দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৭০
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
(কার্টেসী বা কপি করা নিষেধ। শেয়ারিং ছাড়া)
৭০
সকাল নয়টা নাগাদ রুম থেকে রেডি হয়ে বের হলো মায়া। জুইকে নিয়েও ইতিমধ্যে আয়ন পৌঁছে গেছে খান বাড়িতে। যেহেতু মায়ার বিয়ের শপিং রিদ আগে থেকেই করিয়ে রেখেছিল তাই পুনরায় আর কারও শপিং করতে যাওয়া হলো না। ফিহাও আসল না। আরিফ চেয়েছিল ফিহাকে নিয়ে ঢাকা আসতে কিন্তু ফিহা না করে দেয়। কারণ তাদের বিয়ে সময় করা শপিং প্রচুর শপিংয়ের ড্রেস এখনো অনেক বাকি আছে ফিহার কাছে। তাছাড়া বিয়ের সময় দুই বাড়ির থেকে পাওয়ার অসংখ্য ড্রেস এখনো পুরো কবার্ড ভরপুর। সেখান থেকেই যেটা ভালো লাগে পড়ে নিবে ফিহা। তারপরও পুনরায় আরিফের টাকা খরচ করতে চাইল না। আরিফ ফিহাকে নিয়ে ঢাকা যাওয়ার কথা ছিল শপিংয়ের জন্য। এবং আসার সময় মায়া আর জুঁইকে সাথে নিয়ে আসার কথা থাকলেও এখন যখন আরিফ যাচ্ছে না। তাই মায়াকে আর জুইকে যতদ্রুত সম্ভব আশুগঞ্জ ফিরতে আদেশ জারি করল শফিকুল ইসলাম ও রেহেনা বেগম। যেহেতু বিয়ে চার দিন পর থেকে শুরু হবে সেহেতু এখন মায়ার খান বাড়িতে থাকা কোনো মানেই হয়না। তাছাড়া বিয়ের নিয়ম বলতেও একটা কথা আছে। হেনা খান বুঝল সম্পূর্ণ বিষয়টি। বিয়ের আগের সত্যি স্বামীর বাড়িতে থাকা ভালো দেখায় না বিদায় তিনিও যতদ্রুত সম্ভব সকাল সকাল মায়াকে আশুগঞ্জ পাঠানো ব্যবস্হা করল। সেই সাথে মেহেরবানকেও ফোন করে জানায় জুইকে নিয়ে দ্রুত খান বাড়িতে আসতে। এজন্য মেহেরবানের কথা অনুযায়ী আয়ন জুইকে নিয়ে সকাল আটটার দিকে খান বাড়িতে হাজির হয়েছিল। সাথে করে বেশ কিছু শপিং ব্যাগও ছিল জুইয়ের জন্য। মূলত আয়ন এসব কিনেছিল কালই জুইয়ের জন্য। রিদ মায়ার জন্য দেশের বাহির থেকে অগ্রিম শপিং করে রেখেছিল বলে সেও জনতো জুইকে নিয়ে কেউ হয়তো আর শপিংয়ে যাবে না। তাই সে কাজের ব্যস্ততার ফাঁকেও শপিংয়ে কাজটা সেরে নিয়েছিল জুইয়ের জন্য। মায়া কালো বোরকায় পরিপাটি হয়ে বের হয়। রাতের কথা তার মনে নেই এমনটা না। মনে আছে তবে সকালে মায়া নিজের রুমে নিজেকে আবিষ্কার করেছিল বলে বুঝতে পারছে না আসলে মায়া কখন নিজের রুমে আসল। অনেক চেষ্টা করেও মায়া মনে করতে পারলো না রাতে কখন রিদের রুম থেকে নিজের রুমে ফিরেছিল সেটা। রাতে রিদের সাথে ঘুমিয়েছিল এতটা মনে আছে বাকিটা মনে নেই বলে মায়া খুব স্বাভাবিক ভাবেই রেডি হয়ে বের হয় রুম থেকে। হাতে পায়ে কালো মোজা উচু জুতার সাথে। মুখে কালো নেকাব বেঁধে রাখা। হেনা খান মায়াকে নাস্তা করিয়ে বাসার বাহিরে বের হন গাড়ির উদ্দেশ্য। আরাফ খান মায়াকে আর জুঁইকে আশুগঞ্জ নিয়ে যাবেন দায়িত্ব করে। তাদের সাথে এক গাড়ি বডিগার্ড দেওয়া হচ্ছে সেফটির জন্য। মায়া ঘর থেকে বের হয়ে বাগানের আশেপাশে তাকিয়ে রিদকে খুঁজল ডাগর ডাগর আঁখিদয় ঘুরিয়ে। প্রথমে খুঁজে না পেলও ঠিক তার পর মূহুর্তে পেয়ে যায়। উৎফুল্লর মায়া হেনা খান বলে এক দৌড় দিল রিদের উদ্দেশ্য। রিদ খোলা বাংলোতে বসে আছে অফিসিয়াল গ্যাটাপে বসা। গায়ের আকাশি রঙ্গা কোট-টা পাশে রাখা। বামহাতে কফির মগ চেপে ধরে ডানহাতে ল্যাপটপের কি-বোর্ড চালিয়ে মনোযোগ সহকারে কিছু দেখছে। রিদের মনোযোগ ভস্ম হয় মায়ার হঠাৎ আগমনে। রিদ মায়ার উপস্থিতি বুঝে যেন বুঝল না। চুপচাপ কাজ চালিয়ে গেল। এমন একটা ভান ধরল যেন রিদ সত্যি মায়ার উপস্থিতি বুঝতে পারছে না। মায়া হাঁপাতে হাঁপাতে সোজা হয়ে দাঁড়াল। রিদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে গলা কাশল। রিদ বুঝেও না বুঝার মতো করেই রইল। মায়া দুই কদম এগিয়ে এসে রিদের সামনে টি-টেবিলে পাশে দাঁড়াল। একহাতে মুখের নেকাব উঠিয়ে মাথার উপর রাখল। উঁকি ঝুঁকি মেরে রাতে কেটে যাওয়া রিদের বামহাতটা দেখতে চাইল। দেখল ও। সেখানটায় ঔষধ লাগানোই আছে। স্বস্তির মায়া চোখ আওড়িয়ে রিদের বুকে তাকাল। কিন্তু চোখে পড়ল না কিছুই। কারণ রিদ শার্টের সবগুলো বোতাম আটকিয়ে রেখে গলায় টাই বেঁধে রেখেছে। অপরাধী মায়া হাসফাস করল রিদের সাথে একটু করে কথা বলতে। কিন্তু রিদের কাছ থেকে সুযোগ না পেয়ে ঘুরঘুর করে রিদের এপাশ থেকে ওপাশ দাঁড়াচ্ছে বারবার। তারপরও রিদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে না পেরে একটু করে বলল…
—” দেখুন না! আমি চলে যাচ্ছি তো।
মায়া কথায় বিরুক্তির চোখ তুলে তাকায় রিদ। ধমক স্বরে বলল…
—” কি সমস্যা, কি চাই?
রিদের ধমকে হালকা কেঁপে উঠল মায়া। ভয়ে মিনমিন স্বরে বলল…
—” কিছু চাই না।
—” তো? গেট আউট ফ্রম হেয়ার।
মায়া গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল নড়লো না। রিদ বিরক্তি প্রকাশ করে পুনরায় ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকাল। মনোযোগ হওয়ার চেষ্টাও করলো। মায়া শুকনো ঢুক গিলে চোখ বুলিয়ে এদিক সেদিক দেখল। আশেপাশে তেমন কাউকে না দেখে ঝুকে টুপ করে রিদের গালে চুমু খেয়ে নিল। রিদ কেঁপে উঠে। কি-বোর্ডে চলিত থাকা হাতটা মূহুর্তেই থেমে যায়। তবে মায়ার দিকে চোখ তুলে তাকাল না। বরং কয়েক সেকেন্ড থেমে থেকে রিদ পুনরায় কাজে মনোযোগী হয়। মায়া রিদকে চুপ থাকতে দেখে সাহস পেল। এপাশ থেকে ঘুরে ওপাশে গিয়ে দাঁড়াল তাও রিদের সাথে চেপে চেপে। রিদকে শান্ত দেখে সাহসী মায়া এবারও টুপ করে রিদের অপর গালে শব্দ করে চুমু খেয়ে ভোঁ দৌড় লাগাল গাড়ির উদ্দেশ্য। রিদ কেঁপে উঠে খেই হারিয়ে অল্প কফি পরল ল্যাপটপের কি-বোর্ডে উপর। মায়া চলে গেল আর দাঁড়াল না। রিদ প্রেমময় মোহিত দৃষ্টি তুলে তাকাল মায়ার দৌড়ে চলে যাওয়ার দিকে। বেশ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল। যতক্ষন না মায়া গাড়িতে উঠে বসছে ততক্ষণ পর্যন্ত। মায়ার গাড়িটি ছেড়ে দিতেই রিদ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে ল্যাপটপের কি-বোর্ডের উপর পরা কফির পানিটুকু মুছল। ল্যাপটপের শাটার বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। আপাতত তার কাজ শেষ। বউয়ের জন্যই এতক্ষণ যাবত বাসায় বসে ছিল। নয়তো অনেক আগেই চলে যেত অফিসে। সোফার উপর থেকে কোট-টা নিয়ে গায়ে জড়াতে জড়াতে সামনে হাঁটল। বডিগার্ডসহ সবাই রিদের জন্য অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ। রিদ কাছে যেতেই গাড়ির দরজা খুলে দেয় একজন বডিগার্ড। রিদ গাড়িতে উঠে বসল। আসিফ বসল ডাইভারের সঙ্গে। ডাইবার গাড়ি স্টাট দিতেই রিদ গম্ভীর মুখে আসিফকে ডেকে বলল।
—” আসিফ! তোর কি মনে হয় বিয়েটা ঠিকঠাক হবে?
আসিফ চমকে তাকাল রিদের দিকে। বিয়েটা ঠিকঠাক ভাবে হবে মানে? বিষয়টি তখনো বুঝল না। প্রশ্ন সিক্ত গলায় বলল…
—” জ্বিই ভাই???
রিদ সরাসরি উত্তর করলো না আসিফের কথায়। নিজের মধ্যে সবকিছু চেপে রাখল। বরং আসিফকে যেটা বলল সেটা হলো…
—” সিকিউরিটি বাড়িয়ে দে তোর ভাবির।
রিদের মনোভাব বুঝে উঠতে পারল না আসিফ। শুধু মুখে এতটুকু বলল…
—” সিকিউরিটি দেওয়া আছে ভাই।
রিদ সিটে গা ছেড়ে দিতে দিতে বলল…
—” আরও বাড়িয়ে দে।
~~
মায়া আশুগঞ্জ এসেছে আর গোটা দুই-দিন পার হলো। এই দুই দিন বেশ ভালোই ব্যস্ততায় কেটেছে সবার। বিয়ে উপলক্ষে বেশ গমগম পরিবেশ মায়ার পরিবারের সবার মধ্যে। মায়ার নানা বাড়ি, চাচা বাড়ি, বোনের শশুর বাড়ির লোকজনও উপস্থিত হয়েছে আরও একদিন আগেই। সবই ঠিকঠাক চলছে। দুই বাড়িতে পুরো দমে বিয়ে ডেকোরেশনে কাজও চলছে তোড়জোড় করে। কাল থেকে বিয়ের সকল অনুষ্ঠান শুরু। কাল মায়ার হলুদ সন্ধ্যা অনুষ্ঠান। পরশুদিন বিয়ে। হৈ- হুল্লোড় উল্লাসের আমেজ পড়েছে মায়ার কাজিন ছেলে-মেয়েদের উপর। কে কি পড়বে? সেই নিয়ে ড্রেস কোড মিলাচ্ছে সবাই। তবে মায়াদের বাড়িতে আসা আত্মীয়দের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ গুরুজনরা বড়ই আহ্লাদে সুরে হাই হুতাশ করছে শফিকুল ইসলামের কাছে। থেকে থেকে তীব্র আতনার্দ করে বলছে ‘ হাই! হাই! শফিক তোর এতো সুন্দর মেয়েটারে শেষমেশ একটা গুন্ডা পোলার হাতে তুলে দিচ্ছিস। দেশে কি ভালো ছেলের অভাব পড়ছে। ঐ বড়লোক গুন্ডা পোলা তোর মেয়ের সাথে সংসার করবো না রে। দুইদিন যাইতে না যাইতে ঠিকই তোর মেয়েরে গলা ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিবো। এখন সময় আছে শফিক এই বিয়েটা বন্ধ করে দে। তোর মেয়ের জীবনটা বাঁচা।
এসব কথার বিপরীতে শফিকুল ইসলাম চুপ থাকেন। দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। তিনি নিজেও মায়াকে এমন গুন্ডা ছেলের কাছে বিয়ে দিতে চান না। কিন্তু উনার মেয়ের কাছে তার হাত-পা বাঁধা। মায়া ঐ বাড়ির ছেলের জন্য কান্নাকাটি করে। পাগলামি করে। তাই বাবা হিসাবে মেয়ের কথা রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন শুধু। বাকিটা মেয়ের ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। দুপুর বারোটা। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে তিনি রাস্তায় দাড়িয়ে থেকে বাড়ির গেইট ঠিক করছেন মিস্ত্রি দিয়ে। এই গেইট-টাও ঐ বাড়ির ছেলেই গুন্ডামী করে ভেঙ্গে গেছে সেদিন রাতে। এতোদিন বিয়ের ব্যস্ততার জন্য ঠিক করতে পারেনি। তাই আজ কাজ করাচ্ছেন। বিয়ে বাড়ি মানুষ জন্য আসছেন। সেখানে বাড়ির গেইট ভাঙ্গা জিনিসটা খারাপ দেখায় বলেই তিনি দ্রুত হাতে মিস্ত্রি দিয়ে কাজ শেষ করছেন। শফিকুল ইসলাম রিদের উপর প্রচন্ড বিরক্ত। উনার সেই বিরক্তিতে আরও ঘি ডালার মতোন কাজ করে যখন তিনি দেখেন মায়ার জন্য রিদের ঠিক করে দেওয়া চারজন বডিগার্ডকে চোখে পড়ে। বিরক্তিতে সাথে সাথে উনার নাক মুখ গুজে গেল। আজ তিন ধরে এই মেয়ে গুলো মায়ার চারপাশে ঘুরঘুর করে অকারণে। প্রথমে বিষয়টি উনারও আজব লেগেছিল। কিন্তু তারা বলে মায়ার সিকিউরিটি জন্য তাদের পাঠিয়েছেন রিদ খান৷ এই থেকেই বিষয়টি আদিখ্যেতা মনে হচ্ছে উনার। অনেকটা এমন হলো ‘ জুতা মেরে গরু দান। উনার ছোট অবুঝ মেয়েটির জীবনটা রিস্ক পড়ে গেছে শুধু মাত্র ঐ বাড়ির ছেলের জন্য। আজ মায়া সিকিউরিটি ছাড়া কোথাপ যাওয়াটা নিরাপদ না শুধু মাত্র রিদের জন্যই। উনার মেয়ের জীবনের না আসলে আজ সবকিছুই ঠিকঠাক থাকতো৷ মায়াও নরমাল জীবন লিড করতে পারতো। সারাক্ষণ প্রাণ হারানো ভয়ে থাকতে হতো না। যতসব বদরামী। উনার মেয়েকে বিপদে ফেলে সিকিউরিটি দিচ্ছে। তাছাড়া বিয়ে উপলক্ষে মায়াকে উনার বাসায় রাখছেন তিনি কোথাও বের হতে দিচ্ছে না। তাহলে বাড়ির ভিতরে কেন মায়াকে সিকিউরিটি দিতে হবে সেটাও বুঝল না তিনি। মায়ার পরিবারের কি মায়াকে সেফটি দিতে পারবে না। তাছাড়া এতো সাহস কি কারও হবে নাকি? উনার বাড়িতে এসে গোটা পঞ্চাশ-ষাট জন্য মানুষকে পেরিয়ে মায়ার উপর হামলা করার। ভুলেও হবে না। সবকিছুই আদিখ্যেতা। ঐ বাড়ির ছেলের বাড়াবাড়ি। শফিকুল ইসলামকে পরিবারের সামনে, আত্মীয় স্বজনদের সামনে, পারা প্রতিবেশীদের সামনে, খৈ করতে-ছোট করতেই মূলত এই সব সিকিউরিটি পাঠিয়ে ঐ বাড়ির ছেলে। আর এজন্য কতো মানুষের কানাঘুষা করে শুনতে হচ্ছে উনাকে। চাপা রাগে বিরক্তিতে আরও অতিষ্ঠ হয়ে উঠল শফিকুল ইসলামের মন। বিষিয়ে উঠল রিদের প্রতি।
~~
মায়া মামাতো বোন রিধি। স্কুল পড়ুয়া মেয়ে। খুবই ছোটখাটো সহজ সরল মেয়েটি ক্লাস টু-য়ে পড়ে। মা-বাবা ভাই বোনদের সাথে মায়ার বিয়েতে এসেছে। মিষ্টি দেখতে মেয়েটির গায়ে কালো ফ্রক পরা। চুল গুলো সব জুটি করা। একহাতে আইসক্রিমের কোণ চেপে ধরে খেতে খেতে হেলেদুলে অন্যহাতে সাদা প্যাকেটে মুড়িয়ে ছোট একটি পুটলি নিয়ে হাজির হলো কিচেনে। মেয়েটির আগমনে হকচকিয়ে কাজের মহিলাটি। এদিক সেদিক তাকিয়ে রিধিকে নিজের কাছে টেনে নিল। দ্রুততার সঙ্গে চট করে রিধির হাত থেকে ছোট কাগজের পুটলিটি নিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে ফেলল। পুনরায় এদিক সেদিক তাকিয়ে রিধির উদ্দেশ্যে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল…
—” মামুনি তোমাকে এই কাগজ নিয়ে আসার সময় কেউ দেখেছে?
রিধি মাথা নাড়িয়ে না বুঝাল। যার অর্থ কেউ দেখেনি। রিধির উত্তরে স্বস্তির হলো কাজের মহিলাটি। রিধির বাচ্চা মন কৌতূহল বশত প্রশ্ন করে ফেলে মহিলাটিকে…
—” এটাতে কি ছিল আন্টি?
কাজের মহিলাটি ভয়ার্ত চোখজোড়া এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখল কেউ আছে কিনা। কাউকে না দেখে তৎক্ষনাৎ হাসি মুখে রিধির গাল ছুঁয়ে আদুর করে বলল…
—” ঐটা আমার ঔষধ ছিল মামুনি। আসলে আমার অনেক শরীর খারাপ তো তাই কাজ করতে পারছি না। কাজ করতে না পারলে আমাকে বের করে দিবে তোমার মামা। টাকাও দিবে না বললো। টাকা না দিলে আমরা খাবো কি? আমার দুটো মেয়ে আছে তোমার মতোন। আমি কাজ করে খাবার না নিলে, তারাও না খেয়ে থাকবে। তাই শরীর খারাপের জন্য ঔষধটা তোমাকে দিয়ে আনলাম। তুমি কিন্তু কাউকে বলো না আমি যে অসুস্থ কেমন? তুমি কাউকে কিছু বললে আমাকে কিন্তু সবাই বের করে দিবে। তখন আমার মেয়েগুলোও কান্না করবে খাবার না পেয়ে। এখন বলো তুমি কি চাও এমনটা হোক?
ছোট অবুঝ রিধির বেশ মায়া হলো কাজের মহিলাটির ছোট ছোট মেয়েদের জন্য। তাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল কাউকে সে বলবে না কিছু। চতুর মহিলাটি রিধিকে কথার জালে ফাঁসাতে পেরে কমড়ের গুঁজে রাখা চকলেট প্যাকেট তুলে দিল রিধির হাতে আর বলল…
—” নাও এটি তোমার মামুনি। আর শোন! কাউকে কিন্তু কিছু বলবে না আমাদের মধ্যে হওয়া সিক্রেট বিষয়টাকে কেমন।
রিধি চকলেট হাতে নিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে বলল…
—” আচ্ছা।
—” ভেরি গুড গার্ল। যাও এবার।
রিধি চলে যেতেই মেয়েটি সোজা হয়ে দাঁড়াল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশেপাশে তাকিয়ে অপর পাশের কমড় থেকে বাটন ফোন বের করে কাউকে মেসেজ করে পুনরায় কমড়ে রেখে দিল। মুড়িয়ে রাখা কাগজের ভাজ থেকে ছোট শিশির কয়েকটি বিষের বোতলটি বের করল। সাদা কাগজটি ডাস্টবিনে ফেলে হাতের মুঠোয় বোতল গুলো নিয়ে এগিয়ে গেল গ্যাসের চুলার দিকে। ফ্রিজ থেকে দুধ নামিয়ে পাতিলে ঢেলে চুলায় বসাতেই হুড়মুড় করে কৌশলে কিচেনে ঢুকলো আরও দুজন কাজের মহিলা। কেউ কারও দিকে সরাসরি না তাকিয়ে যার যার মতো করে কাজে লাগল। একজন বেসিনের তালা বাসনের সামনে দাঁড়াল অপরজন ফ্রিজ থেকে নাস্তা বের করছে এমন একটা ভাব করে বলল…
—” কাজ হয়েছে শিফা?
দুধ গরম করা মেয়েটি বলল…
—” অল মোস্ট ডান। বিষের বোতল গুলো আমার হাতে এসে গেছে। শুধু মেয়েটিকে খাওয়াতে পারলেই কাজ শেষ। তাছাড়া এই পয়জনের এন্ট্রি ডোজ এই শহরে পাওয়া যাবে না। পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বিষের নামটা সনাক্ত করতে করতে ততক্ষণে রোগী এমনই মারা যাবে। আমরাও কাজ শেষ ভালোই ভালোই কেটে পড়ব এখান থেকে। এই রুজি তুই বসকে ফোন করেছিস? বলেছিস আমরা উনার পাঠানো পয়জনের পার্সেল হাতে পেয়েছি সেটা?
বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে তালা বাসন মাজতে মাজতে উত্তর করলো রুজি।
—” হুমম বলেছিলাম। তবে উনি আমাদের সাবধানে থাকতে বলল। রিদ খানের লোকজন আশেপাশে আছে সেটার সর্তকও করেছে। আচ্ছা আমরা যদি রিদ খানের বউকে বিষ খাওয়াতে সফল হতে না পারি তাহলে কি করবো?
অন্তত দক্ষতার সঙ্গে উত্তর করলো ফ্রিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মোহনা।…
—” তুই কথা কম বলবি তাহলেই হবে। ঝামেলা চাচ্ছি না। নেক্সট প্ল্যান আমাদের করাই আছে। বিষ প্রয়োগে সফল না হলে। রাতে সরাসরি হামলা করলো রিদ খানের বউয়ের উপর। তাও কৌশলে। বাড়ির সবাইকে খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ দিয়ে খাইয়ে তারপর মেয়েটির উপর হামলা করবো। এতটা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের আগে মেয়েটি মরেছে কিনা। ভুলে যাসনা আমাদের মূল লক্ষ কি?
কেউ আর কোনো কথা বললো না। চুপচাপ যার যার মতো করে কাজ চালাল। মূলত শফিকুল ইসলাম মায়ার বিয়ের উপলক্ষে কাজের মহিলার রেখেছেন চারজনকে কিচেনে সাহায্য করতে। যার তিনজনই ছিল রিদের শত্রুর পক্ষে পাঠানো মানুষ। আর এই বিষয় কারও বোধগম্য নয়। রিদের ও না। রিদ নিজের সন্দেহ বশে মায়ার জন্য সার্বক্ষণিক সিকিউরিটি দিয়েছে ঠিকই। কিন্তু মূল ষড়যন্ত্র বিষয়টি এখনো কারও অবগত নয়। যার হাতিয়ার হিসাবে মায়ার মামাতো বোনকে কাজে লাগাল তাঁরা। রিধিকে কেউ সন্দেহ করবে না বলে তাদের লোকের হাত থেকে রিধিকে দিয়ে পার্সেলটি আনাল তারা। বিগত তিনদিন ধরেই সুযোগ খুঁজছে তাঁরা মায়াকে মারার জন্য। কিন্তু সিকিউরিটি জন্য পারছে না। তাই আজ অবশেষে বিষ প্রয়োগ প্ল্যানিং করে মায়াকে মারতে চাইল তারা।
~~
সারাদিন গিয়ে সন্ধ্যা হলো। সময় সাতটা বিশ। বিয়ে বাড়ি ডেকোরেশন করা শেষ। চারদিকে মরিচ বাতিতে ঝলমলে করছে পরিবেশ। মায়াদের বাড়িতে মেহমানে গিজগিজ করছে। ব্যস্ততা চলছে বাড়ির বড়দের মধ্যে। মায়া তখনো নিজের রুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে কাজিনদের সাথে দলবেঁধে। সিকিউরিটি মহিলারা তখনো মায়ার রুমে কাঠের সোফায় বসে ছিল। রুজি মায়ার রুমে প্রবেশ করলো। সরাসরি মায়ার মিষ্টি চেহেরার হাসি মুখের দিকে তাকাল। দারুণ সুন্দর লাগল রুজি চোখে মায়াকে। এত সুন্দর মেয়েটা অকালে ঝরে যাবে ভেবে একটু আফসোসও করল। কিন্তু তাদের ও কিছু করার নেই। রুজি কয়েক কদম এগিয়ে এসে সিকিউরিটি মেয়েদেরকে এক পলক দেখে নিয়ে মায়ার কাজিনদের উদ্দেশ্য বলল…
—” আফামনিরা আফনাদের সব্বাইরে নিচে যাইতে কইছে খালামুনি(রেহেনা বেগম) নাস্তা করার জন্য। মায়া ম্যাডামরে একা রাইখা যাইতে কইছে। রাস্তা শেষে আবার আড্ডা দিবেন। চলেন আইয়েন সব্বাই। নাস্তা করবেন।
রুজি কথা কেউ না করলো না। একে একে চলে গেল নিচে নাস্তা করতে। কিন্তু রিধি মায়ার কোলে চেপে বসে রইল সে গেল না। রুজি রিধিকে নিতে চাইলে সে আপত্তি করল। বলল, সে যাবে না। মায়ার সাথেই থাকবে। মায়াও দিল না। রিধিকে নিজের সাথেই রাখল। রুজি নিচে চলে যেতেই ট্রে ভরতি খাবার নিয়ে পৌঁছাল শিফা। মায়ার জন্য বাদাম দুধ আর কেক নিয়ে আসল খেতে। সিকিউরিটি মহিলাদের অন্য ট্রে-তে করে গরম চা, মিষ্টি, নুডলস দিল। যার সবকিছুতে ছিল কর্ড়া ডোজের বিষ দেওয়া। মায়ার খাবার গুলো পাশাপাশি বডিগার্ড মহিলাদের খাবারেরও বিষ মিশানো হয়েছে। শিফা খাবার গুলো দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। কারণ বডিগার্ড মহিলারা সন্দেহ করবে বলে বের হয়ে গেল তৎক্ষনাৎ। তবে যাওয়ার আগে বাহির থেকে দরজা আটকিয়ে গেল। যাতে বিষের তাড়নায় ছটফট করলেও বাহিরের কেউ বলতে না পারে। সবাই খাবার শুরু করলো। বডিগার্ড মহিলারা একে একে খাবার খেতে লাগলো। খাবারের টেস্ট অন্য রকম লাগলেও খেল। মায়া রিধির হাতে বিষ মেশানো চকলেট কেক তুলে দিয়ে একটু করে সে ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। মিনিট পাঁচেক পর ওয়াশরুম থেকে ফিরতে দেখলো সবাই কেমন ঝিমাচ্ছে আর গলা ধরে ছটফট করতে করতে কাতরাচ্ছে অস্পষ্ট স্বরে। মায়া চমকালো, ভড়কালো, হকচকিয়ে গেল প্রত্যেককে ছটফট করতে দেখে। আতংকিত মায়া দৌড়ে গেল বডিগার্ডদের কাছে উত্তেজনায় তাড়নায় বলতে লাগল…
—” আপনারা এমন করছেন কেন? চোখ মুখ এমন কালো হয়ে যাচ্ছে কেন। কি হয়েছে আপনাদের? আমাকে বলুন।
বডিগার্ডদের মধ্যে একজন গলা চেপে ধরে ছটফট করতে করতে মায়াকে কোনো রকম কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল…
—” ম্যাডাম কাউকে দ্রুত ডাকুন প্লিজ। আমাদের সাহায্য করুন। খাবারে কিছু মেশানো ছিল মনে হয় যেটা আমাদের খাওয়ানো হয়েছে। প্লিজ ম্যাডাম কাউকে ডেকে আমাদের হসপিটালের নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্হা করুন নয়তো আমরা সবাই এখানেই মারা যাবো। প্লিজ ম্যাডাম সাহায্য করুন।
মায়া দ্বিগুণ উত্তেজিত হয়ে পরে খাবারে কিছু মেশানো ছিল এটা শুনে। মায়া কি করবে কিছু বুঝতে না পেরে দৌড়ে যেতে চাইল দরজা দিকে। কিন্তু বিছানা বরাবর আসতেই দেখল রিধি খাবার মুখে নেতিয়ে পড়ে আছে বিছানায়। গ্লাসের দুধটুকু উল্টে পরে আছে বিছানায়। আতংকিত মায়া দৌড়ে রিধিকে কোলে নিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল। উত্তেজনা মায়া ঘামতে লাগলো নিষ্পব ভাবে। রিধির গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে জাগ্রত করার চেষ্টা করে মায়া কান্না জড়িত গলায় বলল…
—” রিধি? এই রিধি বোন আমার। আপুর কথা শুনছিস তুই। চোখ মেলে দেখ এইতো তোর মায়াপু এইখানে। কি হয়েছে সোনাবোন তোর আপুকে বল। কষ্ট হচ্ছে তোর। এই রিধি। সোনা চোখ খোল না। এই রিধি। রিধি!
রিধিকে নড়াচড়া করতে না দেখে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল মায়া। দ্রুত সঙ্গে রিধিকে বিছানায় শুইয়ে গেল দরজা কাছে। দরজা টেনে ধরতেই বুঝল দরজাটি বাহির থেকে বন্ধ। উত্তেজিত মায়া দু’হাতে প্রাণপূর্ণ দরজা ধাক্কিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগল সবাইকে ডেকে ডেকে। কিন্তু দোতলায় কেউ না থাকায় মায়ার চিৎকার তৎক্ষনাৎ কেউ শুনলো না। মায়াও দমে যায়নি। অনবরত চিৎকার করে দরজা ধাক্কিয়ে সবাইকে ডাকতে লাগলো সাহায্যের জন্য। মিনিট খানিকটা পর মায়ার চিৎকার শুনলো আরিফ। মূলত সে বাহির থেকে ঘরে ফিরছিল। দোতলা বাড়িটির নিচের ফ্লাইটের ঢুকার আগে উপরের ঘর থেকে মায়ার চিৎকার ভেসে আসল তার কানে। আরিফ চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ সিঁড়ি ধরে উপরের ফ্লাটে উঠে গেল নিচে না গিয়ে। বাহির থেকে দরজা খুলতেই মায়া ঝাপটে জড়িয়ে ধরলো আরিফকে। আরিফ বিচলিত হয়ে মায়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে ‘কি হয়েছে জানতে চাইলে ‘ মায়া হিচকি তুলে কান্না করতে করতে আঙ্গুল দিয়ে দেখাই রুমের ভিতরে বেহুশ অবস্থায় সবাইকে। আরিফ চমকে উঠে মায়া ছেড়ে আতংকিত অবস্থা দৌড়ে গেল সেদিকে। বডিগার্ডসহ রিধিকে বেহুশ অবস্থায় দেখে আরিফের শরীরে ঝিম ধরে যায় কম্পনের। আরিফ সবাইকে বেহাল অবস্থা দেখে দ্রুত সঙ্গে মায়ার খোলা বারান্দায় দিয়ে নিচের দাঁড়িয়ে থাকা কাজিন ছেলেদের চিৎকার করে ডাকলো সাহায্য জন্য। পরিস্থিতি খারাপ বুঝে সবাই দৌড়ে আসল দোতলা ফ্লাটে। ছোট বড় ছেলেদের দৌড়াদৌড়ি দেখে বাড়ির মেয়েদের এবার টনক নড়লো। খাবার রেখে সবাই দৌড়ে যেতে চাইল দোতলা দিকে। কিন্তু সিঁড়ি কাছে আসতে দেখল বাড়ির ছেলেরা কোলে করে একে একে বেহুশ অবস্থা বডিগার্ড মেয়েগুলোকে নিচে নামাচ্ছে হসপিটালের উদ্দেশ্যে। আরিফের কোলে ছোট রিধিকে দেখে আঁতকে উঠল রিধির মা মারিয়া। হাউমাউ করে গিয়ে নিজের মেয়েকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরতেই আরিফ ব্যস্ত কন্ঠে জানায়’ তাদের আগে হসপিটালের যেতে হবে। খাবারের কিছু ছিল যেটা খেয়ে সবাই বেহুশ হয়ে গেছে। তাই আরিফের পথ না আটকিয়ে হসপিটালের যেতে সাহায্য করতে বলল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়ার কান্না মিশ্রিত বিধস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে তাকল রুজি, শিফা, মোহনা। মূলত মায়াকে সুস্থ সবল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইতিমধ্যে তারা বেশ করে বুঝে গেছে মায়া ছাড়া বাকি সবাই বিষ যুক্ত খাবার খেয়েছে। মায়া না খাওয়ায় এখন বাকিদের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে। তিনজন একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। পরিস্থিতি বুঝে চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল শান্ত হয়ে। আপাতত কিছু বলল না। তাছাড়া বাসার কেউ এখনো বুঝতে পারেনি তাদের খাবারের সাথে বিষ দেওয়া হয়েছে এই বিষয়টি। হয়তো হসপিটালের গেলে, ডাক্তার দেখিয়ে পরিক্ষা নিরিক্ষার রিপোর্ট আসলে তখন বুঝতে পারবে যে আসলেই তাদের বিষ দেওয়া হয়েছিল। খাবার যেহেতু তারাই সবাইকে পরিবেষণ করেছে তাই প্রথম টার্গেট কাজের মানুষ হিসাবে তাদের তিনজনকেই ধরবে। কিন্তু এসব কিছু সনাক্তকরণের প্রায় ঘন্টা দুইয়েক লেগে যাবে সবার। আর এই সময়ের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে মায়াকে মারার দ্বিতীয় প্ল্যানটা সাকসেসফুল করতে হবে যেকোনো মূল্যে। নয়তো বিপদ বাড়বে ছাড়া করবে না। ঘোর বিপদে পরে যাবে তারা তিনজনই। তাদের মারার জন্য একদিকে রিদ খান থাকবে আর অন্য দিকে থাকবে তাদের বস। পরিবারের প্রাণ, নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে চাইলে অবশ্যই দ্বিতীয় প্ল্যান অনুযায়ী দুই ঘন্টার ভিতর মায়াকে মেরে সফলতা অর্জন করতেই হবে তাদের।
ধরাধরি করে বডিগার্ড গুলোকে গাড়িতে উঠিয়ে বাড়ির সব ছেলেরা চলে গেল হসপিটালের উদ্দেশ্য। মেয়েদের মধ্যেও বেশ কয়েক জন গেল সাথে। রিধির মাও গেল জুইকে সাথে করে নিয়ে। মায়া যেতে চাইলে রেহেনা বেগম দিল না মায়ার বিয়ে বলে বাসার বাহিরে যাওয়া নিধেষ করল।
~~
রাত সাতটা বাইশ। বিষ প্রয়োগের ঘটনার প্রায় এক ঘন্টা পর আসিফের ফোনে কল গেল গুপ্তচরদের। প্রথম দফায় আসিফ ফোন রিসিভ করল। গুপ্তচর ব্যক্তিটি জরুরি ভিত্তিতে রিদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে আসিফ জানাল সে বিয়ের কাজে জন্য বাহিরে আছে। তার অফিসে পৌঁছাতে আরও আধাঘন্টা লাগবে। তাই আসিফের অ্যাসিস্ট্যান্ট নাম্বার দিল গুপ্তচরদের রিদের সাথে যোগাযোগ করতে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আসিফের অ্যাসিস্ট্যান্ট জামাল মোস্তফা অফিশিয়াল ফোনটি নিয়ে গেল রিদের অসিফ কক্ষের দিকে। দরজা নক করে রিদের অনুমতি নিয়ে রুমে প্রবেশ করে দেখল। রিদ নিজের চেয়ারে বসে ল্যাপটপে কিছু ইমেইল চেক করছে। জামাল হাসফাস করে রিদকে ভয়ার্ত কন্ঠে ডাকল ‘স্যার’ বলে। রিদ চোল তুলে গম্ভীর মুখে তাকাতেই ভয়ার্ত হাতে জামাল ফোন এগিয়ে দেয় রিদের দিকে। রিদ কপাল কুঁচকে জামালের হাতের ফোনটির দিকে তাকাতেই জামাল বলল…
—” আসিফ স্যার বলেছেন এই কলটি আপনাকে দিতে। আশুগঞ্জ থেকে নাকি একজন লোক জরুরি ভিত্তিতে আপনার সাথে কথা বলতে চাইছেন।
রিদ কথা না বাড়িয়ে দ্রুত হাতে ফোন নিয়ে কানে চেপে ধরল। ভয়ে বুকটা তার ধুরধুর করছে আশুগঞ্জ থেকে কল এসেছে শুনে। বউটা ঠিক আছে কিনা সে নিয়ে। রিদ গম্ভীর মুখে ‘হ্যালো’ বলে কথা চালাল। ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটি মিনিট খানিকটা সময় ব্যয় করে রিদকে জানাল মায়ার বডিগার্ডের কেউ বিষ দিয়ে মারতে চেয়েছিল। বর্তমানে তারা সবাই মৃত্যুর মুখে আছে। কারও অবস্থা ভালো না। বাঁচবে কিনা তাও বলা যাচ্ছে না। গুপ্তচরের কথায় আঁতকে উঠল রিদ। যা বুঝার রিদ বুঝে গেছে। তাই ব্যস্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে শুধু এতটুকু বলল…
—” শিট! আমার বউ কই।
রিদের কথায় হকচকিয়ে গেল ফোনের ওপাশের ব্যক্তিটি। আমতা আমতা করে বলল..
—” স্যার ম্যাডাম তো বাড়িতে।
—” হারামি বাচ্চা তুই কই?
—” স্যার আমি তো হসপিটালের সবার সাথে।
রিদের উত্তেজনা দ্বিগুণ হয় যখন শুনে মায়া একা বাড়িতে। মাথার রক্ত টগবগিয়ে উঠে রাগে উত্তাপে। খাবারের বিষ মিশিয়ে অন্যকে নয় বরং তার বউকে মারতে চেয়েছিল শত্রুর পক্ষরা। যখন এই কাজে সফল হতে পারেনি। তাহলে নিশ্চিত দ্বিতীয়বার চেষ্টা করবে তার বউকে মারতে। হামলা কারী হয়তো এখনো তার বউয়ের আশেপাশেই আছে। দ্রুত সেফটি না দিলে তার বউকে এই মূহুর্তে বাঁচাটায় হয়তো মুসকিল হয়ে যাবে। রিদ রাগে চেচিয়ে উঠে বলে….
—” হারামির বাচ্চারা আমার বউয়ের কিছু হলে সব-কয়টার কলিজা ছিড়েখুঁড়ে খাব আমি। দ্রুত হসপিটাল থেকে বের হয়ে বাড়িতে যাহ। সবাইকে সর্তক কর। বল আমার বউকে সেইফটি দিতে। আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে আসছি।
রিদের কথায় ভয়ে সিঁটিয়ে যায় গুপ্তচর গুলো। বার কয়েক শুকনো ঢুক গিলে ভয়ার্ত কন্ঠে বলে…
—” জ্বিই স্যার আমরা এক্ষুনি যাচ্ছি।
ভয়ে উত্তেজনায় রিদের শরীর রি রি করছে রাগে। রিদ অস্থির কন্ঠে ফের প্রশ্ন করলো গুপ্তচরকে…
—” কতটা সময় হয়েছে এই ঘটনার?
শুকনো ঢুক গিলে লোকটি বলল..
—” স্যার অনেকক্ষণ হয়েছে এই ঘটনার। না মানে, ঘন্টা খানিক সময়ের উপরে হয়েছে আরকি।
অস্থির ভঙ্গিতে নিজের ঘাড়ের চুল টেনে চেঁচাল রিদ। নিজেই নিজেকে বলল…
—” শিট! শিট! শিট! না-জানি কতটা দেরি হয়ে গেছে বউটাকে বাঁচাতে। শিট! আআআহহ….
রিদ সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠে একহাতে দিয়ে টেবিলের সবকিছু খিঁচে নিচে ফেলে দিল৷ রিদের গলা ফাটা চিৎকারে কেপে উঠে জামাল ও ফোনের অপর পাশে ব্যক্তিটি। চিৎকারের ধ্বনি কম্পন তুললো রুমের দেয়াল দেয়ালে। রিদ চিৎকার করে বলল…
—” হারামির বাচ্চারা এতো পূর্বের ঘটনাটি আমাকে এতক্ষণে জানালি কেন? তোদের জন্য যদি আমার বউয়ে কিছু হয় আই সয়ার আমি কাউকে ছাড়বো না। দ্রুত সবাইকে সর্তক কর। আমার বউয়ের খোঁজ করে সঠিক তথ্য আমাকে দে। আমি আসছি।
রিদ ফোন কেটে ফিহাকে কল করে বলল তৎক্ষনাৎ
মায়ার খুঁজ করতে। ফিহা রিদকে জানাল, সে নিচে বসে আছে। আর মায়া নিজের রুমেই আছে। তবে ফিহা মায়ার বর্তমান অবস্থা কথা জানে না। বাড়িতে দুর্ঘটনা হওয়ার পর কেউ আর মায়ার খবর রাখেনি। অস্থির রিদ ফিহাকে জানাল দ্রুত মায়ার রুমে যেতে এবং মায়ার খুঁজ করতে ঠিক আছে কিনা। রিদের কথায় এক মূহুর্তে ঘাবড়ে গেল ফিহা। রিদ এমনই এমনই কিছু বলবে না বেশ জানে সে। তাহলে কি সত্যি মায়া বিপদে পড়ল? ফিহা নিজের নানিশাশুড়ীর পাশ থেকে উঠে অস্থির ভঙ্গিতে এগিয়ে গেল দোতলা ফ্ল্যাটের দিকে মায়ার রুমের উদ্দেশ্য। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই দেরি হয়ে গেল। ফিহা বাহির থেকে রুমের ভিতরে ধ্বস্তাধস্তি আর গোঙ্গানির শব্দ পেল প্রচন্ড। ফিহা আঁতকে উঠে বেশ কয়েক বার দরজায় কর্ড়া আঘাত করল মায়াকে ডাকতে ডাকতে। কিন্তু রুমের ওপাশ থেকে কেউ দরজা খুলল না। আতংকিত ফিহা একাদিক মানুষের উত্তেজিত গলার শব্দ শুনতে পেল। সেই সাথে ফিহা স্পষ্ট মায়ার তীব্র গোঙ্গানির শব্দও শুনতে পেল। ফিহার বুঝতে বাকি রইল না কেউ যে মায়াকে আঘাত করছে সেটা বুঝতে। আতংকিত ফিহা এবার ভয়ে কেঁদে উঠে অস্থির ভঙ্গিতে দরজায় ধাক্কাতে শুরু করল মায়াকে ডাকতে ডাকতে। রিদ তখনো ফিহার ফোনের লাইনেই ছিল। ফিহার অস্থির কান্নায় রিদ যা বুঝার বুঝে গেল। রিদ শরীর তরতর করে ঘেমে উঠে ঝিম ধরে ঠাস করে বসে পড়ল চেয়ারে উপর। ফিহা অস্থির ভঙ্গিতে ফোনটি কানে নিয়ে রিদকে ডাকলো বেশ কয়েক। রিদের হুশ আসতে ফিহা অঝোরে কেঁদে কেঁদে বলল…
—” ভাই! ভাই! মা মায়া মায়ার রুমের ভাংচুরের শব্দ পাচ্ছি। কিন্তু কেউ দরজা খুলছে না। একাদিক মানুষের গলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ভাই রুমের ভিতর থেকে। হয়তো কেউ মায়াকে আঘাত করছে তার হালকা গোঙ্গানির চিৎকার ও শুনতে পারছি ভাই। এখন কি করবো ভাই?
রিদের বুক তরতর করে কেঁপে উঠে। কপালে চিকন ঘাম দেখা যায় তৎক্ষনাৎ। রিদ গলার টাই টেনে খুলে ফেলে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হতভম্ব হয়ে দৌড়ে রুমে বের হতে হতে ফিহাকে উত্তেজিত কন্ঠে বলল…
—” ফিহা দ্রুত সবাইকে ডাক। দরজা ভাঙ্গার ব্যবস্হার কর। তোর ভাবি বিপদে আছে। তাড়াতাড়ি করে সবাইকে ডাক। কুইক!
—” ভাই বাসায় তো ছেলে মানুষরা কেউ নেই। সবাই হসপিটালের গেছে। কি করবো?
রিদ তেতে উঠে বলল…
—” শিট! সবকিছুই প্রি-প্ল্যান করা ছিল। শিট! ফিহা এক কাজ কর বাসায় ছোট বড় যারা যারা আছে সবাইকে নিয়ে দ্রুত দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা কর আমি আসছি। কুইক!
~~
মায়ার বডিগার্ডদের সহ রিধিকে নিয়ে সবাই হসপিটালের যাওয়ার পরপরই মায়া সবার সাথে নিচে বসার ঘরে বসে ছিল বেশ কিছু সময়। কিন্তু অতিরিক্ত কান্নায়ও অস্থিরতায় মায়ার শরীর দূর্বল মনে হতেই রেহেনা বেগম মায়াকে কাজের মেয়ে রুজিকে দিয়ে রুমে পাঠায়। সুযোগ সন্ধানী রুজি চট করে মায়াকে নিয়ে রুমে গেল। মায়াকে বিছানায় বসিয়ে সেও মায়ার পাশে বসে রইল। আপাতত অপেক্ষা করছে কখন বাকি দুজন আসে তার। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর শিফা আসল মায়া রুমে হাতে করে এসিডের বোতল নিয়ে আঁচলে লুকিয়ে। রুজি শিফার সাথে চোখাচোখি করে কথা বলল। ইশারায় বুঝাল কাজ শুরু করতে হবে। তবে রুজি ইশায় মোহনার কথাও জানতে চাইল। তখন শিফা ইশারায় বুঝায় মোহনা নিচে আছে। বাড়ির কোনো লোক যাতে দোতলায় আসতে না পারে সেই দিকটা দেখার জন্য নিচে পাহারা দিচ্ছে সবাইকে। এবং সময় বুঝে মোহনাও অল্প সময়ের মধ্যে এখানে চলে আসবে। রুজি মাথায় নাড়িয়ে সম্মতি দিল সে সবটা বুঝতে পেরেছে। শিফা রুজির পাশে বসা নত মস্তিষ্কের মায়ার দিকে তাকাল। পা ঝুলিয়ে বিছানার পাশে বসে আছে মায়া। আর মায়ার ঠিক পিছনে রুজি বসে আছে। মায়ার নিঃশব্দে কান্নায় শরীর দুলছে মৃদু মৃদু। শিফা সময় নষ্ট না করে শাড়ির আঁচল থেকে এসিডের বোতল বের করলো। মায়ার মুখে ছুঁড়ে মারে জন্য এগিয়ে আসল। ততক্ষণে মায়াও উঠে দাঁড়াল ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য। মায়াকে উঠে দাঁড়াতে দেখে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে আসল শিফা। মায়া ওয়াশরুমের জন্য এক কদম বাড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিফা মায়ার মুখের উদ্দেশ্য এসিড ছুড়ে মারলো। মায়া কিছু বুঝে উঠার আগেই তৎক্ষনাৎ মুখ দু’হাতে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল রুজি। চমকে উঠল মায়া। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই দেখল রুজি দু-হাতে মুখ চেপে ধরে গলা ফাটা চিৎকার করছে আতনার্দে। মায়া চমকে উঠে তৎক্ষনাৎ রুজিকে ধরতে চাইল। কি হয়েছে জানতে চাইলে তেতে উঠে শিফা। মূলত মায়া দিকে ছুঁড়ে মারা এসিড গিয়ে পড়লো রুজির মুখের উপর। তখন মায়ার নিজের অজান্তে সামনের দিকে কদম বাড়ানোতে বেঁচে গেল। এবং অসাবধানতায় এসিড পুরোটায় পড়ল রুজি গায়ে উপর। যেহেতু রুজি মায়ার পিছনে ছিল তাই সে এসিডের শিকার হলো। শিফা তেতে উঠে দক্ষ হাতে মায়ার চুলের মুষ্টি ধরে রুজির পাশ থেকে টেনে তুলে রাগে ঠাস করে থাপ্পড় মারল মায়ার গালে। মায়া খৈ হারিয়ে ছিটকে পড়লো ফ্লোরে। মায়ার উপর হওয়া আকস্মিক আক্রমণ কারণটা তখনোও বুঝল না মায়া। শিফা রাগী হাতে ফের মায়ার চুলের মুষ্টি ধরে ফ্লোর থেকে টেনে তুলে অপর গালে থাপ্পড় মারতেই এবার মায়া ছিটকে পড়ল খাটের কোণায়। অসাবধানতার কারণে মায়ার কপাল কাটল খাটের লেগে। মায়া ফুপিয়ে উঠল কান্নায়। মায়া কিছু বলার আগে ফের মায়ার চুলে মুঠি ধরে টেনে ধরল শিফা। মায়া দু’হাতে নিজের চুল ছাড়ানোর চেষ্টা করে কেঁদে উঠে বলল…
—” আপু আমাকে মারছেন কেন? কি করেছি আমি। ছাড়ুন না আমাকে। ব্যথা পাচ্ছি তো আমি।
মায়া কান্নায় মন ভুলনা শিফার। বরং মায়ার চুল ধরে টেনে নিয়ে দেয়ালের ধাক্কা মারলো। মায়া দেয়ালে ভারি খেয়ে নিচে পড়তেই হুড়মুড় করে রুমে প্রবেশ করলো মোহনা। দ্রুততা সঙ্গে রুমের ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে পিছন ঘুরে তাকাতেই বুঝতে পারলো রুজি এসিডে আক্রান্ত হয়েছে। ছুরি হাতে মোহনা এগিয়ে আসলো। রুজি চিৎকারে বাড়ির মানুষজন উপরে চলে আসবে ভেবে মোহনা রাগে কটমট করে শিফার উদ্দেশ্য বলল..
—” এই হারামজাদি এসিডে আক্রান্ত হল কিভাবে? কোনো কাজ ঠিকঠাক ভাবে হয়না একে দিয়ে। শালী নিজেও মরবে আমাদেরকে ও মারবে।
মোহনার কথার সম্মতি দিয়ে শিফা তেতে উঠে
বলল…
—” এই মাইয়ারে মারতে গিয়ে ভুলবশত রুজি মুখে পড়ে গেছে এসিড। সেই তখন থেকে এমন মরার মতো চিৎকার জুড়ে বসে আছে এই রুজি। আজ এই মেয়ের চিৎকারের জন্য আমরাও বিপদে পরবো মোহনা। গড নোস! এই আধা পাগল মেয়েকে কেন বস আমাদের সাথে পাঠাল।
—” ওকে দ্যান তুই রিদ খানের বউকে সামলা। আমি রুজি দেখছি। এই মেয়ের জন্য আমরা লাস্ট মূহুর্তে এসে বিপদে পরতে পারবো না।
—” ওকে ডান।
দু’জন দুই দিকে গেল। মোহনা ধারালো ছুরি হাতে রুজিকে মারতে গেল তো অন্য দিকে শিফা মায়ার কাছ গেল। আতংকিত মায়া এতক্ষণে বুঝতে পারলো তারা সবাই আসলে মায়াকে মারতে এসেছে। মায়া দূর্বল শরীর উঠে দাঁড়াল। তরতর করে মায়ার সর্বাঙ্গে কাঁপছে অনবরত ভয়ে। মায়ার শরীর বেয়ে দরদর ঘাম ছুটছে। পরপর দুটো পরিস্থিতির শিকার হয়ে মায়া নিজেকে সংযম করতে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া বিষের ভয়াবহ ঘটনার পর এখন আবার সরাসরি মায়ার উপর হামলা করাটা ছিল তার আতঙ্কের কারণ। মায়া শিফাকে এগিয়ে আসতে দেখে দরজার দিকে পালাতে চাইল। দৌড়ে দরজার কাছে গিয়ে দরজার লক খুলতে চাইল। কিন্তু তার আগেই মায়াকে ধরে ফেলল শিফা। মায়াকে আটকিয়ে, ওড়না দিয়ে মায়ার গলা পেঁচিয়ে ধরলো মারার জন্য। ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল তাদের দু’জনে মধ্যে। মায়া হাত পা ছুটাছুটি করে নিজের গলার ওড়নার বাঁধন খুলতে চাইল। পারলো না। ততক্ষণে মোহনাও রুজির এসিডের ছটফটের কাতরানোর সুযোগ নিয়ে গলায় ছুরি চালাল মারার জন্য। সফলও হলো রুজিকে জবাই করতে মোহনা। ধারালো ছুরি ধারে রুজি গলা থেকে ফিকরে রক্ত বের হল তরতর করে। চোখের সামনে মূহুর্তেই সাদা বিছানাটি লাল হয়ে গেল। মায়া গলায় ওড়ানা বাঁধা অবস্থায় রুজির নৃশংস হত্যা কান্ডটা দেখলো মায়া। প্রাণের ভয়ে মায়ার ছটফট করলো দ্বিগুণ। রুজির জবাই করা গলার দিকে তাকাতেই মায়ার চোখ উল্টে বমি আসলো মুখ ভর্তি। গরগর করে বমি করেও দিল। দূর্বল শরীরটা আরও দূর্বল হয়ে গেল মায়া। শরীরের অবশিষ্ট শক্তি রা- না থাকায় নেতিয়ে পরতে চাইল মায়া। মোহনা রক্তাক্ত শরীর ও ছুরি হাতে এগিয়ে আসলো মায়ার দিকে। উদ্দেশ্য মায়াকে এবার জবাই করবে। শিফা পিছনে থেকে মায়ার গলায় শক্ত করে ওড়না বেঁধে রেখে দাঁড়িয়ে আছে। মোহনা উদ্দেশ্য অনুযায়ী মায়ার কাছে আসতেই মায়া প্রাণের ভয়ে জোর খাটিয়ে লাতি মারলো মোহনার পেটে বরাবর। যার ফলে মোহনা ছিটকে পড়লো ফ্লোরে। হাতের ছুরিটিও কিছু দূরে ছিটকে পরল সোফার পাশে। আকস্মিক ঘটনায় শিফা তেতে উঠে মায়াকে টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে থাপ্পড় মারতে চাইলে মায়া শিফাকে ধাক্কা মেরে দরজা পাশে ফেলে দিয়ে দৌড়ে পালাতে চাইল বারান্দায় দিকে। মায়া নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে চিৎকার করতে করতে সবাইকে ডাকল সাহায্যের জন্য। কিন্তু কেউ শুনতে না পারায় এগিয়ে আসল না। যার কারণে এতেও মায়ার সফল হতে পারলো না নিজেকে বাঁচাতে। মোহনার চতুর বুদ্ধি খাটিয়ে ফ্লোরে পরে থাকা অবস্থায় মায়ার পা টেনে ধর, মায়াকে উল্টে নিচে ফেলে দিল। সময় নষ্ট না করে মোহনা তৎক্ষনাৎ মায়ার উপরে চড়ে বসল। মায়ার চিৎকার বন্ধ করার জন্য মোহনা প্রথমে ধ্বস্তাধস্তি করে, মায়ার মুখে ওড়নার কিছু অংশ টেলে ঢুকিয়ে দিল। শিফা ফ্লোর থেকে উঠে দ্রুত এগিয়ে বিছানা পাশ থেকে বালিশ নিয়ে মোহনার হাতে দিল মায়াকে বালিশ চাপায় মারতে। পরে মোহনাকে সাহায্য করতে শিফা মায়ার দু-হাত চেপে ধরলো ফ্লোরে সাথে। মোহনা দক্ষ হাতে মায়ার মুখে বালিশ চাপা দিল। মায়া ধস্তাধস্তি করেও কারও সাথে শক্তি পেরে উঠতে সক্ষম হলো না। মায়ার নিশ্বাস আটকে আসায়, শেষ চেষ্টায় হাত পা ছুটিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইলেও পারলো না। চারদিক থেকে ব্যথ মায়ার শরীরে যখন অবশিষ্ট শক্তির রা থাকলো না। এবং নিশ্বাসের অভাবে শরীর নিস্তেজ প্রাণহীন হয়ে পড়ছিল ঠিক তখনই দরজার মধ্যে কর্ড়া আঘাত পায় ফিহার। সেই সাথে পায় ফিহা অস্থির ভঙ্গিতে চিৎকারের শব্দ। আপনজনের ডাক পেয়ে মায়ার সাহস পেল। পুনরায় জোর খাঁটিয়ে বন্ধ থাকা হাত-পা ছুটাছুটি করতে চাইল। কিন্তু মোহনা শিফার শক্তির সঙ্গে পেরে উঠছিল না তখনো। ফিহার অনবরত দরজা আঘাত ও চিৎকারের শব্দ ঘাবড়ে যায় মোহনাও শিফা দু’জনই। মোহনা সর্তকের কান খাঁড়া করতেই বুঝতে পারলো ফিহা কারও সাথে লাউড স্পিকার ফোনেও কথা বলছে ভাই! ভাই করে ডেকে ডেকে। চতুর মোহনা তৎক্ষনাৎ বুঝে গেল ভাই, নামক মানুষটি স্বয়ং রিদ খান নিজেই। হয়তো ভালোবাসার বউ বিপদে আছে বুঝতে পেরে মানুষ পাঠিয়েছে তার বউকে বাঁচাতে। মোহনা শিফা দু’জনই ঘামতে শুরু করলো। এইভাবে আরও কিছুক্ষণ থাকতে নিশ্চিত তারা দু’জন ধরা পড়ে যাবে। তাছাড়া বালিশ চাপা দিয়ে কাউকে মারতে বেশ সময়ের ব্যাপার। তাদের হাতে এতো সময় নেয়। মোহনা মায়ার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে নিজের রক্তাক্ত ছুরিটি খুঁজল। সোফার পাশে ছুরিটি পরে থাকতে দেখে দ্রুততার সঙ্গে মোহনা শিফার উদ্দেশ্য বলল…
—” শিফা আমাদের হাতে সময় কম। রিদ খান মানুষ পাঠিয়েছে নিজের বউকে বাঁচাতে। দ্রুত কিছু একটা না করলে আমরা তো মরবোই সাথে এই মেয়েটিও বেঁচে যাবে। এই ভাবে বালিশ চাপায় মানুষ তাড়াতাড়ি মরে না সময় নেয় অনেক। তাই আমি এই মেয়েকে ধরে রাখছি তুই দ্রুত আমার ছুরিটা আন সোফার সামনে থেকে। তুই হাত ধরবি আর আমি এই মেয়েকে জবাই করবো ততক্ষণে। তাড়াতাড়ি যা।
মোহনার কথায় শিফা মায়ার হাত ছেড়ে দ্রুত এগিয়ে গেল সোফার দিকে ছুরি আনতে। আর সেই সুযোগটায় কাজে লাগাল মায়া৷ হাত ছাড়া পেয়ে আন্দাজে উপর ভিত্তি করে দুহাতে মোহনার চোখে খাবলে ধরল। এতে করে খেই হারায় মোহনা। মায়াকে ছেড়ে নিজের চোখে দু’হাতে চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল ফ্লোরে পরে। মায়া কাঁপা কাঁপা হাতে তৎক্ষনাৎ মুখের উপর থেকে বালিশ সরিয়ে উঠে দাঁড়ায় বিধস্ত নাজেহাল অবস্থায়। শরীরে ঘাম ও রক্তে একাকার হয়ে আছে। মায়ার মুখের ভিতর ঢুকিয়ে রাখা কাপড়ের অংশটুকু টেনে বের করে অনবরত কাশতে থাকে বুকে হাত দিয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিতে নিতে মায়া। মায়া তখনো দাঁড়ানোর শক্তি পাচ্ছে না। পা দুটো ভেঙ্গে আসছে নি-শক্তির কম্পনে। মায়া কম্পিত দূর্বল শরীরটা টেনে কোনো রকম উঠে দাঁড়াল। শিফা ততক্ষণে ছুরি হাতে মোহনায় দিকে আসতেই দেখল মোহনার চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। উত্তেজিত শিফা দৌড়ে এসে মোহনাকে ধরলো পাশে ছুরিটি রেখে। মোহনার কি -হয়েছে জানতে চাইলে, মোহনা শিফাকে জানাল মায়া আঘাত করেছে তার চোখে। শিফা তেতে উঠে মায়ার দিকে তাকাতেই দেখল। মায়া দূর্বল শরীরে কোনো রকম দৌড়ে পালাতে চাইছে বারান্দার দিকে। শিফা মোহনাকে কোলে নিয়ে একহাতে ফ্লোরের বালিশটি তুলে ছুড়ে মারল মায়ার দিকে। মায়ার পিঠে উপর বালিশটি লাগলেও মায়া পড়লো না। শুধু সামন্য খেই হারাল। তাই মায়া বারান্দার দরজা ধরে নিজের দূর্বল শরীরের ব্যালেন্স ঠিক করে পুনরায় বারান্দার দিকে যেতে লাগল। শিফা মায়াকে বারান্দার দিকে পালাতে দেখে বেশ একটা বিচলিত হলো না। কারণ দোতলার বারান্দায় দিয়ে মায়ার পালানো সম্ভব না তাই। যদি পালাতে চাই তাহলে বারান্দার নিচে রাখা ডেকোরেশনের জিনিসপত্রে উপরে পরলে এমনই মারা যাবে সে। তারপরও শিফা রিস্ক নিতে চাইল না। মোহনাকে ছেড়ে ছুরি হাতে উঠে দাঁড়াতে এবার জোরালো ভাবে দরজার ওপাশের বেশ অনেক মানুষের চিৎকার চেচামেচির শব্দ শুনতে পেল সে। ভারি কিছু দিয়ে যে সবাই দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করছে তা বেশ বুঝতে পারলো শিফা। ভয়ে বিচলিত হলো শিফা। এতক্ষণ মায়াকে তারা আরামছে মেরে ফেলতো। যদি তখন রিদ খান লোক পাঠিয়ে দরজায় আঘাত না করতো। তাহলে তারাও বিচলিত হতো না। এবং মোহনা তাকে ছুরি আনতে পাঠাতো না উত্তেজিত হয়ে। তারা সময় নিয়ে এমনই সহজে মারতে পারতো মায়াকে। কিন্তু সবটা এক মূহুর্তে উল্টো হয়ে গেল রিদ খানের মানুষ পাঠিয়ে দরজায় আঘাত করাতে। এতে করে তাদের ধারা ভয়ের কারণে প্রথম ভুলটি হয়। মায়াকে ছেড়ে ছুরি আনতে যাওয়ার আর তার সুযোগ নেয় মায়া। কৌশলে মোহনাকে আঘাত করে ছুটে যায়। যার ফলে বিষয়টি আরও জটিল হয়। এখন যদি সময় থাকতে মায়াকে মারতে না পারে তাহলে সব শেষ। শিফা মোহনাকে ছেড়ে ছুরি হাতে দ্রুত এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে। মায়াকে ধরতে যাবে তার আগেই মায়া কোনো দিক না দেখে মূহুর্তেই লাফিয়ে পরে খোলা বারান্দার বর্ডার লাইন পেরিয়ে। আকস্মিক ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যায় শিফা। মায়া যে হঠাৎ করে নিচে লাফিয়ে পড়বে ঘুণাক্ষরে টের পাইনি সে। শিফা ছুরি হাতে দ্রুত এগিয়ে মায়াকে দেখতে চাইল কিন্তু পারলো না। কারণ ততক্ষণে চারপাশে থেকে মানুষজনের চিৎকারের ধ্বনি ভেসে আসে শিফার কানে। বাড়ির গেইট ধরে কয়েক প্রতিবেশী মহিলা ঢুকতে ঢুকতে চমকে উঠল যখন মায়াকে দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়তে দেখলো। মায়ার রক্তাক্ত শরীর দেখে তারা আহাজারি করে চিৎকার করতে করে বলতে লাগলো….
—” হায়! হায়! আল্লাহ গো! আরিফের মা-রে তোর ছোট মেয়ে মারা গেল গো। অঅ রেহেনা! এদিকে আয়। হায় হায়! মেয়েটার কাল গায়ে হলুদ আর আজ আত্মহত্যা করে নিজের জীবন দিয়ে দিল। আল্লাহ গো! ওহ আরিফের মা। তোর মেয়ে শেষ গো! তোর মেয়ে শেষ।
ঝলমল করা বিয়ে বাড়িটা মূহুর্তেই মৃত্যু পল্লীতে রুপান্তরিত হলো। বিয়ের আমেজ মেতে ওঠা প্রতিটা চেহায় কালো মেঘে ঢেকে গেল। হাসি খুশিতে আছন্ন বাড়িটা মৃত্যু একে একে মৃত্যুর ধ্বনিতে লুটিয়ে পড়লো। চিৎকার চেচামেচি, আহাজারি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো প্রতিটা মানুষ। সেকি আতনার্দ মৃত্যু সংবাদে। একটা দুইটা নয়! দুটো নয়! পুরো ছয়টা লাশের লাইন ধরে বের করলো শফিকুল ইসলামের বাড়ির আঙ্গিনায় উঠানে। রিদের কান অবধি পৌছাল সেই সকল মৃত্যুর সংবাদ।
চলিত…
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা) সিজন ২ পর্ব ৪৬
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৪০
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৫৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৩৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৬০(প্রথমাংশ+শেষাংশ)