Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৮


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ)
৪৮
দিনটা বুধবার। সকাল দশটার। সরকারি ছুটির দিন আজকে। পূজার বন্ধ পড়েছে স্কুল কলেজ। সেই সুবাদে মায়াও আজ বাসায়। তবে ঘুম থেকে উঠেছে আজ একটু দেরিতে। রোজকার মতো সকাল পাঁচটায় উঠেনি আজ উঠলো নয়টায়। অনেকটা রাত কেঁদেকুটে ঘুমানোর ফলে আজ দেরিতে উঠার মূল কারণ মায়ার। ততক্ষণে বাসাও পুরো খালি জুঁইসহ রেহেনা বেগম হসপিটালের চলে গেছে। আরাফ খান রিদ যার যার অফিসে। হেনা খান মায়াকে নিয়ে এগারোটার দিকে হসপিটালের যাবেন বলে কেউ আর মায়াকে ঘুম থেকে ডেকে তুলেনি। মায়া ঘুম থেকে রয়েসয়ে উঠে নাস্তা করলো ফুরফুরে মেজাজে। রাতের ঘটনা দিব্যি ভুলে বসে আছে এমনটা নয়। সে ডিপ্রেশনে আছে তবে খাবার সামনে পেলে দুনিয়ায় সব ডিপ্রেশনে ভুল যায়। শুধু খাবারের কথাটায় মনে রাখে। মায়া পেট পুরে খাবার খেল। তারপর হেনা খানের আঁচল ধরে বেশ কিছুক্ষণ কিচেন রুমে দাঁড়িয়ে থাকলো। বেশ মনোযোগ সহকারে হেনা খানের দক্ষ হাতের রান্নাটা দেখলো। শফিকুল ইসলামের জন্য তিনি দুধ-পায়েস রান্না করছেন। আর সেই রেসিপিটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝলঝল চোখে ঢুক গিলছে মায়া। একদিন সেও রাঁধবে তার মিস্টার ভিলেন জন্য এমন করে। দাদী থেকেও বেশি মিষ্টি করে রান্না করবে মায়া। তারপর তার মিস্টার ভিলেনকে খেতেও দিবে নিজের হাতে। মায়ার ভাবনার মাঝেই হেনা খান পায়েস পাতিল নামিয়ে রাখলো। বক্সে ঢেলে ফ্রিজে রেখে মায়াকেও এক বাটি পায়েস দিল খেতে। মায়া পায়েসের বাটি নিয়ে সোফায় গিয়ে বসলো। কিন্তু পর মূহুর্তে কি ভেবে রিদের রুমের দিকে উঁকি মারলো নিচ থেকে। এই সময় রিদ বাসায় থাকে না সেটা মায়া জানে। তাই পায়েসের বাটি নিয়ে রয়েসয়ে গেল রিদের রুমের দরজার সামনে। দক্ষ হাতে পাসওয়ার্ড দিয়ে ঢুকলো রিদের রুমে। দরজা বন্ধ করে ভিতরে ঢুকতেই মায়া হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো রিদের রুমের দিকে কিছুক্ষণ। মায়া এর আগে দুবার এসেছে রিদের রুমে। কিন্তু রাত আর অন্ধকার থাকায় ভালো করে দেখতে পারেনি সে এই রুমটি। তবে আজ দেখলো। বেশ হা হয়েই দেখলো রিদের রুমটি। মায়ার রুমের তিনগুণ বড় রিদের রুমটি। অন্তত সুন্দর ও পরিপাটি একটি রুম রিদের। সম্পূর্ণ রুমটিই সাদা পিন্ট কথা। দেয়ালের একপাশ সম্পূর্ণটায় সচ্ছ কাঁচের। আর তাতে সাদা বড় বড় পর্দা লাগালো। সেই কাঁচের দেয়ালের এক সাইডের দরজা ধরে বারান্দায় যেতে হয়। রুমের বাকি তিনপাশ দেয়াল করা। পশ্চিমে মাঝ বরাবর বিশাল বড় বেড রাখা। সাদা চাদর ও কোশনে মোড়ানো সেই তুলতুলে নরম বিছানাটি। রুমের প্রতিটা আসবাপত্রই সাদা আর আভিজাত্যের চাপ রয়েছে। বেডের পাশে ছোট টেবিলের উপর সাদা ল্যাম্পপোস্ট রাখা। রুমের একপাশে সাদা সোফা। তার সামনের দেয়ালের ফিড করা বিশাল বড় টিভি। দেয়াল জুড়ে গুটি কয়েকটি প্যান্টিনও পেল। এবং সেই তিন তাকের বড় ফ্রিজটিও দেখলো মায়া। তার একপাশে কফি মেশিনও রয়েছে। মায়া এবার ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকায়। দেয়ালের সাথে ফিড করা বড় সাদা ওয়ালসেলফ দেখতে পেল। যেখানে প্রয়োজনীয় ফাইল পত্র রাখা আছে রিদের। তবে রুমের কোথাও মায়া আয়না বা কর্বাট দেখতে পেল না। রিদের কাপড়-চোপড় বা প্রয়োজনীয় সমগ্রী কোথায় রাখা আছে তাও বুঝলো না। সন্দেহী মায়া পায়েসের বাটি হাতে রিদের সম্পূর্ণ রুম ঘুরঘুর করলো বেশ কয়েক বার। কোথাও রিদের কাপড়ের সন্ধান মিলনা। তবে রিদের রুমটি বেশ পছন্দ হলো মায়া। তাই পায়েসের বাটি সোফায় টেবিলের উপর রেখে রিদের বিছানা গিয়ে বসলো। হাত দিয়ে রিদের বিছানা ছুঁয়ে দিয়ে ধুপ করে গা এলিয়ে শুয়ে পড়লো সেখানটাই। ফুরফুরে মেজাজে রিদের বিছানায় গড়াগড়ি করতেই মায়ার নাকে ভারি খেলো রিদের শরীরের মিষ্টি ঘ্রাণ। মায়া শিহরিত হয়ে উপুড় হয়ে শুলো। রিদের বালিশটি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিল। মায়ার কম্পিত মনে ছুঁয়ে গেলো রিদ নামক শিহরণ। লজ্জায় আষ্টশ মায়া ঝুপ করে রিদের বালিশের নিজের মুখ চেপে ধরলো। মন ভরে নিশ্বাস টানলো। বিছানায় আরও কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করলো সুপ্ত অনুভূতি নিয়ে। তারপর রিদের বিছানা সম্পূর্ণ এলোমেলো করে নেমে গেল। উঠে গিয়ে ফ্রিজ খুলতেই মায়ার চোখ ঝলমলে হলো, যখন দেখলো রিদের ফ্রিজে সব মায়ার পছন্দের খাবার রাখা। একে একে মায়া ফ্রিজের তিন পার্টই খুললো। আর তিন পার্টেই মায়ার পছন্দ খাবারের ভরপুর পেল।

