দিশেহারা (৬৯)
সানা_শেখ
দেরি না করে আবার দৌড়ে এলো নিজের গাড়ির কাছে। দ্রুত উঠে বসে স্টার্ট দিয়ে ছুটল মাইক্রোবাসের পেছন পেছন। মাইক্রোবাসটা দৃষ্টির আড়ালে চলে গেছে ইতি মধ্যেই।
কারা ওরা? তার সোহাকে কেন ধরে নিয়ে গেল? তার বউ বাচ্চার কিছু হলে সে শেষ, সে কোনোভাবেই নিজেকে সামলে রাখতে পারবে না।
দিশেহারা হয়ে কতক্ষন—কতটা পথ চলে এলো শ্রবণ জানে না। গাড়ি থামাল রাস্তার মাঝখানে। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাল। কোথায় চলে এলো? আশপাশ একদম নির্জন শুনশান। তার গাড়ির হেডলাইটের আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই। ভুল রাস্তায় চলে এলো? সোহাকে কোনদিকে নিয়ে গেছে?
উদভ্রান্তের ন্যায় গাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। গলা ফাটিয়ে সোহার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে মাঝ রাস্তায় বসে পড়ল হাঁটু মুড়ে। তার সোহাকে কেন ধরে নিয়ে গেল? কোথায় নিয়ে গেল? সোহা নিশ্চই অনেক ভয় পাচ্ছে। বাবুর যদি কিছু হয়ে যায়!
শ্রবণের মনে হচ্ছে তার পুরো দুনিয়াই কেউ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। হ্যাঁ, পুরো দুনিয়াই তো। তার বউ-বাচ্চাই তো তার পুরো দুনিয়া।
আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,
“আল্লাহ, তুমি কেন বারবার আমার সঙ্গে এমন করো? কেন আমার জীবন থেকে সবাইকে কেড়ে নাও? এভাবে বারবার আমাকে নিঃস্ব না করে, আমাকে নিয়ে গেলেই তো পারো। ও আল্লাহ, আল্লাহ, আমার সোহাকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে দাও আমার কাছে। পুরো দুনিয়া না জানুক, তুমি তো জানো ও আমার কাছে কি। কোথায় গেলে আমার সোহাকে সুস্থভাবে পাবো দিশা দেখাও আমাকে। আল্লাহ, তুমি ছাড়া আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই এই দুনিয়ায়। আল্লাহ, দয়া করো আমার উপর। হে আল্লাহ, সাহায্য করো আমাকে। আমার সোহাকে সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে দাও আমার কাছে।”
নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইল অন্ধকার আকাশের দিকে। টিপটিপ করে অসংখ্য তারা জ্বলছে।
তাড়াহুড়ো করে রাস্তা থেকে উঠে গাড়ির ভেতর থেকে নিজের ফোন বের করে হাসানের ফোনে কল করল। এই মুহূর্তে হাসান ছাড়া আর কারো কথা স্মরণ হচ্ছে না যে তাকে সাহায্য করতে পারবে।
কল রিসিভ হতেই হাসানের নাম ধরে ডেকে কেঁদে উঠল শ্রবণ। ওপাশ থেকে ভেসে এলো হাসানের উদ্বিগ্ন গলার স্বর।
“শ্রবণ, কী হয়েছে? কাঁদছিস কেন, ভাই?”
“হাসান, কারা যেন আমার সোহাকে ধরে নিয়ে চলে গেছে।”
“কী বলছিস এসব? কোথা থেকে ধরে নিয়ে গেছে? কখন নিল? তুই কোথায়?”
শ্রবণ খুলে বলল সবকিছু। হাসান আরো বেশি অস্থির হয়ে উঠল বন্ধুর কথা শুনে।
“তুই এখন কোথায়?”
“জানিনা। চিনতে পারছি না এটা কোন জায়গা।”
“ভাই, ওখান থেকে চলে আয়। ওরা তোরও কোনো ক্ষতি করে ফেলতে পারে। তুই ওখান থেকে চলে আয়, আমরা পুলিশের সাহায্য নিয়ে ভাবিকে খুঁজে বের করব।”
“আমি আমার সোহাকে ছাড়া কোথাও যাব না।”
“ভাই, তুই ওখানে থাকলে কী তোর সোহাকে পাবি? উল্টো তোর যদি কোনো ক্ষতি হয়? তখন কী হবে? তুই ওখান থেকে তোর ফ্ল্যাটের সামনে আয়, আমি আসছি তোর কাছে।”
শ্রবণ কল কে’টে গাড়িতে উঠে বসল। স্টার্ট দেওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল অপরিচিত নাম্বার। রিসিভ না করে গাড়ি স্টার্ট দিলো দ্রুত। রিং বাজতে বাজতে কল কেটে গেল একবার, দ্বিতীয়বার রিং বেজে উঠতেই রিসিভ করে কানে ধরল। শ্রবণ কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো ভারী গম্ভীর পুরুষালি গলার স্বর।
“মিস্টার শ্রবণ চৌধুরী, বউকে খুঁজছেন?”
কথাগুলো শুনে দ্রুত গাড়ি দাঁড় করাল রাস্তার পাশে। উত্তেজিত হয়ে বলল,
“এই, কে আপনি? আমার সোহা কোথায়?”
“আপনার প্রাণপাখি আমাদের কাছে।”
“এই কু/ত্তার বাচ্চা, কে তোরা? সোহাকে কেন ধরে নিয়ে গেছিস? আমার বউ-বাচ্চার কিছু হলে একটাও প্রাণে বাঁচবি না।”
“কুল কুল, মিস্টার চৌধুরী। এত উত্তেজিত হলে চলে? আপনার বউ-বাচ্চার কিচ্ছু হবে না, শুধু আমাদের কথা শুনলেই হবে।”
“কী কথা?”
“একশ কোটি। আপনি আমাদের একশ কোটি টাকা দিবেন, বিনিময়ে আপনার বউকে সুস্থ অবস্থায় ফিরে পাবেন। নতুবা বউ-বাচ্চার ডেট বডি দেখার জন্য প্রস্তুত হন।”
“একশ কোটি! আমি এখন একশ কোটি কোথায় পাব?”
“আপনার কাছে একশ কোটি টাকা কিছুই না সেটা আমরা জানি।”
“এই মুহূর্তে এত টাকা কোথায় পাব আমি? এখন ব্যাংক বন্ধ।”
“এখনই না তো। আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে একশ কোটি টাকা আমাদের দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে দিলে বউকে একদম ঠিকঠাকভাবে পেয়ে যাবেন। আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টা আপনার বউ আমাদের কাছে যত্নে থাকবে, যথা সময়ে টাকা না পেলে যত্নের সঙ্গে তার গলা কে’টে দিবো আমরা। ভুলেও পুলিশ বা অন্য কাউকে জানানোর দুঃসাহস দেখাবেন না, আপনার উপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর আছে আমাদের। আপনার বন্ধুমহল আর ফ্যামিলি, তাদের উপরেও আমাদের নজর আছে। বউ বাচ্চার ভালো চাইলে কোনো রকম চালাকি করার চেষ্টা করবেন না। আগামী চল্লিশ ঘণ্টা পর আমি আবার কল করে ঠিকানা দিবো টাকা পৌঁছে দেওয়ার জন্য।”
“ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দিন, সকালে ব্যাংক খোলার সঙ্গে সঙ্গে টাকা পৌঁছে যাবে।”
“পাগল মনে হয় আমাদের? নাকি আমরা ঘাস খাই? কোনো অ্যাকাউন্টে ফ্যাকাউন্টে টাকা আসবে না। ক্যাশ দিবেন পুরোটা।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমি সোহার সঙ্গে কথা বলব।”
“একেবারে আটচল্লিশ ঘণ্টা পর কথা বলবেন।”
“আমি কীভাবে বিশ্বাস করব যে সোহা আপনাদের কাছেই আছে?”
“ওয়েট, আপনার প্রাণপাখির সঙ্গে কথা বলিয়ে দিচ্ছি।”
ত্রিশ সেকেন্ডের মতো সময় অতিবাহিত হলো তারপর ভেসে এলো সোহার গলার স্বর।
“হ্যালো, বাবুর আব্বু?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। সোহা, কোথায় তুই?”
“জানিনা আমি। আমার ভীষণ ভয় লাগছে?”
জড়ানো গলায় অস্পষ্ট স্বরে কথাগুলো বলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠল সোহা। সোহার কান্না তীরের ফলার মতো শ্রবণের বুকে বিঁধছে। তাড়াহুড়ো করে বলল,
“সোহা, ভয় পাস না, কাঁদিস না। তোকে খুব শীগ্রই নিয়ে আসবো আমি।”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই পুরুষালি গম্ভীর ভারী গলার আওয়াজ।
“মিস্টার চৌধুরী, আপনি তাহলে টাকার ব্যবস্থা করতে থাকুন, আমরা বিশ্রাম নিই। ভুলেও কিডন্যাপিং-এর কথা কাউকে বলার চেষ্টা করবেন না, হিতে বিপরীত হবে।”
কল কে’টে গেল। শ্রবণ ফোন আনলক করে কল করল সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু নাম্বার বন্ধ বলছে। বেশ কয়েকবার চেষ্টা করার পরও কল ঢুকল না। ফোনের স্ক্রিনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে স্টিয়ারিং-এর সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে বসে রইল চুপচাপ। নীরবে দু-চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে ঝরঝর করে। আজ কেন বের হলো ফ্ল্যাট থেকে? বের না হলে তো এমন কিছু ঘটতো না। সোহা যা ভীতু মেয়ে, নিশ্চই অনেক ভয় পাচ্ছে। তার সন্তান? ডেলিভারির আর কিছুদিন বাকি। শ্রবণের দিন দুনিয়া কেমন ওলট পালট হয়ে যাচ্ছে। এত বিপদ কেন শুধু তার জীবনেই আসে? কেন শুধু সে-ই সব কিছু হারাবে? আল্লাহ কেন তার জীবনেই এত কষ্ট দেন?
শ্রবণের গাড়ি এসে দাঁড়াল ভবনের পার্কিং-এ। হাসানকে দেখে এসেছে বাইরে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার অপেক্ষায়। ফ্ল্যাটের কাছাকাছি আসতেই শ্রবণের ফোনে কল এসেছিল সেই নাম্বার থেকে। তাকে সাবধান করে দেওয়া হয়েছে যেন হাসানকে কিছু না বলে। লোকগুলো জানে হাসান ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মানে সত্যি সত্যিই নজর রাখা হচ্ছে তাদের উপর।
শ্রবণ গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতেই হাসান এসে দাঁড়াল তার সামনে। শ্রবণের হাত ধরে বলল,
“চল দ্রুত থানায় যাই।”
শ্রবণ হাসানের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। বেজমেন্ট থেকে বের হতে হতে বলল,
“কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই, তুই তোর বাড়িতে ফিরে যা।”
হাসান বিস্মিত হয়ে বলল,
“শ্রবণ, কী বলছিস এসব? তুই না বললি ভাবিকে কারা তুলে নিয়ে গেছে।”
শ্রবণ পিছু ফিরে করুণ চোখে তাকাল হাসানের মুখের দিকে। শ্রবণের চাহনি দেখে হাসান ছুটে এসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“ভাই, কী হয়েছে?”
শ্রবণ হাসানের ঘাড়ে মুখ গুঁজে রেখে জড়ানো অথচ মৃদু স্বরে তাড়াহুড়ো করে বলল,
“আমি কাউকে কিছু বললে ওরা আমার সোহাকে মে’রে ফেলবে। ওরা নজর রাখছে আমাদের উপর। তুই এখানে এসেছিস এটা ওরা জেনে গেছে। মুক্তিপণ দিলে ওরা সোহাকে ছেড়ে দিবে। তুই কোনো টেনশন করিস না, বাড়িতে ফিরে যা। প্রয়োজন হলে আমি নিজে থেকেই যোগাযোগ করব তোর সঙ্গে, তুই নিজে থেকে আর আসিস না আমার কাছে। আমি চাই না আমার জন্য তোর কিছু হোক। চলে যা বাড়িতে।”
হাসানকে ছেড়ে দিয়ে তাড়াহুড়ো করে চলে গেল শ্রবণ। হাসান পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন, তারপর নিজেও বের হয়ে চলে গেল।
শ্রবণ ফ্ল্যাটে প্রবেশ করল চোখের পানি মুছতে মুছতে। বের হওয়ার সময় দুজন বের হয়েছিল, ফিরল একা। কোথায় আছে তার সোহা? বেডরুমে এসে ফ্লোরে বসে পড়ল ধপ করে। খাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে তাকাল উপরের দিকে। একশ কোটি টাকা চলে যাবে সেটা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই, কষ্ট তো হচ্ছে সোহা আর বাবুর জন্য। রাতে শোয়ার পর বাবু উপরের দিকে উঠে যায়। সোহা ঠিক মতো ঘুমোতে পারে না, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ঘুম থেকে উঠে বসে থাকে, কখনো কখনো কেঁদে ফেলে।
আজকে সোহা কোথায় ঘুমাবে? লোকগুলো সোহাকে বিছানা দিবে ঘুমোনোর জন্য? মাঝরাতে যখন সোহার খিদে পাবে, তখন কী তাকে খেতে দিবে? রাতের খাবার খেতে দিয়েছে? সোহা তো খারাপ লোকদের হাতে রয়েছে, সোহার সঙ্গে যদি উল্টাপাল্টা কিছু করে?
শ্রবণের মনে হচ্ছে কেউ যেন তার বুকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে হৃৎপিণ্ড টেনে ছিঁড়ে বের করছে। বুকের বাম পাশে ডান হাতটা চেপে ধরল। সোজা হয়ে বসে জোরে জোরে শ্বাস নিতে শুরু করল।
সোহাকে চোখ বেঁধে কোথায় যেন নিয়ে আসা হলো। একটা রুমের ভেতর এনে হাতের বাধন আর চোখের পট্টি খুলে দিলো একজন।
সোহা প্রথমে দুই হাতে চোখ কচলে নিল। চোখে অন্ধকার অন্ধকার দেখছে। রুমে সাদা আলোর ছোটো একটা লাইট জ্বলছে, আলো খুবই কম। ভ্যাপসা গন্ধ, ভীষণ গরম লাগছে। ব্যাক পেইন হচ্ছে অনেক, ঘাড় ব্যথা করছে। পা দুটো ভারী লাগছে।
শ্রবণ কেমন আছে? কেমন করছে এখন? পাগলের মতো অবস্থা হয়েছে বোধহয়। অতিরিক্ত টেনশনে প্যানিক করে শ্রবণের যদি কিছু হয়ে যায়? যদি আবার স্ট্রোক হয়? আবার স্ট্রোক হলে শ্রবণকে আর বাঁচানো যাবে না। সে কী শ্রবণের কাছে ফিরে যেতে পারবে? কেন বের হলো গাড়ি থেকে? ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল আবার। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়ল ময়লা জমে থাকা ফ্লোরে।
সোহার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের মধ্য থেকে একজন বলল,
“মাইয়াডা কিন্তু বহুত সুন্দর আছে। গাল দুইটা দেখ কত সুন্দর!”
লোকটার কথা শুনে তড়িৎ গতিতে মুখ তুলে তাকাল সোহা। ভয়ে আতঙ্কে গুটিয়ে গেল। দুজনেই দাঁত বের করে শয়’তা’নের মতো হাসছে।
চলবে………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৯
-
দিশেহারা পর্ব ৩২
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ৬৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩৭
-
দিশেহারা পর্ব ৩৯
-
দিশেহারা পর্ব ১৫