Golpo romantic golpo তোমার হাসিতে

তোমার হাসিতে পর্ব ২৮


তোমার_হাসিতে

ফারহানাকবীরমানাল

২৮.
বাদশা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে রাস্তা দেখা যায় না। সে ইশারায় আমাকে ডাকল। ফিসফিসিয়ে বলল, “তানহার নানি কী করে?”

“মোবাইলের দিকে তাকিয়ে আছে।”

“এই মহিলা কী যাবে না?”

“সে কথা আমি জানি না। তোর যদি এতই জানতে ইচ্ছে করে তাহলে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নে।”

“মশকরা করছিস?”

“না, সিরিয়াসলি বলছি।”

বাদশা চোখ-মুখ কুঁচকে তাকাল। বিরক্তি নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “বুড়িটা মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রেমিকের নম্বর খুঁজছে নাকি?”

এক হাত দিয়ে নিজের মুখ চেপে ধরলাম। হো হো করে হেঁসে ওঠা যাবে না। তানহার নানি শুনলে ঝামেলা। ভদ্রমহিলা বেশ অনেক সময় নিয়ে মোবাইলে কিসব খুঁজল। তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা এগোতেই তার পা পড়ল গোবরে উপরে। রাস্তার একপাশে কাঁচা গোবর। যেন মাত্রই গরু তার কাজ সেরে রেখে গিয়েছে। তানহার নানি চিৎকার দিয়ে সরে দাঁড়াল। ঝাঁঝালো সুরে বলল, “এদের কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই। রাস্তার উপর দিয়ে গরু নিয়ে যায়।”

বলেই হনহনিয়ে হাঁটা ধরল। তার হাতে ধরে রাখা বাজারের থলে সামনে পেছনে দোল খাচ্ছে। ভালো লাগছে দেখতে।

সে চলে যেতে আমরা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলাম। বাদশা বলল, “সামনে যাবি নাকি পেছনে?”

“সামনে যাব। এতদূর এসে ফিরে যাওয়ার কোন মানে নেই। ফোনে নেটওয়ার্ক এলে দারোগা সাহেবকে লোকেশন পাঠিয়ে রাখতে হবে।”

“নেটওয়ার্ক নেই। যাইহোক, সামনে চল।”

দু’জনে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম৷ জায়গাটা সুন্দর। রাস্তার দু’পাশে সরু সরু মেহগনি গাছ। গাছে নতুন পাতা গজিয়েছে। হালকা হালকা বাতাস বইছে। সব মিলিয়ে চমৎকার পরিবেশ।

বেশ অনেকখানি পথ পেরিয়ে একটা কুটিরের দেখা পেলাম। গাছগাছালিতে ঘেরা ছবির মতো সুন্দর। বাদশা আমার আগে আগে হাঁটছিল। পায়ের গতি বাড়িয়ে ওর হাত ধরে ফেললাম। চিকন সুরে বললাম, “এভাবে বাড়ির ভেতরে যাওয়া ঠিক হচ্ছে?”

“ভুল কিছু হচ্ছে না। তাছাড়া আমরা সরাসরি বাড়িতে ঢুকব না। কুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে সবুজের নাম ধরে ডাকব।”

“জিজ্ঞেস করলে কী বলবি?”

“বলব– উনার লেখা কবিতার পড়ে দেখা করতে এসেছি। লেখকদের সাথে হুটহাট কেউ দেখা করতে এলে তারা ভীষণ আপ্লূত হয়। এদের খুশি করা সহজ। লেখার দুই চার লাইন প্রশংসা করলেই হলো। ব্যাস! কাজ শেষ।”

“আচ্ছা।”

বাদশা ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপরই একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে সবুজের নাম ধরে ডাকল। দুইবার ডাকতেই ঘরের ভেতর থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এলো। তার পরনে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি। ছেলেটা আমাদের দেখে হাসল। হাসি-হাসি মুখে আন্তরিক সুর বের করে বলল, “আপনাদের তো ঠিক চিনলাম না।”

বাদশা বলল, “আপনি আমাদের চিনবেন না। আমরা আপনার পাঠক। আপনার লেখা কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছি। এটাই মুগ্ধ হয়েছি যে খোঁজ খবর নিয়ে দেখা করতে চলে এসেছি৷ হাতে করে কিছু নিয়ে আসা হয়নি। এজন্য খুবই দুঃখিত।”

সবুজ আমাদের দিকে তাকিয়ে বিনীত ভঙ্গিতে হাসল। কোমল গলায় বলল, “আপনারা এত কষ্ট করে দেখা করতে এসেছেন এটাই আমার কাছে অনেক বেশি৷ লেখক হিসাবে এর চেয়ে বড় পাওনা আর কী হবে পারে? কিছুই না।”

“শুনে ভালো লাগল। খাতা নিয়ে এসেছি। যদি আপনার একটা অটোগ্রাফ দিতেন।”

“নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু আপনারা দাঁড়িয়ে থাকবেন না। রোয়াকে এসে বসুন। চা পান করেন নিশ্চয়ই?”

“হ্যাঁ। মাঝেমধ্যেই চা খাওয়া পড়ে।”

“আমি চা পান করি না। কাজেই আমার এখানে চায়ের ব্যবস্থা নেই। তবে আপনাদের যত্ন-আত্তির কোন ত্রুটি হবে না।”

“এত ব্যস্ত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনার একটা অটোগ্রাফ আমাদের জন্য যথেষ্ট।”

“সে কথা বললে কীভাবে হবে? আমার সকল পাঠক আমার কাছে খুব সম্মানের এবং ভালোবাসার। তারা বাড়ি পর্যন্ত এসে ফিরে যাবে এটা হতে পারে না। আপনারা বসুন। অমত করবেন না।”

বারান্দার একপাশে মোড়া পাতানো। সামনে ছোট মতো একটা টেবিল। টেবিলের উপর ফুলদানি রাখা, তাতে বুনোফুল শোভা পাচ্ছে। কবিদের ভাবসাব আলাদা রকমের। দেখলেই কেমন বিরক্ত লাগে। এই সবুজও তেমন বিরক্তিকর। কথার ধরন শুনলে মেজাজ খারাপ হয়। বিদখুটে ভাষায় কথাবার্তা বলে।

বাদশা আর আমি মোড়ায় বসে পা দোলাচ্ছি। সবুজ এখানে নেই৷ সে আমাদের মোড়ায় বসতে দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকছে। মিনিট দশেক হতে চলল বের হওয়ার নাম নিচ্ছে না। এই বাদশার ভাবসাবও বুঝতে পারছি না। এমন ভাব করছে যেন সত্যিই সে বিশাল মাপের একজন পাঠক। কবির সান্নিধ্যে পেয়ে ধন্য হয়েছে।

ঘড়ি ধরা আঠারো মিনিট পর সবুজ বাইরে এলো। নরম স্বরে বলল, “পোশাক বদলে নিলাম। আপনারা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমি যাব আর আসব।”

আমি বললাম, “কোথায় যাবেন?”

“বাজারে যাব। ঘরে বিশেষ কিছু নেই। টুকটাক জিনিসপত্র কিনতে হবে। দুপুরে দু’টো ভাত মুখে না দিয়ে যেতে পারবেন না।”

“আরে না না। এসব কী? আপনি নেই, আমরা আপনার বাড়িতে একা থাকব– এটা হয় না।”

সবুজ হো হো করে হেঁসে উঠল।

“আরে মশাই, আমার বাড়িতে চুরি ডাকাতি করার মতো কিছু নেই৷ ঘরের ভেতরে ভাঙাচোরা একটা খাট আছে। রান্নাঘরে দু’টো মাটির চুলা। হ্যাঁ, তবে ফুলের গাছ আছে। ইচ্ছে করলে সবকিছু ঘুরে দেখতে পারেন। আমি চললাম।”

সবুজ বেরিয়ে গেল। আমি বললাম, “বাদশা তোর সবুজের এই আচরণ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?”

“না। সবুজ আমাদের সাথে অভিনয় করছে। তবে এর কারণ বুঝতে পারছি না।”

“লোকজন ডাকতে গেল নাকি?”

“জানি না। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। জায়েদাকে খুঁজতে হবে। আমি নিশ্চিত জায়েদা এখানেই কোথাও আছে। এই বাড়িতে না থাকলেও সবুজের বাবা-মা যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়িতে আছে।”

দু’জনে উঠে দাঁড়ালাম। আমরা উঠে দাঁড়াতেই জায়েদা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। দরজার সামনে ঝোলানো পর্দা সরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। হাতে ধরে রাখা ট্রে-টা টেবিলের উপর রেখে বলল, “শরবত নিন।”

জায়েদা এখানে সে কথা অনুমান করেছিলাম, তবে এভাবে সামনে আসবে আশা করতে পারিনি। বিস্মিত মুখে ওর দিকে চেয়ে রইলাম। জায়েদা বলল, “কী হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”

আমি বললাম, “তুমি এখানে কী করছ?”

“তানহা আপুর ডাইরি চু’রির শা’স্তি হিসাবে আমাকে এখানে আটকে রেখেছে। তবে চিন্তার কিছু নেই– ওরা আমাকে মা’রধর করেনি।”

“তুমি এখান থেকে বের হচ্ছো না? কেউ কী তোমার কথা জানে না?”

“সে কথা জেনে আপনি কী করবেন? আপনার আমার সাথে যে কাজ ছিল তা অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন আমি আপনার কাছে উসুল করা বাকির খাতার মতো মূল্যহীন।”

“তুমি এভাবে কথা বলছ কেন?”

“কীভাবে কথা বলব বলে আশা করেন?”

“তুমি জানো তোমাকে নিয়ে আমরা কতটা চিন্তায় ছিলাম?”

“আপনি আমাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলেন না। কারণ আমি আপনার চিন্তায় থাকার মতো বিশেষ কেউ না। সেভাবে দেখতে গেলে আপনি ভীষণ স্বার্থপর। কাজ হাসিল হওয়ার পর ন্যূনতম খোঁজ খবর করার প্রয়োজন মনে করেননি।”

“তুমি জানো তানহার বাবা আমাদের দু-জনকে আটকে রেখেছিল?”

“হুম! তা রাখতেই পারে। তবে আমায় নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এ কথা বললে বিশ্বাস করব না।”

“কেন বিশ্বাস করবে না?”

“মা বলেছে– আপনারা আমার ব্যাপারে এক বিন্দু পরিমাণ আগ্রহী ছিলেন না। একবারের জন্যও খোঁজ খবর নেননি।”

“জায়েদা, আমরা…”

জায়েদা আমার কথা শেষ করতে দিলো না। বাদশা দিকে তাকিয়ে হতাশ স্বরে বলল, “আপনি তো একবার খোঁজ নিতেই পারতেন। পারতেন না?”

বাদশা বলল, “তানহার বাবা আমাকে আটকে রেখেছিল।”

“ছাড়া পাওয়ার পর?”

আমি বললাম, “জায়েদা তুমি আমাদের ভুল বুঝছ। হ্যাঁ এ কথা সত্যি তোমার জন্য যা করার দরকার ছিল তা আমরা করতে পারিনি। বিশেষ করে আমি কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু এখান পর্যন্ত তো এসেছি?”

জায়েদা হাসল। অসম্ভব সুন্দর ভঙ্গিতে বলল, “আমার মনে হয় আমাদের এখন বিদায় নেওয়া উচিত। আমি চাইব আমার সাথে যেন আর কখনো আপনাদের দেখা না হয়।”

“দেখা না হোক, তুমি ভুলে বুঝে থেকো না।”

“আমার ভুল ঠিক বোঝায় আপনাদের দুনিয়া পাল্টে যাবে না।”

“বেশ! বিদায় নেওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করতে চাই।”

“বলুন।”

“তোমার বাবা মা এখানে এসেছিল?”

“হ্যাঁ এসেছিল। তারা তানহার বাবার হাত পা ধরে আমার মুক্তির আবেদন জানিয়েছে। আমাকে ছেড়ে দিতে বলেছে। তানহার বাবা আমাকে মুক্তিও দিয়েছে। তবে বিনিময় নিয়ে।”

“কী বিনিময়?”

“আমাদের বাড়ির সমস্ত জায়গা জমি তার নামে দলিল করে দিতে হবে। আদালতে তার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে হবে।”

“তোমার বাবা মা রাজি হয়েছে?”

“না হয়ে উপায় কী ছিল?”

“তুমি এখানে এলে কীভাবে?”

“সবুজ মামা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিল। বেঁধে রেখেছিল।”

“তানহার বাবার সাথে সবুজ মামার কী সম্পর্ক?”

“এই সমাজে টাকার বিনিময়ে সম্পর্ক কিনতে পাওয়া যায়। অনেক কথা বলে ফেলেছি। এবার আসুন। বেশি সময় নিয়ে বিপদে পড়তে পারেন।”

“কী বিপদ?”

“বুঝতে পারছেন না নাকি বুঝেও না বোঝার ভান করছেন?”

জায়েদা সরল চোখে তাকিয়ে আছে। তার কণ্ঠস্বর শান্ত। কথা বলছে বড় মানুষের মতো খুব গুছিয়ে। এই কয়দিনে মেয়েটার এত পরিবর্তন হলো কীভাবে? ক্লাস সিক্সের মেয়ে এত গুছিয়ে কথা বলতে পারে?

জায়েদা গ্লাসের শরবত ফেলে দিলো। কঠিন মুখে বলল, “যে পথে এসেছেন সেই পথে যাবেন না। এই বাড়ির পেছন দিয়ে একটা সরু রাস্তা গেছে। ওই পথ ধরে চলে যান। খানিকটা গেলে নদীর দেখা পাবেন। নৌকা থাকে।”

“তুমি এতোকিছু কীভাবে জানো?”

জায়েদা কথার জবাব দিলো না, হাসল। বাদশা বলল, “আমরা যাব। তবে তোমাকে এখানে একা ফেলে যাব না। আমরা চলে গেলে ওরা তোমাকে আদর যত্ন করে বসিয়ে রাখবে না।”

“আমার কথা ভাবতে হবে না। নিজেদের কথা ভাবুন। বোকার মতো এতদূর কেন এসেছেন? বুঝতে পারেননি এটা একটা ফাঁদ?”

“বুঝেছি, তবে শেষ সময়ে।”

“সময় এখনও পুরোপুরিভাবে শেষ হয়ে যায়নি। জলদি করুন। সবুজ মামা চলে আসবে। সে কয়েকটা ছেলেপেলে জোগাড় করতে গেছে। আমাকে বলেছে শরবতের ভেতরে অজ্ঞান করার ওষুধ মিশিয়ে দিতে।”

“তুমি দিয়েছিলে?”

“না।”

“কেন?”

“কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় নেই। তাড়াতাড়ি করে বিদায় হন।”

বাদশা জায়েদার হাত ধরে ফেলল। হাত ধরে টানতে টানতে বলল, “কথা বলার সময় না থাকলে এত কথা বললে কেন?”

“জানি না। আমার হাত ছাড়েন। কী করছেন আপনি?”

“আমাদের সাথে চলো। পথ দেখিয়ে দাও।”

“আমি যাব না।”

“যাবে।”

বাদশা জায়েদার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমিও ওদের পেছনে যাচ্ছি। তবে এগোতে পারছি না। মাথা ঘুরছে। শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ঘুরে পড়ে যাব। এসব কী হচ্ছে আমার সাথে? একটার পর একটা সমস্যা লেগেই আছে। জীবনের শেষ সময় কী এমন করে আসে? হঠাৎই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়। আমার চোখ বুঁজে আসছে। মানুষের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। যেন অনেকগুলো মানুষ একসাথে ছুটে আসছে। সবুজ ওই ছেলেপুলেদের নিয়ে আসছে নাকি? ওরা কী আমাদের মে’রে ফেলবে?

মা’কে দেখতে পাচ্ছি। একটু দূরে মা দাঁড়িয়ে আছে। পরনে কটকটে কমলা রঙের শাড়ি। তবুও কী সুন্দর লাগছে দেখছে। তিমুও মায়ের পাশে দাঁড়ানো। নতুন বউয়ের মতো সেজেছে। পাশে বাবুই। সে-ও নতুন বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে৷ এসব কী সত্যি? নাকি আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? পানির পিপাসা লেগেছে। বাদশাকে একবার ডাকতে হবে। পানি চাইতে হবে। কিন্তু কীভাবে? আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না। শত চেষ্টা করেও কিছু বলতে পারছি না। শুনেছি কথাও এক ধরনের রিজিক। হিসাব করে লেখা থাকে। তবে কী আমার কথার রিজিক শেষ? আর কিছু বলতে পারব না?

একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে লাগছে। গন্ধটা ভীষণ সুন্দর। মন ভুলিয়ে দেয়।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply