তোমার_হাসিতে
ফারহানাকবীরমানাল
১৩.
পায়ের ওপর পা তুলে বসলে জমিদারি ভাবটা বজায় থাকে। মনের মধ্যে চিনচিনে আরাম পাওয়া যায়। বেশিরভাগ লোকই পা ওপর পা তুলে বসতে পছন্দ করে। কাজের জায়গায় ফর্মালিটি দেখিয়ে বসতে পারে না। আমার অবশ্য তেমন কোন ব্যাপার নেই। রোদের মধ্যে চেয়ার পেতে বসেছি। রুল টানা কাগজে হিসেব লিখছি। খাম্বা, পাথর, বালি। এক বস্তা করে মাল নিচ্ছে, আমি এক যোগ এক লিখছি। আপাত দৃষ্টিতে খুব সহজ কাজ। বাচ্চা ছেলেপেলে দিয়ে করানো সম্ভব। তবে এই সহজ কাজে চোখ ফেরানোর সময় নেই। এমনকি পলক ফেলারও সময় পাওয়া যাচ্ছে না। একভাবে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ জ্বলছে৷ আর একটু সময় এভাবে তাকিয়ে থাকলে চোখ থেকে পানি পড়তে শুরু করবে। ছেলে মানুষ সবার সামনে কাঁদছে। ইসস! কী একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে তখন!
জোহরের আজান শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। মিনিট পাঁচেক পর ঘন্টা খানেক ব্রেক। দুপুরে খাওয়ার সময়। ছেলেগুলো কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছে। তারা গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে নদীর দিকে হাঁটা ধরেছে। খাতা বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিলাম।
“সাহেবের কী ব্যাপার? মুখ হাত ধুয়ে দুপুরের খানা খেয়ে নেন। টিফিনবাক্স কোথায়? বের করে দেব?”
চমকে পেছন ফিরে তাকালাম। বুড়ো মতো এক লোক দাঁড়িয়ে আছে৷ পান খাওয়া লালচে দাঁত বের করে ক্রমাগত হাসছে। তার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলাম। নরম গলায় বললাম, “টিফিন নিয়ে আসিনি। আশপাশ থেকে হালকা-পাতলা কিছু একটা খেয়ে নেব।”
“দুপুরবেলা হচ্ছে খাওয়ার উপযুক্ত সময়। সারাদিনের খানাপিনার মা যাকে বলে। এই সময়ে হালকা-পাতলা কিছু খেতে হয় না। ভরপেট খেতে হয়।”
“আমার জানামতে আশেপাশে ভাতের হোটেল নেই। দূরে যেতে ইচ্ছে করছে না৷”
“ইচ্ছে না করাটাই খুব স্বাভাবিক। বসে বসে কাজ করেছেন। একটানা বসে থাকলে নেশা লেগে যায়। তখন শুধু বসতে ইচ্ছে করে।”
হাসার চেষ্টা করলাম। লোকটার পানসে মুখ দেখে বুঝলাম হাসার চেষ্টা সফল হয়নি। সে মাথা নিচু করে হাত কচলাতে লাগল। স্বাভাবিক গলায় বললাম, “কিছু বলবেন আমাকে?”
সে দাঁত বের হাসল। রসালো সুরে বলল, “এইখানে আমার একটা ভাতের হোটেল আছে। বড়সড় দোকান না। ঝুপড়ি মতো। নিজের হাতে রান্না করি। একবেলা খেয়ে দেখেন। মন্দ লাগবে না।”
অনিচ্ছায় স্বত্তেও তার সাথে গেলাম। এই ধরনের লোকেরা সহজে পিছু ছাড়ে না। কাজ করে শরীর ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না।
খাওয়া ব্যবস্থা মেঝেতে। মাদুর বিছিয়ে আসন পেতে দিয়েছে। সরু চালের সাদা ভাত, লাউ পাতা ভর্তা, বাটা মাছের ঝাল। রান্নার স্বাদ ভালো। চমৎকার স্বাদ। এক নিমেষে মন ভালো হয়ে যায়।
“সাহেব, আমার হাতের রান্না কেমন?”
“চমৎকার রান্না।”
“আরও কিছু আইটেম রাখতে ইচ্ছে করে। টাকায় কূল পাই না।”
“আস্তে আস্তে হবে।”
“আজ নতুন?”
“বুঝতে পারিনি।”
“আজকেই প্রথম কাজ শুরু করেছেন নাকি? আগে-পরে তো দেখিনি।”
“জ্বি, আজকেই প্রথম।”
“তা ভালো। সহজ কাজ। বসে বসে হিসাবপত্র লেখা। লেখাপড়া জানলে এমন সহজ কাজ পাওয়া যায়।”
খাওয়া থামিয়ে তার দিকে তাকালাম। চোখ জ্বলছে, তবে সে চোখে আফসোসের মলিনতা নেই। অন্যকিছু আছে। যে ভাষা আমি পড়তে পারছি না। মানুষের চোখের ভাষা খুব দুর্বোধ্য। সহজে পড়া যায় না।
“সাহেবের কিছু লাগবে?”
“না, আর কিছু লাগবে না।”
“প্রাণ ভরে খান। পেটে খিদে পুষে রাখতে নেই। আর একটা বাটা মাছ দেই?”
“না। মাছ লাগবে না। এতে হবে। আপনার দোকান কতদিনের?”
“সবে সবে শুরু করেছি। খুব বেশিদিন হয়নি।”
“উনাদের কাজের ব্যাপারে কিছু জানেন? বলতে চাইছি মালপত্র কোথা থেকে আসে। এইসবই।”
“আপনি জানেন না?”
তার চোখ চকচক করছে।
“না, আমি এসবের কিছু জানি না। আমার কাজ হিসেব রাখা। প্রথমদিন। আস্তে আস্তে জেনে যাব।”
সে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎই উজ্জ্বল মুখে বলল,“আমার নাম রইস উদ্দিন। আপনি আমাকে রইস উদ্দিন বলে ডাকতে পারেন।”
“ছিঃ ছিঃ। আপনি আমার চেয়ে অনেক বড়। নাম ধরে ডাকব কেন!”
“তাহলে কী বলবেন? চাচা?”
“কী বলে ডাকলে খুশি হবেন?”
রইস উদ্দিন মাথা দোলালো। চোখের পানি মুছে বলল, “অন্য একদিন বলব।”
খাওয়া শেষ। হাত ধুয়ে ভাতের দাম জিজ্ঞেস করতেই রইস উদ্দিন মিইয়ে গেল। তরল গলায় বলল, “আজকেরটা তোলা থাকুক। পরে খেলে চেয়ে নেব।”
“না না। আজকে থাকবে কেন। আজকেও নেন। টাকা আছে কাছে। অন্যদিন না থাকলে তখন চেয়ে খেয়ে যাব।”
“টাকা নেব না। আপনার নাম কী?”
“সাজ্জাদ। আপনি আমাকে তুমি তুমি করে বলতে পারেন। এইবার টাকা নিন। দাম কত হয়েছে বলুন।”
সে একটা পয়সাও নিলো না। অনেকবার অনেকভাবে বলে কয়ে কোন কিছুতেই তাকে রাজি করাতে পারলাম না। সে টাকা নেবে না। কিছুতেই নেবে না। শেষ পর্যন্ত টাকা না দিয়ে চলে আসতে হলো। রইস উদ্দিন এমনভাবে তাকিয়ে রইল যেন খুব আহত হয়েছে।
কাজ শুরু হয়েছে। কাজের গতি নেই। ছেলেগুলো খুব ঝিমিয়ে কাজ করছে। বয়স্ক লোকও আছে কিছু। তাদের গতি ভালো।
শেষ বিকেল পর্যন্ত কেউই এলো না। একাধারে কাজ করে গেলাম। কাজ শেষ হওয়ার পর একজন এলো। খটখটে গলায় বলল, “ভেতরে আসুন। হিসেব দিয়ে যান। বড় স্যার বসে আছেন।”
বড় স্যার লোকটা ছিপছিপে লম্বা গড়নের। মুখভর্তি দাড়ি গোঁফ। জুলপির কাছে বেশ কয়েকটা চুল সাদা হয়ে আছে। তিনি আমার দিকে তাকালেন না। গম্ভীর মুখে বললেন, “হিসাব দাও।”
“এই যে। এই খাতায় সবকিছু লেখা আছে।”
“যোগ করো। যোগ করে টোটাল অংক বলো। যোগ করতে পারো তো?”
“পারি।”
“তাহলে বলো।”
যোগ করে টোটাল হিসেব বললাম। স্যার বললেন, “ভালো কাজ করেছ। বেতন নিয়ে যাও।”
তিনি ড্রয়ার টেনে পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করলেন। নোটটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমার টাকা।”
আমি একটু হেঁসে টাকা নিলাম। স্যার বললেন, “রঘু মনির তোমাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছ তো?”
“রঘু মনির….”
“যাদের সাথে কথা বলে কাজে এসেছ। মাঝবয়সী লোকটার নাম রঘু। পিচকেটা মনির।”
“জ্বি আচ্ছা।”
“ওদের সাথে কথা বলে যাবে। কাল কখন কাজে আসবে বলে দেবে।”
“জ্বি আসব।”
“এখন যাও। এক মিনিট! চা খাবে?”
“না। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাড়ি ফিরব।”
“ভালো। এই বয়সে চায়ের অভ্যাস ঠিক কথা না। ভেরি গুড। ইয়াং ম্যান! আই রিয়েলি লাইক ইউ!”
মনিরের সাথে দেখা হলো না। রঘু বলল, “নয়টায় আসবে। এক মিনিটও দেরি করবে না।”
“ঠিক আছে। আসব।”
“সকালে খেয়ে আসবে। দুপুরের জন্য ভাত-তরকারি নিয়ে আসবে। এদিকে খাওয়ার ব্যবস্থা ভালো না। আমরা ক’জন মিলে রান্না করে খাই। মনির রাঁধে। স্বাদ হয় না। বেঁচে থাকতে হবে তাই খাই।”
“রইস উদ্দিনের দোকানে খেয়ে নেব। খুব ভালো রাঁধে।”
“কার দোকানে? এদিকে ভাতের দোকান হয়েছে নাকি?”
চোখমুখ দেখে মনে হলো রঘু ভীষণ অবাক হয়েছে। চোখ-মুখে বিস্ময়ের ভাব স্পষ্ট। আমার কেমন একটা লাগল। ভাতের দোকান হলে সে জানবে না কেন? তবে কথা বাড়ালাম না।
সন্ধ্যা হতে এখনও ঢের দেরি। ঘন্টা খানেক বেলা আছে। আকাশে মেঘ জমেছে বিধায় চারপাশ এমন অন্ধকার। এই ভরা শীতে বৃষ্টি নামবে নাকি?
স্কুলের সামনে যেতে জায়েদার সাথে দেখা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাচ্ছে। আমাকে দেখেই ছুটে এলো। উজ্জ্বল গলায় বলল, “অবশেষে আপনার দেখা পেলাম।”
“আমায় কেন খুঁজছিলে?”
“আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে। অনেক কথা আছে।”
“কেমন কথা?”
“খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা। আপনার খোঁজে কলেজ পর্যন্ত গিয়েছিলাম। কিন্তু আপনার দেখা পাইনি। আপনার এক বন্ধুকে দেখলাম। তার সাথে কথা বলে চলে এসেছি।”
“বাদশা আমাকে তোমার কথা বলেছে।”
“আমাকেও আপনার কথা বলেছিল। শুনলাম আপনার পা কে’টে গেছে। সুস্থ হয়েছেন?”
“হয়েছি। হাঁটতে পারি। অসুবিধা হয় না।”
“যাক আলহামদুলিল্লাহ।”
“আমায় কী বলবে?”
“তাহনা আপুর ব্যাপারে। আপু বাড়িতে ফিরে এসেছে। এসেই ডাইরির খোঁজ শুরু করেছে। আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছে। বলেছি– আমি কিছু জানি না। এখন আপু সবাইকে চাল পড়া খাওয়াবে। পড়া চাল খেলে যে ডাইরি নিয়েছে তার গলা থেকে র’ক্ত পড়তে শুরু করবে। আমাকে বাঁচান। ওই ডাইরিটা ফেরত দেন।”
“ডাইরি তো আমার সাথে নেই।”
“নিয়ে আসুন। যত রাত হোক আমি এখানে দাঁড়িয়ে থাকব। ডাইরিটা লাগবে৷ সকাল হলে আপু আবার ডাকবে।”
“খুব দুশ্চিন্তায় আছো মনে হচ্ছে।”
“খুবই! আপনি ডাইরি নিয়ে আসুন। আমি এখানে আছি।”
“খানিকক্ষণ পর সন্ধ্যা নেমে যাবে। একা দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। বাড়িতে যাও।”
“ডাইরি?”
“তোমার বাড়ির ঠিকানা বলো। আমি গিয়ে দিয়ে আসব।”
“আপনি আমাদের বাড়িতে যাবেন!”
জায়েদা ভীষণ রকমের ভড়কে গেল। আমি বললাম, “চিন্তা করো না। পড়াশোনার ব্যাপার নিয়ে যাব।”
“তারপরেও! মা একবার কিছু বুঝতে পারলে আমাকে মে’রে ফেলবে।”
“সন্ধ্যা পেরিয়ে বাড়িতে গেলে কিছু বলবে না?”
জায়েদা সত্যিকার অর্থে নিভে গেল। থমথমে গলায় বলল, “ডাইরি দিয়ে যাবেন বলছেন?”
“হুম যাব।”
“আচ্ছা বেশ।”
“জায়েদা শোনো।”
“জ্বি বলুন।”
“তানহার বড় ভাই আছে যে মা’রা গিয়েছে?”
জায়েদা ডানে বামে মাথা দোলালো। শুকনো গলায় বলল, “না। এমন কেউ নেই। আর থাকলেও আমি কখনো শুনিনি।”
“ঠিক আছে। তুমি এখন যাও। বাড়ি যাও জায়েদা। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। খানিক বাদে অন্ধকার হয়ে যাবে।”
জায়েদা পেছন ঘুরে হাঁটতে শুরু করল। তার পেছনে ছুটে গিয়ে উঁচু গলায় বললাম, “জায়েদা শোনো।”
জায়েদা থমকে দাঁড়াল।
“বাদশার সাথে তোমার কী কথা হয়েছে? আমার ব্যাপারে কী বলেছ?”
“তেমন কিছু বলিনি। আপনার বন্ধুর সাথে দু’টো লোক কথা বলছিল। আমি গিয়ে আপনার কথা জিজ্ঞেস করতে সে বলল– আপনি অসুস্থ। পা কে’টে গিয়েছে। তারপর আর কোন কথা হয়নি।”
“দু’টো লোক?”
“হ্যাঁ, দু’জনই তো ছিল। একজন মাঝবয়েসী, অন্যজন বয়স অল্প।”
“দেখলে চিনতে পারবে?”
“পারব।”
“আচ্ছা যাও। আমি আসব। রাতের মধ্যে ডাইরি দিয়ে যাব।”
জায়েদা চলে গেল। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম। ঘরে মা নেই। মা না থাকলে সবকিছু কেমন খালিখালি লাগে। ঘরে ঢোকার পরপরই তিমু এলো। হাতে পানির গ্লাস। গ্লাসটা খাটের কোণায় রাখতে রাখতে বলল, “সারাদিন কোথায় ছিলে?”
“কাজে গিয়েছিলাম।”
“বাড়িতে খুব চমৎকার একটা ঘটনা ঘটেছে।”
“কী ঘটেছে?”
“হবু মামানির নানি এসেছে। ভদ্রমহিলা বাড়িতে আসার পর থেকে বড় মামানির খোঁজ করছে। আমাকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল। এবার দু’বার না। গুনে গুনে পঞ্চাশবার জিজ্ঞেস করেছে।”
“কী জিজ্ঞেস করেছে?”
“ছোট মামার সাথে বড় মামানির সম্পর্ক কেমন। কী অদ্ভুত প্রশ্ন বলো। ছোট মামার সাথে বড় মামানির সম্পর্ক আবার কেমন হবে। আমি বলেছি ভালোই। সে বলে– কেমন ভালো। কেমন কথা হয়। আলাদা করে গল্প করে।”
“আর কিছু বলেনি?”
“বলেছে। নানি আপুর সাথে কেমন কথা হয় তা-ও জিজ্ঞেস করেছে। কেমন সম্পর্ক সে কথাও তার জানতে হবে। কী অদ্ভুত! মা ছেলের সম্পর্ক কেমন হবে! খুবই বিরক্তিকর মহিলা!”
“তুই এখন এখান থেকে যা তিমু। আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। আমি একটু ঘুমাব।”
তিমু বেরিয়ে গেল। হাত-মুখ ধুয়ে বিছানায় পিঠ এলিয়ে দিতেই জায়েদার কথা মনে পড়ল৷ ডাইরি দিতে যাব বলে এসেছি। মেয়েটাকে বিপদে ফেলে বিছানায় শুয়ে আরাম করা যায় না।
কাপড়-চোপড় পরে তৈরি হয়ে নিলাম। ডাইরিটা চাদরে নিচে লুকিয়ে বের হব তখনই রাঙা দাদি ডাকলেন। কোমল গলায় বললেন, “সারাদিন কী করা হয়েছে?”
“একটু কাজ ছিল।”
“পায়ের এই অবস্থা নিয়ে কিসের কাজ?”
আমি কিছু বলব তার আগেই তানহার নানি কথা বলে উঠলেন।
“এই ছেলেটা কে?”
আমি নিজের পরিচয় দিলাম। ভদ্রমহিলা বললেন, “এমন সোমত্ত ছেলের ঘরে মেয়ে বিয়ে দেওয়া ঠিক না।”
“এ কথার মানে?”
“কথার মানে খুব পরিষ্কার। ছেলে-মেয়ে হচ্ছে আগুন চর মোমের মত। পাশাপাশি রাখা ঠিক না। তাছাড়া দেখে মনে হচ্ছে তুমি তাহনার চেয়ে বয়সের বড়।”
“কী বলতে চাইছেন পরিষ্কার করে বলুন।”
ভদ্রমহিলা দাদিকে ডেকে নিয়ে এলেন। পান চিবুতে চিবুতে বললেন, “ঘরে আপনার বড় ছেলে আছে। ছেলে বউ, এই ছেলেটা। এতজন মানুষের মধ্যে মেয়ের বিয়ে দেওয়া বেশ ঝামেলার। আজকালকার যুগে কেউই যৌথ পরিবারে মেয়ে দিতে চায় না। আমরাও চাই না।”
দাদি মেকি হাসি হাসলেন। চোখ মুখ ফ্যাকাশে করে বললেন, “এতদিন আমরা সবাই আছি। তানহাও থাকতে পারবে। ওর কোন সমস্যা হবে না।”
“তানহার সমস্যা হোক তা আমরা কেউ চাই না। সেজন্যই সবকিছু দেখেশুনে নিচ্ছি।”
রাঙা দাদি বললেন, “একটু বেশিই দেখছেন। আমার এত বছরে জীবনে দেখিনি– মেয়ের নানি বিয়ের আগে ছেলের বাড়িতে থাকতে এসেছে।”
ভদ্রমহিলা এতটুকুও লজ্জা পেলেন না। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বললেন, “আগের যুগ নেই। যুগ বদলে গিয়েছে। যুগের সাথে বদলাতে না পারলে আপনি আদিম মানুষ। সেখানেই না হয় থাকুন।”
রাঙা দাদি ভীষণ রকমের রেগে গেলেন। তবে মুখে কিছু বললেন না। আমিও আর দাঁড়ালাম না। রাত বাড়ছে। জায়েদাদের বাড়িতে যেতে হবে।
জায়েদা দরজা খুলে আমাকে দেখে ভীষণ ভয় পেল। তক্ষুনি কোন কথা বলতে পারল না। জায়েদা মা বলল, “কে এসেছে?”
জায়েদা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, “চিনি না আমি।”
জায়েদার মা বেরিয়ে এলো। আমাকে দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কে তুমি?”
“আপনি আমাকে চিনবেন না। এদিকে আসা হয়নি কখনো।”
“কিছু বলবে?”
“আমরা কয়েকজন মিলে একটা কোচিং সেন্টার খুলেছি। স্টুডেন্ট সংগ্রহ করছি। খুব অল্প বেতনে আপনি আপনার সন্তানকে পড়াতে পারবেন।”
জায়েদার মা একটু বিরক্ত হলো। যথাসম্ভব স্বাভাবিক গলায় বলল, “ভেতরে এসে বসো। জায়েদার আব্বু বাড়িতে আছে। ঘুমচ্ছে। তাকে ডেকে দিচ্ছি।”
ঘড়িতে সাতটা বাইশ। এখনই কেউ কীভাবে ঘুমিয়ে পড়তে পারে? ভদ্রমহিলা স্বামীকে ডাকতে গেলেন। চাদরের নিচ থেকে ডাইরিটা বের করে জায়েদার দিকে এগিয়ে দিলাম। ইশারায় বললাম– ভেতরে রেখে এসো।
জায়েদা বুঝল। ডাইরিটা নিয়ে ভেতরে চলে গেল। ভদ্রলোক চোখ মুছতে মুছতে বসার ঘরে ঢুকলেন। তেঁতো গলায় বললেন, “আমার মেয়েকে কোন কোচিং সেন্টারে পড়াব না। তুমি যাও।”
তার কণ্ঠস্বরে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। বেরিয়ে চলে এলাম। কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন এখানে বেশিক্ষণ থাকা উচিত হবে না।
অনেকক্ষণ হল সন্ধ্যা মিলিয়েছে। রাত গভীর হতে শুরু করছে। শীতের ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে। চাদরটা আরও একটু জড়িয়ে নিলাম। এমন সুন্দর রাতে পাশাপাশি কেউ একজন হাঁটলে মন্দ হয় না। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললাম।
বাবা আমার মোবাইল ঠিক করতে দিয়েছিলেন। আমাকে না কিছু বলেননি। রাতে খাওয়ার সময় মোবাইলটা টেবিলে উপরে রাখলেন। স্বাভাবিক গলায় বললেন, “তোমার মোবাইল। ঠিক করে নিয়ে এসেছি।”
আমি বাবার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ধন্যবাদ সূচক কিছু বলতে পারলাম না। খাওয়া শেষে মা’কে কল দিলাম। মা বলল, “কেমন আছিস? তোর পায়ের কী অবস্থা?”
“পা ভালো আছে। হাঁটতে কোন অসুবিধা হচ্ছে না।”
“তবুও ওষুধগুলো শেষ করিস। তোর বাপ জেদ করে আমাকে এখানে রেখে গেল।”
“আব্বা যা করেছে ভালো করেছে।”
“কাল সকালে একবার আসিস। ঘুরে যাস।”
“আচ্ছা আসব। রাতে খেয়েছ?”
“না। খেতে বসব। তুই খেয়েছিস?”
“মাত্র খেলাম।”
“ওষুধ খা। আমি লাইনে থাকতেই খা।”
মা কলে থাকা অবস্থায় ওষুধ খেলাম। মা বলল, “শুয়ে পড়। বেশি রাত করিস না।”
মায়ের সাথে কথা শেষ করে বাদশার মামাকে কল দিলাম। মামা ভীষণ বিষন্ন স্বরে বললেন, “সাজ্জাদ বলছ?”
“জ্বি মামা। দারোগা সাহেব এসেছিলেন?”
“না, তিনি আসেননি। আমাদের থানায় ডেকে পাঠিয়েছিল। তোমাকে কল দিয়েছিলাম। ফোন বন্ধ বলে।”
“মোবাইল নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আজকেই ঠিক করলাম।”
“তা ভালো। পায়ের অবস্থা কেমন?”
“পা ঠিকঠাক। দারোগা সাহেব কী বললেন?”
“বাদশার কল লিস্ট বের করেছেন। সেখানে সন্দেহজনক কিছু পাননি। তারপরও খোঁজ চালাচ্ছেন।”
“আচ্ছা।”
“তুমি একটু সাবধানে থেকো, কেমন?”
“এ কথা কেন বললেন?”
“জানি না রে বাবা। ভয় হয় অনেক।”
“চিন্তা করবেন না মামা। বাদশা ফিরে আসবে। আমরা সবাই মিলে ওকে খুঁজে বের করব।”
মামা কিছু বললেন না। কল কে’টে দিলেন। বোধহয় তার গলা ধরে এসেছে।
রাতে ঘুমতে পারলাম না। তানহা এখনও আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেনি। আইডির প্রোফাইলে আমার ছবি দেওয়া। সেজন্যই বোধহয়। বহুকাল আগে একটা ফেক আইডি খুলেছিলাম। সেই আইডি থেকে তানহাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালাম। মিনিট দুয়েক পর রিকোয়েস্ট একসেপ্ট হলো। সাত-পাঁচ ভেবে টেক্সট করে ফেললাম। ছোট্ট করে “হ্যালো।”
“জ্বি। বলুন।”
“কেমন আছেন?”
“ভালো আছি। অনেক ভালো আছি।”
“এত ভালো আছেন কেন?”
“বহুদিন বাদ একা ঘুমব। সেজন্যই খুব ভালো আছি।”
“একা ঘুমোতে ভয় লাগে না?”
“না। এখন আর কিছুতে ভয় লাগে না।”
“কেন ভয় লাগে না?”
“আমি কী আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?”
তাহনার কথার ধরনের ভীষণ রকমের অবাক হলাম। এই মেয়ে তার মনের মধ্যে এমন কি রহস্য লুকিয়ে রেখেছে? রিপ্লাই করলাম–
“জ্বি, নিশ্চয়ই।”
সে কতগুলো কান্নার ইমোজি পাঠাল।
“কাঁদছেন কেন?”
“মানুষের জীবনে এত কষ্ট থাকে কেন?”
“আপনার জীবনে এত কষ্ট কিসের?”
“যেখানে নিজের মা বাবা পর হয়ে যায়। স্বার্থের জন্য ব্যবহার করে সেখানে বাকিদের কথা আর কী বলব!”
“বুঝতে পারলাম না।”
“আমার অনেক কষ্ট। আপনি বুঝবেন না। দুনিয়ায় একজন মানুষও ভালো নেই। একজনও না।”
“এমন কেন মনে হলো? দুনিয়ায় এখনও অনেক মানুষ আছে যারা নিজেদের স্বার্থ না দেখে অন্যকে সাহায্য করে।”
“নেই। কেউ নেই। এমন কেউ নেই।”
“আছে, হয়তো আপনার সাথে তেমন কারোর পরিচয় হয়নি।”
“হবে হয়তো। এমন মানুষ থাকলে আমার সাথে দেখা হয় না কেন?”
“কিসের কষ্ট আপনার?”
“বাবা মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।”
“বিয়ে ঠিক হলে কেউ কষ্ট পায় নাকি?”
“আমি পাই। কারণ বিয়েটা আমার পছন্দ অনুযায়ী হচ্ছে না। মা বাবা একজন ছেলে খুঁজে বের করেছে। সরকারি চাকরি করে। ভদ্রলোকের চেহারা ভালো। তবে তার মন অনেক কুৎসিত।”
“এ কথা বলছেন কেন? আপনি কী তার সাথে কথা বলেছেন?”
“হ্যাঁ বলেছি। অনেক আশা নিয়ে তার সাথে কথা বলেছিলাম। ভেবেছিলাম সে আমার সমস্যা বুঝবে। কিন্তু না সে কিছু বুঝল না।”
“কী সমস্যা আপনার?”
“আমি একটা ছেলেকে পছন্দ করি। অনেক পছন্দ করি। তাকে ভীষণ রকমের ভালোবাসি।”
“এখানে সমস্যার কী আছে? আপনার বাড়িতে বলুন। বাবা মাকে বুঝিয়ে বললে তারা নিশ্চয়ই বুঝবে।”
“বুঝবে না। আমি তাদের হাতে পায়ে ধরেছি। কেঁদে কেটে বলেছি– আমি এই বিয়ে করতে চাই না। বাবা বলেছেন– জীবনে না চাইতেও অনেক কিছু করতে হয়। আমার তার ভালোর জন্য এই বিয়ে করতে হবে। করতেই হবে।”
“আপনার হবু বরকে বলেছেন?”
“বলেছি। তবে সে-ও আমার ব্যাপারটা বুঝতে চায়নি। উল্টো আমাকে জ্ঞান দিয়ে বলেছে– কিশোরী বয়সে এমন টুকটাক প্রেম থাকা খুব বেশি দোষের কিছু না। আবেগে অনেকে ভুল করে। সমস্যা নেই।”
তানহা এসব কী বলছে? ছোট চাচা তানহার প্রেমের সম্পর্কে জানে। জেনেশুনেই ওকে বিয়ে করতে চাইছে? কী অদ্ভুত! রিপ্লাই দিতে দেরি হচ্ছে দেখে তানহা বলল–
“আপনিও কী বিরক্ত হচ্ছেন?”
“না, আমি বিরক্ত হচ্ছি না। চিন্তা করছিলাম।”
“চমকে গেলেন তাই না?”
“একটু তো চমকানো কথা।”
“কী করব বলেন। আমার জীবন এমনই।”
“আপনার বাবা কী চান? একজন বাবা মেয়ের সুখের চেয়ে বেশিকিছু আর কী চাইতে পারে?”
“সে কথা আমি জানি না। তবে বাবা বলেন– তার জীবনের একট উদ্দেশ্য আছে। আমাকে বিয়ে দিতে পারলে উদ্দেশ্য সফল হবে।”
খটকা লাগল। তবে বুঝতে দিলাম না। প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললাম–
“রাতে খেয়েছেন?”
“খেয়েছি। বহুদিন বাদে ভরপেট খেয়ে শুয়ে আছি। নানি পাশে নেই। নিজেকে মুক্ত মানুষ মনে হচ্ছে।”
“আপনার নানি আপনার সাথে থাকে?”
“চব্বিশ ঘন্টা। সবাই মনে করে আমি পালিয়ে যাব। সেজন্য পাহারা দিয়ে রাখে।”
“সত্যি সত্যি পালিয়ে যাবেন নাকি?”
তানহা হাসির ইমোজি পাঠাল। আমি বললাম–
“সত্যিই কী পালিয়ে যাবেন?”
“যেতে পারি। বলা যায় না।”
“তা ভালো।”
“আচ্ছা থাকেন। ঘুমাব। ঘুম পাচ্ছে। রাত জেগে কথা বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে গিয়েছি।”
“কার সাথে এত কথা বলেন?”
“বাবা যে ভদ্রলোকের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করেছে তার সাথে। নানি বলেছে– বিয়ের আগেই কথাবার্তা বলে তাকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখতে। কখন কী বলতে হবে সে কথাও শিখিয়ে দিচ্ছে।”
“কী আশ্চর্য!”
“ঘুমালাম। শুভ রাত্রি।”
তানহা আর কোন টেক্সট করল না। আমি করলাম। রিপ্লাই এলো না। সবকিছু কেমন অদ্ভুত লাগছে। রহস্যময়!
রাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙল তিমুর ডাকে। সে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে আমাকে ডাকছে। হুড়মুড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। ব্যস্ত গলায় বললাম, “কী হয়েছে? এভাবে ডাকছিস কেন?”
“তোমার বন্ধুর খুব বিপদ। তাকে বাঁচাও।”
“এসব কী বলছিস? কোন বন্ধু বিপদে পড়েছে?”
“যে তোমাকে দেখতে এসেছিল সে। কী যেন নাম? ও হ্যাঁ! মনে পড়েছে। বাদশা। তার খুব বিপদ।”
“তোকে কে বলেছে?”
“স্বপ্ন দেখেছি। কয়েকটা লোক তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে।”
“কোথায় ধরে নিয়ে যাচ্ছে?”
“জানি না। অন্ধকার ছিল। চারপাশে পানির শব্দ।”
তিমু কথা বিশ্বাস হলো না। আবার পুরোপুরিভাবে অবিশ্বাসও করতে পারলাম না। হাত-মুখ ধুয়ে থানায় রওনা দিলাম। পথে যেতে যেতে তানহার আইডি চেক করলাম। না! নতুন কোন টেক্সট নেই। বরং কাল রাতের সব টেক্সট ডিলিট করে দেওয়া।
হঠাৎই মাথায় কিছু খেললো না। কী হচ্ছে না হচ্ছে কিছু বুঝতে পারলাম না। নয়টা বাজতে বেশি বাকি নেই। কাজে যেতে হবে। কাজ ফাঁকি দেওয়া যাবে না। মায়ের আংটি বানিয়ে দিতে হবে। ছোট চাচার বিয়ে আগে এই কাজটা শেষ করতে হবে। কাজ শেষ করে জুয়েলার্সের দিকে যাব। আংটির বায়না দিয়ে আসব।
দারোগা সাহেব আমাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। বিরক্ত গলায় বললেন, “এখানে কী চাই?”
“বাদশার খোঁজ নিতে এসেছি। ওর ব্যাপারে কিছু জানতে পারলেন?”
“না। এখনও কিছু জানতে পারিনি। প্রতিদিন এমন অনেক কে’স আসে। একটা নিয়ে পড়ে থাকার সময় নেই।”
“তবুও আমাদের চিন্তা হয়। বুঝতেই তো পারছেন।”
দারোগা সাহেব বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। গম্ভীর গলায় বললেন, “এখন আসুন।”
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। এখানে নষ্ট করার মতো সময় নেই। কাজে যেতে হবে। হঠাৎই দারোগা সাহেবের ফোন বেজে উঠল। তিনি কল রিসিভ করে বললেন, “লা’শ পেয়েছ? অল্প বয়সী ছেলে? কলেজে পড়ে এমন? নদীতে পড়ে ছিল৷ ওকে, ওকে, ফর্মালিটি শেষ করে পোস্টমর্ডেম করতে পাঠিয়ে দাও।”
চমকে উঠলাম। লা’শ পেয়েছে? কার লা’শ? বাদশার? দারোগা সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন।
“আমার সাথে এসো। লা’শটা দেখে যাও। তোমার বন্ধু হলেও হতে পারে।”
আমি কী বলব বুঝতে পারলাম না। সারা শরীর অবশ হয়ে গেছে। পা চলছে না। যেন সীসা ঢালা প্রাচীরের মত জমে গেছে।
চলবে
Share On:
TAGS: তোমার হাসিতে, ফারহানা কবীর মানাল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি গল্পের লিংক
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৩
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৪
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১৪
-
তোমার হাসিতে সূচনা পর্ব
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১২
-
তখনও সন্ধ্যা নামেনি পর্ব ২
-
তোমার হাসিতে পর্ব ১১
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৫
-
তোমার হাসিতে পর্ব ৭