Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৪


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৪৪
অবস্থানটা খান বাড়িতেই সবার। সবেমাত্র হেনা খান নিজের সাথে করে মায়া, জুঁই ও রেহেনা বেগমকে নিয়ে এসেছেন অনেকটা জোরপূর্বকই। হসপিটালের শফিকুল ইসলামের পাশে রয়েছে আরিফ ও শাহিন। শুভও ঢাকা নিজেদের ফ্ল্যাটে গেছে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে পুনরায় আসবে হসপিটালের। ততক্ষণে রেহেনা বেগম ও চলে যাবেন খান বাড়ির থেকে ফ্রেশ হয়ে। তারপর আরিফ শুভকে হসপিটালের শফিকুল ইসলামের কাছে রেখে শাহিনকে নিয়ে যাবে তাদের ফ্ল্যাটে ফ্রেশ হতে, এমনটাই স্থির করে রেখেছে আরিফ। স্থির অনুযায়ী যথারীতি কাজও করা হয়। হেনা খান রেহেনা বেগমকে জোরপূর্বক নিজেদের সাথে নিয়ে এসেছেন। শফিকুল ইসলামের চিন্তায় রাত থেকে মায়ার পরিবার সবাই বিধস্ত অবস্থা রয়েছে। আপাতত সবার বিশ্রাম দরকার। ফ্রেশ হওয়ার দরকার। হেনা খান রেহেনা বেগমকে নিচে একটা গেস্ট রুম দেখালো ফ্রেশ হওয়ার জন্য। জুঁই ক্লান্তিময় ভাব নিয়ে উপরে ফিহার রুমে গিলো ফ্রেশ হতে। যেতে যেতে ভাবলো ভাগ্য তাকে আবারও খান বাড়ির দরজায় দাঁড়া করালো। আবারও সেই একিই অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটার সামনে। যাকে জুই ভয়ংকর কালো অতীত ভেবে ভুলে যেতে চেয়েছিল আজ পুনরায় তার মুখোমুখি দাঁড়াতে হচ্ছে তাঁকে। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে ক্লান্তিময় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললো জুঁই। কখন এসবের বেড়া জাল থেকে মুক্তি পাবে জানা নেই জুইয়ের। তবে আজ বড্ড ক্লান্ত জুই এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে। আর কত ভাববে? চারমাস তো হলো! তবে আজ জুই খুব করে চাই এসব থেকে মুক্ত পেতে। আদৌ কখনো সম্ভব কিনা জানে নেই জুইয়ের।

খান বাড়িতে পা রাখতেই মায়া উৎসুক দৃষ্টিতে চারপাশটা পযবেক্ষণ করলো। রিদকে খোঁজা চেষ্টা করলো। নিস্তব্ধ খান বাড়িতে সার্ভেন্ড, আর বডিগার্ড ছাড়া কাউকে চোখে পড়লো তাঁর। মায়া ছোট অবুঝ মন নিরাশ হলো। হতশায় এদিক সেদিক উঁকি ঝুঁকি মেরে আরও এবার চোখ ঘুরালো চারপাশে। অচেতন মন নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই মনে হলো মায়ার রিদের রুমে একবার উঁকি মেরে আসার দরকার। রিদ যদি না থাকে তাহলে রিদ রিদ গন্ধটা তো পাবে মায়া। যথারীতি মায়া নিজের রুমে না গিয়ে উল্টো ঘুরে হাঁটা ধরলো, রিদের রুমের সামনে এসে কিছুক্ষণ ঘুরঘুর করলো চারপাশে। ভিতরে ঢুকবে কিনা সেই নিয়ে দ্বিধাবোধ করলো খানিকটা। আজ দুমাস পর সে রিদকে দেখবে সামনে থেকে, উত্তেজনায় মায়ার ছোট মন ধুকপুক শুরু হলো বেশ। মায়া আরও কিছুক্ষণ নিজের ধুকপুক বুক নিয়ে রিদের দরজার সামনে ঘুরঘুর করে অবশেষে ঠিক করলো, সে রিদের রুমে ভিতরে যাবে। এবার যায় হোক না কেন? মায়ার ভিলেন স্বামী যদি বকা দেয় তাহলে সেই বকাটা মায়া টুস করে গিলে ফেলবে এবং ঠাস করে স্বামীকে দেখে চলেও আসবে। দাঁড়ানোর দরকার কি মায়ার? যেই ভাবা সেই কাজ মায়ার, রিদের রুমের দরজা ধাক্কা দিল আস্তে করে। বন্ধ দরজা পেয়ে এবার মায়া দু’হাতে বেশ জোর খাটিয়ে ধাক্কা দিতে থাকলো। খটখট শব্দ করলো বেশ উচ্চ স্বরে। কিন্তু তারপরও রিদের রুমের দরজাটা কিছুতেই খোলতে পারলো না মায়া। ধাক্কা ধাক্কির কারণে মায়ার কাপল বেয়ে ঘাম দরদর করে ছুটলো। বোকা মায়ার মাথায় আসতেই দেরি হলো যে রিদ তো নিজের রুম লক করেই বাহিরের যায় সবসময়। কারণ রিদের রুমের অন্য কারও প্রবেশ নিষেধ আছে। সেই সুবাদে মায়াও যেতে পারবে না রিদের রুমে। তাছাড়া রিদ যেহেতু বাসায় নেই সেহেতু অবশ্যই রিদ নিজের রুম লক করেই অফিসে গেছে। হতাশায় মায়া মূহুর্তেই ঠোঁট উল্টিয়ে কান্না করে বসে রিদের রুমের দরজায় কপাল ঠেকিয়ে। প্যাঁচ প্যাঁচ করে কিছুক্ষণ কান্নার করার মধ্যে দিয়ে হঠাৎই মায়ার চোখ গেলো, রিদের দরজা সামনে থাকা ট্যাপ ফোনের মতো টার্চ স্ক্রীন লক বুথে। মূহুর্তেই মায়ার চোখ মুখ উজ্জ্বল হলো। কান্না থামিয়ে এগিয়ে আসলো লক বুথের সামনে। রিদের রুমের দরজা খুলতে গেলে অবশ্যই মায়াকে লক বুথে সঠিক পাসওয়ার্ড দিতে হবে। ভাবুক মায়া কিছুক্ষণ চিন্তা করলো যে রিদের পাসওয়ার্ড কি হতে পারে? অবশেষে মায়া নিজের ছোট মাথায় রিদের পাসওয়ার্ড হিসাবে বেশ কয়েকটি কোডও মিলাল। সেই অনুযায়ী ফটফট করে ট্যাপে টাইপ করলো লক বুথের পাসওয়ার্ড হিসাবে। কিন্তু প্রতিবারই ইনকারেক্ট অথাৎ ‘ভুল’ দেখালো মায়ার সেই পাসওয়ার্ড গুলো। কিন্তু মায়া দমে গেলো না বিন্দুমাত্রও বরং রয়েসয়ে পরপর তিনবার তিন পাসওয়ার্ড দিল তারপরও প্রতিবারই ইনকারেক্ট মানে ‘ভুল দেখালো মায়ার পাসওয়ার্ড। সাথে রেড সিগনাল হিসাবে লক বুথে এক মিনিট সময় দেখালো। মায়া সময় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো এক মিনিট। লক বুথের এক মিনিট সময় শেষ হতেই মায়া আবারও দ্রুততার সঙ্গে ফটফট করে মনগড়া পাসওয়ার্ড দিলো রিদের রুমের দরজা খোলার জন্য। কিন্তু এবারও বিফল হলো। তিন তিনবারই ট্যাপে মায়াকে ইনকারেক্ট ‘ভুল’ পাসওয়ার্ড দেখালো। এবং সেই সাথে এবার মায়াকে রেড সিগনাল হিসাবে লক বুথে পাঁচ মিনিট সময় দেখালো নেক্সটবার ট্রাই করার জন্য। চঞ্চল মায়া এবারও দমে যায়নি বরং ধৈর্য নিয়ে রিদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলো। আজ রিদের দরজা লকের একটা ব্যবস্থা করেই যাবে মায়া এমনটা মনোস্থির করলো সে। তাই সময় নিয়ে এবারও পাঁচ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলো দরজার সামনে। অপেক্ষা করলো লক বুথের সময় শেষ হওয়ার জন্য মায়া। একটা সময়ে ট্যাপের পাঁচ মিনিট সময় শেষ হতেই আবারও একিই কাজ করলো মায়া। উল্টাপাল্টা পাসওয়ার্ড দিয়ে এবার রিদের লক বুথে বারোটা বাজালো। রিদের দরজার লক বুথের ট্যাপের মধ্যে রেড সিগনাল দিয়ে বারো ঘন্টা সময় দেখালো মায়াকে ভুল পাসওয়ার্ড দেওয়ার জন্য। বারো ঘন্টা আগে দরজা খোলা যাবে না। সেই সাথে রেড সিগনাল দিয়ে বুথের ভিতরে প্যাপু করে উচ্চ স্বরে বাজতে শুরু করলো। ভয়ার্ত মায়া রিদের দরজা লকের বারোটা বাজিয়ে এক দৌড়ে পালায় নিজের রুমের দিকে। নয়তো নিঘার্ত আজ কারও না কারও হাতে ধরা খেয়ে যাবে। তখন মায়া মিথ্যা বলেও বাঁচতে পারবে না। তাছাড়া সেকি জানে নাকি রিদের রুমের দরজার লক কে নষ্ট করেছে? সেতো সবেমাত্র খান বাড়িতে এসেছে হসপিটালের থেকে। মায়া তো কিছুই জানে না। মায়াকে জিগ্যেসা করলে মায়া সাফ সাফ জানিয়ে দিবে’ সে এসবের কিছুই জানে না। উল্টো বড় গলায় বলবে যে ‘ রিদই ভুল পাসওয়ার্ড নিজের লক নষ্ট করে ফেলেছে হয়তো এখন মনে নেই তাঁর। এতে করে মায়াও বেঁচে যাবে এবং রিদকেও কৌশলে বুঝাবে এসব পাসওয়ার্ড যুক্ত দরজা রাখারও দরকার নেই।
~~

যথারীতি সকলে খান বাড়িতেই দুপুরের খাবারটা খেয়ে নিল। তারপর সবাই মিলে আবারও হসপিটালের উদ্দেশ্য বেড়িয়ে গেলো। এবার আরাফ খান সাথে যায়নি। তিনি হসপিটাল থেকেই নিজের অফিসে চলে গেছেন সকালেই। হেনা খান মায়া,রেহেনা বেগম, জুই ও মালাকে রেখে পুনরায় হসপিটালের চলে আসলো। তার কিছুক্ষণ পরপরই শুভও চলে আসলো হসপিটালের। আরিফ শুভকে নিজের পরিবারের সাথে রেখে শাহিনকে নিয়ে চলে গেলো তাদের ফ্ল্যাটে। সে আপাতত খান বাড়িতে যেতে চাই না বলেই শাহিনদের ফ্ল্যাটে গেলো গোসল করে ফ্রেশআপ হতে। শফিকুল ইসলামের জ্ঞান ফিরেছিল দুইটার দিকে। পুরোপুরি সুস্থ না থাকায় উনাকে অক্সিজেন মাক্স লাগিয়ে রেখেছেন। আপাতত কথা বলা বন্ধ উনার। তবে তিনি সজ্ঞানে আছেন। সবকিছু দেখতে শুনতে পারছেন। উনার কেবিনে মধ্যে হেনা খান, রেহেনা বেগম, মায়া, জুই, শুভসহ সবাই বসে রইলো পুরোটা বিকাল। ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে আরিফও হাজির হলো। শাহিন আসবে একেবারে রাত করে। আরিফ সবার সাথে করে বাবার কেবিনের একপাশে বসে রইলো গম্ভীর মুখে। তখনো সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিন্তু বিপত্তি ঘটলো আকস্মিক ভাবে ফিহার হতভম্ব হয়ে কেবিনের ভিতর প্রবেশ করাতে। আরিফ যেন শান্ত ন্যায় অশান্ত ভাবে নড়েচড়ে উঠলো। ফিহার ঘামন্ত ভয়ার্ত মুখশ্রী এক পলক দেখেই মাথা বুঝিয়ে দৃষ্টি ফ্লোরে স্থির করে রাখলো শক্ত ভাবে। ফিহার হঠাৎ আগমনে চমকে উঠলো হেনা খানও। আজ প্রায় দুমাস পর ফিহার সাথে হসপিটালের দেখা হলো উনার। সেদিন রাতের ঘটনার পর মেহেরবান সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফিহাকেও খান বাড়িতে আসতে দেওয়া হয়না। তাহলে আজ মেহেরবান ফিহাকে কিভাবে হসপিটালের আসতে দিলো? তাও মায়ার পরিবারের সাথে দেখা করার জন্য? হেনা খানের ধারালো মাথায় যেন এই বিষয়টি বুঝেও বুঝলো না। তবে তিনি উত্তেজিত ভঙ্গিতে কিছু বলবেন তার আগেই ফিহার উপর ঝাপিয়ে পড়লো মায়া ও জুঁই একত্রে দুজন। তিনজনই বেশ গভীর ভাবে সম্পর্ক রয়েছে একে অপরের সঙ্গে। দীর্ঘ টানা পুড়ার দুটো মাস অতিবাহিত হলেও এই তিনজনের সম্পর্কের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটেনি বরং একাছিন্ন ভাবে তিনজনে মধ্যেই যোগাযোগ ছিল। মায়া ও জুঁই ফিহার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো। প্রতিরাতেই কথা হতো মায়াও জুঁইয়ের শফিকুল ইসলামের ফোন দিয়ে ফিহার সঙ্গে। কিন্তু কাল রাতে হঠাৎ করে শফিকুল ইসলামের অসুস্থতার বিষয়টি জানাতে পারেনি কেউ ফিহাকে। তবে ফিহা কিভাবে জানলো শফিকুল ইসলামের অসুস্থতার বিষয়টি তাও অজানা তাদের। ফিহা উত্তেজিত ভঙ্গিতে নিজের দু’হাতে মায়া, জুইকে জড়িয়ে নিতে নিতে এক পলক কেবিনের চারপাশে চোখ বুলাই। উপস্থিত সবাইকে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মূহুর্তে চোখ যায় আরিফের দিকে। আরিফকে মাথা ঝুঁকে বসে থাকতে দেখে ফিহার অশান্ত বুক হা হা করে উঠলো তৎক্ষনাৎ। কতদিন পর দেখলো আরিফকে নিজের সামনে ফিহা। তাও এতটূ কাছ থেকে। ফিহার বুক ভারি হয়ে আসার কান্নাটা দলা পাকিয়ে গলায় আটকে যায়। বুকের মধ্যে চলিত কষ্ট গুলোর ফিহার চোখ ভরে আসলো নোনাজলে। তক্ষুনি পাশ থেকে এগিয়ে আসলো হেনা খান। ফিহার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আপেক্ষিক কন্ঠে প্রশ্ন করলো ফিহাকে তিনি…

—” তুই এখানে?
হেনা খানের কথায় চোখ তুলে তাকায় ফিহা সেদিকে। বুক ভারির কষ্ট গুলো ঢুক গিলে নিল নিজের মাঝে। স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো বেশ। সফল ও হলো।ঠান্ডা গলায় বললো…
—” সবার সাথে দেখা করতে এসেছি নানুমা।
—” তুই জানলি কিভাবে আমরা সবাই হসপিটালের আছি সেটা?
—” আয়ন ভাইয়া সাথে কিছুক্ষণ আগে আমার কথা হয়েছিল নানুমা। ভাইয়া জানিয়েছে আঙ্কেলের অসুস্থতার বিষয়টি আমাকে। তাই ছুটে চলে আসলাম।
—” তোর মা কই?
—” আম্মু বাসায় নেই। বাবা সাথে সিলেট গিয়েছে বাবার বিজনেস ট্রিপে। ফিরতে কয়েক দিন লাগতে পারে।
—“ওহ!
বিষন্নতায় হেনা খান পুনরায় নিজের জায়গায় গিয়ে বসলো। ফিহা মায়াও জুইকে নিয়ে কেবিনের এক কোণে পাতা চেয়ার গুলোতে বসলো। বসতে বসতে ফিহা আবারও চোখ আওড়িয়ে তাকালো আরিফের দিকে। আরিফ ফিহার পাশাপাশি থেকেও একটা বারের জন্য চোখ তুলেও দেখার চেষ্টা করলো না ফিহাকে। বরং মিনিট দুইয়েকের মধ্যেই প্রচন্ড উত্তেজনায় আরিফ কেবিন হতে বেড়িয়ে গেলো বুকের চিনচিন অসয্য ব্যথায়। আরিফের পিছু পিছু শুভও বেড়িয়ে গেলো। কিন্তু পিছন থেকে রয়ে গেলো ফিহার অশ্রু সিক্ত ভেজা টলমলে চোখ দুটো।
~~

সারাটা বিকাল পার হলো সবাই হসপিটালের মধ্যেই। সন্ধ্যার দিকে আরিফ শুভকে সাথে নিয়ে বাহিরে গেলো সবার জন্য নাস্তা আনতে। মায়া হেনা খানের আঁচল ধরে ঘুরঘুর করছে পুরো হসপিটালের মধ্যে। রেহেনা বেগম জুঁইকে নিয়ে কেবিনের সামনে খোলা করিডোরে দাঁড়িয়ে ভিডিও করে কথা বলছেন নিজের বড় মেয়ের সাথে। শফিকুল ইসলাম কেবিনে ঘুমিয়ে থাকায় কেউ বিশেষ একটা লক্ষ করেনি সেই বিষয়টি। তবে ফিহা কেবিনে ভিতরে এক কোণে একটা চেয়ারে বসা ছিল বিষন্ন অবস্থায়। হঠাৎই শফিকুল ইসলামের গোঙানির শব্দে ফিহা মাথা তুলে তাকায় সেদিকে। শফিকুল ইসলামকে নড়াচড়া করতে দেখে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে আসলো ফিহা। অসুস্থতার ক্লান্তিময় চোখে শফিকুল ইসলাম ফিহাকে দেখে তৎক্ষনাৎ না চিনলেও কয়েক সেকেন্ড মধ্যে চিনতো পারলো। কারণ লাস্ট টাইম তিনি ফিহাকে দেখেছিল মায়ার এক্সিডেন্ট সময় এরকম হসপিটালেই। তারপর ফিহার সাথে বেশ কয়েকবার ফোনেও কথা হয়েছিল উনার জুঁই ও মায়ার সূত্র ধরে। তাই তিনি অনাহেষেই চিন্তে পারলো ফিহাক। ফিহা অন্তত আন্তরিকতা সঙ্গে শফিকুল ইসলামকে ধরে বেড়ের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসাতে বসাতেই কেবিনের ভিতর প্রবেশ করলো আরিফ হাতে খাবার নিয়ে। ফিহাকে একা শফিকুল ইসলামকে বসাতে দেখে দ্রুততা সঙ্গে এগিয়ে আসলো সেও। ততক্ষণে ফিহা শফিকুল ইসলামকে বেডের সঙ্গে হেনা দিয়ে বসিয়ে দিলেন এবং উনার পিঠের নিচে একটা বালিশও চাপা দিয়ে দিল। অসুস্থ শফিকুল ইসলাম কৃতজ্ঞতার স্বরুপ ফিহা মাথায় হাত রাখতেই ফিহা নিজের মাথাটা আরও ঝুঁকিয়ে দিলেন উনার দিকে। দোয়া করার জন্য। ফিহার এমন কাজে শফিকুল ইসলাম অন্তত সন্তুষ্টের সঙ্গে আলতো হেসে ফিহার মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করলেন। আরিফ সবটা দেখেও যেন না দেখার মতো করে থাকলো। বাবাকে গম্ভীর মুখে নড়াচড়া করতে নিষেধ করে, আরিফ ফিহার দিক প্যাকেটে মুড়ানো একটা নাস্তার বক্স তুলে দিল, না তাকিয়ে। ফিহা অশ্রু সিক্ত ভেজা চোখে আরিফ থেকে নাস্তাটা তুলে নিলো চুপচাপ। কোনো রকম প্রতিক্রয়া জানালো না। যে ভালোবাসার মানুষটা ফিহাকে অসংখ্য বার নিজের হাতে যত্ন করে খাইয়ে দিয়েছে। আজ সেই ভালোবাসার মানুষটা তার সাথে আজানা পথিকের মতো আচরণ করছে। ফিহা ঠোঁট কামড়িয়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো। সেদিনের পর থেকে আরিফের সাথে ফিহার কথা হয়না। আরিফ কথা বলে না। ফিহার কল রিসিভ করে না। এক প্রকাশ দূরে দূরে থাকছে ফিহার থেকে সে। সকল প্রকার যোগাযোগ বন্ধ করে রেখেছে আরিফ ফিহার সাথে। ফিহা কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আরিফের মুখশ্রী দিকে। যাহ দেখার চেষ্টা করলো না আরিফ। বরং সে ফিহার সেই কাতর দৃষ্টি অপেক্ষা করে আবারও কেবিন থেকে বেড়িয়ে যায় গম্ভীর মুখে। প্রেয়াসীর কাতর দৃষ্টি আরিফের হৃদয় ভাঙ্গনের কারণ। হ্যাঁ কষ্ট আরিফ পাচ্ছে। তবে সেটা ফিহার মতো করে প্রকাশ করতে পারছে না। পারার কথাও না। ফিহা ছোট অবুঝ। বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা নেই। কিন্তু আরিফ সেতো ছোট নয়। অবুঝ নয়। বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণাও আছে গভীর ভাবে। তাহলে সে কিভাবে ফিহার ভালোবাসায় সারা দিবে। কিভাবে বুঝাবে ফিহা আর তার মধ্যে আকাশ সমান পার্থক্যটা? সমাজে উঁচুস্তর নিচুস্তর মধ্যে ভালোবাসা হয়না। তাদেরও হবে না। তাছাড়া আরিফ তো ফিহাকে সাধারণ ঘরের মেয়ে ভেবে ভালোবেসে ছিল। কিন্তু ফিহা তো সাধারণ ঘরের মেয়ে নয়। বরং ধনীর দুলালি। সেখানে আরিফের মতো সাধারণ পরিবারের ছেলেদের ভালোবাসার ঠায় হয়না। বরং উঁচু নিচু জাত বেঁধে ভালোবাসাকে ভাগ করে দেওয়া হয়। ফিহার পরিবারও তাই করবে। তাঁরা কখনোই আরিফের মতো সাধারণ ছেলের হাতে ফিহাকে তুলে দিবে না। উল্টো ঝামেলা সৃষ্টি হবে দুই পরিবারের মধ্যে আবারও। তার বাবা আবারও কষ্ট পাবেন। যেটা আরিফ কখনোই চাই না। এমনিতেই প্রথম থেকে শফিকুল ইসলাম খান বাড়ির সাথে সম্পর্ক জড়িয়ে কষ্ট পাচ্ছে। দ্বিতীয় বারের মতো করে সে কিভাবে কষ্ট দিবে বাবাকে? কিভাবে বলবে যে তারও খান বাড়ির সম্পর্কের মেয়েকেই পছন্দ? ভালোবাসে খান বাড়ির মেয়েকে। বউ করতে চাই সেই বাড়ির মেয়েকেই? তাছাড়া ফিহা এখন হয়তো আরিফের ভালোবাসায় আছে। আবেগে আছে। তাই জেদ ধরে আরিফকেই ভালোবাসতে চাইছে। হয়তো বা জেদ ধরে সে বিয়েটাও করে নিল আরিফকে কিন্তু তারপর? তারপর কি হবে? মানাতে পারবে ফিহা আরিফের ছোট ঘরে নিজেকে? নিজের বিলাশ বহুল জীবন ছেড়ে পারবে কি ফিহা আরিফকে নিয়ে আরিফের ছোট সংসারে সুখী হতে। নিজেকে ঘুছিয়ে নিতে পারবে সল্পতায়? পারবে না। কখনোই পারবে না ফিহা সেটা করতে। হ্যাঁ হয়তো ফিহা নিজের আবেগে প্রথম প্রথম আরিফকে ভালোবাসে সংসার করতে চাইবে। কিন্তু যখন দেখবে আরিফ তাঁকে তার মতো করে বিলাশ বহুল জীবন দিতে পারছে না। তখনই আরিফের প্রতি ফিহার সকল ভালোবাসা চলে যাবে। আরিফকে ছেড়ে! আরিফের ভালোবাসা ছেড়ে! আরিফের সংসার ছেড়ে, ফিহার চলে যেতে দুই মিনিটও ভাববে না। তখন আরিফ বেঁচে থেকেও হাজার মরার সামিল হয়ে যাবে। বু্ক ফাটা কষ্টে ধুঁকে ধুঁকে মরবে সারাজীবন। তার চেয়ে বরং সে আগে থেকেই সরে যাওয়া ভালো। এখনের কষ্টটা আরিফ সামাল দিতে পারবে কিন্তু পরবর্তী কষ্টটা মরা ছাড়া উপায় থাকবে না তার। সে বাস্তব ভিত্তিক মানুষ। অবাস্তবিক কাজ তার সাথে যায় না। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হলো খান বাড়ির মানুষরা মায়াকে নিজের বউ করেছে তাদের সেচ্ছায়। এতে করে খান বাড়ির কেউই তো আর তাদের মতো করে সাধারণ জীবন চলতে হচ্ছে না। কারণ মায়া তাদের বাড়িতে থাকছেন। কিন্তু আরিফ ফিহাকে বিয়ে করলে? ফিহাকেও আরিফের সাথে তার সাধারণ জীবন বাঁচতে হবে। যেটা খান পরিবারে কেউ মেনে নিবে না ইহকালে। তাই অথযা আবেগ না বাড়ালোটায় শ্রেয় মনে হলো আরিফের কাছে। আরিফের অবহেলা হয়তো ফিহা দুইদিন কাঁদবে তবে সময়ে সাথে সাথে ফিহাও ভুলে যাবে আরিফক। নতুন করে নিজের জীবনও গুছিয়ে নিতে পারবে আরিফকে ভুলে ফিহা।
~~
আয়ন আসলো সন্ধ্যা ছয়টা করে। অন্যদিন আরও আগে আসলেও আজ একটু দেরি করে রয়েসয়ে আসলো হসপিটালের। তার মূল কারণ হলো মায়া। আয়ন মানসিক ভাবে প্রস্ততি নিয়ে আসতে চাওয়ায় একটু দেরিতে আসা তার। যাতে করে মায়াকে দেখে অস্থির না হয়। কষ্ট গুলো সামলাতে পারে। আয়ন নিজের দ্বায়িত্বতার মাথায় রেখে এসেই, নিজের লিস্টে করা রোগীদের চেক লাগলো গম্ভীর মুখে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে রোগী দেখলো। আজ যেহেতু আয়ন নিজের কেবিনে বসে সিরিয়ালি রোগী দেখাটা ছিল না। তাই হাতে সময়ও থাকলো বেশ। কারণ সাপ্তাহে তিনদিন আয়ন নিজের কেবিনে বসে রোগী দেখে দুপুর দুইটা থেকে রাত দশ-টা পযন্ত। তারপর একেবারে নাইট শিফট করে সকালে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে যায়। আজ যেহেতু রোগী দেখার তাগদা ছিলনা তাই সময় নিয়ে রয়েসয়ে এসেছিল হসপিটালের। আয়ন লিস্ট অনুযায়ী একে একে প্রতিটা ওয়ার্ডের রোগীকে পযবেক্ষণ করে নিল। এবং সেই লিস্ট অনুয়ায়ী আয়ন শফিকুল ইসলামের কেবিনের দিকে যেতে চাইলো। গম্ভীর মুখে হসপিটালের করিডোর ধরে ঢুকতেই চোখে পড়লো জুঁইকে। রেহেনা বেগমের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে জুঁই সাদা একটা থ্রি পিস পড়ে। তবে জুইয়ের গায়ে যে মায়ার জামা জড়ানো তাও বেশ বুঝতে পারলো আয়ন। আয়নের দৃষ্টি ঘুরালো জুঁইয়ের হাস্য উজ্জ্বল মুখটার দিকে। জুইয়ের হাসি মুখটা দেখে যেন আয়ন বক্ষস্থলে চিনচিন ব্যথাটা তীব্র প্রহর হলো। এই হাসিটা দীর্ঘ চেনা পরিচিত আয়নের। এই হাসিতেই তো শত মরণ মরেছিল আয়ন। আজও মরছে নীরবে। পুড়ছে দহনের আগুন। আর কতটা বা পুড়বে তাও জানা নেই আয়নের। তবে আয়নের মুক্তি চাই এই গুমোট অসয্য অনূভুতি থেকে। আদৌ মুক্তি পাবে কিনা তাও জানা নেই তার। আয়ন দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে জুঁইয়ের থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে এগিয়ে যায় নিজের কেবিন দিকে। আয়ন চলে যেতেই আয়নের চলে যাওয়া দিকে চোখ তুলে তাকায় জুঁই। এতক্ষণ যাবত জুঁইও লক্ষ করেছিল আয়নের উপস্থিতটা, তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিটাও। তবে সেটা কোনো ভাবেই বুঝতে দেয়নি আয়নকে জুই। অজানা ভাবে থেকে যাতে আয়ন বুঝতে না পারে। দু’জনের লুকোচুরি খেলায় কে কতটা কার থেকে এগিয়ে তা জানা নেই কারও ই। তবে দুজনের ভিতরে মধ্যকার থাকা পবিত্র বন্ধনের টানটা থেকেই গেলো নীরবে।

যথারীতি আয়ন নিজের শিফটের সকল রোগীকে তদারকি করে আসলো শফিকুল ইসলামে কেবিনে। রিপোর্ট গুলো চেক করে একে একে কুশলাদি বিনিময় করলো শফিকুল ইসলাম সঙ্গে। সেই সাথে আয়ন দক্ষতা সঙ্গে সবকিছু চেক করেও নিল এক পলক। আয়নের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে হেনা খান উসখুস করতে করতে তিনি আপাতত আয়নের সঙ্গে কথা বলতে চান। হয়তো আয়ন বিষয়টি বুঝতে পারছে তাই সে নিজের কাজ করতে করতে হেনা খানের উদ্দেশ্য বলে…

—” আমার কেবিনে অপেক্ষা করো নানুমা। আমি আসছি কিছুক্ষণের মধ্যে।

আয়নের কথায় তিনি যেন ভরসা পেলেন। কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন আয়নের কেবিনে। আয়ন আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শফিকুল ইসলামের সাথে নম্র গলায় কথা বললেন। কিছু মেডিসিনও সাজেস্ট করলো উনার উদ্দেশ্য। নার্সকে ঔষধ গুলো বুঝিয়ে দিয়ে শফিকুল ইসলাম থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলো নিজের কেবিনের দিকে আয়ন। আয়ন গম্ভীর মুখে নিজের কেবিনে ঢুকতেই জড়ো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় হেনা খানের কাছে। তিনি বললেন…
—” এখনো রেগে আছিস আমাদের উপর আয়ন?
হাতের স্টেথোস্কোপটি টেবিলে উপর রাখতে রাখতে ছোট করে বললো আয়ন…
—” না।
—” তাহলে যোগাযোগ কেন করছিস না আমাদের সাথে তুই? তোর মাও আমাদের সাথে সকল রকমের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। ফিহাকে পযন্ত আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না। তোরা সবাই আমাদেরকে দোষী কেন মানছিস? যা হয়েছে সবাটার পিছনে কি সত্যিই আমরা দোষী ছিলাম আয়ন? রিদের মনে…

হেনা খানের কথায় শেষ করতে দিল না আয়ন। তার আগেই গম্ভীর মুখে বাঁধা দিয়ে বললো…
—” অনেক আগেই আমি সবটা ভুলে গেছি নানুমা। আমার মানসিক স্পেইস দরকার ছিল যেটা আমি নিয়েছে সবার থেকে। আপাতত আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। দোষারোপ করে আমি কিছুই ফিরে পারো না। আমি বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি। তোমরাও মেনে নাও। চিন্তা করো না আমি তোমাদের সাথে যোগাযোগ রাখব। আম্মুও একটু সময় দাও। তিনিও সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সহজ হয়ে আসবে তোমাদের সাথে। হয়তো একটু সময় লাগবে। বাকিটা সময়ে উপর ছেড়ে দাও নানুমা।

আয়নের কথায় প্রশান্তির ঢেউ খেলে যায় হেনা খানের মনে। দীর্ঘ দুমাস ধরে উনার মনে অপরাধ বোধতা কাজ করছিল আয়নের জন্য। কষ্টও পাচ্ছিলেন তিহি। কিন্তু হেনা খানের কাছে করার মতো কিছুই ছিল না। কারণ যদি বিষয়টি একপক্ষিক হতো বা রিদ শুধু মায়াকে পছন্দ করে! এমনটা হতো তাহলেও তিনি রিদের সাথে কথা বলতো মায়াকে নিয়ে। কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। রিদ মায়া দু’জন দুজনকে গভীর ভাবে পছন্দ করে, ভালোও বাসে। সেখানে তিনি কিভাবে আয়নের জন্য কথা বলবে? আর কার সাথেই বা কথা বলবে? তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হলো আয়নও বিবাহিত। জুই আয়নের বউ। তাহলে সেখানে মায়ার জন্য কথা বলাটাও পাপ ছাড়া অন্য কিছু না। তাই এই মূহুর্তে তিনি অন্তত খুশি হলো আয়নের কথা। তবে জুইয়ের বিষয়েও তিনি কথা বলতে চান আয়নের সাথে। জুইকে উনারও বেশ পছন্দ। যেহেতু বিয়েটা হয়েই গিয়েছে তাহলে অন্তত একটা বার হলেও ভেবে দেখা উচিত আয়নের এই বিয়েটা নিয়ে তিনি মনে করেন। মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে হেনা খান ইতস্তত বোধ করলো। নিজের মধ্যে জড়তা নিয়ে রয়েসয়ে তিনি পুনরায় আয়নকে বললো…
—” আমি কিছু বললে তুই শুনবি আয়ন?
—” হুমম বলো।
—” না মানে! তোর জুঁইকে কেমন লাগে?
হেনা খানের কথায় চমকে উঠে আয়ন। সচকিত চোখ তুলে তাকালো হেনা খানের দিকে। কপাল কুঁচকে বলে…
—” মানে?
আয়নের পাল্টা প্রশ্ন খানিকটা হাসফাস করলো হেনা খান। ইতস্ততা জড়িয়ে পুনরায় বললো…
—” মেয়েটা বেশ মিষ্টি। অনেকটা মায়ার মতোই দেখতে। তবে মায়ার মতো অতটা অবুঝ নয়। বেশ বুঝদার। আমি লক্ষ করেছি। ছোট হলেও পরিস্থিতি বেশ মানিয়ে চলতে পারে। তোদের বিয়ের বিষয়টি এখনো নিজের পরিবারকে জানায়নি, বাবার অসুস্থতার কথা চিন্তা করে। মায়া আমাকে আজ বলেছে এই বিষয়টি। তাছাড়া জুঁইকে আমাদের আরও আগে থেকেই পছন্দ ছিল ভেবেছিল তোর সাথে মায়ার বিয়েটা দিয়ে। রিদের জন্য জুইকে ঘরে তুলবো। কিন্তু পরিস্থিতি উল্টো হলো। তুই কি কিছু ভেবেছিস জুঁইকে নিয়ে? না মানে সম্পর্কটা কি আগাবি সামনে জুঁইয়ের সাথে? কথা বললো জুঁইয়ের পরিবারের সাথে?

হেনা খানের সম্পূর্ণ কথা গুলো গম্ভীর মুখ শুনলো আয়ন। তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না হেনা খানকে তবে কয়েক সেকেন্ড নিরব থেকে হঠাৎ গম্ভীর মুখে বলে উঠলো সে…
—” আমি সম্পর্কটা নিয়ে আপাতত কিছুই চিন্তা করিনি নানুমা। যদি কিছু চিন্তা করিও তবে সেটা নাই-ই আসবে আমার মন থেকে। আমি জুঁইয়ের সাথে কোনো রকম সম্পর্কে জড়াতে ইচ্ছুক নয়। আমি প্রফেশনালি ডিভোর্স পাঠাবো জুইয়ের জন্য। ইতি মধ্যে আমার উকিল সঙ্গে কথাও হয়েছে এই বিষয়ে। আশা করছি তুমি তোমার সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছো নানুমা। আমি এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা মানি না। আর না মানতে চাই। আমাকে আপাতত আমার মতো থাকতে দাও প্লিজ নানুমা।
~~

রাত এগারোটা ছুঁই ছুঁই। ইতিমধ্যে আরাফ খানও এসেছেন হসপিটালের। আপাতত শফিকুল ইসলামের কেবিনে বসে আছে সবার সঙ্গে। টুকটাক সবার সঙ্গে কথাও বলছে। আরিফের কাজের সূত্রে চট্টগ্রাম থেকে ফোন আসায়! নিজের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে কেবিন হতে বেড়িয়ে যায় এবং হসপিটালের করিডোর ধরে নিরব পরিবেশে গিয়ে দাঁড়ায়। আপাতত এইদিকটায় তেমন কেউ আসে না। চারপাশে রেলিং দেওয়া বারান্দার মতো করে। অন্ধকারময় পরিবেশ। আরিফ কথা বলতে বলতে সেদিকটায় গিয়েই দাঁড়ালো। অন্তত মনোযোগ সহকারে কথা বলার সময় হঠাৎ কেউ একজন তাকে পিছন থেকে আরিফকে ঝাপটে ধরে পিঠে কপাল ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠে। স্তব্ধ আরিফ মূহুর্তে সমস্ত কায়া কাপিয়ে কেঁপে উঠলো। সাথে কেঁপে কেঁপে উঠলো আরিফের কানে ধরে রাখা ফোনের হাতটি। কথা বলতে কষ্ট হলো তাঁর। বুকের চিনচিন ব্যথায় গলা ধরে আসলো আরিফের। তাই বাঁধ্য হয়ে অসম্পূর্ণ রাখলো ফোনের কথা গুলো। ছোট করে ম্যানেজারকে বলে…
—” আপনাকে পড়ে ফোন দিচ্ছি আশিক সাহেব।

আরিফ কল কেটে সামনের দিকে ঘুরতেই ফিহা আরিফকে সামনের থেকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরে মূহুর্তেই। আরিফ দুই কদম পিছালো ফিহাকে নিয়ে। দেয়ালের সঙ্গে তার পিঠ ঠেকে যেতেই আরিফের প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো ফিহা। অস্পষ্ট স্বরে আওড়ালো…
—” আমার কষ্ট হচ্ছে আরিফ। ভিষণ কষ্ট হচ্ছে। আমি আর পারছিনা তোমাকে ছাড়া থাকতে। হয় আমাকে নিজের হাতে মেরে ফেলো নয়তো আমাকে গ্রহণ করো। তবুও আমাকে দূরে সরিয়ে রেখো না। আমার এই দূরত্বটা সয্য হচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি তোমার ভালোবাসায় অভ্যস্ত আরিফ তাহলে কেন এতোটা অবহেলা করছো আমায়? আমার অপরাধ! আমি খান বাড়ির সম্পর্ক ধর আর এজন্য তুমি আমার সত্যিকারের ভালোবাসাটাকে মিথ্যা বানাতে পারো না আরিফ। প্লিজ আরিফ আমাকে বিয়ে করে নাও। আমাকে আর দূরে সরিয়ে রেখো না। আমি মরে যাচ্ছি তুমি ছাড়া। প্লিজ আমাকে অবহেলা করো না।

আরিফ ঠোঁট কামড়িয়ে নিজের অনূভুতি গুলো দমে রাখলো নিজের মাঝে। বুকের তীব্র ব্যথাটা এবার মাথা ছাড়া দিয়ে উঠছে। কষ্ট গুলো ক্ষত বিক্ষত করছে প্রেয়াসিকে হারানোর ভয়টা। ফিহা শুধু খান পরিবার সদস্য এই একটা সমস্যা নয়। সমস্যা অসংখ্য! ফিহা পরিবার নিজের বিলাশ বহুল জীবন ছেড়ে ফিহাকে আরিফের মতো সাধারণ ছেলের হাতে তুলে দিবে না। তাছাড়া ফিহাও আরিফের সাদামাটা জীবনের সাথে গছিয়ে চলতে পারবে না। দামি গাড়ি বাড়ির কিছুই নেই আরিফের। শুধু ভালোবাসা দিয়ে জীবন চলে না বড়লোক ঘরের মেয়েদের। তাই ফিহার ও চলবে না। তাছাড়া আরিফ নিজের বাবাকে কোন মুখে বলবে তার ফিহাকে পছন্দ? ভালোবাসে একে অপরকে। ফিহাকে টেনে নিজের থেকে দূরে সরাতে চাইলো আরিফ। কিন্তু পারলো না। বরং ফিহা আরও শক্ত করে ঝাপটে ধরলো আরিকে নিজের সাথে। অজ্ঞাত আরিফ ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে বলে…

—” সময়ের সাথে সাথে সবাই সবটা পারে ফিহু। তুমিও পারবে দেখিও। আমার প্রতি তোমার আবেগ ভালোবাসা সবকিছুই কয়েকদিন পর শেষ হয়ে যাবে। হ্যাঁ! হয়তো এখন কষ্ট হচ্ছে তোমার। কিন্তু জীবনের একটা সময়ে গিয়ে তুমি আমাকে ধন্যবাদ জানাবে। তোমার জীবন থেকে চলে যাওয়ার জন্য। মিলিয়ে নিও ফিহু তুমি!

ডুকরে কেঁদে উঠে ফিহা আরিফে গলায় মুখ গজায়। নিজের ঠোঁট আরিফের কন্ঠেনালিতে ছুঁয়ে কান্না জড়িত গলায় বলে উঠে…
—” কেন এমন করছো আমার সাথে তুমি? তুমি আমাকে চিনো। কখনো কোনো পরিস্থিতি তোমার সামান্য কথাও অমান্য করিনি আমি। তাহলে আজ কেন তুমি আমার ভালোবাসাকে মোহ বা খান বাড়ির সম্পর্কের দোহাই দিয়ে অবহেলা করছো? আমি মরে গেলে তুমি বিশ্বাস করবে যে আমি কতটা ভালোবাসি তোমাকে? আমি জীবিত থাকতে কি তোমাকে কখনোই পারো না আরিফ? চারপাশের এতো চাপ আমি আর নিতে পারছিনা। প্লিজ আরিফ! তুমি আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও। তুমি যেভাবে রাখবে আমি সেই ভাবেই থাকবো তোমার সাথে। আমার এই বিলাশ বহুল জীবনটা দম বন্ধ হয়ে আসছে তুমিহীনা। আমি মরে যাব…

ফিহা থামে। থামে নয় তাঁকে থামতে হয় এক প্রকাশ বাঁধ হয়েই। কারণ ততক্ষণে ফিহা ওষ্ঠদয় আটকা পড়ে আরিফের ঠোঁটের ভাঁজে। অশান্ত হরিণী মূহুর্তেই শান্ত হলো। অন্ধকারময় বারান্দায় ফিহা আরিফকে নিয়ে দেয়ালের সাথে মিশে গিয়ে নিজের দু’হাতে আরিফের পিঠে শার্ট আঁকড়ে ধরলো শক্ত করে। ফিহা আবেশেই চোখ বন্ধ করতেই মিনিট দুয়েক পর আরিফ ছেড়ে দিল ফিহার নরম ওষ্ঠদয়।। অতি সন্তপর্ণে ফিহার দুগাল আঁকড়ে ধরলো আরিফ। গভীর ভাবে ফিহার অশ্রু সিক্ত বন্ধ দু-চোখের পাতায় আরিফ ভেজা ঠোঁটে পরপর চুমু খেলো শব্দ করে। এক হাতে ফিহা কমড় জড়িয়ে ধরে ফিহাকে আরও কাছে টানলো আরিফ। ফিহার গলায় নিজের মুখ গজিয়ে দীর্ঘ নিশ্বাস টানলো নিজের মাঝে। তারপরও হুট করেই এলোমেলো ঠোঁট ছুঁয়াতে লাগলো ফিহার গলায় আরিফ। ফিহা তরতর করে কেঁপে উঠে আরিফের শার্টের কার্লার চেপে ধরতেই ভেজা কন্ঠে মুখ খুললো আরিফ…

—” মরার কথায় নয় ফিহু। আমি তোমাকে পায় বা না পায়। তারপরও তোমাকে বাঁচতে হবে ফিহু। আমার ভাগের সবটা সুখ তোমাকে দিয়ে হলেও তোমাকে সুখী হতে হবে ফিহু। আমি তোমাক বিলাসবহুল জীবন দিতে পারবো না। আর না নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে তোমাকে চাইতে। তোমার পরিবারও আমার মতো সাধারণ একটা ছেলেকে উনাদের মেয়ের জামাই করতে চাইবে না ফিহু। মানুষ বুঝার ক্ষমতা আমার আছে। আর সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি তোমার কষ্ট আর বাড়িয়েও না। আমাকে ভুলার চেষ্টা করো। তোমার মার কথা গুলো মেনে নাও। তিনিও আমাদের সম্পর্কটা নাহুচ করছে সেটা হয়তো তিনি ভেবে চিন্তেই করেছে। তুমি তোমার মার কথা মেনে নিয়ে বিয়ে করে ফেলো ফিহু। আমার পথ তোমার জন্য শুভ নয়। আমি তোমার জন্য উপযুক্ত পাত্র নয় ফিহু।

আরিফের ভালোবাসায় এতক্ষণ যাবত ফিহা শান্ত থাকলেও পুনরায় অশান্ত হয়ে উঠে তার কথায়। আরিফের বাহুতে নিজের শরীর ছেড়ে দিতেই তৎক্ষনাৎ ফিহাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো আরিফ নিজের মাঝে। ডুকরে কেঁদে উঠে ফিহা বলে।
—” আমার দীর্ঘ তিন বছরে ভালোবাসা তুমি। কিশোর থেকে যৌবনে আসার দীর্ঘ সাধনা তুমি। আমার জীবনের প্রথম পুরুষ তুমি। তুমিহীন মৃত্যু আপন। তারপরও অন্য পুরুষ নয়। আমার বিলাস বহুল জীবন চাই না আরিফ। আমার তোমাকে চাই। তোমার সাথে ছোট সংসার বাঁধতে চাই।

ফিহার ছেড়ে দেওয়া শরীরেটা আরিফ নিজের মাঝে আঁকড়ে নিয়ে আবারও ফিহার গলায় নিজের মুখ ডুবাই। পুনরায় আরিফ এলোমেলো চুমু খেলো তৃষ্ণার্তের মতো। গলা থেকে মুখ উঠিয়ে আবারও ফিহার ঠোঁটের ভাঁজে নিজের ঠোঁট রাখলো সে। দীর্ঘ সময় নিয়ে চুমুও খেলো একে অপরকে। কপাল কপাল ঠেকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস টানলো দু’জনই। নিশ্বাসের ঘনত্ব গছিয়ে মুখ খুললো আরিফ। গভীর কন্ঠে বলে উঠলো ফিহাকে…
—” আমি কাকে বলবো ফিহু আমার যে তোমাকে চাই? কার কাছে আবদার করবো তোমার মতো করে? তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসলে আমাদের এলোমেলো সম্পর্ক গুলো আরও এলোমেলো হয়ে যাবে ফিহু। সবাই চোখে সারাজীবনের মতো অপরাধী হয়ে থাকবো আমরা দু’জনই। তখন পারবে কি সবার অধরাধী হয়ে বেঁচে থাকতে? কষ্ট হবে না তোমার? আমার হবে তোমার কষ্টে। তাই আমি তোমাকে কারও চোখে অপরাধী করে রাখতে চাই না ফিহু। আমার দূরে থাকাতেই তোমার সর্বোত্ত সুখ হবে।

দুজনের নিশ্বাসের ঘনত্ব গুছিয়ে আরও ঘনিষ্ঠ হলো ফিহা। বুঝতে পারলো আরিফের মন নরম হয়ে এসেছে ফিহার জন্য। তাই নিজের থেকে আরিফের দুগাল আঁকড়ে ধরে দুপা উঁচু করে আরিফের ললাটে দীর্ঘ সময় নিয়ে নিজের ঠোঁট চেপে রাখলো। দুচোখ পাতায়, গালে পরপর ঠোঁট বুলালো মিষ্টি আদুরে ফিহা। খানিকটা লজ্জায় ফিহা দু’হাতে আরিফের গলা জড়িয়ে ধরে তৎক্ষনাৎ সেখানটায় নিজের মুখ লুকালো। তারপর চোখ মুখ খিঁচে লাজুক ভঙ্গিতে হেঁসে বলে উঠে…
—” আই লাভ ইউ। খুব খুব খুব ভালোবাসি তোমাকে। তোমার জন্য সব মঞ্জুর। বহুবার অপরাধীনি হতেও দ্বিধা নেই। শুধু তুমি পাশে থেকো প্রিয়।
ফিহার লজ্জায় হালকা শব্দ করে হেঁসে উঠে আরিফ। দীর্ঘ তিন বছরের ভালোবাসার সম্পর্কে আজ প্রথম একে অপরকে গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিলো। তাও অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে। আরিফ শব্দ করে হেসে দুহাতের উষ্ণ ছুঁয়া শক্ত করে আলিঙ্গন করলো ফিহাকে। ফিহার মাথায় নিজের গাল ঠেকিয়ে আদুরে সহিত বলে উঠলো…
—” আমি তোমার আম্মু সাথে দেখা করতে চাই ফিহু।
আরিফকে গভীর জড়িয়ে মোহিত কন্ঠে বলে ফিহা…
—” আম্মু আব্বু সাথে সিলেট গেছে আব্বুর বিজনেস ট্রিপে। ফিরে আসতে দুইদিম লেট হবে। তৃতীয় দিন দেখা করলে হবে না তোমার?
দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে সম্মতি জানালো আরিফ..
—” হবে।
—” আই লাভ ইউ!
ফিহূ মাথায় ছোট করে চুমু দিয়ে বললো আরিফ…
—” আই লাভ ইউ টু।
হসপিটালের করিডোর ঘুরঘুর করা মায়া অতি সন্তপর্ণে দেখে নিলে ফিহা ও আরিফে প্রেম ঘটিত বিষয়টি। সম্পূর্ণ বিষয়টি না দেখলেও ফিহার লাস্টে কথা ও আরিফকে খাওয়া চুমু গুলো দেখে নিল। ফিহার আরিফকে কপালে, গালে, খাওয়া চুমু গুলো দেখতেই মায়া বিশাল বড় হা হয়ে থাকলো নিজের মাঝে বেশ কিছুক্ষণ। স্তব্ধ মায়ার বুঝতে বাকি রইলো না ফিহার সাথে নিজের ভাইয়ের প্রেম ঘটিত জটিলতা বিষয়টি। মন্ত মায়া হা হয়ে ততক্ষণ তাকিয়ে থাকলো যতক্ষণ না পযন্ত হেনা খান মায়াকে ডাক লাগালো বাসায় ফিরে যাওয়া উদ্দেশ্য। এলোমেলো চিন্তা ভাবনা নিয়ে মায়া বেশ ভাবুক হলো। করিডোর থেকে ফিরে এসে কতক্ষণ নিজের মায়ার চারপাশে ঘুরঘুর করলো ভাবুক মায়া। হেনা খানের পাশেও গা এলিয়ে কতক্ষণ বসে রইলো। কিন্তু নিজের চিন্তা ভাবনা শেষ করতে না পেরে ভাবুক মায়া নিজের বাবার বেড়ে চারপাশে কতক্ষণ চক্কর কাটলো। তারপর উঠে বসলো শফিকুল ইসলামের বেডে উপর। কথাও বললো। কিন্তু মন শান্ত হলো না মায়ার। দীর্ঘ সময় পর যখন আরিফ ও ফিহা আলাদা আলাদা ভাবে কেবিনে ভিতর প্রবেশ করলো তখন থেকেই ভাবুক মায়া গোল গোল চোখে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলো ফিহা ও আরিফের দিকে। নিজের ভাইয়ের কাছে লজ্জায় যেতে না পারলেও ফিহার চারপাশে ঘুরঘুর করলো বিশেষ কিছু চিন্তা ভাবনায়। একবার ফিহার গা ঘেঁষে বসছে তো অন্যবার ফিহার দিকে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছে। ফিহা মায়ার চঞ্চলতার স্বভাব সম্পর্কে প্রথম থেকে অবগত বিদায় বিশেষ একটা নজর দিলো না সেদিকে। তবে এর মধ্যে একবার ফিহা মায়াকে নিজের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করেছিল’ কি হয়েছে’ জানার জন্য। তবে মায়া উত্তরে না বোধক মাথা নাড়ায়। এবং অসম্মতি জানিয়ে বলে ‘কিছু হয়নি। কিন্তু মায়ার আসল চিন্তা ভাবনার শেষ হলো না বরং তরতর করে বাড়লো। পেটের মধ্যে ঘুরঘুর করলো দলা পাকিয়ে আসা দলে দলে প্রশ্নরা।

হসপিটালের করিডোর এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা জুঁইও শুভকে চোখে পড়লো আয়নের। ওটির জন্য বের হতেই চোখে পড়লো দুজনকে। পূব পরিচিত হওয়ায় বেশ হাসি হাসি কথা বলছে দুজনই। আয়ন কপাল কুঁচকে শুভকে লক্ষ করলো। মুটামুটি গঠনের ছেলেটি শ্যামবণের গায়ের রঙ্গ। উচ্চতা ৫”৮ ইঞ্চি হবে। দেখতে বেশ খারাপ না চলে। দুজনের হাতের ওয়ান টাইম কফির কাপ। জুই মাথায় ওড়না দিয়ে মুড়িয়ে শরীর ডেকে হাতে কফির কাপে চুমুক বসাচ্ছে ছেলেটির সাথে মৃদু হেসে কথা বলতে বলতে। আয়ন অজান্তেই পা বাড়ালো সেদিকে। গায়ে তার ওটির ড্রেস। অপারেশন যাবে। আয়ন জুইও শুভের কাছা কাছি আসতেই কপালের ভাজ আরও তীক্ষ্ণ হয় তাদের কথা গুঞ্জন শুনে। দু’জনের মনোযোগ আর্কষণের জন্য আয়ন মৃদু গলা খাকিয়ে শব্দ করে বললো…

—” আপনারা এখানে?
জুই চমকে উঠে তাকায় আয়নের দিকে। জুইয়ের বুকের সাথে সাথে হাতের কফির কাপটাও যেন মৃদু কেঁপে উঠলো তৎক্ষনাৎ। আয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো জুইয়ের দিকে। তখনই সামনের থেকে হাসিমুখে কথা বলে উঠলো শুভ…
—” আরে ডক্টর সাহেব যে এখানে?
জুইয়ের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আয়ন তাকালো শুভের দিকে। চেহারায় গম্ভীর্য্যতা টেনে বললো…
—” জ্বিই! ওটিতে যাচ্ছি। আপনারা এখানে কেন?
—” এইতো আরকি! আমরা অবসর সময় পার করছিলাম ডক্টর। জুইয়ের রাতের শহর খুব পছন্দ সেই গল্পই শুনছিলাম। তা আপনি কিছু বলবেন নাকি? দাঁড়ালেন যে?
শুভের পরপর প্রশ্ন গুলো আয়নের খুব একটা পছন্দ না হলেও সেটা কোনো ভাবেই চেহারায় প্রকাশ পাচ্ছে না তার। বরং স্বাভাবিকতা ন্যায় গম্ভীর্য্য ভাবটায় চেহারায় বজায় রাখলো আয়ন। তবে কন্ঠে রাখলো দারুণ নম্রনীয়তা ভাব…
—” জ্বিই! আপনাকে হয়তো আরিফ খোঁজ করছে আসার সময় দেখলাম সেটা। আপনি গিয়ে বরং দেখে আসুন একবার। হয়তো কোনো প্রয়োজনে ডাকছে আপনায়।
—” ওহ আচ্ছা! ধন্যবাদ ডক্টর বলার জন্য। আমরা যাচ্ছি তাহলে। চলো জুঁই ভিতরে…
শুভের কথা সঙ্গে সঙ্গে থামিয়ে দেয় আয়ন। আগের ন্যায় গম্ভীর মুখে বলে…
—” আরিফ আপনার খোঁজ করছে মিস্টার আহামেদ। জুইয়ের নয়। উনি থাকুক। আপনি বরং যান।
আয়নের সোজাসাপটা কথায় কপাল কুঁচকে আসে শুভের। সন্দিহান গলায় বললো শুভ…
—“কেন? ওহ থাকবে কেন?
—” আমার কথা আছে তাই।
আয়নের কথায় মূহুর্তেই খানিকটা নড়েচড়ে উঠলো জুঁই। কম্পিত স্বরের মিনমিন গলায় বলে শুভের উদ্দেশ্য…
—” আমি আব্বু কাছে যাব শুভ ভাইয়া। আপনি চলে..
জুইকে মাঝ পথে থামিয়ে দিয়ে পুনরায় বলে উঠলো আয়ন। অন্তত শক্ত ও গম্ভীর মুখে বললো…
—“জুই থাকবেন। আপনি যান মিস্টার শুভ।

শুভের সন্দেহ অসন্তোষ মধ্যে থেকে গেলো আয়ন। কারণ শুভ জানে আয়নের পরিচয় কি জুঁইদের সাথে। তাই বিষয়টা এতোটা আমলে নিল না যেহেতু পূব পরিচিত আয়ন জুইদের তাই। তবে শুভ যাওয়ার সময় জুঁইকে বলে গেলো কথা শেষ করে দ্রুত চলে আসতে কেবিনে মধ্যে। জুঁই শুভের কথা অনুযায়ী মাথা নাড়িয়ে সম্মতিও জানালো নীরবে। যেটা খুবই সূক্ষ্ম চোখে পযবেক্ষণ করলো আয়ন। তবে তৎক্ষনাৎ কিছু বললো না জুঁইকে আয়ন। সময়ে নিয়ে খানিকটা চুপ থাকলো সে। জুইয়ের ইতস্তত দৃষ্টি ভঙ্গিও পযবেক্ষণ করলো স্থির চোখে আয়ন। রয়েসয়ে গম্ভীর কণ্ঠে মুখ খুললো আগে। জুঁইকে প্রশ্ন করে বললো আয়ন…
—” ছেলেটার সাথে সম্পর্ক কি আপনাদের?
কফি হাতে জুঁই খানিকটা হাসফাস করলো। নিজের নত দৃষ্টি ফ্লোরে এদিকে সেদিক করে একহাতে কপালের পাশের চুল গুলো কানে পিছনে গজিয়ে দিতে দিতে জড়ানো গলায় বললো…
—” জ্বিই! বড় আপুর দেবর হয় তিনি। শাহিন ভাইয়ার ছোট ভাই।
—” তো হসপিটালের এতোটা সময় কেন থাকছেন? রাত দিন দুই বেলায় দেখা যাচ্ছে উনাকে। কিন্তু কেন?
আয়নের খাপছাড়া প্রশ্ন আবাক হলো জুঁই। তৎক্ষনাৎ চোখ তুলেও তাকালো আয়নের দিকে। সাথে সাথে চোখ মিলল দুজনের। জুঁই দ্রুততার সঙ্গে পুনরায় নিজের দৃষ্টি নত করে আগের ন্যায় বললো…
—” তিনি আমাদের পরিবারেরই একজন। আব্বুকে খুব ভালোবাসেন ভাইয়া তাই দ্বায়িত্ব নিয়ে থাকছেন আমাদের পাশে আরকি। কেন এখন ভাইয়া আমাদের সাথে হসপিটালের থাকছে বলে ও কি আপনি উনাকে থাপ্পড় মারতে চান নাকি সেদিনের মতো করে? যেমনটা আমায় মেরেছিলেন?
—” আপনার ভাইয়াকে থাপ্পড় দিলেও আমার মনে হয়না সেটা অস্বাভাবিক বা অযাচিত কিছু হবে মিসেস জুঁই। উনি এমনিতেই আমার হাতের একটা থাপ্পড় প্রাপ্ত হয়ে গেছেন।
আয়নের সোজাসাপটা কথায় চমকালো, ভড়কালো, মূহুর্তেই হকচকিয়ে গেলো জুই। সচকিত দৃষ্টি তুলে আয়নের দিকে স্থির করে হতবাক গলায় বললো..
—” মানে? আপনি উনাকে কেন মারতে চান?
—” একটা বিবাহিত মেয়ের প্রতি যত্নশীল হওয়া মানেই স্বামী হাতের চড় থাপ্পড় ফ্রিতে পাওয়া। সেই সুবাদে আপনার শুভ ভাইও মনে হয় আমার কাছে একটা থাপ্পড় পাওনা হয়ে গেলো। কারণ স্বামী তো আমিও হয় আপনার তাই না।

আয়ন নিজের কথায় নিজের থমথমে খেয়ে যায়। ইতস্তত, অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে ফেললো দুজনের জন্যই আয়ন। আয়ন কথায় কথায় মুখ ফুসকে কি থেকে কি বলে ফেলেছে বিষয়টি বুঝতেই নাক মুখ কুঁচকে পাশে তাকিয়ে অসন্তোষ কন্ঠে আওড়ায় “শিট! নার্ভাসনেসে ইতস্ততায় আর দাঁড়ালো না আয়ন। দ্রুততা সঙ্গে প্রস্হান করলো জুঁইয়ের সামনে থেকে। মূলত সে জুঁইয়ের সাথে নিজেদের ডিভোর্সের বিষয়ে কথা বলতে এসেছিল। কিন্তু নিজের কথায় নিজেই গুলিয়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে আয়ন। কিছুই বলা হলো না জুঁইকে আয়নের উল্টো সে নিজের বোকামির জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ ক্রিয়েট করলো নিজেদের মাঝে। কি জানি জুঁই কি ভাবছে তাঁকে নিয়ে? হতবিহ্বল জুঁই জড়তায় সিঁটিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো জায়গায়। মূলত আয়নের কথায় সে ইতস্ততায় আষ্টশ হয়ে আছে প্রচন্ড ভাবে।

.

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply