Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৬


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

(কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ)
৪৬
মায়া গোসল করে ড্রাইনিং টেবিলে আসতে আসতে দেখলো রিদ ততক্ষণে অফিসে চলে গেছে নাস্তা করে। বাকিদের সবাইকে যথারীতি ড্রাইনিং টেবিলে উপস্থিত পেল মায়া। রিদের চেয়ারটা শূন্য অবস্থায় খালি পেতেই চোখ দুটো টইটম্বুর হলো জলে। মায়ের আদের্শ রক্ষাতে গোসল করে আসলো সে। অথচ ফিরে এসে পাষাণ স্বামীকে ফেল না। অবুঝ মায়া বুঝলো না কেন রিদ মায়াকে দেখেও দেখে না? কেন মায়ার সাথে কথা বলতে চাইছে না? আর কেনই বা তাকে এড়িয়ে চলছে। অক্ষত মায়া দুঃখী মনে গিয়ে বসলো নিজের চেয়ারে। পেটের খিদায় খাবার কাছে পেতেই এক মূহুর্তের জন্য রিদকে ভুলে গেল। শুধু মনে রাখলো সামনে থাকা খাবার গুলোকে। মায়া খাওয়ার মধ্যে দিয়েই জোড়ালো প্রশ্নের সম্মোহনী হলো হেনা খানের। তিনি অন্তত সূক্ষ্ম চোখে মায়ার গলার কামড়টা পযবেক্ষণ করে বলে….

—” এই তোর গলায় কি হয়েছে? কিসের দাগ ওটা?

হেনা খান হঠাৎ প্রশ্নে থমথমে খেয়ে যায় রেহেনা বেগম। যদিও রিদ বলেছে তাদের মধ্যে কিছু হয়নি। তারপরও সংকোচতায় আর ফিরে তাকাতে পারিনি মায়ার দিকে। চেপে থেকে খাবার খেতে লাগলো। কিন্তু উপস্থিত বাকিদের সবার নজর ঠিক গেলো মায়ার গলায় গাঢ় লাল কালচে হয়ে থাকা দাগটার দিকে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো সবাই। কিন্তু মায়ার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হলো না। এবং খেতে খেতে স্বাভাবিক ন্যায় উত্তর করলো হেনা খানের প্রশ্নের…
—” এলার্জি হয়েছে দাদী।
খানিকটা উত্তেজনায় মায়ার দিকে এগিয়ে আসলো হেনা খান। মায়ার মাথাটা টেনে নিজের দিকে উপরে তুললো। মায়ার গলার দাগটা চিন্তিত ভঙ্গিতে দেখে বলেন…
—” সেকি হঠাৎ এলার্জি হলো কি করে তোর? কি খেয়েছিস তুই? রাতে তো কিছুই খেলিনা। তাহলে এলার্জি হলো কি করে?
—” খেয়েছি তো দাদী। মধ্যে রাতে ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা খেয়েছিলাম তারপর থেকেই এমনটা হয়েছে?
মায়ার কথাটা ঠিকঠাক গ্রহণ যোগ্য হলো না হেনা খানের। তিনি কিছু বলবেন তার আগেই সামনে থেকে তীক্ষ্ণ প্রশ্নের সম্মোহনী হয় আরাফ খানের। তিনি বললেন…
—” ঠান্ডায় কি এলার্জি আছে নাকি তোমার সোনামা? কোন ঠান্ডা খেয়েছিলে তুমি? নাম কি?
—” নামটা জানিনা। খাওয়ার সময় লক্ষ করিনি দাদাভাই। ঠান্ডায় এলার্জি আছে কিনা তাও তো জানি না আমি। আজ প্রথমই এমনটা হয়েছে আমার সাথে…

কেউ কোনো প্রশ্ন করলো না আর এই নিয়ে মায়াকে। সবাই স্বাভাবিক ভাবেই বিষয়টি নিল। হেনা খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললো….
—” খাওয়ার পর আমার থেকে এলার্জি একটা টেবলেট খেয়ে নিবি কেমন? বলা যায়না যদি আরও বাড়ে। সতর্ক থাকা ভালো। আমি ফ্রিজে ঠান্ডা গুলোও এক্সচেঞ্জ করে নিব একবার। তুই খা! খেয়ে কলেজে যাহ।
—” কেন? আমি হসপিটালের যাব না?
—” যাবি বিকাল করে। আমি নিয়ে যাব। কিন্তু এখন তুই কলেজে যাবি। দুইমাস ধরে কলেজ বন্ধ যাচ্ছে তোর। পড়া মিস যাচ্ছে। কলেজে শুরুই হয়েছে মাত্র তিন মাস হলো। তার মধ্যে দুইমাস তোর বন্ধ গেল। পড়াশোনায় কতটা পিছিয়েছিস খবর আছে তোর? তাই বাহানা না দিয়ে কলেজে যাহ তাড়াতাড়ি।
অসন্তোষ্টের গলা ঝাড়লো মায়া। বিরক্তি ভঙ্গিতে বললো…
—” আচ্ছা!
~~
পিংক কালারের বোকরা পরিহিত মায়াকে কলেজ ব্যাগে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখে চমকে উঠে হেনা খান। তিনি ড্রাইনিং টেবিলে গোছানোর সময় চোখে পড়লো মায়াকে বোকরা পরিহিত অবস্থায় কলেজ ব্যাগ কাঁধে চাপিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে। সাথে অবশ্য জুইও রয়েছে। মায়া কলেজে যাবে তোহ জুই রেহেনা বেগমের সাথে হসপিটালের যাবে। হেনা খান হাতে প্লেটটা শব্দবিহীন টেবিলে উপর রেখে সম্পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মায়ার দিকে। মায়ার গায়ে কাজ বিহীন একদম নরমাল মিহি জর্জেটের মধ্যে পিংক কালারের বোকরা জড়ানো। মাথা ঘুরিয়ে হিজাব করা। তোর মুখে একিই পিংক কালারের মাক্স। সেই সাথে হাতেও হালকা ডিজাইনের পিংক কালারের হাত মোজা পড়া। পায়ে মোজা পড়ে উপরে কলেজে সুজ পড়া। সব মিলিয়ে একদমই পর্দা প্রথাশীল নারী লাগছে মায়াকে। হেনা খান খানিকটা কেঁপে উঠলো যেন মায়ার এই রুপ দেখে। সমাজের উচ্চ শ্রেণি মানুষ হওয়ায় খান বাড়ির বংশধরদের মধ্যে কোনো নারীই পর্দা করে না। তাদের উঁচু শ্রেণির সমাজের সাথে হয়তো যায় তাই। কেউ কখনো করে না। কিন্তু মায়াকে হঠাৎ পর্দায় দেখে মনে শান্তি লাগলেও আবার অশান্ত হলেন এই ভেবে যে তিনি তো মায়াকে কোনো রুপ বোকরা কিনে দেয়নি। তাহলে মায়া বোকরা পেল কোথায়? মায়ার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো হেনা খান। থমথমে গলায় বললো…
—” হঠাৎ বোকরা পড়লি যে?
মায়ার সোজাসাপ্টা উত্তর…
—” আজ থেকে আমার বোকরা পড়েই চলতে হবে দাদা। উনি নিষিধ করেছেন বোকরা না পড়ে বাহিরে যেতে। তাই বোকরা পড়ছি।

হেনা খান আর মায়ার কথোপকথন ড্রয়িংরুমের সোফার থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ফিহা, রেহেনা বেগমও আরাফ খান। তারা টুকটাক কথা বলছিল নিজেদের মাঝে। আর মায়ার জন্য আরাফ খান অপেক্ষা করছিল। তিনি মায়াকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে অফিসে যাবেন বলে। কিন্তু মায়াকে বোকরা পড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে খানিকটা অবাক তারাও হয়েছে। হেনা খান মায়ার কথার প্রেক্ষিতে পুনরায় প্রশ্ন করে মিহি কন্ঠে। তিনি বলেন…
—” রিদ বোকরা পড়তে বলেছে তোকে?
—“হুমম!
—” এসব বোকরা রিদ কিনে দিয়েছে তোকে?
—“হুমম!
—” কবে?
—” দুইমাস আগেই। যেদিন নাকফুল পড়েছিলাম সেদিনই তো কিনে দিয়েছিল উনি। তুমি দেখনি?
মায়া কথায় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেন হেনা। মনের মধ্যে অন্তত শান্তির ঢেউ খেলে গেল মায়ার কথা শুনে। অবশেষে তিনি পেরেছেন রিদকে সংসারী করতে। আর কোনো চিন্তা নেই উনার। এবার মায়া ভালোই ভালোই মায়া অনার্স পাসটা করলেই হলো। ঘটা করে আবারও বিয়ে দিবেন তিনি দুজনের। কিন্তু ততদিনে মায়ার পরিবার ঝামেলা না করলেই হলো।
~~
দুপুর দুইটা। সময় মাফিক আয়ন নিজের গাড়ি ছুটিয়ে হসপিটালের গেইট ধরে ভিতরে ঢুকার সময় বেখেয়ালি চোখ যায় রাস্তা পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুঁইয়ের উপর। অন্তত হাসি মুখে দাঁড়িয়ে কথা বলছে শুভর সাথে। হাতে ফুচকা প্লেট। চোখে ঠোঁটের সাথে মৃদু মাথা নাড়িয়ে হেসে কথা বলছে জুঁই। তাঁর ঠিক পাশেই অবশ্য ফিহাও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেদিকে চোখ গেলো না আয়নের। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আপাতত জুঁইয়ের উপরই৷ মেয়েটা অকারণে অন্তত বেশিই হাসে আজকাল। অযথা হাসিটাও এক প্রকার বিরক্তি কারণ হলো আয়নের। আয়নের সমস্যাটা এটা না যে জুঁই বেশি হাসে। তার সমস্যা হলো জুঁইয়ের হাসিটা নিয়ে। জুঁইয়ের হাসিটা চির পরিচিত তাঁর। মায়ার হাসি মতোন। তাই আয়নের সমস্যা হয় যখন জুঁই হাসে। না চাইতেও মনে করিয়ে দেয় মায়াকে। মনে করিয়ে দেয় তার বুকের তীব্র চাপা ব্যথাটাকে। আয়ন ভুলতে চাই মায়াকে। কারণ মায়া তাকে নয় রিদকে ভালোবাসে। শুধু ভালোবাসে যে তা নয়! অসম্ভব পাগলামো রয়েছে মায়ার ভালোবাসাতে রিদের জন্য। যেখানে আয়নের জায়গায় কোথায়ও নেই। হয়তো পাবেও না আর। আয়ন জুঁইয়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকায়। থামিয়ে দেওয়া গাড়িটা পুনরায় চালিয়ে হসপিটালের পাকিং এরিয়াতে চলে যায়। গাড়ি পাক করে হসপিটালের ভিতর যেতে গিয়েও হঠাৎ থেমে যায়। কিছু একটা ভেবে আয়ন ঘুরে যায় রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুঁইয়ের দিকে। গেইট ধরে বের হতেই আবারও চোখে পড়লো জুঁইকে। ততক্ষণে শুভ জুঁইকে পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছে পানি খাওয়ার জন্য। আর জুঁইয়ের ফুচকা প্লেট নিজের হাতে নিচ্ছে যত্ন সহকারে। আশেপাশে পরিচিত কাউকে আর দেখলো না আয়ন। তবে চোখ ঘুরাতেই ফিহাকেও দেখলো পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা খাচ্ছে। তবে অল্প একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ন কপাল কুঁচকে এলো জুঁই শুভের ঘনিষ্ঠতা দেখে। পর মূহুর্তে ভাবলো হয়তো দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার যোগল হবে। আয়ন আর ঘাটালো না সেই বিষয়ে। বরং এগিয়ে গেলো তাদের সামনে। নিজের উপস্থিত জানান দিতে গলা ঝেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললো আয়ন…

—” জুঁই আপনি আমার কেবিনে আসুন দশ মিনিটের মধ্যে।

জুই পানি খাচ্ছিল আয়নের হঠাৎ কথায় নাকে মুখে উঠলো সঙ্গে সঙ্গেই। জুঁইকে শান্তি করার জন্য ততক্ষণে শুভও জুঁইয়ের মাথায় ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে খানিকটা অস্থির ভঙ্গিতে। জুঁই থামলো। আড়চোখে তাকালো আয়নের দিকে। আয়নের দৃষ্টি বেশ তীক্ষ্ণ ও প্রখর। তাদের দিকেই তাক করা কপাল কুঁচকে। জুঁই কিছু বলতে পারলো না। তবে তার আগেই মুখ খুললো শুভ। অন্তত ভদ্রতার স্বরুপ হেসে বললো..

—” আরে ডক্টর আয়ন যে। আপনি তো আচ্ছা লোক। হুটহাট উপস্থিত হয়ে চমকে দেন আমাদের। এবার কিন্তু তার থেকে একটু বেশি হয়ে গেল। আমাদের জুঁই ভয় পেয়েছে। ডাক্তার হয়ে সুস্থ মানুষকে রোগী বানাতে নেই। যায় হোক! তা জুঁইকে কি দরকার আপনার? কেবিনে কেন যাবে কিছু বলবেন নাকি আপনি?

শুভের অতি ভদ্রতা টাইপ কথা গুলো পছন্দ হলো না আয়নের। খানিকটা বিরক্তি বোধ করলো। তবে চেহারায় প্রকাশ করলো না সেটা। স্বাভাবিক থাকলো। বামহাতের ঘড়িতে সময়টা দেখে নিয়ে পকেটে দুহাত গজিয়ে দাঁড়ালো। স্বাভাবিক ন্যায় বলে উঠলো…
—” আপনার কৌতূহল বেশ। থাকাও ভালো। আর
আপনাদের জুঁই মনে হয় জানে কেন ডাকছি তাকে আমি। তারপরও যদি কৌতূহল মেটাতে চান তাহলে এই প্রশ্নটা আমাকে নয় বরং আপনাদের জুঁইকে করুন। আশা করছি উনি আপনাকে উত্তরটা দিবেন মিস্টার শুভ। অনুরুপ ভাবে আমি একজন ডক্টর মানুষ। সুস্থ মানুষকে যদি রোগী বানানোর ক্ষমতা রাখি! তাহলে তাঁকে পুনরায় রোগী থেকে সুস্থ বানানোর ক্ষমতাও রাখছি আমি। তাই বলা যায় ডক্টর আমি, রোগীও আমার। সবই আমার। মাঝ থেকে বাদ পড়লেন আপনি।

