দিশেহারা (০৪)
সানা_শেখ
“ভাইয়ার হঠাৎ কী হলো?”
সোহা শ্রবণের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আনমনে বলে,
“ভাইয়া পাগল হয়ে গেছে।”
“কী বলছিস এসব? ভাইয়া পাগল হবে কেন?”
“পাগল না হলে কোনো কারণ ছাড়া গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেললো কেন?”
“কিছু হয়েছে বোধহয়। তুই রুমে যা আমি দেখে আসছি।”
সোহা স্পর্শর পথ আগলে দাঁড়িয়ে তাড়াহুড়ো করে বলে,
“ভাইয়ার কাছে যেও না, এখন রেগে আছে মা’র’বে তোমাকে।”
স্পর্শ কপাল ভ্রু কুঁচকে বলে,
“মা’র’বে কেন? তুই ওপরে যা আমি দেখছি কি হয়েছে।”
স্পর্শ সোহার কোনো কথা না শুনে বাইরের দিকে এগিয়ে যায় দ্রুত পায়ে। সোহা পেছন থেকে কয়েকবার ডাক দেয়। স্পর্শ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে যেতেই সোহা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। চিন্তা হচ্ছে স্পর্শর জন্য। ও তো জানে শ্রবণ কতটা ভয়ংকর মানুষ। রাগ উঠলে হুশে থাকে না। সেদিন তো রাগের মাথায় ওকে মে’রে’ই ফেলছিল। আজকে স্পর্শকে কিছু না করলেই হয়।
স্পর্শ বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসলেও শ্রবণকে দেখতে পায় না। গার্ডকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।
ওর ভাই হঠাৎ এত রেগে গেলো কেন?
সকাল হতেই বাড়িতে মানুষজনে ভর্তি হতে শুরু করে। সবাইকে শুক্রবার আর শনিবারের দাওয়াত দেওয়া হয়েছে।
সকালেই বাড়ি সাজানো হয়েছে। গত কালকেও এই বাড়িকে বিয়ে বাড়ি বলে মনে হচ্ছিল না। কিন্তু আজকে বিয়ে বাড়ি বলে মনে হচ্ছে।
বিয়ে হবে কমিউনিটি সেন্টারে। শহরের সবচেয়ে বড় কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের জন্য বুকিং দেয়া হয়েছে।
গত কাল রাত থেকে শ্রবণ একজন শান্ত হয়ে আছে। কোনো রাগারাগি করেনি কারো সাথে। যে যা জিজ্ঞেস করছে সুন্দরভাবে উত্তর দিচ্ছে। ঠোঁটে হাসি না থাকলেও চেহারায় রাগী রাগী গম্ভীর ভাবটা নেই।
গত রাত থেকে ওকে দেখে বাড়ির সবাই অবাকই হচ্ছে আবার খুশিও হচ্ছে। পরিবারের সাথে সময় কা’টি’য়ে হয়তো পরিবর্তন আসছে ওর মধ্যে।
সোহাকে গোছল করানো হয় এগারোটা নাগাদ। ওকে এখন পার্লারে নিয়ে যেতে হবে ব্রাইডাল সাজের জন্য।
শ্রবণ গোছল করে একদম তৈরি হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে আসে। পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি। ফরসা গায়ের রঙ আবার পরেছে সাদা পাঞ্জাবি। দেখতে একটু বেশিই ভালো লাগছে। চৌধুরী বাড়ির প্রায় সবাই হা করে তাকিয়ে আছে শ্রবণের দিকে। ওনারা আজকে প্রথম শ্রবণকে পাঞ্জাবি পরনে দেখছেন। বিয়ের শপিং করার সময় সামাদ চৌধুরী বড়ো নাতির জন্য এই পাঞ্জাবিটা এনেছিলেন নিজে পছন্দ করে। শ্রবণ যে এই পাঞ্জাবি পরবে উনি ভাবেননি। শ্রবণ পাঞ্জাবি পরেই না, পরতে দেখেওনি বাড়ির কেউ।
“এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকার মানে কী? জোকারের মতন লাগছে আমায়?”
সামাদ চৌধুরী দ্রুত দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলেন,
“একদমই না দাদু ভাই, তোমাকে তো অনেক হ্যান্ডসাম লাগছে পাঞ্জাবি পরনে। আমি তো ভাবিইনি এই পাঞ্জাবি পরনে তোমাকে এত ভালো লাগবে।”
শ্রবণ আর কিছু বলে না।
সোহার মা অনিমা চৌধুরী বলেন,
“যেটা বলছিলাম আমি, সোহাকে পার্লারে নিয়ে যেতে হবে। কে নিয়ে যাবে ওকে?”
সোহার বাবা মিস্টার শাহীন রেজা চৌধুরী বলেন,
“সিয়াম নিয়ে যাক।”
সিয়াম বলে,
“আমি তো গোছলও করিনি এখনো। পাঁচ মিনিট সময় দাও গোছলটা সেরে আসি। দৌড়াদৌড়ি করে শরীর ঘেমে একাকার হয়ে গেছে।”
অনিমা চৌধুরী বলেন,
“সাড়ে এগারোটার মধ্যে পার্লারে যাওয়ার কথা। তোর গোছল করতে করতে তো দেরি হয়ে যাবে।”
“দেরি হবে না।”
শ্রবণ কাকির দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি বসেই আছি এখন, আপনারা চাইলে আমি সোহাকে পার্লারে নিয়ে যেতে পারি।”
সবাই আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা নিয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। শ্রবণ চৌধুরী বলছে এই কথা? অবিশ্বাস্য।
“এভাবে তাকানোর কী হয়েছে?”
শাহীন রেজা চৌধুরী বলেন,
“সত্যিই তুমি নিয়ে যাবে?”
“মিথ্যে কেন বলবো?”
“তাহলে তো ভালোই হয়।”
“আমি গাড়িতে গিয়ে অপেক্ষা করছি আপনারা সোহা আর ওর সাজার সব কিছু নিয়ে আসুন।”
“আচ্ছা যাও।”
শ্রবণ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বাইরের দিকে এগিয়ে যায় ধীর পায়ে। বাড়ির সবাই স্বস্তির শ্বাস ফেলে। যাক অবশেষে ছেলেটা ওনাদের সকলের সাথে স্বাভাবিক হচ্ছে।
অনিমা চৌধুরী দ্রুত মেয়ের রুমে আসেন। ওনার সাথে একজন মেড এসেছে। মেডের হাতে ব্রাইড সাজানোর সব কিছু দিয়ে গাড়িতে নিয়ে রাখতে বলে সোহাকে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। সবাই এখন তৈরি হতে চলে গেছে। গোছল করবে, রেডি হবে সময়ের ব্যাপার। বিয়েতে তো আর যেমন তেমন করে সাজলে হবে না।
স্পর্শও গোছল করতে ওয়াশরুমে ঢুকে গেছে কিছুক্ষন আগেই।
বাড়ির বাইরে এসে শ্রবণের গাড়ি আর গাড়ির ভেতর শ্রবণকে দেখে সোহার পা দুটো স্থির হয়ে যায়। তড়িৎ গতিতে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমাকে পার্লারে কে নিয়ে যাবে আম্মু?”
“শ্রবণ নিয়ে যাবে।”
ছ্যাঁত করে ওঠে সোহার বুকের ভেতর। দ্রুত দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“আমি ভাইয়ার সাথে যাবো না আম্মু। তুমি চলো আমার সাথে।”
“সোহা বোঝার চেষ্টা কর, আমি এখনো রেডি হইনি। তোর সাথে গেলে আমি রেডি হবো কখন? দেরি হয়ে যাচ্ছে তুই যা শ্রবণের সাথে।”
“না, যাবো না আমি।”
“সোহা।”
মায়ের কন্ঠে স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ পাচ্ছে।
ওর মা কীভাবে পারছে ওকে জ্বলজ্যান্ত একটা বাঘের গুহায় ঠেলে দিতে? দেখছেই তো গুহার ভেতরে বাঘ ওত পেতে বসে আছে শিকারের আশায়।
অনিমা চৌধুরী জোর করেই সোহাকে শ্রবণের পাশে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে দেন। পার্লারের নাম আর মেকআপ আর্টিস্টের নাম বলে দেন শ্রবণকে। পার্লারে গিয়ে অনিমা চৌধুরীর নাম বললেই হয়ে যাবে এটাও বলে দেন।
শ্রবণ মনোযোগ দিয়ে সব শুনে মাথা নাড়ায়। সোহার দিকে একবার তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়।
সোহা জড়সড়ো হয়ে বসে রইল। মনের ভুলেও শ্রবণের দিকে তাকাচ্ছে না। শ্রবণকে সেদিনের পর থেকে ভীষণ ভয় লাগে ওর। দেখলেই মনে হয় এই বুঝি এসে গলা চেপে ধরবে।
“সোহা।”
সোহা চমকে উঠে শ্রবণের দিকে তাকায়। ওকে ডাকছে কেন আবার?
শ্রবণ সোহার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“স্পর্শকে ভালোবাসিস?”
সোহা কথা বলে না। শ্রবণ অভয় দিয়ে নরম কোমল স্বরে বলে,
“ভয় পাচ্ছিস কেন? ভালোবাসিস স্পর্শকে?”
মাথা নাড়ায় সোহা।
“মুখে বল।”
“হ্যাঁ।”
“স্পর্শ তোকে ভালোবাসে?”
“হ্যাঁ।”
“অনেক ভালোবাসে?”
“হুম।”
“তোকে না পেলে ম’রে যাবে?”
“তু তুমি এসব বলছো কেন?”
“জানতে ইচ্ছে করছে সেজন্য। স্পর্শ তোকে পাগলের মতো ভালোবাসে তাইনা?”
মাথা নাড়ায় সোহা। শ্রবণ কিছু না বলে সামনের দিকে তাকায়। শ’য়’তা’নের মতো মুচকি হেসে, চোখে মুখে রহস্য ছড়িয়ে পড়ে। কিছু তো একটা প্ল্যান করেছেই। একটু পর গুনগুনিয়ে গান গাইতে শুরু করে,
“আরে…আতর গোলাপ চন্দন মাইখা
সবাই মোরে যাইবো রাইখা,
চুপি সারে একলা ঘরে কলমি
ফুলের সুভাশ নেবো…”
গাড়ি এসে দাঁড়ায় একটা পার্লারের সামনে। শ্রবণ সিট বেল্ট খুলতে খুলতে বলে,
“নাম গাড়ি থেকে।”
দু’জন একসাথে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়।
শ্রবণকে দেখে কাছে এগিয়ে আসে হাসান।
শ্রবণের পেছনের দরজা খুলে ভেতর থেকে প্যাকেট বের করে দুই হাতে তুলে নেয়।
শ্রবণের সাথে সোহাকে দেখে হাসানের চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। শ্রবণ এই মেয়ের সাথে কেন? আর ওকেই বা এত তাড়া দিয়ে এখানে আসতে বলেছে কেন?
“শ্রবণ এই মেয়ে তোর সাথে কেন? আর আমাকে এখানে আসতে বলেছিস কেন?”
“গাড়িতে বসে অপেক্ষা কর, একটু পর এসে বলবো। সোহা ভেতরে চল।”
শ্রবণের সাথে সাথে ভেতরের দিকে এগিয়ে যায় সোহা। পার্লারের সাইন বোর্ডের দিকে একটাবার তাকিয়েও দেখে না।
সোহাকে সাজাতে বেশি সময় লাগেনি। সোহার ইচ্ছে ছিল নিজের বিয়েতে ভারি সাজ দেবে কিন্তু ওর মা কী করলো? এই প্যাকেজ কেনো চুজ করেছে? এই সাজ সোহার পছন্দ হচ্ছে না। দেখতে সুন্দরই লাগছে কিন্তু সোহা আরেকটু ভারি সাজ চেয়েছিল। ওর মাকে তো বলেছিল ওর পছন্দ সম্পর্কে।
শ্রবণ সোহাকে নিয়ে পার্লার থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে আসার পর পার্লারের নামের দিকে নজর বুলায় সোহা। চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে পার্লারের নাম দেখে।
“ভাইয়া আম্মু তো অন্য পার্লারের নাম বলেছিল।”
আগুন চোখে সোহার দিকে তাকায় শ্রবণ। আগের সেই চিরচেনা রূপ ফিরে এসেছে। ওর এই রূপ দেখেই সোহার কলিজার পানি শুকিয়ে গেছে।
শ্রবণ সোহার হাত ধরে টেনে গাড়ির ব্যাক সিটে বসিয়ে নিজে উঠে বসে পাশে। ফ্রন্ট সিটে বসে থাকা হাসানের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দে।”
হাসান নেমে ঘুরে এসে ড্রাইভিং সিটে বসে।
“কোথায় যাব?”
“কাজি অফিসে।”
হাসান তড়িৎ গতিতে পেছনে তাকায়। সোহা বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে। বিস্ময় নিয়ে বলে,
“বিয়ে তো কমিউনিটি সেন্টারে হবে ভাইয়া। আমরা কাজি অফিসে কেন যাব?”
“হাসান চল দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“ভাই কী করতে চাইছিস তুই ক্লিয়ার করে বল।”
“বিয়ে করতে চাইছি, এখন চল।”
সোহা কাঁপা গলায় বলে,
“আ আমাকে আগে কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছে দিয়ে আসো তারপর তুমি বিয়ে করতে যাও।”
শ্রবণ ঘাড় কাত করে সোহার মুখের দিকে তাকায়। ওর তাকানো দেখেই সোহা কেঁদে ফেলে। শ্রবণের এভাবে তাকানো মানে নিশ্চই অনেক বড়ো কোনো প্ল্যান করে বসে আছে। এখন শ্রবণ নিজের মর্জি মতো চলবে।
“তোকে যদি পৌঁছে দিয়ে আসি তাহলে বিয়ে করবো টা কাকে?”
“মা মানে?”
“মানে খুব সোজা, আমি তোকেই বিয়ে করছি।”
সোহার কান্না অটো বন্ধ হয়ে যায়। একটু পরেই আবার শব্দ করে কেঁদে ওঠে।
“তু তুমি এসব কী বলছো ভাইয়া?”
“শুনতে পাসনি?”
“আ আমি তোমার ছোটো ভাইয়ের হবু স্ত্রী। তুমি এরকমটা কীভাবে করতে পারো? আ আমাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দাও।”
“তোকে কে বলেছে স্পর্শ আমার ছোটো ভাই? ওর সাথে আমার র’ক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। ওর মায়ের সাথে আমার বাবার বিয়ে হলেও ওকে আমি সৎ ভাই হিসেবেও মানি না। স্পর্শ আর ওর মা আমার কেউ হয় না। ওরা আমার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। স্পর্শ আমার কাছ থেকে আমার বাবাকে কেড়ে নিয়েছে আর আমি ওর ভালোবাসাকে কেড়ে নিলাম। তুই স্পর্শর ভালোবাসা হয়ে ভুল করলিরে সোহা। না তুই ওর ভালোবাসা হতি, আর না আমার তোকে বিয়ে করার মতো ফালতু একটা সিদ্ধান্ত নিতে হতো।”
চলবে………….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৯
-
দিশেহারা পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
দিশেহারা পর্ব ৩৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
দিশেহারা পর্ব ৪৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১