নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ১৭
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
তাহিরের গাড়িতে নিস্তব্ধতা জমাট বেঁধে আছে। এইদিকে হৃদি গুটিসুটি মেরে সিটে বসে আছে, আঙুলগুলো আঁকড়ে ধরা নিজের ওড়নার প্রান্তে। পাশেই স্টিয়ারিং আঁকড়ে বসে আছে তাহির। চোয়াল শক্ত, চোখ দুটো রাস্তার দিকে স্থির, আর পায়ের নিচে এক্সেলেটর যেন তার রাগেরই প্রতিচ্ছবি। গাড়ি হাইস্পিডে ছুটছে, কিন্তু তার ভেতরের উত্তেজনা যেন আরও দ্রুতগতির। হৃদি ভয়ে ভয়ে একবার তাহিরের দিকে তাকাল তো আবার সামনে রাস্তার দিকে। বুকের ভিতরটা ধুকপুক করছে। শেষমেশ মিনমিনে কণ্ঠে বলল ও,
__আমরা তো প্লাবন ভাইয়ার সাথে গিয়েছিলাম। তাই দাভাই কিংবা আপনাকে জানাইনি। আর এমনিতেও আম্মু তো জানতোই…. বাক্য শেষ হওয়ার আগেই কট করে ব্রেক কষল তাহির। গাড়ি রাস্তার পাশে থেমে গেল। নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে নেমে এল সেই মুহূর্তে। তাহির ধীরে মাথা ঘুরিয়ে কড়া দৃষ্টি নিক্ষেপ করল হৃদির দিকে।
তোমরা কার সাথে গিয়েছো সেটা বড় কথা নয়, হৃদিয়ানা? তাহিরের গলা নিচু, কিন্তু খুব তীক্ষ্ণ। সে আবারও বলল, তুমি ভাইকে বা আমাকে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করলে না? গার্ডও সাথে নিলে না। আজ যদি তোমার বা ভা.. এতটুকু বলেই তাহির থেমে গেল , তারপর নিজের বাক্য সংশোধন করে আবার বলল — আই মিন তোমার বা তরী বনুর যদি কিছু হয়ে যেত, তখন কি হত একবার ভেবে দেখেছো? তোমাদের এত স্পর্ধা হয় কি করে? ভাই যে তোমাদের আজ কি করবে আল্লাহ জানে!
হৃদি অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল তাহিরের দিকে। বুকের ভিতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে ওর। সত্যিই আজ কি হবে কে জানে!
ওর ভাবনার মাঝেই তাহির আবার বলল,
__আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। আমি ভাইকে কিছু বলতে পারব না। তোমাদের দুজনেরই শাস্তি পাওয়া উচিত।
__এইভাবে বলছেন কেন? ক্ষীণ কণ্ঠ হৃদির।
__তাহলে আর কিভাবে বলব আমি, হৃদি?
হৃদি এবার গাল ফুলিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
__আমি মরে গেলে তো আপনি সবথেকে খুশি হতেন। আপনার ঘাড় থেকে একটা জঞ্জাল সাফ হতো।
এইবার যেন তাহিরের ধৈর্য শেষ সীমানায় পৌঁছালো। মুহূর্তে সে হাত বাড়িয়ে হৃদির নরম কব্জিটা চেপে ধরল। চাপটা খুব জোরে নয়, কিন্তু তার ভেতরের আবেগের তীব্রতা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে।
__সমস্যা কি তোমার, হৃদিয়ানা? দাঁত চেপে বলল সে। — এইসব বলে কি প্রমাণ করতে চাও?
জবাবে হৃদি কষ্টে চোখ নামিয়ে বলল,
__আমি কিছু ভুল তো বলছি না। আপনার ঘাড়ের জঞ্জালই তো আমি।
__আমি সেইরকম কিছু কখনো বলেছি তোমাকে?
হৃদি এইবার তেতো হাসল। পরপর ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল,
__বলেননি তো কি হয়েছে? আপনার ব্যবহার সব বলে দেয়। নয়তো দুবছর যাবত আপনাকে ভালোবেসে যাচ্ছি, তবুও একবারের জন্যও আপনার মনে আমার প্রতি ভালোবাসা জন্মালো না। ভালোবাসা তো দূরে থাক , একটু ভালোলাগাও জন্মালো না। সেই অনুযায়ী তো আমি আপনার ঘাড়ের জঞ্জালই হলাম, তাহির সাহেব।
হৃদির কথার পাছে তাহির আর কিছু বলতে পারল না। তার হাতের চাপ আলগা হয়ে এল। মুখ গম্ভীর করে সে আবার সামনে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল। এবার গাড়ি চলতে শুরু করলো ধীর গতিতে, গাড়িতে আবারও নিরবতা নেমে এল যেন দুজনেই মৌনতা ধারণ করেছে।
অন্যদিকে,
নির্জন রাস্তায় হৃদয়ের বাইক ছুটে চলছে। তরী আগের মতো হৃদয়ের পিঠে পড়ে আছে। যেতে যেতে হঠাৎই রাস্তার মাঝপথে খেয়াল করলো হৃদয় তরীর হাত ঢিলে হয়ে আসছে কিছুটা এবং ওর ছোট শরীরটাও ও তার উপর ছেড়ে দিয়েছে পুরোপুরি। হৃদয় বুঝতে পারলো তরী হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। তরীর এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, ও যেখানে খুশি সেখানে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। অতঃপর ধীরে করে বাইক থামাল হৃদয়।
বাইক থামতেই তরীর চোখের পাতা কেঁপে উঠল হালকা। সেই মুহূর্তে তরীর ঘুম কিছুটা ছুটে গেল। কিন্তু ও নড়লো না এইভাবে পড়ে থেকেই আধো আধো ঘুম কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল ,
__এসে পড়েছি আমরা?
__নাহ। হৃদয় শান্ত গলায় আবার বলল, — একটু সরে বস তো।
__কেন?
__দরকার আছে।
তরী বাধ্য মেয়ের মতো একটু সরে বসতেই হৃদয় বাইক থেকে নেমে গেল। পরপর তরীকে আলতো করে কোলে তুলে নিয়ে সামনে বসিয়ে দিল ঘুরিয়ে। তরী ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে আছে হৃদয়ের দিকে, আসলে ও বুঝতে পারছে না হৃদয় করছে টা কি । তরীর ভাবনার সমাপ্তি ঘটিয়ে হৃদয়ও বাইকে উঠে বসলো, এবার দুজন মুখোমুখি।
তরীর চোখ বিস্ফারিত। হচ্ছেটা কি এসব? ও কিছু বলার আগেই হৃদয় ওর দুটো পা টেনে ওকে একদম নিজের কাছে টেনে নিল । ওর পা দুটো হৃদয়ের কোমড় জড়িয়ে। তারপর তরীর হাত টেনে নিজের গলায় জড়িয়ে দিয়ে নিচু স্বরে বলল—
__এবার ঘুমা। কথাটা এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল যেন এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ব্যবস্থা।
তরী নিঃশব্দে তার বুকে মাথা রেখে ভেবে যাচ্ছে ওর সাথে আজ হচ্ছে টা কি! এই হৃদয় তো ওর কাছে অদ্ভুত অচেনা। মুহুর্তেই তরী বুঝতে পারলো ওর বুকের ভিতর থেকে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে— লজ্জা, বিস্ময়, অচেনা সুখ, না কি ভয়! ও নিজেই বুঝতে পারছে না। মনে হচ্ছে আজকের দিনটা স্বপ্নের মত, যেখানে সবকিছু বাস্তব অথচ অবাস্তব।
হৃদয় আবারও বাইক স্টার্ট দিল। কিন্তু এবার বাইকের গতি ধীর। এক হাত দিয়ে বাইকে ব্যালেন্স করে অন্য হাত দিয়ে তরীর পিঠে শক্ত করে চেপে আছে। বাইকের ধীর গতি স্পষ্ট করে জানান দিচ্ছে যে হৃদয় কোনো মতেই চাইছে না এই রাস্তা শেষ হয়ে যাক।
এইদিকে তরীর বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠছে ক্রমাগত — ধকধক ধকধক শব্দটা এত জোরে হচ্ছে যে মনে হচ্ছে হৃদয়ও নিশ্চয় শুনতে পাচ্ছে। এই অনুভূতি ওর কাছে একেবারেই নতুন। এই অনুভূতির সঙ্গে ও একবারেই পরিচিত নয়। তাই হয়তো বুকের ধকধকানিটাও এইভাবে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠেছে। যেন ছোট্ট খাঁচার ভেতর বন্দি পাখি ডানা ঝাপটাচ্ছে মুক্তির জন্য। হৃদয়ের এতটা কাছাকাছি থাকা ওর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে, অথচ সেই বিপদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মায়া, এক অজানা টান, যা ওকে দূরে সরে যেতে দিচ্ছে না।
হৃদয়ের ঠোঁটে তখন এক বাঁকা হাসি। তরীর মনের ভেতরকার ঝড় সে খুব ভালো করেই পড়তে পারছে। সে তো এটাই চেয়েছিল , এই অসহায় কাঁপন, এই অনিয়ন্ত্রিত স্পন্দন, এই অব্যক্ত আত্মসমর্পণ।
এতগুলো বছর সে পাগলের মতো ভালোবেসেছে তরীকে। অপ্রকাশিত, অস্বীকৃত, অথচ আগুনের মতো জ্বলন্ত সেই ভালোবাসা তাকে অসংখ্যবার নিজেকেই আঘাত করতে বাধ্য করেছে। তীব্র অনুভূতির যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে নিজেকেই শাস্তি দিয়েছে।
এখন পালা তরীর। না এখন আর সে এগোবে না। তরীকেই আসতে হবে। নিজে থেকে। নিজের ইচ্ছায় তার কাছে ধরা দিতে হবে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় নিয়ে বাইক এসে থামল খান বাড়ির সামনে। গেটের ভিতরে তাহিরের গাড়িটা দাঁড়ানো, মনে হচ্ছে তারাও মাত্রই পৌঁছেছে। তরীর ঘুম অনেক আগেই কেটে গেছে। এখন ওর সারা শরীর জুড়ে শুধু অস্বস্তিকর উত্তাপ আর লাজ । ও পারছে না এই অনুভূতি সহ্য করতে। তাই অজান্তেই হৃদয়ের গলাটা এত জোরে আঁকড়ে ধরেছে যে ওর নখের চাপ বসে গেছে হৃদয়ের ত্বকে। হৃদয় সব টের পাচ্ছে। তবু কিছু বলছে না। কারণ প্রিয়তমার এই প্রথম অনুভূতির মুহূর্তে সে কোনোভাবেই ব্যাঘাত ঘটাতে চায় না।
বাইক থেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। তবু তরীর কোনো নড়াচড়া নেই। হৃদয়ও ইচ্ছে করেই নিশ্চুপ। সময় অনেকটা কেটে যেতেই অবশেষে হৃদয় নিজেই একটু ঝুঁকে তরীর কানে হালকা ফু দিয়ে, ফিসফিস করে বলল—
__এইভাবেই আজ সারারাত থাকতে চাইছিস নাকি? তোর ইচ্ছে থাকলে আমার কিন্তু কোনো সমস্যা নেই।
ব্যস তরীর মনে হলো এইমুহুর্তে লজ্জায় মরে যাওয়া উচিত ওর। এতক্ষণ এইভাবে বসে ছিল ও হৃদয়ের সাথে? ভাবতেই তরী লজ্জায় মিইয়ে গেল।
হৃদয়ের সামনে এই অবস্থায় ধরা পড়ে বেচারির বুক ধড়ফড় করছে, হাঁসফাঁস করে সরতে চাইলো ও । কিন্তু সরতে পারছে না , কারণ হৃদয়ের হাত এখনো শক্ত করে জড়িয়ে আছে ওর কোমর আর পিঠে।
তরীর এই অসহায় ছটফটানি দেখে হৃদয় আলতো করে তার কপালে চুমু এঁকে দিল। পরপর নরম গলায় নরম বলল—
__শান্ত হ।
অদ্ভুতভাবে তরী সত্যিই শান্ত হয়ে গেল। যেন ওই একটুখানি শব্দই ওর সব অস্থিরতা থামিয়ে দিল। তারপর মিনমিনে স্বরে বলল তরী,
__কিভাবে নামব! নামতে পারছি না তো?
হৃদয় এবার একটু সরে বসল তরীর থেকে। তারপর ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল এবং সাবধানে তরীকে তুলে নামিয়ে দিল।
তরীর পা মাটিতে ছুঁতে দেরি ওর দৌড়ে পালাতে দেরি নেই। হৃদয় স্থির দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন।
তার দৃষ্টি তরীর দূরে সরে যাওয়া পিঠের উপর আটকে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল সেই চেনা বাঁকা হাসি।
অতঃপর ফিসফিস করে বলল সে—
__এইবার তোর পালা, বাবুই। দেখি তুই কি করতে পারিস আমাকে পাওয়ার জন্য। এখন থেকে তোর সামনে এক নতুন আমাকে দেখবি তুই বাবুই।
হৃদয়ের কণ্ঠে কোনো রাগ ছিল না ছিল শুধু এক অদ্ভুত নিশ্চয়তা।
হৃদি ভেবেছিল আজ হৃদয় ওকে আর তরীকে হয়তো কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখবে সেই ভয়েই হৃদি গুটিগুটি হয়ে ড্রয়িং রুমে, কিন্তু হঠাৎ তরীকে হতদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে হৃদি ভড়কে গেল।
ঐদিকে তাহির অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তরীর দিকে। তরী কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দৌড়ে উপরে চলে গেল। তরী যাওয়ার কিছুক্ষন পরেই হৃদয়কে আসতে দেখা গেল। তাহির ভেবেছিল হৃদয় খুব যদি রেগে যায়, তখন সে হৃদয়কে বুঝাবে। তাই সে থেকে গেছে। নয়তো হৃদিকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেত। কিন্তু তাদের ভাবনায় এক বালতি জল ঢেলে দিয়ে হৃদয় বেশ ফুরফুরে মেজাজে ড্রয়িং রুমে আসলো। একপলক তাহিরের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে শান্ত ভাবে উপরে চলে যাচ্ছে সে । পিছনে ফেলে গেল বিস্মিত হৃদি এবং তাহিরকে ।
চলবে।
কেমন যেন খাপছাড়া হয়েছে লেখাটা।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৬
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৬
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৮