Golpo romantic golpo দেওয়ানা আমার ভালোবাসা দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২

দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৩


দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২

লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৪৩
ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ জন-নগরী। লোডশেডিং প্রচন্ড। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে আবারও ফিরছে। তবে আপাতত বিদ্যুৎ নেই চারপাশে। নেই কোনো প্রকৃতির শীতল হওয়ার। তপ্ত গরম চারপাশে। আমাবস্যার ঘনকালো ঘুটঘুটে রাত। সময়টা রাত দশটা কৌঠা পেরিয়ে যথারীতি এগারোটার কাঠায় ঠেকেছে আরও বিশেক আগেই। বর্তমান রাত ১১ঃ২১। একটা মাঝারী সাইজের দোতলা বাড়ির কোর্ণার রুমে খোলা বারান্দায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে জুঁই। অশান্ত মনে শান্ত দৃষ্টি স্থির প্রশ্বস্ত কালো আকাশে ঝলমলে তাঁরা দিকে। ভাবনা জুড়ে নানান চিন্তা। সেই চিন্তার এক অংশে আয়নের নামটাও আছে। ভাবনায় বিভোর জুঁইকে চমকে দিতে হঠাৎ আগমন ঘটলো মায়ার। চঞ্চল হরিণীর ন্যায় অন্ধকার রুম হাতরে এসে ধুপ করে বসলো খোলা বারান্দায় বেতের চেয়ার উপর। চেয়ারটা খানিকটা নড়ে উঠলো শব্দ করে। অন্ধকারে হঠাৎ শব্দে ভয়ে চমকে উঠে জুঁই। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন ফিরে তাকাতেই আবছা আলোয় চোখে পড়লো মায়ার দুষ্ট হাসি রেখে।

