তোমারসঙ্গেএক_জনম (১০)
সানা_শেখ
জাকির মায়ের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ধুপধাপ শব্দ তুলে। লামহাও আর দেরি করে না, দ্রুত পায়ে হেঁটে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুমে ঢুকেই ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়। জাকিরের বলা কথাগুলো এখনো কানে বাজছে।
জোবেদা মির্জা দুই ছেলের বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“কী হয়েছে? ঝগড়া করো কি নিয়া তোমরা?”
শিরিন সুলতানা শাশুড়ি মাকে নিয়ে তার রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলেন,
“আপনি ভুল শুনেছেন, মা। ঝগড়া করি না।”
“বড়ো বউ চিৎকার চেঁচামেচি করলো কেন?”
“জাকির লামহার সঙ্গে কথা বলেছে বলে। সেসব বাদ দিন।”
নাজমা মির্জা আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছেন। উনি কি একটু বেশিই রিয়েক্ট করে ফেলেছেন? না ঠিকই করেছেন। উনি ছেলের চাহনি দেখেছেন, ওই চাহনি অন্য কিছু বলে। বাইরে বের হওয়ার আগে কীভাবে রেগে তাকিয়েছিল ওনার দিকে।
নিঃসন্দেহে লামহা অনেক সুন্দরী মেয়ে। যেকোনো ছেলের নজর আটকাবে ওর দিকে। লামহাকে জাকিরের সামনে আসতে দেওয়া যাবে না। জাকির যতদিন বাড়িতে আছে ততদিন লামহা নিজের রুম থেকে বের হবে না।
হিমেলের রুমের সামনে এসে দাঁড়ান নাজমা মির্জা। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে দরজায় ধাক্কা দেন। ভেতর থেকে লামহার গলার স্বর ভেসে আসে,
“কে?”
“আমি, দরজা খোলো।”
লামহা শোয়া থেকে উঠে ঘোমটা টেনে দরজার কাছে এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়। নাজমা মির্জা বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই গম্ভীর গলায় বলেন,
“জাকির যতদিন বাড়িতে আছে তুমি রুম থেকে বের হবে না, ওর সামনে যাবে না। তোমার খাবার রুমেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”
লামহা মাথা নাড়ায়। নাজমা মির্জা আর কিছু না বলে নিজেদের রুমের দিকে আগান।
লামহা আবার দরজা লাগিয়ে দেয় ভেতর থেকে। বলা তো যায় না, জাকির এসে যদি রুমের ভেতর ঢুকে পড়ে?
বিকেল পাঁচটা। লামহা সোফায় বসে আছে কনার পাশে। ও এখন রুম থেকে বের হতে চায়নি, কনা একপ্রকার জোর করেই নিয়ে এসেছে। জাকির বাড়িতে না থাকায় লামহা-ও বেশি কিছু বলেনি আর।
হিমেল বাড়ি থেকে যাওয়ার পর আর লামহার সঙ্গে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি, লামহা-ও করেনি। এমনিতেও লামহার ফোন নেই, বিয়ের আগেও ছিল না। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ফোন কিনে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তার আগেই তো বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
শিশির সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে সোফার দিকে এগিয়ে আসে। কনার দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই কোনা, যা আমার জন্য কফি নিয়ে আয়।”
কনা রেগে শিশিরের দিকে তাকায়। আঙুল তুলে বলে,
“একদম কোনা কোনা করবে না আমাকে। নাম ধরে ডাকতে পারলে ডাকবে নয়তো ডাকার দরকার নেই।”
শিশির এগিয়ে এসে কনার আঙুলটা খপ করে ধরে বলে,
“আমাকে আঙুল দেখিয়ে কথা বলছিস? এখন এটা ভেঙে দিলে কী হবে?”
কনা শিশিরের হাত থেকে নিজের আঙুল টেনে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলে,
“আঙুল ছাড়ো আমার। নয়তো ভালো হবে না বলে দিলাম।”
“না ছাড়লে কী করবি তুই?”
“ছাড়ো।”
“ছাড়বো না। তুই কোন সাহসে আমাকে আঙুল দেখালি?”
“ছোটো মামিইইই, শিশির ভাইকে আমার আঙুল ছাড়তে বলো।”
শিশির ভ্যাঙ্গ করে বলে,
“কিছু হলেই, ম্যামিইইই।”
“নানু, তোমার নাতিকে আমার আঙুল ছাড়তে বলো।”
“ন্যানুউউউ।”
“ব্যথা পাচ্ছি তো, ছাড়ো।”
“আঙুল দেখালি কেন?”
“তুমি আমাকে কোনা বললে কেন?”
“তোর নাম তো কোনাই।”
“কীসের কোনা? কনা আমার নাম, কনা।”
“আমিও সেটাই বলেছি, কোনা। একোনা, ওকোনা, চারকোনা।”
কনার এখন হাত-পা ছড়িয়ে ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলতে ইচ্ছে করছে। এই বদ ছেলে সবসময় ওর সুন্দর নামটা বিকৃতি করে ডাকে। মাঝে মধ্যে তো কোলা ব্যাঙ বলেও ডাকে।
লামহা চুপচাপ দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। জোবেদা মির্জা দুজনের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“শিশির, কনার আঙুল ছাড়।”
“বদ খাচ্চুনি নাতনি আমাকে আঙুল দেখালো কেন?”
“তুই ওকে উল্টাপাল্টা নামে ডাকিস কেন?”
“উল্টাপাল্টা নামে রেখেছো কেন?”
“ছাড় ওকে।”
“আমার পা ধরে মাফ চাইতে বলো।”
কনা ছ্যাত করে উঠে বলে,
“জীবনেও না। ও মামিইইই, দেখো তোমার বদ ছেলে কেমন করছে আমার সঙ্গে।”
“কী বললি, শ’য়’তা’নি?”
“তুমি শ’য়’তা’ন।”
শিশির কনার আঙুল ছেড়ে ওর ঘাড় ধরে শক্ত হাতে তারপর ধুমধাম করে দুটো লাগিয়ে দেয় পিঠে। কনা চিৎকার করে ওর মামিকে ডাকছে। জোবেদা মির্জা সোফা ছেড়ে উঠে দ্রুত এগিয়ে আসেন শিশিরের হাত থেকে কনাকে ছাড়ানোর জন্য।
লামহা হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে।
শিশির চঞ্চল, দুষ্টু প্রকৃতির সেটা বুঝতে পেরেছিল কিন্তু এতটা বজ্জাত সেটা বুঝতে পারেনি। নিজেই দোষ করলো আবার নিজেই মা’রছে। কত বড়ো খচ্চর ভাবা যায়!
শিরিন সুলতানা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসে সোফার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,
“কনা, কী হয়েছে? এভাবে ডাকছিস কেন?”
মায়ের দিকে তাকিয়ে কনাকে ছেড়ে বাইরের দিকে দৌড়ে এগিয়ে যায় শিশির। এখন আর এক মিনিট এখানে থাকলে ওর পিঠেও ধুমধাম পড়বে কয়েকটা।
দ্রুত পায়ে কনার কাছে এগিয়ে এসে ওকে ধরে বলেন,
“কী হয়েছে?”
“তোমার বদ ছেলে মে’রেছে আজকেও। সে যে আমাকে কোনা বললো তাতে তার দোষ নেই আর আমি আঙুল তুলে কথা বলেছি বলে আমার দোষ হয়ে গেছে। সবসময় কোনা কানি চারকোনা বলে ডাকবে আর আমি কিছু বললেই দোষ।”
“নেক্সট টাইম এমন কিছু করলে তোর আঙুল কে’টে দেব।”
শিরিন সুলতানা কটমট করে ছোটো ছেলের দিকে তাকান। শিশির ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। মা’ইর খাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে হলে এখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়াই ভালো।
মাগরিবের নামাজ আদায় করে লামহার রুমে আসেন শিরিন সুলতানা। লামহাকে কলেজে ভর্তি করাতে হবে। আগামীকাল ভর্তির জন্য আবেদন করতে নিয়ে যাবেন।
দুজনের কথার মাঝে হঠাৎ জাকিরের গলার স্বর ভেসে আসে। লামহার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে এদিকেই এগিয়ে আসছে জাকির। লামহা শাশুড়ি আর কনার মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। এই লোক ওকে এভাবে ডাকছে কেন? লামহার ইচ্ছে করে এই বাড়ি থেকে পালিয়ে যেতে।
ডাকতে ডাকতে রুমের ভেতরে প্রবেশ করে জাকির। নিজের হাতে থাকা ফোনটা লামহার দিকে এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
“তোমার ফোন এসেছে।”
লামহা জোর করে গলা দিয়ে শব্দ বের করে মৃদু স্বরে বলে,
“কে?”
“আমি চিনতে পারছি না, তোমার ভাইয়া বোধহয়।”
লামহা জাকিরের ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ভাইয়া জাকিরের ফোনে তো কল দেওয়ার মতো মানুষ না। কে কল করেছে?
“ধরো।”
লামহা শাশুড়ি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ফোনটা হাতে নেয়। স্পিকারে দিয়ে বলে,
“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।”
“হাই, ডার্লিং। কেমন আছো?”
গলার স্বর আর কথা শুনে চমকে ওঠে লামহা। বাকি তিনজনও এমন কথা শুনে শকড। লামহার পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বল চেহারায় অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এসেছে। মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বের হচ্ছে না। ফোন ধরে রাখা হাতটা কাঁপতে শুরু করেছে। ওপাশ থেকে আবার ভেসে আসে,
“ডার্লিং, কি করো? জামাইয়ের বুকে মাথা রেখে শুইয়া আছো? তোর জামাই তো আমার ভয়ে ফোন-ই বন্ধ কইরা রাখছে। তোর জামাইরে হাতের কাছে পাইলে কলিজা টাইনা ছিরমু আগে তারপর বাকি হিসাব।”
“এই জানোয়ার, জীবনে ভালো হবি না? লজ্জাশরম বলতে তোর মধ্যে কিছু নাই? এই নাম্বার কই পাইছস?”
“নাম্বার কই পাইছি এইডা তো ভাবোন লাগবো না। আমি ভালো হমু না, লজ্জাশরম নাই আমার মধ্যে। তোরে বিয়া কইরা ভালো হইয়া যামু।”
“আল্লাহর গজব পড়বো তোর উপরে।”
“গজব তোর জামাই আর তোর বাপ-ভাইয়ের উপরে পড়ুক, হারামজাদি। আমি বাংলাদেশে নাই আর এই সুযোগে তোর বাপ-ভাই তোরে বিয়া দিয়া দিছে। সাহস থাকলে আমি দেশে থাকতে নয়তো দেশে ফিরলে বিয়া দিত।”
“এই জংলি কু/ত্তা, ঘেউঘেউ করবি না একদম। তুই বাড়িতে এসে ঘেউঘেউ করবি সেই অপেক্ষায় বসে থাকবে আমার বাপ-ভাই? গুজব তো কম রটাসনি, বারবার আমার নামে মিথ্যাচার করে বিয়ে ভেঙেছিস। ভরা বিয়ে বাড়িতে আমার পরিবারকে অপমানিত হতে হয়েছে তোর জন্য। তোর যন্ত্রণায় না আমি শান্তি পেয়েছি বাইরে বের হয়ে আর না আমার পরিবারের কেউ পায়। শত শত মানুষের সামনে আমাদের মান সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস তুই। যেখানে আমাকে ছোঁয়ার মুরোদ হয়নি তোর, সেখানে তুই তোর চামচাদের দিয়ে রটিয়েছিস তুই আমাকে—, কুত্তা তোর উপর আল্লাহর গজব পড়বো, ঠাডা পড়বো, শ’য়’তা’ন ম’র তুই।”
“আস্তে আস্তে। এত উত্তেজিত হচ্ছো কেন, ডার্লিং? ছুঁইতে পারি নাই তো কি হয়েছে, বলতে তো বাঁধা নাই। বলাতেই তো কাম হইয়া গেছিল কিন্তু মাঝখানে ওই বুইড়া আইসা সব ঘাইটা দিছে। ভুজুং ভাজুং কইয়া বড়ো ভাইয়ের কাছ থেকে ছুডাইলাম কিন্তু ছোটো ভাই নিয়া চইলা গেল। আমার পাখি হাত ছাড়া হইয়া গেল। তোর জামাইয়ের কাছ থেকে দূরে থাকবি সবসময়, তোরে শুধু আমি ছুঁব। তোর বাপ-ভাইয়ের ব্যবস্থা আগে করি তারপর তোরে নিয়ে আসব।”
লামহা কিছু বলার আগেই জাকির বজ্র কন্ঠে বলে,
“আয়, তোর কাছে দেওয়ার জন্যই তো বইসা আছি আমরা। পাখির ঠ্যাং তোর পেছন দিয়ে ভরে দেব, অসভ্য জানোয়ার কোথাকার।”
লামহার হাত থেকে থাবা দিয়ে ফোন নিজের হাতে নিয়ে গালাগালি করতে শুরু করে জাকির। জাকিরের ননস্টপ গালি শুনে কল কে’টে দেয় কবীর। জাকিরের গালি শুনে লামহার কান ঝা ঝা করছে। বিড়বিড় করে কয়েকবার আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে নিয়েছে।
জাকির লামহার মুখের দিকে তাকায়। জাকিরের চাহনি দেখে লামহা শাশুড়ি মায়ের গা ঘেঁষে বসে।
শিরিন সুলতানা কবীরের কথা শুনে থম মে’রে গেছেন।
জাকির রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ও বেরিয়ে যেতেই লামহা ফোস করে শ্বাস ছাড়ে, এতক্ষণ যেন দম বন্ধ করে ছিল।
জাকির সোজা বাবা মায়ের রুমে প্রবেশ করে অনুমতি নিয়ে।
চলবে………..
Share On:
TAGS: তোমার সঙ্গে এক জনম, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৩৪
-
দিশেহারা পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ৪৮
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ১১
-
দিশেহারা পর্ব ৪৭
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