নবরূপা পর্ব ১
প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে যে আবারো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে তা ভাবেনি ইরফান। এমনকি সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিল আর কখনো বিয়ে করবে না। মৃত স্ত্রী তাহিয়ার স্মৃতি ও তার তিন বছরের সন্তান টা নিয়েই একটা জীবন কাটিয়ে দেবে।
কিন্তু সমাজ সামাজিকতা তো ভিন্ন। সমাজ বলে, পুরুষ কখনো একা চলতে পারে না। শুধু তারা কেনো? সত্যি বলতে, মানুষ সামাজিক জীব। তারা কেওই একা বসবাস করতে পারে না। স্বাভাবিক জীবনের জন্য সঙ্গী প্রয়োজন। এসব ইরফান জানে। তবুও জেদী মনে সে ভেবেছিল যে আর বিয়ে করবে না। কিন্তু, হার মানতে হয়েছে তাকে।
নিজের জন্য নয়, তার মেয়ে ইনায়ার জন্য। একটা তিন বছরের বাচ্চা, মা ছাড়া কীভাবে বড় হবে? কীভাবে থাকবে? বাচ্চা লালনপালন করা কখনো একা বাবার পক্ষে সম্ভব হয়না। ব্যতিক্রমী হলেও না। মা মা-ই হয়। অন্তত ইনায়ার একটা রঙিন শৈশব ও তার ভবিষ্যতের জন্য হলেও ইরফানকে একটা বিয়ে করতে হবে এসব বুঝিয়েই পুরো পরিবার মিলে রীতিমতো জোরপূর্বকই তাকে বিয়েতে রাজি করিয়েছে।
পেশায় একজন কলেজ লেকচারার ইরফান কবির। বাবা ইয়াহিয়া কবির, মা আয়শা বেগম ও ছোটবোন ইয়াশা কবিরকে নিয়ে ‘কবির মহল’ এ বসবাস করে ইরফান। বিয়ে করার পরে তাহিয়াও পরিবারের সদস্য হয়েছিল, এক বছরের মাথায় ইরফানের মেয়ে ইনায়াও পৃথিবীর আলো দেখে। মোটামুটি এই ছিল তার পরিবার। কিন্তু হুট করে এক ধাক্কায় পুরো পরিবার কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়। ছোট্ট একটা দূর্ঘটনায় সবকিছু শেষ। ইরফান কবির হয়ে যায় একা।
আজ শুক্রবার। ছোটবোনকে কোচিং সেন্টারে নামিয়ে দিয়ে পাত্রী দেখতে এসেছে ইরফান। এই পর্যন্ত দুই সপ্তাহের দুটো শুক্রবারে দুটো পাত্রী দেখলো সে। কিন্তু প্রতিবারে হতাশ হয়েছে। নাহ। লম্বা চওড়া, সুঠামদেহী সুদর্শন ইরফানকে কোনো পাত্রী প্রত্যাখ্যান করেনি। সে নিজেই করেছে। এর বিরাট কারন হলো, সে নিজের জন্য স্ত্রী খুঁজছে না, তার মেয়ে ইনায়ার জন্য মা খুঁজছে। আর একটি মেয়ের মাঝেও সে মনের মত মায়াময়ী ভাব, স্নিগ্ধ স্বভাব, সরলতা, বিনয়ী স্বভাব দেখেনি।
আজ আবারো ইয়াহিয়া কবির ও আয়েশা বেগম ইরফানকে নিয়ে পাত্রী দেখতে এসেছে। মেয়ের বাবা নাঈমুল ইসলাম স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মা রেবেকা বানু গৃহিনী। অত্যন্ত আঁট পরিবার, স্বচ্ছল নয়। মধ্যবিত্ত বলা যায়। মেয়ের বড় ভাই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে, একমাত্র ছোট বোনকে বিয়ে দেয়ায় মত ছিল না। তাও এমন দ্বিতীয় পক্ষের সাথে। কিন্তু বাঙালি মেয়েদের সবচেয়ে সাধারণ এক খুঁত হলো গায়ের রঙ।
কথাবার্তা এগোনোর পর ইয়াহিয়া কবির বিনয়ী ভাবে বললেন,
—” তাহলে মেয়ে কে দেখি আমরা।”
নাঈমুল ইসলাম মুখের হাসি বিস্তৃত করলেন। তড়িঘড়ি করে স্ত্রীর দিকে ইশারা করে মেয়েকে আনতে বললেন। ভদ্রমহিলাও দেরি করলেন না। দ্রুত পা চালিয়ে ঘরে গেলেন। এর মধ্যে পাত্রীর বড় ভাই নিলয় ইরফানকে উদ্দেশ্য করে বলল,
—” ভাইয়া আপনার মেয়েকেও নিয়ে আসতেন।”
ইরফান সচরাচর হাসে না। বেশ ঠান্ডা একটা মানুষ সে। এবারেও মুখে হাসি আনলো না। মোটামুটি একটা ভদ্রতা নিয়ে বলল,
—” এসবে ওকে আনতে চাইনি। একদম সব কিছু ঠিকঠাক হওয়ার পরেই জানাবো ভেবেছি। বাচ্চা মানুষ! না জানি কী বুঝবে।’
নিলয় মাথা নাড়লো। সে নিজেও জানে ব্যাপার টা। শুধু একটা পরীক্ষা করতে চাইছিল ইরফান কেমন প্রতিক্রিয়া দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই চুড়ির রিনঝিন শব্দ কানে এলো ইরফানের। চোখ সরু করে মাথা নিচু করলো সে। এর আগেও দুটো পাত্রীর দিকে সে প্রথমে তাকায়নি। এবারেও আয়শা বেগম নিজে থেকেই মেয়েটির কাছে গিয়ে হাত ধরলেন। জিজ্ঞেস করলেন মিষ্টি সুরে,
—” নাম কী তোমার মা?”
মেয়েটি বোধহয় চমকে গেলো। আশেপাশে তাকিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলল। অসহায় নেত্রে তাকালো বাবার দিকে। নাঈমুল ইসলাম পরিস্থিতি সামলিয়ে হেসে বললেন,
—” আমার মেয়ে অনেক লাজুক। নতুন মানুষদের সাথে ঠিক কথা বলতে পারে না। কদিন গেলেই অবশ্য ঠিক হয়ে যাবে।”
নিলয় হেসে যোগ করল,
—” এমনিতে আমার বোনের কথার সাথে কেও পারে না। ঝগড়া করতে ওস্তাদ!”
বলেই বিস্তৃত হাসলো নিলয়। আয়েশা বেগমও হাসলেন। বললেন,
—” বড় ভাইয়েরা সবসময় এভাবেই বলে। তোমার কাছে আমি আমার হবু বউমার বিষয়ে কোনো সমালোচনা শুনবো না।”
রেবেকা বানুও খুশিতে হাসলেন। সবাই যেন নীরবেই একে অপরের মতামত বুঝিয়ে দিলো। আয়েশা বেগম নিজের ব্যবহারেই বুঝিয়ে দিলেন যে তার পাত্রী পছন্দ হয়েছে। নাঈমুল ইসলাম বুদ্ধিমান লোক, তিনিও বুঝেছেন ব্যপারটা। এখন শুধু ইরফানের মতামত নেয়ার পালা। কিন্তু ইরফান এখনো মাথা তুলে দেখেনি মেয়েটাকে। সে নিজের জুতোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে অপলক। আয়েশা বেগম চিনেন নিজের ছেলের এই ব্যবহার। কেনো করছে তাও জানেন। আর কখন চোখ তুলে তাকাতে পারে তাও অবগত তার।
সবাই এটা ওটা বলার পরে ইয়াহিয়া কবির ট্রে থেকে চা নিলেন। ইরফানও নিলো। এক চুমুক চা খেয়ে ভীষণ আবেশে খুশি হয়ে ইয়াহিয়া কবির জিজ্ঞেস করলেন,
—” চা কি তুমি বানিয়েছো মামুনি?”
অফ হোয়াইট শাড়ি পরিহিত মেয়েটি এবার তাকালো চোখ তুলে। হয়তো ভদ্রলোকের “মামুনি” সম্বোধনে পুলকিত হলো। সাহস পেলো ভীষণ। একটুখানি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
—” জ্বি। “
—” বাহ চমৎকার। দারুণ বানিয়েছো। তুমি তো চা খাইয়ে আমার মন জিতে নিলে।”
বলেই হাসলেন ইয়াহিয়া। মেয়েটি এবারে এক পলক দেখলো ভদ্রলোকের পাশে বসা কালো শার্ট ও ফর্মাল প্যান্ট পরিহিত মানুষটাকে। মাথা নিচু করে ভাবুক লোকটাকে দেখেই যে কেও গম্ভীর বলবে। এক দেখাতেই চোখ নামালো মেয়েটা।
আয়েশা বেগম একটুখানি মন খারাপ করে জিজ্ঞেস করলেন,
—” এ কি বৈষম্য! তুমি কি কফি বানাতে পারো না মা? আমি তো চা খাই না। তোমার হাতের দারুণ কফি কি খেতে পারব না?”
এ পর্যায়ে মুখ কালো করে ফেলল মেয়েটা। একটুখানি বিভ্রান্ত হলো। কিন্তু পরক্ষণেই বিনয়ী সুরে আয়েশা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
—” কফি খুব একটা ভালো বানাতে পারি না। তবে চেষ্টা করব, আপনি বললে আমি ঠিক শিখে নেব। অল্প একটু শিখিয়ে দিলেই পারব বোধহয়। “
এ পর্যায়ে অবশেষে চোখ তুলে তাকালো ইরফান। সুরেলা মিষ্টি কন্ঠের মালকিনকে দেখার শখটা আর ফেলতে পারলো না। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলো। এক পলকে দেখলে যে কেও মেয়েটিকে শ্যামলা বা কালো বলে তাচ্ছিল্য করতেই পারে। তবে ইরফান সেটা করলো না। ভারি মনোযোগ দিয়ে দেখলো শ্যামরঙা মেয়েটার টানা টানা চোখদুটোয় বড় বড় পাপড়ি, ঠোঁটে গাঢ় করে দেয়া লাল লিপস্টিক, গোল মুখ, মাথায় এক হাত ঘোমটা, যদিও এখন একটু উঠিয়েছে। অফ হোয়াইট শাড়ি পড়াতে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে। সর্বোচ্চ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েছে ইরফান, তারপরই চোখ নামিয়েছে।
এদিকে মেয়েটির কথা শুনে আয়েশা বেগম খুশিতে আঁটখানা হলেন। নাঈমুল ইসলামও ঠোঁট ভিজিয়ে প্রস্তুত হলেন, না জানি কী হবে সবশেষে। আয়েশা বেগম নিজে থেকেই বললেন,
—” ইরফানের বাবাকে চা খাইয়ে মন জিতে নিয়েছে। আর আমার মন জিতে নিলো কথা বলে। চমৎকার মিষ্টভাষী আপনার মেয়ে। “
ইরফান কবির এবারে একটু নড়েচড়ে বসলো। মেয়েটার কথা বলা তারও ভালো লেগেছে। সে মানুষ চেনে খুব। তাই বুঝেছে মেয়েটা অনেক সহজ-সরল, মিশুক, আর লাজুক একটা মেয়ে। যদিও নিজেকে নিয়ে মেয়েটা বোধহয় অপ্রস্তুত, বারবার গালে গলায় হাত বুলোচ্ছে। ইরফান অতকিছু দেখলো না। যেমন স্বভাবের মেয়ে দরকার ছিল, তেমন পেয়েছে বোধহয়।
ছেলের আচরণে আয়েশা বেগম কিছুটা পজিটিভ ইশারা পেলেন। তাই নিজে থেকেই এবারে বলে উঠলেন,
—” এখন আমরা আর কী কথা বলব। সংসার তো আমরা করব না তাইনা? ছেলে মেয়ে দুটো তাহলে নিজেদের মধ্যে একটু কথা বলে আসুক, কী বলেন বেয়াইন! “
রেবেকা বানু নিতান্তই একজন পাকা গিন্নি। স্বামীর কথা ব্যতিত তিনি কোনো কাজই করেন না। তবুও এবারে আঁচলের ওপাশ থেকে বললেন,
—” জ্বি অবশ্যই। “
নাঈমুল ইসলামও সম্মতি দিলেন। ইয়াহিয়া কবির এবারে ইরফানের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
—” যা তাহলে। “
নাঈমুল ইসলাম মেয়েকে বললেন,
—” ইরফানকে বড় বারান্দাটা ঘুরিয়ে দেখা যা।”
মেয়েটি মাথা এলিয়ে সম্মতি দিলো। মাথার ঘোমটা টা আরো টেনে আনলো। ইরফান দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটি হাতের ইশারায় ভদ্রভাবে তাকে সামনে এগোতে বলে। আয়েশা বেগম এবারে কিছু একটা ইশারা করতেই রেবেকা বানু তড়িঘড়ি করে এসে মেয়েকে একটু আড়ালে এনে মাথার ঘোমটা নামিয়ে দেয়। নিচু গলায় ধমক দিয়ে বলে,
—” ঘোমটা নামা। চুল ছেড়ে দে। বড় বারান্দার বাগানটা ঘুরিয়ে দেখাস, আর সুন্দর ভাবে কথা বলবি।”
বলেই তিনি মেয়ের বড় খোপা টা খুলে দেন। সাথে সাথে কোঁমড় ছাড়ানো চুলগুলো ছড়িয়ে যায়। মেয়েটা তবুও চুপ থাকে। সম্মতি দিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায়।
—” বউ মারা যাওয়ার পর আমার আর বিয়ে করার ইচ্ছেই ছিল না। এমনকি এখনো নেই। আমার পুরো জীবনটা ঘিরেই রয়েছে আমার মেয়ে ইনায়া। শুধুমাত্র তার জন্যই আবারো বিয়ের সম্মতি দেয়া। সত্যি বলতে, আমি চাই এমন কাওকে বিয়ে করতে যে আমার তিন বছরের মেয়েটা কে মায়ের অভাব বুঝতে দেবে না। আমি কম করিনা, তবুও কিছু একটা অপূর্ণ থেকে যায়। যার জন্যই এখন বিয়ের কথা।”
ইরফান কবির পকেটে হাত দিয়ে বারান্দার গ্রিল পেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজে থেকেই গম্ভীর গলায় কথাগুলো বললো। অবাক হলো মেয়েটা। বারান্দায় আসার পর লোকটা একবারো তার দিকে তাকায়নি। এমনকি কোনো কথা ছাড়াই এসব বলে থামলো। এরপর তাকালো পাশে দাঁড়ানো মেয়েটার দিকে। কোঁমড় ছাড়ানো ঘন কালো চুলগুলোর মাঝে থাকা ছোট্ট আদুরে মুখটা দেখে ইরফানের মনে হলো সে কোনো বাচ্চার সাথে কথা বলছে। কিন্তু পরক্ষণেই তার মায়া হলো। এভাবে হয়তো প্রথমেই বলাটা উচিত হয়নি। কিন্তু ইরফান নিরূপায়। সে এসব কিছু বলা ব্যাতিত কোনো কথা আগাতে চায় না। এখন যদি মেয়েটা তাকে অভদ্র, স্বার্থপর ভাবে তাতে তার কিছু করার নেই।
ইরফানের ধারনা ভুল প্রমাণিত করে মেয়েটি এবারে নিজেও গ্রিলে আটকানো একটা ঘাসফুলের টবের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকলো,
—” তিন বছর বয়সী একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তানের বাবার পুনরায় বিয়ে করতে চাওয়ার মধ্যে অবশ্যই যৌক্তিক কোনো কারণ রয়েছে এটা আমি জানতাম। আর এসব জেনেই আমি আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। নইলে তো আপনার পরিবার আমাদের বাড়িতে আসতো না।”
ইরফান মনে মনে অত্যন্ত অবাক হলো। মুগ্ধও হলো বটে। তবে প্রকাশ করলো না। এবারে তার দিকে তাকিয়ে অতি নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো,
—” আপনার নাম কী?”
মেয়েটি এবারো নিজেও তাকালো ইরফানের দিকে। চোখাচোখি হলো। এবারে অস্বস্তি তে চোখ সরালো না। ঠোঁটে বিনয়ী ভাব এনে বলল,
—” নীহারিকা ! “
ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বেশ কৌতুহলী সুরে বলল,
—” বেশ চমৎকার। কিন্তু এখন এমন নাম পাওয়া যায় না। আপনার নাম কে রেখেছে?”
—” আমার বাবা।”
ইরফান এবারে ঠোঁট ভিজিয়ে ইতস্তত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
—” আমার একটা প্রশ্ন আছে। আপনি কিছু মনে না করলে বলতাম।”
—” জ্বি বলুন।”
ইরফান তবুও ভরসা পেল না। কথাটা জিজ্ঞেস করা উচিত কিনা তাও বুঝতে পারল না। কিন্তু সে আসলে পেটের মধ্যে কথা রাখতে পারে না। মুখের উপর উচিত কথা বলা ও মনের মধ্যে আসা সব প্রশ্ন উগলে দিতে সে পছন্দ করে। তাই কিছুক্ষণ সময় নিয়ে অবশেষে জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
—” সোজা ভাষায়, আমি বিপত্নীক। আজকাল কোনো মেয়েই এমন ছেলেকে বিয়ে করতে চায় না, যদি না তার নিজের কোনো খুঁত থাকে। আমার স্ত্রী ছিল, একটা মেয়ে আছে, এগুলো জেনেও আপনি কেনো আমায় বিয়ে করতে রাজি হলেন? “
নীহারিকা হাসলো। ঠোঁট চেপে বলল,
—” ওইযে, আপনি তো নিজেই উত্তর টা বলে দিলেন। নিজের খুঁত আছে বলেই।”
আবারো ভ্রু কুঁচকে তাকালো ইরফান। বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
—” আপনি বিধবা?”
ফিক করে হাসলো নীহারিকা,
—” নাহ।”
—” তো, আপনার কোনো বাজে অতীত আছে?”
এবারেও মাথা নাড়ালো নীহারিকা।
—” উহু।”
ইরফান সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,
—” তাহলে?”
মুখের হাসি নিভে গেলো নীহারিকার। সে ঠোঁট কাঁমড়ে কান্না আটকালো বোধহয়। কোনোমতে জোরপূর্বক হাসি এনে বলল,
—” আমি তো কালো।”
ইরফানের মনে হলো, বারান্দার বাতাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেছে। ওর জায়গায় অন্য কেও হলে নীহারিকার কথার গভীরতা বুঝতে সময় নিত। কিন্তু ইরফান সময় নেয়নি। ও বুঝেছে৷ বুঝেছে কথাটা বহুবার বলা, বহুবার শোনা, বহুবার মেনে নেওয়ার ক্লান্তি। কিছুক্ষণ কথা খুঁজে পেল না। সে এমন উত্তর আশা করেনি। কোনো অতীত, কোনো ভুল, কোনো দায়—এর কোনোটাই না। শুধু একটা রঙ।
নীহারিকা এবারে কথা বলল না। গ্রিলের বাইরে তাকিয়ে রইল। টবের ঘাসফুলটার পাতা আলতো করে ছুঁয়ে দিল আঙুল দিয়ে। এই মুহূর্তে নিজের দিকেই তাকাতে ভয় পাচ্ছে সে। ইরফান বুঝলো, এই মেয়েটা লাজুক না, অভ্যস্ত। প্রশ্নের সামনে চুপ থাকা, নিজের অনুভূতিকে গুছিয়ে বলা, এগুলো সে শিখে গেছে খুব ছোটবেলা থেকেই।
ইরফান পরিস্থিতি সামলানোর জন্য শুকনো ঢোক গিলে বলল,
—” আপনার পরিচয় টা বড্ড সংক্ষিপ্ত। আমি বোধহয় আপনাকে এত সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ননা করব না।”
নীহারিকা আগ্রহ দেখালো। জিজ্ঞেস করল,
—” তাহলে কেমন ভাবে বর্ননা করবেন?”
ইরফান পাশ ফিরে বলল,
—” বিয়ের পর বলব।”
কথা টা বলে কিছুক্ষণ তাকিয়েই রইলো ইরফান। বোঝার চেষ্টা করলো বোকা মেয়েটা তার কথার মানে বুঝেছে কিনা।
নীহারিকাও তাকিয়ে দেখলো ইরফানের চোখদুটো। কথাটার মানে না বুঝলেও চোখের ভাষা পড়ে নিল। নিজে থেকেই বলল,
—” ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। ‘কালো মেয়ে’, ‘ফর্সা হলে ভালো হতো’, ‘বিয়ে দিতে কষ্ট হবে’ এমন আরো অনেক কিছু। প্রথমে কষ্ট লাগতো। পরে অভ্যাস হয়ে যায়। মানুষ যখন কোনো কথা বারবার শোনে, তখন একসময় সেটা নিজের কথাই মনে হতে শুরু করে। অবশ্য শেষে ওটাই হচ্ছে। সবাই একটা না একটা অযুহাত দিয়ে সম্বন্ধ পাকা করে না।”
ইরফানের বুকের ভেতর কোথাও একটা টান লাগলো। তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছোট্ট ইনায়া—যে এখনো জানে না পৃথিবী কীভাবে মানুষকে আঘাত করে। নীহারিকা আবারো বলল,
— ” আজ পর্যন্ত অনেক পাত্র এসেছিল বাড়িতে। সবাই আমায় দেখার পরই… খাওয়াদাওয়া করে বিদেয় নেয়, আর পরে কল দিয়ে জানায় মেয়ে পছন্দ হয়নি। অথবা এটা ওটা অযুহাত দিয়ে পালিয়ে যায়। সোজাসুজি তো বলতে পারে না, মেয়ে কালো। তাই পছন্দ হয়নি। যতই হোক, আজও মানুষেরা কালোকে বাহ্যিকভাবে সরাসরি খারাপ বলতে পারে না। মানবিকতা দেখাতে হবে তো।”
ইরফান মনোযোগ দিয়ে শুনলো সব কথা। একটু থেমে নীহারিকা আবারো বলল,
—” তাই যখন আপনার ব্যাপারটা জানলাম। ভাবলাম, অন্তত এখানে কেউ আমাকে রঙ দিয়ে মাপবে না। আপনি স্ত্রী খুঁজছেন না, আপনার সন্তানের মা খুঁজছেন। আর আমি মা হতে ভয় পাই না। বরং হয়তো খুব ভালো মা হতেও পারি। মায়েদের তো ফর্সা, সুন্দর হতে হয়না, তাই না?”
এই কথাটায় ইরফান চমকে গেল। প্রথমবারের মতো বারান্দার বাইরে নয়, সামনে থাকা মানুষটার দিকেই তাকিয়ে রইল একটু বেশি সময়। এই দৃষ্টিতে বিচার নেই, তুলনা নেই—শুধু একটা উপলব্ধি। সরাসরি অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে গলা পরিষ্কার করল। তার কণ্ঠে আগের গাম্ভীর্যটা আছে, কিন্তু তার নিচে কোথাও একটা নরম ভাব ঢুকে গেছে। বলল,
—” না। মায়েদের ফর্সা বা সুন্দর হতে হয় না। মায়েদের শুধু মমতা থাকতে হয়।”
নীহারিকা কিছু বলল না। চোখ দুটো ভিজে উঠল, কিন্তু জল গড়াতে দিল না। এই প্রথম কেউ তার কথার জবাব দিচ্ছে যুক্তি দিয়ে নয়, বিশ্বাস দিয়ে। ইরফান আবার বলল, এবার আরও স্থির কণ্ঠে,
—” আপনি জানেন, আমার মেয়ে কী রঙ পছন্দ করে?”
নীহারিকা অবাক হয়ে তাকালো। মাথা নাড়ল।
—” না।”
—”সে আকাশ ভালোবাসে। নীল আকাশ। কখনো মেঘলা, কখনো রোদ্দুরে ভরা। আকাশকে সে কখনো জিজ্ঞেস করে না— ফর্সা কেন, কালো কেন। সে শুধু তাকিয়ে থাকে। মুগ্ধ হয়ে।”
কথাগুলো বলতে বলতে ইরফানের গলা একটু থেমে গেল। সে বুঝলো, সে আসলে মেয়েটাকে নয়, নিজেকেই বোঝাচ্ছে।
—” আমি চাই, আমার মেয়ে এমন কাউকে পাশে পাক, যাকে ও এই আকাশের মতোই ভালোবাসবে। আর মা বলে ডাকতে পারবে।”
নীহারিকার ঠোঁট কাঁপল। সে খুব আস্তে বলল,
—” আপনি কি মনে করেন, আমি পারব?”
ইরফান এক মুহূর্তও দেরি করল না।
—” আমি মনে করি, আপনি পারবেন বলেই আমি রাজি হয়েছি এখানে দাঁড়াতে।”
এই কথাটার পর বারান্দায় একটা নীরবতা নামল। ভারী না, শান্ত। বহুদিন পর কোনো কথা ঠিক জায়গায় গিয়ে বসেছে। নীহারিকা চোখ নামিয়ে ফেলল। এবার আর লজ্জায় নয়, নিজেকে সামলাতে।
—” আমি জানি না ভবিষ্যতে কী হবে! কিন্তু আমি চেষ্টা করব। মন দিয়ে। সবটুকু দিয়ে।”
ইরফান হালকা মাথা নেড়ে বলল,
—”চেষ্টাটুকুই আমার দরকার ছিল।”
ইরফান গ্রিলের বাইরে তাকাল। আকাশটা ঠিক নীল না, ঠিক ধূসরও না, দুটোর মাঝামাঝি। ঠিক যেমন নীহারিকার জীবন। আর হয়তো, সেখান থেকেই নতুন কোনো রঙের শুরু। এই বিয়ে হয়তো ভালোবাসা দিয়ে শুরু হবে না। কিন্তু বোঝাপড়া দিয়ে শুরু হলে, একদিন ভালোবাসা আসতেই পারে।
চলবে কি?
নবরূপা
পর্ব_১ ( সূচনা পর্ব )
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
📌নোট—
১. হুট করেই এমন কিছু মাথায় আসলো, তাই ভোরে উঠে লিখে ফেললাম। এমন থিমের দ্বিতীয় বিয়ে রিলেটেড আগে কখনো লেখা হয়নি। তাই কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন। ভালো না হলে, রেসপন্স না পেলে ডিলিট করে দিব। তবে ভিন্ন স্বাদের গল্প এটা। ভালো রেসপন্স আশা করছি।
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ৩
-
নবরূপা পর্ব ৭
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা গল্পের লিংক