—” ভয় পেয়েছিস?
মায়ার কথায় হালকা হাসার চেষ্টা করলো জুই। বিষন্নতায় ঘিরা মন খারাপ ভাব নিয়ে পুনরায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অন্ধকারময় আকাশের দিকে। মায়ার কথায় ছোট করে উত্তরে বললো..
—” না!
নিজের পাশের বেতের চেয়ারটা টেনে, মায়া চেয়ার সাথে চেয়ার লাগিয়ে জুইকে সেখানটায় বসতে ইশারা করে বলে..
—” আয়! এখানটায় বস।
মায়া কথা অনুযায়ী জুই বিনা বাক বয়ে এসে বসলো মায়ার পাশের চেয়ারটায়। দু’জনের স্থির দৃষ্টি খোলা আকাশের উপর। নিরবতা ভেঙ্গে মায়া পুনরায় বলে..
—” কি নিয়ে এতো ভাবছিস?
—” কিছু না।
—” আয়ন ভাইয়াকে মনে পড়ছে?
—” না।
জুইয়ের উত্তরের পুনরায় নিরবতা চেয়ে যায় চারপাশে। সেদিন রাতের ঘটনার পর আজ দুমাসের থেকে অধিক সময় হয়েছে জুইয়ের সাথে মায়া ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে আছে নিজের পরিবারে। শফিকুল ইসলামের শরীরটা বেশ একটা ভালো যাচ্ছে না বিদায় মায়া ঢাকা ফিরছে না ইচ্ছাকৃত ভাবেই। অবশ্যও আর একটি কারণ আছে। জুইকে মানসিক ভাবে সাপোর্ট করার জন্য আপাতত মায়া ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে থাকা। তবে খান বাড়ির সকলের সাথে যোগাযোগ হয়। কথা হয় বাবা শফিকুল ইসলামের ফোন দিয়ে। শুধু রিদের খবরাখবর জানা নেই মায়ার। আজ বিগত দুই মাসের বেশি সময় ধরে রিদের সাথে মায়ার কথা বা দেখা-সাক্ষাৎ নেই। রিদ ভালো আছে কিনা তাও জানা নেই মায়ার। তবে প্রতি মূহুর্তেই খুব জানতে ইচ্ছা হয় মায়ার, তার মিস্টার ভিলেন কেমন আছে? ভালো আছে কিনা? একদিন তো মায়া লাজ-লজ্জা মাথা খেয়ে হেনা খানকে জিগ্যেসা করেই বসেছিল তার মিস্টার ভিলেন কেমন আছে? ভালো আছে কিনা? সেদিন হেনা খান উত্তরে বলেছিল ভালো আছে। ব্যস এটুকুই। আর কিছুই মায়া প্রশ্ন করতে পারিনি। আর না হেনা খান আগ বাড়িয়ে রিদের সম্পর্কে কিছু বলেছিল মায়াকে। অক্ষাত মায়া খুব ছটফট করে তার মিস্টার ভিলেন খবর নিতে। মায়ার ছোট মনে বেশ অভিমান জমা হয়েছে কেন তার মিস্টার ভিলেন তার খবর নিচ্ছে না। কেন মায়াকে দেখতে আসে না ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে? এতো কিসের ব্যস্ততা এই লোকটির? তাকে কি একটা বারও মিস করা যায় না? কই মায়া যে বসে বসে সারাদিন লোকটাকে মিস করে বেড়ায়। কষ্ট পাই। সেটা কাকে বলবে সে? মায়ার ছোট মাথায় একটা জিনিস কিছুতেই আসে না। সে কেন এমন পাষাণ লোককে বসে বসে সারাদিন মিস করে বেড়ায়। তাছাড়া তার মিস্টার ভিলেনের ও কি আর কোনো কাজ নেই? বসে বসে মায়ার ভাবনায় আসা ছাড়া। মায়ার মন খারাপ হয়। ভিষণ মন খারাপ হয়। হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কান্না করার মতো মন খারাপ হয়। কিন্তু সে কাঁদবে না। বরং ভিষণ অভিমান করবে তার মিস্টার ভিলেনের সঙ্গে। কথাও বলবে না। ফিরেও তাকাবে না। এমন মন খারাপের অভিমান করবে মায়া। দৃঢ় ভাবনা চিন্তায় মন্ত মায়া অন্ধকারময় রুমে গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে রইলো ঝলমলে তাঁরা দিকে। নিস্তব্ধতা পুনরায় চেয়ে যায় চারপাশে। এবার নিরবতা ভাঙ্গলো জুঁই। আকাশের দিকে তাকিয়ে বিষন্ন গলায় বললো জুঁই…
—” ভাইয়াকে(রিদ) মিস করছিস?
মায়ার মন খারাপের কাটকাট উত্তর…
—” না।
—” তোর লটকানো ফেস দেখলে যে কেউ বলে দিবে তুই কতটা শোকাহত স্বামী দহনে। কতটা মিস করছিস ভাইয়াকে। ফিরে যাচ্ছিস না কেন তাহলে ঢাকা?
—” বাবা অসুস্থ। আগে সুস্থ হোক তারপর যাব।
জুই দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে ছোট করে উত্তরে বললো.
—” হুমমম।
পুনরায় নিস্তব্ধতা চেয়ে যায় চারপাশে। মায়া খানিকটা নড়েচড়ে বসে ঘুরে তাকায় জুঁইয়ের দিকে। আবছা আলোয় দেখলো জুঁইয়ের বিষন্নতা ফেসটি। খানিকটা হাসফাস করে জুঁইকে কিছু বলার জন্য মায়া। নিরবতা কাটিয়ে পুনরায় মুখ খুললো মায়া। জড়তায় বললো মায়া..
—” কিছু প্রশ্ন করলে ঠিকঠাক উত্তর দিবি তো জুন্নু? কিছু লুকাবি না কিন্তু?
মায়ার জড়তার কন্ঠে কান খাঁড়া হলো জুঁইয়ের। তবে মায়ার দিকে ঘুরে তাকালো না ঠিকই তারপরও খানিকটা হলেও বুঝতে পারলো আসলে মায়া কি বলতে চাই ওকে। তাই কোনো রুপ বনিতা না করেই সম্মতিতে বললো জুঁই…
—” হুমম! বল
মিনমিন গলায় বললো মায়া…
—” আয়ন ভাইয়াকে পছন্দ করিস?
মায়ার হঠাৎ প্রশ্নে খানিকটা কেঁপে উঠলো যেন জুঁই। বুকের ধুড়ফড় চিনচিন ব্যথা নিয়ে মায়ার অগোচরে শক্ত করে চেপে ধরলো বেতের চেয়ারের হাতল। কম্পিত কন্ঠে কঠিনতা বজায় রেখে শক্ত গলায় বললো জুঁই…
—” না।
—” তাহলে তোদের বিয়ের বিষয়টা এখনো পযন্ত বাবাকে কেন জানাচ্ছিস না তুই? তোর কি মনে হয়না এখন অন্তত পরিবারের সবাইকে জানানো দরকার তোদের বিয়ের বিষয়টা নিয়ে?
—” বাবা সুস্থ নয় মায়া। অসুস্থ তিনি। হার্টের সমস্যা উনার ইদানীং বেশি হচ্ছে সেটা তুই জানিস। এমন্তর অবস্থায় আমার অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের বিষয়টা প্রকাশ করলে কি হবে সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস তুই। তাছাড়া তোর বিয়েটায় বাবা আজ পযন্ত মেনে নিতে পারেননি। সেখানে দ্বিতীয়বারে মতো সেই খান বাড়ির সাথে আমার অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়েটা তিনি সহজে মেনে নিতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে তোর? ঝামেলা কতটুকু হবে বলার বাহিরের। এসব জন্য সময় দরকার। সময় হোক বাবাকে সবটা বলবো আমি।
—” আর কতো সময়? তোদের বিয়ের অলরেডি চার মাস চলে গেছে জুঁন্নু। বাবা সাথে পড়ে কথা বললেও অন্তত অয়ন ভাইয়ার সাথে একবার তোর কথা বলা উচিত। তোরা কি বিয়েটাকে কন্টিনিউ করতে চাইছিস নাকি..
মায়াকে শেষ করতে দিল না জুঁই। তার আগেই বলে উঠলো সে…
—” প্রশ্নই উঠে না বিয়েটা কন্টিনিউ করার। এই বিয়েটা আমি চাই না। আর না চাই সম্পর্কটা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে। আমি আমার বাবাকে প্রচন্ড ভালোবাসি রিতু। আমার জন্য আমার বাবা বিন্দু মাত্র কষ্ট পাক সেটা আমি কখনোই চাইবো না। বাবা খান বাড়ির সাথে কোনো সম্পর্ক পছন্দ করে না। তাই আমিও চাই না নতুন কোনো সম্পর্ক গড়ুক তাদের সাথে আমার। যেটা যেভাবে আছে সেভাবেই থাকুক। বিয়েটা আমি ভুলে গেছি অনেক আগেই। আমার জীবনে বিয়েটা শুধু কালো অতীত ছাড়া অন্য কিছু না। আমি আমার জীবনে দ্বিতীয় বারের মতো কখনোই মুখোমুখি হতে চাই না সেই বিয়েটার সাথে। তাই বলছি তুইও ভুলে যা এই বিয়েটাকে।
~~

রাত একটা পয়তাল্লিশ। ঘনঘন দরজার করাঘাতে ঘুম থেকে ধুর ফরিয়ে উঠে জুঁই। ঘুম ঘুম চোখে দরজার দিকে তাকাতেই উচ্চ শব্দে চিৎকার চেচামেচি শুনা যায় দরজার ওপাশ হতে রেহেনা বেগমের। মধ্যে রাতে মায়ের চিৎকার চেচামেচি শব্দে ঘাবড়ে যায় জুঁই। এতো রাতে কি হয়েছে বিষয়টি বুঝতে না পেরে পাশে থাকা মায়ার দিকে তাকায়। মায়া উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গজিয়ে বেঘোর ঘুমাচ্ছে। দরজার এতটা উচ্চ স্বরে করাঘাতের শব্দটাও বিন্দু মাত্র কানে ঢুকছে না মায়ার। জুঁই আতঙ্কিত ভঙ্গিতে মায়াকে বেশ কয়েক বার ধাক্কিয়ে জাগ্রত করার চেষ্টা করলো। মায়াকে কিছুতেই ঘুম থেকে উঠাতে না পেরে বাধ্য হয়ে জুঁই একাই ছুটলো দরজার দিকে। রুমের লাইট জ্বালিয়ে দরজার খোলতেই চোখে পড়লো রেহেনা বেগমের কান্না জড়িত লাল হয়ে ফোলে যাওয়া মুখটা। আতঙ্কিত জুই সঙ্গে সঙ্গে রেহেনা বেগমেকে ঝাপটে ধরতেই তিনি ডুকরে কেঁদে উঠে জুইকে বুকে নিয়ে। অস্পষ্ট স্বরে বলতে থাকে…
—” তো তোদের বা বাবা। তোদের বাবা হার্ট অ্যাটাক করেছে জুঁই। আরিফ তোদের বাবাকে গাড়িতে উঠাচ্ছে। তাড়াতাড়ি চল তোরা দুজন। মায়াকে ডাক! তোদের বাবা জ্ঞান ফিরে তোদের দুজনকে পাশে দেখতে চাইবে। চল তাড়াতাড়ি তোরা দুজন আমাদের সাথে।

রেহেনা বেগমের কথা আকাশ ভেঙে পড়লো যেন জুইয়ের মাথায়। সশব্দে কেঁদে উঠে পরপর ধাক্কিয়ে জাগ্রত করে মায়াকে। মায়াকে শফিকুল ইসলাম কথা জানাতেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠে মূহুর্তেই। রাতে শফিকুল ইসলাম ভালো ছিলেন। হঠাৎ করে কিভাবে হার্ট অ্যাটাক করলো কেউই বুঝতে পারছে না বিষয়টি। অক্ষত জুই ও মায়া রেহেনার বেগম পিছু পিছু ছুটে যায় শফিকুল ইসলামের কাছে। অজ্ঞান অবস্থায় শফিকুল ইসলামকে নিয়ে ব্রাক্ষণবাড়িয়া মেডিকেল হসপিটালের ভর্তি করাতেই ডক্টর জানায় শফিকুল ইসলামের অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল। উনার ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে ভালো চিকিৎসা হবে না। তাই ঢাকার একটা হসপিটালের রেফারেন্স করে দেয়। ইমারজেন্সিতে অ্যাম্বুলেন্স করে মধ্যে রাতেই ছুটে চলে ঢাকার উদ্দেশ্য আরিফ অসুস্থ শফিকুল ইসলামকে নিয়ে। অক্সিজেন মাক্স লাগিয়ে রেখেছেন শফিকুল ইসলামকে মুখে। তার পাশেই বসে আছেন বিধস্ত অবস্থায় রেহেনা বেগম, জুঁইও মায়া। আরিফ ডাইভারের সাথে বসা। উত্তেজিত ভঙ্গিতে বারবার ঘুরে ফিরে বাবাকে দেখছেন আর ফোনে কারও সঙ্গে হসপিটালের ভর্তি করানোর বিষয়টি আলোচনা করছে। যথারীতি রাত ৩ঃ২১ মিনিটে পৌছায় ব্রাক্ষণবাড়িয়ার ডক্টরদের রেফারেন্স করা ঢাকা হসপিটালের মধ্যে শফিকুল ইসলামকে নিয়ে। সেখানে পূবে থেকেই উপস্থিত ছিল মায়ার বড় বোনের স্বামী শাহিন আহামেদ এবং তাঁর ছোট ভাই শুভ আহামেদ। যথারীতি শফিকুল ইসলামকে কেবিনে শিফট করতেই নার্সরা এগিয়ে আসে সেদিকে এবং ইমারজেন্সি ওয়েতে ডাক্তারও ডাকা হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যে কক্ষে ডাক্তার প্রবেশ করতেই দেখলো ছোটখাটো ভিড় জমানো রোগীর চারপাশে। তবে সবাই সামনের দিকে ফিরানো। তাই ডক্টর অন্তত গম্ভীরতার সহিত দরজার সামনে থেকে সবার উদ্দেশ্য সর্তকতা অবলম্বন করে বলে…

—“রোগীর চারাপাশে এতো ভিড় কেন করছেন আপনারা? প্লিজ আপনার সবাই বাহিরে যান রোগীকে স্পেইস দিন।

কথা গুলো বলতে বলতেই থামে আয়ন। উপস্থিত মায়া সহ পরিবারের সবাই ঘুরে তাকায় আয়নের দিকে। সবাই চমকে উঠে আয়নকে ডক্টরের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। পরক্ষণেই আরিফের মনে পড়লো আয়ন একজন বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট। হার্টের ডক্টর। ফিহা অসংখ্য বার বলেছিল তাকে। ভাগ্যক্রমে আবারও খান বাড়ির দুয়ারেই আসতে হলো তাদের। আয়ন আজ প্রায় দুমাস পর মুখোমুখি হলো মায়া। তাও তার সপরিবারের। স্তব্ধ নিবাক আয়ন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেই উত্তেজিত মায়া দৌড়ে আসে আয়নের সামনে। পুরাতন কথা ভুলে গিয়ে শুধু মাথায় থাকলো আয়ন ভাইয়া একজন ভালো ডক্টর মানুষ। সে মানুষদের প্রাণ বাঁচায়। মায়া অসংখ্য বার শুনেছে দেখেছে আয়নকে মানুষের প্রাণ বাচাতে। তাহলে আজ আয়নই পারবে তার বাবাকে সুস্থ করতে। সেতো মানুষ বাঁচায় তাহলে? ভয়ার্ত মায়া কান্নায় টইটম্বুর হয়ে অস্থির ভঙ্গিতে আয়নের একটা হাত বিশ্বাস্তের সহিত চেপে ধরে নিজের ছোট দু’হাতে মুঠোয়। কান্না জড়িত গলায় তৎক্ষণাৎ আওড়ায়…

—” ভাইয়া! আব্বু! আব্বু! আব্বুকে বাঁচান প্লিজ। আব্বু হার্ট অ্যাটাক করেছে। আপনি আব্বুকে বাচিয়ে তুলুন না প্লিজ। আমার আব্বু অসুস্থ। প্লিজ ভাইয়া দেখুন কি হয়েছে আব্বুর।
অশান্ত মনে শান্ত চোখে আয়ন মায়াকে এক পলক দেখে নিল। আজ প্রায় দুমাস পর মায়ার সঙ্গে তার দেখে। খান বাড়িতে যাওয়া হয় না আয়নের। কারও সাথে যোগাযোগও করা হয় না। তবে হঠাৎ করে যে এইভাবে মায়ার সাথে আবারও দেখা হয়ে যাবে কখনো ভাবিনি আয়ন। গত দুমাস নিজেকে অনেকটা গছিয়ে নিয়েছে মায়ার ভালোবাসার অনূভুতি থেকে। নিজেকে ব্যস্ত রেখেছে কাজের চাপে। শক্ত রাখতে চেয়েছে ভিতর থেকে। কিন্তু আজ হঠাৎ করে মায়াকে চোখের সামনে বিধস্ত অবস্থায় দেখে যেন আবারও বেহায়য়া বুকটা জ্বালাতন করছে প্রচন্ড ভাবে। আয়নের বেহায়া চোখে দুটো চাইলো মায়াকে গভীর ভাবে পযবেক্ষণ করার। কিন্তু সর্তক মস্তিষ্ক টনক নড়লো। বাঁধা দিল অন্যের বউকে দেখার থেকে। ঘোর প্রতিবাদ করে জানালো’ অসাধারণ এই মেয়েটি তোর না। সে তোকে ভালোবাসে না। অন্য কাউকে ভালোবাসে আয়ন। এই মেয়ে দিকে ভুলেও তাকাবি না। আয়ন যেন শুনলো তার মস্তিষ্কের কথা গুলো। মায়াকে গভীর চোখ দেখলো না। বরং দৃষ্টি সরিয়ে সামনের তাকালো। চেহারায় ফুটালো প্রফেশনাল গম্ভীর ভাব। গম্ভীর কণ্ঠে বললো…
—” দেখছি আমি। সবাইকে নিয়ে তুমি বাহিরে যাও।

আয়নের কথা রাখলো মায়া। আয়নকে সুযোগ দিয়ে চলে গেলো বাহিরে। মায়া যেতেই গোপনে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আয়ন। এগিয়ে যায় শফিকুল ইসলাম দিকে। চোখে ইশারায় সবাইকে বের হয়ে যেতে বলতেই একে একে সবাই চলে যায় কেবিনের বাহিরে। আয়ন পুনরায় দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে স্বস্তির মনোভাবে নিয়ে শফিকুল ইসলামের হাত চেপে ধরে নার্ভস চেক করতেই বেখেয়ালি চোখ যায় সামনে। শফিকুল ইসলামের বামহাত চেপে ধরে তাতে মাথা ঠেকিয়ে পাশে বসে থাকা জুঁইয়ের উপর। মেয়েটি থেকে থেকে ফুপিয়ে কেঁদে উঠার কারণ হাল্কা শরীর নড়ছে জুঁইয়ের। আয়ন প্রথমে জুইকে চিনতে না পেরে কপাল কুঁচকে বিরক্তি সহিত গম্ভীর মুখে বলে…
—” এক্সকিউজ মি! মিস! আপনি বাহিরে যান। পেশেন্টের পাশে কান্না কথা নিষেধ। আপ…

আয়ন কথা গুলো বলতে বলতে থামলো। ততক্ষণে জুঁই মাথা তুলে তাকায় আয়নের দিকে। অনেকটা সময় নিয়ে কান্নায় অসম্ভব লাল হয়ে আছে জুঁইয়ের ফর্সা নাক মুখ। অগোছালো ভাবে মুখের চারপাশে চুলের গোছা বের হয়ে আছড়ে পড়ে আছে জুঁইয়ের মুখে। অসম্ভব মায়াবী দেখালো জুইয়ের কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটা। তবে চমকে উঠে দুজনই স্থির দৃষ্টিপাত করলো একে অপরের দিকে কয়েক সেকেন্ড। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে হঠাৎ দেখায় অপদস্তক হলো দুজনই। তবে সেটা জুইয়ের চেহারায় প্রকাশ পেলেও আয়নের চেহারায় ছিল প্রফেশনাল গম্ভীরতার ভাব। কোনো কিছু বুঝার উপায় নেই আয়নের বাহিক্য গম্ভীর চেহারা দেখে। তবে আয়ন বুঝলো জুইয়ের থমথমে দৃষ্টিটা। জুইয়ের দৃষ্টি থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় নিজের কাছে মনোযোগী হলো আয়ন। শফিকুল ইসলাম নার্ভস চেক করতে করতে অপর হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আয়ন প্রফেশনাল গম্ভীর কন্ঠে জুইকে উদ্দেশ্য করে বললো…
—” বাহিরে যান আপনি। পেশেন্ট কাছে ভিড় জমানো যাবে না। নিষেধ।

আয়নের কথায় বিনা বাক বয়ে উঠে দাঁড়ালো জুঁই। বাবার অসুস্থতার শোকাহত জুঁই তখনো আয়নকে নিয়ে বিশেষ একটা ভাবতে বসেনি। তবে আয়নকে খেয়াল করেছে। জুঁই চলে যেতে যেতে পুনরায় ঘুরে তাকায় শফিকুল ইসলামের দিকে। বাবাকে একটা পলক দেখে নিয়ে চোখ আওড়ায় গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আয়নের দিকে। কয়েক সেকেন্ডর ব্যবধানে কেবিন ছেড়ে বাহিরেও চলে যায় জুই। আয়ন ইমারজেন্সি অয়েতে শফিকুল ইসলামের সকল টেস্ট পরীক্ষা নিরীক্ষা করায় এবং সকল রিপোর্ট কালেক্ট করে পাঠানো হয় আয়নের কেবিনে। আয়ন মনোযোগ সহকারে রিপোর্ট গুলো চেক করেই ডাকলো আরিফকে। আরিফ আয়নের কেবিনের সামনে হাজির হতেই পরপর আসে আরও দু’জন পুরুষ। শাহিন ও শুভ। আয়নের অনুমতি স্বরুপ তিনজনেই কেবিনে ঢুকে বসে চেয়ার টেনে। আয়ন অপরিচিত দু’জন পুরুষকে এক পলক দেখে নিয়ে চোখ ঘুরিয়ে তাকায় আরিফের দিকে। অন্তত গম্ভীর মুখে রিপোর্টের কাগজ গুলো আরিফের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে প্রফেশনাল গম্ভীর মুখে বলে উঠলো…
—” পেশেন্টের হার্ট ৭৫% ব্লক হয়ে আছে। যার ফলে পেশেন্ট মেজর হার্ট অ্যাটাক করেছে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, টেনশনে, বা মানসিক চাপে এমনটা হয়ে থাকে। পেশেন্টের ৭৫% হার্ট ব্লক তারমানে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন। হয়তো পেশেন্ট কোনো কিছু নিয়ে তীব্র টেনশনে করেন ক্রমাগত। আপনার কি পেশেন্টের এই বিষয়টি নিয়ে পূবে থেকে অবগত ছিলা না মিস্টার আরিফ?

আয়নের পরপর কথায় বুক কেঁপে উঠে আরিফের। বাবার দুশ্চিন্তা কারণটা অজানা নয় তার। মায়াকে আর তাকে নিয়েই মূল চিন্তার কারণ শফিকুল ইসলামের। মায়াকে জড়িয়ে সম্পর্কটা ভালো যাচ্ছে না বাবা-ছেলের মধ্যে। আরিফ ঠিকঠাক কথা বলে না শফিকুল ইসলামের সাথে, মায়াকে কেন খান বাড়িতে পাঠালো এই বিষয়টি নিয়ে। কিন্তু তার বাবা যে এতটা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়বে সেটা ভাবেনি আরিফ। নিজের বাবাকে মৃত্যু সঙ্গে লড়াই করতে দেখে কষ্টে দলা পাকিয়ে আসছে কান্না গুলো গলায়। কিন্তু তারপরও দারুণ শক্ত থাকলো উপর দিয়ে আরিফ। স্থির বসে রইলো। কঠিনতা বজায় রাখলো মুখশ্রীতে। শক্ত গলায় আয়নের প্রশ্নের উত্তর করে গম্ভীর মুখে বললো…
—” অবগত ছিলাম। তবে এতটা দৃঢ় ভাবে নয় ডক্টর। বিষয়টি এতটা গম্ভীর হবে ধারণা ছিল না আমাদের। তবে কিছু পারিবারিক সমস্যায় দীর্ঘ দিন ধরে ডিপ্রেশন ভুগছিলেন তিনি। আমাদের মতামতের অমিল থেকে বিষয়টি আমি গভীর ভাবে লক্ষ করতে পারিনি এতদিন। কিন্তু আপাতত সবকিছুর ঊর্ধ্বে নিজের বাবাকে সেইফ রাখতে চাই। আপনি চিকিৎসা শুরু করুন ডক্টর। যেকোনো কিছু মূল্যে হলেও বাবাকে হেফাজত করতে চাই।

আরিফের কথার যথার্থ অর্থ বুঝলো আয়ন। প্রফেশনাল গম্ভীর কণ্ঠে পুনরায় বললো…
—” আপাতত আমরা পেশেন্টকে অবজারভেশনে রেখেছি। আমাদের বাকি ডক্টরা মিলে প্রস্তুতি নিচ্ছে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পেশেন্টের হার্টের অপারেশন করা হবে। আশা করছি ঠিক হয়ে যাবেন বাকিটা আল্লাহ ইচ্ছা। তবে আপনাদের পেশেন্ট বিষয়ে বেশ সর্তকা অবলম্বন করতে হবে। আমি আপনাদেকে সতর্কতার সকল বিষয় গুলো পড়ে বুঝিয়ে বলবো। আপাতত আপনার হসপিটালের সকল ফর্মালিটি ফিলাআপ করে আসুন। পেশেন্টকে ওটিতে নিতে হবে।

আরিফ আয়নকে সম্মতি জানিয়ে উঠতে উঠতেই শাহিন দ্রুততার সঙ্গে নিজের ভাই শুভকে বলে’ জুঁইদের পাশে থাকতে তাঁরা হসপিটালের সকল ফর্মালিটি পূরণ করছে আসছে একটু পর। কথা গুলো বলতে বলতেই তিনজনেই দ্রুত পদে আয়নের কেবিন হতে বের হয়ে যায়। কিন্তু পিছনে থেকে আয়ন কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থাকে শুভ নামক ছেলেটির দিকে। আপাতত বুঝতে পারছে না অপরিচিত ছেলে দু’টোর সাথে মায়ার পরিবারের সম্পর্কটা কি?
~~

ভোর ৫ঃ২৩ মিনিট। উজ্জ্বলময় সকাল চারপাশে । কালো রাতের আধার কাটিয়ে সকালের মিষ্টি সাদা আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে ততক্ষণে। কিন্তু আপাতত মায়ার পরিবারের সেদিকে কারও কোনো খেয়াল নেই। বিষন্নতা ঘিরা একেক জন্য ওটির সামনে বসে আছে চিন্তিত ভঙ্গিতে। রেহেনা বেগমের মুখ চেপে নিঃশব্দে কাঁদছে। উনার কোলের উপর মায়া মাথা রেখে ফ্লোরে বিধস্ত অবস্থায় চুপচাপ বসা। কান্না থেমে গেছে কিন্তু থেকে থেকে ফুপিয়ে উঠছে। আর তার ঠিক দুই চেয়ার পরই জুঁই নিজের দু’হাতে মাথা চেপে ধরে নিচের দিকে ঝুঁকে বসে আছে রানের উপর কুইন ঠেকিয়ে। দৃষ্টি স্থির সাদা ফ্লোরে উপর। তার পাশাপাশি চেয়ারটায় শুভ বসে আছে জুঁইয়ের জন্য কফি হাতে নিয়ে। দৃষ্টি বারবার ঘুরেফিরা করছে জুইয়ের উপরই। শাহিন ফোন কানে নিয়ে একপাশ চলে গেছে নিজের কান্নারত স্ত্রীকে বারবার সান্ত্বনা দিচ্ছেন আর শফিকুল ইসলামের অবস্থা বর্ণনা করছে রয়েসয়ে। আরিফ ওটির সামনে দাঁড়ানো স্থির অবস্থায়। শফিকুল ইসলামের অপারেশন চলছে ঘন্টা দেড়েক হতে চললো। ভিতরের অবস্থাটা কারও জানা নেই। হসপিটালেরও ধীরে ধীরে শোরগোল বাড়ছে। সকাল হয়ে আসায় চারপাশে মানুষের ভিড়ও বাড়ছে হসপিটালের মধ্যে। গুমোট পরিবেশে হঠাৎ করেই ওটির দরজা খুলে বের হয় আয়ন। আয়নকে বের হতে দেখেই দ্রুত এগিয়ে আসে আরিফ ও শাহিন নিজের স্ত্রীর কল কেটে। অস্থির ভঙ্গিতে দুজনই শফিকুল ইসলামের অবস্থা জানতে চাইলো আয়নের কাছে। আয়ন হাতের সাদা গ্লাভস টেনে খুলতে খুলতে সূক্ষ্ম চোখে চারপাশের পরিবেশটা পযবেক্ষণ করলো একবার। মায়াকে রেহেনা বেগমের কোলে লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখে চোখ ঘুরালো জুঁইয়ের দিকে। তখনো জুঁইয়ের পাশে থাকা শুভকে চোখে ভিড়লো না আয়নের। আয়ন পুনরায় চোখ ঘুরিয়ে মায়ার দিকে তাকায়। জুঁই, মায়ার পড়নে একি রকম সুতির ড্রেস পরিহিত। পায়েও একি রকম দেখতে বাড়ির জুতা পড়া। হাতের চুড়ি থেকে পায়ের পায়েলসহ একি রকম, একি কালার, একি ডিজাইনের পড়া। চুল গুলোসহ একি রকম করে হাত খোঁপায় বাঁধা। দুজনকে দেখতেও একি রকম লাগছে। কতটা আদুরী হলে দুই কন্যাকে একি রকম সাজে সাজিয়ে রাখে তার পরিবার সেটা বেশ বুঝতে পারলো আয়ন। হয়তো মায়া আর খান বাড়ির সম্পর্ককে ঘিরেই শফিকুল ইসলামের হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক কারণ। আয়ন মায়ার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় জুঁইয়ের দিকে তাকায়। কোনো এক মনস্তাত্ত্বিক কারণে জুঁইয়ের সাথে প্রথম থেকেই সম্পর্কটা ভালো নয় তাঁর। ভালো করে লক্ষ বা কথা হয়নি জুইয়ের সাথে আয়নের। অথচ এই মেয়েটি আয়নের অনাকাঙ্ক্ষিত বউ। আয়নের ভাবনার মাঝেই ততক্ষণে আয়নের দৃষ্টিতে পড়লো জুঁইয়ের পাশে বসা শুভকে কফি হাতে। আয়নের হালকা কপাল কুঁচকে আসে বিষয়টি লক্ষ করে। তবে সে সেদিকে মনোযোগী হলো না তাৎক্ষণিক নিজের দৃষ্টি সরিয়ে আরিফের দিকে স্থির করে, মুখে মাক্স টেনে খুলতে খুলতে জানায়” অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে। পেশেন্টকে কিছুক্ষণের মধ্যে কেবিন দেওয়া হবে। আয়ন কথা গুলো বলতে বলতেই একবার চোখে বুলিয়ে দেখে নিল ঝুঁকে থাকা জুঁইকে। তবে জুইয়ের পাশে শুভের বসে থাকা বিষয়টি বুঝলো না আপাতত আয়ন। জুই একটাবারের জন্যও মাথা তুলে আয়নকে দেখলো না পযন্ত। শক্ত কঠিন ভাবে মাথা ঝুঁকে বসে রইলো সেইভাবেই। আয়ন নিজের বাক্য শেষ করে পা বাড়ায় নিজের কেবিন দিকে। যেতে যেতে আবারও কোনো এক মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে আয়ন চোখে আওড়িয়ে জুইকে দেখে নিল এক পলক।

~~
সকাল নয়টা। শফিকুল ইসলামকে কেবিনে শিফট করা হয়েছে ঘন্টা চারেক হবে।। ততক্ষণে হাজির হয়ে গেছে খান বাড়ির সদস্যরাও। সবাই নয় মাত্র চারজন। হেনা খান, আরাফ খান, মালা, ও আসিফ। বাকিরা কেউ আসেনি। আসবেও বা কিভাবে? আয়নের পরিবার সেদিনের ঘটনার পর থেকে খান বাড়ির কারও সাথে যোগাযোগ রাখে না এক প্রকার রাগ করেই। মেহেরবান স্পষ্ট ভাষায় মা-বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে স্বামী সন্তান নিয়ে বেড়িয়ে গিয়েছিল সেদিনই। আজ অবধি যোগাযোগ করেনি মা-বাবার সাথে তিনি। এমনকি ফিহাকেও খান বাড়িতে আসতে দেয়না মেহেরবান। আর হেনা খানের বড় মেয়ে শাহেবা। তিনি স্বামী সন্তানদের নিয়ে লন্ডনে আছে বর্তমানে। রিদ বাংলাদেশে আছে তবে আপাতত মায়ার থেকে দূরে থাকছে। শফিকুল ইসলামের অবস্থার কথা সকালে আসিফ হতে জানতে পারলো হেনা খান ও আরাফ খান। আয়নের সাথে যেহেতু হেনা খানের যোগাযোগ নেই তাই আয়ন মায়ার বাবার হার্ট অ্যাটাকে বিষয়টি তাদেকে জানায়নি। আসিফ কেমন কেমন করে যেন জানলো মায়ার বাবার অসুস্থতার কথাটি। আর বিষয়টি জানতে পেরেই সে আরাফ খানকে জানায়। এবং সবাইকে নিয়ে ছুটে আসে হসপিটালের শফিকুল ইসলামকে দেখতে। আর এই হসপিটালের আসার পরপরই আবারও জানতে পারলো মায়ার বাবার অপারেশন আয়নই করেছে। আয়ন বর্তমানে হসপিটালের নেই। শফিকুল ইসলাম অপারেশন করেই সে চলে গিয়েছিল নিজের ফ্ল্যাটে। আপাতত তার শ্ফিট শেষ। সেদিনের ঘটনার পর আয়ন নিজের ফ্ল্যাটে একা থাকে। চৌধুরী বাড়িতে যাওয়া হয়না তাঁর আর। বাবা-বোনের সাথে টুকটাক কথা হলেও মেহেরবানের সঙ্গে একদমই কথা হয়না আয়নের। এবং নিজেকে সকল প্রকার গুমোট অনূভুতি থেকে বাঁচানোর জন্য সেচ্ছায় কাজের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে আয়ন। চব্বিশ ঘণ্টা থেকে আয়ন দিন-রাত পনেরো ঘন্টায় হসপিটালের কাজে কাটায়। বাকি নয় ঘন্টা ঘুম আর খাওয়া দাওয়া ব্যয় করে।

মায়া হেনা খানের কোলো মাথা রেখে বসে আছে কেবিনের ভিতর ফ্লোরে। জুঁইও মায়ার মতো একি ভঙ্গিতে রেহেনা বেগমের কোলো মাথা রেখে বসা। শফিকুল ইসলামের জ্ঞান ফিরে ছিল মাঝে তবে অল্প কিছুক্ষণ মধ্যে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়ে কারণ উনাকে ডক্টরা ঘুমের কড়া ডোজ দিয়েছে তাই। এই মূহুর্তে তিনি ঘুমিয়ে আছে। মস্তিষ্ক ঠান্ডা রাখার জন্য ঘুমটা আপাতত জরুরি। উত্তেজিত পরিবেশটা এখন শীতল হয়ে আছে। কারও মধ্যে কোনো রুপ উত্তেজনা নেই তবে গুমোট হয়ে আছে সবাই। আরাফ খান টুকটাক কথা বলছে আরিফ ও শাহিনের সঙ্গে। ভদ্রতার সহিত আরিফও মাথা নাড়িয়ে সকল কথার উত্তর দিচ্ছে আর মাঝে মাঝে চোখে আওড়িয়ে সবাইকে পযবেক্ষণ করছে। হেনা খান বিরুতিহীন ভাবে মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আর টুকটাক কথা বলছে রেহেনা বেগমেকে স্বাভাবিক রাখছে। শীতল পরিবেশের মধ্যে হঠাৎ প্রবেশ করলো আসিফ। দুজন বডিগার্ড দিয়ে বেশ কিছু খাবার রাখলো কেবিনের একপাশে। আসিফ সরাসরি ঘুরে তাকালো মায়ার দিকে। মায়াকে হেনা খানের কোলে হেলিয়ে পড়তে দেখে খানিকটা কাচুমাচুম করলো আসিফ। চারপাশে সর্তকতার দৃষ্টি বুলালো। আপাতত কেউ তার দিকে তাকাচ্ছে না। আরাফ খান এক পলক দেখলেও সেও পুনরায় নিজের কথায় মনোযোগী হয়। আসিফ ইতস্ততা গলা ঝেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলো মায়ার। কিন্তু সফল না হলেও হাল ছাড়লো না আসিফ। অন্তত মিনমিন স্বরে মায়াকে ডেকে বলে উঠলো আসিফ…

—” ভাবি খাবার খেয়ে নিন।
আসিফের কথায় মূহুর্তে চোখ তুলে তাকায় মায়ার সেদিকে। মায়া আসিফকে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ব্যস্তার চোখ বুলিয়ে তাকায় চারপাশে রিদের খোঁজ করে। আজ বিগত মাস ধরে রিদকে একটু করে দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে মায়ার ছোট মন। ছটফট কাতর ভাব চোখে মুখে স্পষ্ট মায়ার। মায়া অস্থিতার চোখ চারপাশে বুলিয়ে রিদকে কোথাও দেখতে না পেয়ে যেন আহত হলো মায়ার কিশোরীর ছোট মনটি। আসিফ বাংলাদেশে আছে তারমানে নিশ্চয়ই তার মিস্টার ভিলেনও বাংলাদেশে আছে? তাহলে কেন একটাবার তার মিস্টার ভিলেন তাকে দেখার জন্য আসছে না হসপিটালের? মায়ার বাবা অসুস্থ সেটা জেনেও কেন দেখা করতে চাই না রিদ মায়ার সাথে? অভিমানী মায়া ঠোঁট উল্টায় কান্নায়। কান্না ভেজা কন্ঠে নাহুচ স্বরে বলে আসিফকে..
—” খাব না আমি।
—“প্লিজ ভাবি।
—” না!
.

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply