দিশেহারা (৪২)
সানা_শেখ
সোহার প্রেগন্যান্সির তিন মাস পূরণ হয়েছে গত দুদিন আগে। শ্রবণ আজকে সোহাকে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল চেক-আপ করানোর জন্য। মা এবং বাবু দুজনেই সুস্থ আছে আলহামদুলিল্লাহ। ডক্টর শ্রবণকে বলে দিয়েছেন আরও বেশি বেশি সোহার খেয়াল রাখার জন্য। সোহাকে-ও বলেছেন নিজের খেয়াল রাখতে, প্রচুর পুষ্টিকর খাবার খেতে আর হাসি খুশি থাকতে।
হসপিটাল থেকে বেরিয়ে সোহাকে নিয়ে শপিং মলে এসেছে শ্রবণ। বিয়ের পর এখন পর্যন্ত সোহাকে কোনো ড্রেস কিনে দেয়নি ও। সোহা বাড়ি থেকে যা নিয়ে এসেছিল সেসবই পরছে এখনো।
শ্রবণ সোহার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“দেখ কোনটা কোনটা পছন্দ হয়।”
সোহা ড্রেসগুলোর দিকে নজর বুলিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। মৃদু স্বরে বলে,
“তুমি দেখো।”
“পরবি তুই, তুই দেখ।”
“আমি নিজে তো কখনো ড্রেস পছন্দ করে কিনতাম না, সবসময় আম্মু নিয়ে যেত।”
শ্রবণ সোহার দিক থেকে চোখ সরিয়ে ড্রেসের উপর নজর বুলায়। সোহার হাত ছেড়ে দিয়ে নিজেই ড্রেস পছন্দ করতে শুরু করে। বা/লের এক মেয়েকে বিয়ে করেছে, নিজের জন্য সামান্য ড্রেস পছন্দ করবে তাও করতে পারে না।
বেশ কয়েকটা ড্রেস পছন্দ হয়েছে শ্রবণের। আরও কয়েকটা নেবে। কালো একটা জামার দিকে তাকিয়ে সোহার হাত ধরার জন্য হাত বাড়ায় পাশে। হাত ধরবে ধরবে এমন সময় শ্রবণের হাত থেমে যায়। ফট করে ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের পাশে তাকায়। নিজের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েকে দেখে দ্রুত হাত গুটিয়ে নেয়। এটা কাকে ধরতে যাচ্ছিল এখনই? ওর বউ কোথায় গেল? দ্রুত আশেপাশে নজর বুলায়।
যেখানে সোহার হাত ছেড়েছিল সোহা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। চোয়াল শক্ত করে সোহার কাছে এগিয়ে আসে। হাত মুঠো করে ধরে চাপা রাগী স্বরে বলে,
“আমার সঙ্গে না গিয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
সোহা হাতের ইশারায় একটা জামা দেখায়।
“পছন্দ হয়েছে?”
উপর নিচ মাথা নাড়ায় সোহা।
শ্রবণ জামাটা হাতে নিয়ে সোহার গায়ে ধরে। ওরো পছন্দ হয়। ভালোই লাগছে।
সোহার জন্য কেনাকাটা শেষ করে গাড়ির দিকে আগায়। শপিং ব্যাগগুলো পেছনে রেখে সোহাকে ফ্রন্ট সিটে বসায়। নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে সিট বেল্ট লাগাতে লাগাতে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“দাদা ভাই কল করেছিল?”
সোহা শ্রবণের দিকে তাকিয়ে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলে,
“না তো।”
“করেনি?”
“না। কেন? কিছু হয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কী হয়েছে?”
“তোর ডাইনি মায়ের অ্যাক্সিডেন্ট।”
চমকে ওঠে সোহা। বিচলিত হয়ে বলে,
“অ্যাক্সিডেন্ট! কী… কীভাবে? কখন হয়েছে?”
“এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন? ম’রেনি, বেঁচেই আছে। কৈ মাছের জান, এত সহজে কি যাবে নাকি?”
“এখন কোথায়?”
“হসপিটালে, আইসিইউ-তে ভর্তি।”
“কীভাবে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?”
“ওই ডাইনির জন্য তোর চোখ থেকে পানি বের হলে তোর চোখ উপড়ে নেব।”
সোহা ভয়ে দ্রুত নিজের দুচোখ মুছে নেয়। শ্রবণ নির্লিপ্ত গলায় বলে,
“গতকাল বিকেলে ডাইনিটা অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল যেন কীসের জন্য, একটা ব্ল্যাক মার্সিডিজ ছুটে এসে ওকে ধাক্কা দিয়ে চলে এসেছে।”
“কে ছিল ওই গাড়িতে? পু… পুলিশ ধরেনি?”
“নাহ্, ধরেনি।”
“কেন ধরেনি?”
“সেটা তোর বাপ-মাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করিস। যাবি ডাইনিটাকে দেখার জন্য? বাঁচবে নাকি ম’রবে ঠিক নেই। যাবি নাকি?”
“অনেক সিরিয়াস অবস্থা?”
“সকালে তো নিউজে দেখেছিলাম জ্ঞান ফেরেনি।”
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা এখনই বোধহয় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠবে। চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে। চেহারা লাল হয়ে গেছে কান্না চেপে রাখার কারণে। যতই হোক, মা তো।
শ্রবণ সামাদ চৌধুরীর ফোনে কল করে। রিসিভ হতেই স্পিকারে দেয়।
“আসসালামু আলাইকুম, দাদা ভাই।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। নিউজে দেখলাম ছোটো ডাইনির নাকি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?”
“হ্যাঁ।”
“কীভাবে হলো? কে করল? যে ধাক্কা দিলো তার নামে এখনো মামলা করেনি কেন? অ্যাক্সিডেন্টের স্পষ্ট ফুটেজ তো আছেই।”
সামাদ চৌধুরী গম্ভীর হয়ে বলেন,
“এমনটা না করলেও পারতে, শ্রবণ।”
শব্দ করে হেসে ওঠে শ্রবণ। সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,
“কেমনটা করেছি আমি?”
“অনিমাকে ধাক্কা দিয়েছো কেন?”
শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই ওষ্ঠজোড়া প্রশস্ত করে বলে,
“নেক্সট টার্গেট বড়ো ডাইনি আর শামীম রেজা। দুজনকে চোখকান খোলা রেখে রাস্তায় বের হতে বলবে নয়তো দেখা গেলো কবে ওরাও আইসিইউ-এর বেডে শুয়ে আছে নিস্তেজ হয়ে।”
“শ্রবণ!”
“রাখছি, দাদা ভাই।”
কল কেটে দেয় শ্রবণ।
সোহা অবাক হয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রবণ ইচ্ছে করে ওর মাকে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়েছে?
কি সুন্দর করে হাসছে এখন। শ্রবণ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে হাসি মুখে গান গাইতে শুরু করে,
“মানুষ বড়ই স্বার্থপর রে
বড়ই স্বার্থপর…
বুকের মাঝে জায়গা দিলে
যতন কইরা ভাঙ্গেরে অন্তর…।
সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অপলক দৃষ্টিতে। এই শ্রবণ তো সেই শ্রবণ না। শ্রবণের অসুস্থতা কি আবার বাড়ছে? একজন সুস্থ মানুষকে আইসিইউ-তে পাঠিয়ে মনের সুখে হাসছে আর গান গাইছে কি সুন্দর সুর তুলে।
সোহা মুখ ফিরিয়ে বাইরের দিকে তাকায়। দুচোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
হাসানের ফোন বেজে ওঠে। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে ওর মামা কল করেছে।
“হ্যাঁ মামা, বলো।”
“কোথায় তুই?”
“বাড়ির কাছেই।”
“দ্রুত বাড়িতে আয়।”
“কেন? কিছু হয়েছে?”
“রিতাকে দেখার জন্য পাত্রপক্ষ এসেছে হুট করে। তুই দ্রুত আয়।”
রিতাকে দেখতে পাত্রপক্ষ এসেছে শুনেই হাসানের বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠেছে।
“আসছি, মামা।”
“আচ্ছা আয়, রাখছি।”
“হুম।”
হাসান ফোন পকেটে ভরে হেলমেট পরতে শুরু করে। রাব্বি বলে,
“কোথায় যাবি? কী বলল তোর মামা?”
“বাড়িতে যাব, মেহমান এসেছে।”
কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বাইক স্টার্ট দিয়ে বাড়ির পথে আগায়।
বাড়িতে পৌঁছে বাইক এক পাশে পার্ক করে হেলমেট খুলে বাইকের উপরেই রাখে।
চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিকঠাক করে ভেতরের দিকে পা বাড়ায়।
ড্রয়িংরুমে ঢুকেই সোফায় বসে থাকতে দেখতে পায় দশ বারোজন অপরিচিতদের।
“আসসালামু আলাইকুম।”
সবাই একসঙ্গে হাসানের দিকে তাকায়। সালামের জবাব দেওয়ার পর রিতার বাবা রেজোয়ান আহমেদ হাসানকে দেখিয়ে দিয়ে বলেন,
“ও হাসান, যার কথা আপনাদের বলেছিলাম। হাসান, এখানে এসে বোস।”
হাসান মামার পাশে বসে। ছেলেপক্ষের সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর মনে হচ্ছে রিতাকে নয় ওকেই দেখতে এসেছে এরা। অস্বস্তিতে এদিক ওদিক নজর বুলায়।
রিমা বেগম রিতাকে নিয়ে এগিয়ে আসছেন সোফার দিকে। রিতাকে মিষ্টি কালার শাড়ি পরানো হয়েছে, ঘোমটা টেনে নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে মায়ের সঙ্গে এগিয়ে আসছে।
রিতাকে এনে সকলের সামনে একটা চেয়ারে বসানো হয়। ছেলেপক্ষের সবাই রিতাকে দেখে, যা যা জিজ্ঞেস করার করে। সকলের চোখমুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে মেয়ে পছন্দ হয়েছে।
ছেলের বাবা রেজোয়ান আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“ভাই সাহেব, মেয়ে তো আমাদের পছন্দ হয়েছে। আপনাদের কিছু বলার থাকলে বলুন।”
রেজোয়ান আহমেদ হাসানের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“তুই কি বলিস?”
হাসান ছেলের বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ছেলে যেন কি করে?”
“কার্ডিওলজিস্ট।”
“ছেলেকে নিয়ে আসলে ভালো হতো না? ছেলে মেয়েকে দেখত, মেয়েও ছেলেকে দেখত।”
“রোহান আসতে চেয়েছিল কিন্তু হুট করে ইমার্জেন্সী থাকায় আটকে গেছে। সমস্যা নেই তো, পরে ওরা বাইরে দেখা করে নেবে।”
“আপনার কতজন ছেলেমেয়ে?”
“আমার একটাই ছেলে।”
হাসান মামার দিকে তাকায়।
“তোমার পছন্দ হয়েছে?”
“তুই যা বলবি সেটাই হবে।”
ছেলের বাবা বলেন,
“আপনারা রাজি থাকলে আমরা আজকেই আংটি পরিয়ে রাখতে চাই।”
হাসান হাসি মুখে বলে,
“আংকেল, আমরা তো এখনো আপনাদের বিষয়ে কোনো খোঁজ খবর নেইনি। আপনারাও হয়তো আমাদের বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না। একটা বিয়ে যেহেতু সারাজীবনের জন্য তাই ভেবে চিন্তেই তো আগানো ভালো, তাইনা?”
