দিশেহারা (২৪)
সানা_শেখ
শ্রবণ সোহার হাত ধরে সকলের দিকে একবার নজর বুলিয়ে বজ্র কন্ঠে বলে,
“কোনোদিন কোনো ছেলে ওর দিকে তাকালে তার খবর আছে। আর কোনো কু/ত্তা/র বাচ্চা ওর গায়ে হাত তোলা তো দূর ওকে ফুলের টোকা দিলেও শরীরের সঙ্গে আর হাত থাকবে না ফুল ছোঁয়ার জন্যও।”
কথাগুলো বলেই সোহাকে নিয়ে পার্কিং এর দিকে আগায়। সোহা এখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছে।
শ্রবণ নিজের ব্ল্যাক মার্সিডিজ বেঞ্জ নিয়ে ভার্সিটির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে আসে রাস্তায়। রাগে ওর মাথা ফেটে যাচ্ছে। ও ওর বউকে মা’র’বে কা’ট’বে খু’ন করবে কিন্তু বাইরের একটা মানুষও ওর বউয়ের সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে পারবে না, গায়ে হাত তোলা তো অনেক দূরে।
অল্প সময়ের মধ্যেই গাড়ি বিশাল ভবনের পার্কিং লটে এসে দাঁড়ায়। সোহা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ানোর পর শ্রবণ গাড়ি পার্কিং করে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
লিফট থেকে বেরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজার খুলে ভেতরে প্রবেশ করে দু’জন। আসতে আসতে সোহার কাছ থেকে রাস্তায় শুনে নিয়েছে পুরো কাহিনী।
শ্রবণের চোখমুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে এখনও।
সোহাকে ওই শ’য়’তা’নটা ছুঁয়েছে এটা শুনে মাথায় আরও আগুন ধরে গেছে।
চোখ বন্ধ করে রেখে বলে,
“যা গোসল করে আয়।”
সোহা হাতের ব্যাগ ফ্লোরে রেখেই সোজা আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। কাঁদতে কাঁদতে মাথা ধরে গেছে। শ্রবণের চোখমুখ দেখে এখন আরও ভয় করছে। বাইরের কোনো ছেলে ওকে ছুঁয়েছে এটা শোনার পর যে শ্রবণ এখনও ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে এটাই অনেক। কাপড় চোপড় বের করে নিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
শ্রবণ ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে। দুই হাতে খামচে ধরে নিজের মাথার চুল। ওই কু/ত্তা/র বাচ্চাকে হাতের কাছে আরেকবার পেলে ওর হাত-ই ছিঁড়ে নেবে।
প্রায় আধা ঘন্টা পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে সোহা। শ্রবণ এখনও আগের মতোই বসে আছে।
ওর চোখমুখের দিকে তাকানোর সাহস এখন হচ্ছে না সোহার। তখন ওদের মে’রে’ছে এখন ওকেও মা’র’তে পারে শ্রবণকে দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই।
ভেজা কাপড় চোপড় নিয়ে ব্যালকনিতে চলে আসে। শুকনোগুলো তুলে নিয়ে ভেজাগুলো মেলে দেয়।
রুমে ফিরে আসতেই দেখে শ্রবণ উদাম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
“টাওয়েল দে।”
সোহা দ্রুত চুল থেকে টাওয়েল খুলে দিয়ে দেয়। শ্রবণ টাওয়েল হাতে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়িয়ে বলে,
“কফি নিয়ে আয়।”
সোহা রুম থেকে বের হয়ে যায়।
শ্রবণ শাওয়ার ছেড়ে নিচে দাঁড়িয়ে রইলো সোজা হয়ে। সোহার বলা কথাগুলো এখনও কানে বাজছে। ওই
কু/ত্তা/র বাচ্চাকে সামনে পেলে সত্যি সত্যিই মা’র’বে আবার। শ্রবণ চৌধুরীর ওয়াইফকে ছোঁয়ার স্বাদ মিটিয়ে দেবে চিরদিনের জন্য।
রাগে ওর কপাল আর ঘাড়ের প্রত্যেকটা রগ ভেসে আছে। হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে রাখার কারণে হাতের রগগুলোও ভেসে উঠেছে আবার।
শ্রবণ কোনোদিন মেয়েদেরকে র্যাগিং করে না। সেদিন প্রথম সোহাকে র্যাগিং করার জন্য নিয়েছিল আর অমন একটা ডেয়ার দিয়েছিল ওকে। শ্রবণ আগে থেকেই জানে সোহার মায়ের চরিত্র সম্পর্কে, ওর পুরোপুরি ধারণা ছিল সোহা মায়ের মতো হয়েছে। মা, খালা, নানি সবগুলোর চরিত্র তো একই, ফুলের মতো পবিত্র। শ্রবণ ভেবেছিল সোহা ডেয়ার পূরণ করার জন্য ওর বন্ধুকে কিস করবে কিন্তু ওকে ভুল প্রমাণ করে ওর বন্ধুকে কিস করার জন্য রাজি হয়নি। নাচতে বললে তাও রাজি হয়নি শেষে কান ধরে উঠবস করেছিল। সেদিন একটু হলেও সোহার প্রতি ওর ধারণা বদলেছিল কিন্তু যখন সামাদ চৌধুরী কল করে এব্যাপারে বলেন তখনই ওর মস্তিষ্কে আগুন ধরে আর সোহাকে ক্যালানোর ভূত ভর করে মাথায়।
গোসল সেরে বেরিয়ে এসে দেখে সোহা কফির মগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ড্রেস না পরেই কফির মগ হাতে তুলে নেয়। সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে চোখ দুটো এখনও পানিতে টুইটুম্বর হয়ে আছে।
“কী খাবি এখন? যা রান্না কর।”
সোহা বেরিয়ে যায় রুম থেকে। শ্রবণ কফির মগে চুমুক দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়।
ঘুরে ফিরে বারবার ওই শ’য়’তা’ন’টার চেহারা চোখে ভাসছে আর শরীরে আগুন ধরছে।
এখন হাতের কাছে পেলে কি যে করতো শ্রবণ নিজেও জানে না।
ও মেনেই নিতে পারছে না ওই ছেলে সোহার হাত ধরেছিল।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রুম থেকে বের হয় শ্রবণ। রাগ কিছুটা কমেছে এখন।
রান্নাঘরে এসে দেখে সোহা পানিতে হাত ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কপাল ভ্রু কুঁচকে বলে,
“রান্না হয়েছে?”
“হ্যাঁ। তুমি গিয়ে বসো, আমি সব নিয়ে আসছি।”
পানি থেকে হাত তুলতেই হাতের জ্বালা বেড়ে যায়। হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে চুলার কাছে এসে দাঁড়ায় ভাতের পাতিল নামানোর জন্য। শ্রবণ ওর কাছে এগিয়ে এসে হাতটা ধরে দেখতে দেখতে বলে,
“হাতে কী হয়েছে?”
“কিছু না।”
“কিছু হয়নি তাহলে এভাবে ঝাঁকাচ্ছিস কেন?”
সোহা চুপ করে থাকে। শ্রবণ হাতের দিকে ভালোভাবে নজর দিয়ে বলে,
“হাত এমন লাল হয়েছে কেন? কী হয়েছে? কতক্ষন ধরে হাত ভিজিয়ে রেখেছিস?”
“হাত জ্বলছে।”
“কেন?”
“মরিচ ধরার জন্য।”
শ্রবণ হাতের দিকে তাকিয়ে আছে, সোহার হাতের আঙুলগুলো কাপছে। অনেকক্ষণ ধরে বোধহয় পানিতে হাত ডুবিয়ে রেখেছে, হাতের চামড়া কুঁচকে গেছে। লাল হয়ে গেছে পুরো হাত।
“প্রত্যেকদিন রান্নার সময় এমন হয়?”
মাথা নাড়ে সোহা। শ্রবণ সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যন্ত্রণায় সোহার চোখমুখ কাতর দেখাচ্ছে। চোখ দুটো টলমল করছে। শ্রবণ সোহাকে টেনে এনে আবার সিংকের পাশে দাঁড় করায়। পানিতে হাত ডুবিয়ে দিয়ে ফ্রিজ থেকে আইস কিউব বের করে নিয়ে আসে। আইস কিউব বাটির পানিতে দিতেই সোহা বলে,
“আর লাগবে না, তুমি গিয়ে টেবিলে বসো আমি ভাত বেড়ে নিয়ে আসছি।”
“চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।”
সোহা পানিতে হাত ডুবিয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। যেই শ্রবণ সবসময় ওকে কষ্ট দিতে যন্ত্রণা দিতে মুখিয়ে থাকে সে আজ ওর যন্ত্রণা কমানোর চেষ্টা করছে?
শ্রবণের চোখমুখ গম্ভীর, দেখে অনুমান করার সাধ্য কারো নেই ও কি ভাবছে।
আজ সকালে সোহার ঘুম আগে ভাঙে। নড়াচড়া করতে গেলে বুঝতে পারে শ্রবণ ওকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরে আছে। গায়ের উপর থেকে আস্তে আস্তে শ্রবণের হাত পা সরিয়ে দেয়। উঠে বসতে গেলেই চুলে টান লাগে। ব্যথা পেয়ে পুনরায় শুয়ে পড়ে, মুখ দিয়ে মৃদু শব্দ বেরিয়ে এসেছে। ওর নড়াচড়ায় শ্রবণের ঘুম হালকা হয়ে আসে। নড়েচড়ে পুনরায় সোহাকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চুপ হয়ে যায় আবার।
সোহা শ্রবণের হাত সরিয়ে দিতে দিতে বলে,
“সকাল হয়ে গেছে, জিমে যাবে না?”
“হুম, ক’টা বাজে?”
সোহা শ্রবণের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফোনে সময় দেখে বলে,
“সাড়ে পাঁচটার উপর।”
সাড়ে পাঁচটার উপর বাজে শুনে শোয়া থেকে উঠে বসে শ্রবণ। রাতে ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিল সেজন্য সকালে ঘুম ছাড়তে চাইছে না।
অল্প সময়ের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যায় জিমে যাওয়ার জন্য।
সোহা নিজেও ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হয়। তখনই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন মাজেদা আন্টি। ওনার হাতে অল্প কিছু সবজি আছে, হয়তো ওদের জন্যই নিয়ে এসেছে।
উনি সোহার সঙ্গে টুকটাক কথা বলে রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। গতকালকের জমিয়ে রাখা থালাবাসন ধুয়ে পরিষ্কার করে রেখে দেন গুছিয়ে। রান্নাঘর পরিষ্কার করে ড্রয়িং রুম ঝাড়ু দেন।
মাজেদা আন্টি নাস্তা তৈরি করতে নিলে সোহা বলে,
“নাস্তা তো বাইরে থেকেই নিয়ে আসে।”
“আমাকে তো শ্রবণ গতকাল বলেছিল এখন থেকে সকালে এসে নাস্তা বানিয়ে দেওয়ার জন্য।”
“ওহ।”
“দুপুরে কী কী খাবে? নাস্তা তৈরি করে দুপুরের খাবার তৈরি করে রেখে যাব।”
“দুপুরের খাবার তো আমিই তৈরি করি।”
“আমাকে বলেছে দুপুরের আর রাতের রান্নাও করে রেখে যেতে।”
সোহা আর কিছু বলে না।
রান্নাঘর থেকে বের হওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই মাজেদা আন্টি বলেন,
“তুমি শ্রবণের আপন চাচাতো বোন?”
সোহা আবার ঘুরে দাঁড়ায়। মাথা নাড়ে “হ্যাঁ” বোঝায়।
মাজেদা আন্টি আবার বলেন,
“শ্রবণের সঙ্গে বাড়িতে কোনো ঝামেলা হয়েছে? ও বাড়িতে গিয়ে থাকে না কেন? বিয়ের সময় গিয়ে শুধু কিছুদিন ছিল।”
সোহা মনে মনে কিছু একটা ভেবে বলে,
“আমি তো সেভাবে কিছু জানি না। ছোটো বেলা থেকেই এমন দেখে আসছি।”
“তোমরা একে অপরকে আগে থেকেই ভালোবাসতে?”
“না।”
“পারিবারিকভাবে বিয়ে তোমাদের?”
সোহা চুপ করে থাকে।
“কথা বলছো না কেন?”
“ভাইয়ার ইচ্ছায় হয়েছিল বিয়ে।”
“ওহ। শ্রবণ কিন্তু খুব ভালো ছেলে।”
সোহা জোর পূর্বক মৃদু হেসে বলে,
“হুম।”
সোহা আর দাঁড়ায় না রান্নাঘরে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বেডরুমে চলে আসে। ওকে আর রান্না করতে হবে না ভেবেই অনেক আনন্দ হচ্ছে। এখন থেকে আর হাত জ্বালা করবে না। জানালার পর্দা সরিয়ে গ্লাস খুলে দেয়। বাইরে থেকে সকালের হিমেল হাওয়া এসে ছুঁয়ে যায় ওর সারা অঙ্গ। চোখ বুঁজে লম্বা একটা শ্বাস টেনে নেয়। কেন যেন ভালো লাগছে এখন। আনন্দ আনন্দ ফিল হচ্ছে।
আজকেও সোহাকে নিয়ে ভার্সিটিতে এসেছে শ্রবণ। গাড়ি থেকে বেরিয়ে ওর বন্ধুদের কাছে এগিয়ে আসে। আশেপাশের ছেলেমেয়েরা ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে বিশেষ করে মেয়েরা তাকিয়ে আছে শ্রবণের দিকে।
শ্রবণ আগে থেকেই ভার্সিটির ক্রাশবয়। ওর লুক, পার্সোনালিটি, অ্যাটিটিউট সকল মেয়ের নজর কাড়ার জন্য যথেষ্ট। মেয়েদের ধারে কাছে যাওয়া তো দূর চোখ তুলে তাকিয়েও দেখে না কখনও। গতকালই বোধহয় কোনো মেয়ের দিকে ভালোভাবে তাকিয়েছিল আর একটা চড় বসিয়েছিল। গতকালকের শ্রবণকে দেখে তো অনেক মেয়ে রীতিমতো ফ্যান্টাসিতে ভুগছে। সব মেয়ে তো শ্রবণের মতোই জীবন সঙ্গী চায়। ওর মতো জীবন সঙ্গী হলে আর কী লাগে?
সোহার ভাগ্য নিয়ে কথা বলছে অর্ধেকের বেশি মেয়ে। এই মেয়েই প্রথম শ্রবণের কাছে র্যাগিং হয়েছিল আর এই মেয়েকেই বিয়ে করে নিল শ্রবণ? কি ভাগ্য মেয়েটার!
চলবে……….
ভালো ভালো মন্তব্য আর রেসপন্স বেশি বেশি করলে আগামীকাল গল্প দেওয়ার চেষ্টা করবো ইনশা-আল্লাহ।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ২২
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৩
-
দিশেহারা পর্ব ১৪