়ে গেছে। আনমনে হাসতে হাসতেই জবাব দিল।
“আছে অনেক কিছু আছে।”
কথাটা শোনামাত্র তার দুই বান্ধবী বৃষ্টি আর আনিকা একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর সমস্বরে চিৎকার করে উঠল।
“এ্যাঁ! তার মানে আমরা যা ভাবছি, ঘটনা কি আসলেই তাই?।”
বান্ধবীদের চিৎকারে সৃজনীর ঘোর কাটল। সে কী বলে ফেলেছে বুঝতে পেরে লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল, কিন্তু মুখে একটু মেকি রাগ দেখিয়ে বলল।
“উফ তোরা সবসময় বেশি ভাবিস। কিছুই না তো।”
কিন্তু বৃষ্টি আর আনিকা ছাড়ার পাত্র নয়। তারা চিমটি কেটে বলে উঠল।
“লুকিয়ে লাভ নেই। আমাদের সৃজনী একদম নাকানিচুবানি খেয়ে প্রেমে পড়েছে।”
সৃজনী আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এদের সাথে সব কথা শেয়ার করে সে অভ্যস্ত, তাই আড়াল না করে সোজাসুজি বলেই ফেলল।
“হ্যাঁ, পড়েছি। আর জানিস উনি কে?।”
আনিকা আর বৃষ্টি উৎসুক হয়ে মাথা নাড়ল না, তারা জানে না। সৃজনী ধীরপায়ে ভার্সিটির গেটের দিকে হাঁটতে হাঁটতে গম্ভীর ভঙ্গিতে ঘোষণা করল।
“উনি হচ্ছেন আমার হবু ভাবির চাচাতো ভাই। খান বাড়ির বড় ছেলে।”
খবরটা শুনে বৃষ্টি আর আনিকার খুশি দেখে কে! তারা প্রায় নেচে উঠে বলল।
“আরে বাহ! এ তো একদম জমজমাট প্রেম হবে! রিলেশনশিপ তো অলরেডি সেট হয়েই আছে। যাই হোক, এবার দেখ আমি কী করেছি।”
বলেই বৃষ্টি পকেট থেকে ফোন বের করে সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ছবিগুলো দেখাল। রৌদ্রের চওড়া বুকে সৃজনী আছড়ে পড়ার দৃশ্যগুলো একদম নিখুঁতভাবে ফ্রেমবন্দি হয়েছে। ছবিগুলো দেখামাত্র সৃজনীর কান-মুখ লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে গেল। হৃৎস্পন্দন যেন আরও এক দফা বেড়ে গেল তার। তড়িঘড়ি করে ছবিগুলো নিজের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে নিল সে। তারপর তিন সখী একে অপরকে হাসাহাসি আর খুনসুটি করতে করতে ভার্সিটির বারান্দায় মিলিয়ে গেল।
[খান বাড়ি]
তিথি খুব পরিপাটি করে সাজগোজ করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। বান্ধবীদের সাথে অনেক আগে থেকেই আজকের আড্ডাটা ঠিক করা, কিন্তু বাড়িতে এখনো কাউকে জানানোর সুযোগ পায়নি। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখল তনুজা খান আর হিমি খান সোফায় বসে বেশ আড্ডায় মশগুল। তিথি বিড়ালের পায়ে গিয়ে পেছন থেকে দুই আম্মুর গলা জড়িয়ে ধরল।আর আদুরে গলায় বলল।
“এই যে আমার দুই সুন্দরী আম্মু, শোনো না! আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”
তনুজা খান ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন।
“বাইরে যাবি মানে? আয়ানকে বলেছিস? ওর অনুমতি নিয়েছিস?”
আয়ানের নাম শুনতেই তিথির মেজাজটা বিগড়ে গেল। সে গাল ফুলিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল।
“ওই কুত্তাকে বলে আমি বাইরে যাব? কক্ষনো না! তোমরা তাড়াতাড়ি আমাকে পারমিশন দাও তো।”
তনুজা খান এবার বেশ রেগে গেলেন। শাসন করার সুরে বললেন।
“আয়ানকে বলবি না মানে? তিথি, তুই কি ভুলে যাচ্ছিস যে আয়ান এখন তোর স্বামী? যেখানেই যাস না কেন, এখন থেকে আগে ওর অনুমতি নেওয়াটা তোর কর্তব্য।”
তিথি দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে তনুজা খানকে ছেড়ে এবার হিমি খানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী স্বরে বলল।
“আম্মু দেখো তোমার বউমাকে কী সব বলছে এই ‘বেডি’। আম্মু তো কিচ্ছু বোঝে না। তুমি তো খুব ভালো, প্লিজ একটু যেতে দাও না? কথা দিচ্ছি একদম তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। তোমার ওই রাক্ষস ছেলে টেরই পাবে না, কথা দিলাম।”
বউমার এমন কাণ্ড দেখে হিমি খান না হেসে পারলেন না। তিনি তিথির গালে একটা আদর দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন।
“আচ্ছা বাবা ঠিক আছে, যা। তবে সাবধানে থাকিস আর একদম দেরি করবি না। জানিস তো আমার ছেলেটা কত রাগী! একবার যদি জেনে যায় তুই না বলে বাইরে গিয়েছিস, তবে আস্ত কেলেঙ্কারি বাধিয়ে দেবে কিন্তু।”
তিথি একগাল হেসে হিমি খানের কপালে একটা চুমু খেয়ে ডানা কাটা পাখির মতো দরজার দিকে ছুটে গেল। তার মনে তখন জয়ের আনন্দ।
ব্যালকনিতে উদাস মনে দাঁড়িয়ে আছে তুরা। বিকেলের ম্লান আলোয় তার মনটা কেন জানি ভীষণ ছটফট করছে। কোনো কিছুতেই ঠিক মন বসাতে পারছে না সে। এই রৌদ্র লোকটা বাড়িতে যতক্ষণ থাকে, তুরাকে জ্বালিয়ে পিষ্ট করে মারে। কিন্তু যখন কাছে থাকে না, তখন তুরা যেন এক নিমেষে ভীষণ নীরব আর অসহায় হয়ে পড়ে। তুরা বুঝতে পারছে, রৌদ্রের সেই মিষ্টি জ্বালাতনগুলো এখন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই তো সে সামনে না থাকলে চারপাশটা বড্ড ফাঁকা আর বিষণ্ণ লাগে।
তুরা নিজের অবাধ্য মনকে আর দমিয়ে রাখতে পারল না। দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে রৌদ্রের নাম্বারে কল দিতে গিয়েও হাত কেঁপে উঠল। একবার কল লিস্টে আঙুল ছোঁয়ায়, আবার ভয়ে কেটে দেয়। এভাবে বেশ কয়েকবার যুদ্ধ করার পর অবশেষে সাহস করে কলটা দিয়েই ফেলল।
রৌদ্র তখন চট্টগ্রামের একদম কাছাকাছি। ড্রাইভ করতে করতে হঠাৎ ফোনের স্ক্রিনে ‘বউ’ নামটা দেখে তার ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল। ফোনটা রিসিভ করে ব্লুটুথের সাথে কানেক্ট করল সে। ওপাশ থেকে তুরা কোনো কথা বলছে না, এপাশ থেকে রৌদ্রও নিরব। শুধু একে অপরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। নিস্তব্ধতা ভেঙে বেশ কিছুক্ষণ পর তুরা খুব মৃদু গলায় বলল।
“কোথায় আপনি? পৌঁছেছেন কি?”
রৌদ্র দুষ্টুমিভরা হাসি নিয়ে জবাব দিল।
“কেন? আমাকে খুব মিস করছো?”
তুরা তড়িৎ উত্তর দিল।
“মোটেও না।”
রৌদ্র শ্বাস টেনে বলল।
“তাই?”
“হুম।”
“তাহলে আজ এত অসময়ে হুট করে কল দিয়ে ফেললে যে?”
তুরা এবার চুপ করে রইল। রৌদ্র খুব ভালো করেই জানে তার এই অবুঝ বউটির চুপ থাকার মানে কী।রৌদ্র হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল।
“উহম! বুঝেছি, আমার বউ আমাকে একদমই মিস করে না। আচ্ছা শোনো, আমি গন্তব্যে পৌঁছে গেছি, এখন রাখি। ফ্রি হলে পরে কল দেব।”
রৌদ্রের কথা শুনে তুরা অস্থির হয়ে দাঁত দিয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে জিজ্ঞেস করল।
“শুনুন না কখন ফিরবেন?”
রৌদ্র এবার হাসি থামাতে পারল না। কোনোমতে গম্ভীর হওয়ার ভান হয়ে দুষ্টুমি করে বলল।
“হয়তো আজ ফিরব না, কিংবা দুই তিন দিনও লেগে যেতে পারে।”
কথাটা শোনামাত্রই তুরার মনটা আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো হয়ে গেল। অভিমানে গলার স্বর ভারী হয়ে এলো তার। সে ঝটপট বলল।
“ঠিক আছে, আসার দরকার নেই। ওখানেই সারাজীবন থেকে যান। রাখি।”
বলেই তুরা ফোনের লাইনটা কেটে দিল। এদিকে রৌদ্র এবার শব্দ করে হেসে উঠল। তার পাগলী বউটা যে কি দারুণ অভিমান করেছ,তার বুঝতে বাকি রইল না৷ রৌদ্র মনে মনে ভাবল এই অভিমান আজ রাতে বাড়ি ফিরে আদর দিয়েই পুষিয়ে দেবে। সে আর পাল্টা কল না দিয়ে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল।
[দুপুর ২:০০ টা, চৌধুরী বাড়ি]
মিষ্টি রোদেলা দুপুর। আরশি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অনেক কষ্টে ব্যালকনির আরামকেদারা পর্যন্ত এসে বসেছে। শরীরের দুর্বলতা থাকলেও মনের ভেতর এক অজানা অস্থিরতা। ঠিক তখনই তার ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল। স্ক্রিনে শিহাব ভিড়িও কল দিয়েছে নামটা দেখেই আরশির ফ্যাকাশে ঠোঁটে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল।
ভিডিও কল রিসিভ করতেই ওপাশে শিহাবের ক্লান্ত কিন্তু দীপ্ত মুখটা ভেসে উঠল।শিহাব হয়তো কেবলই কাজ থেকে ফ্রী হয়ে কল দিয়েছে।আরশিকে ব্যালকনিতে একা দেখে শিহাবের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা শাসন করার সুরে বলল।
“এই যে মহারানী, তুমি এই টাইমে ব্যালকনিতে একা কী করছ? নার্স কোথায়? সে কি তোমায় এখানে রেখে গেছে?”
আরশি একটু অভিমানী হাসি দিয়ে বলল।
“নার্সকে আমি নিজেই পাঠিয়ে দিয়েছি। সারাক্ষণ চোখে চোখে রাখা একদম ভালো লাগে না। আমি একাই এসেছি।”
শিহাব এবার বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল।
“পাঠিয়ে দিয়েছো মানে? তুমি জানো না তোমার শরীর এখনো কতটা দুর্বল? যদি একবার পা পিছলে পড়ে যেতে, তবে কী হতো শুনি?”
আরশি শিহাবের চোখে চোখ রেখে খুব শান্ত গলায় বলল।
“নার্স পাঠিয়েছি কারণ আমার আসল নার্স তো আপনি। আর আমি এখন একা চলতে পারি, ধীরে ধীরে ঠিক হচ্ছি। আপনি কি এখনো আমাকে খুব বেশি অসুস্থ মনে করেন? শুনুন, আমি এখন যথেষ্ট সুস্থ। আর আমার যেটুকু অসুস্থতা বাকি আছে, সেটা আপনি পাশে থাকলেই সেরে যাবে। আমার কোনো নার্সের দরকার নেই।”
শিহাব আরশির কথার গভীরতা বুঝতে পেরে নিজের কপাল থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মুখে দুষ্টুমি মাখা হাসি ফুটিয়ে বলল।
“ও আচ্ছা! তার মানে আমার মহারানী পুরোপুরি সুস্থ, এটাই তো বলতে চাইছ?”
আরশি গর্বের সাথে বলল।
“হ্যাঁ!”
শিহাব এবার গলার স্বর নিচু করে, চোখে একরাশ নেশা আর দুষ্টুমি নিয়ে বলল।
“ঠিক আছে, তবে আজ রাতেই পরীক্ষা হবে তুমি কতটুকু সুস্থ হয়েছ।”
আরশি শিহাবের চোখের চাহনি দেখে মুহূর্তেই বুঝে গেল কথা কোন দিকে গড়াচ্ছে। সে লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“আপনি দিন দিন কেমন জানি ঠোঁটকাটা আর নির্লজ্জ হয়ে যাচ্ছেন!”
শিহাব এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর ছন্দের তালে তালে তার স্বভাবজাত সেই ‘বোল্ড’ ভঙ্গিতে বলল।
“আমাকে সভ্য থাকতে দিলে কই আর বউ?আগে সুস্থ হয়ে শরীরটা করো স্ট্রং,তারপর শুরু হবে আসল রঙ।প্রতি রাতে খাট ভেঙে হবে ঝাকানাকা খেলা,সহ্য করতে হবে তোমার এই পাগল স্বামীর বুনো আদরের মেলা।”
শিহাবের মুখে এমন খোলামেলা আর তপ্ত কথা শুনে আরশির কান-মুখ একদম আগুনের মতো লাল হয়ে গেল। লজ্জায় আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না সে। তড়িঘড়ি করে কলটা কেটে দিয়ে ফোনটা বুকের ওপর চেপে ধরল। তার হৃৎপিণ্ড তখন পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে আরশি লজ্জামাখা স্বরে বলল।
“অসভ্য একটা! যা মুখে আসে তাই বলে দেয়! লোকটা ভুলেই যায় যে আমি একটা মেয়ে, আমার তো লজ্জা লাগে।”
আয়ানের হঠাৎ একটা দরকারি কলের জন্য এয়ারপোর্টে যেতে হচ্ছে। সে বিরক্তি আর তাড়া নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ রাস্তার পাশে তার চোখ আটকে গেল। কিছু মেয়েদের সাথে গোলাপী চুড়িদারে একজন মেয়ে ফুচকা খাচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে আয়ান বোঝার চেষ্টা করল এটা কি তিথি?
সে দ্রুত গাড়িটা থামিয়ে কাঁচ নামিয়ে ভালো করে তাকাল। লম্বা চুল ছেড়ে, সুন্দর করে সেজেগুঁজে তিথি তার বান্ধবীদের সাথে রাস্তার পাশের ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে আর খিলখিল করে হাসছে। আর সেটাই আয়ানের মাথায় আগুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। সবথেকে বড় কথা, তিথি তাকে এক বারের জন্যও বলেনি যে সে বাইরে যাবে! এই ভাবনাগুলো আয়ানের রাগকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। এমনিতেই জরুরি কলের জন্য মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে ছিল, তার ওপর তিথি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল।
আয়ান রাগে গাড়ির স্টিয়ারিংটা চেপে ধরে তিথির দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকাল। দাঁতে দাঁত পিষে বিড়বিড় করে বলল।
“দাঁড়া, আজ তোকে তোর ফুচকা খাওয়াচ্ছি।”
বলেই আয়ান একটা লাথি মেরে গাড়ির ডপাট খুলে নেমে পড়ল। তিথি তখন ফুচকা মুখে তুলতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল সামনে। আয়ান! তার রক্তচক্ষু আর ফুলে ওঠা চোয়ালের রেখা দেখে তিথির হার্টবিট যেন বন্ধ হয়ে গেল। আয়ান তার দিকেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এগিয়ে আসছে। তিথির হাত থেকে ফুচকার প্লেটটা মাটিতে পড়ে গেল।
আয়ান কোনো রকম কালক্ষেপণ না করে মুহূর্তেই পা থেকে জুতো খুলে হাতে নিল। জুতোর বাড়ি উঁচিয়ে সে যখন তিথির দিকে এগোতে লাগল, তিথি ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া। সে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেই উল্টো দিকে দৌড় দিল।পেছন পেছন আয়ানও দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে বলল।
“এই! কোথায় যাস? দাঁড়া বলছি! তোর সাহসটা কত বড় হয়েছে, আজ আমি ফিতা দিয়ে মেপে দেখব! দাঁড়া কুত্তি, নয়তো কিন্তু খারাপ হয়ে যাবে।”
তিথি এক মুহূর্তের জন্যও পেছনে তাকাল না। সে প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করে বলল।
“হায় আল্লাহ! এই রাক্ষস সাইকো জানলো কিভাবে আমি এখানে? আজ তো নির্ঘাত আমার ইন্নালিল্লাহ! তিথি, তোর শেষ ইচ্ছা পূরণ করার আগেই এই লোক তোকে কবরে পাঠিয়ে দিবে।”
আয়ান যখন খুব কাছে চলে এসেছে তিথি তখন অসহায়ে বলতে লাগল।
“বাঁচাও! কেউ এই রাক্ষসটাকে ধরো! ওরে কেউ জ্যান্ত মানুষটাকে খাঁচায় ভরো! ও মা গো, আজ আমার হাড়গোড় সব ফিতা দিয়ে মেপে খিচুড়ি বানিয়ে ফেলবে।”
আয়ান পেছন থেকে আবারো বাঘের মতো হুঙ্কার ছাড়ছে।
“তিথি দাঁড়া বলছি! আমার পারমিশন ছাড়া রাস্তায় এসে দাঁত বের করে ফুচকা খাওয়া বের করছি তোর! আজ তোকে মেরেই আমি জেলে যাব, তাও শান্তি।”
তিথি সামনের দিকে দৌড়াতে দৌড়াতে গলা ফাটিয়ে উত্তর দিল।
“আমি কি তোমার কেনা গোলাম নাকি? আর মরা মানুষের কি জেলের ভয় থাকে? মরার আগে অন্তত এক প্লেট ফুচকাও তো শান্তিতে খেতে দিলে না! অসভ্য, ইতর, জলহস্তী একটা।”
আয়ান রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চিতার মতো গতি বাড়িয়ে দিল।
“তুই আমাকে জলহস্তী বললি? দাঁড়া, আজ তোর ওই মুখ ফিতা দিয়ে সেলাই না করলে আমার নাম আয়ান না।”
রাস্তার মানুষজন অবাক হয়ে দেখছে পিছনে এক সুঠামদেহী হ্যান্ডসাম যুবক জুতো হাতে নিয়ে “দাঁড়া” “দাঁড়া” করে ছুটছে, আর সামনে এক সুন্দরী মেয়ে জানপ্রাণ দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আল্লাহ বিল্লা করছে।
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৮