নবরূপা
পর্ব_৭
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
বসুন্ধরা সিটি কমপ্লেক্সে এসে গাড়ি থেকে সবাইকে নামিয়ে ইরফান গাড়ি পার্ক করতে গেলো। ইনায়া দাদির কোলে, তামান্না বোরখা পড়ে মাথায় সাদা হিজাব বেঁধেছে। মুখে মাস্ক ছিল এতক্ষণ, মাত্রই খুলে নিলো। বেশিক্ষণ মাস্ক পড়লে দমবন্ধ হয়ে যায় তার। মলে ঢুকেই ইয়াহিয়া কবির কল করল নাঈমুল ইসলামের নম্বরে।
—” হ্যাঁ, বেয়াই সাহেব! কোথায় আপনারা? আমরা তো পৌঁছে গেলাম।”
নাঈমুল ইসলাম ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,
—” আমরা তো সেকেন্ড ফ্লোরে আছি। আপনি কোথায়?”
—” আমরা মাত্র ঢুকলাম। এইযে গ্রাউন্ড ফ্লোরে আছি।”
বলতে বলতেই ইয়াহিয়া কবির দেখতে পেলেন নাঈমুল ইসলাম কে। নাঈমুল ইসলাম ফোন কানে নিয়েই চারপাশে তাকাচ্ছিলেন। হঠাৎই চোখে পড়লো ইয়াহিয়া কবিরকে। ভিড়ের মধ্যেও চেনা মুখ আলাদা করে ধরা পড়ে—তিনি হেসে হাত নাড়ালেন। ফোন কেটে সিঁড়ির ধারে এসে দাঁড়ালেন। ইয়াহিয়া কবির সামনে এগিয়ে এসে দু’হাত মেলে ধরলেন।
—” আরে বেয়াই সাহেব! অবশেষে দেখা হলো!”
নাঈমুল ইসলাম হালকা হেসে বললেন,
—” আপনাদের আসতেই একটু দেরি হলো ভাবলাম। মল তো শুক্রবারে যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে যায়।”
আয়শা বেগম পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন,
—” ভিড় থাকবেই তো, বিয়ের বাজার বলে কথা!”
এই কথা শুনে নাঈমুল ইসলাম হাসলেন।
—” সে আর বলতে! দোকানে দোকানে ঢুকছি, কিন্তু নীহারিকার মায়ের পছন্দের শেষ নেই।”
রাবেয়া বানু এবারে আয়েশা বেগমের সামনে গিয়ে ভদ্রতার সুরে নিচু গলায় বললেন,
—” ভালো আছেন তো আপা?”
আয়েশা বেগম হাত ধরলেন রাবেয়ার। অবাক হয়ে বললেন,
—” হায় আল্লাহ! আপা আপনি এখনো আমার সাথে এত দুরত্ব নিয়ে কথা বলছেন কেনো? এখন তো একটু বন্ধুসুলভ সম্পর্কে কথা বলুন!”
সবাই হেসে ফেলল আয়েশা বেগমের কথায়। রাবেয়াও হাসলেন একটু। নাঈমুল ইসলাম এবারে বললেন,
—” ও একটু ওরকমই। অনেক ইন্ট্রোভার্ট! তবে ঠিক হয়ে যাবে আস্তে আস্তে।”
রাবেয়া বানু এবারে তামান্না কে দেখলেন। আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—” ও কে আপা?”
তামান্না একটুখানি গুটিয়ে এলো। আয়েশা বেশ স্বভাবসুলভ হেসে বললেন,
—” আমার ভাগ্নি। তবে আমার আরেক মেয়ে বলা যায়। ইয়াশার সমবয়সী। আমাদের বাড়িতেই থাকে।”
তামান্না নিচু স্বরে সালাম দিলো। রাবেয়া বানু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসলেন, এরপর ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
—” নানুমনি কেমন আছে? মুখে হাসি নেই কেনো?”
ইয়াহিয়া কবির বললেন,
—” ওর বাবা থাকলে সবসময়ই ভালো থাকে। খিলখিল করে হাসে বাবার সাথে।”
আরেকদফা কথাবার্তা চলল তাদের মাঝে। ইয়াশার সাথে ইতোমধ্যে তাদের দেখাসাক্ষাৎ হয়ে গিয়েছে। প্রায় এক ঘন্টা আগেই জ্যোতি, আর নীহারিকার সাথে যোগ দিয়ে ইয়াশাও শপিং মলে ঘুরছে। তারা তিনজনই একসাথে রয়েছে। কথাবার্তা চলাকালীন এক পর্যায়ে ইরফান গাড়ি পার্ক করে এসে তাদের কাছে যোগ দিলো।
—”আসসালামু আলাইকুম, আংকেল।”
নাঈমুল ইসলাম স্নেহভরে ইরফানের কাঁধে হাত রাখলেন।
—”ওয়ালাইকুম সালাম। তোমার তো আজকাল খুব ব্যস্ত সময়, শুনছি!”
ইরফান হালকা হাসলো।
—” জ্বি বছরের শেষ দিক তো। কলেজে একটু ব্যস্ততা চলছে।”
ইয়াহিয়া কবির চারপাশে তাকিয়ে বললেন,
—” চলুন তাহলে। কথা তো অনেক হবে, কিন্তু দোকানগুলোও আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
নাঈমুল ইসলাম সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে বললেন,
—”ঠিক বলেছেন। আগে কেনাকাটা, পরে বসে চা।”
চারপাশে মানুষের কোলাহল, আলো-ঝলমলে দোকান, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দুই পরিবার—হাসি, কথাবার্তা আর আসন্ন সম্পর্কের উষ্ণতায় বসুন্ধরা সিটির ভিড়টাও যেন একটু আপন হয়ে উঠলো।
ইয়াশা কে কল করতেই জ্যোতি আর নীহারিকাও সেকেন্ড ফ্লোরে চলে এলো। রাবেয়া বানু এবং আয়েশা বেগম ইতোমধ্যে নিজেদের মত কেনাকাটা করা শুরু করেছে। পছন্দ করে করে রেখেও দিচ্ছে। সিঁড়ির কাছটায় তামান্না ইনায়াকে কোলে নিয়ে ফিডার খাওয়াতে লাগলো। এর মধ্যেই সে সামনে তাকাতে দেখলো ইয়াশার সাথে দুজন মেয়ে, একজন টপস, ফর্মাল প্যান্ট এবং অপরজন অফ হোয়াইট থ্রি-পিস পরিহিত, তিনজনই এগিয়ে আসছে। পোশাক দেখে তামান্না বুঝে ফেলল হবু বউ কে! সে একটুখানি সংকুচিত হলো। আরেকবার তাকিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলো। না চাইতেও মুখ ফঁসকে বিড়বিড় করে বলে উঠলো, – শ্যামলা!
তামান্না গলা খাঁকারি দিলো। ছি ছি! এভাবে কারো গায়ের রঙ নিয়ে কথা বলতে হয় না। ঠোঁট ভিজিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো তামান্না। ইয়াশা তামান্নার কোলে ইনায়াকে দেখে দৌঁড়ে এলো তার কাছে। জ্যোতি এবং নীহারিকাও এগিয়ে এলো। ইয়াশা এসেই ইনায়ার গালে চুমু খেয়ে নীহারিকার বাহু জড়িয়ে নিয়ে এসে দেখিয়ে বলল,
—” ভাবি, এইযে দেখো, আমাদের ইনায়া।”
নীহারিকা প্রথমে তামান্নার দিকে তাকালো। তাকে সালাম দিয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে আদর করে দিলো। ইয়াশা অস্থির ভঙ্গিতে বলল,
—” ভাইয়ারা সবাই মনে হয় দোকানে ঢুকেছে। জ্যোতি ভাবিকে নিয়ে এখানে থাকো, ইনায়ার সাথে মিট করো। আমি চট করে গিয়ে ফট করে ভাইয়াকে ডেকে আনি।”
নীহারিকা আটকানোর পূর্বেই জ্যোতি সত্যি চট করে চলে গেলো। তামান্না নীহারিকার দিকে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আপনিই নীহারিকা?”
—” জ্বি। আপনাকে ঠিক চিনতে পারলাম না। আপনি কি…
নীহারিকার বলার আগেই তামান্না ঠোঁট চেপে হেসে ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—” আমি তামান্না। ইনায়ার মামণি।”
নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই তামান্না আবারো ফিক করে হেসে বলল,
—”মানে আমি ইনায়ার ফুফু। ইরফান ভাই আমার খালাতো ভাই। “
নীহারিকা বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে হাসলো। জ্যোতি ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
—” তার মানে আপনি নীহুর ননদ হবেন, রাইট? লাইক ইয়াশা?”
তামান্না জোরপূর্বক হেসে ইনায়ার পিঠে হাত রেখে বলল,
—” জ্বি।”
জ্যোতি এবারে নীহারিকার বাহু ঝাঁকিয়ে বলল,
—” ভাই কি কিউট বাচ্চাটা! এই নীহু, ওকে কোলে তোল না রে !”
তামান্না কেমন যেন একটুখানি থমকে গেলো, কিন্তু পরে সহমত প্রকাশ করলো। নীহারিকা একটুখানি ভয় নিয়ে এবারে প্রথমবারের মত হাত বাড়িয়ে দিলো ইনায়ার দিকে। ছোট্ট ইনায়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। অপরিচিত কাওকে হাত বাড়িয়ে দিতে দেখে বাচ্চাদের স্বভাব অনুযায়ী সে তামান্নার গলা জড়িয়ে ধরে মুখ ঘুরিয়ে নিলো মুহুর্তেই। নীহারিকার মুখের হাসি নিভে গেলো। তামান্না আমতা আমতা করে বলল,
—” আসলে ও যার-তার কোলে ওঠে না।”
নীহারিকা স্বাভাবিক দৃষ্টিটা বদলে নিলো, ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
—” যার-তার বলতে?”
তামান্না একটুখানি মিইয়ে গেলো। নীহারিকার চোখের দিকে তাকাতেই বুঝলো মেয়েটাকে যতটা সরল মনে করছে, হয়তো ততটাও না। নইলে মুখের উপর ফট করে সোজাসুজি প্রশ্ন টা করতো না। তামান্না বুঝলো ভুল কথা বলেছে সে। তাই কথা ঠিক করে হেসে বলল,
—” না মানে, অপরিচিত মানুষদের কোলে ওঠে না। বোঝেনই তো ছোট মানুষ!”
নীহারিকা এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো। তামান্নার কথায় রাগও করল না, অপমানবোধও করলো না—বরং তার চোখে হালকা একটা কৌতুকের ঝিলিক দেখা গেল। কিছুক্ষণ সরু চোখে ইনায়াকে দেখে নীহারিকা ধীরে নিজের ব্যাগটা খুললো। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। তামান্না ঢোক গিলে দেখতে থাকলো। এরমধ্যেই নীহারিকা ভেতর থেকে ছোট্ট একটা রঙিন মোড়কের চকলেট বের করলো। চোখ তুলে তামান্নার দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
—” ও কি চকলেট পছন্দ করে?”
তামান্না একটু অবাক হলো। বলল,
—” আ… খুব একটা না। মানে, এখনো ঠিক অভ্যাস করাইনি। ইরফান ভাই তো সামান্য চিনি টুকুও খেতে দেয় না। চকলেট তো কখনো দেখেইনি ইনায়া।”
নীহারিকা আর কিছু বলল না। হেসে নিলো, বিড়বিড় করে বলল,—তাহলেই হবে। ও চকলেটটা খুললো না, শুধু হাতের তালুতে নিয়ে ইনায়ার সামনে একটু নাড়ালো। এরপর আঙুল দিয়ে ধরে ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিলো।
—” আমার ইনামনি কি চকলেট নিতে চায় হুম?”
তামান্না অবাক হয়ে তাকালো। ইনামনি? এই ডাক তো সে ব্যবহার করে। এই নামে তো ইনায়াকে সে ডাকে। নীহারিকা এই নামে কেনো ডাকলো? তার ভাবনা বিস্তৃত হলো৷ ইনায়া এতক্ষণ গলা জড়িয়ে ধরে ছিল তামান্নার। কিন্তু রঙিন কাগজটা চোখে পড়তেই কৌতূহলী হয়ে তাকালো। ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দিলো নেয়ার জন্য। নীহারিকা খুব সাবধানে চকলেটটা ইনায়ার আঙুলের কাছে ধরলো। স্পর্শ করতেই ইনায়া হেসে উঠলো—সেই নিখাদ, নির্ভেজাল শিশুহাসি।
তারপর যা হলো, তামান্না প্রস্তুত ছিল না।
ইনায়া নিজেই ধীরে ধীরে তামান্নার গলা থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। এরপর নীহারিকার মিষ্টি হাসি দেখে তার বাড়িয়ে দেয়া হাতে নিজের ছোট্ট দু’হাত ছুঁড়ে দিলো নীহারিকার দিকে। এক মুহূর্তের দ্বিধা থাকা সত্ত্বেও নিঃশব্দে নীহারিকার কোলে উঠে পড়লো।
তামান্নার বুকের ভেতর কেমন করে উঠলো। এক মুহুর্তে কি হয়ে গেলো বুঝলো না। কিন্তু সত্যিই খুব অবাক হলো। নীহারিকা যেন এই মুহূর্তটাকে খুব সাবধানে সামলালো। কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কোনো বিজয়ের হাসি নেই। সে ইনায়াকে শক্ত করে ধরল না, আবার আলগাও করল না। একদম ঠিক যতটা দরকার। নরম স্বরে বলল,
—” চকলেট টা দেখতে তোমার মতই কিউট। তাই না?”
ইনায়া বড় বড় চোখ করে এবারে তাকিয়ে রইলো নীহারিকার দিকে। ছোট্ট আঙুলে এখনও চকলেটের মোড়ক ধরা। জ্যোতি বিস্ময়ে বলে উঠলো,
—” ও মাই গড! ও তো নিজেই কোলে উঠে গেল! ব্যাপার টা জোস তো!”
নীহারিকা হালকা হেসে বলল,
—” যার-তার কোলে না যাওয়াটা স্বাভাবিক, আর স্নেহ পেলে তা প্রত্যাখ্যান করাটা বাচ্চাদের কাছে অস্বাভাবিক।”
তামান্না চমকে তাকালো। নীহারিকার দিকে তাকিয়ে বুঝলো মেয়েটা মোটেই তাক৷ অপমান করছে না। বরং আন্তরিক একটা হাসি দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। সে এবারে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। এই শিশুটাকে সে কোলে বড় করেছে। রাত জেগে খাইয়েছে। অথচ এখন, এবং ভবিষ্যতে এই নতুন মানুষটার কোলে, এত স্বাভাবিকভাবেই থাকবে। নীহারিকা ইনায়ার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিলো।
তামান্না গিলে ফেললো একটা দীর্ঘশ্বাস। জ্যোতি এবারে নীহারিকার কোলে থাকা ইনায়ার সাথে বাচ্চাদের মত করে কথা বলতে থাকলো। নীহারিকা বলে উঠলো,
—’ জ্বালাস না ওকে জ্যোতি। ধীরে ধীরে ঠিক চিনে নিবে সবাইকে।”
এই “ধীরে” শব্দটা তামান্নার কানে অন্যরকমভাবে বাজলো। মনে হলো, ঠিক এইভাবেই, ধীরে ধীরে,
কেউ একজন তার জায়গাটা নিচ্ছে। দায়িত্বটা, মনোযোগটা। আর হয়তো, ভবিষ্যতের অধিকারটাও।
তামান্না চোখ সরিয়ে নিলো। নিজের অজান্তেই আঙুল শক্ত করে চেপে ধরলো হিজাব। আবার হঠাৎ করেই মনে হলো, এসব ভাবনা টা ভুল। তার উচিত না এসব ভাবা৷ তবে সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপারটা হলো, তামান্না সবকিছু দেখছে, করছে খুব সুন্দরভাবে, খুব ভদ্রভাবে, এমনভাবে, যাতে অভিযোগ করারও কোনো জায়গা নেই।
ইয়াশা এরমধ্যেই ইরফানের বাহু চেপে ধরে রীতিমতো দৌঁড়ে তাকে নিয়ে এলো সিঁড়ির কাছে। দুজনেই অবাক হয়ে গেলো ইনায়াকে নীহারিকার কোলে দেখে। ইয়াশা তো অবাক হয়ে বলেই ফেলল,
—” মাই গড! কী দেখছি আমি? ভাইয়া তোমার প্রিন্সেস কবে থেকে তুমি ছাড়া অন্য কারো কোলে যাওয়া শুরু করলো? এ কি অবস্থা! ভাবিকে না চিনেই!”
ইরফানও হতবাক হয়েছে। প্রথমত ছোট বাচ্চারা এমনিতেই অপরিচিত কারো কোলে যেতে চায়না, জোর করে দিলে আবার হাতপা ছোঁড়াছুড়ি করে কান্না শুরু করে। দ্বিতীয়ত, ইনায়া এসব বিষয়ে আরো সেনসিটিভ! অথচ নীহারিকার কোলে কি সুন্দর রয়েছে। নীহারিকা ইরফানকে দেখে ইনায়াকে আরেকটু শক্ত করে ধরলো। জ্যোতি এবারে ইয়াশাকে কিছু একটা ইশারা করতেই ইয়াশা বুকের ডান পাশে চেপে ধরে মুখ কুঁচকে বলতে থাকলো,
—” ও মাই গড, আমার হৃদয় ব্যাথা করছে ভাইয়া। আমার কলিজা ভেঙে যাচ্ছে। হৃদপিন্ড কাঁপছে। আমার এক্ষুনি জ্যোতি কে নিয়ে পাতালে আই মিন হাসপাতালে যাওয়া দরকার!”
ইরফান চোখমুখ কুঁচকে তাকালো তার ছোট বোনের দিকে। বুকের ডান পাশে হাত রেখে হৃদপিণ্ড ব্যাথা করার কথা বলছে। কিন্তু ইরফান এও বুঝলো তার বোন কেনো এই নাটক করছে। তাই চুপ থেকে ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করলো। ইয়াশার অভিনয় নতুন না, কিন্তু আজকে ওর নাটকটা একটু বেশিই জমে উঠেছে। নীহারিকা কিছুটা বিভ্রান্ত, কিছুটা মজা নিয়ে তাকিয়ে আছে—কী হচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। ইয়াশা হঠাৎ করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে বলল,
—” ইনায়া, মামণির দিকে তাকাও! দেখো, তোমার ফুফু অসুস্থ! এই যে দেখো, চোখে অন্ধকার দেখছি আমি!”
জ্যোতি সঙ্গে সঙ্গে সুযোগ লুফে নিলো। মাথা দুলিয়ে নাটকীয় গলায় বলল,
—” আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওর হার্ট উইক। ক্লাস টেনের খাতা কাটার সাইড ইফেক্ট! ইরফান ভাইয়া যে কেন ওকে দিয়ে এসব খাতা কাটালো!’
তামান্না এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। কেমন যেন নতুন নতুন আনন্দ দেখতে পেলো সবার মধ্যে। হঠাৎ জ্যোতি তার হাত ধরে টান দিলো।
—” চলো চলো, তামান্না আপু! আপনি তো আছেনই আমাদের দায়িত্বশীল মানুষ। আমাদের এই রোগীটাকে একটু বাঁচান।”
তামান্না প্রথমে থমকে গেল। তারপর পরিস্থিতিটা বুঝে নরম করে হেসে ফেলল। চোখ একবার ইনায়ার দিকে গেল—নীহারিকার কোলে নিশ্চিন্ত, নিরাপদ। বুকের ভেতরের ভারটা চেপে রেখে সে বলল,
—” আচ্ছা বাবা, চলো। এখানে নাটক করো না।”
ইয়াশা তখন ইরফানের দিকে ফিরে একদম সিরিয়াস মুখ করে বলল,
—” ভাইয়া, যদি আমরা ফিরে না আসি, জানবে, তোমার বোন শহীদ হয়েছে ভালোবাসার যুদ্ধে।”
ইরফান বিরক্ত মুখে বলল,
—” নাটক কম কর। যা ভাগ।”
এই “যা” বলাটাই ইয়াশার দরকার ছিল। সে আর অপেক্ষা করল না। জ্যোতির হাত ধরে, আর তামান্নাকে প্রায় টেনে হেঁচড়ে সিঁড়ির দিক থেকে দূরে নিয়ে যেতে লাগল। যেতে যেতে আবার পেছন ফিরে চিৎকার করে বলল,
—” ভাবি, ভাইয়ার খেয়াল রাখবেন! আমরা কিন্তু নজর রাখছি!”
জ্যোতি হেসে যোগ করল,
—” একদম প্রাইভেসি! ফুল প্রাইভেসি!”
তিনজনের কোলাহল ধীরে ধীরে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। হঠাৎ করে জায়গাটা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে উঠলো। ইরফান আর নীহারিকা—দুজনেই একটু অপ্রস্তুত। মাঝখানে নীহারিকার কোলে ইনায়া, ছোট্ট হাত দিয়ে তার ওড়নার প্রান্ত আঁকড়ে ধরে আছে।
নীহারিকা নরম স্বরে বলল,
—” ওরা খুব… প্রাণবন্ত।”
ইরফান হালকা হাসলো।
—” হ্যাঁ। বিশেষ করে ইয়াশা। সুযোগ পেলেই নাটক।”
একটু থেমে ইনায়ার দিকে তাকালো সে। আশ্চর্য! মেয়েটা আজ ওকে দেখেও কোলে আসতে চাইছে না কেনো? চকলেট কি এতই পছন্দ? ইরফান হেসে বলল,
—” ও সাধারণত এভাবে থাকে না।”
নীহারিকা মাথা নুইয়ে ইনায়ার কপালে হালকা চুমু দিলো।
—“সম্ভবত আজ ওর মন ভালো।”
কথাটার ভেতরে কোনো দাবি নেই, কোনো অহংকার নেই। তবু ইরফানের মনে কোথাও একটা নরম অনুভূতি ছুঁয়ে গেল। আর দূরে, ভিড়ের আড়ালে হাঁটতে হাঁটতে তামান্না একবার পেছনে তাকালো।
দেখলো—তিনজন একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। একটা ছবি, যেটা ভবিষ্যতে আরও স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সে চোখ ফিরিয়ে নিলো।নিজেকে বোঝালো—এটাই ঠিক। তবু বুকের ভেতরটা হালকা করে খালি হয়ে এলো।
চলবে…
আগামী দিন শ্রাবণ ধারা সিজন ২ আসছে.. 😩 আজ বিইউপি এর এক্সাম চলছে৷ তাই একটু বিজি আছি।
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা গল্পের লিংক