দিশেহারা (১৭)
সানা_শেখ
“ভা ভাইয়া, ওটা সরাও, আগুন লেগে যাবে।”
“লাগাতেই তো চাইছি।”
“ভুল হয়ে গেছে আমার, এবারের মতো মাফ করো, আর জীবনেও এমন ভুল হবে না শুধু এবারের মতো মাফ করে দাও।”
শ্রবণ হাতের লাইটার নিভিয়ে রেখে দেয় পাশে। সোহাকে ঝাড়া দিয়ে ছেড়ে ধমক দিয়ে বলে,
“যা আমার রুম আর চোখের সামনে থেকে। তোদের ছায়া দেখা মানেও নিজের দৃষ্টি নষ্ট করা।”
সোহা ঘুরে দাঁড়াতেই শ্রবণ আবার বলে,
“এই দাঁড়া, তুই যাবি না এই রুমের বাইরে। বাইরে গেলে দেখা যাবে তোর নষ্টা মা তোকে কোন লোকের বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে।”
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সোহা। শ্রবণকে কিছু বলার মতো সাহস ওর নেই। শ্রবণ আবার বলে,
“আজকের পর থেকে ওই অনিমা কু/ত্তা/র বাচ্চার সাথে কথা বলতে পারবি না।”
ভয়ে মাথা নাড়ায় শ্রবণের কথার তালে।
“কোনো ছেলের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারবি না।”
মাথা নাড়ে সোহা।
“যা ঘুমা।”
সোহা চুপচাপ বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে কিনার ঘেঁষে। শ্রবণ আগের মতোই বসে রইলো। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। অনিমা চৌধুরীর বলা কথাগুলো কিছুতেই মাথা থেকে বের হচ্ছে না।
প্রায় ঘন্টা খানিক সময় পেরিয়ে গেছে। সোহা চুপচাপ একভাবে শুয়ে আছে, শ্রবণও আগের মতোই বসে আছে।
দরজা ধাক্কানোর শব্দে দরজার দিকে তাকায় শ্রবণ। সোহা নিজেও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় দরজার দিকে। একটু পরেই সামাদ চৌধুরীর গলার স্বর ভেসে আসে। উনি শ্রবণের নাম ধরে ডাকছেন।
শ্রবণ বসা থেকে উঠে দরজার কাছে এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়।
“ডাকছো কেন?”
“খাবে না? নিচে চলো।”
“খাব না, তুমি খেয়ে শুয়ে পড়ো।”
“খাবে না কেন? ঔষুধ খেতে হবে তো, চলো।”
“ওই নষ্টদের হাতের খাবার খাব না আমি।”
“তাহলে মেডদের বের করে দিলে কেন?”
“আমি খাব না দাদা ভাই, তুমি খেয়ে বিশ্রাম নাও।”
“খাবার না খেয়ে ঔষুধ খাবে? অসুস্থ হয়ে পড়বে আবার।”
“এতকাল যখন ম’রি’নি তখন আজকেও ম’র’বো না। সারাদিন অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছো, এখন খেয়ে বিশ্রাম নাও।”
“রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে আসতে বলি।”
“দাদা ভাই, বলছি তো খাব না, যাও।”
“সোহাও তো খায়নি, ওকে আসতে বলো।”
“একদিন না খেয়ে থাকলে ম’র’বে না, যাও।”
দরজা লাগিয়ে দেয় শ্রবণ। সামাদ চৌধুরী হতাশ হয়ে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে গলা ছেড়ে বলেন,
“শ্রবণ ঔষুধ গুলো খেয়ে নিও।”
শ্রবণ ধীর পায়ে হেঁটে বিছানায় এসে বসে আবার। মাথা ব্যথা বাড়ছে ধীরে ধীরে। ওই দু’জনের হাতের রান্না তো জীবনেও খাবে না, বাইরের খাবারও খেতে ইচ্ছে করছে না।
লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে শ্রবণ। কয়েক মিনিট পেরিয়ে যায়।। সোহা ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। শ্রবণ চোখ বন্ধ করে আছে।
শুকনো ঢোঁক গিলে ভয়ে ভয়ে ডাকে,
“ভা ভাইয়া।”
শ্রবণ চোখ মেলে সোহার দিকে তাকায়। শ্রবণের লাল টকটকে চোখ জোড়া দেখে ভয়ে গলা আরও শুকিয়ে যায়। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন ওকে এখনই চোখের আগুনে ভস্ম করে দেবে।
সোহা নিজের ভয়কে ধামা চাপা দিয়ে কম্পিত স্বরে বলে,
“ঔষুধ খেলে না?”
শ্রবণ চুপ হয়ে থাকে। ওকে চুপ থাকতে দেখে সোহা মনে একটু সাহস পায়। আবার ঢোঁক গিলে বলে,
“ঔষুধ খেয়ে ঘুমাও।”
“কিরে, তুই বউয়ের মতো কথা বলছিস কেন?”
শ্রবণের গম্ভীর স্বর সোহার বুকে কাঁপুনি বাড়িয়ে দেয়। কম্পিত স্বরে বলে,
“না মানে দাদা ভাই বলেছিল ওই…”
“দাদা ভাই কী বলেছিল?”
“ও ঔষুধ খেয়ে ঘুমাও।”
“ঘুমা।”
শ্রবণের হঠাৎ ধমকে অনেক জোরে কেঁপে ওঠে সোহা। উল্টো ফিরে আর তাকায় না শ্রবণের দিকে। দাদা বার বার ওকে বলেছিল শ্রবণ ঔষুধ না খেলে সোহা যেন বলে বলে খাওয়ায়। সোহা আরেকবার ঔষুধ খাওয়ার কথা বললে শ্রবণ ঔষুধ না খেয়ে ওকেই কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
কারো ফোঁপানোর শব্দে ঘুম ভাঙে সোহার। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নিয়েছে, পরমুহুর্তেই হুড়মুড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। রুমে ঘুটঘুটে অন্ধকার ব্যতীত কিছুই দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারের মাঝেই এদিক ওদিক তাকায় ঘাড় ঘুরিয়ে। ফোঁপানোর শব্দ ওর পাশ থেকেই আসছে। শ্রবণ কাদঁছে? কিন্তু কেন কাদঁছে?
তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। অনুমান করে অন্ধকার হাতড়ে রুমের লাইট অন করে। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে শ্রবণ উপুর হয়ে বালিশে মুখ গুজে ফোঁপাচ্ছে। শ্রবণের ধমক খাওয়ার পর আর কোনোদিকে তাকায়নি সোহা। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতে থাকতেই ঘুমিয়ে গিয়েছিল।
ভয়ে ভয়ে শ্রবণের কাছে এগিয়ে এসে ডাকে,
“ভাইয়া, ভাইয়া কী হয়েছে তোমার?”
শ্রবণ কিছু বলে না তবে ওর ফোঁপানোর শব্দ কমে এসেছে।
“ঠিক আছো? কী হয়েছে তোমার? ভাইয়া।”
শ্রবণ এবারেও কিছু বলে না। সোহা ভাবছে ঘুমের ঘোরে কাদঁছে সেজন্য মনে সাহস যুগিয়ে শ্রবণের গায়ে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাকে আবার।
গায়ে হাত দেওয়ায় শ্রবণ ভীষণ রেগে যায়। ডান হাতের এক থাবায় সোহাকে ছিটকে ফেলে দেয় নিচে। জড়ানো গলায় বলে,
“দূরে থাক আমার কাছ থেকে, ভুলেও আমার গায়ে তোর নোংরা হাত ছোঁয়াবি না।”
পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে সোহা। বিছানার দিকে তাকিয়ে সোজা হয়ে বসে। শ্রবণ এখনও বালিশে মুখ গুজে আছে। শ্রবণ কেন কাদঁছে সোহা বুঝতে পারছে না। ও কি ঘুমায়নি? সারারাত ধরেই জেগে আছে?
ভয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসও পাচ্ছে না।
শ্রবণ কিছু সময় নিশ্চুপ থাকলেও আবার ফুঁপিয়ে ওঠে। ফোঁপানোর কারণে ওর পুরো শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে।
শ্রবণ রাতে ঔষুধ খায়নি মনে পড়ে সোহার। ঔষুধ না খাওয়ার কারণেই কী এমন করছে? হতে পারে।
বসা থেকে উঠে ভয়ে ভয়ে আবার এগিয়ে আসে শ্রবণের দিকে, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ায় যেন আবার ফেলে দিতে না পারে।
“কী হয়েছে তোমার? এভাবে কাদঁছো কেন?”
শ্রবণ মুখ তুলে সোহার দিকে তাকায় ঘাড় ঘুরিয়ে। ওর চোখ জোড়া দেখে সোহার আত্মা কেঁপে ওঠে। চোখ জোড়া পানির বদলে যেন র’ক্তে টুইটুম্বর হয়ে আছে। ভয় পেয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে যায়। মানুষ কম অন্য কিছু মনে হচ্ছে শ্রবণকে।
শোয়া থেকে উঠে বসতে গিয়ে পড়ে যেতে নেয়, দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে কোনো রকমে উঠে বসে। মাথায় এত পরিমাণ যন্ত্রণা হচ্ছে যে সবকিছু ঘোলা ঘোলা দেখছে। ঘুম আসছে না, বার বার মা আর বোনের কথা মনে পড়ছে। অদ্ভুত সব হ্যালুসিনেশন করছে। জেগে থেকেও স্বপ্নে দেখছিল ওর মা-বোনকে ওর সামনে খু’ন করা হচ্ছে নৃশংসভাবে। আরও কত কিছুই যে চোখে ভাসছিল। মা-বোনের কথা স্মরণ করে আজকে আর নিজেকে সামলাতে পারছিল না, ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছে নিজের অজান্তেই। মাথার যন্ত্রণায় পাগলের মতো লাগছে এখন। রাতে ঔষুধ না খেয়ে অনেক বড়ো ভুল করেছে। এখন নিজের মাথা নিজেরই ফাটিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।
শ্রবণ বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সোহা ভয়ে সরে যায় সামনে থেকে। শ্রবণ সোজা ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। ড্রেসিং টেবিলের উপরেই ঔষুধগুলো রেখেছিল।
ঔষুধ বের করে খুলতে শুরু করে। সোহা তাকিয়ে আছে শ্রবণের দিকেই। শ্রবণ স্লিপিং পিল পুরো কয়েক পাতা খুলে ফেলেছে। সবগুলো হাতের মুঠোয় নিয়ে সেন্টার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে ঔষুধগুলো খেতে গেলেই সোহা দৌড়ে এসে শ্রবণের হাত থেকে ঝাড়া দিয়ে ঔষুধগুলো ফেলে দেয়। ভয়ার্ত কন্ঠে বলে,
“এসব কী করছ? এতোগুলো ঘুমের ঔষধ কেন খেতে চাইছ?”
শ্রবণ নিভু নিভু দৃষ্টিতে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“ঘুমাবো, আমার ঘুম আসছে না। আমি অনেক কাল ধরে ভালোভাবে ঘুমোতে পারিনি। আজকে সবগুলো ঘুমের ঔষুধ খেয়ে মহা কালের ঘুম ঘুমাব। কোথায় ফেললি? সবগুলো খুঁজে দে দ্রুত।”
“কী সব বলছ? ডাক্তার তো একটা খেতে বলে।”
“আমি সবগুলো খাব। ঔষুধ খুঁজে দে নয়তো আমার যন্ত্রণা কমিয়ে দে।”
“মাথা ব্যথা করছে?”
“মাথা ব্যথা করছে, বুকে ব্যথা করছে, সব জায়গায় ব্যথা করছে।”
সোহা কিছু বলার জন্য উদ্যত হয়েছিল কিন্তু শ্রবণ ওর দিকে এগিয়ে আসায় আর বলতে পারে না। পিছিয়ে যাওয়ার আগেই শ্রবণ খপ করে ওর হাত চেপে ধরে। ব্যাকুল স্বরে বলে,
“এই যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দে সোহা, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মাথা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে মাথা গুড়ো গুড়ো করে ফেলি।”
দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে দুলতে দুলতে নিচে বসে পড়ে শ্রবণ। সোহা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে শ্রবণের মুখের দিকে। শ্রবণ সোহাকে টেনে বসায় নিজের সামনে। আগের চেয়েও করুণ সুরে বলে,
“সোহা তুই মে’রে ফেল আমাকে, আমি মে’রেছিলাম না তোকে, তুই আমাকে জানে মে’রে প্রতি’শোধ নিয়ে নে। আমি কিচ্ছু বলবো না তোকে, সত্যি কিছু বলবো না। মে’রে ফেল না, বসে আছিস কেন?”
সোহার হাত টেনে নিজের গলায় চেপে ধরে শ্রবণ।
“মে’রে ফেল নয়তো এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দে আমাকে। মা’র’ছিস না কেন? মা’র। গলা চেপে মা’রতে না পারলে ছু’রি নিয়ে আয়, গলা কে’টে দে।”
রীতিমত পাগলামি শুরু করেছে শ্রবণ। সোহাকে বার বার জোর করছে ওকে মে’রে ফেলার জন্য।
ওর অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠে সোহা। শ্রবণের গলা থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে আসতে চায়। শ্রবণ সোহার হাত ছেড়ে ওর দুই গালে হাত রেখে মুখ আগলে ধরে।
“তুই কাঁদছিস কেন? মা’রবি না আমাকে? তোকে তো মে’রে’ছিলাম আমি, তুইও আমাকে মে’রে ফেল।”
সোহা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“তু তুমি শান্ত হও, এমন করছো কেন?”
শ্রবণ মাথা সোজা করে রাখতে পারছে না। শোয়া থেকে ওঠার পর থেকেই মাথা এদিক ওদিক হেলে পড়ছে বার বার। এখন আরও বেশি এমন হচ্ছে।
মাথা ঠিক রাখতে না পেরে সোহার কাঁধের ওপর মাথা রেখে গলা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে, তবুও সোহাকে নিয়েই হেলে পড়ে যেতে নেয়। সোহা নিজেও কোনো রকমে শ্রবণকে ধরে সোজা হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করে। সোহার কাঁধে ভর ছেড়ে দিয়ে জড়ানো গলায় বলে,
“আমি ম’রে গেলে আম্মুর কবরের পাশে কবর দিস আমাকে।”
চলবে…………….
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ৩২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ৮