দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৫
দেওয়ানা(আমার ভালোবাসা)সিজন_২
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
২৫
গাড়ি থেকে নেমে কলেজ মাঠে পা রাখলো মায়া। হালকা কপাল কুঁচকিয়ে চারপাশের চোখ বুলিয়ে নিল নিরব নিচ্ছিন্নে। বেশ কয়েক জোড়া চোখে কেন্দ্র বিন্দু হয়ে আছে মায়া। সে বেশ চমকালো, ভড়কালো, নিরবে তাকালো ডাইভারের দিকে। সচকিত হয়ে গুমোট কন্ঠে বললো…
—” ভালো কাকু তুমি যাও। তোমাকে কলেজে থাকতে হবে না। আজ আমি বাড়ি একা ফিরব বান্ধবীদের সাথে। তুমি চলে যাও।
গাড়ির দরজা লাগিয়ে হকচকিয়ে মায়া দিকে তাকালো রহিম। মায়ার কথায় হতভম্ব হয়ে সচকিত বললো…
—” আম্মাজান! আমি এহন চইলা গেলে বড় ম্যাডাম আমারে বকব। বড় ম্যাডাম আমারে আফনার কলেজ থেইক্কা আনন নেওনের দায়িত্ব দিসে। তাই বড় ম্যাডাম না কওয়া পযন্ত আমি এহন থেইক্কা যাইমু না। আফনে
ক্লাসে যান। আমি এইহানে থাকুম। যান।
মায়া খানিকটা বিরক্তি বোধ করলো নিজের মাঝে রহিমের কথায়। সর্তক চোখে আবারও তাকালো চারপাশে। এখনো আগের ন্যায় চারপাশের মানুষজনের দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু হতে দেখে হতাশ হলো উদাস মনে। আজ মায়ার কলেজে এটেন্ড করা প্রথম দিন নয়। বরং সাপ্তাহ দশদিন হয়েছে মায়া কলেজে রেগুলার জয়েন করছে। প্রথম দিন থেকেই মায়া লক্ষ করে তার চারপাশে অদ্ভুত কিছু ঘটনা গুলো। শুধু অদ্ভুত বললে ভুল হবে ভিষণ ভাবে উদ্ভট। মায়া কলেজ আসলে সিনিয়র ভাইয়া আপিরা থেকে শুরু করে চারপাশের সবাই কেমন অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে থাকে। মায়ার থেকে সবাই দূরে থাকে। কথা বলতে চাই না এরিয়ে চলে। এমনকি মায়ার ক্লাসের সহপাঠীরাও মায়ার সাথে তেমন কেউ কথা বলতে চাই না। মায়া কিছু বললে হুম, হ্যাঁ ছাড়া কেউ বাড়তি উত্তর বসাতে চাই না। সবাই কেমন সিঁটিয়ে থাকে নিজের মাঝে। এতে মায়াও ভিষণ ভাবে অস্থিরতা ভুগে। চারপাশের মানুষ থেকে নিজেকে আলাদা গুটিয়ে চলতে হয় তাকে। তবে মায়ার সঙ্গী হিসাবে ছায়া, টিয়া ছাড়া অন্যকেউ সঙ্গ দেয়না। তাছাড়া মায়ার ধারণা, তার উচ্চ লাইফ স্টাইলের জন্য হয়তো চারপাশের মানুষজন মায়ার সাথে ঠিকঠাক মিশতে পারছে না। এজন্য সবাই কথা বলে না এরিয়ে চলে তাকে। মায়া সাধারণ ভাবে চলতে চাই। মিশতে চাই সবার সাথে। কিন্তু কোনো কিছুই পারছে না হেনা খান ও আরাফ খানের জন্য। তারা মায়াকে গাড়ি, ডাইভার ছাড়া একা কলেজে পাঠাবেন না। তাই এক প্রকার বাধ্য হয়েই গাড়ি করে আসতে হয় মায়াকে। মায়া সচকিত চোখে চারপাশ দেখে নিয়ে হাসফাস করে উঠলো নিজের মাঝে। হতাশ হয়ে ঘুরে তাকালো রহিম মিয়ার দিকে। অকপটে বলে উঠলো…
—” ভালো কাকু! তোমার এখানে থাকার হলে তুমি থাকু। তারপরও আমি আজকে গাড়ি করে বাসায় যাব না। আজ আমি আমার ফ্রেন্ডদের সাথেই রিক্সা করে বাসায় যাব। নয়তো যাবনা।
মায়া কথার মধ্যস্থলে প্রবেশ কয়কজন সিনিয়র সদস্যরা। ছোটখাটো দল বেধে চারজন ছেলে এগিয়ে আসলো মায়ার সামনে। তাদের মধ্য থেকে রাফি নামক ছেলেটি মায়ার সামনে এগিয়ে এসে নম্রতা সহিত বলে উঠলো…
—” কোনো সমস্যা ভাবি?
মায়া চমকালো! ভড়কালো! হকচকিয়ে তাকালো পাশে ছেলেগুলোদের দিকে। চিন্ততে পারলো কলেজের সিনিয়র ভাইদের। কিন্তু তাদের মুখে “ভাবি’ ডাকটা বোধগম্য হলো না। আজকে প্রথম যে ভাবি ডাকছে তাও নয়। রোজই ভাবি ডাকে, আর আগ বাড়িয়ে মায়ার খুঁজ খবর ন্যায়। মায়া শুকনো ঢুক গিলে নিজেকে সংযম করে দৃষ্টি নত করে দাঁড়ায় ছেলেগুলোর সামনে। রাফি নামক ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে প্রায় সাথে সাথে মিঠেই গলায় বলে উঠে..
—” কোনো সমস্যা নেই ভাইয়া।
পাশ থেকে রাহাত নামক ছেলেটি প্রায় তৎক্ষনাৎ বলে বসে…
—” তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন ভাবি? ক্লাসে যান আপনি। ডাইভার চাচা আপনি ক্যান্টিনে গিয়ে বসুন। ভাবি! আপনার বাঁদর বান্ধবী দুইটা কই?
মায়া চোখ তুলে উপরের দিকে তাকালো না। আগের ন্যায় দৃষ্টি নত রেখেই বলে…
—” চলে যাব ভাইয়া। ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম আমি। ওরা দু’জন এক্ষুনি চলে আসবে।
সচকিত চোখ বুলালো চারপাশ রাহাত। নম্র কন্ঠে বলে উঠলো….
—” দরকার নেই ভাবি। বাঁদর দুইটা আসলে নিজের পায়ে হেঁটে ক্লাস অবধি যেতে পারবে। আপনি বরং ওদের জন্য অপেক্ষা না করে ক্লাসে চলে যান। কলেজের এই দিকটার পরিবেশটা আপনার ভালো না। সামনের গেইট ধরে ছেলেরা আসা যাওয়া করছে।
এখান থেকে রাস্তার মানুষজনও দেখা যায় স্পষ্ট। আপনি এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে ক্লাসে যান দ্রুত, নয়তো ভাই রাগ করবেন ভাবি।
ভাই রাগ করবেন শব্দটিও শুনল মায়া। কানে ঝংকার তুলল সেই শব্দটি। হকচকিয়ে গেলে নিজের বক্ষস্থলে। কোন ভাইকে জড়িয়ে মায়াকে বারবার ভাবি বলছে সেটিও বুঝে আসলো না মায়ার। তবে যেটা বুঝে আসলো সেটি হলো এই মূহুর্তে মায়ার এখান থেকে প্রস্হান করাটা। কিন্তু যাওয়ার আগে ‘ভাই ” নামক মানুষটির সাথে পরিচিত হতে চাই সে। কোন ভাইয়ের জন্য তাঁকে রোজ রোজ এই সিনিয়র ভাইরা তদারকি করে তীক্ষ্ণ নজরে সেটাও জানতে চাই। মায়ার দৃঢ় বিশ্বাস সেই অদ্ভুত মানুষটায় হলো এই ভাই “নামক’ মানুষটি। বেশ কৌতূহল জাগে মায়ার মন পিঞ্জরে। তটস্থ হয় চোখ তুলে তাকাই রাহাতের দিকে। কিন্তু তৎক্ষনাৎ সেই দৃষ্টি নিচে নামিয়ে ন্যায় পুনরায়। মনে ভিতর থেকে ক্ষীণ প্রতিবাদী সত্ত্বাটা সাবধান করে উঠে তৎক্ষনাৎ” খবরদার মায়া একদম পরপুরুষ দিকে নজর দিবিনা। জানিস না তোর পর পুরুষদের দেখা নিষেধ! তারপরও অবাধ্য হচ্ছিস তুই। মায়া শুধালো। নিজের দ্বিসত্তার প্রতিবাদে দমে গেল মূহুর্তেই। চোখ তুলে তাকাল না আর সেদিকে। তবে দুটানা মনে আওড়ালো ” সবাই মায়ার পরপুরুষ হলে, তার আপন পুরুষ কে? মায়ার ছোট মনে কৌতূহল জাগ্রত হয় তীব্র থেকে তীব্র। মাথায় দল পাকিয়ে আসে” ভাই নামক ” মানুষটিকে ঘিরে নানান প্রশ্ন। দমে না গিয়ে করে বসল অনাকাঙ্ক্ষিত সেই প্রশ্নটি।
—” কোন ভাই’রাগ করবেন ভাইয়া?
নির্দ্বিধায় উত্তর করলো রাহাত…
—” আপনার স্বামী!
মায়া খানিকটা চমকালো ভড়কালো। হকচকিয়ে তাকিয়ে বললো…
—” আমার স্বামী কে?
রাহত কিছু বলার আগে এগিয়ে আসলো নাদিম। রাহাতে কাঁধে একহাতে চাপড় মেরে বললো…
—” কে আবার ভাই।
—” তাহলে আপনার ভাই কে?
—” আপনার শশুরের ছেলে।
—” মানে! আমার শশুর কে?
—” ভাইয়ের আব্বা।
থমথমে খেয়ে যায় মায়া।৷ চোখ পিটপিট করে তাকায় নাদিমের মুখশ্রীতে। নাদিম বিন্দাস নির্বাক বংগিতে দাঁড়িয়ে আছে রাহাতের কাঁধ চেপে অবুঝ শিশুর ন্যায়। যেন এই মূহুর্তে নাদিম বুঝদার বাক্য কিছুই বুঝে না। এতটা অবুঝ শিশু। মায়া বুঝল না নাদিমের গোলকধাঁধা বিষয়টি। তবে নাদিমের প্রত্যেকটা কথায় যে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে জিলাপি প্যাঁচ লাগাচ্ছে সেটা ঠিক বুঝতে পারলো ছায়া। মায়াকে সিনিয়র গ্যাংদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছায়া টিয়াকে নিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে আসে এখানটায়। ছায়া দূর থেকে ভাবলো “এই বুঝি মায়া সিনিয়রদের হাতে রেগিং এর স্বীকার হলো। কিন্তু কাছে আসতে আসতে বুঝলো নাদিমের খিয়ালিপণা। সেই সাথে কর্ণকুহল হলো নাদিমের খাপছাড়া কথা গুলো। মায়া উত্তর করার আগে ফুড়ুৎ কাটলো ছায়া। এগিয়ে আসতে আসতে নাদিমকে প্রশ্ন করে বললো…
—” তাহলে আপনার এই ভাইটা কে??
হঠাৎ বাক্য ঘাড় বাঁকা করে তাকায় চার সদস্যের চারজন সিনিয়র ভাই। বাকি তিনজনের দৃষ্টি ছায়ার দিকে কপাল কুঁচকে থাকলেও নুহাশ সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃষ্টি ফিরে নিয়ে নিজের ফোনে পুনরায় স্থির করলো। বিরক্তিতে টাইপ করতে লাগলো ব্যস্ত হাতে। আপাতত তার এখনটায় সুরগোলের কোনো ধ্যান ধারণা নেই। রাহাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছায়াকে পরখ করে নিল। রাফি বেশ সয়েরয়ে মজা করে দাঁড়িয়ে আছে। নাদিম এতক্ষণ মায়াকে যে ইজ্জত দিচ্ছিল সেটা মূহুর্তেই কমে আসলো ছায়াকে দেখে। মনে মনে আওড়ালো “মায়া বিষয়ে নাহয় উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু ছায়া টিয়ার ক্ষেত্রে তো সেটা নেই। তাই বিন্দাস কিছু মজা তো নেওয়ায় যায় নাবালিকা শিশুদের। নাদিমের মুখের ভাব কৃত্রিম পরিবর্তন ঘটলো। চোখে মুখে উপচে উললো দুষ্টমীর রেশ। পুনরায় একি বংগিতে রাহাতে কাঁধে হাত রেখে অবুঝ শিশু ন্যায় উত্তর বসালো…
—” কেন ভাবির স্বামী।
ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গে ছায়ার। কটমট দৃষ্টিতে তাকালো নাদিমের দিকে। অপদস্তক চোখ বুলিয়ে নিল চারজনের দিকে। নুহাশকে এইদিকটায় মনোযোগী না দেখে তাকালো বাকি চারজনের দিকে। রাহাতের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দেখে শুকনো ঢুক গিললো নিজের মানে। রাহাত এই কলেজ ভিপিদের মধ্যে একজন। দিন ধাহারে মারপিট, জুনিয়রদের রেগিং করা রোজকার কাজ রাহাতের। এই গ্যাংটিও রাহাতেরই। তাই জুনিয়র হয়ে তাদের সাথে তর্ক করা নিত্যয় বোকামি ছাড়া অন্য কিছু নয়। ছায়া নিজের রাগ সংযম করে। জোর পূবক হাসিটানে নিজের মুখশ্রীতে। অন্তত বিনিময় সুরে বলে নাদিমকে…
—” খেয়ালি করছেন ভাইয়া? সিনিয়র বলে আমাদের মজা নিচ্ছেন ভাইয়া?
নাদিম ভ্রুঁ কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ছায়ার মুখশ্রীতে। সিরিয়াস হওয়ার ভাব করে বলে উঠে…
—” তুমি কি আমার বউ লাগ? না গার্লফ্রন্ড লাগ? যে তোমার সাথে মজা করবো আমি। যাহ সত্যি তাই বলছি। জুনিয়র হয়ে কি তুমি আমার কথা অবিশ্বাস করছো? তারমানে তুমি আমার কথা বিশ্বাস না করে অপমান করছো তাই না?
নাদিমের খাপছাড়া কথায় মূহুর্তেই জোর তালে সঙ্গ দেয় রাফি। অগণিত মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলে উঠে….
—” হ! হ! দোস্ত তোরে অপমান করছে। আমি শুনছি! হেতি তোর কথা বিশ্বাস করে নাই। ছোট ছোট অপমান করছে তোরে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করছি তোর কথা। যে ভাবির স্বামী ভাই হয়।
রাফি কথায় যেন ঘোর আহত হলো রাফি। রয়েসয়ে ভারি ব্রজন কষ্ট টানল মুখে। যেন এই মূহুর্তে ছায়া তাকে ঘোর অপমান করেছে বিশ্বাস না করে। সেই অপমানে অপমানিত হয়ে কষ্টে রোষপূণ গলায় বললো রাহাতকে….
—” দোস্ত দেখছোস কি ক? আমারে তোর সামনে ছোট ছোট অপমান করছে। বিশ্বাস না করলে রাফি স্বাক্ষী আছে। আমি স্বাক্ষী প্রমাণ নিয়ে রাখছি। তারপরও তুই বিচার কর। নয়তো আমি জুনিয়রের অপমানিত জালায় মুখ দেখাইতে পারুম না কলেজে কাউকে। তুই কিছু কর ভাই।
নাদিম, রাফির নাটকিয় কথায় থমথমে খেয়ে যায় মায়া,ছায়া, টিয়া। মায়া এতক্ষণ ছায়ার আসাতে যে সাহসটুকু পাচ্ছিল। সেটা মূহুর্তেই চুপসে যায় নাদিমের নালিশ করাতে। নাদিম সহজ কথাটাকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথার জালে ফাঁসিয়ে দিয়েছে ছায়াকে। সেটা ঠিক বুঝল ছায়া। কিন্তু সিনিয়র ভাইয়াদের সাথে গলাবাজি করলো না। বরং হাসার চেষ্টা করলো। নাদিমের কথার তলে দমে না গিয়ে বুদ্ধি খাটালো জোর তালে।
—” আচ্ছা সরি ভাইয়া। ইট’স মাই মিস্টেক। আমি ঠিক করে বুঝিয়ে বলতে পারিনি আপানদের। আপনি আমার কথায় অপমানিত হবেন না প্লিজ। ক্ষমা করবেন আমাকে। আসলে আমরা জানতে চাইছিলাম মায়া স্বামী কে?
ছায়ার কথায় নরম হয়ে আসার ভাব টানলো মুখে নাদিম। ভাব নিয়ে বললো…
—” আচ্ছা যাও যাও মাপ করলাম তোমাকে। তুমি কি মনে রাখবা নাদিম কি ডিলদার মানুষ ছিল। সিনিয়রকে অপমান করার পরও ক্ষমা পেয়ে গেলা।
দারুণ হাসলো ছায়া। কৃতজ্ঞতা স্বরুপ বলে উঠলো নাদিমকে…
—” আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন এটাই আমার বড় কাপালের ভাগ্য। সত্যি ভাইয়া আপনার মতো আজকাল ডিলদার মানুষ পাওয়ায় যায় না। দুনিয়া থেকে একেবারেই বিলুপ্ত। আপনি দয়ালু ব্যক্তি ডিলদার মানুষ। আমি কৃতজ্ঞ আপনার ক্ষমা পেয়ে। ভাইয়া আপনি যদি একটু কষ্ট করে বলতেন আপনার “ভাই নামক মানুষটি সম্পর্কে তাহলে আমাদের ছোট ছোট মনে কৌতূহলটা দমে যেতে আরকি।
জহুরি চোখে তাকাল রাহাত। মেয়েটিকে নাদিমের প্রশংসা করলো নাকি পুনরায় ভদ্র ভাষায় অপমান করলো বুঝা দায়। কিন্তু নাদিম ছায়ার ভারি প্রশংসা পেয়ে পঞ্চমূখ। খুশিতে আটখানা ভাব টানলো মুখে। তাই খুশিতে গদগদ হওয়ার ভাব করে বললো…
—” ধন্যবাদ ধন্যবাদ। জুনিয়র হয়ে সিনিয়রের এতটা সম্মান দেখানো কলিজায় লাগলো মুরে। তবে ভাইয়ের সম্পর্কে ভাবি বলতে পারবে ভালো। তাই না ভাবি?
থমথমে খেয়ে অসহায় দৃষ্টিতে চোখে মেলে তাকালো মায়া ছায়ার দিকে। সাথে সাথে দু’জনের চোখাচোখি হয় ছায়ার সাথে। ছায়া কিছু বলবে তার পূর্বে মুখ খুলে মায়া ধীর কন্ঠে বললো….
—” কিন্তু আমি আপনার ভাইকে চিনিনা তো ভাই?
পাশ থেকে আহাজারি করে উঠলো রাফি….
—” নাউজুবিল্লাহ! নাউজুবিল্লাহ! এমন কথা স্বামী সম্পর্কে বলতে নেই ভাবি। ভাই শুনলে রাগ করব।
রাফির আহাজারিতে চটাং করে ফুড়ুৎ কাটলো টিয়া। এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও অবশেষে মুখ খুললো সেও। উত্তেজনা করে বসলো নতুন প্রশ্ন….
—” তাহলে আপনার ভাই থাকেন কই?
নাদিম চোখ ঘুরিয়ে জহুরি দৃষ্টিতে তাকায় টিয়ার মুখপানে। পুনরায় একিই বংগিতে বলে উঠলো….
—” কেন বাড়িতে থাকেন!
—” না মানে কোথায় থেকে আসেন আপনার ভাই?
—” বাড়ি থেকে আসে!
থমথমে গেল টিয়াও। অধৈর্য হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললো টিয়া…
—” মজা নিচ্ছেন কেন ভাইয়া?
কপাল কুঁচকে বললো নাদিম…
—” আমি কোথায় মজা নিলাম? তুমি ঠিকঠাক প্রশ্ন করতে পারো না তাতেও আমার দোষ?
হতবাক হলো টিয়া। সে কিছু বলবে তার আগেই ফুড়ুৎ কাটলো ছায়া। বিনিত সুরে বললো…
—” সরি ভাইয়া টিয়ার ভুলবাল প্রশ্নের জন্য। বরং আমি সুন্দর করে আপনাকে প্রশ্ন গুলো করি কেমন? আসলে ভাইয়া আপনার ভাইয়ের নাম, বাবার নাম কি? উনার বাড়ি কোথায়?
নাদিম গুরুগম্ভীর হওয়া চেষ্টা করলো ছায়ার সামনে। রাহাতের কাঁধ হতে নিজের হাতটা নামিয়ে সটান হয়ে দাড়ালো। গম্ভীর মুখে বললো….
—” ভাইয়ের নাম pn। ভাইয়ের বাবার নাম “আব্বা। ভাইয়ার বাড়ি হলো, যেখানে ভাই থাকে সেখানেই। আরকিছু বালিকা?
মূহুর্তেই রাগে ভিতর রি রি করে উঠলো ছায়া টিয়া। এতক্ষণ যাবত এতটা কসরত করেও বিন্দু মাত্র তথ্য বের করতে পারেনি ভাই নামক মানুষটির। উল্টো তাদেকে নিজেদের কথার জালে ফাঁসিয়ে অপদস্তক করলো। মজা নিল। অধৈর্য্যের সয়ে রয়ে গেল ছায়ার। রাগে হাসির চেষ্টা করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো…
—” না ভাইয়া থাক। অনেক উপকার করছেন আপনি আমাদের। এতটা উপকার না করলেও পারতেন আপনি। লাস্ট একটা উপকার বাকি আছে আপনার ভাইয়া। করবেন সেটা।
—” অবশ্যই বালিকা তোমার জন্য এই মূহুর্তে সব করতে পারুম। বলে ফেলো।
—” আহ! আমাকে ধন্য করলেন আপনি ভাইয়া। আমি অনেকটা কৃতজ্ঞ আপনার প্রতি। আপনার এই ঋণ কখনোই শোধবোধ করা নয় ভাইয়া।
—” যাহ পাগলি! ঋণ শোধবোধ করার কি আছে। আমরা আমরাই তো।
থমথমে খেয়ে গেলো নাদিমের নাটকিয় কথায়। প্রশ্রয় দিলনা নাদিমকে। প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে বললো…
—” pn মানে কি ভাইয়া?
নাদিম ঠোঁট উল্টিয়ে সঙ্গে সঙ্গে বলে…
—” pata nahi(pn)
চুপ করে গেল ছায়া পুনরায় প্রশ্ন করার জো হলো না। কিন্তু অবশেষে বিরক্তির মুখ খুললো নুহাশ। চেতন কন্ঠে বললো…
—” শালারা ভাবিরে আটকায় রাইখা গল্প করস। ভাই এইডা শুনলে তোদের উথার মুখ বুতা বানায় দিব। তাড়াতাড়ি যেতে দে ভাবিরে। নয়তো যে কোনো সময় তান্ডব হইতে পারে তগো জন্য। ভাবি ক্লাসে যান আপনি। বেয়াদবটির কথা গুলো শুইনেন না।
নুহাশের সর্তক বার্তায় চুপ করে যা উপস্থিত সবাই। রাহাত সচকিত হয়ে গুমোট কন্ঠে বললো…
—” ভাবি যান আপনি। কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানিয়েন কেমন।
চুপ থেকে নিরবে সম্মতি জানালো মায়া। রাহাতের কথায় ছায়ার হাত ধরে সেখান প্রস্হার করলো সাথে সাথেই। কিন্তু পিছন থেকে শুনা গেল নাদিম রাফির স্বশব্দের হাসি আওয়াজ।
২ঃ০৬ মিনিট। ফুটপাতে রাস্তা ধরে হেলেদুলে হাঁটছে মায়া। তার সঙ্গ দিচ্ছে ছায়া টিয়া। সাদা এপ্রোনের সাথে কলেজ ব্যাগ পিছনে ঝুলানো। কলেজ হতে খান বাড়ির অনেকটা দূরে। রিক্সা করে গেল প্রায় মিনিটের রাস্তা হবে। সেখানে হেঁটে গেলে চল্লিশ মিনিট লাগবে। মায়া ডাইভার রহিমের চোখ পাকি দিয়ে চুপিচুপি বের হয়ে এসেছে ছায়া টিয়া সাথে কলেজ থেকে। মায়ার কলেজটিতে ইন্টার থেকে শুরু করে অনার্স মাস্টার সবই আছে। বিশাল বড় এরিয়া নিয়ে বানানো মায়ার নতুন কলেজটি। একেকটি ভবনে এককটি বিভাগ। নিজের ভবনের পিছনের গেইট ধরে বের হয়ে আসে মায়া বান্ধবীদের সাথে। মায়ার নতুন করে ফ্রেন্ড নেই এই কলেজে। কেউ হতে চাই না মায়ার ফ্রেন্ড। কেন হতে চাই না সেটা তাঁরা জানে। সেটা আপাতত মায়া জানে না। মায়ার স্কুল ফ্রেন্ড দুজন। তিনজন একত্রে বাংলা মিডিয়াম থেকে পাস করে একিই কলেজে ভর্তি হয়েছে। একিই গ্রুপে। তাই বন্ধুত্বের গভীরতাটা একটু বেশিই মায়া, ছায়া, টিয়ার ভিতর। ছায়ার ছোট হলেও বুঝদার চলাফেরা করে। টিয়া খানিকটা চঞ্চল টাইপের মেয়ে। মায়া বোকাসোকা চলন টাইপ মেয়ে। সবমিলিয়ে দৃঢ় সংকল্প তিনজনের মাঝে। তবে এই মূহুর্তে তিনজন যে চুপচাপ হাঁটছে রাস্তা দিয়ে সেটাও নয়। ননস্টপ বকবক করে যাচ্ছে মায়া আর টিয়া। ছায়া থেকে থেকে হাসছে ওদের কথায়। তিনজনে হাতেই আইসক্রিম কোণ ধরা। মায়া মুক্ত স্বাধীন ভাবে হাঁটতে উচ্ছ্বাস যে ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে পড়ছে মুখশ্রী থেকে। পাশ দিয়ে কর্ড়া হণের শব্দ করে সাঁই সাঁই করে যাচ্ছে গাড়িঘোড়া। থেকে থেকে অটোরিকশা টিং টিং শব্দ করে যাচ্ছে ব্যস্ত যান্ত্রিকে। মায়া ধ্যান নেই তাতে। নিজের মতো করে বারবার আইসক্রিম তুলছে মুখে। টিয়ার সাথে সাথে কথা বলতে বলতে দৃষ্টি যায় দূর রাস্তা কালো গাড়ির দিকে। পা দুটো ধীরে ধীরে স্থির হয়ে আসে জায়গায়। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় সেদিকে। চেনার চেষ্টা করে মায়া যাকে দেখছে আসলে সেই ব্যক্তিটি কিনা। দূর থেকে চেহারাটা অস্পষ্ট হলেও শরীরের গঠন বলছে মায়ার ধারণায় ঠিক। এই সেই ব্যক্তিই। মায়া সন্দেহের বশে আরও ক্ষীণ দৃষ্টি মেলে তাকালো ব্যক্তিটির চারপাশ। একটা খোলা কফি শপের সামনে গাড়িটি থামানো। সেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে বডিগার্ড নামক কালো দেহির কঠিনত্বের চেহারার মানুষ গুলো বন্দুক হাতে। কালো গাড়ির সাথে, কালো পোশাকদারি, কালো মানুষ গুলো, কালো বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মূহুর্তেই মায়ার চোখ চকচক ফকফক করে উঠে। বিগত একমাস পর অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির দেখা পাওয়ার আশায় আনন্দিত হলো মায়ার কোমল ছোট বক্ষস্থল। আনন্দের উত্তেজনার সাথে সাথে লাফিয়ে উঠলো রাস্তায় কোনো দিক বিবেচনা না করে তারুণ্যে বলে উঠলো ছায়া টিয়াকে ” তোরা দুই মিনিট দাঁড়া! আমি পাঁচ মিনিটে আসছি কেমন।
কথা গুলো শেষ করে আর দাঁড়ালো না মায়া। দৌড়ে ছুটে গেল রাস্তার ঔপাশে। মায়ার হঠাৎ এমন কান্ডে চমকালো ভড়কালো ছায়া টিয়া। হকচকিয়ে পিছনে থেকে অনবরত ডেকে সাবধানে করলো ” মায়ু কই যাস তুই? এই ভাবে মধ্যে রাস্তা ধরে দৌড়স না এক্সিডেন করবি তুই।
মায়া না সেই কথা। দৌড়ালো নিজ গতিতে। আজ একমাস পর অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির দেখা পাবে সে। আর সেটা এমনি এমনি ছেড়ে দিবে সে না দেখা করে? কক্ষনোই না। মায়ার দৌঁড়ানোতে ব্যাঘাত ঘটে সাঁই সাঁই করে গাড়িঘোড়ার জন্য। রাস্তা পার হতে বাধ্য সাধলো তাতে। তারপরও কোনো রকম হুঁচট খেয়ে দেয়ে পার হলো রাস্তা। দৌড়ে গিয়ে হাজির হলো সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সামনে। মায়ার হাঁপানো দাপটা ক্ষীণ চলমান রেখে তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো সামনে ঘুরে থাকা ব্যক্তিটিকে।
—” আপনি এসেছেন? আমি আপানাকে অনেকটা মিস করেছি।
মায়ার সহজ সরল স্বীকারোক্তি চমকিয়ে উঠলো সামনে থাকা মানুষটি। দ্রুত পিছন ঘুরে মায়াকে দেখে ভড়কালো ভিষণ ভাবে। আতংকিত চোখে মূহুর্তেই পাশের টেবিলে চোখ বুলিয়ে নিল কাউকে। শুকনো ঢুক গিললো নিজের মাঝে। ভয়ে উত্তেজিত হয়ে রোষপূর্ণ গলায় বললো…
—” আস্তাগফিরুল্লাহ! কি কন এই গুলা ভাবি? মারাবেন নাকি আমারে। মিস করাটা কি খুব জরুরি ছিল আমারে ভাবি? না মানে আমার মনে হয় আপনার মিস করাটা ভুল করে রং নাম্বারে আমাকপ লেগে গেছে তাই না ভাবি?
মায়া তুমুল গতিতে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে না বুঝালো। অথাৎ সে ঠিক নাম্বারেই লাগিয়েছে। আসিফ মায়ার মাথা নাড়ানো দেখে পুনরায় পাশে টেবিলে থাকালো ভয়াৎ দৃষ্টিতে। পরপর কয়েক বার নিজের মাঝে শুকনো ঢুক গিলে বিরবির করে বলে উঠে ” ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’….
চলিত….
Share On:
TAGS: দেওয়ানা আমার ভালোবাসা সিজন ২, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৩
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ১৯
-
দেওয়ানা (আমার ভালোবাসা)সিজন ২ পর্ব ২৮