আনন্দে বিমোহিত মায়া ভুলে গেল এটি রিদের রুম। শুধু মনে রাখলো চোখের সামনের খাবার গুলোকে। ফ্লোরে পা ভাঁজ করে বসে একে একে খাবার খুলতে লাগলো ফ্রিজ থেকে। আইসক্রিমের বক্স! চকলেট কেক! চকলেটের বক্স, রসমলাই, ছানা মিষ্টি, একে একে নামিয়ে নিজের সামনে স্তুপ বানালো। প্রতিটায় খেলো যতক্ষণ পর্যন্ত খেতে পারলো। অবশিষ্ট আর খেতে না পেরে উঠে দাঁড়ালো সবকিছু এলোমেলো অবস্থায় রেখেই। ফ্রিজও বন্ধ করলো না। পানি না খেয়ে ঢেকু তুললো। আইসক্রিম আর রসমালাইয়ের রস পরে মায়ার জামা নষ্ট হওয়ায় ঢুকলো ওয়াশরুমে। পরিস্কার করতে। কিন্তু ওয়াশরুমে ঢুকে মায়া যেন আরও হতবাক হয়ে গেল। যখন দেখলো মায়া রুমের সমান রিদের ওয়াশরুমটি। হতভম্ব মায়া রিদের ওয়াশরুমের চারপাশে চোখ বুলালো। ওয়াশরুমের একপাশটাও কাঁচে তৈরি এবং তাতে বড়সড়ো একটা দরজা রয়েছে। যাহ দিয়ে ভিতরের রুমে প্রবেশ করতে হয়। আর এখানেও উপর দিয়ে পাতলা সাদা পদা টাঙ্গানো। মায়া পরিষ্কার হলো না আর। বরং হতভম্ব মায়া কৌতূহল বশত সেই দরজা ধরে ঢুকলো ভিতরের রুমে। আর তাতেই যেন আরও বেশি হা হয়ে যায় ভিতরের পরিবেশটা দেখে। আজ মায়ার অবাক হওয়ার দিন। তারজন্যই তো মায়া আজ শুধু অবাক আর আবাক হচ্ছে। কারণ এটি কোনো সাধারণ রুম নয় বরং বিশাল বড় শপ বলা যায়। রিদের শপ। মায়া গোল গোল চোখে চারপাশটায় চোখ বুলালো। শপের মতো করে জায়গায় জায়গায় , হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে টাঙ্গিয়ে রাখা আছে রিদের শার্ট, প্যান্ট,কোট, টি-শার্ট, তাউজার, গুলো আলাদা আলাদা সেক্টর করে সারিবদ্ধ ভাবে। অন্য সেক্টরে রিদের ব্যান্ডের জিনিসপত্র রাখা। ঘড়ি, সুজ, টাই, পারফিউম, বেল্ট কাচের দেয়ালে সাজানো আলাদা ভাবে। তার পাশেই বিশাল বড় আয়ন রাখা। মায়া হতভম্ব হলো রিদের বিশাল বড় শপ দেখে। দিন দুনিয়া ভুলে মায়া শুধু তাকিয়ে থাকলো চারপাশে। তার মিস্টার ভিলেন যে এতোটা সাজুগুজু করে তা জানা ছিলনা মায়ার। আজ মায়া এখানে না আসলে হয়তো কখনোই জানতো না সেটা। হতবাক মায়াকে চমকে দিতে তক্ষুনি রুমে প্রবেশ করলো রিদ। মায়া চমকালো, ভড়কালো, হকচকিয়ে গেল যখন দেখলো রিদ এই শপের ভিতর প্রবেশ করেছে। ভয়ার্ত মায়া যখন উত্তেজিত হয়ে চিন্তা করলো এক ছুটে পালিয়ে যাবে। তখনই শান্ত হলো যখন দেখলো রিদ মায়াকে এরিয়ে অন্য পাশে চলে গেছে। মায়া যে এই রুমে আছে সেটা দেখেও যেন দেখলো না রিদ। রিদ ছাড়া এই রুমে অন্য কারুর অস্তিত্ব নেই এমন একটা ভাব। আর এতে করেই মায়া কিছুটা সাহস পেল। যেহেতু রিদ মায়াকে কিছু বলছে না তাই মায়া জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলো। নড়লো না। মায়া ভাবিনি হুট করে রিদ এই সময় বাড়িতে চলে আসবে। এই সকাল বেলা রিদ বাসায় আসে না। তাই কেন আসলো রিদ তা দেখার জন্যই মায়া দাঁড়িয়ে রইলো। আর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো রিদের দিকে। রাতের ঘটনা সে ভুলে গেছে আপাতত। কিছুই মনে নেই। তাই দিব্যি স্বাভাবিক ন্যায় কৌতূহল চোখে তাকিয়ে থাকলো রিদের দিকে।

রিদ কিছু কারণ বশত পূর্বাঞ্চলে যাবে। আজ রাতটা সেখানে কাটিয়ে কাল বাসায় ফিরবে। তাই নিজের ড্রেস চেঞ্জ করে প্রয়োজনী ফাইল নিবে সে। মায়া যে এই রুমে আছে সেটা রিদ মায়ার ঢুকার সময় বুঝতে পেরেছিল। কারণ মায়া যখন রিদের রুমের পাসওয়ার্ড টাইপ করে তখন রিদের ফোনে একটা কোড নাম্বার গিয়েছিল। তাছাড়া রিদের দরজার লক বুথে হিডেন ক্যামেরা ফিট করা ভিতরে বাহিরে। তাই অনাহেষে রিদ জানতে পারে তার রুমে কে আসা যাওয়া করছে সেই বিষয়টি। তাই রিদ দেখেছিল মায়াকে তার রুমে ঢুকতে। এবং সেই সাথে দেখেছিল সিসি ফুটেজে মায়ার দীর্ঘ সময়ে করা পাগলামোর কান্ড গুলো রিদ। বেশ মনোযোগ সহকারেই দেখেছিল। কিন্তু এই মূহুর্তে রিদ মায়াকে না দেখার মতো করে এক্সট্রা কাপড় নিল চেঞ্জ করার জন্য। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের কোট টেনে খুলে পাশে রাখলো। শার্টের বোতামে হাত রেখে আয়না দিয়ে মায়ার দিকে তাকালো। চোখাচোখি হলো দু’জনের। মায়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই রিদের দিকে গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে। রিদ যে ড্রেস চেঞ্জ করছে সেদিকে মায়ার কোনো ভাবান্তর নেই। মায়াকে স্বাভাবিক দেখে রিদ হালকা কপাল কুঁচকা। তারপরও মায়াকে কিছু না বলে একে একে শার্টের বোতাম ছুটাতে লাগে। মায়া রিদকে শার্টের বোতাম খুলতে দেখেও বুঝলো না। রিদ কেন আবারও ড্রেস চেঞ্জ করছে? কিছুক্ষণ আগেই না রিদ এই পোষাক পড়ে বেড়িয়ে ছিল তাহলে এতো তাড়াতাড়ি কেন আবারও ড্রেস চেঞ্জ করছে? কৌতূহলী মায়া রিদকে প্রশ্ন করে উঠলো..

—” আপনি আবারও ড্রেস চেঞ্জ করছে কেন?

মায়া প্রশ্ন ঘুরে তাকায় রিদ। একে একে বোতাম খুলতে খুলতে লিপিপ্ত গলায় বললো…

—” রাতের স্বপ্ন**ষ দিনে হয়েছে তাই ড্রেস চেঞ্জ করতে এসেছি। কেন? কোনো সমস্যা?

রিদের কথা থমথমে খেয়ে যায় মায়া। এতক্ষণ দিব্যি ভুলে থাকা রাতের ঘটনাটি ফটফট করে মনে পড়লো মায়ার। রিদকে বিন্দাস ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে লজ্জায় চোখ মুখ লাল হলো মায়া। মায়া বুঝলো রিদের সামনে এই মূহুর্তে থাকা মানেই ঘোর বিপদ। লজ্জায় আড়ষ্ট মায়া তৎক্ষনাৎ দৌড় লাগাতে চাইলো রিদ থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য কিন্তু পারলো না। কারণ তার আগেই পিছন ডেকে বাধা দেয় রিদ। শক্ত গলায় মায়াকে হুমকি বার্তায় বলে…

—” ডোন্ট গো! ম্যাডাম পালিয়ে লাভ নাই। যেখানে যাবেন সেখান থেকে ধরে নিয়ে আসবো আপনাকে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন তাহলে জানটা অন্তত রক্ষা পাবে আপনার। নয়তো আজকেই শেষ দিন আপনার। মনে রাইখেন আমি কিন্তু ভালে মানুষ না। তাই জানটা বাঁচাতে চাইলে দাঁড়ায় থাকেন।

রিদের বেপরোয়া ভঙ্গির কথায় মায়া ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। কম্পিত শরীরে পিছন ঘুরে রিদের সামনে দাঁড়ালো নত মস্তিষ্কের। প্রচন্ড ভয়ে মায়া নিজের ওড়না দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রাখলো। কারণ এই মূহুর্তে রিদের মোড স্বাভাবিক লাগছে না মায়ার কাছে। বেশ রাগান্বিত মনে হলো। মায়া মনে করলো রিদের রুমে সে আসাতে, রিদ রাগ করেছে। তাই পানিশমেন্ট স্বরুপ আজ রিদ মায়াকে মাথার উপর তুলে আছাড় মারবে নিশ্চিত। মায়া বেশ ভয়ার্ত হলো নিজের চিন্তা ভাবনায়। তাই শুকনো ঢুক গিলে আঁড়চোখে তাকালো রিদের দিকে। রিদ শার্টের নিচের অবশিষ্ট দুটো বোতাম আর খুললো না। তবে ইন করা শার্টটি প্যান্টের ভিতর থেকে টেনে বের করে উপর ফেলতে ফেলতে মায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নত মস্তিষ্কের মায়াকে দেখে নিয়ে বললো..

