তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড
পর্ব_৪০
প্রিমাফারনাজচৌধুরী
ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই তাসনুভার মুখ আষাঢ়ের আকাশের মতো থমথমে। আনিস শুরুতেই ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে কিন্তু না দেখার ভান করে বসে আছে। তাসনুভার মেজাজ-মর্জির কোনো ঠিক নেই। তার খুশি হওয়া আর অমাবস্যার চাঁদ দেখা দুটোই বিরল ঘটনা। মন খুব ভালো থাকলেও সে হাসে না, যেন হাসলে ট্যাক্স দিতে হবে।
আজ অবশ্য চেহারায় বিষণ্নতা নেই। তবে রাগের একটা কড়া আস্তর পড়ে আছে। আনিস মনে মনে কারণ হাতড়ালো। কিন্তু ঝগড়া করার মতো কোনো লাগসই সূত্র সে খুঁজে পেল না। এই মুহূর্তে আগ বাড়িয়ে ‘কী হয়েছে’ জিজ্ঞেস করা মানেই বিপদকে দাওয়াত দিয়ে আনা। তখন সে এমন সব কাণ্ডকারখানার দায় তার ওপর চাপাতে শুরু করবে, যা আনিস দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
সে চুপচাপ তাসনুভাকে লক্ষ্য করতে লাগল। না, রাগী অবস্থায় তাসনুভাকে মন্দ লাগে না। রাগী চেহারায়ও তাকে যথেষ্ট নিষ্পাপ দেখাচ্ছে এই মুহূর্তে। সেটাই আনিসের জন্য চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একে আসলে রাগ বলা ঠিক হবে না। রাগ আর অভিমানের মাঝে একটা সূক্ষ্ম সুতোর মতো তফাত আছে। মেয়েরা যখন খুব কাছের মানুষের ওপর অধিকার নিয়ে মন খারাপ করে, তখন সেটা হয়ে যায় অভিমান। রাগ করা সহজ, কিন্তু কারো ওপর অভিমান করার জন্য তাকে অনেক বেশি ভালোবাসতে হয়। তাসনুভা কিছুক্ষণ পরেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মন ভালো থাকলে কিছু একটা বলতো। কিন্তু আজ কিছু বললো না।
শাহিদা বেগমের গলা শোনা যাচ্ছে। সকালের নাশতা তৈরি। আনিসকে এখনই খেয়েদেয়ে অফিসের জন্য দৌড় দিতে হবে। কিন্তু তার আগে তাসনুভার রহস্যময়ী রাগের উৎসটা বের করা দরকার। সমস্যা হলো আজ সব কিছুতেই বড্ড দেরি হয়ে গেছে।
সে বিছানায় বসে মোজা পরছে। সে সচরাচর খেয়েদেয়ে একদম শেষ মুহূর্তে মোজা পরে। আজ নিয়মটা ভেঙে গেছে।
তাসনুভা কিছুক্ষণ পর দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়াল। বুকে হাত ভাঁজ করে সে কঠিন দৃষ্টিতে তার মোজা পরা দেখছে।
আনিস একটু অস্বস্তিতে পড়ল। খেয়াল করল তাসনুভার মেজাজ খারাপ হওয়ার কারণে তার নিজের ভেতরের গোছানো ভাবটা ওলটপালট হয়ে গেছে। অথচ সকালবেলা সে একদম টিপটপ থাকে। একটা সুতোও এদিক-সেদিক হওয়ার জো নেই। অফিস থেকে ফেরার পর সে হয়তো একটু আলুথালু থাকে, কিন্তু যাওয়ার আগে সে অন্য একটা মানুষ।
অথচ আজ বের হওয়ার আগেই সে অগোছালো হয়ে পড়েছে। জুনুনআরার এই নিষ্পাপ রাগী মুখটা তার রুটিনের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। সে মোজা পরা থামিয়ে একবার তাসনুভার দিকে তাকাল। মেয়েটার চোখেমুখে এখন যুদ্ধের আগাম সংকেত। আনিস প্রস্তুতি নিয়ে মনে মনে বলল, “যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। এবং আমি যথারীতি নিরস্ত্র।”
যুদ্ধের প্রথম গোলাটা দাগল তাসনুভা। গলাটা বেশ সপ্তমে চড়িয়ে সে বলল, “আর কতবার ডাকলে আপনার কানে যাবে? আপনি কি এখন কানেও কম শুনছেন?”
আনিস চমকে মাথা তুলল। মিসেস যে কখন দরজার সামনে থেকে ভেতরে চলে এসেছেন, সে টেরই পায়নি। অপরাধীর মতো বলল, “যাচ্ছি।”
“কখন? যখন সব বরফ হয়ে যাবে তখন?”
“না, এই তো এখনই।”
তাসনুভা একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, “আর যেতে হবে না। আমি এখানেই নিয়ে আসছি।”
আনিস আর দ্বিরুক্তি করল না। মনে মনে সে খুশিই হলো। ডাইনিং টেবিলে বসে সবার সামনে জেরা করা যেত না। এখানে অন্তত কথা বলার জন্য কিছুটা নিরিবিলি সময় পাওয়া যাবে।
খানিক বাদে তাসনুভা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। তার বুকের ওপর চওড়া করে মেলানো ওড়নার এক কোণা মেঝের ধুলো ছুঁয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আনিস আলতো করে ওড়নাটা তুলে তার কাঁধে তুলে দিল।
নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি কোনো কারণে রেগে আছ?”
তাসনুভা ট্রে-টা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে বলল, “না।”
আনিস একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, “আচ্ছা বাঁচা গেল। তুমিও বসো। একসাথে খাই।”
তাসনুভা গুমোট মুখে বলল, “একসাথে খাব বলেই এখানে এনেছি। একা খাওয়ার শখ আমার নেই।”
আনিস তখনো বিছানায় বসে। সে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত ভাবল। আজ আর মোজা পরা হবে না। নিয়ম যখন একবার ভেঙেই গেছে, তবে পুরোটা ভাঙাই ভালো। সে ধীরে ধীরে মোজা জোড়া খুলে ফেলল। তাসনুভা আড়চোখে সেটা দেখল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু ঠান্ডা গলায় নির্দেশ দিল,
“খাওয়া শুরু করার আগে হাতটা স্যানিটাইজ করে নিন। হাত না ধুয়ে আবার খেতে বসবেন না।”
আনিস বাধ্য ছেলের মতো হাত ধুয়ে এল। ছোট টেবিলটায় তারা মুখোমুখি বসল। দুজনের মাঝখানে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, লাল আটার পাউরুটি, ফ্রুট জেলি, সেদ্ধ ডিম আর কলা। তাসনুভা সাধারণত সকালে খুব অল্প স্বাস্থ্যকর খাবারই খায়। তবে আজ ঘরোয়া আয়োজনে যা আছে তারা তাই নিয়ে বসেছে। কোনো বাড়তি আড়ম্বর নেই।
তাসনুভা পাউরুটিতে জেলি মাখাতে মাখাতে একবার আনিসের দিকে তাকাল। আলতো করে পাউরুটিটা আনিসের দিকে বাড়িয়ে দিল।
আনিস পাউরুটিটা নিল। জেলি মাখানো পাউরুটি দেখতে বেশ সুন্দর। অনেকটা শরতের মেঘের ওপর সূর্যাস্তের রঙের মতো। কিন্তু আনিসের মাথায় এখন মেঘ-বৃষ্টির চিন্তা। আজ আকাশের অবস্থা ভালো না। সে পাউরুটিতে একটা কামড় দিয়ে নরম গলায় বলল,
“রাগের কারণটা যদি দয়া করে একটু জানাতে তাহলে আমার অফিস যাত্রাটা বেশ নিঝঞ্ঝাট হতো। মনটা খচখচ করছে।”
তাসনুভা চায়ের কাপে চুমুক দিল। ধোঁয়া ওঠা চায়ের আড়ালে তার মুখটা খানিকক্ষণ অস্পষ্ট হয়ে রইল। তারপর সে নিস্পৃহ গলায় বলল, “রাগ করার জন্য কি সবসময় কারণ লাগে? কারণ ছাড়া কি রাগ করা যায় না?”
আনিস একটু থতমত খেল। এই ধরণের তর্কে জেতা অসম্ভব। তাই সে শান্ত স্বরে বলল, “অবশ্যই যায়। তবে কারণটা জানা থাকলে সমাধান খোঁজা সহজ হয়।”
তাসনুভা এবার তার সেই বড় বড় চোখ তুলে তার দিকে তাকাল।
“সবকিছুর সমাধান হওয়ার দরকার নেই। কিছু জিনিস অমীমাংসিত থাকাই ভালো। এই কথা আপনিই বলেন।”
আনিস পাউরুটির টুকরোটা মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল, “তুমি আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলে যে আনন্দটা পাও সেটা দিয়ে তোমার কী হয়? এই যে আমি এখন অফিস যাব সারাক্ষণ মাথার ভেতর তোমার এই মুখভার ঘুরে বেড়াবে। কলম ধরতে গেলে মনে হবে কোথায় একটা ভুল করে ফেলেছি, ফাইল খুললে মনে হবে ফাইলে ভুল আছে। এই অস্বস্তিটা দিয়ে তোমার লাভটা কী?”
তাসনুভা চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। চোখের কোণে একটা চিকচিকে আলো দেখা দিল। খুব শান্ত গলায় বলল, “মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। এতে হার্ট সচল থাকে।”
আনিস দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমার হার্ট এমনিতেই সচল। তোমার এই অজানা রাগের চোটে সেটা এখন রীতিমতো দৌড়াচ্ছে।”
তাসনুভা এবার একটু নড়েচড়ে বসল। একটা ডিম আনিসের প্লেটে তুলে দিয়ে বলল, “বেশি কথা না বলে ডিমটা খান।”
“সেটা খাব। কিন্তু কেন রেগে আছ সেটা বলে দাও।”
“বলে দিলে কি হবে?”
“হতে তো অনেক কিছুই পারে।”
“আমি শুনতে চাই।”
আনিস ডিমটা মুখে দিয়ে তার দিকে চেয়ে রইলো। তাসনুভা ভ্রু নাচালো। হাত ঘুরিয়ে বলল,”অমনি কথা বন্ধ?”
আনিস পানির গ্লাস টেনে নিল। গলা ভিজিয়ে বলল,
“আচ্ছা অফিস থেকে এসে বাকি কথা হবে। যেহেতু বলতে চাচ্ছ না। আমি জোরাজোরি করবো না।”
আনিস দ্রুত হাতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে চেয়ার ছাড়ল। ঘড়ির কাঁটা এখন তাকে তাড়া দিচ্ছে, কিন্তু মনের ভেতরের কৌতূহলটা তখনো থিতু হয়নি। অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার ঠিক আগমুহূর্তে সে আচমকা তাসনুভার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। নিচু হয়ে ওর কাঁধের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“রাগটাকে একটু ছুটি তো দিতে পারো। বেচারা আর কত খাটুনি খাটবে?”
তাসনুভা আস্তে করে বলল,”ওকে।”
মাথা দিয়ে তার মাথায় একটা টোকা দিয়ে আনিস বলল,”আল্লাহ হাফেজ।”
“আল্লাহ হাফেজ।”
আনিস বেরিয়ে গেল। তাসনুভা দ্রুত পায়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
তার রাগের কারণটা ছিল, কাল রাতে সে খেয়াল করেছে আনিসুজ্জামান তার বিজনেস পেজটাতে এখনো ফলো দেননি। এই সামান্য অবহেলার জন্য তার অভিমান আকাশ ছুঁয়েছে। যদিও আনিসুজ্জামান তার সেই সূক্ষ্ম অভিমান বিন্দুমাত্র আঁচ করতে পেরেছে কি না তা নিয়ে তার বিস্তর সন্দেহ।
মন খারাপ নিয়ে ভাবতে ভাবতে অজানা এক কৌতূহলে সে মোবাইল হাতে নিয়ে আনিসুজ্জামানের আইডিতে ঢুকল। আর ঢুকেই তার বুকটা ধক করে উঠল। আনিসুজ্জামান তার পেজটা শেয়ার দিয়ে লিখেছে,
“এটা আমার বউয়ের পেজ। ভাইবন্ধুরা সবাই ফলো দিয়েন।”
তাজদার সিদ্দিকী কমেন্ট করেছে,”তোর যে বউ আছে এটা তো জানতাম না ভাই।”
অনেক হা হা রিয়েক্ট পড়েছে সেই মন্তব্যে। তৌসিফ কমেন্ট করেছে,
“বোঝা যাচ্ছে এই পোস্টের পেছনে পাশের বাসার ভাবির অনেক চোখের পানি আছে।”
শাওন কমেন্ট করেছে।
“নির্ঘাত কোনো বিশাল ঝগড়া হয়েছে, আর সেই ড্যামেজ কন্ট্রোল করতেই আনিস সাহেবের এই আকুতি। ভাই আমার বেঁচে থাক।”
তাসনুভা ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল। ঠিক তখনই নিচে তাকিয়ে দেখল আনিস বাইক স্টার্ট দিচ্ছে। তার হাসিমুখ দেখে সে কপাল কুঁচকে চেয়ে আছে কিছুটা বিচলিত, কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে। তারমানে রাগের কারণ ওটা ছিল? সত্যি! এই মেয়েটা পারে বটে।
তাসনুভা তাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল। নিজের এই ছেলেমানুষি ধরা পড়ে যাওয়ায় সে অপ্রস্তুত। বারান্দার গ্রিল ঘেঁষে থাকা টব থেকে একটা ফুল ছিঁড়ে সে নিচের দিকে ছুঁড়ে মারল। তারপর একছুটে ঘরের ভেতর চলে গেল।
ফুলটা টুপ করে গিয়ে পড়ল আনিসের হেলমেটের কাঁচে। আনিস বাইক থামিয়ে ফুলটা হাতে নিল। ছুঁড়ে দিল, কিন্তু ফুল তো দিল।
তাজদার সিদ্দিকী গম্ভীর গলায় বলল, “না আর সম্ভব না। এখানে একটা বিয়ে আমাকে করতেই হবে। প্র্যাকটিক্যাল চিন্তা করে দেখলাম একটা মাত্র বউ নিয়ে সুখী হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। বিজ্ঞানের সূত্রমতে ইমপসিবল। জীবনে বৈচিত্র্য দরকার।”
ওপাশ থেকে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে ঝরঝরে গলায় জবাব এল।
“বিয়ে যখন করবেনই তখন কিছু জরুরি আলাপ সেরে ফেলি। বাংলাদেশ থেকে কি আমি বেনারসি পাঠিয়ে দেব? দাদুর দেওয়া গয়নাগুলোও কিন্তু আলমারিতে তোলা আছে। বেশ পুরোনো গয়না। খাঁটি সোনা আছে ওতে। ওগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছি, নতুন করে সোনাদানা কেনার কোনো দরকার নেই। হাদিস-তসরুফে আছে বিয়েতে যত কম খরচ, বরকত তত বেশি। কি বলেন? আপনার দ্বিতীয় বউয়ের জন্য দোয়া রইলো।”
তাজদার কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রাগটা ফেটে বের হওয়ার কথা। কিন্তু অদ্ভুত কারণে তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরুলো না। মানুষের রাগ কি বাষ্পীভূত হয়ে মেঘ হতে পারে? না, এরকম একটা বেঈমান বউ ঘরে ঘরে থাকা দরকার। সে কেন একা একা এই আগুনে পুড়ে খাক হবে? সবার পোড়া উচিত। এমন আনন্দময় মড়ক সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন। ভীষণ প্রয়োজন।
শাইনা বুকের নিচে বালিশ রেখে বিছানায় শুয়ে পা নাড়তে নাড়তে বলল,”আমার সতীনকে আমি কি কি দেব তার লিস্ট আমি তৈরি করে দুপুরের মধ্যে আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। কথা দিচ্ছি আমি খুব ভালো একজন সতীন হবো।”
তাজদার রেগে বলল,”তুই ওটাই পারবি।”
“আম্মা আমাকে একটা বেয়াদবের সাথে বিয়ে দিয়েছে।”
“তুই আমাকে আর ফোন দিবিনা বেঈমান।”
শাইনা হেসে হেসে বলল,”সতীন আসার পর দেব না। সতীন আসার আগে তো দিতেই পারি।”
“না দিবিনা।”
“দেব। সতীন..
“আরেকবার সতীন সতীন করলে দেশে এসে তোর গলা টিপে ধরবো।”
শাইনা হেসে উঠলো আরও জোরে।
“ভাদ্র মাসে কুকুর পাগল হয়। শ্রাবণ মাসে কি মহিষও পাগল হয় নাকি?”
“এই বেঈমান মহিষ কাকে বলছো?”
“মহিষকেই। না না যে গাপুসগুপুস করে মহিষের মাংস খায়। গপগপ গপগপ করে। হা হা।”
“তোমার মনে এত ফূর্তি কীসের? আমি তো দেশে নেই।”
“বলবো?”
“তো বলবি না?”
“তুই তুকারি কেন করছেন তাজদার সাহেব?”
“তোকে ভালো কথা বললে তুই শুনিস?”
“তুইও তো শুনিস না।”
তাজদার চুপ হয়ে গেছে। নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত ভুলে গেছে। শাইনা বলল,
“আমি ঠিক করেছি যে আমাকে তুই তুকারি করবে আমিও তাকে তুই তুকারি করবো।”
“বাজে কথা বাদ দে।”
“দিলাম। মনে এত ফূর্তি কেন বলি।”
তাজদার সিদ্দিকী আর কিছু বললো না। গোঁয়ারটাকে সর্বোচ্চ রাগিয়ে দেয়ার মিশনে নেমেছে শাইনা। বলল,
“আজ বহুদিন পর মেসেঞ্জারে গেলাম। একজন মেসেজ দিল, ভাবি আপনার স্বামী কি বিদেশে? আপনি কি একাকিত্ব বোধ করছেন? একা একা সময় না কাটলে…
সাথে সাথে ওপাশটা গর্জে উঠলো।
“থামো! ওই আইডির লিংক দাও।”
“পুরোটা শুনুন।”
“না শুনতে চাই না।”
“আরেহ শুনুন। আমাকে বললো..
“তুই বেঈমান লিংক দিবি কিনা?”
শাইনা গজগজ করে বলল,
“আস্ত একটা বেয়াদব গোঁয়ারের সাথে আমার মতো ভোলাভালা মেয়ের বিয়ে দিয়েছে সবাই মিলে। জীবনেও কাউকে মাফ দেব না আমি।”
তাজদার ফোন কেটে দিয়েছে। মেসেজ দিয়েছে।
“লিংগ কোথায়?”
“হোয়াই ইজ লিংগ?”
শাইনা পেট চেপে ধরে উচ্চস্বরে হাসছে। চোখে পানি চলে এসেছে হাসতে হাসতে।
“লিংক বলেছি।”
“সাবধানে টাইপ করা উচিত। হা হা।”
“আর মাত্র ছ’মাস। তুই আয় আমার কাছে। তারপর তোর কি অবস্থা করি দেখ।”
“ডিম দেবেন। আমি ছানা ফুটাবো এই আর কি।”
আর কোনো রিপ্লাই এল না। শাইনা বিছানায় শুয়ে হাসছে। তাজনা তার মাকে অবাক চোখে দেখছে। মা এভাবে হাসছে কেন?
ঘন্টা দুয়েক পর হুট করে মেসেজ এল।
“ওই ভেড়ার আইডি খেয়ে দিয়েছি। একাকিত্বের পিরিতি আর কার কার সাথে চলে, সেটা দেখার জন্য তোর আইডিও আপাতত আমার হাতে। বেস্ট অফ লাক। সি ইউ ইন লন্ডন। বাকি হিসেব তখন সশরীরে বসে হবে।”
শাইনা হতচকিত, বিস্ময়াহত! পাশের বাসার এইসব বেয়াদবকে বিয়ে করে ভাগ্যিস ইজ্জত সম্মান বাঁচিয়েছে সে! নইলে একে বিয়ে করতো কে?
“ভাইয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে…
ব্যাঙ লাফ দিয়ে তৌসিফের সামনে এসে পড়লো তিতলি। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,”তুমি গান গাইবে। আর আমি দুলে দুলে নাচবো। শাওন ভাই ভিডিও করবে। আমি এক্ষুণি শাওন ভাইকে ডাকছি। ভাবিদেরকেও ডাকছি।”
তৌসিফ গিটারটা তার হাত থেকে নিয়ে বলল,”কিন্তু আমি তো গান জানিনা।”
তিতলি বলল,”জানি, কিন্তু সবাই না থাকলে তখন ভালোই জানো। এখন কেউ নেই। সবাই আসার আগে একটা গান করো।”
“কোন গানটা?”
“মন বোঝে না।”
তৌসিফ হতাশ হয়ে বলল,”মনে পড়ছেনা পুরোটা।”
তিতলি তার মাথায় গুঁতা দিয়ে বলল,
“যেটা মনে পড়ে সেটা গা না ভাই।”
“আচ্ছা।”
“রোজ বিকেলে আতর ঢেলে তোকে সাজাবোই
মেলায় যাবো রিক্সা চড়ে, বসবি পাশে তুই
বন্দি আছে হাজার আশা বুকের মাঝে দেখ
একটু চিনে নিলেই হবো দু’জন মিলে এক
তবু স্বপ্নেরা মুখ তোলে না।
ও মন বোঝে না, বোঝে না, বোঝে না
মন বোঝে না, বোঝে না।
তিতলি ধেইধেই করে আপন মনেই নেচে যাচ্ছিল। তখুনি শাওন ধপাস করে ছাদের দরজা ঠেলে ঢুকল। কপালে তিনটি ভাঁজ। সে মাথায় হাত দিয়ে আকাশ-পাতাল কাঁপিয়ে বলে উঠল,
“সর্বনাশ! মহাসর্বনাশ!”
তৌসিফ আরামকেদারায় আধশোয়া হয়ে গান গাইছিল। ধড়ফড়িয়ে উঠে বলল, “কি হলো?”
“তাজ ভাই কি স্টোরি দিয়েছে একবার দেখ। এই ভরসন্ধ্যায় এত বিরহ কিসের?”
তৌসিফ অনিচ্ছাসত্ত্বেও মোবাইলটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ফুটে উঠল নীলচে পাহাড়ের চূড়ায় একা একা দাঁড়িয়ে আছে তাজদার সিদ্দিকী। দৃষ্টি দিগন্তের ওপারে। ব্যাকগ্রাউন্ডে গান বাজছে,
“আমার বিচার তুমি করো, তোমার বিচার করবে কে?”
তৌসিফ আর শাওন গভীর মনোযোগ দিয়ে স্টোরিটা দেখছে। তখনই হাসতে হাসতে উদয় হলো শাইনা। তার কোলে তাজনা। মা-মেয়ের হাসির দমকে সবাই চমকে তাকালো।
শাওন আর তৌসিফ একে অপরের দিকে তাকালো। তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না তাজদার সিদ্দিকী বিলেতে বসে কেন অমন বিচিত্র নাটকের মঞ্চ সাজিয়েছেন। এই গান কার জন্য, আর এই বিচার কার কাছে চাওয়া হচ্ছে সেটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার।
দুইটা মানুষ মাইলের পর মাইল দূরে থেকেও কীভাবে এত ঝগড়া করতে পারে সেটা তারা বুঝতে পারছেনা।
আনোয়ারা বেগম নাতির সাথে কথা বলতে বসেছেন। পুত্রবধূ রওশনআরা তার নাতিবউকে বাড়ি নিয়ে আসার পর তিনি বেশ খোশমেজাজে আছেন। ভিডিও কলে তাজদার সিদ্দিকী। কিছু একটা চিবোচ্ছে। পাশাপাশি নিজের কাজও করে যাচ্ছে। তিনি বললেন,
“দাদুভাই দূরে থাকলে শুনেছি মহব্বত বাড়ে। তোমাদের কি কমছে নাকি? শুনলাম দু’জন আবারও ঝগড়া করেছ?”
“বেঈমানটা এইসব বলেছে?”
“না, কিন্তু ঝগড়া কি নিয়ে? আর বেঈমান আবার কেমন ডাক?”
তাজদার গুমোট চেহারায় বলল,”ওকে জিজ্ঞেস করো।”
“এত রাগ কেন?”
“এমনি।”
“এমনি আবার কী? দূরে থেকে অত ঝগড়া করতে আছে বুঝি?”
পাশে শাইনা চুপটি করে বসে আছে। ক্যামেরা তার দিকে ঘুরলে সে তাজদারকে জিহ্বা বের করে দেখাচ্ছে। তাজদার বলল,
“দূরে আছি বলেই তো ঝগড়া করছি।”
“কাছে এলে করবে না বলছো?”
তাজদার বিরক্ত। মহাবিরক্ত। ওটা আবার বলে দিতে হয়? দূরে থাকলেই ঝগড়া হয়। আর কাছে এলে শুধু ভালোবাসা বাসি হয়। ননসেন্স! কেউ বোঝে না সেটা। তার গাধীটাও না।
সমাপ্ত….
আজ ইতি টানলাম। টানা অসুস্থতা, লেখালেখিতে অনাগ্রহ সব মিলিয়ে আপনাদের অনেক অপেক্ষা করিয়েছি তারজন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আজকে সবার মন্তব্য চাই। শীঘ্রই নতুন গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছি ইনশাআল্লাহ। সবাই দোয়ায় রাখবেন। আপনাদের জন্যও দোয়া রইলো।
তাজমহলের আর কিছু এলে সেটা বোনাস পর্ব আসবে। আজ ওরা এখানেই বিদায় জানালো আপনাদের। ভালো থাকুন।
Share On:
TAGS: তাজমহল, প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৯
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩৫
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২২
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৬
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২০
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৬
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৪