দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪২
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
৪২
—” মরার পাখ গজায়ছে তোর? দেখছিস না ওহ ভয় পাচ্ছে। দূরে যাহ…
রিদের ধাক্কা দুই কদম পিছিয়ে গেলো আয়ন। তবে শান্ত থাকলো না। রাগান্বিত ভঙ্গিতে রিদের দিকে তেড়ে আসতেই মায়া রিদকে ঝাপটে ধরা অবস্থায় রিদকে নিয়ে দু-কদম সরে গেলো। রিদ কিছু বলবে বা করবে তার আগেই দু-হাত মেলে দিয়ে রিদের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে মায়া আয়নের মুখামুখি। দুচোখ ভরতি আতঙ্কের জল। মায়ার ছোট দেহ আয়ন রিদের বুক বরাবর। তারপরও ছোট মায়ার রিদকে বাঁচার দারুণ ব্যাকুলতা ঘর ভরতি মানুষের সামনে। স্তব্ধতা ন্যায় এক একটি মানুষ পাথর মূতি হয়ে ঠায় জায়গায় দাঁড়িয়ে। চোখে মুখে বিষ্ফলা হতভম্ব ভাব। মায়া দৃষ্টিতে ভিড় করলো না কারও সেই চাহনি বা আয়নের হৃদয় ভাঙ্গনের বিষয়টি। যেটি ইফেক্ট করলো সেটি হলো রিদকে বাঁচাতে হবে আয়ন থেকে। তাই যতটা উত্তেজিত ভঙ্গিতে রিদকে ছেড়ে ঘুরে দাঁড়ালো ঠিক ততটাই কাতর গলায় অনুনয় করলো মায়া আয়নের কাছে রিদের জন্য। তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো…
—” ভাইয়া প্লিজ মারবেন না উনাকে। প্লিজ! উনি কি করেছে আপনার সাথে? আপনি কেন উনাকে মারতে নিচ্ছেন বারবার? উনি কি আপনার থেকে কিছু নিয়েছে? নিয়ে থাকলে আমি উনাকে বলে আপনার জিনিস, আপনাকে ফেরত দিয়ে দিব তারপরও আপনি উনাকে মারবেন না প্লিজ।
মায়া কথা শেষ হলো না। তার আগেই প্রচন্ড তিক্ততার গলা ঝড়লো রিদ মায়ার পিছন থেকে। মায়া পিঠ রিদের পেটে সাথে মিশে থাকা অবস্থায় রিদ তিক্ত মেজাজ বললো…
—“দিব না আমি আমার জিনিস ওকে।
রিদের কথায় মায়া ভয়ার্ত দৃষ্টি বিলাই আয়নের শক্ত থাকা মুখে দিকে। কান্না ভেজা গলায় মায়া রিদকে উপেক্ষা করে আয়নের দিকে তাকিয়ে পুনরায় আগের ন্যায় বলে…
—” উনার কথা বিশ্বাস করবেন না ভাইয়া। আমি বলছি তো উনার থেকে আপনাকে আপনার জিনিস ফিরত নিয়ে…
মায়ার কথা শেষ করার আগেই রিদ প্রচন্ড বিরক্তি মায়ার বাহু টেনে নিজের দিকে ঘুরাতে ঘুরাতে বললো…
—” পাকামো করবা না একদম। বলছি না, দিব না আমি আমার জিনিস কাউকে।
রিদ কথা গুলো বলতে বলতেই থেমে যায় মায়ার নাকের দিকে তাকিয়ে। নাকফুলের ফুটো বেয়ে রক্ত ঠোঁট অবধি লাল হয়ে আছে। উত্তেজনায় মায়া এতক্ষণ যাবত রিদের শার্টের মধ্যে নিজের নাক ঘষা-মাঝা করায়, অসাবধানতার কারণের রিদের শার্টের বোতামে মায়ার নাকফুল ভেজে রক্ত গড়িয়ে পড়লো নাক বেয়ে ঠোঁট পযন্ত। রিদের শার্টের বুকের অংশেও মায়ার রক্তের দাগ লাগানো। রিদ কপাল কুঁচকে নিজের বুকের উপর রক্তের দাগটা দেখে নিয়ে চোখ তুলে তাকায় মায়ার নাকের দিকে। আঁজলে নিজের দু-হাতে ভাঁজে মায়া নরম তুলতুলে গাল দুটো আঁকড়ে ধরে রিদ মায়ার রক্তক্ত নাকটা উঁচিয়ে দেখতে দেখতে বললো…
—” বলছি নাকফুল পড়ার দরকার নাই। বালে একটা নাকফুলের জন্য একটা জায়গায় দুই দুইবার ব্যথা পাইছো। উফ! অসয্য! কান্না বন্ধ করো বিরক্ত লাগছে আমার। দেখি নাকটা! বেশি ব্যথা লাগছে আবার?
মায়া মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায়। যার অর্থ ‘না বেশি ব্যথা লাগছে না তার। তবে মায়া আড়চোখে একবার পরিবারের সবাইকে দেখে নিল ভয়ার্ত দৃষ্টিতে। সবাই তাদের দিকে তাকানোর হতবাক দৃষ্টিতে। নাকে ব্যথা মায়াকে এই মূহুর্তে কাবু করতে পারছে না। যতটা না মায়ার ছোট মনের ব্যথায় কবু হয়ে আছে রিদের জন্য। মায়ার বাকিয়ে যাওয়া ফেসটা রিদ পুনরায় নিজের সামনে সোজা করে ধরলো। অতি সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে মায়ার নাকের চারপাশটা টিস্যু ঘুরিয়ে মুছে দিল অলতো ফুঁ দিয়ে দিয়ে। উত্তেজিত পরিস্থিতিতে রিদের এমন খামখেয়ালি ভাবটা মেনে নিতে পারেনি আয়ন। হৃদয় ভাঙ্গুনের দহনে আগুন ধরাতে চাচ্ছে সবকিছুতে। বিধস্ত ধ্বংস পরিণত করতে চাচ্ছে সবকিছু। আয়ন রাগান্বিত ভঙ্গিতে দু’হাত শক্ত করে মুষ্টি বদ্ধ করতেই, যেন রিদ বুঝলো আয়নের ভিতরে জ্বলে উঠা দহনের আগুনটাকে। তাই মায়ার নাকের রক্তটা পরিষ্কার করে টিস্যু ফেরতে ফেরতে চোখ তুলে তাকায় আয়নের দিকে রিদ। অন্তত সূচালো ঠান্ডা গলায় হুমকি বার্তা স্বরুপ বললো…
—” আপাতত ঝামেলা চাচ্ছি না আমি আয়ন। তোর সব প্রশ্নের উত্তর দিব তবে এই মূহুর্তে চুপ থাকতে হবে তোকে। বউ আমার! তোকে ভয় পাচ্ছে ভিষণ। সেই সাথে নাকে আঘাত ও পেয়েছে। তাই মন-মেজাজ দু’টোই খারাপ হয়ে আছে আমার। এখন ঝামেলা করবি তো ঝামেলা বাড়বে। আগে আমার অবুঝ বউকে শান্ত করে নেয় তারপরও তোকেও শান্ত করবো। বউয়ের সামনে ঝামেলা চাচ্ছি না। আমার বউ ছোট মানুষ এসবে ভয় পাচ্ছে। দাদাভাই! তুমি আয়নকে আপাতত সামলাও। আমার মনে হয়না! ওর মাথায় আমার কোনো কথা ঢুকছে। যদি ওহ আমার বউয়ের সামনে সিনক্রিয়েট করে তাহলে আমি মনে হয়না শান্ত থাকতে পারব। তাই বলছি দাদাভাই টেল হিম! জাস্ট ওয়েট ফর আ দু’মিনিটস…
রিদ কথা গুলো বলতে বলতেই মনোযোগী হয় মায়াতে। আরাফ খান দ্রুততার ন্যায় আয়নকে আটকালো। আপাতত সবকিছুই সবার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। রিদের মায়াকে নিয়ে ছোট থেকে ছোট বিষয়ে যত্নশীল হওয়াটা। সাথে মায়ার রিদের প্রতি অস্বাভাবিক পাগলামো প্রকাশ করছে দু’জন একে অপরের প্রতি কতটা ডুবে আছে। যতটা হয়তো উপস্থিত কেউ কল্পনা করতে পারবে না। আরাফ খান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন সবার মতো করে। আপাতত তিনিও জানতে চাই রিদ এরপর কি বলে? তিনি পুনরায় পূর্ণ দৃষ্টি ফেলে রিদ মায়ার দিকে। তখন রিদ আদুরে হাতে মায়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, ‘জুইকে নিয়ে নিজের রুমে যেতে’ রিদের আদর্শে মায়া নড়েচড়ে আড়চোখে আয়নের রাগান্বিত ফেসটা দেখে নিয়ে নাহুচ করতে চাইলো রিদের সামনে। তার ধারণা সে চলে গেলে আবারও আয়ন তার মিস্টার ভিলেনকে মারতে চাইবে। তখন যদি মায়া বাঁচানোর জন্য না থাকে তাহলে ভিষণ কষ্ট পাবে তার মিস্টার ভিলেন। না সে কিছুতেই চাই না এমনটা হোক। আর না সে চাই তার মিস্টার ভিলেনকে কেউ আঘাত করুক। কিন্তু মায়া কিছুতেই পেরে উঠলো না রিদের ধমকের সাথে। চোখে মুখ অন্ধকার করে কাঁদতে কাঁদতে জুইকে নিয়ে চলে যায় নিজের রুমে। প্রচন্ড কান্নায় টইটম্বুর দুই বোন দরজার কুন্ডি লাগিয়ে কাঁদতে বসে।
মায়া যেতেই গা ঝেড়ে, গলায় টাই খুলে আসিফের হাতে দিল রিদ। শার্টের উপরে বোতাম দুটো পরপর খুলে উম্মুক্ত করলো নিজের গলদেশ। গুটানো হাতা দুটো আরও একটু টেনে গুটিয়ে নিতে নিতে বললো…
—” তো? শুরু কর তোর সব প্রশ্নের ভান্ডার।
রিদের খাপছাড়া আচরণের বহিঃপ্রকাশে আয়নের বিন্দু মাত্র হেলদোল হলো না। বরং সে জানতো রিদ এমন কিছুই বলবে তাকে। আয়ন আগের ন্যায় চোখ মুখ শক্ত করে বলে…
—” কেন করেছিলি এমনটা? গ্রামবাসি সবাই তোর লোক ছিল তাই না?
আয়নের প্রশ্নে দায়সারা ভাব উত্তর দিল রিদ..
—” অবিয়েসলি! তোর কি মনে হয় বতমান যুগে এসেও সেই আগেকার মতো ব্লক মাইন্ড আছে নাকি কারও। যে ছেলে-মেয়েকে দেখলেই ধরে বেঁধে বিয়ে দিবে? উহুম! এমনটা নেই। যুগ বদলায়ছে। সে সাথে মানুষের মাইন্ডও। নিজের খেয়ে পড়ে, কেউ নিজের পকেটের টাকা খরচ করে এখন মানুষজন অন্যকে ধরে বেঁধে বিয়ে দেয় না। বরং ছেলে-মেয়ে দেখলে ধরে বেঁধে ফাঁদে ফেলে টাকা উসুল করতে চাই। এখন তোর সাদাসিধা মাইন্ডে আমার ক্রিমিনাল কেসটা ধরতে পারলো তার জন্যও আমি অবশ্য খানিকটা অবাক হয়েছিলাম। তোকে আমি বোকা ভাবি কখনো। কিন্তু তুই বোকার মতোই কাজ করে ফেললি। যাই হোক মুল কথায় আসি। সেদিন রাতে তোর সামনে উপস্থিত থাকা প্রতিটা সদস্য, ছোট থেকে বড়, বাচ্চা-কাচ্চা, যোয়ান-বৃদ্ধ, মহিলা প্রতিটা মানুষ ছিল আমার লোক। পুরো এলাবাসিকে ঘোষ দেওয়া হয়েছিল বিশাল। হসপিটাল, রাস্তা, বিদ্যালয় এসব বানানোর চুক্তি করা হয়েছিল তাদের সাথে আমার লোকের। যেটা পেয়েও গেছে ইতিমধ্যে। তোর সকল তথ্য আগের থেকেই দেওয়া ছিল তাদের হাতে। তোর যাতে সন্দেহ না হয় সেই জন্য আমার বউয়ের নাম তোকে শুনানোর হয়েছিল প্রকাশে কবুল বলার সময়। তবে ঠিক তার সাথে সাথে নিস্বরে গ্রামের দু’জন স্বাক্ষীকে রেখে জুইয়ের নামটা শুনানো হয়েছিল তাদের। তুই অন্যমনস্ক থাকায় হয়তো লক্ষ করিস নি। এবার কাবিননামায় তোর সাইনটা নেওয়া হয় যাতে জুইয়ের নামটা তোর চোখে না পড়ে। দ্বিতীয়ত্ব তোকে বিয়ের আগ পযন্ত আটকে রাখার কারণ হলো যাতে তুই বুঝতে না পারিস আসলে তোর বিয়েটা কার সাথে হচ্ছে। কারণ ভিতরে আমার বউয়ের কাছে গেলে, কথা বলে বুঝে যেতি আসলে তোকে জুইয়ের সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য গ্রামবাসি ফাঁদ পেতেছে। তাই কৌশলে সবটা আগেই করে নেওয়া হয়েছিল। তৃতীয় তোর চোখে এটা কেন পড়লো না যে, জুই কেন সেদিন আঘাত পেল? আমার বউ কেন পেল না? ভালো করে লক্ষ করলে দেখতে পারতি সেদিন ছেলে গুলো জুইকে টানছি আমার বউকে না। উল্টো আমার বউ তার বোনকে বাচানোর জন্য জুইয়ের হাত ধরে টানাটানি করছিল।
রিদের কথা শেষ হবার আগেই পুনরায় রিদের শার্টের কর্লার চেপে ধরলো আয়ন। রাগে আয়নের নিজের হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছে। তাই রিদের কথায় গুলো সহজে মেনে নিতে পারছে না। পারার কথাও না। রিদের দেওয়া আঘাতটাও বড়। ছলনাটাও বড় ছিল আয়নের জন্য। যাহ আয়ন নিতে পারছে না। রাগান্বিত আয়ন রিদের শার্টের কর্লার চেপে দক্ষ হাতে আঘাত করতে নিবে তার আগেই আরাফ খান ও নাহিদ চৌধুরী আয়নের বাহু টেনে ঝাপটে ধরে ছাড়ানো চেষ্টা করলো পরপর। উত্তেজিত পরিস্থিতিতে হেনা খান, মেহেরবানও পিছিয়ে নেই। আয়নকে থামানোর চেষ্টা করছে। একটা সময় সবার তুমুল চিৎকার চেচামেচি শব্দে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে রমনা-রমনির উত্তেজনাময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সারিবদ্ধ ভাবে বাড়ির সকল কাজের লোক দাঁড়ানো কিচেন রুমে সামনে জড়সড় হয়ে কম্পিত ভঙ্গিতে। রিদের শান্ত ভঙ্গিতে যেন অশান্ত ন্যায় বিরক্ত হলো এবার। আয়নের বারবার শার্টের কর্লার চেপে ধরাটা মোটেও পছন্দ হচ্ছে না তার। আয়ন পরিবারের একজন বলে এতক্ষণ যাবত শান্ত মস্তিষ্কের হ্যান্ডের করতে চাইছিল বিষয়টি। কিন্তু আয়নের বারবার শার্টের কর্লার চেপে ধরাটা যেন রিদ অশান্ত, বিরক্তিতে পরিণত হচ্ছে। প্রচন্ড বিরক্তিতে অতিষ্ঠ রিদ এবারও শক্ত হাতে টেনে আয়নের হাত থেকে নিজের শার্টের কর্লার ছাড়িয়ে, আয়নের বুক বরাবর একহাতে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয় রিদ। কুঁচকানো শার্টের কর্লার টেনে সোজা করতে করতে বিরক্তি সহিত রিদ আয়নকে বলে উঠে….
—” বারবার ঘেঁষাঘেঁষি করে গায়ের উপর উঠছিস কেন তুই? দূরে থেকে কথা বলতে পারিস না? কবে থেকে মেয়েলি স্বভাব পালতে শুরু করেছিস তুই। ছেলে হয়ে ঘেঁষাঘেঁষি? ছেহ!
রিদের পরপর খাপছাড়া কথায় আয়ন নিজের লাল লাল হিংস্রত্ব চোখে রিদের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠে…
—” তুই আমার ধৈর্যের পরিক্ষা নিচ্ছস রিদ। আমার মন, আমার মাইন্ড, আমার ভালোবাসা নিয়ে তুই সর্বোচ্চ ভাবে ক্রিমিনাল মাইন্ডে খেলেছিস? তোর কি মনে হয় আমি চুপ থাকব? আমার জীবন নিয়ে খেলতে দিব তোকে আমি? এতো সহজ সবকিছু?
রিদ চোখ মুখে বিরক্তিতে কুঁচকে অতিষ্ঠ গলায় বললো আয়নকে…
—“তুই কি পাগল? মাথায় সমস্যা আছে তোর? আমার বিয়ে করা বউকে তোর কাছে কোন দুঃখের বিয়ে দিব আমি। যেখানে আমি শারিরীক, মানসিক, আর্থিক সকল দিক থেকে ফিট এন্ড ফাইন। লুক আয়ন! আমার কথা শেষ হয় নাই। প্রথমত্ব আমাদের বিয়েটা সেদিন বাতিল হয়নি। কিছু কারণ বশত বউয়ের সাথে রাগ করে বিয়ে বাতিলের কাগজপত্র পাঠিয়ে ছিলাম। দাদাভাই সাইন করিয়ে কোটে জমা করলেও আমি পড়ে লোক দিয়ে উঠিয়ে নেয়। দ্বিতীয়ত্ব বিয়েটা আমার ধর্মী মোতাবেক হয়েছিল ছোট বেলায়। সেখানে কোনো রুপ বিয়ের রেজিষ্ট্রি পেপার হয়নি। তাই আমি কাগজ সূত্রে বা অন্য কোনো সূত্রে তালাক দিচ্ছি এই কথাটি উল্লেখ্য করেনি বিয়ে বাতিলের সময় । কাগজে শুধু লেখা ছিল যে আইনগত ভাবে আমি আমার বাল্য বিয়েটাকে ক্যান্সেল করছি ব্যস। এই তার কাগজ পত্র চেক করে দেখ।
রিদ কথা বলতে বলতে আয়নের দিকে কিছু কাগজ এগিয়ে দেয়। কাঁপা কাঁপা হাতে আয়ন কাগজ গুলোতে চোখে বুলাই। মূহুর্তে বুক কেঁপে উঠলো তার। রিদ যাহ বলছে সবটাই গুটি অক্ষরে কাগজের লেখা আছে। আয়নের সাথে সাথে উপস্থিত বাকিরাও একে একে রিদের দেওয়া কাগজ পত্রে চোখ বুলালো। রিদ সবাইকে উপেক্ষা করে পুনরায় আয়নের উদ্দেশ্য বললো…
—” লুক আয়ন! ধর্মের পার্ট কিন্তু আমি জানি কিছুটা। ধর্মীয় মোতাবেক তালাক কখনোই হয়নি আমাদের। মূলত আমিই দেয়নি। এখন আমি স্বামী হয়ে বউকে কিভাবে দ্বিতীয় বিয়ে দিব তুই আমারে বুঝা? ওয়েট! তোর জন্য আরও একটা সারপ্রাইজ আছে। নে! ধর! এই পেপার গুলোও চেক কর একটু। মনোযোগ সহকারে করবি কেমন? নে ধর।
রিদ আয়নের দিকে এবার আরও বেশ কিছু কাগজ পত্র এগিয়ে দিল। আয়ন সময় নিয়ে একটা একটা করে চেক করতেই মাত্রাতিক চমকালো। উত্তেজিত ভঙ্গিতে একটা পর একটা পেপার উল্টিয়ে দেখতে দেখতে বললো…
—” মানে এসব কি রিদ?
আয়নের উত্তেজনায় রিদের কাছে দারুণ লাগলো। রিদ দু-পা হালকা ফাঁক করে স্টং হয়ে দাঁড়ালো আয়নের সামনে। পকেটে দুহাত গজাতে গজাতে বলতে শুরু করলো…
—” আমার দ্বিতীয় বিয়ের কাবিননামা ও কিছু শর্ত সাপেক্ষে নোটিশনামা। যেখানে গুটি হাতে স্বাক্ষর করেছে আমার আদর্শ বউ। কাবিননামায় দেনমোহর হিসেবে রয়েছে আমার সম্পত্তির ৩০% আমার বউয়ের নামে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে। আমি আমার বাপ-দাদার জম্ম সূত্রে যেসকল সম্পত্তির, প্রপার্টি, বিজনেস, ব্যাংক-ব্যালেন্স,পাবো সেই সবাটায়, আমি সেচ্ছায় আমার বউয়ের নামে টান্সফার করলাম। আমার হালাল সম্পত্তির বলতে আমার বাপ-দাদার থেকে পাওয়া জম্ম সূত্রে সম্পত্তিটায় ছিল। সেটা আমার হালাল বউয়ের জন্য হালাল দেনমোহর হিসাবে দিলাম। বাকি রইলো আমার ৭০% সম্পত্তির। সেটা হলো আমার নিজস্ব হারাম টাকার পাহাড়ে বানানো। কালো টাকা বুঝিস তো সেটাই। এবার আসি মূল শর্তে। এই যে বউকে ফ্রীতে এতো কিছু দিলাম। সেটা কিন্তু মোটেও এমনি এমনি দেয়নি আমি। তার পিছনেও বড়সড় শর্ত দেওয়া আছে। এবার তুই আমার শর্তনামা গুলোতে চোখ বুলা একটু। সেখানটায় লেখা আছে বেশ কিছু শর্ত। শর্ত সাপেক্ষ ওয়ান! প্রথমত্ব”! আমার বউ! উফরে রিক্তা ইসলাম মায়া সে সেচ্ছায়, সজ্ঞানে আমাকে তার স্বামী হিসাবে মেনে নিচ্ছে। এই প্রতিশ্রুতিতে যে, জীবনের কখনো কোনো পরিস্থিতি সে আমাকে তারপক্ষ থেকে ডিভোর্স দিতে পারব না। আর যদি কোনো কারণে তার মন বদল হয় আমাকে ডিভোর্স দিতে চাই। তাহলে সে আমাকে আমার ১০০% সম্পত্তির সমতুল্য ভাগ দিতে হবে বাধ্যতা মূলক। আর যদি দিতে না পারে তাহলে তারপক্ষ থেকে ডিভোর্স গ্রহণ যোগ্য হবে না আইনি ভাবে।
দ্বিতীয়ত্ব! যদি কোনো স্বদয়বান ব্যক্তি আমার বউয়ের হয়ে কথা বলে। এবং সাপোর্ট করে আমার থেকে তাকে আলাদা করার। বা ডিভোর্স দেওয়ার। তাহলে সেই উক্ত স্বদয়বান ব্যক্তি আমাকে আমার বউয়ের হয়ে ১০০% সম্পত্তির ভাগ পরিষদ করতে হবে। আর যদি না পারে তাহলে জরিমানা স্বরুপ তার সকল ব্যাংক-ব্যালেন্স, সম্পত্তির আমার নামে টান্সফার হবে প্লাস তার সপরিবারে সহ সে আইনি ব্যবস্হায় থাকবে চৌদ্দ বছর পযন্ত। এখন জেলখানায় চৌদ্দ বছর কিভাবে রাখতে হবে সেটা নিশ্চয়ই আমাকে কেউ শিখায় দিতে হবে না তাই না। তাদের জেলে রাখার দ্বায়িত্বটাও আমার নিজেরই হবে। এবার যদি তুই মনে করিস যে, আমার বউয়ের হয়ে আমার শর্ত পূরণ করবি। শর্ত মোতাবেক আমাকে ১০০% পাওনা পরিষদ করবি। তাহলে শুনে রাখ! আমার সম্পত্তির ৩০ ভাগ মানে হাজার হাজার কোটি টাকা হয়ে দাঁড়ায় খান বাড়ির সম্পত্তিতে। সেখানে আমার সম্পত্তির ১০০ ভাগ মানে কারও মাথায় হিসাবেই আঁটবে না কতটা কালো টাকার পাহাড় জমা আছে আমার নামে। গ্যাংস্টার মানুষ। দিনের আলোতে ক্ষমতা আসরে বসে সকলে সামনে দিয়েই ডাকাতি করারই আমার কাজ। তাই তোর আশাটাও গুডিবালি দে। যায় হোক এবার আসি
তৃতীয় শর্তে! আমি চাইলে ডিভোর্স দিতে পারবো আমার বউকে। তবে আমার ডিভোর্স দেওয়ার সাথে সাথে আমার সম্পত্তির ৩০% ভাগ একান্ত ভাবেই আমার বউয়ের নামের টান্সফার হয়ে যাবে নি-দাবি স্বরুপ। ব্যস এতটুকু পরের শর্ত গুলো তুই নিজ দ্বায়িত্বে পড়ে নিস। এবার আসি তোর কাছে। তুই কি করবি সেটা তোর একান্ত ব্যক্তিগত ইস্যু। তবে আমি আমার বউকে ছাড়ছি না ইহকালে আর না পরকালে। বউ থাকতে না চাইলে বাধ্য করবো। দরকার পড়লে দুটো পা কেটে সারাজীবনের জন্য রুমে বসিয়ে রাখবো তারপরও বউকে ছাড়ছি না। তাই বলছি আমার রাস্তায় আসবি না। আমি তোকে আজকে শান্ত স্বরুপ বুঝাচ্ছি কারণ আমি ঝামেলা চাচ্ছি না পরিবারের সাথে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো! তুই আমার বউকে দেখেছিস। আমার প্রতি তার অস্বাভাবিক পাগলামোটাও চোখে পড়ছে তোর। এখন নিশ্চিয় আমাকে ভেঙে বলতে হবে না তোকে যে বউয়ের কতটা অস্তিত্ব জোড়ে আমার বসবাস রয়েছে। বাকিটা তোর ইচ্ছা। এখন কাহিনি করতে চাইলে করতে পারিস। সফল হবি বলে মনে হয়না। তারপরও নিজের সান্ত্বনার জন্য ট্রাই করে দেখতে পারি। আই অলওয়েজ দেয়ার ফর ইউ।
দীর্ঘ ভাষণে থামলো রিদ। বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়লো। অনেকটা বছর পর পরিবারের সাথে এতো কথা বলতে হয়েছে তাঁকে। তাও ফালতু একটা বিষয় নিয়ে। রিদ দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে চোখ তুলে তাকায় আয়ন ও উপস্থিত সদস্যের দিকে প্রত্যেকেই বাকরুদ্ধ বিস্মিত অবস্থায় দাড়ানো হয়তো কারও ই রিদের কথা গুলো হজম হয়নি। রিদ তীক্ষ দৃষ্টিতে সবাইকে পযবেক্ষণ করতেই কানে আসলো কারও ডুকরে কেঁদে উঠার শব্দ। উপস্থিত সবাই চমকে উঠে পিছনে তাকাতেই চোখে পড়লো ফিহা ফ্লোরে বসে সোফায় মুখ গজিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠছে। উপস্থিত কেউ বুঝলো না ফিহার হঠাৎ কেঁদে উঠার কারণটা। ফিহা নিজের বুক ফাটা কষ্ট লুকাতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠে সবার সামনেই। এমনিতেই এলোমেলো সম্পর্কের জোড়ে সে দিশেহারা প্রায়। আরিফকে কিছুতেই মানাতে পারছে না নিজের জন্য। দীর্ঘ তিন বছরের সম্পর্কটা ইতি ঘটে যাচ্ছে দিন বা দিন। এমনিতেই আরিফ মায়াকে নিয়ে খান বাড়ির সাথে নারাজ। যার রেশ টেনে ফিহার সাথে সম্পর্ক নষ্টের কারণ। তারপরও ফিহা কোথাও একটা আশা রেখেছিল হয়তো মায়ার সাথে আয়নের বিয়েটা হলে নিশ্চয়ই তাকে আরিফ মেনে নিতে পারবে। কারণ মায়া তখন খান বাড়ির গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে এই ভেবে। কিন্তু এখন মায়ার সাথে সাথে জুইও অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে খান বাড়ির সম্পর্কের ভিড়ে আঁটকা পড়ে গেলো। এলোমেলো সম্পর্ক গুলো আরও এলোমেলো হয়ে গেলো। এবার আরিফকে মানাতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। বরং আরও রেগে যাবে নিজের দ্বিতীয় বোনকে খান বাড়ির সম্পর্কে আটকানোর জন্য। তার দোষের ফল স্বরুপ ফিহা সারাজীবনের জন্য আরিফকে হারাতে হবে। তাছাড়া নিজের বাপ-ভাইও আর মেনে নিবে না মায়ার পরিবারের কাউকে। কারণ আজকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফিহার পরিবারের সবার মন বিষিয়ে গেছে হয়তো মায়ার পরিবারের প্রতি। সেটা ঢের টের পেয়েছে ফিহা। এলোমেলো সম্পর্কের কথা চিন্তা করেই ফিহা বারবার ডুকরে কেঁদে উঠতে চাইছে।
আয়ন কাউকে কিছু বললো না। আর না ঘুরে দেখলো নিজের বোনের কান্নারত অবস্থাটা। অশান্ত মনে বেড়িয়ে পড়লো খান বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়ে। রিদের দেওয়া কোনো শর্তই আয়নকে আজ নাড়াতে পারেনি তবে রিদের বলা লাস্ট কথা গুলো আয়নের বুকে এপিঠ থেকে ওপিঠ তীর মেরেছে। তীব্র ভাবে আঘাত করেছে মায়ার চোখে রিদের জন্য ব্যাকুল ভালোবাসা দেখে। কারণ আয়ন সচক্ষে দেখেছে মায়ার ছটফট রিদের জন্য। দেখেছে মায়ার চোখে ব্যাকুলতা, ভালোবাসা রিদের জন্য। মায়ার সবকিছুতেই আজ জড়িয়ে ছিল রিদ আর রিদ। আয়ন নিজেকে মায়ার চোখে কোথাও দেখতে পায়নি। আর না দেখেছে মায়ার চোখে নিজের জন্য সম্মান না ভালোবাসা। পেয়েছে শুধু ভয় আর ভয়। আর এতেই আয়ন অশান্ত বড্ড যন্ত্রণাময় বুকের তীব্র ব্যথায় কাতর। তার আজ একা থাকা প্রয়োজন। মায়ার জন্য সে রিদের সাথে যুদ্ধ করতে রাজি। কিন্তু যুদ্ধটা করবে কার জন্য আয়ন। মায়া তো তার নয়। সেতো তাকে চাই না। রিদকে চাই।
আয়ন যেতেই রিদ গম্ভীর মুখে প্রস্হান করলো নিজের রুমের দিকে। আপাতত তার কাজ শেষ। বাকিটা সময়ে সময়ে দেখা যাবে।
-~~
এলোমেলো সম্পর্কে ভিড়ে পরদিন সকালে জুঁই এক প্রকার কান্নাকাটি করেই খান বাড়ির সম্পর্ক মারিয়ে ছুটে চলে যায় ব্রাক্ষণবাড়িতে। জুইয়ের পিছন পিছন মায়াও ছুটলো ব্রাক্ষনবাড়িয়ার উদ্দেশ্য নিজের পরিবারের। পরদিন সকালে মায়া সবকিছু বাদ দিয়ে জুইকে নিয়ে পড়ে রইলো। এতটাই খামখেয়ালি অন্যমনস্ক ছিল যে একবার রিদের সাথে দেখাটা অবধি করলো না। রিদকে না বলে গেল৷ মায়া রিদকে পিছনে ফেলে জুইয়ের সাথে পাড়ি জমালো ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে। আর এতেই যেন এলোমেলো সম্পর্কে ভিড়ে আরও একটি সম্পর্ক শেষ হলো। এলোমেলো সম্পর্কের আগুন বুঝি এবার রিদ-মায়ার সম্পর্কেও লাগলো। সবেমাত্র রিদ মায়ার নতুন গুছানো সুন্দর সম্পর্কটাতেও ফাটল সৃষ্টি হলো মায়ার অবুঝতার কারণে। অধৈর্যের ন্যায় মায়া জুইকে নিয়ে চলে গেলো নিজের পরিবারের আজ একমাস রিদকে না জানিয়ে। রিদও খবর নিল না। নেওয়ার চেষ্টাও করলো না। গোছানো সম্পর্কটা আবার অগোছালো হলো। মায়াও পড়ে রইলো নিজের পরিবারের নিজের বাবা-মার কাছে।
চলিত…..
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪১
-
দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২ গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৪
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৫