নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৬৯ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
আরফা আর নেহালকে গাড়িতে তুলে একে একে সবাই গাড়িতে উঠে পড়ল। তিথিও বুকের ভেতর একরাশ পাথর চেপে ধরে ধীরপায়ে গাড়িতে গিয়ে বসল। আয়ান রৌদ্রকে আগেই মেসেজ করে জানিয়ে দিয়েছে যে সে বেরিয়ে গেছে, তাই বাড়ির বড়রা আর বাড়তি কোনো চিন্তা করলেন না।
এদিকে রৌদ্রের অবস্থা পাগলের মতো। সারাদিন সে চেষ্টা করেও তুরার নাগাল পায়নি। তনুজা খান আর রৌশনি খানের পাশে তুরা এমনভাবে সেঁটে ছিল যে রৌদ্র ডাকার সুযোগটুকুও পায়নি। অস্থির হয়ে রৌদ্র আগেভাগেই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে তার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পরই সে দেখল তুরা তনুজা খানের সাথে ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে। তুরা কাছে আসতেই রৌদ্র তার হাত ধরে একটু টেনে গাড়ির আড়ালে নিয়ে এল। অধৈর্য হয়ে রৌদ্র জিজ্ঞেস করল।
“তুরা, কী হয়েছে তোমার? তুমি আমাকে এড়িয়ে চলছো কেন? আজ সারাদিন একটা বারও আমার সাথে কথা বললে না কেন?”
তুরা নিজেকে খুব কষ্টে সংযত রাখল। তার চোখের সামনে বারবার সেই লনের দৃশ্যটা ভেসে উঠছে। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল।
“কই, এড়িয়ে চলছি না তো। আসলে শরীরটা একটু ভালো লাগছিল না, তাই মার সাথে থেকেছি সারাদিন।”
তুরা সত্যিটা বলল না। আসলে কীভাবে বলবে? রৌদ্র আর সৃজনীর ওই হাসিমুখের দৃশ্যটা বলার মতো ভাষা তার জানা নেই। রৌদ্র একটা লম্বা শ্বাস নিল। তার মনে হলো তুরার কণ্ঠস্বরে সেই চিরচেনা সতেজতা নেই। সে আলতো করে তুরার দুই গালে হাত রেখে গভীর চোখে তাকিয়ে বলল।
“কী হয়েছে তুরা? সত্যি করে বলো তো, কোনো সমস্যা? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে তুমি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো।”
তুরা মুহূর্তের জন্য দুর্বল হয়ে পড়ল, কিন্তু পরক্ষণেই মুখে একটা কৃত্রিম হাসি টেনে বলল।
“আরে না, কিছু হয়নি। কী লুকাবো আপনার কাছ থেকে? আর আমার ভালো লাগছে না, বাড়ি যাব। তাড়াতাড়ি গাড়ি চালান।”
বলেই তুরা রৌদ্রের হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দ্রুত গাড়ির ডোর খুলে ভেতরে গিয়ে বসল। রৌদ্র অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিল। পুরোটা পথ তুরা একদম নিশ্চুপ। সে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন ওই অন্ধকারের মাঝেই নিজের সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
রৌদ্র স্পষ্ট বুঝতে পারছে তুরার মনে কোনো ঝর বইছে। এই নীরবতা রৌদ্রের সহ্য হচ্ছে না। হঠাৎ সে মাঝরাস্তায় সজোরে গাড়ির ব্রেক কষল। টায়ারের ঘর্ষণে বিকট শব্দ হলো। তুরা চমকে উঠে রৌদ্রের দিকে তাকাল। কিছুটা বিরক্ত আর অবাক হয়ে বলল।
“কী হলো? গাড়ি থামালেন কেন?”
রৌদ্র সিট থেকে একটু এগিয়ে তুরার দুই হাত নিজের শক্ত মুঠোয় নিয়ে নিল। তার চোখে তখন আকুলতা। রৌদ্র খুব নরম আর আদুরে গলায় বলল।
“আমার লক্ষ্মী বউ, প্লিজ বলো কী হয়েছে? আমি জানি তোমার কিছু একটা হয়েছে, যা আমি তোমার চোখ দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারছি। তুমি তো জানো আমি তোমার ওই চোখের ভাষা পড়তে ভুল করি না। আচ্ছা তুমি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছো না তো? কোনো ভুল বুঝে বসে আছো?”
রৌদ্রের কথায় তুরা মুহূর্তে সচেতন হয়ে উঠল। সে জানে, রৌদ্রের মতো তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে বেশিক্ষণ মিথ্যে বলা সম্ভব নয়। তুরার মন চাইল এক নিমিষেই সৃজনীর সাথে দেখা ওই নিভৃত মুহূর্তের কথা বলে দেয়, রৌদ্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো সে তো এখনো নিশ্চিত নয় যে রৌদ্র আর সৃজনীর মাঝে আসলে কী চলছে। নিজের চোখের দেখাই কি সব? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো গল্প আছে? তুরা চাইল না অপরিণতভাবে কোনো দৃশ্য তৈরি করতে সে চাইল ধীরস্থিরভাবে দেখে যেতে ঘটনা আসলে কোন দিকে মোড় নেয়।
এখনই দুর্বল হওয়া চলবে না এই জেদ নিয়ে তুরা ঠোঁটে একটা চওড়া হাসি ফুটিয়ে তুলল। সেও রৌদ্রের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু ঝাকুনি দিয়ে আদুরে গলায় বলল।
“আরে আমার পাগল জামাই! কিচ্ছু হয়নি তো, সত্যি বলছি। এমনিতে আজ মানুষের ভিড়ে একটু খারাপ লাগছিল, তাই সারাদিন মার আঁচল ধরে ছিলাম। আপনি মিছেই চিন্তা করছেন!”
রৌদ্র লম্বা একটা নিশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করল। তুরার হাসিতে কিছুটা আশ্বস্ত হলেও মনের খুঁতখুঁতানিটা তার পুরোপুরি গেল না। তবুও সে আর কথা না বাড়িয়ে পুনরায় গাড়ি চালানোয় মনোযোগ দিল। তুরা আবার জানালার বাইরে চোখ রাখল, তার দৃষ্টি মিশে গেল রাস্তার পাশের গাছপালার দ্রুত বয়ে চলা অন্ধকারের মাঝে।
ধীরে ধীরে খান বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে সবার গাড়ি এসে থামল। আরফা আর নেহালকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন সবাই। ড্রয়িং রুমে সবাই যখন একসাথে বসলেন, তখন আরিফুল খান চারদিকে নজর বুলিয়ে আয়ানকে দেখতে পেলেন না। তিনি ভ্রু কুঁচকে সবার উদ্দেশ্যে বললেন।
“একি! আয়ান তো সবার আগে বেরিয়েছে, তাহলে সে কই? বাইরে তো আয়ানের গাড়িও দেখলাম না!”
তিথির বুকের ভেতরটা অজান্তেই ‘ছ্যাঁত’ করে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আয়ানের সেই রক্তবর্ণ চোখ আর কান্নামাখা কণ্ঠস্বর। সে নিজেও দেখে এসেছে বাইরে আয়ানের গাড়ি নেই। তার মানে আয়ান এখনো বাড়িতে ফেরেনি।
পাশ থেকে আনোয়ার খানও বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন।
“ছেলেটা এত রাতে আবার কোথায় গেল?
নেহাল বড়দের অস্থিরতা দেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল।
“আপনারা চিন্তা করবেন না। আয়ান হয়তো কোনো দরকারি কাজে বেরিয়েছে বা বন্ধুদের সাথে দেখা করতে গেছে। একটু পরেই চলে আসবে।”
নেহালের কথায় সবাই কিছুটা শান্ত হলেন। রাত অনেক হয়েছে, তাছাড়া নতুন জামাই ঘরে এসেছে তাই সবাই আর কথা না বাড়িয়ে যে যার ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু তিথির অস্থিরতা কমল না তার কানে তখনো বাজছে সেই চিৎকার’যাহহহহহহহহ, দিলাম তোকে মুক্তি।এই মুক্তি কেন তিথির কাছে আনন্দ হচ্ছে না, কেন এত অস্থির করে তুলছে।
বাড়ির সবাই মিলে বেশ কিছুক্ষণ সোফায় বসে জমিয়ে আড্ডা দিল। নেহাল আর আরফাকে হালকা নাস্তা দেওয়া হলো। অনেক হাসি-ঠাট্টার পর যখন ক্লান্তিতে সবার চোখ বুজে আসছিল, তখন একে একে সবাই নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল।
তুরা ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিজের রুমে আসতেই রৌদ্র তার পেছন পেছন ঢুকল। তুরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রৌদ্র আচমকা তাকে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর তুরার কোলে মাথা রেখে চোখ দুটো বুজে শুয়ে পড়ল। খুব ক্লান্ত আর ভেজা কণ্ঠে রৌদ্র আবদার করল।
“তুরা, খুব মাথা ব্যথা করছে একটু টিপে দাও না।”
তুরা কোনো কথা বলল না, কোনো পাল্টা প্রশ্নও করল না। শুধু যান্ত্রিকভাবে নিজের আলতো হাত দুটো রৌদ্রের মাথায় রাখল। ধীরে ধীরে সে রৌদ্রের কপাল আর মাথা টিপে দিতে লাগল। সারাদিনের ধকল আর তুরার হাতের আঙুলের ছোঁয়ায় রৌদ্রের শরীরের সব ক্লান্তি যেন জুড়িয়ে এল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিশ্বাস গভীর ও স্থির হয়ে এল রৌদ্র গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
তুরা অপলক দৃষ্টিতে রৌদ্রের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রৌদ্রের প্রতিটি নিশ্বাস এখন খুব শান্ত। এই মানুষটার দিকে তাকালে কার সাধ্য আছে বলবে যে তার মনে কোনো লুকোছাপা আছে? কী নিষ্পাপ আর শান্ত দেখাচ্ছে তাকে।
তুরার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। যে মানুষটা তার কোলে মাথা রেখে এত নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, সেই মানুষটা কি সত্যিই অন্য কাউকে হৃদয়ে জায়গা দিতে পারে? তুরা ভাবল, রৌদ্র যদি কোনোভাবে তাকে ঠকায়, তবে সে কোনোদিন তাকে ক্ষমা করতে পারবে না। তুরার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। রৌদ্রের এই নিষ্পাপ চেহারার আড়ালে যদি সৃজনীর জন্য কোনো গোপন টান থাকে, তবে তুরা হয়তো সত্যিই নিঃশেষ হয়ে যাবে।
তুরা রৌদ্রের ঘুমন্ত কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল। রৌদ্রের শান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তুরার দুচোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। রৌদ্রের এলোমেলো চুলে আঙুল চালাতে চালাতে সে খুব নিচু স্বরে, অনেকটা নিজের মনের সাথেই ফিসফিস করে বলল।
“জানি না রৌদ্র আমি আপনাকে সন্দেহ করছি কি না, কিন্তু কেন জানি আমার ভীষণ খারাপ লাগছে, আমার মনটা অনবরত ছটফট করছে। রৌদ্র, আপনার যদি সত্যিই সৃজনীর সাথে কোনো সম্পর্ক থাকে, তাহলে কিন্তু আমি আপনাকে কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারব না। পৃথিবীর সব নারী সব কিছু সহ্য করতে পারলেও, নিজের স্বামীকে অন্য কারোর পাশে সহ্য করতে পারে না তেমনি আমিও পারি না। খুব কষ্ট হয় রৌদ্র, অসহ্য কষ্ট!”
তুরার গলার স্বর কান্নায় বুজে এল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রৌদ্রের চুলের ভাঁজে মুখ লুকিয়ে আবার বলল।
“আমি মনেপ্রাণে দোয়া করি, আমার মনের এই সন্দেহটা যেন ভুল হয়। সবকিছুই যেন কেবল আমার মনের ভুল হয়। আপনার ওই হৃদয়ে যেন সবসময় শুধু আমারই জায়গা থাকে। আমি আপনাকে ছাড়া আর কাউকে নিয়ে ভাবতে পারি না রৌদ্র, প্লিজ আমাকে কোনোদিন একা করে দেবেন না।”
ঘরের আবছা আলোয় রৌদ্রের ঘুমন্ত মুখটা তখনো শান্ত। সে টের পেল না তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঘূর্ণিঝড়ের কথা। তুরা রৌদ্রের মাথায় হাত রেখেই একসময় দেয়ালের দিকে তাকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে হারিয়ে গেল।
এদিকে তিথির ঘরে তখন এক অস্থির নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটা রাত দুটোর ঘর ছুঁইছুঁই, কিন্তু আয়ানের কোনো খবর নেই।তিথি ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নির্জন গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় দুলছে। আয়ানকে সে আজ যে কথাগুলো বলেছে, সেগুলো কি সত্যিই বলা দরকার ছিল? আয়ানের চোখের জল দেখার অভিজ্ঞতা তিথির কোনোদিন ছিল না,আর আজ আয়ানের মতো পাথরের মতো শক্ত একজন পুরুষের চোখে সে সমুদ্রের মতো কান্না দেখেছে। তবে কি সে সত্যিই আয়ানকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে?
পরক্ষণেই নিজের মনকে জোর করে শাসন করল তিথি। সে তো এটাই চেয়েছিল আয়ান তার থেকে দূরে থাকুক, তাকে মুক্তি দিক। এটাই তো তার জীবনের সবথেকে বড় চাওয়া ছিল। তাহলে এখন কেন মনের এক কোণায় অপরাধবোধ কাজ করছে? আর আয়ান কতই রাগ করে থাকতে পারবে একটু পড়েই এসে তাকে জড়িয়ে ধরবে, সে আবার তার অপর অধিকার না খাটিয়ে থাকতে পারবে কোনোদিন ও না।তিথি এসব ভেবে আর নিজেকে প্রশ্রয় দিতে চাইল না। সে ব্যালকনি ছেড়ে রুমে এসে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। সারাদিনের ধকল আর মানসিক চাপে শরীরটা এতটাই ক্লান্ত ছিল যে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
রাত তখন তিনটে। পুরো বাড়ি যখন নিঝুম অন্ধকারে আচ্ছন্ন, তখন আয়ান নিঃশব্দে বাড়িতে ঢুকল। তার চুলগুলো বড্ড এলোমেলো, শার্টের হাতা গুটানো। চোখ দুটো টকটকে লাল হয়ে আছে, যা দেখলেই বোঝা যায় সে দীর্ঘ সময় ধরে একা একা কেঁদেছে বা পাগলের মতো গাড়ি চালিয়েছে। রুমে ঢুকে বিছানায় ঘুমন্ত তিথির দিকে তার নজর গেল, কিন্তু আয়ান আজ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। প্রতিদিনের মতো তিথিকে জড়িয়ে ধরল না। চুপচাপ একটা বালিশ তুলে নিয়ে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। শরীরের ক্লান্তিতে সেও খুব দ্রুত ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল।
সকাল হতেই খান বাড়িতে আবার প্রাণচঞ্চলতা ফিরে এসেছে। ড্রয়িং রুমে নতুন জামাই নেহালকে ঘিরে সবাই আড্ডায় মেতে আছে। নেহাল আর আরফাকে নিয়ে সবার হাসি-তামাশার রেশ যেন কাটতেই চাইছে না। ওদিকে রান্নাঘরে সাজ সাজ রব। রৌশনি খান, তনুজা খান আর হিমি খান মিলে উৎসবের মতো রান্না করছেন। নতুন জামাইয়ের প্রিয় সব পদ আজ পাতে উঠবে ইলিশ ভাজা থেকে শুরু করে কাচ্চি বিরিয়ানি, কোনো কিছুরই কমতি নেই।
বাড়ির সবাই যখন ড্রয়িং রুমে বসে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল, ঠিক তখনই আয়ান ধীরপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল। আয়ানের চেহারার সেই চিরচেনা জৌলুস আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। তার বিধ্বস্ত দশা দেখে আড্ডার চনমনে কলরব মুহূর্তেই থেমে গেল। আরফা বেশ অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“ভাইয়া, কী হয়েছে তোমার? চোখ-মুখ এমন শুকনো আর লাল দেখাচ্ছে কেন?”