“তা আপনি ঠিকই বলেছেন।”
“তাহলে এটাই থাকুক, আমরাও আপনাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেই, আপনারাও নিন তারপর আস্তে ধীরে বিয়ের কথায় আগাই।”
“আচ্ছা। আশা করছি আমাদের বিষয়ে কোনো খারাপ রিপোর্ট পাবেন না আপনারা।”
“এটাই যেন হয়।”
“তাহলে আমরা এখন আসি, দেখা সাক্ষাৎ তো হলোই।”
“খাওয়াদাওয়া না করেই চলে যাবেন? রাত হয়েই গেছে, খাওয়াদাওয়া সেরে তারপর যাবেন সবাই।”
“খাওয়াদাওয়া করতে হবে না, আমরা যার জন্য এসেছিলাম সেটা তো হয়েছেই। তাড়াহুড়ো করে এসেছি শুধু মেয়েটা দেখার জন্য। আমরা আসছি তাহলে, ভালো থাকবেন আপনারা। আপনাদের সঙ্গে আত্মীয় করতে পারলে আমরা অনেক খুশি হবো।”
“আল্লাহ তা’য়ালা চাইলে হবেন ইনশা-আল্লাহ।”
সবাই চলে যায়। হাসান রিতার দিকে তাকাতেই রিতা অভিমান ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। হাসানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। ঠেলে কান্না আসছে ওর। এতক্ষণ ধরে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছিল।
রেজোয়ান আহমেদ বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করেন। হাসানের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,
“মনে হচ্ছে ফ্যামিলিটা ভালোই, তোর কি মনে হয়?”
“আমারও এমনই মনে হচ্ছে। খোঁজ খবর নিয়ে দেখি যদি খারাপ কোনো রিপোর্ট না পাই তাহলে এখানেই বিয়ে হবে।”
“আচ্ছা, ফ্রেশ হয়ে আয়।”
“হুম।”
হাসান রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রেজোয়ান আহমেদ রিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“রিতাকে ডেকে আনো খাওয়ার জন্য।”
রিমা বেগম রিতাকে ডাকার জন্য চলে যান উপরে। রেজোয়ান আহমেদ মায়ের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন।
রিমা বেগম রিতার রুমের সামনে এসে দেখেন দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলেন,
“রিতা, কি করছিস? চেঞ্জ করে নিচে আয় খাওয়ার জন্য।”
কিছুক্ষণ পর রিতার গলার স্বর ভেসে আসে ভেতর থেকে।
“আমি এখন আর খাব না, খিদে পায়নি, তোমরা খেয়ে নাও।”
“অল্প খাবি আয়, তোর আব্বু ডাকছে খাওয়ার জন্য।”
“বলছি তো খাব না। যাও।”
রিমা বেগম আর কিছু না বলে নিচের দিকে এগিয়ে আসেন। রেজোয়ান আহমেদ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“রিতা আসলো না?”
“সন্ধ্যায় খেয়েছে এখন আর খাবে না।”
“অল্প খেতো।”
“বলেছি, খাবে না।”
“যাও আমাদের জন্য বাড়ো।”
রিমা বেগম ডাইনিংরুমের দিকে এগিয়ে যান।
হাসান ডাইনিং রুমে এসে চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলে,
“বাচালটা কই? খাবে না?”
রিমা বেগম বলেন,
“সন্ধ্যায় খেয়েছিল এখন আর খাবে না।”
হাসান বলে না কিছু। চুপচাপ নিজের খাওয়া শুরু করে।
রাত প্রায় বারোটা বেজে গেছে। রুমে শো শো ফ্যানের বাতাসের শব্দ ব্যতীত অন্য কোনো শব্দ নেই। হাসান স্টাডি টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আছে। সামনে মেলে রাখা বই, দৃষ্টি স্থির বইয়ের পাতায়।
হঠাৎ দরজা ধাক্কানোর শব্দ হয়। হাসান ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকায় দরজার দিকে। আবার ধাক্কা পড়তেই গলার স্বর বাড়িয়ে বলে,
“কে?”
উত্তর আসে না তবে দরজায় ধাক্কানোর শব্দ হয় আবার। হাসান বইটা বন্ধ করে বসা থেকে উঠে দরজার কাছে এগিয়ে আসে। দরজা খুলে দেখে সামনে রিতা দাঁড়িয়ে আছে। রিতা মুখ তুলে হাসানের মুখের দিকে তাকায় অন্ধকার থাকায় দুজনের একজনও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না একে অপরের চেহারা। রুমে আলো থাকলেও হাসানের সুঠাম দেহের কারণে ছায়া পড়ে আছে রিতার ওপর।
“এত রাতে এখানে কী?”
রিতা হাসানকে পাশ কা’টিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে।
হাসান দরজার সামনে থেকে সরে এসে রিতার মুখের দিকে তাকায়। কান্না করার কারণে রিতার চোখমুখ ফুলে উঠেছে। চোখ দুটোতে র’ক্ত জমে গেছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, এখনো শাড়ি পরনে রয়েছে।
হাসান দৃষ্টি নামিয়ে নেয় রিতার দিক থেকে। রিতা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে থেমে থেমে বলে,
“তুমি কেন এমন করছ? আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।”
হাসান নিচের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে,
“যা এখান থেকে, গিয়ে চেঞ্জ করে ঘুমা।”
“যাবো না আমি।”
“মার খাবি কিন্তু।”
“মে’রে ফেলো।”
হাসান চোখ তুলে তাকায় আবার। রিতা করুণ সুরে বলে,
“তুমি জানো আমি তোমাকে ভালোবাসি। সবকিছু জানার পরও কীভাবে অন্য জায়গায় বিয়ে দিতে চাইছ?”
“যা করে তোর ভালো হবে সেটাই করছি। এখন যা নিজের রুমে।”
“করতে হবে না আমার ভালো। আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো না।”
“যেতে বলেছি আমি।”
“তুমি কি মানুষ? হৃদয় বলতে কিছুই কি নেই? এত সুন্দর করে কীভাবে ইগনোর করো আমাকে আর আমার অনুভূতিকে? আমার অনুভূতির, ভালোবাসার কি কোনোই মূল্য নেই তোমার কাছে?”
“না, নেই। যা তো এখান থেকে, বিরক্ত করবি না।”
“বেশি কিছু তো চাইছি না তোমার কাছে।”
“বেশি কিছু চাইছিস না অথচ পুরো আমিটাকেই চাইছিস।”
“দিয়ে দাও না।”
“অসম্ভব।”
“আমি হারিয়ে গেলে তোমার একটুও আফসোস হবে না?”
“একদম না।”
“তুমি কি সত্যিই রোবট?”
“হ্যাঁ।”
“কোনো অনুভূতি নেই?”
“না।”
“কান খুলে শুনে রাখো হাসান মাহবুব, আমি যদি তোমার না হই দুনিয়ার আর কোনো পুরুষের হবো না।তুমি ব্যতীত অন্য কারো নামে কবুল বলবো না আমি। এই দেহে অন্য পুরুষের ছোঁয়া লাগার আগে কাফনের কাপড় জড়াবে। তুমি আমাকে বিয়ে না করলে আমি সুইসা*ইড করব।”
হাসানের শক্ত হাতের চড় পড়ে রিতার নরম গালে। মেয়েটার মাথা একদিকে হেলে পড়েছে অনেকটা। হাসান রাগে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আরেকবার উল্টাপাল্টা কথা বলবি তো চাপায় আর দাঁত থাকবে না একটাও। ভালোভাবে বলছি ভালো লাগছে না? কিছু না বলতে বলতে সাহস বেড়ে গেছে? যা গিয়ে ঘুমা।”
অবিশ্বাস্য এক কাজ করে ফেলে রিতা। দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাসানকে। ওর এমন কর্মে শকড হাসান। স্তব্ধ হয়ে গেছে।
রিতাকে ঠেলে নিজের কাছ থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা করে বলে,
“এত নির্লজ্জ কবে থেকে হয়েছিস? ছাড় আমাকে।”
রিতা শক্ত করে ধরে রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“আমি সত্যিই ভালোবাসি তোমাকে। তোমাকে ছাড়া বাঁচব না আমি। সন্ধ্যার পর থেকে ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছি না, অনেক কষ্ট হচ্ছে। তুমি কেন বুঝতে পারছো না আমাকে? আমি তোমার যোগ্য না ঠিক আছে, একটু কি মানিয়ে নিতে পারবে না আমার সঙ্গে?”
হাসান স্থির হয়ে দাঁড়ায়। মৃদু স্বরে বলে,
“তুই আমার যোগ্য হলেও আমি তোর যোগ্য না। যেখানে বিয়ে দিতে চাইছি চুপচাপ মেনে নে, ভালো থাকবি।”
“ভালো থাকতে চাই না আমি। আমি তোমার সঙ্গে মন্দই থাকতে চাই, তবুও তোমাকেই চাই।”
“পাগলামি বন্ধ কর।”
“আমি অন্য কাউকে বিয়ে করবো না। তুমি আব্বুকে একবার বলো দেখবে আব্বু রাজি হয়ে গেছে।”
“কাউকে কিছু বলতে পারবো না আমি। তুই ছাড় আমাকে আর যা এই রুম থেকে।”
রিতা হাসানের বুক থেকে মুখ তুলে হাসানের মুখের দিকে তাকায়। ঝাপসা চোখজোড়া দিয়ে হাসানকে দেখতে দেখতে বলে,
“বলতে হবে না তোমাকে, আমি বলবো তুমি শুধু রাজি হয়ে যাবে।”
“না। ছাড় আমাকে। তোর লজ্জা করছে না মাঝরাতে একজন পুরুষের রুমে ঢুকে তাকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে? এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে তোকে? ছাড় আমাকে নয়তো মে’রে পিঠের ছাল তুলে নেব।”
“যা খুশি করো।”
হাসান গলার স্বর কিছুটা নরম করে বলে,
“দেখ রিতা, পাগলামি করবি না। তুই মামা মামির একমাত্র সন্তান। তাঁরা সবসময় তোকে বেস্ট দেওয়ার চেষ্টা করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। যাকে তাকে তো আর তোর লাইফ পার্টনার বানিয়ে দিতে পারে না তাইনা? তোর লাইফ পার্টনারও বেস্ট একজনই হবে।”
“তুমিই বেস্ট, আমার তোমাকেই লাগবে। তুমি ছাড়া অন্য কাউকে চাই না আমি।”
“আমি এখনো স্টুডেন্ট, থাকি মামার কাছে, খাই বাবার টাকায়, চলি ছন্নছাড়া হয়ে।”
“সারাজীবন তো আর স্টুডেন্ট থাকবে না, বিয়ে করলে সব ঠিক হয়ে যাবে না হলেও আমি মানিয়ে নেব।”
হাসান চুপ করে থাকে। আর কোন যুক্তি দিয়ে এই মেয়েকে দূরে সরাবে? কোন যুক্তি দিয়ে এই মেয়েকে বোঝাবে ও রিতার যোগ্য না? তেরো বছর বয়স থেকে মামার কাছে রয়েছে। মামার বাড়িতে বড়ো হয়ে এখন মামাতো বোনকেই বিয়ে করবে? মামা সবসময় মেয়েকে বেস্ট জিনিস দিয়েছেন। মুখ ফুটে চাইতেই হাজির করেছেন সব। সে রাজি হবে হাসানের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিতে?
হাসান কোন মুখে মামার কাছে গিয়ে বলবে “আমি রিতাকে বিয়ে করতে চাই।”?
হাসানকে চুপ থাকতে দেখে রিতা বলে,
“তুমি একবার শুধু আব্বুকে বলো দেখবে আব্বু রাজি হয়ে গেছে। তুমি বললে আব্বু না করতে পারবে না।”
“তুই কেন বুঝতে চাইছিস না আমার কথা? এটা সম্ভব না।”
“তুমি চাইলেই সম্ভব। আমি তোমার বউ না হলে অন্য কারো হবো না। আমি সত্যি সত্যিই সু’ই’সা’ই’ড করব।”
“তুই স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের কথা ভাবছিস নিজের বাবা-মায়ের কথা একবারও ভেবেছিস? তুই তাঁদের একমাত্র সন্তান, তুই না থাকলে তাঁদের কি অবস্থা হবে একবারও ভেবেছিস?”
“আমি যদি ভালো না থাকি তাহলে তাঁরা ভালো থাকবে? জীবন্ত লা*শ হয়ে বেঁচে থাকলে তাঁদের ভালো লাগবে? তুমি জানো আমি ছোটো বেলা থেকে কোনো কষ্ট পাইনি। তোমাকে না পাওয়ার মতো কষ্ট যন্ত্রণা নিয়ে আমি বেঁচে থাকতে পারবো না, এত কষ্ট সহ্য করার মতো ক্ষমতা আমার নেই।”
হাসান ফোস করে শ্বাস ছাড়ে। রিতাকে ঠেলে সরানোর চেষ্টা করে বলে,
“ছাড় আমাকে।”
“তুমি বলো আব্বুকে বলবে আমাদের বিয়ের কথা।”
হাসান চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিয়ে বলে,
“বলব।”
“সকালেই বলবে।”
“হ্যাঁ, বলব।”
“আমার মাথায় হাত রেখে বলো সত্যি সত্যিই বলবে।”
“আরে ভাই, বলছি তো বলব।”
রিতা হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টে বলে,
“আমার মাথা ছুঁয়ে বলো।”
হাসান রিতার মাথায় হাত রেখে বলে,
“সকালে মামাকে বলবো আমাদের দুজনের বিয়ের কথা কিন্তু মামা রাজি না হলে বিয়ে হবে না।”
“তুমি আব্বুকে রাজি করাবে তাহলেই হবে।”
“হ্যাঁ, ঠিক আছে। এখন ছাড় আমাকে।”
“আমাকে এত কষ্ট দিয়েছ সেজন্য আদর করো।”
“এই যে ডিমান্ড বেড়ে চলেছে। ছাড় আর যা এখান থেকে।”
“একটু আদর করো।”
হাসান পড়ে মহা ঝামেলায়। এখন এই মেয়েকে কীভাবে আদর করবে? ছোটো বাচ্চাদের আদর করা সহজ কিন্তু এত বড়ো মেয়েকে কীভাবে আদর করবে?
ওকে ঝামেলায় না ফেললে এই মেয়ের বোধহয় শান্তি লাগে না।
“আদর করো।”
রিতার গাল দুটো মুছিয়ে দিয়ে চুলগুলো ঠিক করে দিতে দিতে বলে,
“রুমে যাবি, ফ্রেশ হবি তারপর ঘুমাবি।”
“আচ্ছা।”
“যা এখন।”
“সকালে কিন্তু আব্বুকে বলবে।”
“হ্যাঁ।”
“আচ্ছা তুমিও ঘুমাও।”
রিতা ছেড়ে দিয়ে দরজার দিকে আগায়। হাসান বিড়বিড় করে বলে,
“টেনশন ধরিয়ে দিয়ে বলছে ঘুমাও। দুইটা বছরে মাথা আউলা ঝাউলা করে দিয়েছে অসভ্য মেয়েটা। ধুর… ভাল্লাগেনা।”
রিতা রুম থেকে বেরিয়ে গেলেও খেয়াল করে না দরজার বাইরে একটু দূরে ওর বাবা দাঁড়িয়ে আছে। রেজোয়ান আহমেদ দরজার ডানপাশে করিডোরে দাঁড়িয়ে আর বাম পাশের করিডোর দিয়ে রিতা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকার থাকায় হয়তো বাবাকে দেখেনি।
“হাসান।”
চমকে উঠে সামনে তাকায় হাসান। ওর মামা এখানে কেন এত রাতে? এতক্ষণ কোথায় ছিল? ওর আর রিতার সব কথা শুনে নিয়েছে? ওরা এতক্ষণ যেভাবে ছিল দেখে নিয়েছে? হাসানের চেহারার রঙ পাল্টে গেছে।
চলবে……….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২৪
-
দিশেহারা পর্ব ১০
-
দিশেহারা পর্ব ১৭
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৯
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