তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
১৮.
গতরাতে তিমু বলেছিল– আজ পূর্ণিমা। আকাশে খুব বড় চাঁদ উঠবে। রাত বেশ গভীর। চাঁদ উঠেছে কি-না বুঝতে পারছি না। মাটির নিচের ঘরে বসে চাঁদ দেখার সুযোগ নেই। নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধে হচ্ছে না এই বেশি। বাদশাকে আর আমাকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। খুব শক্ত করে বেঁধেছে। তানহার বাবা এখন নেই। আমাদেরকে বাঁধার পরপরই চলে গিয়েছে। তার সাথে যারা ছিল তারাও গিয়েছে। রইস উদ্দিন বাদে। সে রান্নাবান্নার কাজ করছে। গোশত কষানোর সুন্দর গন্ধ নাকে লাগছে। সারাদিনে কিছু খাইনি। এক ফোঁটা পানিও না। খিদেয় পেট চোঁ-চোঁ করছে। পিপাসাও পেয়েছে খুব।
“কী হলো? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
বাদশার কথায় ওর দিকে তাকালাম। হতাশ স্বরে বললাম, “আমি আর সহ্য করতে পারছি না।”
“এ ছাড়া অন্য উপায় নেই। দাঁতে দাঁত কামড়ে হলেও সহ্য করতে হবে।”
“রইস উদ্দিনকে ডেকে পানি চাইব?”
“চাইতে পারিস। তেড়েফুঁড়ে মা’র’তে আসবে বলে মনে হয় না।”
আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। উঁচু গলায় রইস উদ্দিনের নাম ধরে ডাকলাম। সে রান্না ফেলে ছুটে এলো। খটাখটে গলায় বলল, “কী চাই?”
“পানি খাব।”
রইস উদ্দিন বেশ খানিকক্ষণ আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধুপধাপ পা ফেলে রান্নাঘরে চলে গেল। ফিরল জগ হাতে। কাঁচের একটা গ্লাসও এনেছে। সে আমার মুখের সামনে পানিভর্তি গ্লাস ধরল। নরম কোমল গলায় বলল, “খান।”
পরপর দু’গ্লাস পানি খেয়ে ফেললাম। বাদশাও খেল। আমি বললাম, “আমাদের না খাইয়ে রাখার হুকুম দিয়েছে নাকি?”
রইস উদ্দিনের চোখমুখের ধরন বদলে গেল। শক্ত গলায় বলল, “আমাকে এত কথা জিজ্ঞেস করবেন না।”
“কেন করব না? আমার সাথে এত নাটক করেছেন। কেন করেছেন?”
“স্যারের হুকুম।”
“কী হুকুম দিয়েছে আপনার স্যার?”
“আপনাকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে বলেছিল। এমন করে ফাঁদ সাজাতে বলেছিল যেন রহস্য উদঘাটন করে তারপর এই পর্যন্ত পৌঁছাতে হয়।”
“কেন করেছে?”
“স্যার দেখতে চেয়েছিলেন আপনার বুদ্ধি কেমন।”
“আমার বুদ্ধি দেখে তিনি কী করবেন?”
“সে কথা জানি না। স্যার জানে।”
“আপনার স্যার কী করে? বলতে চাইছি এই জায়গায় কী কাজ হয়?”
রইস উদ্দিন কথার জবাব দিলো না। উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে রইল। আমি বললাম, “খিদে পেয়েছে। খাবার-দাবার কিছু দিতে পারেন?”
“তরকারিতে পানি দিয়েছি। সেদ্ধ হলে দিচ্ছি।”
কথাগুলো বলে সে আবার রান্নাঘরে ঢুকে গেল৷ আমি এই জায়গার অবস্থান ঠিকমতো বুঝতে পারছি না। চারদিক থেকে আটকা কিন্তু আলো বাতাসের অভাব নেই। রান্না করা যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কোন অসুবিধে হয় না। মাটির নিচে এত সুবিধা পাওয়া যায় জানা ছিল না। বাদশা বলল, “তোর কী মনে হয়? কেন আমাদের এখানে বেঁধে রেখেছে?”
“শুধু আমাকে ধরলে কিছুটা অনুমান করা যেত। তোকেও যখন নিয়ে এসেছে তখন কিছু বুঝতে পারছি না।”
“তোর সাথে উনার শত্রুতা আছে?”
“তার সাথে আমার কোন শত্রুতা নেই। কিন্তু আমার সাথে তার কোন শত্রুতা আছে কি-না কীভাবে বুঝব।”
“এটা কোন ধরনের কথা?”
“তোকে কেন আটকে রেখেছে সে কথা কী বুঝতে পেরেছিস?”
“তোকে এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে আমাকে ব্যবহার করেছে। সরাসরি তোকেই নিয়ে এলে তিনি তোর বুদ্ধির ধার বুঝতে পারতেন না।”
“অনুমানের কথা বলতে চাই না। সরাসরি উনার মুখে শুনব।”
“তুই কী তোর ছোট চাচার বিয়ে ভাঙতে চেয়েছিলি?”
“নাহ। তেমনটা কখনো চাইনি। তবে…”
রইস উদ্দিনকে দেখে চুপ করে গেলাম। সে দুই থালা ভর্তি করে ভাত নিয়ে এসেছে। ভাতের ওপর মুরগির গোশতের তরকারি। কুচি করে কাটা শশা। সে থালা দু’টো মেঝেতে রাখল। পানির গ্লাস, জগ এনে দিলো। আমাদের হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে বলল, “স্যারের আসতে কিছুক্ষণ সময় লাগবে। আপনারা খেয়ে নেন।”
সাত পাঁচ না ভেবে খেতে বসে গেলাম। খিদে পেটে এমন খাবার দেখলে নিজেকে ধরে রাখা যায় না। রইস উদ্দিনের রান্না হাত ভালো। আজকে আরও ভালো হয়েছে। খেতে খুব ভালো লাগছে। বাদশা বলল, “একটা কাঁচা মরিচ পাওয়া যাবে?”
রইস উদ্দিন কাঁচা মরিচ এনে দিলো। তরল গলায় বলল, “ভাত তরকারি কিছু লাগবে?”
বাদশা ভাত নিলো। আমিও কিছু নিলাম। সারাদিন পর খাচ্ছি। খিদে মিটতে চাইছে না। বাদশা বলল, “পালানোর চেষ্টা করবি?”
“লাভ আছে কোন?”
“না নেই।”
“পালানোর পথ থাকলে রইস উদ্দিন আমাদের খেতে দিতো না। তাছাড়া আমি পালাতে চাই না। কেন কী করেছে সবটা জানতে চাই।”
খাওয়া শেষ করে প্লেটে হাত ধুয়ে ফেললাম। রইস উদ্দিন একটা গামছা দিয়ে বলল, “হাত-মুখ মুছে জায়গায় গিয়ে বসেন। আমি হাত পা বেঁধে দিচ্ছি।”
কথা বাড়ালাম না। রইস উদ্দিন হাত পা বেঁধে দিয়ে চলে গেল। যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালো। ভীষণ দুঃখী চেহারা৷ যেন কিছু ভেবে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করল। তবে কিছু বললাম না। সারাদিন পর পেট পুরে ভাত খেয়েছি। শরীর ছেড়ে দিচ্ছে। বিছানায় টনটনা দিয়ে খানিকক্ষণ ঘুমতে পারলে বেশ লাগত। বাদশা চেয়ারে উপর শরীর ছেড়ে দিয়েছে৷ চোখ মুখে ক্লান্তি বিস্ময় মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
“কিছু ভাবছিস?”
বাদশা মাথা দোলালো। যার অর্থ হ্যাঁ হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। ঠিক বোঝা গেল না৷ রাত বাড়ছে৷ শীত লাগছে একটু। ঘুম পাচ্ছে। কী অদ্ভুত! এই পরিস্থিতিতেও কী কারো ঘুম পেতে পারে?
চোখ লেগে গিয়েছিল। চিৎকার চেঁচামেচির শব্দে চোখ খুলল। তানহার বাবা এসেছে৷ সে আমাদের সামনে একটা চেয়ারে বসে রইস উদ্দিনকে বকাঝকা করছে৷ রইস উদ্দিন তার কথার জবাব দিচ্ছে না। মাথা নিচু দাঁড়িয়ে আছে। হাত কচলাচ্ছে শুধু। হঠাৎই কথা বলে উঠলাম। কঠিন মুখে বললাম, “আমাদের এখানে বেঁধে রেখেছেন কেন?”
ভদ্রলোক একটু হাসার চেষ্টা করল৷ তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “কারণ আছে।”
“কী কারণ আছে? কারণটাই তো জানতে চাইছি।”
“তুমি ছেলে বাচ্চা মানুষ। তবে বড়দের চেয়ে ঢের বুদ্ধি রেখে চলো।”
“এ কথা বলছেন কেন?”
“আমার মেয়ের বিয়ে ভাঙতে চাইছ কেন?”
“আমি আপনার মেয়ের বিয়ে ভাঙতে চাইনি।”
“তাই বুঝি? তাহলে আমার মেয়ের পিছনে গোয়েন্দাগিরি করতে কেন?”
“আপনার কথা বুঝতে পারছি না।”
“সবকিছু জেনে বুঝে না বোঝার ভান করাটা বেশ বিরক্তিকর এবং নিচু শ্রেণির কাজ।”
“তানহাকে আমি একটা ছেলের সাথে দেখেছিলাম। আমার চাচার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে। এসব ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া কী অন্যায় কিছু?”
“না, তেমন অন্যায় না। সেজন্যই তো তোমাকে এখানে নিয়ে এলাম।”
“আমাকে নিয়ে এসেছেন খুব ভালো কথা। আমার বন্ধুকে কেন কিডন্যাপ করলেন?”
“কান না টানলে মাথা পাওয়া যায় না। তাছাড়া নিজের সন্দেহ দূর করলাম।”
“কী ধরনের সন্দেহ?”
“এইসব গোয়েন্দাগিরি পারো কি-না।”
“কী বুঝলেন?”
“যা বোঝার তা অনেক আগে থেকে বুঝেছি৷ কম কিছু তো করোনি। জায়েদাকে দিয়ে আমার মেয়ের ডাইরি পর্যন্ত চু’রি করিয়েছ। ফেক ফেজবুক একাউন্ট খুলে আমার মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছ। এতসব কেন করেছ?”
জায়েদার নাম শুনে বুকের ভেতর কেমন করে উঠল৷ ব্যস্ত গলায় বললাম, “জায়েদা ডাইরি নিয়েছে এ কথা আপনি জানলেন কী করে?”
“ডাইরি রাখতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। দুই ঘা দিতেই গড়গড়িয়ে সব বলে দিলো।”
“জায়েদা কোথায়?”
“খুব সুন্দর একটা জায়গায় আছে৷ সেখানে কোন বিপদ ওকে স্পর্শ করবে না। কষ্ট পাবে না, মনও খারাপ হবে না।”
“এ কথার মানে কী?”
“মানে মানকচু। মানকচু চেনো? গায়ে লাগলে খুব চুলকায়।”
“আপনার মেয়ের বিয়ে ভাঙতে চেয়েছি এর জন্য এভাবে তুলে এনেছেন? আমার ছোট চাচার এমন কী আছে যে তার সাথেই মেয়ের বিয়ে দিতে হবে? আমি যতদূর জানি– তানহা নিজেও এই বিয়েতে রাজি না।”
“তানহা কেন! পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই। একদম কেউই না, যার জন্য আমি আমার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে পারি। কারো জন্যই না।”
“কী এমন পরিকল্পনা যার জন্য আপনি এতকিছু করছেন?”
“সব কথা বলে দিতে নেই। আমার পরিকল্পনাও তেমন।”
“এখন আমাদের কাছে কী চান? আমার কাছে কী চান?”
তানহার বাবা হাসল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “খানিকক্ষণ পর আমার কাছে জীবন ভিক্ষা চাইবে। তাই আপাতত আমি তোমার কাছে আর কিছুই চাই না৷”
“শেষ প্রশ্ন। আমি ফেক আইডি ওপেন করে তানহার সাথে কথা বলেছি– এ কথা আপনি কীভাবে জানলেন?”
সে হাসল। কথার জবাব দিলো না। পরনের কোট ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়াল। চেয়ারটা একটু টেনে রাখল। চেয়ারে টানার শব্দ ভীষণ কর্কশ শোনলো। সে উল্টো দিকে পা বাড়িয়েও থামল। পেছন ফিরে আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, “ব্যবস্থা করে ফেলো। হাতে সময় খুব কম।”
আমি বললাম, “আপনি আমাদের এখানে আটকে রাখতে পারবেন না। একজন আসবে। পুলিশকে সাথে নিয়ে সে খুব তাড়াতাড়ি এখানে আসবে৷ আপনি আমাদের ধরে রাখতে পারবেন না। নিজেও বাঁচতে পারবেন না।”
সে বলল, “কে আসবে? তিমু? তোমার তিমু আসবে না।”
বরফ শীতল কণ্ঠস্বর। গায়ে হিম ধরে যায়। আমি বললাম, “তিমুর কথা আপনি কীভাবে জানলেন?”
তানহার বাবা কিছু বলল না৷ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। যেন আমরা দু’জন মানুষ নই, অদৃশ্য কিছু!
খানিকক্ষণ ওভাবেই তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
“একটা কথা মনে রেখো– সব প্রশ্নের উত্তর একসাথে পাওয়া যায় না।”
বলেই চলে গেল। তার সাথে যারা ছিল তারাও গেল। শুধুমাত্র রইস উদ্দিন গেল না। যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল, সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।
চারদিক শুনশান। পিনপতন নীরবতা। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে বসে রইলাম। মিনিট বিশেক পর নীরবতা গেল। একটা শব্দ কানে এসে ঢুকছে। একটু দূরে কোথাও পানির ফোঁটা পড়ার শব্দ। খুব হালকাভাবে ট্যাপ ছেড়ে রেখেছে এমন। টুপ… টুপ… টুপ….
বাদশা ফিসফিস করে বলল, “আমরা এখন কী করব?”
“বুঝতে পারছি না। এই লোক তিমুর সাথেও কিছু করেছে৷ তা না হলে এতক্ষণে তিমুর এখানে চলে আসার কথা।”
“নতুন চিন্তা শুরু হলো। এমন বিভ্রান্তিতে থাকতে ভালো লাগছে না।”
“পুরোটা বিভ্রান্তি নেই৷ তানহার রিলেশনের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিয়েছি বলে উনি আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। কারণ তিনি চান না ছোট চাচার সাথে তানহার বিয়ে ভেঙে যাক৷ কিন্তু কেন চান না? ছোট চাচার মধ্যে এমন কী আছে যার জন্য উনি এতকিছু করছেন!”
বাদশা কিছু বলবে ঠিক তখনই পেছনের দিক থেকে খুব হালকা শব্দ পেলাম। কেউ খুব সাবধানে হাঁটছে। কয়েক সেকেন্ড পর রইস উদ্দিন সামনে এসে দাঁড়াল। তার মুখটা ফ্যাকাসে। সে ফিসফিস করে বলল, “আপনাদের সময় খুব কম।”
“কিসের সময়?”
বাদশা জিজ্ঞেস করল। রইস উদ্দিন ঠোঁট কামড়াল। চিন্তিত গলায় বলল, “স্যার সিদ্ধান্ত বদলায় না। একবার যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা কখনো বদলায় না।”
সে কথা শেষ করতে পারল না। দূর থেকে পায়ের শব্দ ভেসে আসছে। রইস উদ্দিনও ব্যস্ত পায়ে দূরে সরে গেল৷ আমার বুক ধড়ফড় করছে৷ হার্টবিট শুনতে পাচ্ছি। গলা শুকিয়ে কাঠ। কী করব? রইস উদ্দিনকে ডেকে এক গ্লাস পানি চাইব? সে কী আমাদের আরও একবার পানি খাওয়া সুযোগ করে দেবে?
চলবে
আমার লেখা ই-বুকসমূহ পড়ুন বইটই অ্যাপে৷ লিংক কমেন্ট বক্সে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৯
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৬
-
তোমার হাসিতে সূচনা পর্ব
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৮
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ২২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৭
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১১
-
তোমার হাসিতে গল্পের লিংক