আয়ান কারোর চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস পেল না, পাছে মনের ক্ষতটা চাউনিতে ধরা পড়ে যায়। সে পকেট থেকে ফোন বের করে যান্ত্রিকভাবে টিপতে টিপতে সোফায় গিয়ে বসল। খুব নিচু আর নির্লিপ্ত স্বরে উত্তর দিল।
“তেমন কিছু না রে। কাল রাতে ঘুমটা ঠিকঠাক ক্লিয়ার হয়নি, তাই হয়তো চেহারায় এমন ক্লান্তি লাগছে।”
তিথি এক কোণায় দাঁড়িয়ে আড়চোখে আয়ানকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। আয়ানের এমন মলিন আর বিমর্ষ মুখ সে জীবনে এই প্রথম দেখছে। তিথির চেনা আয়ান মানেই হয় প্রচণ্ড জেদ আর রাগ, না হয় গম্ভীর এক ব্যক্তিত্ব।কিন্তু সে সবসময় পরিবারকে মাতিয়ে রাখত। কিন্তু আজকের এই নিস্তব্ধ আয়ানকে সে কোনোভাবেই মেলাতে পারছে না।
সবচেয়ে বেশি যেটা তিথিকে তিলে তিলে ভাবাচ্ছে, তা হলো আয়ানের গতরাতের আচরণ। প্রতিদিন আয়ান কোনো না কোনো ছুতোয় তিথিকে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে আগলে নিয়ে ঘুমাত। অথচ কাল রাতে সে তিথির ধারেকাছেও ঘেঁষেনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে আয়ানকে সোফায় একা গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতে দেখে তিথির বুকের ভেতরটা কেমন জানি একটা ধাক্কা খেয়েছিল। আয়ান কি তবে সত্যিই তিথিকে দেওয়া সেই ‘মুক্তি’র কথা রাখতে শুরু করেছে? সে কি সত্যিই তিথির জীবন থেকে নিজের অধিকারগুলো সরিয়ে নিচ্ছে।
আয়ানের এই অদ্ভুত শান্ত ভাবটা তিথির মনে স্বস্তি দেওয়ার বদলে এক অজানা অস্থিরতা আর দহন তৈরি করছে। সে বুঝতে পারছে না,এই দূরত্বটাই কি সে মনে-প্রাণে চেয়েছিল? নাকি আয়ানের এই নিস্তব্ধ বদলে যাওয়া রূপটা তাকে অজান্তেই এক পাহাড়সম অপরাধবোধের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
সারাটা দিন বাড়ির সবার হাসি-খুশি আর আড্ডার মাঝেই কেটে গেল। রৌদ্র আজ এক মুহূর্তের জন্যও তুরাকে চোখের আড়াল হতে দেয়নি; সারাদিন তার সাথেই থেকে যেন জ্বালিয়ে মেরেছে। রৌদ্রের এই অতি-ভালোবাসা তুরার মনে বার বার সৃজনীর সেই স্মৃতিটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল, যা সে ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। অন্যদিকে আয়ান আর তিথির মাঝে জমেছে এক পাহাড়সম দূরত্ব। আয়ান তিথির সাথে কোনো কথা তো বলেইনি, বরং এমনভাবে পাশ কাটিয়ে চলেছে যেন সে তিথিকে চেনেও না। আয়ানের এই নির্লিপ্ততা তিথিকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
সন্ধ্যা গড়াতেই আরফা সবাইকে নিয়ে ছাদে যাওয়ার বায়না ধরল। আরফা, রৌদ্র, তুরা, আয়ান, তিথি, আরশি আর শিহাব সবাইকে নিয়ে সে জোর করেই ছাদে এল। আয়ান একদমই আসতে চাইছিল না, কিন্তু আরফাও ছাড়ার পাত্র নয় একপ্রকার টেনেই তাকে নিয়ে এসেছে। উদ্দেশ্য হলো সবাই মিলে ‘ট্রুথ অর ডেয়ার’ খেলবে।
ছাদের এক কোণে সবাই গোল হয়ে বসল। আয়ান নেহালের পাশে গিয়ে বসতে চেয়েছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে শিহাব তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরাসরি তিথির পাশে বসিয়ে দিল। আয়ান কোনো প্রতিবাদ করল না, কোনো বিরক্তিও দেখাল না কেবল পাথরের মতো মুখ করে চুপচাপ তিথির গা ঘেঁষে বসে পড়ল। ওদিকে রৌদ্র আর তুরাও একে অপরের পাশাপাশি আসন নিল।
আরফা সবার দিকে তাকিয়ে চনমনে গলায় বলল।
“তাহলে খেলা শুরু হোক! আমি বোতল ঘুরাচ্ছি কিন্তু প্রথমে।”
বলেই আরফা উত্তেজনার সাথে বোতলটা জোরে ঘুরিয়ে দিল। বোতলের মুখটা কয়েকবার পাক খেয়ে একদম শিহাবের দিকে গিয়ে স্থির হলো। নেহাল সুযোগ পেয়েই সাথে সাথে বলে উঠল।
“প্রথমটা আমিই ধরবো! তো ভাই, কী নিবেন? ট্রুথ নাকি ডেয়ার?”
শিহাব কিছুক্ষণ সময় নিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস সজোরে জানান দিয়ে সরাসরি বলল।
“ডেয়ার!”
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে নেহালের দিকে তাকাল। শিহাবের মতো শান্ত ছেলেকে নেহাল এখন এমন কী কঠিন কাজ দেবে, তা দেখার জন্য সবাই যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে।নেহাল শয়তানি হাসিতে শিহাবের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল। সবাই বুঝতে পারল শিহাবের কপালে আজ বড় কোনো দুর্গতি আছে। নেহাল একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল।
“শিহাব ভাই, যেহেতু আপনি ডেয়ার নিয়েছেন, তাই কোনো সহজ কাজ দিয়ে আপনাকে ছেড়ে দেব না। আপনার কাজ হলো আপনি এখন এই ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একদম সত্যিকারের একটা শাড়ি পরবেন। শুধু তাই না, শাড়ি পরে একদম নতুন বউয়ের মতো ঘোমটা টেনে লাজুক ভঙ্গিতে ক্যাটওয়াক করে আমাদের কাছে আসতে হবে। আর একেকজনের কাছে গিয়ে মিনমিন করে বলতে হবে ‘ওমা! আপনারা এখনো নাস্তা খাননি? আমি কি এক কাপ চা করে আনব?’ তাও আবার একদম মেয়েলি গলায়।”
নেহালের এই অদ্ভুত ডেয়ার শুনে শিহাবের চোখ কপালে উঠল। সে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
“ইয়া আল্লাহ লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিওল রাজিউন, শাড়ি তাও আবার আমি, আমি পারবো না ভাই আমি গেলাম।”
বলেউ শিহাব যেই না পালানোর জন্য পা বাড়াবে, অমনি রৌদ্র আর আয়ান অতর্কিতে তাকে দুই পাশ থেকে জাপটে ধরল। রৌদ্র হাসতে হাসতে বলল।
“পালানোর পথ নেই! ডেয়ার যখন নিয়েছিস, তখন খান বাড়ির ইজ্জত তোর রাখতেই হবে।”
আয়ানও একটু মুচকি হেসে শিহাবের হাত শক্ত করে ধরে টেনে আবার মাঝখানে নিয়ে আসলো।তিথি তখন আর দেরি করল না। সে এক দৌড়ে নিচে গিয়ে নিজের আলমারি থেকে টকটকে লাল রঙের একটা জর্জেট শাড়ি নিয়ে এল। তিথি হাসতে হাসতে শাড়িটা শিহাবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল।
“এই নিন শিহাব ভাই, একদম লেটেস্ট কালেকশন! আজ আপনাকে নতুন বউ সাজতেই হবে।”
শিহাবের চেহারা তখন দেখার মতো। শিহাব ভালো করেই বুঝতে পারল আজ শাড়ি না পড়লে এরা ছাড়ার পাএ নই। সবার চাপে পড়ে সে শেষমেশ শাড়ি পরা শুরু করল। একটা জিন্সের ওপর সে কোনোমতে শাড়িটা পেঁচাতে লাগল। শাড়ির কুঁচি করতে গিয়ে তার হাত-পা জড়িয়ে যাচ্ছে। একবার শাড়ি পায়ের নিচে পড়ে যায় তো আরেকবার আঁচল মেঝেতে লুটোপুটি খায়। নেহাল আর রৌদ্র হাসতে হাসতে সাহায্য করার নাম করে শাড়িটা এমনভাবে তার কোমরে গুঁজে দিল যে শিহাবকে দেখতে একদম ঢোলা মোড়কের মতো লাগছে।
শিহাব এবার মাথায় বিশাল এক ঘোমটা টানল। ঘোমটা এত বড় যে তার মুখই দেখা যাচ্ছে না। এরপর সে শাড়ি সামলে নিয়ে পা টিপে টিপে লাজুক ভঙ্গিতে ক্যাটওয়াক শুরু করল, শিহাবের লাজুক হাঁটার স্টাইল দেখে হাসির চোটে সবার পেট ফেটে যাওয়ার দশা। রৌদ্র হাসতে হাসতে ছাদের মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগল।শিহাব এবার আরফার সামনে গিয়ে ঘোমটার আড়াল থেকে একদম মেয়েলি মিহি গলায় বলল।
“ওমা আরফা আপা! আপনারা এখনো নাস্তা খাননি? আমি কি এক কাপ চা করে আনব আপনাদের জন্য?”
শিহাবের মেয়েলি কন্ঠে কথা বলার ধরন দেখে। পুরো ছাদে যেন অট্টহাসির বোমা ফাটল। এমনকি আয়ান,যে এতক্ষণ পাথর হয়ে বসে ছিল , সেও হাসতে হাসতে তিথির শরীরে গড়াগড়ি খেতে লাগল। তুরা আর আরশি হাসতে হাসতে একে অপরের ওপর ঢলে পড়ছে।
শিহাব সবাইকে পাগলের মতো হাসতে দেখে মোটেও দমে গেল না। সে বরং শাড়ির আঁচলটা দাঁত দিয়ে চেপে ধরে আরও একটু বেশি লজ্জার অভিনয় করে আদুরে গলায় বলল।
“ওমা দুষ্টুরা! তোমরা এভাবে সবাই হাসছো কেন? লাল শাড়িতে আমাকে খান বাড়ির পুত্রবধূ হিসেবে কি একটুও ভালো লাগছে না?”
শিহাবের এই ঢং দেখে রৌদ্র আর নেহাল হাসতে হাসতে ছাদের মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। তুরা হাসতে হাসতে প্রায় শেষ, সে কোনোমতে নিজের পেট চেপে ধরে লম্বা শ্বাস নিতে নিতে বলল।
“উফ শিহাব ভাই! আপনাকে একদম পাক্কা বউ লাগছে! আমার তো এখন খুব আফসোস হচ্ছে,আপনি কেন যে খান বাড়ির জামাই হলেন। আপনি যদি পুত্রবধূ হতেন, তবে এই বাড়িতে আমাদের আর কোনো বিনোদনের অভাব হতো না! বিশ্বাস করেন, তিথির চেয়েও আপনাকে বেশি মানিয়েছে এই লাল শাড়িতে।”
মুহূর্তে শিহাব শাড়িটা এক ঝটকায় গা থেকে খুলে ছুড়ে মারল। তারপর ধপ করে নিজের জায়গায় বসে নেহালের দিকে আঙুল উঁচিয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলল।
“ভাই, খুব তো মজা নিলেন! আমারও কিন্তু পালা আসবে, তখন বুঝবেন মজা কারে কয়!”
শিহাবের কথা শুনে সবাই আবার হাসাহাসি করে স্বাভাবিক হলো। এইবার বোতল ঘুরানোর দায়িত্ব নিল তুরা। সে বেশ কায়দা করে বোতলটা ঘুরিয়ে দিল। বোতলটা বনবন করে ঘুরে একদম সোজা গিয়ে থামল তিথির দিকে।আরশি যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল। সে সাথে সাথে চনমনে গলায় বলে উঠল।
“তিথি, ফেঁসে গেছিস! আমিই প্রশ্ন করব। বল, তুই কী নিবি? ট্রুথ নাকি ডেয়ার?”
তিথি বিন্দুমাত্র দেরি না করে ডেয়ার নিল।তিথির ডেয়ার নিতে দেখে আরশির মুখে এক বিশ্বজয়ী হাসি ফুটে উঠল। সে বেশ আয়েশ করে সবার সামনে ঘোষণা করল।
“ঠিক আছে, তাহলে তোর এখনকার কাজ হলো ওই যে ছাদের ওই কোনা থেকে একটা গোলাপ তুলে আনবি। তারপর সবার সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে আমাদের এই আয়ান ভাইকে প্রপোজ করতে হবে। তবে মনে রাখিস তিথি, প্রপোজটা হতে হবে একদম নিখুঁত, অবিচল আর সুন্দর।”
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৩