—” কি ম্যাডাম! ভয় পাচ্ছেন? আমাকে ভয় লাগছে আপনাকে মেরে ফেলব বলে? লাগারই কথা। আপনার ধারণাই ঠিক। আপনাকে জানে মেরে ফেলার চিন্তা ভাবনায় করছি আমি। তবে আপনার পা দুটো আগে কাটবো। আপনার পা দুটো চলে বেশি। আমার অবাধ্য হয়ে বাপের বাড়ির যায় এই পা, আপনাকে নিয়ে। সব দোষ আপনার এই পায়েই। তাই পা নাই! ঝামেলাও নাই। চলেন কোথাও বসেন! আপনার পা দুটো কাটব। আমিও চুরিটা নিয়ে আসি। আসেন! আসেন!

রিদ কথা গুলো বলতে বলতে মায়াকে ধরতে নেয়। কিন্তু ততক্ষণে মায়া ভয়ে ছিটকে দূরে সরে যেতে চাইলো। কিন্তু পারলো না। কারণ রিদ একহাত দিয়ে মায়ার একহাত শক্ত করে চেপে ধরে নিল। রিদের ভয়ে উত্তেজিত মায়া ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে বসলো। নিজেকে বাঁচানোর জন্য বলতে লাগলো…
—” আর অবাধ্য হবে না আমার পা। আর কোথাও যাবেও না আমার পা দুটো। সত্যি বলছি। আপনার রুমেও আসবে না। আমাকে ছেড়ে দিন না প্লিজ। আমার পা কাটলে দাদী কষ্ট পাবে । কান্নাও করবে ভিষণ। তাই বলছি! প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন না।
—” দাদী কান্না করলে করুক! আমার কি। আজ আমি আপনার এই পা দুটো কেটেই শান্ত হবো নয়তো না। দেখি আসেন এইদিকে! চুরিটা ঐখানে রাখা আছে। চলেন।

কথা গুলো বলেই রিদ মায়াকে টেনে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ভয়ে আষ্টশ মায়ার এবার জান যায় যায় অবস্থা। কারণ রিদ সিরিয়াস ভঙ্গিতে মায়াকে টানছে নিয়ে যাওয়ার জন্য। রিদের সিরিয়াসনেস দেখে মায়া আরও ভয়ে উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিজের হাত টেনে ধরে বাঁচার জন্য। কিন্তু রিদের শক্তি সামর্থ্যে সাথে উঠতে না পেরে ভয়ে লাফাতে লাফাতে ঠোঁট ফেরে বাচ্চাদের মতো করে চিৎকার করতে করতে বলে।
—” আর করবো না। আর করব না। অ আল্লাহ গো! অ আল্লাহ গো! শয়তান ছাড়!

রিদ থামে! মায়ার মুখে শয়তান কথাটা শুনে কপাল কুঁচকে বলে…
—” শয়তান? আমাকে আপনার শয়তান মনে হয়। ঠিক আছে। এবার পায়ের সাথে সাথে হাত দুটো কাটবো। তারপর বস্তা ভরে নদীতে ফেলে দিব। আসেন!
রিদ পুনরায় মায়ার হাত টেনে ধরতেই উত্তেজিত মায়া বলে উঠে…
—” পায়ে পড়ি! পায়ে পড়ি আপনার! আমার মুখ ফসকে শয়তান কথাটা বের হয়ে গেছে। আর বলবো না। আর জীবনেও বলবো না। সত্যিই।
—” ওহ তাহলে মুখেরও দোষ আছে আপনার? হাত পা সাথে সাথে এবার আপনার মুখটাও আজ ভেঙ্গে দিব আমি। চলেন!
—” ওহ আল্লাহ গো! আমিতো ভুলবশত আপনার রুমে ঢুকে পড়েছিলাম। আর ঢুকবো না। বলছি তো। এবার ছেড়ে দিন না আমায়। আমি আর কোথাও যাব না জীবনে আপনাকে না বলে।

মায়ার আর কোথাও যাবে না এই স্বীকারোক্তিতে রিদ থামে। মায়া স্বাভাবিক নেয় দাঁড়ায় কাঁদতে কাঁদতে। হাতের উল্টো পিঠে বারবার গাল মুছে রিদের দিকে তাকায়। রিদ তখনো বিরুক্তির কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে মায়ার দিকে। মায়া রিদকে স্বাভাবিক হতে দেখে কান্না ভিজা গলায় পুনরায় বলে…
—” আমি আর আসবো না আপনার রুমে। আমি তো শুধু একটি করে চেক করতে এসেছিলাম আপনার…

মায়ার কথাটা শেষ করার আগেই রিদ বলে উঠে…
—“কি চেক করতে এসেছেন স্বামীর সিস্টেম ঠিক আছে কিনা? সবকিছু ঠিকঠাক চলে কিনা? আসেন চাইলে চেক করতে পারেন। আমি মাইন্ড করবো না।

রিদের কথায় মায়া তুমুল লজ্জায় সিটিয়ে পড়লো মূহুর্তেই। এক মূহুর্তের জন্য নিজের কান্না ভয় ভুলে গিয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হলো মায়া। রিদ মায়ার মাইন্ড ডাইভার্ট করে চাইলো। সফলও হলো। কারণ মায়া ভয় ভুলে লজ্জা পেল প্রচুর। তাই নত মস্তিষ্কে হয়ে রিদের সামনে দাঁড়িয়ে সাথে সাথে নিজের মুখ ঢেকে ফেললো তুমুল লজ্জায়। নাক মুখ ছিটকে বললো…
—” ছিইইইই! কি বিচ্ছিরী কথা।
রিদ প্রসঙ্গ পাল্টায়। একটু এগিয়ে এসে মায়ার কাছাকাছি মুখোমুখিতে দাড়ায়। মায়া বেশ ছোট হওয়ায় রিদ খানিকটা ঝুকে পড়লো মায়ার দিকে। পূবে জুঁইয়ের কথার রেশ টেনে বললো…

—” ছিইঃ কি ম্যাডাম? এই ছিইয়ে কাজ হবে আজ আপনার? হবে নাতো মনে হয়। কারণ শুনলাম বউয়ের নাকি সিস্টেমে সমস্যা আছে। ডাক্তার দেখাতে হবে আমায়। তাই ভাবলাম একবার আমিই চেক করে নেয় কোথায় কোথায় সমস্যা আছে বউয়ের সেটা দেখতে। আমি শিওর না হলে ডক্টরকে কি বলবো আসলে আমার বউয়ের সমস্যাটা কোথায় আছে। আসুন! আমার কাছে আসুন! দেখি আপনার কোথায় কোথায় সমস্যা আছে।

রিদ কথা গুলো বলতে বলতে মায়া বাহুতে হাত দেয়। ভয়ার্ত মায়া রিদের হাড় কাঁপানো কথায় মূহুর্তে ছিটকে সরলো রিদের থেকে। নাক মুখ ছিটকে বললো…
—” ছিই কি বাজে আপনি! নির্লজ্জ অসভ্য..
মায়ার কথাটা বলতে দেরি রিদ তেড়ে যেতে দেরি হলো না। রাগান্বিত ভঙ্গিতে সাথে সাথে মায়াকে উল্টিয়ে চেপে ধরলো দেয়ালের মধ্যে পিছন থেকে মায়ার হাত মুচড়ে। মায়ার একগাল দেয়ালের সাথে চেপে যেতেই রিদ ঝুকে পড়লো মায়ার কানের কাছে। অন্তত রাগান্বিত স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে…

—” ম্যাডাম বেশি বাড় বাড়িয়েন না কাঁচা খেয়ে খেলব আপনাকে। এমনিতেই আপনার অনেক হিসাব কষা বাকি আমার। নতুন করে সেই হিসাবের খাতায় আর ভরবেন না। তাহলে জান খেয়ে ফেলবো আমি। রাক্ষস চিনেন? যেদিন ধরবো! সেদিন অস্তিত্ব হারা করবো আপনার। রাক্ষসের ন্যায় খেয়ে ফেলবো আপনাকে। ওয়ার্নিং দিচ্ছি ভালো হয়েছে যান! আমাকে জ্বালানো বন্ধ করুন। এমনিতেই গলা অবধি পুড়ে কয়লা হয়ে গেছি আমি আপনার জ্বালায়। আমার নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে, আমি আপনার নিশ্বাসটাও বন্ধ করে দিব ম্যাডাম। নিশ্বাসটা ফেলার সুযোগটা অবধি পাবেন না আপনি। শুধু বিছানায় ছটফট করবেন। তাই বলছি! সময় যখন দিচ্ছি, সময়টা ভালোভাবে নেন। কাজে লাগান। আমার থেকে বেশি বেশি করে দূরে থাকার চেষ্টা করুন। নয়তো আমি বেসামাল হলে? আপনার আমাকে সামালানোর ক্ষমতা থাকবে না। কারণ দুনিয়ায় সকল বেপরোয়া নির্লজ্জতার ডেফিনেশন ভেঙ্গে দিব আমি। আপনাকে তখন নিজের সাথে পিষে ফেলতেও দুই সেকেন্ড ভাববো না।

রিদের কথার ধাঁচে আর হাতের ব্যথা কুঁকড়ে উঠে মায়া। রিদের কথা গুলো মায়ার মনে টনক নড়লেও তার চেয়ে বেশি টনক নড়ে তীব্র হাতের ব্যথা মস্তিষ্কে মধ্যে জোরালো ভাবে। হাতের ব্যথায় জড়িয়ে মায়া কেঁদে উঠলো রিদের বক্ষতলে। শব্দ করে কেঁদে উঠে অস্পষ্ট স্বরে বলল…
—” আমি ব্যথা পাচ্ছি তো মিস্টার ভিলেন। ছাড়ুন আমাকে! যাব আমি।

মায়ার হঠাৎ ফুপিয়ে উঠা কান্নায় রিদেরও ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গে। মায়ার না ছেড়ে আরও জোড়ালো ভাবে চেপে ধরলো। যার ফলে মায়ার হাতের কাঁচের চুড়ি ভেঙে রিদ মায়া দু’জনের হাতের ঢুকলো। মায়া এবার ব্যথায় ছটফট করে, রিদের ভয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। রিদ মায়াকে তখনো ছাড়লো না বরং মায়ার হাতটা পিছন থেকে আরও মুচড়ে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে উঠে…
—” আমি ছুঁলেই তোর কান্না আসে। তাই আমার থেকে পালিয়ে বেড়াতে তোর বাপের বাড়ির চলে গেলি। তুই ভালো কথার মানুষ না। ভালোভাবে বলছিলাম জীবন কখনো আমার অবাধ্য হবি না। তারপরও হলি। কার পারমিশন নিয়ে তুই বাপের বাড়িতে গেলি? আমি বলেছিলাম তোকে যেতে? তাও দুটো মাস থাকলি! তোর কি আমাকে মানুষ মনে হয়না? তোর জ্বালায় রাতে ঘুম হয়না আমার। তাও তুই ফিরে আসলি না আমার কাছে। এখন নাটক করিস আমার সাথে? মেরে দেয়! পিষে ফেলি তোকে!

ব্যথায় কাতর মায়া তখনো বুঝলো না রিদের হঠাৎ অধৈর্য্যর রাগের কারণটা। বুঝলো না মায়ার হঠাৎ করে বাপের বাড়ি চলে যাওয়াতে রিদের গাঢ় অভিযোগে কারণটা। মায়া সেদিন জুঁইয়ের সাথে চলে যাওয়াতে, রিদ একপ্রকার জেদ করেই খুঁজ করলো না মায়ার। কেমন কেমন করে দুটো মাস মায়া ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে কাটালো। রিদের জেদ অভিমানের পাল্লাটা আরও ভারি হলো। রিদ প্রথমে মায়াকে ছাড় দিল, ভাবলো হয়তো মায়া নিজ থেকে চলে আসবে কিছুদিনের মধ্যে। কিন্তু মায়া আসলো না। বরং মায়া আসলো দুমাস পর তাও বাবার হার্ট অ্যাটাকের কারণে। নয়তো মায়া তখনো আসতো না খান বাড়িতে। আর এরজন্যই রিদ মায়াকে এরিয়ে চলতে চাই। যে বউ তার স্বামী জন্য মন কাঁদে না। তার সাথে কিসের ভাব আবার রিদের? রিদের এমন বউ তো মোটেও পছন্দ না। যে বউ স্বামীকে রেখে বাড়িতে যেতে চাই। তাই রিদের মায়াকে চাই না। চাই না মানে চাই-ই না। কিন্তু বিপত্তি ঘটে মায়াকে নিয়ে। তার বেয়াদব বউ তাঁকে শান্তি দিচ্ছে না। সারাক্ষণ এটা সেটা করে আরও জ্বালিয়ে মারছে। দহনের আগুন পুড়াচ্ছে আরও বেশি করে। যেটা অধৈর্য্যের বাঁধ হিসাবে রিদের জেদ গুলো ভাঙ্গে পুরোপুরি। রিদ গত দুই মাসের হিসাব কষতেই আজ এতটা রাগান্বিত। কিন্তু মায়াও অবুঝের ন্যায় আরও বাড়িয়ে দিল রিদের সেই রাগটা। রিদের বক্ষতলে পিষ্ট হয়ে কান্না জড়িত গলায় বলে…
—” বেশ করেছি বাপের বাড়ির গেছি! আরও যাব। আমি আবারও চলে যাব আব্বু সাথে! থাকবো না আর আপনার বাড়িতে। দেখিয়েন আপনি।

মায়ার কথায় রাগে গা রি রি করে উঠে রিদের শরীর। প্রচন্ড শক্ত করে মায়ার হাত চেপে ধরে মুচড় দিতেই ফটফট করে ভেঙ্গে পড়ে মায়ার কাঁচের চুড়ি গুলো হাত থেকে। এলোপাতাড়ি গিয়ে বিঁধল কাঁচের অবশিষ্ট চুড়ির টুকরো গুলো দুজনের হাতেই। তবে মায়ার নরম হাতটা বেশ জখম হলো। গরম রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো ফ্লোরে উপর। মায়া ব্যথায় ছটফট করে ডুকরে কেঁদে উঠে। রিদ সেদিন মনোস্হির না হয়ে। মায়ার কথায় রাগে রি রি করতে করতে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে বলে…
—” তুই যাবি! যাহ! তোর ধান্দাবাজ বাপের হ্যাটের সমস্যা না? তোর ঠকবাজ বাপ! এতো হ্যাটের সমস্যা নিয়ে বেঁচে থেকে কি করবে? বরং মরতে মরতে আমার একটা উপকারে আসুক। দুই দিন পর পর তুই লাফাতে লাফাতে বাপের বাড়ি যাস। এখন যদি তোর ধান্দাবাজ বাপ বেঁচেই না থাকে তাহলে তুই যাবি কই? মূলত যত সমস্যা তোর ঐ ধান্দাবাজ বাপের নিয়েই। তোর বাপ নাই ভারতি ঝামেলাও নাই। সবশেষে।

রিদের কথায় উত্তর করলো না ব্যথায় কাতর মায়া। শুধু ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে উঠে কোনো রকম বলে…
—” আমি ব্যথা পাচ্ছি তো! হাতটা ছাড়ুন। বলছি তো আর কাছে আসবো না আপনার। দূরে দূরে থাকব। আপনার আশেপাশেও ঘুরঘুর করবো না। এবার হাতটা ছেড়ে দিন না আমার। সত্যিই ব্যথা পাচ্ছি আমি।

মায়ার কথা নরম হলো না বরং আরও রেগে গেলো রিদ। মায়া বুঝলো না কেন রিদ বারবার রেগে যাচ্ছে। রিদ মায়াকে বললো দূরে থাকতে। মায়া স্বীকার করলো দূরে থাকবে। তারপরও কেন রিদ রেগে যাচ্ছে? কেন রিদ মায়ার হাতটা ছাড়ছে না সেটাও বুঝলো না। মায়া তো সব স্বীকার করলো রিদ থেকে দূরে থাকবে তারপরও কেন রিদ মায়াকে ব্যথা দিচ্ছে? মায়া হাতের ব্যথায় অন্তত কাতর হয়ে এবার হাউমাউ শব্দ করে কেঁদে উঠলো। মায়ার হঠাৎ উচ্চ স্বরে কান্নায় নরম হয় রিদ। শুধু নরম না মোমের মতোন নরম হয়ে হাতের বাঁধন ঢিল করতেই তৎক্ষনাৎ সামনের দিকে ঘুরতে ন্যায় মায়া! কিন্তু রিদ মায়ার কানের কাছে ঝুঁকে থাকায় মায়ার ঘুরতেই, অসাবধানতায় রিদের নাকের সাথে মায়ার নাক, ঠোঁটের সাথে মায়ার ঠোঁট ভারি লাগলো অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে। রিদ মায়া দু’জনই অপদস্তক হলো মূহুর্তে। তবে মায়ার কান্নাটা অপদস্তক ভঙ্গিতে দুই সেকেন্ডর জন্য থামলেও নিজের হাতের অনর্গল রক্ত পড়তে দেখে মূহুর্তে আবারও ঠোঁট ফেরে বাচ্চাদের মতো করে হুলুস্থুল চিল্লি। রক্ত দেখে যেন মায়ার কান্না বেগ আরও বেড়ে যায়। তাই রিদকে যে মাত্রই অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে চুমু খেলো সেটাও লক্ষ করলো না হাতে রক্ত দেখে। কিন্তু রিদ বেশ লক্ষ করলো। তাই সহজ ভঙ্গিতে স্বাভাবিক ন্যায় সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ছোট ছোট চোখ করে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো মায়ার হুলুস্থুল চিল্লির দিকে। রিদ শান্ত হলো। রাগ মাটি করলো মায়ার হাতের রক্ত দেখে। বুক ফুলিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস টেনে মায়ার রক্তযুক্ত হাতটি নিজের হাতে নিল। বেশ অনেক জায়গায় কেটে গেছে হাতের চুড়ি ভেঙ্গে। রক্ত পড়ছে টপটপ করে। রিদ মায়ার হাত শক্ত করে চেপে ধরে ভাঙ্গা চুড়ির টুকরো বের করতেই, মায়া আরও বেশি জোরে জোরে চিল্লায়। রিদ মায়ার হাতের কাটা জায়গায় চেপে ধরে নিয়ে যায় ওয়াশরুমে। ট্যাপ ছেড়ে হাতটা ধুয়ে দিয়ে, এবার নিয়ে যায় নিজের রুমে। মায়াকে সোফায় বসিয়ে রিদ ফাস্টেড বক্স আনতে যায় ড্রয়ার থেকে। কিন্তু তখনো মায়া গলা ছেড়ে সমান তালে কান্না করছে। রিদ মায়ার সামনে ফাস্টেড বক্স নিয়ে বসলো ঠিকই কিন্তু মায়াকে বললো না কান্না থামাতে। বরং নিজের মতো করে মায়াকে ব্যান্ডেজ করতে লাগলো। মায়া কাঁদতে কাঁদতে বেখেয়ালি চোখ যায় সামনের দিকে। মূহুর্তেই চোখে পড়লো রিদের এলোমেলো রুমটা। খোলা ফ্রিজ! ফ্লোরে এলোমেলো খাবার ছড়িয়ে থাকা। এবার মায়া কাঁদার গতি কিছু কমে আসলো। ভয়ার্ত হলো এই ভেবে রিদ নিশ্চয়ই আবারও মায়াকে মারবে তার রুমটা এলোমেলো করে দেওয়ায়। তাছাড়া মায়া রিদের ফ্রিজ থেকে খাবারও চুরি করে খেয়েছে। আবার ফ্লোর নষ্ট করেছে! ছড়িয়ে রেখেছে। এর জন্য নিশ্চয়ই মায়ার অন্য হাতটাও রিদ ভেঙ্গে দিবে এখন? মায়া ভয়ে আষ্টশ হয়ে কান্না অফ করে দিয়ে তৎক্ষনাৎ নিজের ভালো হাতটি পিছনে লুকিয়ে ফেলে রিদের দিকে ভয়াৎ দৃষ্টিতে তাকায়। রিদ তখনো মনোযোগ সহকারে মায়ার হাতে ব্যান্ডেজ করছে। মায়া আবারও ভিজা চোখ আওড়িয়ে রিদের এলোমেলো রুমটার দিকে তাকায়। মায়া হঠাৎ মনে পড়লো, মায়া যে রিদের রুম নষ্ট করেছে সেটা তো আর রিদ জানে না। তাই মায়া যদি রিদকে মিথ্যা বলে দেয়। তাহলে কি রিদ বুঝবে নাকি সে মিথ্যা বলছে এমনটা। বুঝবে না। মোটেও বুঝতে পারবে না। বরং মায়া গুছিয়ে মিথ্যা বলে দিবে রিদকে, যে সে রিদের রুম নষ্ট করেনি। দাদী করেছে! তাহলে তো আর রিদ মায়ার হাত ভাঙ্গতে পারবে না। মায়া কান্না জড়িত গলায় নাক টেনে টেনে বলে…
—” আপনার রুম আমি নষ্ট করিনি। দাদী করেছে।

রিদ মায়ার হাত ব্যান্ডেজ করতে করতে চোখ তুলে তাকায় মায়ার দিকে। তারপরও মায়ার কথা অনুযায়ী এক পলক ফ্রিজের সামনে তাকিয়ে মৃদু কন্ঠে বলে…
—” আচ্ছা।
রিদকে মায়ার কথা বিশ্বাস করতে দেখে কিছুটা সাহস পেল মায়া। রিদ এবার চোখ ঘুরিয়ে নিজের এলোমেলো বিছানার দিকে তাকাতেই মায়া পুনরায় বলে উঠে..
—” আপনার বিছানাও আমি এলোমেলো করিনি। দাদী করেছে!
—” আচ্ছা!
রিদ সম্মতি দিয়ে মায়ার হাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়। তারপর ফ্রিজ হতে নরমাল পানি এনে মায়ার হাতে ধরিয়ে দেয় খাওয়ার জন্য। রিদ মায়াকে গ্লাসে তুলে পানি দিতেই মায়ার মনে পড়লো সেতো খাবার খাওয়ার পর পানি খায়নি। পানি খেতে ভুলে গিয়েছিল তখন। টকটক করে সম্পূর্ণ পানি গ্লাস শেষ করে টেবিলের উপর রাখলো। রিদের হাতের দিকে তাকাতেই ভয়ার্ত কন্ঠে বললো..
—” র রক্ত! আপনার হাতে রক্ত ব্যান্ডেজ…
—” আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না তোমার। বের হও আমার রুম থেকে যাও।
রাগে দুঃখের অপমানে ঠাস করে উঠে দাঁড়ালো মায়া। হনহন করে দরজা অবধি গিয়ে আবারও ফিরে আসলো রিদের সামনে। রিদ কপাল কুঁচকে মায়া দিকে তাকিয়ে থাকার মধ্যে দিয়েই মায়া নাক মুখ শক্ত করে বলে উঠে…
—” আজকের পর থেকে আমি আর আপনার রুমে আসবো না। আপনার সাথে কথাও বলবো না। আপনিও আমার সাথে আর কথা বলবেন না।
—” আচ্ছা!
—” আমার দিকে তাকাতেও পারবেন না।
—” আচ্ছা!
রিদের লিপিপ্ত উত্তরে মায়া রাগে নাক মুখ কুঁচকে হনহন করে বেড়িয়ে যায় রুম থেকে। যতকিছু হোকনা কেন আজকের পর থেকে কোনো কথাই বলবে না এমন স্বামী সাথে। দরকার হলে সে আবারও বাপের বাড়িতে চলে যাবে। তারপরও রিদকে মুখ দেখবে না আর।
~~~~
মন মেজাজ বড্ড উগ্র হয়ে আছে আয়নের। কাল সারাদিন রোগী দেখে রাতভর নাইট ঢেউটি করলো। সকালে পাঁচটার দিকে তার ঢেউটি শেষ হওয়ার শর্তেও বাসায় যেতে পারেনি। হঠাৎ করে ভোর পাঁচটার দিকে ইমারজেন্সিতে একজন হ্যার্টের পেশেন্ট আশায় তাকে জরুরি ভিত্তিতে সকাল সাতটার দিকে ওটিতে যেতে হয়। বাকি ডক্টরদের সাথে মিলে দীর্ঘ দুই ঘন্টা সময় টানা অপারেশন পরের নয়টার দিকে আয়ন ওটি থেকে বের হয়। ক্লান্তময় শরীরটা নিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজের কেবিনে বসলো কতক্ষণ। চেয়ারের গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আধা ঘণ্টা রেস্ট নিল। দীর্ঘ টানাপোড়ার জীবনটাতে সে আজ বড্ড ক্লান্ত। বিশ্রাম দরকার তার। মানসিক শারীরিক দুই দিক থেকেই বিশ্রাম দরকার। আয়ন উঠে দাঁড়ালো নিজের ফোন আর এপ্রোনটা হাতে নিয়ে বের হলো। হসপিটালের করিডোর ধরে নতুন পেশেন্টটিকে একবার পযবেক্ষণ করে নিল যাওয়ার আগে। নার্সকে প্রয়োজনী কালক্রম বুঝিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে আসলো সেখান থেকে। আপাতত এখন সে নিজের ফ্ল্যাটে যাবে। আয়ন হসপিটালের করিডোর ধরে সামনে দিকে এগোতেই চোখে পড়লো শফিকুল ইসলামের কেবিনটি দিকে। আয়ন কি মনে করে শফিকুল ইসলামে কেবিনে ঢুকলো। শফিকুল ইসলামের পাশে রেহেনা বেগমকে বসে থাকতে দেখলো। আর তার অপর পাশে জুঁইকে। আয়ন হাসি মুখে এগিয়ে গেল শফিকুল ইসলামের দিকে। অন্তত নম্রতা সহিত কুশলাদি জিগ্যেসা করলো উনাট শরীরের। আয়নকে পূবে থেকেই চিন্তেন বিদায় শফিকুল ইসলামও বিনিত সহিত কথা বললো আয়নের সাথে। জানালো নিজের শরীরে অবস্থার কথা। আয়নের সকল মনোযোগ শফিকুল ইসলামের দিকেই। অল্প কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের কথা ইতি টানলো আয়ন। আপাতত সে বাসায় যাবে বলে। কিন্তু যাওয়া আগে ক্লান্তিতে দারুণ হেঁসে বলে উঠে শফিকুল ইসলাম উদ্দেশ্য…

—” আঙ্কেল জুঁইকে আমার সাথে নিয়ে যেতে চাচ্ছি। আপনি অনুমতি দিলে উনাকে নিয়ে এক্ষুনি যেতে চাই।

আয়নের হাসি মুখের কথাটা যেন বজ্রপাত হলো জুঁইয়ের মাথায়। চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো শফিকুল ইসলামের বেড ছেড়ে। জুঁই নিজের শকটে কিছু বলবে তার আগেই তীক্ষ্ণ কন্ঠে মুখ খুললো শফিকুল ইসলাম…
—” জুঁই? কিন্তু কেন?
মুখের হাসি বজায় রেখে বললো…
—” তেমন কিছু না আঙ্কেল। ফিহা সকাল থেকেই ফোন দিয়ে বারবার রিকুয়েষ্ট করছে জুঁইকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাই উনাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলাম। তবে বিকালে ফিহার সাথেই ফিরে আসবে।
আয়নের কথায় অমত পোষণ করলো না শফিকুল ইসলাম। কারণ তিনি ফিহাকে অন্তত ভালোভাবেই চিনেন। নিজের মেয়ের মতোই ভাবেন। জুঁই -মায়া সাথে ফিহার বন্ধুত্বটাও জানেন তিনি। তাই আপত্তি না করে জুইয়ের দিকে তাকালে তিনি। নরম গলায় বললো…
—” যাবে তুমি ফিহা সাথে দেখা করতে জুঁই?
~~
আয়নের গাড়িটি এসে থামলো এগারো তলা বিলাসবহুল ভবনের সামনে। দারোয়ান গেইট খুলে দিতেই আয়ন গাড়ি নিয়ে ঢুকলো ভিতরে। সিটবেল খুলে নিজের এপ্রোন আর ফোন নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয় আয়ন। সামনে দিয়ে ঘুরে অপর পাশে দরজাটি খুলে দেয় সে, জুঁই বের হওয়ার জন্য। ইতস্ততার জুই দু’হাতে মুচড়িয়ে আড়চোখে তাকায় আয়নের দিকে। সাথে সাথে চোখ মিলল দুজনের। আয়ন গাড়ির দরজা খুলে স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই তাকিয়ে আছে জুঁইয়ের দিকে। জুঁই হাসফাস করে ধীরেস্হে নেমে দাঁড়ালো গাড়ির থেকে। আয়ন গাড়ির দরজা লাগিয়ে জুইকে কিছু না বলে চুপচাপ হাঁটা ধরলো বিল্ডিংয়ের ভিতরের দিকে। জুই প্রচন্ড হাসফাস করে এদিকে সেদিক তাকিয়ে আয়নের পিছন পিছন গেল লিফট অবধি। আয়ন লিফটে ঢুকতেই জুইও ঢুকলো তার সাথে। আয়নের পিছনে দাঁড়িয়ে জুই অস্থির হলো বন্ধ দরজার লিফটে দুজন একা আছে ভেবে। অস্থিরতার কপাল বেয়ে চিকন ঘাম ছুটলো জুইয়ের। আয়ন তখনো স্থির স্বাভাবিক ন্যায় সামনের দিকে ঘুরে তাকিয়ে আছে। জুইয়ের সাথে কোনো রুপ কথা বলছে না আপাতত সে। গাড়িতেও কোনো কথা হয়নি দুজনের মধ্যে। চুপচাপই ছিল সারাটা রাস্তা দু’জনই। লিফট তিন তলায় এসে থামতেই আয়ন বের হয়ে যায়। আয়নের পিছন পিছন জুইও বের হয়ে আসে। আয়ন নিজের ফ্ল্যাটের দরজার লক চাবি দিয়ে খুলে ভিতরের প্রবেশ করলো। কিন্তু জুই প্রচন্ড অস্থিরতায় দাঁড়িয়ে থাকলো দরজার বাহিরেই। ভিতরে না গিয়ে। আয়ন কয়েক কদম ভিতরে গিয়ে পুনরায় দাঁড়িয়ে যায়। পিছন ঘুরে জুইকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বাভাবিক ন্যায় তাড়া দিয়ে বলে…

—” তাড়াতাড়ি আসুন জুই আমার খিদে পেয়েছে অনেক।

জুই ইতস্তত পায়ে ফ্ল্যাটের ভিতর প্রবেশ করতেই আয়ন দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দেয় তৎক্ষনাৎ। আয়নের এমন কাজে জুই চমকে উঠে কিছু বলবে তার আগেই আয়ন হনহন করে সামনে দিকে চলে যায়। জুই পাথর মূতির ন্যায় আবারও দাঁড়িয়ে পড়ে জায়গায়। আয়নের পিছন পিছন গেল না আর। বরং চোখ আওড়িয়ে চারপাশে তাকালো। আয়নের ফ্ল্যাটটি স্বাভাবিক বড় ফ্ল্যাটের চেয়েও দ্বিগুণ বড়। এবং বিলাসবহুল। তিন তলা বিল্ডিংয়ের পুরো দুপাশের জয়েন ইউনিট একত্রে নিয়ে এই ফ্ল্যাটটি বানানো। বিশাল বড় ড্রয়িংরুমে সুন্দর করে সাজানো গোছানো দামী আসবাবপত্রে। কিন্তু কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন দেখতে পেলনা জুই। ফিহাকে ও না। সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ নিরব এই ফ্ল্যাটটি। জুই মানুষের আভাস না পেরে আরও যেন সিঁটিয়ে গেল ভয়ে। তুমুল অস্থিরতা কাজ করলো নিজের মাঝে। তাই অস্থিরতার জুই চোখ আওড়িয়ে আরও কিছু দেখবে তার আগেই সামনে থেকে আবারও তাড়া দিয়ে বলে উঠে আয়ন।
—” কিহল আসুন তাড়াতাড়ি।

অক্ষত জুই প্রচন্ড অস্থিরতা নিয়ে গেল আয়নে পিছন পিছন। আয়ন জুঁইকে নিয়ে ঢুকলো সোজা তার কিচেন রুমে। তারপর জুইকে ডেকে নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে অন্তত আদর্শ স্বরুপ নিজের কিচেনের ভিন্ন পার্ট দেখাতে দেখাতে বলে উঠে…

—” অয়েলি খাবার আমি পছন্দ করিনা। তাই আমার জন্য ঝটপট শুকনো রুটি বানিয়ে দিন। সাথে কম তেল দিয়ে আলু ভাজি করবেন। এখানে আটা-ময়দা জাতীয় সব রাখা আছে। আর এখানটায় মসলা জাতীয় সবকিছু পাবেন। এই যে বা-দিকটায় চা-কফির প্রয়োজনী সমগ্রী পাবেন। আর বাকি রেক গুলোতে কি আছে সেটা আপনি নিজেই চেক করে নিবেন একবার তাহলে আপনার জন্য সুবিধা হবে। আর ফ্রিজে সবকিছু রাখা আছে। দুপুরের খাবারের কি রাঁধতে হবে সেটা আপনিই মিলিয়ে নিয়েন। খাবার নিয়ে আমি ঝামেলা করিনা। যাহ রাঁধবে তাই খাবো। তবে এখন প্রচন্ড খিদা লাগছে আমার। তাই বিশ মিনিটের মধ্যে আমার খাবার রেডি করুন। এই ফাকে আমিও গোসল করে ফ্রেশ হয়ে আসছি কেমন। ওহ হা আমার মাথাটা চিনচিন ব্যথা করছে সারারাত জেগে থাকায়। তাই আপনি এখন আমাকে ঝটপট হাতে ব্ল্যাক কফি করে দিন এক কাপ। আমি ড্রয়িংরুমে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ!

আয়নের কথায় হতভম্ব জুইয়ের চোখ কোটা থেকে বের হয়ে আসার উপক্রম। হা হয়ে আয়নের দিকে তাকিয়ে আছে বোকার মতোন। তাকে হসপিটাল থেকে মিথ্যা বলে নিয়ে এসেছে রান্না করানোর জন্য এই লোকের? এই লোক তো সাংঘাতিক লোক। জুঁইকে আয়নের বাড়িতে না নিয়ে নিজের পার্সোনাল ফ্ল্যাটে নিয়ে আসলো কাজ করানোর জন্য? হতভম্ব জুই শুধু তাকিয়ে থাকার মধ্যে দিয়ে আয়ন চলে যেতে নেয়। কিন্তু তার আগেই হতভম্বের মুখ খুললো জুই। দ্রুত গলায় বললো…

—” আপনি আমাকে মিথ্যা বলে এখানে আনলেন কেন? ফিহা আপু আমাকে ডাকেনি আমি জানি। আপনি মিথ্যা বলেছেন তাই না?
আয়ন স্বাভাবিক ন্যায় জুইয়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বলে…
—” জুই আপনার প্রশ্নের চেয়ে আমার খাবারটা বেশি জরুরি। তাই দ্রুত আমার জন্য রান্না করুন। আমি খেতে খেতে আপনার সকল প্রশ্নের উত্তর দিব নাহয়। কিন্তু এখন কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। আমি উত্তর দিব না। আগে আমার জন্য কফি করে পাঠান তারপর বাকি রান্নাটা করুন।

কথা গুলো বলেই আয়ন জুঁইকে কিছু বলতে না দিয়ে চলে যায় ড্রয়িংরুমে। হতবুদ্ধি জুই তখনো শকট হয়ে দাড়িয়ে থাকলো। ত্রিশ সেকেন্ড মধ্যে আবারও আয়ন ড্রয়িংরুমে থেকে চেঁচালো নিজের কফির জন্য। আয়নের চেঁচানোতে জুই চমকে উঠে দ্রুততার সঙ্গে কফির জন্য পানি বসালো গ্যাসে। দক্ষ হাতে ঝটপট কফি বানিয়ে হাজির হয় আয়নের সামনে। আয়ন নিজের কফিতে গুটি কয়েক চুমুক বসিয়ে শান্ত হলো। জুইয়ের দিকে না তাকিয়ে নিজের ফোন আর কফি নিয়ে চলে গেল নিজের রুমের দিকে। জুই হতবাক দৃষ্টিতে আয়নের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। আয়ন চলে যেতেই জুইও পা বাড়ায় কিচেনের উদ্দেশ্য। কিচেন রুমে দাঁড়িয়ে জুই খানিকটা হাসফাস করলো। সে মূলত রান্না করতে জানে। রেহেনা বেগম জুইকে আর মায়াকে নিজের হাতে রান্না শিখিয়েছেন। মায়া যখনই ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে বেড়াতে যায় তখনই নিজের পাশে দাঁড় করিয়ে রেহেনা বেগম মেয়েদের রান্না করা শেখাতেন। সেই সুবাদে বেশ ভালোয় রান্নাটা আয়ত্তে আছে তাদের দুইবোনের। জুই হাসফাস করতে করতে আয়নের জন্য রুটি আর আলু ভাজি করে নিল বিশ মিনিটের মধ্যেই। জুই খাবার গুলো ডাইনিং টেবিলের উপর রাখতে রাখতেই আয়ন ধুপ করে এসে চেয়ার টেনে বসে পড়ে সেখানটায়। জুই চমকে উঠতেই আয়ন খাবার খাওয়া শুরু করে দেয়। খানিকটা খাবার খেতে খেতেই বলে জুইয়ের উদ্দেশ্য আয়ন…