আয়নের ঘুরপ্যাচ কথায় কপাল কুঁচকে আসে শুভের। আপাতত আয়নের লাস্ট কথার মানেটা বুঝতে পারছে না সে। বুঝার চেষ্টাও হয়তো করেনি। তবে শুভ পুনরায় কিছু বলবে তার আগে আবারও মুখ খুললো আয়ন। ফিহাকে উদ্দেশ্য করে বললো…
—” তুই এখানে কেন?
আয়নের কথায় থমথমে গলায় উত্তর করলো ফিহা…
—” জুঁইয়ের সাথে এসেছি ভাই আঙ্কেলকে দেখতে। আর আম্মু বাসায় নেই তাই কাল নানু বাড়িতেই ছিলাম আমি। আরও দুইদিন থাকবো নানুবাড়িতে। তারপরও বাসায় যাব।
—” দুপুরের খেয়েছিস তোরা?
—” নাহ! একটু পর খাবে। আরিফ! না মানে আরিফ ভাইয়া খাবার আনতে গেছে রেস্টুরেন্টে থেকে। জুঁই ফুচকা খাবে বলে আমাদের এখানে দাঁড় করিয়ে গেছেন তিনি।
—” হুমম।
আয়ন পুনরায় চোখ তুলে তাকায় জুঁইয়ের ইতস্তত চেহারার দিকে। গম্ভীর মুখে আবারও নিজের বামহাতের ঘড়িটি দেখে নিয়ে তাড়া দিল জুঁইক সে। বলে উঠলো…
—” দশ মিনিট! দশ মিনিট সময় আছে আপনার কাছে জুই। দশ মিনিটের মধ্যে আপনাকে আমার কেবিন দেখতে চাই। কুইক!

কথাটা বলেই চলে যেতে নেয় আয়ন। কিন্তু পিছন থেকে জুইয়ের জড়তা ডাক শুনে থেমে যায়। এবং কপাল কুঁচকে জুইয়ের দিকে তাকাতেই পুনরায় জুই ইতস্তত সহিত বলে উঠে…
—” কেবিনে কেন?
—” আমি কথা বলবো তাই। কারণ পারসোনাল টু বি পারসোনাল। আমি পারসোনাল কিছু অবশ্যই কারও সামনে বা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলবো না তাই না? তাই বলছি আপনার হাতে দশ মিনিট সময় আছে আমার কেবিনে আসুন দ্রুত। নয়তো এগারো মিনিটে মাথায় যেটা হবে সেটা নিশ্চয়ই শোভানীয় কিছু হবে না আপনার জন্য। সো বি কুইক! এন্ড কাম ফাস্ট!
আয়নের কথা শেষ করেই যে দাপে এসেছিল সেই দাপে আবার চলেও গেল। শুভ আয়নের হঠাৎ আচরণটা বুঝতে না পারলেও জুই, ফিহা ঠিকই বুঝতে পারছে কেন আয়ন জুঁইয়ের সাথে আলাদা করে কথা বলতে চাইছে।
~~
থমথমে পরিবেশ। আয়নের কেবিনে জড়তা নিয়ে বসে আছে জুঁই। আর বারবার আড়চোখে আয়নের কমকান্ড দেখছে। আয়ন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নিজের কেবিনের সেল্ফের তাককের মধ্যে কিছু একটা খুঁজে চলছে মনোযোগ সহকারে। পেয়েও গেল অবশেষে। নীল কভারের একটা পাতলা ফাইল হাতে নিল। পৃষ্ঠা উল্টিয়ে চেক করলো ফাইলটা ঠিক আছে কিনা। সঠিক ফাইল হতেই স্বস্তির ভঙ্গিতে পুনরায় নিজের চেয়ার টেনে বসলো জুইয়ের সামনে। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জুইয়ের সামনে নীল ফাইলটা টেবিল ঘেঁষে এগিয়ে দিতে দিতে বললো আয়ন…
—” একবার ফাইলটা চেক করে নিন জুই। দেখুন সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা? এখানে আমাদের বিয়ের কাবিননামা আছে। সাথে আমাদের ডিভোর্সের নোটিশ নামাও। অবশ্য এখানো ডিভোর্স পেপার বানানো হয়নি। তবে এই নোটিশনামা দেখেই অল্প দিনের মধ্যে ডিভোর্স পেপারও বানানো হয়ে যাবে। আপনি শুধু একটাবার চেক করে আমাকে জানান।

আয়নের কথায় মূহুর্তে সমস্ত কায়া নাড়িয়ে বুক কেঁপে উঠলো জুঁইয়ের। নিশ্বাস আটকে আসায় টেবিলের নিচ দিয়ে নিজের জামা চেপে ধরলো শক্ত করে। কষ্টে গলা জমে আসলো আয়নের মুখে ডিভোর্স শব্দটি শুনে। জুই জানতো এমন কিছুই হবে। আগের থেকে পূব প্রস্তুত ছিল। তারপরও নিজেকে সংযম করতে কষ্ট সাধ্য হচ্ছে। বেখেয়ালি জুঁই মাথা নিচু করে মন্ত হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলো। নিজের কষ্ট গুলো সংযম করে নিজেকে স্বাভাবিক রাখা চেষ্টা করলো। সফলও হলো। মুখে দারুণ হাসি রেখে নরমাল হলো। চোখ তুলে তাকালো আয়নের কুঁচকে আসা চেহারা দিকে। জুই নিজের মনোবল শক্ত করতে আয়নের সামনে সকল প্রকার জড়তা, ইতস্ততা কাটিয়ে স্বাভাবিক ন্যায় বসে মিষ্টি হাসলো। হাত বাড়িয়ে সামনে থাকা ফাইলটা পুনরায় টেলে আয়নের দিকে দিতে দিতে দারুণ হেঁসে বললো…
—” আপাতত দরকার নেই ডক্টর সাহেব। আপনি আছেন তো চেক করার জন্য। আমার কিন্তু সেটাতেই চলবে। আপনি শুধু আমাকে সময় আর জায়গায়টা বলে দিবেন কেমন! আমি নিজ দ্বায়িত্বে এসে সাইনটা করে দিব ডিভোর্স পেপারে।
জুইয়ের স্বাভাবিকতা দেখে আয়ন চমকালো না বিন্দুমাত্রও। বরং স্বাভাবিক লাগলো। লাগাটাই স্বাভাবিক! বিয়েটা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল তাই দু’জনের কারও মধ্যেই ভালোবাসা নামক জিনিসটি নেই। তাই কেউ কাউকে ছেড়ে দেওয়ার কষ্টও পাওয়ার কথা না। আয়ন মনোযোগী হলো না সেই বিষয়ে। তবে নীল ফাইলটি পুনরায় এগিয়ে দিল জুঁইয়ের দিকে এবং নিজের কথা শেষ করতে আবারও বলে উঠলো…
—” আপনি একবার চেক করুন। তাহলে সবটা বুঝতে পারবেন। আমাদের ডিভোর্স হতে আরও মাস খানিকটা সময় লাগতে পারে। তাতে আপনার সমস্যা হবে নাতো?
—” না।
—“বেশ! তবে আরও একটা কথা ছিল আমার।
জুই ফাইলের পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে বললো..
—” বলুন।
আয়ন গম্ভীর চোখ তুলে তাকালো জুঁইয়ের দিকে। জুইকে দুই সেকেন্ড দেখে নিয়ে বললো…
—” দেখুন আমাদের বিয়েটা যেভাবেই হোক না কেন আপনি কিন্তু আমার ধর্মীয় ও আইনগত দিক থেকে আমার রিগেল স্ত্রী। তাই স্ত্রীদের হোক হিসাবে আমাদের ধর্মের একটা দেনমোহর দিতে হয় স্বামীকে। যদিও বিয়ের সময় দেওয়ার নিয়ম কিন্তু আমাদের বিয়েটা স্বাভাবিক ছিল না বিদায় দেনমোহর দেওয়া হয়নি আমার। তাই আমি চাচ্ছিলাম কাবিননামার যেই দেনমোহরটা দেওয়া আছে সেটা আমি আপনাকে দিতে চাই ডিভোর্স পেপারে সাথে। যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে তো।
কেঁপে উঠা বুকের সাথেও জুই দারুণ হাসলো। ফাইলটা বন্ধ করে চোখ তুলে তাকালো আয়নের দিকে। মিষ্টি হেঁসে গোছানো কথা বললো…

—” সুন্দর চিন্তা ভাবনার আপনার। আমাদের সমাজের আপনার মতো সুন্দর চিন্তা ভাবনার মানুষ খুবই অভাবনীয় ডক্টর। ভাগ্যিস আমার আপনার সাথে দেখা হলো। নয়তো সারাজীবন তো এই বিরহেই কাটাতে হতো কেন আমার জীবনে এতো সুন্দর চিন্তা মানুষ পেলাম না এই ভেবে। যাক আপনি আমাকে ধন্য করলেন আমার জীবনের এসে। আমার চিন্তাটাও দূর করলেন। আমি কৃতজ্ঞ! এবং অন্তত খুশি হলাম আপানার মতো একজন সুন্দর চিন্তার মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে। তবে একটা বিষয়ে খুশি হতে পারছি না ডক্টর। এই যে আপনার মতো উচ্চবিত্ত বড়লোক মানুষের স্ত্রী হয়েও কাবিননামার টাকা এতো কম কেন হলো? মাত্র বিশ লাখ টাকা? বেশি কম হয়ে গেল না? আমার তো পোষাচ্ছে না। এই ধরেন, আপনার মতো বড়লোক স্বামীর বউদের তো কাবিননামা হবে দুই থেকে তিন কোটি টাকা মতো। তাহলেই তো পোষাবে আমাদের তাই না! এজন্যই বলছি, একটু কিপ্টামি হয়ে গেল না ডক্টর আমার কাবিননামার বেলায়? হুমম হয়েছে তো! ভিষণ বাড়াবাড়ি রকমের কিপ্টামি হয়েছে। তাই মানতে পারছি না বিষয়টি। সাথে কষ্টও লাগছে ভিষণ! এতো বড়লোক স্বামী পটিয়ে বিয়ের করলাম তাও লাভ হলো না। মাত্র বিশ লাখ টাকার কাবিননামাটা আমার চলছে না ডক্টর। তাই আপনিই রেখে দিন এটা। আমার তরফ থেকে গিফট নয় টিপ হিসাবে আপনার দ্বিতীয় বিয়ের জন্য। ভালো হানিমুন প্যাকেজ তো নিশ্চয়ই পাবেন এই টাকায়। আপনার দ্বিতীয় বউও খুশি হয়ে যাবে ভাববে স্বামী তার ভিষণ বড়লোক ও রোমান্টিকও। সেই সাথে আমিও দয়ালু হয়ে যাব এতো টাকা টিপ হিসাবে আপনাদের দিতে পেরে। আজকাল আমাদের সমাজে দয়ালু মানুষেরও বড্ড অভাব আছে ডক্টর। আপনার সুন্দর চিন্তার প্রেমে পড়ে আমিও ততক্ষণে দয়ালু হওয়ার চিন্তা ভাবনাটা করে ফেললাম। কি ভালো না আইডিয়াটা। আমার কিন্তু দারুণ লাগছে ডক্টর।

জুইয়ের দীর্ঘ কথায় আয়ন দারুণ হাসলো। শ্যামবর্ণে মুখে মায়াবী সেই হাসি। জুইয়ের কথা গুলো তার মনে ধরেছে ভিষণ। মেয়েটি ছোট হলেও ভিষণ তেজি। বয়সের তুলনায় ম্যাচুরিটি বেশি। গোছানো কথাবার্তা। তাকে অপমানও করছে মিষ্টি ভাষায়। আয়ন হাত বাড়িয়ে জুইয়ের সামনে থেকে ফাইল নিতে নিতে নিজ বাক্যে বললো…

—” আপনার অপমান করার ধরণটাও ইউনিক। আই লাইক ইট। তবে আপাতত আপনাকে আমি দয়ালু হতে সাহায্য করতে পারছি না মনে হয় জুঁই। তার জন্য এডভান্স সরি! কারণ ঐ যে বললেন, আমি সুন্দর চিন্তা ভাবনার মানুষ। তাই আপনার সুন্দর কথায় আটকে গেছি। এজন্য আপনার কথা রক্ষাতে হলেও আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে বিন্দুমাত্র পিছু পা হবো না। আপনি না চাইলেও কাবিননামার প্রাপ্যটা আমি আদায় করবো জুঁই।

—” আই এম ইমপ্রেস! সত্যিই আপনার মতো সুন্দর চিন্তার মানুষ হয়না ডক্টর। যায় হোক! একটা গল্প শুনবেন? যদিও আপনার হাতে সময় নেই। কিন্তু কথা দিচ্ছে বেশি সময় নিব না। জাস্ট দশ মিনিট সময় নিব আপনার। কি দেওয়ার যাবে আমাকে আপনার মূল্যবান দশ মিনিট সময়? প্লিজ ডক্টর! আজ অন্তত না-টা বলবেন না। নরম মনটা ভেঙে যাবে আমার। আর আমার নরম মনটা ভেঙ্গে গেলে কিন্তু আমি মাঝে মধ্যে একটু আধটু বেয়াদব হয়ে যায় আরকি। আমি বেয়াদব হলে হয়তো ডক্টরের রোগী হওয়ার সম্ভবনা আছে। তাই বলছি ভেবে চিন্তে না-টা কিন্তু করবেন ডক্টর। কারণ আমার আপনাকে গল্পটা শুনানোর মনোবলটা দৃঢ়।

জুইয়ের হাসি মুখে ঠান্ডা হুমকিতে দৃষ্টি বদল হলো আয়নের৷ গাঢ় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো জুইয়ের দিকে কিছুক্ষণ। মেয়েটাকে যতটা সহজ সরল ভেবেছিল আয়ন। আসলে ততোটাও সহজ সরল নয় মেয়েটা। বরং তার চেয়ে বেশি শক্ত ধাঁচের। কথাবার্তাও প্রচুর গোছানো এবং আত্মবিশ্বাস। সহজে কারও কথাই আসার মেয়ে তো নয়ই। সামান্য একটা পিচ্চি মেয়ে হয়ে ঠান্ডা মাথায় আয়নকে হুমকি দিচ্ছে। তাহলে সেই মেয়ে অনাহেষেই সাহসীও বটে। আয়ন গম্ভীর হলো কিছুটা। তবে জুঁইকে সম্মতি জানিয়ে বললো…

—” ইন্টারেস্টিং! একটা পিচ্চি মেয়ে আমাকে হুমকি দিচ্ছে বিষয়টি আমার কাছে দারুণ কৌতূহল দৃষ্টির কারণ মিস জুঁই। তাই আপনার গল্পটি তো শুনতেই হচ্ছে এবার। আপনি বলুন আমি শুনবো।

আয়নের কথায় হালকা হাসলো জুঁই। এবং ঠান্ডা মেজাজে বলতে শুরু করলো…

—” মায়ার বাবা! উঁহুম! আমার বাবা। মায়ার থেকে আমার অধিকার বেশি মায়ার পরিবারের উপর। কারণ নামমাত্র মায়ার পরিবার কিন্তু আমার অধিকার বোধ মায়ার থেকেও বেশি। কারণ মায়াকে উনারা নিজেদের থেকে দূরে রাখছে। কিন্তু আমাকে মোটেও নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে না। বরং বুকে আঁকড়ে রাখে। যত্ন করে। প্রচুর ভালোবাসে। চোখে হারায়। মায়ার বিষয়ে কম্প্রমাইজ করলেও আমার বিষয়ে নো কম্প্রমাইজ। তাহলে বলুন মায়ার পরিবার কিভাবে হলো? পরিবার তো আমার হলো তাই না?

আয়ন চমকানো ভঙ্গিতে বললো তৎক্ষনাৎ…
—” মানে? আপনার বাবা! মায়ার বাবা! মায়ার পরিবার। কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু ক্লিয়ার করে বলুন জুঁই।
আবারও হাসলো জুঁই। ফুরফুরে মেজাজে পুনরায় বললো..
—” আপনি কিন্তু আমাকে বলতে দিচ্ছেন না ডক্টর। মধ্যে প্রশ্ন করে আটকিয়ে দিচ্ছেন।
—” আচ্ছা সরি! প্রশ্ন করবো না আর। আপনি বলুন প্লিজ!

—” আমাকে চার মাসের গর্বে রেখে আমার আব্বু মারা যায়। ব্রেইন টিউমার ছিল দীর্ঘদিনের আব্বু সেটা ধরতে পারেনি প্রথমে কিন্তু যখন ধরতে পারলো তখন অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। আব্বুর আম্মুর সাথে বিয়ে হয়ে গেছিল আর তাদের ভুল স্বরুপ আমি আম্মুর গর্বে চলে আসি। আম্মু আব্বু প্রেমের বিয়ে ছিল। উনাদের এক বছরের সংসারের ফল আমি। আব্বু রোগ ধরা পড়ে তখন আমি দুই মাসের গর্বে। এর আগেই রোগের সমস্যা দেখা দিলেও আব্বু সেটা গায়ে মাখতো না। এরিয়ে চলতো। যার ফল স্বরুপ রোগ ধরা পড়ার দুইমাসের মাথায় মারা যান উনি। মা ভেঙ্গে পড়েন। নানু বাড়ির মানুষজন আম্মুকে পরামর্শ দিলেন আমাকে এবরশন করে মেরে ফেলতে। আম্মু সুন্দর জীবন আছে ভবিষ্যতে। আমাকে জম্ম দিলে সেটা নষ্ট হতে পারে। তাছাড়া আব্বু বেঁচে নেই। আর একা একা জীবন পার হয়না। হেনতেন বলে উনাকে রাজি করায়। আম্মুও সঠিক সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি আব্বুকে হারানোর শোকে ছিলেন তাই একটা সময় উনিও রাজি হয়ে যান। এবং সিদ্ধান্ত নেন আমাকে মেরে ফেলার। আমি তখন পাঁচ মাসের গর্বের। কিন্তু সেদিন আমাকে বাঁচাতে ঢাল হয়ে দাড়িয়ে ছিলেন আমার বাবার, আদর্শ বড় ভাই শফিকুল ইসলাম। বাঁচিয়েও নিলেন সেদিন। তবে তারজন্য উনাকে জরিমানা স্বরুপ বড় একটা অংক চুকাতে হয়। আমার বাবার নামের সকল সম্পত্তি আমার মায়ের নামে লিখে দেয় নানু বাড়ি মানুষদের কথায়। শর্ত অনুযায়ী উনারা আমাকে তখনই বাঁচাবে, যখন শফিকুল ইসলাম তার ভাইয়ের সম্পত্তির ভাগ লিখে দিবেন আমার মায়ের নামে। শর্ত অনুযায়ী সব হলো। মা সম্পতি পেল। আমাকে জম্ম দিল। সাতমাস দুধ খাইয়ে ছেড়ে চলে গেল। নানু বাড়ির মানুষজন নিয়ে গেছিল তারপর উনাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দেন।
আমার বাবারা ছিল দুই ভাই। শফিকুল ইসলাম আর আসাদুল ইসলাম। শফিকুল ইসলাম মানে মায়ার বাবা পরিবারের বড় আদর্শ ছেলে ছিলেন তিনি। দায়িত্বতায় ছিল প্রচন্ড নীতিবান। আমার বাবার সাথে মায়ার বাবার বয়সে পনেরো বছর গ্যাপ ছিল। দাদীর প্রথম সন্তান হওয়ার পর দ্বিতীয় সন্তান হতে সমস্যা ছিল বিদায় আমার বাবার জম্মটা বেশিই দেরিতে হয়। যায় হোক মূল কথায় আসি। আমার দায়িত্ব নিল শফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রেহেনা বেগম। মায়া তখন তিন বা চার দিনের শিশু ছিল। আমি ছিলাম সাত মাসের শিশু। সেদিন থেকে শিশু মায়ার সাথে সাথে আমাকেও প্রতিনিয়ত নিজের দুধ পান করাতেন রেহেনা বেগম। সবাইকে বলতো আমি উনাদের নিজেদের মেয়ে। মায়া আমার জমজবোন। সবাই বিশ্বাসও করতো। কারণ মায়ার সাথে আমার বেশকিছু বিষয়ে মিল রয়েছে তাই। মায়া আমার চাচাতো বোনের সাথে সাথে দুধ বোনও হয়। মায়ার মা-বাবা আমার দুধ মাতা-পিতা। মায়ার থেকেও সবকিছুতে আমার প্রধান্য বেশি থাকে সবসময়ও ঐ পরিবারের। জম্ম দিলেই যে বাবা-মা হওয়া যায় সেটা না। বরং জম্ম ছাড়াও আদর্শ বাবা-মা হওয়া যায়। সেটা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছে আমার পরিবার। জীবন কখনো কোনো পরিস্থিতিতে আমার বিন্দুমাত্র মনে হয়নি আমার জম্মদাতা পিতা-মাতা নেই। বা আমি এতিম। বরং সব থেকে জোর খাঁটিয়ে উঁচু গলায় চলেছি। আমাদের বাবা-মা সেই শিক্ষায় দিয়েছে। তাছাড়া বাবা-মা, আরিফ ভাই, মুক্তা আপু তারা সব সময় আমার আর মায়ার জন্য সেইম জিনিস দুটো করে কিনতো। কাপড়,জুতা, কসমেটিক, তেল, শেম্পু, এভরিথিং দুটো একিই জিনিস কিনে দেওয়া হতো আমাদের জন্য। যাতে বোনে বোনে ঝগড়া না হয়। ভালোবাসা বজায় থাকে। সাথে এটাও বলা হতো আমাদের মিলেমিশে একে অপরের জিনিস ব্যবহার করতে হবে। বোন বোনকে ভালোবাসাতে হবে। অযত্ন করা যাবে না। আমরাও সেই মোতাবেক চলে এসেছি। ভালোবেসে দুই বোন গলাগলি করে বড় হয়েছি। আমি সাত মাসের বড় হয়েও আমাকে আর মায়াকে একিই ক্লাসে ভর্তি করানো হয়। আমাদের সকল পড়াশোনা একসাথেই চলছিল। কিন্তু হুট করে একদিন গিয়ে হাজির হয় খান বাড়ির লোকজন। সেরাতে কি হয়েছিল জানি নেই আমার। তবে আমাদের পরিবারের ঘোর অন্ধকার নেমে আসে মায়াকে ছাড়া। আমি আর মায়া তখন নবম শ্রেণিতের পড়ি। তার মধ্যেই একদিন হুট করে মায়াকে নিয়ে যায় খান বাড়ির লোকজন। আমি একা হয়ে গেলাম। মায়ার শূন্যতা শুধু আমাকেই একা কষ্ট দিচ্ছিল তা না। বরং পুরো পরিবারই কষ্ট পাচ্ছিল। আরিফ ভাইয়া সেরাতে আব্বু সাথে ঝগড়া করে চট্টগ্রাম চলে যায়। আর আপুও চলে যায় শশুর বাড়িতে। আব্বু নিঃসঙ্গ একা আমাকে বুকে জড়িয়ে কেঁদে ছিল সেদিন অনেক। সেদিন প্রথম আমার আদর্শ বাবাকে কাঁদতে দেখেছিলাম আমি। তাই সেদিন আমি আর কষ্ট পাইনি মায়ার জন্য। বরং আমার বাবা-মাকে কিভাবে সামলে রাখবো এই কষ্ট পাওয়া থেকে সেটাই মাথায় চলছিল। তাই মায়ার ভাগের দুষ্টামীটাও আমি করতে শুরু করলাম তাদের সাথে। জ্বালাতাম বেশি করে করে। গলায় গলায় চলতাম বাবা মায়ের সাথে। আমার পাগলামিতে আব্বু আম্মুর খানিকটা কষ্ট কমলো। তারা স্বাভাবিক হলো। কিন্তু ততদিনে আমি আরও বেশি করে বাবা পাগল মেয়ে হয়ে গেলাম। আমার দুনিয়ার সবকিছু ছাড়া চলবে কিন্তু আমার আব্বুকে ছাড়া মোটেও চলবে না। একটা জেদ কাজ করতো আমার। আমার আব্বু মানে আমার আব্বু। যদি কেউ তাকে কষ্ট দিতে চাই তাহলে তাঁকে আঘাত করতেও আমি দ্বিধা বোধ করবো না এমনটা মনে হতো। আমি ছোট থেকেই অন্তত সাহসী একটা মেয়ে। মানুষকে ভয় খুব কম পেতাম। প্রতিবাদী বেশি ছিলাম। অন্যায়টা আমার সয্য হতো না। কিন্তু মায়া আমার ঠিক বিপরীতে ছিল। প্রচুর ভয় পেত মানুষকে। কেউ আঘাত করলে প্রতিবাদ করতে জানতো না। দাঁড়িয়ে চুপচাপ কান্না করতো। আবার কারও কাছে নালিশও করতো না। চাপা স্বভাবের ছিল তাই নিরবে সয্য করে নিত। কিন্তু আমি সয্য করতাম না। ছোটবেলায় যখন কেউ মায়াকে মারতো! বা আঘাত করতো! তখন আমিও তাদের উল্টো আঘাত করতাম। ততোটায় আঘাত করতাম, যতটা তারা মায়াকে আঘাত করতো। শোধবোধে বিশ্বাসী ছিলাম! তাই ছেড়ে দিতাম না কাউকেই। তবে মায়ার শত্রুর কম ছিল। কারণ মায়ার আদুআদু চঞ্চল স্বভাবের জন্য সবাই ওকে পছন্দ করতো। আর যারা ক্লাসে ওকে অপছন্দ করতো, তারা কেউ আমার ভয়ে মায়াকে সামনে থেকে কিছু করতো না। পিছনে করতো। তাই আমিও মায়াকে সবসময় আমার সাথে নিয়ে চলতাম। মায়া ছোট থেকেই পর নির্ভরশীল ছিল। এখনো আছে। তাই সবাই মায়াকে নিয়ে বেশি চিন্তা করতো। আমিও করতাম। তবে মায়ার সাথে আমার যে দিকটা বেশ গভীর ভাবে মিল খায়! সেটা হলো আমাদের দুজনের প্রখর আত্মসম্মান বোধ। মায়ার চাপা আত্মসম্মান বোধটা একটু বেশিই। হয়তো সবক্ষেত্রে মায়া সেটা প্রয়োগ করে না। দেখায়ও না। রাগ কম করে। হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করে সব ভুলে। কিন্তু কথায় আছে না? ভিতু মেয়েদের আত্মসম্মান বোধ বেশি হয়! তারা রাগলে সহজে শান্ত করা যায় না। মায়ার ক্ষেত্রেও তাই! আমরা দেখেছি সেটা। খুব কাছ থেকে দেখেছি মায়াকে রাগতে। আত্মসম্মান বোধে টক-বগিয়ে জ্বলতে। অবশ্য মায়ার সেদিন খান বাড়িতে যাওয়ার পিছেও এই আত্মসম্মান বোধটায় ছিল মূল কারণ। মায়া আর বাবার মধ্যে সেদিন কিছু একটা হয়েছিল। যেটা মায়ার আত্মসম্মান বোধে লাগে। তাই মায়া জেদ্দ ধরেই সেদিন খান বাড়িতে যাওয়া সিদ্ধান্ত নেই। আপনি ভালো করে লক্ষ করলে দেখবেন মায়া আর বাবার সম্পর্কে মধ্যে সামান্য গ্যাপ আছে। যেটা মায়া তৈরি করে রেখেছে। মূলত সেদিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই গ্যাপটা তৈরি করেছে মায়া। তবে যেদিন পুনরায় মায়া নিজের আত্মসম্মানের তাগিদে কিছু করবে সেদিন হয়তো দুনিয়া ছাড়বে তবুও নিজের আত্মসম্মান বোধটা ছাড়বে না মায়া। এতটা নিশ্চিত আমি। সেই ক্ষেত্রে আমিও মায়ার অবস্থানই আছি ডক্টর। তবে পাথক্য এটাই এই মূহুর্তে দুনিয়ায় ছাড়ার কোনো কারণ দেখছিনা আমি। দরকার হলে কাউকে মেরে দিব। তারপরও আমি মরবো না। তবে আপনাকে যে ছেড়ে দিব! তাও না ডক্টর। আমাদের বাবা শফিকুল ইসলাম একজন আদর্শ স্কুল টিচার মানুষ। তিনি হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী গড়ার দ্বায়িত্ব নিয়েছেন। সেখানে আপনার কি মনে হয়? উনি উনার নিজের সন্তানদের আদর্শ মানুষ হওয়ার নীতিমালা শিক্ষা দেয়নি? শিখাবেন না, কিভাবে নিজেদের আত্মসম্মান বোধ টিকিয়ে রাখতে হয় এই দুনিয়াতে বাঁচতে হলে? অবশ্যই! তিনি শিক্ষা দিয়েছেন উনার ছেলে-মেয়েদের। আদর্শ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন আমাদের। তিনি সবসময় বলেন, নিজেরটা ছেড়না আর অন্যটার দিকে তাকিয়েও না। নিজের আত্মসম্মান ছোট করে এমন সবকিছু মোকাবিলা করো। এবং সামনে এগোতে যাও। চুপ থেকো না। নয়তো সামনের মানুষটা তোমাকে দূর্বল ভেবে আবারও আঘাত করতে পারে। তাই কাউকে আঘাত করতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যাবে না। চুপ থাকা মানেই অন্যায়কে মেলে নেওয়া। অন্যায় মানা যাবে না। বরং প্রতিবাদ করতে হবে। বাবার কথা মেনেই বড় হয়েছি। তাই প্রয়োজনের তাগিদে কিন্তু আমিও রুপ বদলাতে পারি ডক্টর সাহেব। হালকা ভাবে আমাকে নিবেন না। কারণ আদর্শ বাবার জেদ্দি মেয়ে আমি। তাই শুধু শুধু আমার আত্মসম্মান বোধটা নিয়ে টানাটানি না করে নিজের খেয়েল রাখুন ডক্টর। বিয়ে করুন! সাদি করুন! আমার কাবিননামার বিশ লাখ টাকা দিয়ে ভালো প্যাকেজের হানিমুন করুন! ঝামেলা মুক্ত হন। আমাকেও ঝামেলা বিহীন রাখুন। আশা করছি, আমি আমার আত্মসম্মান বোধের প্রখরতাটা আপনাকে বুঝাতে পারছি ডক্টর সাহেব। তাহলে আজ উঠি ডক্টর। ভালো থাকবেন কেমন। উঠলাম তবে।

জুই নিজের দীর্ঘ কাহিনি শেষ করেই উঠে দাঁড়ালো। ফাইলটা আয়নের দিকে টেলে দিতেই টনক নড়লো আয়নের। জুইয়ের দীর্ঘ কাহিনিতে ডুবে বসে ছিল আয়ন। কারণ আয়নের জানা ছিল না জুই এতিম। মায়া জুঁইয়ের আপন বোন নয়। সে ভাবতে হয়তো মায়া আর জুঁই জমজ বোন হয়। আয়নের বুকের কোথাও একটা লাগলো জুইয়ের কথা গুলো। চোখ আওড়িয়ে তাকালোও জুইয়ের দিকে আয়ন। ততক্ষণে জুই আয়নের টেবিলে ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় যাওয়া প্রস্তুতি নিয়ে। কিন্তু আবারও থামতে হয় তাকে আয়নের জড়ো প্রশ্নে।

—” আপনার মার সাথে আপনার যোগাযোগ নেই এখন?
আয়নের প্রশ্ন থেমে যায় জুঁই। ঘাড় ঘুরিয়ে আয়নের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো…
—” উহুম! ছোটবেলায় তিনি যোগাযোগের প্রয়োজন বোধ মনে করেনি। আর বড় হয়ে আমি প্রয়োজন বোধ মনে করছিনা। আমার বাবাই আমার সব। আমার পুরো দুনিয়ায়। আর আমি সেই দুনিয়া নিয়েই সুখী আছি। তাহলে আর কি চাই আমার।
—” তাহলে আপনার বাবাকে আমাদের বিয়েটা সম্পর্কে জানাবেন না?
—” উহুম! আপাতত জানাবো না। আগে বাবার শারীরিক মানসিক ভাবে সুস্থ হোক তারপর। ততদিনে আমাদের ডিভোর্সও হয়ে যাবে। আর ডিভোর্স হয়ে গেলে বাবাকে বুঝাতে সমস্যা হবে না আমার। আপনি বরং শুধু ডিভোর্সের ব্যবস্থা করে ফেলুন দ্রুত তাহলেই হবে। আর হ্যাঁ ডিভোর্স তৈরির অর্ধেক টাকা অবশ্যই আমি দিব। যেহেতু প্রয়োজনটা দুজনের তাই একা দায়িত্বটা আপনি কেন নিবেন? আমি আমার দিকটা দেখবো। ডিভোর্স তৈরি হলে আমাকে জানাবেন। আমি আসবো। এবার আশি তাহলে ডক্টর। অনেক কথা হলো। ভুলক্রটি মার্জিত করবেন। আশি!

জুই সামনে দিকে ঘুরতেই পিছন ডেকে উঠলো আয়ন। অন্তত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলিয়ে পড়তে পড়তে বললো….
—” আদর্শ বাবার জেদ্দি মেয়ের মনে হয় আমাকে এসব কথা গুলো বলাটা তার ঠিক হয়নি।
—” মানে।
—” কিছু না মিসেস চৌধুরী। আপনি যান।
—” মিসেস চৌধুরী?
—” হুম! নামটা আপনার সাথে যাচ্ছে অনেক তাই ডাকলাম আরকি। আপনি যান। আমি রোগী দেখবো এখন।
~~
মায়ার খান বাড়িতে আছে আজ টানা তিন দিন হলো। এর মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ঠিক করতে পারছে না রিদের সাথে নিজের সম্পর্কটাকে। রিদ যেন আগের থেকে আরও বেশি মায়ার সাথে রাগী উগ্র ব্যবহার করছে৷ মায়াকে নিজের আশেপাশে ভিড়তে দিচ্ছে না। মায়া যেচে রিদের আশেপাশে গেলেও, রিদ শুধু ধমক আর মেজাজ দেখিয়ে চোখ রাঙ্গায় মায়াকে। বিগত তিন ধরে মায়া রিদের চারপাশে ঘুরঘুর করেছে প্রচুর। কিন্তু রিদের থেকে বিশেষ একটা পাত্তা পেল না সে। উল্টো রিদের রাগের বশবর্তীর শিকার হতে হতো তাকে। রিদের অবহেলায়, মায়া কষ্টে আর কান্নায় জর্জরিত হতো ভিষণ। রাত ভর কেঁদেকুটে সকাল হতে হতেই ভুল যেত। এবং পুনরায় রিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করার চেষ্টা করতো লুকিয়ে চুকিয়ে। যদি মায়া ভুলে রিদের সামনে পড়ে যেত তাহলে ভয়ে পালিয়ে যেত তৎক্ষনাৎ। কারণ রিদ চোখ রাঙ্গাত মায়াকে। এবং নিজের আশেপাশে মায়াকে থাকতে নিষেধ করতো জোর গলায়। এবার কেন রিদ মায়াকে এতটা অবহেলা করে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে সেটা একমাত্র রিদেরই জানা।

রাত ৪ঃ১৩। মায়া খান বাড়ির মেইন দরজা সামনে দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি মারছে বাগানের সেই বাংলোতে। কারণ বাগানের সেই খোলা বাংলোতে রিদ বসে আছে সাদা সোফার উপর। হয়তো কাজ করছে। মায়া দূর থেকে আবারও উঁকি মেরে একবার দেখে নিল রিদকে। রিদকে পাশে যাবে কি যাবে না দ্বিধায় ভুগল খানিকটা। কারণ রিদ মায়াকে আজকাল কথায় কথায় ধমক লাগাচ্ছে। অবহেলা করে এরিয়ে চলছে। কর্ড়া কথায় শাসাচ্ছে। তাই মায়া ভয় পাচ্ছে রিদের সামনে যেতে। নিজের পাশে মায়াকে দেখলে যদি রিদ আবারও রেগে গিয়ে ধমক লাগায় মায়াকে তোহ? ভয়ার্ত মায়া খানিকটা হাসফাস করলো। যাবে কি? যাবে না! তা নিয়ে টেনশন ও করলো। একটা সময় ভাবলো! মায়া যাবে। তবে রিদের পিছন থেকে শুধু উঁকি মেরে দেখবে একবার যে রিদ কি করে? কথা বলবে না। সামনেও যাবে না। দূর থেকে দেখে চলে আসবে মায়া। ভাবনা অনুযায়ী মায়া গুটি পায়ে গিয়ে হাজির হলো রিদের পিছন। তখনো রিদ সোফায় বসে মনোযোগ সহকারে নিজের কিছু ফাইল ঘাঁটছিল। গায়ে অফিসের গ্যাটাপ জড়ালো। পাশেই অবহেলিত ভাবে রিদের কোট আর টাই পড়ে আছে। একহাতে ধোঁয়া উড়ানো কফির মগ ধরা তো অন্যহাতটা নিজের উরুর উপর রাখা ফাইলের মধ্যে। রিদ হালকা সামনের দিকে বুঝে মনোযোগ সহকারে ফাইলটা পযবেক্ষণ করছে। রিদের কুঁচকানো স্থির দৃষ্টি বলে দিচ্ছে এই মূহুর্তে সে কতটা মনোযোগী সে এই ফাইলের মধ্যে। মায়া ধীর পায়ে আরও এগিয়ে আসলো। রিদের বরাবর ঠিক সোফার পিছনে দাঁড়ালো গুটিয়ে মেরে। পিছন থেকে হাল্কা উঁকি ঝুঁকি মেরে দেখলো রিদ কি করছে। কিন্তু বিশেষ একটা লাভ হলো না তাতে মায়ার। কারণ রিদ সামনে দিকে ঝুঁকে বসে ফাইল দেখায়, মায়া শুধু রিদের পিঠ আর মাথায় দেখলো পিছনে থেকে। কৌতূহলী মায়া আরও এগিয়ে আসলো রিদের দিকে। সোফা উপর নিজের দু’হাতের ভর রেখে উঁকি মারলো রিদের পিছনে থেকে। কিন্তু নিজের অসাবধানতার কারণে মায়া নিজের হাতের ব্যালেন্স হারিয়ে পড়লো রিদের ঘাড়ের উপর উল্টে। আকস্মিক ঘটনায় রিদের নিজেরও ব্যালেন্স ছুটে যায়। ধোঁয়া উড়ানোর কফি ছিটকে পড়লো রিদের নিজের শরীর ও ফাইলের উপর। কিন্তু তারপরও রিদ মায়াকে শক্ত হাতে চেপে ধরলো উল্টে পড়া থেকে। এবং ভয়ার্ত মায়াকে টেনে দাঁড় করায়। কিন্তু ততক্ষণে ভয়ার্ত মায়া উত্তেজিত ভঙ্গিতে রিদের সাথে আপত্তিকর কান্ড করে বসলো। রিদ মায়াকে টেনে দাঁড় করাতেই, মায়া ভয়ার্ত চোখ মেলে রিদের দিকে তাকাতেই দেখলো, রিদের ধোঁয়া উড়নো কফি সম্পূর্ণটা রিদের বুকে ও শরীরে উপর পড়েছে। রিদের বুক পুড়ে যাচ্ছে ভেবে মায়া নিজের ভয় ভুলে গিয়ে এক মূহুর্তের জন্য, উত্তেজিত হয়ে হামলে পড়লো রিদের বুকে। ফটফট করে টেনে রিদের শার্টের বোতাম সবগুলো ছিঁড়ে প্রাণপূণ ফুঁ দিতে লাগলো রিদের কয়লা যুক্ত বুকে গোল বৃত্তের মধ্যে। এবং ফুঁ দিতে দিতে মায়ার উত্তেজনা দ্বিগুণ হলো যখন দেখলো ধোঁয়া উড়ানো কফি রিদের গুপ্তধনের ভিতরও পড়েছে। অস্থিরতায় মায়া এবার হামলে পড়লো রিদের প্যান্টের বেল্টের উপর। ঝুকে পড়ে দু’হাতে রিদের গুপ্তধনের উপর ঝাড়তে ঝাড়তে হঠাৎ টেনে ধরলো রিদের প্যান্টের বেল্ট। হতভম্ব রিদ মায়াকে থামাতে গেলে হাত ঝাড়ি দিয়ে ফেলে দিল তাঁর। এবং অস্থির ভঙ্গিতে রিদের প্যান্টের বেল্ট দুপাশ ছড়িয়ে দিয়ে মায়া রিদের গুপ্তধনের উপর জোরে জোরে ফুঁয়াতে লাগলো। দ্রুততার সঙ্গে নিজের দুহাতে রিদের প্যান্টের খুক খোলতে নিবে তখনই ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে রিদের। হতভম্ব রিদ মায়ার হাতের উপর দিয়েই শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের প্যান্টের খুক। এবং মায়া রিদের থেকে বাঁধা পেতেই অস্থির ভঙ্গিতে বলে উঠে তৎক্ষনাৎ…

—” আরেহ! হাতে সরান! হাত সরান! পুড়ে যাচ্ছে তো ভিতরে..

হতবুদ্ধি মায়া তখনো বুঝলো না সে কি করছে রিদের সাথে। তাই উত্তেজনায় মায়া পুনরায় টেনে ধরে রিদের প্যান্টের খুক খোলার জন্য। মায়া রিদের সাথে টানাটানি করতেই ধৈর্য্যের বাঁধ পুরোপুরি ভাঙ্গলো রিদের। অধৈর্য গলায় খানিকটা চেচিয়ে উঠে মায়ার উপর রিদ…

—” স্টপ!
মায়া শুনলো না রিদের চেঁচানি। বরং আগের ন্যায় অস্থির ভঙ্গিতে বললো…

—” আরে পুড়ে যাচ্ছে তো ভিতরে। হাত সরান না আপনি। আমি দেখি ভিতরে।

উত্তেজিত মায়া এতটাই বেখেয়ালি হলো যে বুঝলো সে কি করছে রিদের সাথে। রিদ মায়ার বোকামো আর নিতে না পেরে জোরপূর্বক মায়ার কাছ থেকে নিজের প্যান্ট ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যায় সেখান থেকে। যেতে যেতে নিজের শার্ট ও বেল্ট দুটোই ঠিক করছে। মায়া রিদের যাওয়া দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর, মাথায় আসলো আসলে সে এতক্ষণ যাবত কি করেছিল রিদের সাথে। হতভম্ব মায়া স্তব্ধ হয়ে ফ্লোরে ধুপ করে বসে পড়ে হাত পা ছড়িয়ে। সোফার উপর রাখা হাত দুটোকে স্থির দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে উচ্চ স্বরে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে উঠে লজ্জায়। এই মুখ সে কিভাবে দেখাবে তার মিস্টার ভিলেনকে।

((কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ। প্রয়োজনে শেয়ার করুন))

(আজকাল আমিও ডিপ্রেশনে ভুগছি। গল্পের পার্ট কোনো মতেই ছোট করে লিখতে পারছিনা)

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply