দিশেহারা (৪০)
সানা_শেখ
সোহা শ্রবণের ঘাড় থেকে মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। মৃদু স্বরে বলে,
“ওটা বিড়াল?”
“হ্যাঁ।”
“চোখ দুটো তাহলে অমন জ্বলছিল কেন?”
শ্রবণ রান্নাঘরে এসে আশেপাশে তাকিয়ে বিড়াল খুঁজতে খুঁজতে বলে,
“কু/কুর বিড়ালের চোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করেই।”
“ওওও, বিড়াল আসলো কীভাবে ফ্ল্যাটে?”
“আমি যখন এসেছি তখন এসেছে বোধহয়।”
“নামাও আমাকে।”
শ্রবণ রুক্ষ স্বরে বলে,
“নামবি কেন? থাক সারাজীবন এভাবেই।”
সোহা মুখ কাচুমাচু করে। ও কি ইচ্ছে করে কোলে উঠেছে নাকি? ভয় পেয়ে তো উঠেছে, ভয় পেলে এত কিছু খেয়াল থাকে নাকি? মিনমিন করে বলে,
“নামাও না।”
“দাঁড়াতে পারবি? তুই তো আবার ভয় পেলে দাঁড়াতে ভুলে যাস। আল্লাহর দুনিয়ায় তোর মতো অদ্ভুত ডাইনি আর একটাও নেই।”
সোহা চুপ করে থাকে। শ্রবণ সোহাকে নামিয়ে দেয়। দুই হাতে ধরে রাখে যেন ধপাস করে পড়ে না যায়।
সোহা নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। শ্রবণ আশেপাশে নজর বুলাতে শুরু করে আবার। বিড়ালটা কোথায় গিয়ে লুকাল?
দুই কদম আগাতেই দেখে ফ্রিজের পাশে ঘাপটি মে’রে বসে আছে। শ্রবণ ধীর পায়ে আস্তে আস্তে বিড়ালের কাছে এগিয়ে এসে বসে পায়ের উপর ভর করে। ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে বিড়ালটা ধরে। বাচ্চা বিড়াল। সোহার চিৎকার শুনে অনেক ভয় পেয়ে গেছে বেচারা বিড়াল।
শ্রবণ বিড়াল ছানাটা ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে রেখে দেয়, যার বিড়াল সে খুঁজে নিক। ও ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারবে না, “এটা কার বিড়াল?”
বেসিনের কাছে এসে হাত ধুয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে। সোহা ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিয়ে এসেছে।
শ্রবণ সোহাকে সাবধান করে বলে,
“নেক্সট টাইম থেকে এভাবে দৌড় দিবি না, ভয় পেলে দাঁড়িয়ে থেকেই আমাকে ডাকবি। মনে থাকবে?”
“হ্যাঁ।”
দুজনের জন্য খাবার বেড়ে সোহা চেয়ার টেনে বসে। ভয়ে ওর বুক এখনো ধড়ফড় করছে। আজকের মতো এত ভয় সোহা এই জীবনে পায়নি বোধহয়।
“বিকেলে খেয়েছিলি?”
“হ্যাঁ।”
শ্রবণ আর কিছু বলে না, প্লেটের দিকে তাকিয়ে নিজে খাওয়া শুরু করে। সোহা নিজেও খাওয়া শুরু করে।
রাতের এগারোটা। বাইরে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। জোরে জোরে বাজ পড়ছে। শ্রবণ স্টাডিরুমে গেছে বই রেখে আসার জন্য। এতক্ষণ বেডরুমে সোহার পাশে বসে বই পড়ল। সোহা এখন ঘুমিয়ে পড়েছে প্রায়। একা থাকতে ভয় পাচ্ছিল, তাই শ্রবণ বই নিয়ে বেডরুমে চলে এসেছিল।
আবার বজ্রপাত হতেই চমকে ওঠে সোহা। ঘুম উবে গেছে ভয় পেয়ে। আশেপাশে শ্রবণকে দেখতে না পেয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। কোথায় গেলো শ্রবণ?
বজ্রপাতের শব্দে ব্ল্যাঙ্কেট খামচে ধরে দুই হাতে।
শ্রবণ রুমে এসে ওকে উঠে বসে থাকতে দেখে বলে,
“ভয় পেয়েছিস?”
উপর নিচ মাথা নাড়ায় সোহা। শ্রবণ ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,
“শুয়ে পড়, ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
শ্রবণ নিজেও চমকে উঠেছিল এত জোরে বাজ পড়ায়। তাইতো দ্রুত রুমে ফিরে এসেছে। ভীতু সোহা নিশ্চই ভয়ে কেঁদে ফেলেছে এমনটাই ধারণা ছিল ওর।
ফ্রেশ হয়ে এসে পানি পান করে। ডিম লাইট অন করে মেইন লাইট অফ করে দেয়। বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে সোহার পাশে। সোহা নিজে থেকেই শ্রবণের গা ঘেঁষে শোয়। আবার বাজ পড়তেই শ্রবণকে জড়িয়ে ধরে।
শ্রবণ সোহাকে বুকে আগলে ধরে বলে,
“যখন বাড়িতে ছিলি তখন বাজ পড়লে কি করতি?”
সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে রেখে বলে,
“মেড এসে আমার রুমে থাকতো।”
“তোর ডাইনি মা?”
“আসতো না।”
“কেন?”
“জানিনা।”
সোহার কন্ঠে স্পষ্ট অভিমান। শ্রবণের বুকের সঙ্গে আরও মিশে যায়। অভিমান ভরা সুরে বলে,
“তোমার আম্মু মানে বড়ো আম্মু ছিল না বলে তুমি মা ছাড়া থেকেছো অথচ আমার আম্মু থাকতেই আমি মা ছাড়া থেকেছি। আমি আম্মুকে হাজার কাছে চেয়েও পাইনি কখনো।”
শ্রবণ সোহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
“ঘুমা, ওই ডাইনির ঠ্যাং ভেঙে খোড়া না করলে আমার নামও শ্রবণ চৌধুরী না।”
সোহা চুপ করে থাকে, কিছু বললেই ধমক প্লাস গালি খেতে হবে।
আবার বাজ পড়তেই কেঁপে ওঠে সোহা। এত বাজ পড়ছে কেন? সারারাত কি এমন চলবে নাকি? এমন চললে সোহা ঘুমাবে কীভাবে? অবশ্য শ্রবণ জড়িয়ে ধরার পর ভয় অনেক কমে গেছে।
কয়েকদিন পেরিয়ে গেছে।
শ্রবণ আজ সকাল থেকে ফ্ল্যাটেই রয়েছে, জিম থেকে ফেরার পর আর কোথাও যায়নি। সোহাকে দুই মিনিটের জন্যও চোখের আড়াল হতে দিচ্ছে না। একটু আড়াল হলেই ডাকাডাকি শুরু করে দেয়।
গোসল সেরে বের হতেই শ্রবণ কর্কশ গলায় বলে,
“এত সময় লাগে গোসল করতে? সারাদিন কি ওয়াশরুমেই কা’টানোর চিন্তা ভাবনা করেছিলি নাকি?”
সোহা ব্যালকনির দিকে আগায় কাপড় চোপড় মেলে দেওয়ার জন্য। কতক্ষন হয়েছে গোসল করতে গেছে? বড়োজোর পনেরো মিনিট। একজন মেয়ের গোসল করতে কি পনেরো মিনিট লাগবে না?
ড্রেস মেলে দিয়ে এসে হাত মুখে ক্রিম লোশন লাগায়।
শ্রবণ খ্যাপাটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। হঠাৎ এই ছেলের হয়েছে কি? ভালোই তো ছিল ও গোসলে যাওয়ার আগেও।
“খাবে চলো।”
শ্রবণ বসা থেকে উঠে ধুপধাপ পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। সোহা আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর যাওয়ার পথে। জ্বিনে ধরলো নাকি? এমন করছে কেন হঠাৎ করে?
“এই, ডাইনির বাচ্চা, আসবি নাকি ওখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবি?”
শ্রবণের বাজখাঁই গলার স্বর শুনে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে এগিয়ে আসে।
শ্রবণকে খাবার বেড়ে দিয়ে নিজেও বসে খেতে।
প্লেটের অর্ধেক খাবার ভালোভাবেই খেয়েছে সোহা। শ্রবণ নিজের মতো খেয়ে চলেছে এক তালে। খাওয়ার সময় ডিস্টার্ব করা ওর একদম অপছন্দ।
হঠাৎ সোহার পেট মুচড়ে ওঠে। দ্রুত চেয়ার ছেড়ে উঠে দৌড়ে বেসিনের কাছে এসে গলগল করে বমি করে দেয়। ওর ওয়াক ওয়াক শুনে এই দিকে শ্রবণ নিজেই বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে দিয়েছে।
সোহার বমি বন্ধ হলে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। মাথা ঘুরে গেছে একদম। শ্রবণের ওয়াক ওয়াক শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ চেয়ারের উপর বসে থেকেই বমি করছে এখনো। কী আশ্চর্য! প্রেগন্যান্ট ও আর বমি করছে শ্রবণ?
সোহা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে চোখেমুখে পানি দেয়। কুলকুচি করে শ্রবণের কাছে এগিয়ে আসে দ্রুত পায়ে। বমি করে ফ্লোরের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। বেচারার পেটে অবশিষ্ট কিছুই নেই, পেট ক্লিয়ার হয়ে গেছে একদম।
সোহা পানির গ্লাস এগিয়ে দেয় শ্রবণের দিকে। শ্রবণ গ্লাস হাতে নিয়ে কুলি করে সোজা হয়ে বসে। বমি করতে করতে মনে হচ্ছিল পেটের নাড়িভুড়ি সব বেরিয়ে আসবে।
“ঠিক আছো তুমি?”
শ্রবণ সোহার বুকের সঙ্গে মাথা ঠেস দিয়ে সোহার মুখের দিকে তাকায়। রাগী গলায় বলে,
“বমি করলি কেন?”
সোহা মিনমিন করে বলে,
“বমি পেলে কী করব? বমি আটকে রাখা যায়?”
“নিজে তো বমি করলি-ই সঙ্গে আমাকেও করিয়ে ছাড়লি। বমি করে মাথা ঘুরছে চরকির মতো। এর পর আর একদিন খাওয়ার সময় বমি করলে তোর খবর আছে।”
“বমি পেলে কীভাবে আটকে রাখব?”
“এখন থেকে হয় তুই আগে খেয়ে নিবি নয়তো আমি খাওয়ার পর খাবি। এক সঙ্গে খেতে বসে আমার খাওয়ার বারোটা বাজাবি না।”
“আচ্ছা।”
শ্রবণ কয়েক ঢোঁক পানি পান করে বসা থেকে উঠে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। ওর নিজেকে এখন তিন দিনের অনাহারী আর সাত দিনের বেরামি মনে হচ্ছে।
চলবে…………
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
দিশেহারা পর্ব ১১
-
দিশেহারা পর্ব ১৯
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৭
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
দিশেহারা পর্ব ৩৫