—” আপনি সকালে খেয়েছেন জুই? না খেলে আমার সাথে বসে খেতে পারেন! আসুন!
ইতস্ততার মিনমিন গলায় বললো জুঁই…
—” আমি খেয়েছি ধন্যবাদ!
—” ওয়েলকাম!
সতেজ গলায় প্রশ্ন করলো জুঁই আয়নকে…
—” আমাকে এখানে নিয়ে আসলেন কেন?
সোজাসাপ্টা উত্তর…
—” আমার রান্না করার জন্য।
—” মানে? তাই জন্য মিথ্যা বলবেন আপনি?
খেতে খেতে বললো…
—” সত্যি বললে আসতেন আপনি?
—” একদমই না!
—” এই জন্যই মিথ্যাটা বলা আমার।
রাগী স্বরে বলে জুঁই….
—” ফাজলামো করছেন আপনি আমার সাথে? আপনার রান্না প্রয়োজন হলে বুয়া কোথায়? আমাকে এভাবে মিথ্যা বলে নিয়ে আসার মানে কি। আমাকে বাবার কাছে দিয়ে আসুন আপনি।
—” আপাতত আপনার সাথে ফাজলামো করছিনা আমি। বুয়ার হাতের রান্না খাবো না বলেই তো আপনাকে নিয়ে আসলাম। তাছাড়া বিকালের আগে বাবার কাছে যাওয়ার আশা ছেড়ে দিন। এবং গিয়ে আমার জন্য দুপুরের রান্নাটা করুন। ততক্ষণে আমি কয়েক ঘন্টা ঘুমিয়ে নিব। আমার ঘুম দরকার। আপনার রান্না শেষ হলে তিন নাম্বার রুমটায় গিয়ে রেস্ট করে নিবেন। আর নয়তো টিভি দেখবেন ভালো না লাগলে।

—” আমি এখানে থাকবো না। আমি বাবার কাছে যাব। দিয়ে আসুন আমাকে। শুধু শুধু কেন আমাকে নিয়ে এসেছেন আপনি এখানে? আপনি চাইলে তো রেস্টুরেন্টে থেকে খাবার অর্ডার করে খেয়ে নিতে পারতেন তাই না? এসবে আমাকে জড়ালেন কেন?

—” কারণ আপনি আমার বউ হন তাই। আজকে রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম! বউ আমায় রান্না করে খাওয়াচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হলো আরে আমার তো বউই নেই। তাহলে রান্না করে কে খাওয়াবে আমায়? কিন্তু বিকাল হতে হতে মনে হলো আরে না, আমার তো একটা বউ আছে। তার হাতের রান্নাটা তো আমি খেতে পারি। এখন আমার বউ আপনি। তাই স্বপ্ন অনুযায়ী এখন আপনি আমার জন্য তিনবেলা রান্না করবেন। দুপুরে খাওয়া পর আপনি আমার জন্য রাতের খাবারটা রেঁধে টিফিন বাক্সের ভিতর গুছিয়ে দিবেন আজ। আমি হসপিটালের নিয়ে যাব। এবার গিয়ে দুপুরে রান্নাটা করে ফেলুন। যান!

অন্তত রাগে দুঃখের চললো কিচেন রুমে দিকে জুঁই। আর কথা বাড়ালো না আয়নের সাথে সে। এই অসভ্য ডাক্তারের হঠাৎ মোড পরিবর্তন হওয়া বিষয়টিই জুইয়ের মাথায় ঢুকছে না। জুই রাগান্বিত ভঙ্গিতে কিচেন দিকে যেতে নিলে আবারও পিছন ডাকে আয়ন। জুই আয়নের দিকে নাক মুখ কুঁচকে তাকাতেই আয়ন রুটির সাথে ভাজি নিয়ে মুখে তুলতে তুলতে বলে…
—” জুই! আপনার রোজ রোজ গোসল করার অভ্যাস আছে তো? না মানে অনেক মেয়েরাই তো শীত আসলে রোজ রোজ গোসল করতে চাই না। শীত করে বলে। আপনি তেমন নয়তো? শীত তো প্রায় চলে আসলো বলে! তো এখন গোসল-টোসল করা হয়তো ঠিকঠাক নাকি অভ্যাস ই নাই রোজ গোসল করার? কোনটা?

আয়নের কথায় অপমান বোধ করলো জুই। সেতো রোজ রোজ গোসল করে। ভুলেও একদিন মিস দেয়না গোসল করা থেকে। তারপরও কেন অসভ্য ডাক্তার তাকে গোসল নিয়ে কথা শুনাচ্ছে সেটাও বুঝতে পারছে না জুই। তাই জুঁই আয়নের করা অপমানে লাল হয়ে, রাগী দৃষ্টিতে তাকায় আয়নের দিকে সে। মুখে অন্তত রাগের আভাস ফুটিয়ে ধারালো গলায় বলতে চাইলো..
—” আপনি কিন্তু…
জুইয়ের কথা শেষ করতে না দিয়ে আয়ন পুনরায় বলে উঠে…
—” আমি কিন্তু রোজ রোজ গোসল দেয়। মাঝেমধ্যে দিনে দুবারও দেয়। গোসল করা মানুষ আমার পছন্দ। এখন যদি আপনি রোজ রোজ গোসল করতে না চান। তাহলে সেই ক্ষেত্রে কিন্তু আমার ব্যাপক টেনশন করতে হচ্ছে জুঁই? আচ্ছা জুই! আপনাকে যদি আমি রোজ রোজ গোসল করার মূখ্য কারণ দেয়। তাহলে নিশ্চয়ই আপনি রোজ গোসল করবেন লক্ষী মেয়ে মতোন। তাই না?

আয়নের হঠাৎ বেগতিক কথার মানেটা তখনো বুঝলো না জুই। তাই খানিকটা কপাল কুঁচকে অবুঝ গলায় প্রশ্ন করে বলে…
—” মূখ্য কারণ মানে?
আয়ন পুনরায় মুখে খাবার তুলতে তুলতে তাকায় জুঁইয়ের দিকে। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে লিপিপ্ত গলায় বলে উঠে…
—” ফরজ গোসল বুঝেন মিসেস চৌধুরী? ঐ-যে বাসর রাতে স্বামী-স্ত্রী মধ্যে কি-জানি হয় না? তারপর সকালে উঠে স্বামী স্ত্রীকে গোসল করতে হয়। ঐটা-ই আরকি। আর একটু ভেঙ্গে বলি দাঁড়ান! সকালে উঠে বউদের শরীরে যে কালো কালো দাগ গুলো পাওয়া যায় না? ঐটাকে কি বলে জানি? ধুর! আমার তো মনে পড়ছে না। আপনিই বলুন না জুই কিজানি বলে?

আয়নের চিন্তিত ভঙ্গির মধ্যে দিয়েই প্রচন্ড লজ্জায় সিটিয়ে পড়ে জুঁই। বুক কম্পনের সাথে সাথে জুঁইয়ের সমস্ত কায়া কেপে উঠে আয়নের নির্লজ্জ কথায়। আয়নের কথার মানে বুঝতে পেরে মূহুর্তেই চোখ মুখ লাল হয়ে উঠে গাঢ় লজ্জায়। আয়ন তাকে হুট করে এমন নির্লজ্জ কথাবার্তা বলবে সেটা কখনোই ভাবিনি জুঁই। তাই লজ্জা সিঁটিয়ে গিয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না আয়নের সামনে। তাই আয়নের সামনে থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগে নাক মুখ ছিটকে আয়নকে গালি দিয়ে বেশ জোরেই বললো…
—” অসভ্য ডাক্তার।
কথাটা বলেই জুই দৌড়ে পালিয়ে যায় কিচেন রুমের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে পিছনে থেকে আবারও আয়ন তেজি গলায় জুঁইয়ের উদ্দেশ্য বলে উঠে…
—” অসভ্য নাতো জুই। এটাকে মনে হয় লাভ ব্রাইট বলে। এখন আমি আপনাকে রোজ রোজ এই মূখ্য কারণ গুলো দিলে আপনি গোসল করবেন তো জুঁই? আমি কিন্তু টেনশনে আছি আপনার গোসল করা নিয়ে?

( গল্পের এমন একটা উক্তি কমেন্ট করুন যেটা আপনাদের মন ছুঁয়ে গেছে। আর যদি মন ছুতে না পারে তাহলে সরি বলে কাজ চালিয়ে দিন। ধন্যবাদ সবাইকে)

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply