Golpo ডিফেন্স রিলেটেড ডেসটেনি

ডেসটেনি পর্ব ২


ডেসটেনি [ ২ ]

সুহাসিনি_মিম

[কপি করা নিষিদ্ধ]

“সিদ্দিক কুঞ্জ” প্রায় চব্বিশ শতাংশ জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা এই বাড়িটা শহরের অন্যসব চোখ ধাঁধানো দালানগুলোর মতোই সৌন্দর্যে ভরপুর। ভোর হলেই গাছের ডালে ডালে পাখিরা সুর তুলে ডাকে এখানে। সেই পাখিদের ডাকেই প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় সিদ্দিক কুঞ্জে। যার ব্যতিক্রম হয়নি আজও।

সিদ্দিক বাড়ির ডাইনিং টেবিলে একে একে এসে বসেছেন সকলে। এ বাড়ির সদস্য সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। বাড়ির একমাত্র বড় ছেলে,তাজধীর সিদ্দিক আজান। আর ছোট মেয়ে—অজান্তা তাবাস্সুম মিতালী। এই দুই সন্তানকে নিয়েই মোহনা বেগমের জগৎ বিস্তৃত।

স্কুলের গন্ডি পেরোনের আগেই বাবাকে হারায় তাজধীর। তার বাবা আশরাফুল সিদ্দিক ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা। একটি মিশনে গিয়ে শহীদ হন তিনি। হাসিখুশি পরিবারটা হঠাৎ করেই ভেঙে পড়তে শুরু করে। কিন্তু মোহনা বেগম ভাঙেননি।শক্ত করেছেন নিজেকে। স্বামীকে হারিয়েও তিনি ছেলেমেয়েকে বুকে-পিঠে আগলে রেখে মানুষ করেছেন। কষ্টের ভেতর দিয়েই শিখিয়েছেন শক্ত হতে, সোজা হয়ে দাঁড়াতে।

তাজধীর ছোটবেলা থেকেই বাবাকে নিজের আইডল মানত। বাবার পোশাক, শৃঙ্খলা, সাহস—সবই তার চোখে ছিল বীরত্বের প্রতীক। বাবার পেশাকেই নিজের স্বপ্নের পথ হিসেবে বেছে নিয়েছে সেও।তাই বড় হয়ে বাবার দেখানো পথেই পা বাড়ায় সে। তবে পার্থক্য একটাই, তার বাবা ছিলেন মেজর,আর ছেলে হয়েছে নেভির একজন অফিসার। দেশের নীল জলরাশির বুক চিরে চলা জাহাজে যার পার হয় জীবনের অধিকাংশ সময়।

টেবিলের এক কোণে বসে আছেন প্রিয়ন্তীর দাদি।বয়সের ভারে সামান্য নুয়ে পরলেও রূপচর্চায় কমতি নেই একটুও। দাদি শাশুড়ির পাশেই বসেছে মিতালি। স্বামীর জন্য নাস্তা সাজাচ্ছে প্লেটে। খাবারের থালা সামনে নিয়েও মোহনা বেগমের চোখ বারবার ঘরের ভেতরদিকে যাচ্ছে। যেন কাউকে খুঁজছেন তিনি। মেয়েকে ডেকে বললেন,

” মিতালী, প্রিয়ন্তীকে ডাকিসনি এখনো? কয়টা বাজে দেখেছিস? নাস্তা করবে না মেয়েটা?”

মায়ের কথায় মিতালী উঠে দাঁড়াতেই যাচ্ছিল অমনি তাকে এসে থামিয়ে দিল পাবেল। চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,

“আমি ডেকে এসেছি ওকে । ও আসছে। তুমি বসো!”

স্বামীর কথায় বাড়ন্ত পা দুটো থামিয়ে জায়গায় বসে পড়ল মিতালী। ঠিক সেই সময়েই রুম ছেড়ে বেরিয়ে এল প্রিয়ন্তী। পেঁয়াজ রঙের পাকিস্তানি সুতির লং কামিজটায় মেয়েটাকে স্নিগ্ধ লাগছে খুব। চিকন-চাকন ফর্সা গড়নে পোশাকটা মানিয়েছেও বেশ । লম্বা চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে পেছন দিক থেকে মাথায় হালকা ঘোমটা টেনে রেখেছে। নরম গলায় সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে টেবিলে এসে বসল ও।

গতকাল রাত নামে মাত্র কাটলেও ঘুম হয়নি একরত্তিও। ভেতরে ভেতরে ছটফট করতে করতেই কেটেছে পুরোটা রাত। শত চেষ্টায় দু চোখের পাতা এক করতে পারেইনি। চোখ বন্ধ করলেই তো ভেসে উঠেছে গত রাতের সেই দৃশ্যগুলো। “বউ হবেন আমার? এই নিরামিষ পুরুষের,আমিষ বউ? কথাগুলো বারবার ওর চোখের সামনে ঘুরে ফিরে এসেছে না চাইতেও। এমন মোহনীয় ভাবে কেউ সামনে এসে এমন আবদার করে বুঝি? তাও লোকটা কিনা, যেই সেই কোনো তরুণ যুবক না, সোজা লেফটনেন্টের নেভি কমান্ডার! রাতের ছটফটানি এখনো কমেনি ওর। একবার তো ভেবেছিলো সকাল হতেই চলে যাবে বাড়িতে। থাকবেনা আর এখানে। লোকটার মুখোমুখি কেমন করে হবে ও? আবার ভাবল বাড়িতে একা কিভাবেই বা যাবে? বাড়িতেও তো আর কেউ নেই। একমাত্র ভাই আর দাদি ছাড়া। দুজনেই তো বর্তমানে এ বাড়িতে অবস্থান করছে। তাই নিরাশ হয়ে রয়ে গেছে এ বাড়িতেই । যতদিন থাকবে একটু সাবধানে থাকলেই হলো।

টেবিলে একের পর এক খাবার সার্ভ করা হচ্ছে। নতুন জামাই বলে মোহনা বেগম সবকিছু নিজে তদারকি করে সাজিয়েছেন কাজের মেয়েটাকে নিয়ে। প্রিয়ন্তী পরোটা নিয়ে একটু মাংসের ঝুল মাখাল প্রথমে। এক টুকরো চিবিয়ে যেইনা পুনরায় পরোটাটুকু ছিঁড়ে মুখে পুড়বে ওমনেই সিঁড়ি দিয়ে নামার শব্দে ঘাড় তুলল উপরে। হাতে কালো রঙের ঘড়িটা পরতে পরতেই নিচে নামছে তাজধীর। প্রিয়ন্তী অজান্তেই চোখ তুলে তাকাল। স্পষ্ট সকালের আলোয় লোকটাকে এবার ভালো করে দেখল ও।

কালো ট্রাউজার,অফ হোয়াইট রঙের টি শার্ট গায়ে উজ্জ্বল ফর্সা বর্ণের লোকটাকে নিখুঁত লাগছে দেখতে। প্রিয়ন্তী খেয়াল করল লোকটা ফেইসবুকের প্রোফাইলের থেকেও বাস্তবে দেখতে বেশি আকর্ষণীয়, সুদর্শন। ছবিটা বোধহয় অনেক আগেরই হবে। শক্ত গড়ন, ধারালো চোয়াল, ছোট করে কাটা চুলে নরমাল ছেলেদের না মানলেও এই ডিফেন্সারদের মানিয়ে যায় কাকতালীয় ভাবে। ওর তাকিয়ে থাকার মাঝেই মনে পড়ল গত রাতের কথাগুলো। তড়িৎ বেগে চোখ সরিয়ে নিলো প্রিয়ন্তী। হাঁসফাঁস করল ভিতরে ভিতরে। লজ্জায় বিব্রতিতে পড়ল অমনি।

স্বাভাবিক ভাবেই টেবিলের পাশে এসে চেয়ার টেনে বসল তাজধীর। চেয়ারে বসা ছেলেটাকে মন ভরে দেখলেন মোহনা বেগম। এই ছেলেটা হয়েছে একদম তার বাবার মত। ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ব আর শৃঙ্খলার বাইরে কিচ্ছুটি বোঝেনা। কাজ ছাড়া আর কিছুই যেন নেই ওর জীবনে। নিজের সুখ-দুঃখ, আরাম-আয়েশ—সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওর কাছে একটাই জিনিস বড়: দেশের সেবা করা।

মাসের পর মাস জাহাজে, সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়। ঠিকমতো খায় কি না, ঘুমায় কি না, সেটাও অব্দি জানেন না তিনি। বেশিভাগ সময় তো ছুটি থাকলেও বাড়িতে আসে না অব্দি। শত রিকোয়েস্ট এ আনা গেলেও দেখা যায় দু তিনদিনের বেশি থাকেনা। যতবারই থেকেছে মায়ের আহাজারী, অনুরোধ থেকেই বাধ্য হয়েই থেকেছে।

এই তো মেয়ের বিয়ে হলো দিন পনেরো আগে। সে নাকি ছুটির আবেদন করেছিল, কিন্তু মিশন থাকায় আসতে পারেনি। মোহনা বেগম জানেন একটু চেষ্টা করলেই আসতে পারত তার ছেলেটা। করেনি চেষ্টা। গতকালই বাড়ি এসেছে। ছেলের বাড়িতে আসার খবর পেয়েই মোহনা বেগম আর দেরি করেননি। মেয়ে-জামাই—দু’জনকেই আগেভাগেই নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়েছেন। কারণ বেশ ভালো করেই অবগত তিনি, তাজধীর নিজে থেকে কখনোই কারো বাড়িতে যাবে না। কোনোদিন ও না। এমনকি নিজের বোনের শুশুর বাড়িতেও না।

ছেলের পছন্দের খাবার আগে ভাগেই সাজিয়ে রেখেছেন তিনি। কি খায় না খায় কে জানে। সবসময় পরে থাকে তো ওই নীল পানির মহা সমুদ্রেই। খেতেই খেতেই তাজধীর ধীরে চামচ নামিয়ে পাবেলের দিকে তাকাল। বলল ওমনেই,

“তো পাভেল, তোমার ব্যবসা–বাণিজ্য কেমন চলছে?”

পাভেল খাবার মুখে তুলতে তুলতেই নম্র গলায় প্রত্তুত্তর করল,

“জি ভাই, এইতো আলহামদুলিল্লাহ। চলছে কোনোরকম ।”

কারো কণ্ঠস্বর এতটা মারাত্মক কিভাবে হতে পারে জানা নেই প্রিয়ন্তীর। লোকটা স্বাভাবিক কথা বললেও যেন একদম সোজা বুঁকের মধ্যে গিয়ে লাগতে পারে। এইযে যেমনটা লাগছে ওর। তবে ভয় ও লাগছে। এই বুঝি লোকটা আবার ওর ভাইকে সব বলে না দেয়।
এই বুঝি কাল রাতের কথাগুলো অজান্তেই টেবিলের মাঝখানে এসে পড়ে! খাবার মুখে তুললেও গিলতে পারছে না ও। চোখের কোণ দিয়ে একবার তাকাল তাজধীরের দিকে। লোকটা ঠিক তখনই বলল আবার,

“তা, মিস প্রিয়ন্তী আপনার কি অবস্থা?”

প্রিয়ন্তী তো চেয়েই ছিল। লোকটা প্রশ্নঃ করে তাকাতেই চোখেচোখি হলো দুজনের। সঙ্গে সঙ্গে মাথা নুইয়ে ফেলল প্রিয়ন্তী। আচানক প্রশ্নে খাবার আটকাল গিয়ে গলায়। তুড়ন্ত পানির গ্লাস এগিয়ে দিলো মিতালী।বলল,

“নাও , পানি খাও ! আস্তে!”

প্রিয়ন্তী কাঁপা হাতে পানি নিয়ে কয়েক ঢোক খেল।
খেতে খেতে তাকাল আবার। লোকটা তখনোও ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে। বোনের প্রশ্নের উত্তর দিল পাবেল। বলল,

“এই তো ভালোই চলছে। এবার অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে। ইংলিশ ডিপার্টমেন্টে।”

তাজধীর হালকা ভ্রু তুলে বলল,

“ওহ! ইংলিশ! ভালো তো। তো আপনার শখ কী,মিস প্রিয়ন্তী? লেখাপড়া চালাবেন? নাকি বিয়ে–শাদি করে হাসবেন্ড নিয়ে সেটেল হয়ে যাওয়ার প্ল্যান আছে একবারে?”

ব্যাস! ঠিক এই ভয়টাই তো পাচ্ছিলো ও। হয়ে গেল কান্ড। শব্দগুলো একেকটা ধারাল ছুরির মতো লাগল প্রিয়ন্তীর বুকে। হাত দুটো অজান্তেই নিজের জামা খামচে ধরল । চোখ নামিয়ে ফেলল ত্রস্ত। মোহনা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন,

“বাবা, খাবারের সময় এসব প্রশ্ন কেন ? আগে খাওয়া শেষ হোক, তারপর নাহয় বসে কথা বল!”

“আম্মু, আমাদের কাছে প্রতিটা সেকেন্ডই খুব প্রেসিসিয়াস! সময়কে আমরা হালকাভাবে নিতে পারি না।”

পাবেল হেসে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“সমস্যা নেই আম্মু।”

তারপর নিজেই বলল,

“ওর পড়াশোনার ইচ্ছা আছে ভাইয়া। আমাদেরও ইচ্ছা আছে ওকে পড়ানোর। ওর স্বপ্ন—ইংলিশ লেকচারার হওয়া।”

তাজধীর মাথা নাড়ল।বলল,

“বাহ! খুব ভালো। না হলে আজকালকার মেয়েদের তো কলেজে উঠলেই বিয়ের আবার তাড়া লাগে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে প্লেনিং ও করে ফেলে। অ্যাকচুয়াললি ওটা বয়সের দোষ! তা তোমার ওরকম কোনো ইচ্ছে টিচ্ছে নেইতো মিস প্রিয়ন্তী?”

খুক খুক করে কেশে উঠল প্রিয়ন্তী। এবার আর পানিতেও কাজ হলোনা। চামচ নামিয়ে উঠে দাঁড়াল সোজা। পা বাড়াল উল্টো পথে। যেতে যেতে বলল,

“ইয়ে মানে,আমার খাওয়া হয়ে গেছে। আমি এখন উপরে যাই?”

মিতালী অবাক হয়ে বলল,

“এমা! এত কম খেলে যে?”

মোহনা বেগম ও ডাকলেন মেয়েটাকে। বললেন থামিয়ে,

“আরেকটু খেয়ে যাও মা। শরীরে তো কিচ্ছুই নেই তোমার। এভাবে খেলে হবে?”

প্রিয়ন্তী মৃদু হেসে মাথা নাড়ল,

“না আন্টি, সত্যি খাওয়া হয়ে গেছে। আর খেতে ইচ্ছে করছে না!”

বলেই আর দাঁড়াল না প্রিয়ন্তী। ছুটে চলল রুমে। আপাতত আর এই লোকটার সামনেই আসবে না ও।


ডাইনিং টেবিলের সেই অস্বস্তিকর মুহূর্তটার পর থেকেই প্রিয়ন্তীর মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল,এভাবে ভয় নিয়ে লুকিয়ে থাকলে চলবে না।
লোকটার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে। যা হয়েছে, হয়েছে। মুখোমুখি না হলে এই অজানা আতঙ্কটা কোনোদিনই কাটবে না। রুমে ফিরে এসে বিছানায় বসেই ফোনটা হাতে নিল প্রিয়ন্তী। মেসেন্জারে ঢুকে মেসেজ দিল বান্ধবীকে,

“আমার রীতিমতো অনেক ভয় হচ্ছেরে স্নেহা। কি করবো আমি এখন?একবার মনে হয় সব জানিয়ে দেবে। এই বুঝি ভাইয়া এসে আমার গালে কষিয়ে দুটো থাপ্পড় বসালো বলে। আমি আর পারছি না।”

ওপাশ থেকে রিপ্লাই এল সাথে সাথেই,

“ এভাবে ভয় পেলে তো চলবে না। লোকটা কি সকালে কিছু বলেছিলো তোকে? “

প্রিয়ন্তী সবটাই জানাল ওর বেস্ট ফ্রেন্ডকে। সবকিছু শোনার পর ওখান থেকে সময় নিয়ে টাইপিং হচ্ছে কিছু একটা। প্রিয়ন্তী ঠোঁট কামড়ে ধরে রাখল। অপেক্ষায় থাকল বান্দুবীর উত্তরের। উত্তর এল সময় নিয়ে,

“এক কাজ করে দেখতে পারিস। ডাইরেক্ট গিয়ে কথা বল। ক্লিয়ার করে খুলে বল। ক্ষমা চাইবি। দরকার হলে পা দুটো ক্ষোপ করে দরবি। মনেহয়না পা ধরার দরকার পড়বে। একটু সুন্দর করে ইমোশনাল হয়ে মাফ চাইলে ক্ষমা করে দিবে দেখিস। আফটার অল ছেলে মানুষতো। সাহস দেখাতে হবে বুঝসিস?”

বান্দুবীর কথায় আসস্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল প্রিয়ন্তী। এপাশ ওপাশ হাঁটাহাঁটি করল কিছুক্ষন। অবশেষে একটা দম নিয়ে শ্বাস টানল। মাথায় ঘুমটা টেনে বের হলো ঘর ছেড়ে। এসে দাঁড়াল তাজধীরের রুমের সামনে। দরজাটা হাট করে খোলা পুরোটাই। প্রিয়ন্তী এসে সেখানে দাঁড়াতেই ওর চোখ দুটো বিস্ময়ে ছানাপাড়া হয়ে এল। এটা কি রুম? না কি কোনো শোরুম?

একপাশের দেয়াল জুড়ে কাঁচের কেবিনেট করা। পুরোটাতেই সারি সারি ট্রফিতে ভরপুর। সোনালি, রুপালি, ব্রোঞ্জ রঙের—ঝকঝকে স্মৃতিচিহ্নে ভরা পুরো ঘরটাই। স্কুল লাইফের স্কলারশিপ ট্রফি,
কলেজের স্কলারশিপ,ফুটবল টুর্নামেন্ট, অ্যাথলেটিক্স, স্পোর্টস মেডেল,আর নেভিতে যোগ দেওয়ার পরের অসংখ্য সম্মাননায় ভরা। কিছু শেলফে ইস্পেশালললি নাম খোদাই করা Lt. Cmdr. Tajdheer Siddik Azan.
প্রিয়ন্তীর মাথা ভনভন করে উঠল। এতগুলো ট্রফি একসাথে কখনো ট্রফির শোরুমে দেখেছে কিনা সন্দেহ। কোনো ট্রফির দোকানেও বোধহয় এত ট্রফি একসাথে থাকে না! অমনিই সেখানে এসে হাজির হলো মিতালী। ভাইকেই ডাকতে এসেছিলো সে। আসার পর থেকে ভাইয়ের সঙ্গে তেমন করে কথা বলা হয়ে উঠেনি যে।

“আরেহ প্রিয়ন্তী তুমি এখানে কি করছো?”

প্রিয়ন্তী চকিত ঘুরল পেছনে। ভাবীকে দেখে ইতস্ততও হলো কিঞ্চিৎ। মিউয়ে আসা গলায় জানতে চাইল,

“আপু এতগুলো ট্রফি… সব কি উনার? মানে তাজধীর ভাইয়ার?”

মিতালী হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“হ্যাঁ, বেশিরভাগই ভাইয়ার। তবে দু-একটা বাবারও আছে!”

প্রিয়ন্তী একটু ইতস্তত করে বলল আবার,

“ভাবি… একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”

“হুম করো?কিছু দরকার?”

প্রিয়ন্তী চোখ নামিয়ে বলল,

“ভাইয়া, মানে তাজধীর ভাইয়া… উনি কোথায়?”

মিতালী মেয়েটা খুব মিশুক, সরলসোজা গোত্রের। ভিতরে ওতো পেচগোজ নেই। তাই কথাটাকেও স্বাভাবিক ধারতেই নিলো। একটু অবাক হলেও স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল,

“কেন? ভাইয়াকে দরকার?”

প্রিয়ন্তী তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে বলল,

“না না, এমনি আরকি জানতে চাইলাম।”

“ভাইয়া আসলে এই রুমে থাকেনা খুব একটা।
বাড়িতে এলেও বেশিরভাগ সময় থাকে ছাদের চিলেকোঠার রুমে।”

প্রিয়ন্তীর ভ্রু কুঁচকে গেল অমনি। বলল,

“চিলেকোঠায়?”

“হ্যাঁ। ছাদের ওপরে একটা আলাদা রুম আছে।
ওখানেই থাকে। প্রকৃতিপ্রেমী তো তাই,বাড়ির ভেতরে তার ঠিক জমে না।”

প্রিয়ন্তী আস্তে করে বলল,

“কেন?এখানে তো ওনাকে ডিস্টার্ব করার মত কেউ নেই।”

“ভাইয়া ছোটবেলা থেকেই এমন। শান্ত, চুপচাপ। নিজের মতো থাকতেই স্বাচ্ছন্দবোধ করে। জাহাজে থাকতে থাকতে একা থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে বলতে পারো। বাড়িতে এলেও আলাদা স্পেস দরকার হয় তার।”

প্রিয়ন্তী চুপ করে শুনল। ধুম করে প্রশ্ন করে বসল,

“মানে… উনি বেশি কথা বলেন না?”

“উম খুব একটা নয়। খুবই কম কথা বলে ভাইয়া। কেন বলোতো? ভাইয়া কি তোমাকে কিছু বলেছে?”

প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতর আবার কেমন একটা ঢিপঢিপ শুরু হলো। লুকালো নিজের অসস্তি। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“না ভাবি উনার সঙ্গে তো আমার দেখাই হয়নি তেমন করে।”

মিতালী চলে যেতেই হাফ ছাড়ল প্রিয়ন্তী। দেরি করল না আর এক মুহূর্তও। ঠিক করল ছাদে যাবে। ওখানে গিয়েই কথা বলবে। হাতের তালু ভিজে উঠেছে ঘামে।
তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোল ও। সিঁড়ির প্রতিটা ধাপে বুকের ভেতর ঢিপঢিপ শব্দটা বাড়ছে ক্রমশ। শেষে ছাদের দরজাটা ঠেলে খুলতেই হালকা বাতাস এসে মুখে লাগল ওর। আকাশের অবস্থা বেগতিক। বৃষ্টি ছাড়াই বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে ক্ষনে ক্ষনে। বৈরী বাতাস বইছে। ছাদটা বেশ বড়। চারপাশে উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল। ছাদের এক কোণায় একটু আলাদা করে,ছোটখাটো একটা চিলেকোঠার রুম। রুমটা খুব বড় না বোধহয়। দরজা একটাই। পাশেই খোলা থাই জানালা। জানালায় সাদা পর্দা ঝুলছে। বাতাসে দুলছে সেই পর্দাটা। দরজার পাশে একটা ছোট কাঠের বেঞ্চ রাখা। বেঞ্চের এক কোণায় রাখা একটা পুরোনো ফুলের টব।
যেখানে শুকনো মাটি আর দু-একটা মরা পাতা পড়ে আছে। দরফর করা বুকে আরেকটু এগোলো প্রিয়ন্তী।ঠিক করল দরজায় নক করবে। ঠিক তখনই
হঠাৎ করে আকাশটা কেমন অদ্ভুতভাবে কালচে হয়ে উঠল। ঝপঝপ করে নামল বৃষ্টি। বাতাসের গতিও বাড়াল হঠাৎ। সাথে অনেক শব্দ করে কোথাও একটা বজ্রপাতও হলো।পর্দাটা দুলে দুলে জানালায় আছড়ে পড়ছে।মেয়েটা এইটুকুতেই ভিজে টিজে একাকার।
প্রিয়ন্তী দ্রুত চিলেকোঠার দরজার কাছে দাঁড়াল।
ভিজে যাবে নাহলে পুরোপুরি। ভিজলে যে গায়ে জ্বর আসে তার।

“রোমান্টিক ওয়েদারে বাচ্চার বাবাকে খুব মিস করছিলেন বুঝি, মিস প্রিয়ন্তী? তাই সোজা এসে বাচ্চার বাবার বেড রুমেই হানা দিয়েছেন?”

প্রিয়ন্তীর শরীর কেঁপে উঠল সেই কণ্ঠে। লোকটা তো দেখেওনি ওকে। জানল কি করে কেউ আছে বাইরে? ক্যামেরা টেমেরা নেইতো আবার কোথাও? এতক্ষনে কথাটা মস্তিষ্কে আহরণ করল ওর। অমনি লজ্জায় মিউয়ে গেল মেয়েটা। ইশ! কি সাংঘাতিক এই লোক?
এক সেকেন্ড দম নিলো প্রিয়ন্তী। জবাব দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলো। তবে তার আগেই শব্দ করে খুলে গেল দরজাটা।

“এই ঝড়-বৃষ্টিতে একা ছাদে কী করছেন, মিস প্রিয়ন্তী? একা একটা ছেলে মানুষের রুমের সামনে দাঁড়াতে ভয় করছেনা আপনার?জানেন তো ছেলে মানুষ কিন্ত বহুরূপী হয়। সুযোগের হাতছাড়া করেনা খুনাক্ষরেও। এরকম একটা অশালীন ওয়েদারে নিরামিষ থেকে আমিষে রূপান্তরিত হতেও কিন্ত বেশি সময় লাগবেনা তখন!”

প্রিয়ন্তী কথা হারিয়ে ফেলল লোকটার উপর চোখ পরতেই। লোকটার হাতে সাদা একটা টাওয়াল। চুলগুলো অল্প স্বল্প ভিজা। সবসময়ের মত ট্রাওজার আর টি শার্ট পরনে। আর সবথেকে বেশি যেটা আকর্ষণ করে, সেটা হলো লোকটার কপালের আর নাকের মাঝ বরাবর থাকা সেই কাঁ টা দাগটা। ভ্রূর ঠিক মাঝখানের একটু নিচেই।

চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply