Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৬


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ২৬
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

সকাল দশটা ,,,

তরীর ঘুম ভেঙেছে খুব বেশি সময় হয়নি। ঘুম থেকে উঠে ও বিছানার উপরই গুটিসুটি মেরে বসে আছে। চুলগুলো পুরো এলোমেলো, চোখমুখ এখনো ঘুমে ফোলা ফোলা। দেখতে যেন একেবারে রসগোল্লার মতো নরম আর গোলগাল লাগছে।
চঞ্চল মেয়েটা একদম চুপচাপ বসে আছে আজ, যেন গভীর কোনো চিন্তায় ডুবে গেছে।

তরী যখন গভীর ভাবনায় ডুবে তখনই হালকা শব্দ করে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল হৃদয়। একদম তৈরি হয়ে এসেছে সে হয়তো এখনই কাজের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যাবে। তার পড়নে সাদা কোর্তা, আর তার উপর কালো কোটি। চুলগুলো পরিপাটি করে সেট করা, চোখে সেই চিরচেনা গম্ভীর অথচ আকর্ষণীয় দৃষ্টি।

হৃদয় রুমে ঢুকতেই তরীর চোখ সোজা তার উপর স্থির হয়ে গেল। ও একদম পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হৃদয়ের দিকে। এই পোশাকে হৃদয়কে আজ ওর কাছে ভীষণ অন্যরকম লাগছে। একটা অদ্ভুত গাম্ভীর্য তার চেহারায় , একটা অদ্ভুত সৌন্দর্য , পুরো ম্যানলি টাইপ। তরীর চোখ যেন কিছুতেই সরতে চাইছে না। ও মনে মনে ভাবছে …. ইশশ! ছেলেদেরও বুঝি এত সুন্দর হতে হয়?

এইদিকে হৃদয় প্রথমে কিছু বলল না। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে তরীর সেই নির্বাক তাকিয়ে থাকা দৃশ্যটা উপভোগ করল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এল ওর কাছাকাছি। তরী তখনও এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে।

পরমুহূর্তেই হৃদয় ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে এনে তরীর কপালে আলতো করে একটা টোকা দিল। তরী যেন হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল। পরপর হকচকিয়ে গেল ও। চোখ বড় বড় করে তাকালো হৃদয়ের দিকে। যেন বুঝতে চাইছে আসলে হচ্ছে টা কি।

__আপনি….! বাকিটা আর বলতে পারলো, কি মনে করে যেন চুপ করে গেল।

আর হৃদয় তখন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তরীর সামনে, ঠোঁটে চাপা এক রহস্যময় হাসি নিয়ে। সে কিছুক্ষণ একইভাবে তরীর দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করল,

__কি ভাবছিস?

তরী হকচকিয়ে মাথা নাড়ল।
__কই! কিছু না তো।

হৃদয়ও হালকা মাথা নেড়ে জবাব দিল,
__ঠিক আছে।

এরপর সে পকেট থেকে একটা ছোট চাবি বের করে তরীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

__এইটা রাখ।

তরী অবাক হয়ে চাবিটার দিকে তাকাল একবার, তারপর কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই হৃদয় আবার বলল,

__আমার রুমের চাবি। আমার অনুপস্থিতিতে কেউ যেন আমার রুমে না যায়। কেউ কিছু বললে বলবি, আমি বলেছি।

কথাটা শোনা মাত্রই তরীর ঘুমঘুম, ফোলা মুখটায় মুহূর্তেই আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল। চোখ দুটো চকচক করে উঠল ওর। ও তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল,

__আচ্ছা!

চাবিটা যেন ওর কাছে কোনো সাধারণ জিনিস নয়। বরং এক বিশেষ দায়িত্ব এবং অদৃশ্য অধিকারের মতো।

হৃদয় মুচকি হেসে একপলক ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর আদুরে এবং স্নেহমিশ্রিত গলায় বলল,

__এখন আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, আমি যাচ্ছি।
তুই উঠে ফ্রেশ হয়ে সোজা নিচে গিয়ে নাস্তা করে নিবি।

একটু থেমে সে আবারও বলল,
__ আমার যেন এসে শুনতে না হয় তুই ঠিকঠাক মত খাবার খাসনি। আমার নয়ন তো লক্ষীসোনা, সব কিছু সুন্দর ভাবে করে নেয় তাই না?

হৃদয়ের এই আদুরে কথায় তরীর মুখটা আরও নরম আরও আদুরে হয়ে গেল। ও একটু আহ্লাদী ভঙ্গিতে বলল,

__আচ্ছা। তারপর হঠাৎই যেন কিছু মনে পড়ল। অতঃপর ও আবদারের সুরে বলল,

__কিন্তু আমি সমুদ্রে যেতে চাই। যেন হৃদয়কে জানান দিচ্ছে ও ! যে ও হৃদয়ের কথা শুনবো, কিন্তু তার বিনিময়ে ওর ও কিছু চাই।

হৃদয় ভ্রু কুঁচকাল, পরমুহূর্তেই হেসে ফেললো, হৃদয়ের কাছে বিষয়টা খুবই আনন্দের, তার বাঁদর ছানা তার কাছে আবদার করছে, তার সাথে ফ্রি ভাবে কথা বলছে। এর থেকে আনন্দের আর কি হতে পারে। অতঃপর সে তরীর মাথার এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,

__ আচ্ছা, ইলেকশনটা শেষ হোক। তারপর নিয়ে যাবো।

সাথে সাথেই তরী চোখ বড় বড় করে বলল,

__সত্যিইইই?

হৃদয় মাথা নেড়ে বলল,
__একদম।

কথাটা শুনে তরীর আনন্দ আর ধরে রাখার মতো রইল না। ও হঠাৎই হাঁটুতে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠল।
কিন্তু হঠাৎ লাফাতে গিয়ে ও একটু ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল, যার দরুণ ওর হাত চলে গেল হৃদয়ের বুক বরাবর।

এইদিকে তরী যেন পড়ে না যায়, তার আগেই হৃদয় দ্রুত হাত বাড়িয়ে তরীর কোমরটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। দুজনের মুখ তখন খুব কাছাকাছি।

হৃদয় চিন্তিত ভাবে কপাল কুঁচকে বলল,
__ পড়ে যাবি, বাবুই।

তরী মাথা নাড়ল। ওর চোখে এখনো সেই উচ্ছ্বাসের আলো। ও দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,

__ পড়ে যাব না।

হৃদয় কয়েক সেকেন্ড এইভাবেই ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তার হাত তখনও তরীর কোমর জড়িয়ে আছে।

আর তরী— ও যেন তখনও সমুদ্রে যাওয়ার সেই আনন্দের ঢেউয়ে ভাসছে।


দুপুর দুটো,,,,,

ইনায়া নিজের রুমের মধ্যে বসে আছে। মুখে অস্বস্তিকর এক রাগী ভাব, চোখে স্পষ্ট ঈর্ষা।
ওর মাথার ভেতর তখন অন্য এক হিসেব চলছে। তরীকে কিভাবে হৃদয়ের চোখে খারাপ বানানো যায়! এই চিন্তাতেই ডুবে আছে ও।

কিছুক্ষণ আগেই ও গিয়েছিল হৃদয়ের রুমের উদ্দেশ্যে, ভেবেছে হৃদয়ের অনুপস্থিতিতে হৃদয়ের রুমটাকে সুন্দর করে সাজাবে এবং যখন হৃদয় বাসায় ফিরবে নিজের যৌবনের রূপ হৃদয়ের সামনে তুলে ধরবে। কিন্তু ওর ভাবনায় এক বালতি পানি পড়ে গেল যখন গিয়ে দেখল দরজায় লক করা। সেই মুহূর্তেই ওর মাথায় আগুন ধরে যায়। ও মনে মনে ভেবে নেয় হৃদয়ের রুম তরীই লক করেছে। এই ধারণাটা যেন ওর ভেতরের ঈর্ষাকে আরও উসকে দেয়।

বর্তমান,,,,

ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। পরমুহূর্তেই রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা নিচতলার দিকে হাঁটা দিল ও। ওর পরিকল্পনা একদম পরিষ্কার, প্রথমে অনিমা বেগমের চোখে তরীকে খারাপ বানাবে, তারপর হৃদয়ের। যেই ভাবা, সেই কাজ। দ্রুত পায়ে হেঁটে ও ড্রয়িং রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর একটু জোরে ডেকে উঠলো অনিমা বেগমকে,

__মামি….!

ইনায়ার ডাক শুনে ড্রয়িং রুমে বসে থাকা নীলা চৌধুরী এবং অনিমা বেগম একসাথে তাকাল তার দিকে। তারপর অনিমা বেগম হালকা হাসিমুখে বললেন,

__ কিছু বলবি, ইনায়া?

ইনায়া একটু এগিয়ে এসে মুখে উদ্বিগ্ন ভাব এনে বলল,
__ মামি, দেখো না তরী কি করেছে! হৃদয় ভাইয়া এসে এইসব দেখলে খুব রেগে যাবে আজ।

ইনায়ার কথাটা শোনা মাত্রই নীলা চৌধুরীর কপালে সঙ্গে সঙ্গে ভাঁজ পড়ল। মায়ের স্বভাবসুলভ চিন্তা যেন হঠাৎই জেগে উঠল। তার মেয়েটা আবার কি কান্ড করে বসলো!

অনিমা বেগম কিছু বলার আগেই নীলা চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন,

__ ও কি করেছে, ইনায়া?

ইনায়া যেন এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল।
ও মুহুর্তেই একটু গম্ভীর হয়ে বলল,

__নীলা আন্টি, তরী হৃদয় ভাইয়ার রুম লক করে রেখেছে। ভাইয়া তো বলেছিল তিনটার দিকে ফিরবে। এখন এসে যদি দেখে রুম লক! সে খুব রেগে যাবে। আপনি একটু ওকে বলুন না? নয়তো হৃদয় ভাইয়া তো ওকেই বকবে। তাই বলছিলাম আর কি!

ইনায়ার কথার জবাবে অনিমা বেগম একদম শান্ত গলায় বললেন,

__ হৃদয় তরীকে কিছু বলবে না, ইনায়া। তুই চিন্তা করিস না। তুই গিয়ে রেস্ট কর।

এইরকম জবাব হয়তো ইনায়া আশা করেনি, ও হঠাৎই রেগে বলে উঠলো,
—কিন্তু মামি ও কেন রুমটা এইভাবে লক করে রেখেছে?

তৎক্ষণাৎ অনিমা বেগম হালকা হেসে বললেন,
__ ইনায়া তরী তো ছোট মানুষ। যখন যা মন চায়, তাই করে। তোর এই নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, হৃদয় এইসব নিয়ে তরীকে কিছুই বলবে না।

উনার এই নির্লিপ্ত ভঙ্গি ইনায়ার ভেতরের আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিল।

ঠিক তখনই নীলা চৌধুরী একটু ইতস্তত করে বললেন,
—কিন্তু ভাবি, ইনায়া তো ঠিকই বলছে। মেয়েটা হৃদয়ের রুম লক করে রেখেছে কেন। হৃদয় এসে দেখলে রেগে যাবে না? ছেলেটা সারাদিন এত চাপে থাকে, বাড়িতে আসলে আবার আমার মেয়েটা তাকে জ্বালানো শুরু করে দেয় । তখন তো সে রেগে গিয়ে বকা দেবেই। তখন আবার এই মেয়েই বাড়ি মাথায় তুলবে।

অনিমা বেগম এবার একটু সোজা হয়ে বসলেন।
তার চোখে হালকা গর্বের ঝিলিক।

__ হৃদয় কেন রেগে যাবে ? উল্টো যখন এইসব শুনবে, তখন দেখবি তার মুখ থেকে হাসিই সরছে না। একটু থেমে তিনি আবার বললেন,

__ আর তুই এমনভাবে বলছিস যেন আমার ছেলে সারাদিন তোর মেয়েকে বকে। আদরসোহাগ যে করে, সেটা কি চোখে পড়ে না তোর? আর আমাদের তরী তাকে না জ্বালালে আর কে জ্বালাবে শুনি…. এইটা তাদের নিজেদের ব্যাপার , আমরা গার্ডিয়ান তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলতে গেলে তখন উল্টো আমার ছেলে রেগে গিয়ে বলবে, আমি ওকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাব। বলবে তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমরা হস্তক্ষেপ করি। যতই হোক তার পছন্দের নারী‌ বলে কথা। পরে দেখা যাবে আমাদের দোষী সাব্যস্ত করে, সংসদের মত করে হাজারটা ভাষণ শুনাবে আমাদের।

নীলা চৌধুরী অনিমা বেগমের ব্যাঙ্গাত্মক কথা শুনে হেসে ফেললেন। অনিমা বেগমের সন্তান বলেই হয়তো হৃদয় মনটা এত ভালো।

তবে অনিমা বেগমের কথা সত্য। তিনি নিজেই দেখেছেন, হৃদয়ের তরীর প্রতি পাগলামি, সেই অদ্ভুত ধৈর্য, সেই অগাধ স্নেহ। যেখানে তিনি নিজেই মাঝে মাঝে মেয়ের জেদ আর রাগ সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান। সেখানে হৃদয় কোনো বিরক্তি ছাড়াই সব মেনে নেয়। তার মেয়ের জন্য এমন একজন মানুষ পাওয়া। সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।

এইদিকে ইনায়া?ও দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। মুখে চাপা রাগ, চোখে জ্বলন্ত ক্ষোভ। তার ভেতরটা যেন ফোঁস ফোঁস করে জ্বলছে। এই বাড়ির সবাই কেন তরীকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করে সেটা ও বুঝতে পারে না? কেন সবাই ওর পক্ষ নেয়? কেন হৃদয়ের জীবনে, তরী এত গুরুত্বপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলোই যেন ওর ভেতরে আরও ক্ষোভ তৈরি করছে।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply