ডেনিম_জ্যাকেট —— পর্ব ৩৭
অবন্তিকা_তৃপ্তি
ঘড়ির কাটা ঘুরছে, সকাল ৮:০৫, কাব্যদের ফ্ল্যাট!
রোদের আবছা আলো বারান্দা পেরিয়ে ক্রমশ আছড়ে-ছিটকে পড়ে বিছানায় ঘুমন্ত এক যুগল স্বামী-স্ত্রীর স্নিগ্ধ মুখে। রোদের আলোয় ত্যাক্ত-বিরক্ত হয়ে কুহুর ঘুমটা কেন যেন আজ আগে ছুটে যায়। চোখ-মুখ কুঁচকে শরীর স্ট্রেচ করতেই পেটের উপর একটা শক্ত হাতের উপস্থিতি টের পেতেই কুহু ভ্রু কুঁচকে ধীরে ধীরে মাথাটা নামিয়ে তাকালো পেটের দিকে।
কুহুর ভদ্র-সভ্য.. যে কিনা এখন চুড়ান্ত অসভ্য স্বামী, কাব্যের হাত কুহুর পেটের মধ্যে রাখা, পেছন থেকে ধরে চেপে রেখেছে ভীষণ যত্নে-ভরসায়।
কুহুর রাগ হলো ভীষণ, যেহেতু স্বামী নামক আসামিকে ক্ষমা করা হয়নি এখনো, তাই ও হাতটা সরিয়ে দেবে বলে জোর করতেই দেখা গেল— কাব্য নড়েচড়ে কুহুর পেটের দিকে আরো শক্ত করে হাতটা চেপে ওকে নিজের দিকে আকস্মিক একেবারেই টেনে নিল।
আচমকা আক্রমণে রীতিমত চমকে উঠল কুহু। কাব্যের ঘুমন্ত মুখটা কুহুর মুখের প্রায় কাছাকাছি; আরেকটু এগুলেই স্পর্শ পাবে একে অন্যের।
কুহুর শ্বাস ভারী হচ্ছে হঠাৎ, ও ছটফটিয়ে উঠে কাব্যের হাত পেটের উপর থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতেই কাব্য ‘উফফ!’ — বলে আওয়াজ তুলে আরো চেপে ধরে কুহুকে নিজের সাথে মেশালো।
কুহুর শ্বাস বেড়ে যাচ্ছে, কাব্যের এতটা কাছে ও কখনোই আসেনি সেভাবে।
কুহু অস্থিরভঙ্গিতে কিছুক্ষণ কাব্যের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ছটফট করতে করতে হঠাৎ আপনা-আপনিই থেমে গেল কেন যেন। কাব্যের বুকের দু পাশে ওর হাতদুটো ঠেসে অপলক তাকিয়ে রইলো ঘুমন্ত কাব্যের দিকে। অথচ কুহুকে অস্থির রেখে কাব্য নীরবে ঘুমাচ্ছে, গভীর ঘুমে ঘনঘন শ্বাসও ফেলছে।
কুহু কাব্যের এলোমেলো চুল দেখলো,বন্ধ চোখের পাতা দেখল। খাড়া-উঁচু নাক দেখলো. . তারপর ঠোঁট! একসময় কুহু তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ হাত বাড়িয়ে কাব্যের কপালের চুলগুলো সরিয়ে দিতে লাগল একে-একে, ভীষণ যত্নে। কাব্য তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন! ওর একমাত্র, ঘাড়ত্যাড়া ইগোওয়ালি বউ ওকে ভীষণ আবেগে মুগ্ধ হয়ে এডমায়ার করছে— কাব্য বেচারা সেটা জানেও না। কারণ জেগে থাকলে যা অসম্ভব, ঘুমিয়ে গেলে কুহুর ভালোবাসা পাবে— সেটা হয়তো কাব্য ভাবেওনি।
ওদিকে কুহু কাব্যের কপালের উপর ছড়িয়ে থাকা অল্প এলোমেলো চুল উপরের দিকে ঠেলে দিল আস্তে করে, তারপর ভীষন কাছ থেকে তাকিয়ে রইলো কাব্যের মুখটার দিকে।
ওভাবেই তাকিয়ে রইল, অনেকক্ষণ! তারপর কুহুর কি যে হলো কে জানে! আলতো করে কাব্যের বুক থেকে দুটো হাত তুলে কাব্যের দু’গাল চেপে ধরে পুনরায় দৃষ্টি নামলো কাব্যের ঠোঁটের দিকে। রক্তিম লালচে ঠোঁটদুটো কুহুর কত যে আবেগে-লজ্জার স্থান ছিল একসময়। একসময়? এখন নেই? কুহু নিজে নিজেকে প্রশ্ন করল! প্রশ্নটা এইমুহূর্তে বড়ই বেখাপ্পা, কারণ কুহু নিজের মধ্যেই নেই এখন। তলিয়ে গেছে প্রেমের সাগরে, যে সাগরের ঠাঁই আজ অব্দি কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকা পায়নি।
তাই উপন্যাসের প্রেমিকা কুহু কাব্যের দুগাল চেপে ধরে আলতো করে মাথা নামালো; কাব্যের খাড়া নাকের উপর আস্তে করে একটা চুমু খেলো।
চুমু খেয়েই সাথেসাথেই ভয়ে সরে এলো; কাব্য টের পেলে কুহু লজ্জায় পড়বে ভীষণ। আর কুহু কাব্যের সামনে এখুনি নিজেকে দুর্বল দেখাতেও চায় না। ও শাস্তি দিতে চায় এই মানুষটাকে, আরো আরও! ছয় মাসের য ন্ত্রণা যে এত সহজে ভুলার নয়।
কুহু তাড়াহুড়ো করে সরে যেতে চাইলে; আবার কি মনে করে ধীরে ফিরে তাকালো। কুহুর বুক কাঁপছে, হৃদপিণ্ড অনেক জোরে বিট করছে। বেচারি কুহু নিজেই যেন নিজের হার্টবিট বাইরে থেকেই শুনতে পাচ্ছে।
কুহু ধীরে ধীরে মাথাটা তুলে তাকালো কাব্যের বন্ধ চোখ দুটোর উপর। কুহু যেন কোনো এক ঘোরেই আছে; আস্তে করে আবারো নিজে থেকেই কাব্যের কাছাকাছি এলো। কাব্যের কানের উপর হাত রাখল আলতো করে; তারপর আস্তে করে মুখটা এগিয়ে এনে কাব্যের বন্ধ চোখের উপর চুমু খেতেই কাব্য ঘুমের ঘোরে কুহুর কোমর চেপে ধরে ওকে নিজের দিকে টেনে আনল আরো!
চমকে উঠে কুহু বড় বড় চোখে তাকায় সাথে সাথে; কাব্য ভাই কি জেগে গেছেন?
সাথেসাথেই কুহু নিজেকে সামলে নিল। নিজের প্রখর অনুভূতি সামলে কোমরে চেপে রাখা কাব্যের হাতের উপর পরপর কয়েকটা থাপ্পড় দিতে দিতে বলল——‘শুনছেন? ছাড়ুন আমাকে; কাব্য ভা… মানে এই? শুনছেন? ছাড়ুন আমাকে। অসভ্যতা হচ্ছে কিন্তু এসব। আপনি আপনার ডিল ব্রেক করছেন, এই?’
কুহুর অনবরত হাতের উপর থাপ্পড় আর মৃদ স্বরে শাসানোতে কাব্যের আরামের গভীর ঘুমটা ভেঙে গেল। ও ভীষণ বিরক্ত হয়ে চোখ দুটো খুলে কুহুর দিকে তাকালো। ঘুমে পাগল চোখ দুটো দেখাচ্ছে ভয়ঙ্কর লাল, যেন এক্ষুনি ঘুম এভাবে ভেঙে ফেলায় কুহুকে খেয়েই ফেলবে।
কুহু ওই রকম চোখ দেখে কিছুটা দমলো; কিন্তু সেটা কাব্যকে বুঝতে না দিয়ে আগের মতো গম্ভীর কণ্ঠে বলল——‘হাত সরান।’
কাব্য কিছু বুঝতে না পেরে ভ্রু উঁচালো, কুহু ইশারায় দেখিয়ে দিল ওর কোমরের উপর চেপে রাখা কাব্যের হাত।
কাব্য একবার উদাসভাবে নিজের হাতটা দেখল; পরপর কুহুর দিকে চেয়ে গা-ছাড়া ভাবে বলল——‘তো? ডিসটার্ব করিসনা, ঘুমায়ে দে।’
বলেই কুহুর পেটের উপর হাতটা আরো চেপে ধরে ঘুমাতে যাবে, তার আগেই কুহু হাতের উপর আরেকটা থাপ্পড় বসিয়ে বললো—-‘তো মানে? ডিল কি ছিলো? আপনি এত দ্রুত ডিল ভুলে গেলে আমাকে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে মনে হচ্ছে।’
‘ডিল’- শব্দটা কানে ঢুকতেই কাব্যের মেজাজটাই খিঁচড়ে গেল; ও সাথে সাথেই কুহুর কোমর ছেড়ে দিয়ে ওপাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। একটা শব্দও আর বলল না। কুহু হয়তবা বিস্মিত হয়েছেদ কাব্য কোনো রিঅ্যাকশন দেখালো না? কুহু কিছুক্ষণ কাব্যের পিঠের দিকে ওভাবেই তাকিয়ে রইল, কাব্য এমন নীরবতা থাকার মতো ছেলে তো নয়. . তাহলে? বেশিই গায়ে লেগে গেল কথা নাকি?
হু. লাগলেও কিছু করার নেই। যেমন কর্ম তেমন ফল!
পরপর কুহু উঠে গেল, ওর ভার্সিটি আছে। কাব্যের প্রেজেন্টেশন আছে। দুজনেরই ভার্সিটি যেতে হবে। কাব্যের আর মাত্র ১৫ দিনেরমতো ভার্সিটি যাওয়া লাগবে, তারপর কাব্যের পড়াশোনা শেষ। আর কুহুর তো সবে শুরু, এখনও অনেকদিন বাকি।
সকালে খাবার টেবিলে কাব্য-স্নিগ্ধ বসেছে পাশাপাশি চেয়ারে। স্নিগ্ধ কাব্যের পাশে বসে কাব্যের কানে কিছু গুপ্তমন্ত্র দিচ্ছে। কাব্য স্রেফ শুনছে, জবাবে মাঝেমধ্যে শুধু হু-হা করছে।
কুহু রান্নাঘরে শামিমাকে পরোটা করতে সাহায্য করছে। নাশতা বানানো প্রায় শেষের দিকে। তাই শামিমা কুহুর দিকে চেয়ে বললেন——‘আর লাগবে না মনে হয় পরোটা, তুই যা, রেডি হয়ে খেতে আয়। হু?’
কুহু মাথা নেড়ে চলে গেল। নিজেদের রুমে যেতে যেতে কাব্যের দিকে একবার আড়চোখে তাকালো; কাব্য স্নিগ্ধের সাথে কথা বলতে বলতে কুহুর দিকে একপলক তাকিয়েছে সবে তখন। কিন্তু কুহু সাথে সাথেই মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে নিজেদের রুমে চলে গেছে।
কাব্য একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল; স্নিগ্ধের দিকে চেয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল——‘হানিমুন এখন সম্ভব না। দুজনেই ব্যস্ত এখন। কানের কাছে পকপক করিস না, মেজাজ ভালো নেই।’
হাল ছাড়ে না স্নিগ্ধ, কাব্যের কানে আবারও ফিসফিস করে বলল——‘উফ ভাই, কুহ…মানেভাবির মন ঠিক করার এখনই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ, সো কাজে লাগাও এটা।’
কাব্য জবাবে তেতো স্বরে বলল——‘ভাবি. . হু? আমার বউ ভাবে ও নিজেকে? আমার দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আমি ওর কোনো শত্রু, সেখানে এসব হানিমুন-রোমান্স আমার কপালে জুটবে না ভাই। সো… সময় যাক; সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক তারপর যাব।’
স্নিগ্ধ কিছু বলার আগেই শামিমা পরোটা নিয়ে ডাইনিং রুমে আসলেন। একটা চেয়ারে বসতে বসতে হঠাৎ আনোয়ারের দিকে তাকিয়ে নিজে থেকে বললেন——‘শুনছেন? আমি ভাবছিলাম কাব্য-কুহু কোথাও একটা ঘুরে আসুক, কি বলেন?’
শামিমার এমন কথাতে চোখ বড় বড় করে তাকাল দুই ভাই। পরপর কাব্য চোখ গরম করে স্নিগ্ধের দিকে তাকালো। ভাইয়ের এমন রাগান্নিত চেহারও দেখে স্নিগ্ধ কাব্যের দিকে তাকিয়ে দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়ল— অর্থাৎ সে শামিমাকে এই ব্যাপারে কিছুই বলেনি।
শামিমা দুই ভাইয়ের এসব ইশারা বুঝলেন না; নিজের মতো করে আনোয়ার সিদ্দিককে বলে গেলেন——‘বিয়েটাও হয়েছে এমন একটা পরিস্থিতিতে; দুজন একটু একা কোথাও ঘুরে এলে মাইন্ড ফ্রেশ হবে। কি বলেন?’
আনোয়ার নিউজপেপার রাখলেন টেবিলের উপর, তারপর কাব্যের দিকে তাকাতেই কাব্য সাথে সাথেই লজ্জায় তাড়াহুড়ো করে গ্লাসে পানি ঢালতে ব্যস্ত হয়ে গেল। এসব কথা ও শুনে অভ্যস্ত নয়। নিজের বউয়ের সাথে চুড়ান্ত অসভ্য স্বামী হলেও, মা-বাবার সামনে এসব আলাপ এখনো কাব্য অভ্যস্ত হতে পারেনি।
আনোয়ার গ্লাসে পানি ঢালতে ব্যস্ত কাব্যকে গম্ভীর স্বরে ডাকলেন——‘কাব্য?’
কাব্য জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে ইচ্ছে করেই অন্যমনস্ক হয়ে জবাব দিল—‘জি?’
আনোয়ার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন——‘কোথায় যেতে চাও দুজন? সিদ্ধান্ত নিয়ে স্নিগ্ধকে বলে রেখো; ও টিকিট কেটে দেবে।’
‘হু।’ —-কোনরকমে জবাব দিয়ে কাব্য লজ্জায় এরপর আর মাথা তুলতে পারল না। বাবা-মায়ের সামনে এসব কথা শুনে অভ্যস্ত নয় কাব্য একদমই। ওদিকে নির্লজ্জ স্নিগ্ধ মিটমিট করে হাসছে; একবার কাব্যের কানের কাছে এসে বিড়বিড় করল——
‘ভাই… আরও দুটো টিকিট এক্সট্রা কাটবি? আমি আর কা—!’
—- স্নিগ্ধের কথাতে সাথেসাথেই চোখ রাঙিয়ে তাকাল কাব্য ওর দিকে। স্নিগ্ধ সাথে সাথেই ঠোঁটে আঙুল চাপল, কাব্য সেটা দেখে ভ্রু কুঁচকে চেয়ে হতাশ শ্বাস ফেলে আবার খেতে মন দিল।
কুহু খাবার ঘরে আসতেই কাব্য নিজের মতো চুপ হাপ খেতে খেতে চেয়ার এগিয়ে দিল ওকে বসার জন্যে। কুহু একবার কাব্যের দিকে চেয়ে তারপর ধীরে চেয়ারে বসলো।
কাব্য নিজের মতো ওকে পরোটা এগিয়ে দিচ্ছে, তারপর ওমলেট, চিকেন ঝোল। কুহু একবার কাব্যের দিকে তাকাল; কাব্য ওর দিকে তাকায়নি একবারের জন্যে— অথচ ঠিকই কুহুর পছন্দের চিকেন ঝোল এগিয়ে দিচ্ছে, গ্লাসে পানি ঢেলে দিচ্ছে। কুহু অবাক হয়ে কাব্যের দিকে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ; পরপর আস্তে করে খেতে মন দিল।
—————————————-
‘ক্লাস কখন শেষ হবে?’ — কাব্য গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে নিজের মতোই উদাসভাবে প্রশ্নটা করল।
‘বারোটায়।’ — কুহুরও একবাক্যে জবাব।
‘শেষ হলে কল দিস, পিক করে নিব।’ — কাব্য জানালার ওদিকে মিরোর চেয়ে দেখতে দেখতে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বললো।
‘আমি একা যেতে পারি।’ — কুহুর একবাক্যে জবাব এবারও।
কাব্য একবার ত্যাড়া নজরে কুহুর দিকে তাকালো; কুহু মুখটা থমথমে করে সোজা তাকিয়ে আছে। কাব্য চোখ বন্ধ করে নিজের রাগ কন্ট্রোল করল, পরপর কুহুর দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলল——‘বিয়েটা মানিস না; ওকে ফাইন। কিন্তু আমার কাছে এটা ছেলেখেলা নয়, নিজের বিয়ে করা বউ নিয়ে আমার রেসপন্সিবিলিটি আছে।’
পরপর আবার ড্রাইভিংয়ে মন দিয়ে শীতল স্বরে শাসানোর স্বরে বলল——‘কল দিবি শেষ হলে, নো মোর আর্গুমেন্টস।’
কুহু একবার তীক্ষ্ম চোখে কাব্যের দিকে তাকালো; অথচ কাব্য নিজের মতো চুইংগাম চিবুতে চিবুতে ড্রাইভ করছে। কুহু আবার মুখ ফিরিয়ে নিলো। কাব্য ভার্সিটিতে এসে গাড়ি থামালো।
কুহু গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াতেই, কাব্য বলল——‘একটা জায়গায় নিয়ে যাব, আমাদের লাঞ্চের ইনভাইটেশন আছে। আম্মুকে বলে রেখেছি।’
কুহু ভ্রু কুঁচকে তাকালো কাব্যের দিকে।
————————————
গুলশান, ঢাকা. .!
কাব্য গাড়ি থামালো একটা দু তলা সাদা রঙের রাজকীয় বাড়ির সামনে। কুহু গাড়ি থেকে নামলো, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো বাড়িটার আশপাশ।
কাব্য গাড়ি পার্ক করে এসে ওর পাশে এসে দাঁড়ালো। কুহু ভ্রু কুচকে পুরো বাড়িটা একবার চোখ বুলালো; পরপর কাব্যকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল——‘কার বাড়ি এটা? ঊর্মি আপুর?’
কাব্য কুহুর হাতটা ধরল; এগিয়ে যেতে যেতে জবাব দিল——‘হু।’
কুহু সাথেসাথেই ছটফট করে উঠে; রেগে রেগে বললো——‘আমি যাব না ওই মেয়ের সামনে, ছাড়ুন। ওই জঘন্য মেয়ের মুখ আমি দেখতে চাইনা। আপনি আমাকে আগে বলবেন না কোথায় আনছেন? আমি জানলে আসতামই না।’
কুহু কাব্যের হাত থেকে ওর হাত বারবার ছাড়ানোর চেষ্টা করছিল, কাব্য এবার ওর দিকে চেয়ে খানিক ধমক দিয়েই বললো——‘শাটআপ। ঊর্মি এখানে নেই।’
‘তাহলে?’ —- কুহু ছটফট করা থামিয়ে বললো।
কাব্য জবাব দিল না সাথেসাথে। কলিং বেল বাজাতেই একজনসার্ভেন্ট এসে দরজা খুলে দিল। কাব্য ওকে দেখে বলল——‘আমার ওয়াইফ, দাদু কোন রুমে?’
দাদু? কুহু মাথা তুলে কাব্যের দিকে তাকালো। কাব্য তখন বেশ ভদ্র স্বরে কথা বলছে সার্ভেন্টের সাথে—মনে তো হচ্ছে বেশ গম্বীর সম্পর্ক আছে এই বাড়ির সঙ্গে কাব্যের।
সার্ভেন্ট কাব্যকে একটা রুম দেখিয়ে দিয়ে আলগোছে মাথা নামিয়ে চলে গেল। কাব্য ঘরে ঢুকতেই আরও দু’জন সার্ভেন্ট এসে কাব্যের সামনে দাঁড়িয়ে বলল——‘দাদুমনি স্লিপিং পিল নেননি: আপনি আসবেন বলে। আমি কি উনার মেডিসিন রুমে পাঠিয়ে দেব?’
কাব্য হালকা মাথা দুলিয়ে বিনয়ী স্বরে জবাব দিল——‘ইয়াহ; শিউর পাঠিয়ে দিন।’
বলে কুহুকে নিয়ে সার্ভেন্টের দেখানো রুমে ঢুকলো কাব্য। বারান্দায় চেয়ারে একটা বৃদ্ধ মহিলা বসে শব্দ করে— আওয়াজ করে কুরআন পড়ছেন। কুহু রুমটা দেখল— বিশাল এক কক্ষ। রুমের একপাশে দেয়ালে টানানো একটা ছবির দিকে কুহুর নজর আটকে গেল——
এটা… এটা তো ঊর্মি আপু। তাহলে এটা সত্যি ঊর্মিদের বাড়ি? কিন্তু কাব্য বললো এখানে ঊর্মি আপু নেই। না থাকারই কথা— চ্যাট হিস্ট্রি অনুসারে ঊর্মি আপু কোথায় সেটা কাব্য ভাই নিজেও জানেন না।
কাব্য কুহুকে টেনে নিয়ে গেল বারান্দায়। কাব্য বৃদ্ধ নারীর সামনে গিয়ে উনার হাঁটুর কাছে মাটিতে বসে গেল, আস্তে করে ডাকল—-‘দাদু. .!’
কুহু অবাক হলো— কাব্য মেঝেতে বসেছে, ওর তো ডাস্টে ওসিডি আছে। কুহু তখনও দাঁড়িয়ে রইল; মাথায় ওর তখনো কিছুই ঢুকছে না।
কাব্যের আলতো স্বরে ডাকে বারান্দায় বসে কুরআন পাঠ করা বৃদ্ধ মহিলা একসময় থামলেন; কুরআনকে চুমু খেয়ে একপাশে রাখলেন। তারপর হালকা হেসে বললেন——‘কাব্য দাদু? তুই না?’
কাব্য হালকা হাসলো, দাদুর হাতটা নিয়ে আলতো করে হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বলল——‘হু আমিই, সাথে তোমার নাতবউ এসেছে।’
কাব্য মেঝেতে বসে থেকে কুহুর দিকে চেয়ে বলল——‘ও কুহু; পাঁচ ফুট তিন লম্বা; চেহারা শ্যামলা, চুল আগে কোমর ছুঁতো; এখন আমার উপর রাগ করে টমবয় কাট করেছে।’
কাব্য একে একে কুহুর বিবরণ দিতে লাগলো দাদুকে। কুহু কাব্যের তাকিয়ে তখনো কাব্য-দাদুকে দেখছে।
দাদুও হেসে হেসে সবটাই শুনতে থাকেন কাব্যের থেকে। কুহু অবাক হলো। কাব্যের দিকে তাকাতেই কাব্য বলল——‘উনি ব্লাইন্ড , এন্ড পা দুটোই পারলাইজড!’
কুহু ফিরে তাকালো আবার দাদুর দিকে। দাদু হেসে এদিক-ওদিক হাত বাড়িয়ে বললেন——‘বৌ.লা, এদিকে আয়। তোরে একটু ছুইয়া দেখি।’
কুহু তখনও অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে। কাব্য ইশারা করলে কুহু আলতো করে দাদুর হাতটা সামনে থেকে এসে ধরলো। দাদু ভীষন যত্নে চুমু খেলেন কুহুর হাতে, বিস্ময়ে আপ্লুত হয়ে বললেন——‘কি মোলায়েম হাত। আল্লাহ তোদের বিয়াতে বরকত দিক।’
কুহু কাব্যের দিকে তাকাল; কাব্য মৃদু হাসলো স্রেফ। দাদু কুহুর হাতটা উপরে ধরে রাখলেন, বললেন——‘কাব্য তোরে খুব জ্বালায় নি রে বউ?’
কুহু যন্ত্রের ন্যায় এবার জবাব দিল——‘হু?’
কাব্য পাশ থেকে ফোড়ন কেটে দুষ্টু হেসে বলল——‘আমি জ্বালাই তোকে? আর ইউ শিওর?’
কুহু সাথেসাথে চোখ রাঙিয়ে তাকাল কাব্যের দিকে, কাব্য হেসে উঠল। দাদুকে বলল——‘এই প্রশ্ন তো তোমার আমাকে করা উচিত, দাদু।’
‘তোকে করবো ক্যান? কতো নরম মনের মাইয়্যা— মেপে ঝেপে কথা বলে— ও ক্যানে জ্বালাইবো তোমারে?’ — দাদু কুহুর হাতটা টেনে ওকে নিজের পাশে এনে আরেকটা চেয়ারে বসালেন।
কুহু দাদুর প্রশংসা শুনে কেন যেন লজ্জা পেয়ে গেল। কাব্য তো কখনোই সুযোগ ছাড়ে না, টিপ্পনি কেটে বলল——‘হু, খুবই নরম স্বভাবের তোমার নাতবউ, কথাই বলতে চায় না; আর স্বামীকেও তো খুব মান-সম্মান করে। রাইট কুহু?’
কুহুও জবাব দিল মুখ ফুলিয়ে—-‘যতটুকু প্রাপ্য ততটুকু করি।’
কাব্য অবাক হওয়ার ভান করে বললো—-‘ইয়া খোদা, কি বলে এই মেয়ে।’
দুজনের ঝগড়া দেখে দাদু হেসে হেসে বললেন——‘তোর ভাইগ্য বালা, আমি তো ভাবছিলাম ঊর্মির কারণে তুই…!’
কাব্য ফিরে তাকালো দাদুর দিকে, কুহুও একইসাথে তাকালো। হয়তবা সেটা বুঝলেন দাদু, সাথেসাথেই উনি থেমে গেলেন; নিজেকে শুধরে কুহুর দিকে চেয়ে বললেন——‘সংসার কেমন যায় তোর, বউ? গেছস তো সবচেয়ে বালা একটা পরিবারে— আর হইছস আমার সবচেয়ে পছন্দের নাতির বউ। তোর ভাগ্য আল্লাহ এমনেই সোনায় মোড়া রাখুক।’
কুহুর কেমন যেন লাগল এবার… ও কাব্যের দিকে এক ঝলকে দেখে নিল। কাব্যও ওর দিকে অল্প হেসে তাকিয়ে আছে। কুহু চোখ সরিয়ে নিল। কাব্য এবার সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করলো——‘দাদু? ঊর্মি কোথায়? কুহু ঊর্মির সাথে দেখা করবে।’
ঊর্মির কথা শুনেই কুহু খেয়াল করলো—দাদু অপ্রস্তুত হচ্ছেন, সম্ভবত কুহু সামনে বলে। কাব্য উনাকে আশ্বস্ত করে বলল——‘কুহু ঊর্মির সাথে আমার সম্পর্ক জানতে চাইছে, আমার সংসারটা বাঁচিয়ে দাও দাদু।’
দাদু সাথেসাথেই কুহুর হাত চেপে ধরে চিন্তিত কণ্ঠে বলতে লাগলেন——‘তুই ওরে ঊর্মির লাগি কষ্ট দিছস নাকি? পাগলামি কইরো না বউ… তোর জামাই অমন পোলা না রে পাগল।’
কুহু এবার কথা বলল——‘ঊর্মি আপুর সাথে ওর প্রেমের সম্পর্ক ছিল, আমি শুনেছি দাদু।’
দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন——‘কোনো প্রেম ছিল না, আমার নাতিন মানসিক রোগী আছিল একটা।’
কাব্য পাশ থেকে যন্ত্রের ন্যায় জবাব দিল——‘Schizophrenia পেশেন্ট ফ্রম পাস্ট টুয়েলভ ইয়ার্স।’
কুহু অবাক হয়ে দাদুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, দাদু আবার বললেন——‘ঊর্মি ছয় বছর বেলা থেকেই মানসিক রোগে ভুগতাসিল, হাজার চিকিৎসার পরও ওর রোগ সারেনাই। টাকা দিলেই যে সুস্থতা পাওয়া যায় না— ওইটা ঊর্মিরে দেখলেই বোঝা যায়।’
বলতে বলতে দাদুর চোখে পানি চলে এলো। কাব্য কিছু বললো না, অথচ কুহুর ভীষণ মায়া হলো কেন যেন। ও দাদুর চকজের ওয়ানি কি মনে করে মুছে দিল। দাদু সাথেসাথেই নিজেকে সামলে বলা শুরু করলেন—-‘ আমার নাতিন ঊর্মি তোর জামাইর জীবনে তুফান অচল। আমারে তোগো পরিবার চিনে, আনোয়ার তো আমারে আম্মা কইয়া ডাকে। সেই হিসেবে কাব্যের সাথে আমার বালা একটা সম্পর্ক। কাব্য আজ অব্দি আমারে পর দাদু ভাবে নাই, নিজের দাদুরে একটা নাতি যা যা করে— ও আমার লাগি তাই তাই করছে।’ —
দাদু বলতে বলতে আবার ফুপিয়ে উঠে । পরপর ফুপিয়ে উঠে বলেন——‘কিন্তু আমি স্বার্থপর। নিজের নিজের নাতির সাজানো গোছানো লাইফ নষ্ট কইয়া দিছি আমি।’
কুহু তাকালো কাব্যের দিকে, কাব্য তখন মাথাটা নামিয়ে মেঝের দিকে চেয়ে আছে। কুহু আবার তাকালো দাদুর দিকে। দাদু এবার বলতে থাকেন———————-‘ঊর্মির সাথে কাব্যের দেখা হয়, ঊর্মি যেদিন বিদেশ থেইকা চিকিৎসা শেষ করে দেশে আসে। তখন ও মোটামুটি সুস্থ আছিল। কাব্য আমার বাসায় আসত-যেত, ঊর্মি ওরে দেইখা পছন্দ করছিল। তারপর কাব্যের সাথেই ও কথা বলতো। কাব্য যেহেতু আমার বাসায় আসত, ও কথা বলছে কদিন। কিন্তু ঊর্মি দেখা গেল— কাব্যের বালা পাইয়া যায়। কাব্য ওরে মানা করে শুরুর দিকে। দেখা গেল এরপর ঊর্মি কাব্যের ভার্সিটিতেই গিয়া অ্যাডমিশন নিছিল। তারপর শুনলাম কাব্যরে প্রপোজ করছে ও। ‘
দাদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন; তারপর আবার বলা শুরু করলেন—————‘কাব্য একবার মানা করার পর, ওর রোগ তহন আবার বাড়া শুরু করে, ও সুই-সাইড করে। আমি ভয় পাইয়া যাই- আমার নাতিন একটাই আল্লাহদ দুনিয়ায়, ওরে আমি আমার নিজের বাইচ্চার ন্যায় পালসি এই দুই হাতে।আমার মাথা কাজ করে না। আমি কাব্যরে ডেকে কই— কদিন ওর সাথে থাকতে, তারপর সুযোগ বুঝে ওর চিকিৎসার জন্যে বিদেশ পাঠায় দিমু আমরা।’
দাদু উত্তেজিত হয়ে পড়েন এইবার———‘বিশ্বাস কর ছেড়ি তোর জামাই রাজি আছিল না। আমিই ওরে জোর করি। তারপর কাব্য আমার কথা শুনে ওর সাথে সম্পর্কে জড়ায়। কিন্তু ঊর্মি কাব্যরে অনেক মেন্টালি টর্চার করত, তাই ও আমার সাথে আলোচনা করে ঊর্মির সাথে সব সম্পর্ক নিজে থেকে শেষ করে দেয়। শুরুতে ঊর্মি বুঝে নাই, কিন্তু যখন বুঝবার পারে— ও আবার সুই-সাইড করে। আমাগো একটাই নাতিন, মা-মরা মেয়েটারে আমি দুই হাত পালছি। আমি পাগল হইয়া যাই তখন, কাব্য আমারে বোঝায়। বলে— ও ঊর্মিরে বুঝাইব না যে ও ওর লগে সম্পর্কে নাই। ঊর্মিকে ফুসলাইয়া ও লন্ডন পাঠাইয়া দিবে আমার বড় পোলার কাছে।
আমি রাজি হই। কিন্তু ঊর্মি যাইতে চায় না লন্ডন; কাব্য অনেক চেষ্টা করে— পারে নাই। তারপর একদিন হুনি— তুমি কাব্যর লাগি সুই সাইড করছ।
কাব্য ওইদিন আমার সামনে আইসা বসছিল, বুঝবার পারছিলাম ওর দিল আবার ভাঙছে। কিন্তু ওইদিন আমি বুঝতেছিলাম— কাব্য আমার নাতিন ঊর্মির লাইগা কোনদিন অমন কষ্ট পায় নাই, যেমন তোমার লাইগা পাইছিল। ও বারবার নিজেরে দোষী বলে গাল-গালি দিতেছিলো। ওর মধ্যে ওইদিন আমি ওইদিন রাগ, অপরাধবোধ দেখতেছিলাম।আমার তখন বুঝে আসল— কাব্য তোমারে ঠিকই বালা পাইয়া গেসে, আমি প্রে বলছিও এটা হেদিন। কি রে? বলিনাই?’
কুহু অবাক নয়নে কাব্যের দিকে তাকাল; কাব্য সাথে-সাথেই চোরের মতো মুখ লুকিয়ে অন্যদিকে তাকালো।
শ্বাস ছাড়ে কুহু, দাদুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করে— ‘আপনার নাতি আমাকে ভালোবাসে না, দাদু। ও আমার ব্যাপারে সবটা সবকিছু ঊর্মি আপুকে জানাত।’
‘কেডা জানাইত?’ — দাদু বুঝতে না পেরে আবার জিজ্ঞেস করলেন।
‘উনি… আপনার নাতি।’ — কুহু জবাবে শীতল স্বরে বলল।
‘কিন্তু ঊর্মির লগে তো ওর কিছু নাই, ও জানাবে কেমনে? কাব্যের সাথে সবটা শেষ হইয়া যাওয়ার পর ঊর্মি এটা নিজে আইসা বলছে আমাকে বছরখানেক আগে।’ — দাদু অবাক হয়ে বললেন।
‘কাব্য? বউ কি কয়?’ — দাদু ভীষণ বিস্মিত, কাব্যকে জিজ্ঞেস করলেন।
কাব্য হতাশ, ও ঠোঁট উল্টে জবাব বলল— ‘না না, আমার থেকে নয়, আমি জানাই নি। বাট আমি ফাইন্ড আউট করার ট্ট্রাই করছি সবটা।’
কাব্য বলতে বলতে কুহুর দিকে তাকালো, কুহু মুখ ফিরিয়ে নিলো তখন!
——————————-
সন্ধ্যা ৭: ২৩, ঢাকা মহাসড়ক।
কাব্য গাড়ি ড্রাইব করছে, পাশে কুহু চুপচাপ বসে আছে।
কাব্য ড্রাইভ করতে করতে কুহুর দিকে একবার তাকালো। কুহুকে এতটা নীরব হয়ে যেতে দেখে কাব্য আগে থেকেই কথা তুললো। সোজা রাস্তার দিকে চেয়ে থেকে বলল— ‘মনে হয় না, এতকিছুর পরেও তোর সন্দেহ গেছে, রাইট?’
কুহু উত্তরে নীরবতা ভাংলো, দীর্ঘশ্বাস ফেলে জবাব দিল— ‘রাইট।’
কাব্য ঠোঁট টেনে হাসলো সাথেসাথেই; বিতৃষ্ণা নিয়ে স্টিয়ারিংয়ে চাপড় বিসিয়ে বললো—‘জানতাম আমি।’
কাব্যের এমন স্বরে বলা কথাটা কুহুর খুব গায়ে লাগলো। কুহু কাব্যের দিকে ফিরে বলল— ‘দাদু অনেক কিছু জানেন, অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু আমার উত্তর এসব ছিল না।’
কাব্য উত্তরে স্রেফ হাসলো; বিতৃষ্ণা নিয়ে ঠোঁট টেনে একটা হাসি!
ওই হাসিতে কুহু উত্তেজিত হলো এবার, একের ওর এক বলে যেতে লাগলো———- ‘আমি জানতে চেয়েছি— আপনি ঊর্মি আপুর সাথে কখনো হয়তো. . আমার ভুল না হলে . . হয়তো দাদুর অগোচরেই রিলেশনে ছিলেন। নাহলে… নাহলে একটা মানুষ আপনার সমস্ত কথা কিভাবে জেনে যাচ্ছে? আপনার আর ওর একই দিনের একই ড্রেসআপে ছবি আমাকে দিচ্ছে? এগুলো… এগুলো স্বাভাবিক? মোটেও না। আমি বেশি ভাবছি না এখানে. . এটাই ফ্যাক্ট।’
কাব্য শুনলো সব চুপ করে, উত্তর দিল না— শুধু গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। ওসব দেখেওনা কুহু, আবার বলে যেতে থাকে —————-‘কথা বলেন, উত্তর দিন। আছে আপনার কাছে এর কোনও উত্তর? আমি কিভাবে বুঝব— আপনার মধ্যে ঊর্মির আপুর জন্যে দুর্বলতা ছিল না? কিভাবে ধরব— ওসব মিথ্যা, আপনাকে ফাঁসানো হচ্ছে? কিভাবে ভাবব— আপনি আমাকে না ওক—!’
কুহুর কথা শেষ করার আগেই, কাব্য হঠাৎ একদম আচমকা গাড়ি থামিয়ে দিল, কুহু সাথেসাথেই কথা থামিয়ে হা করে তাকালো সামনের রাস্তার দিকে, পরপর কাব্যের দিকে—-‘ক. . কি হয়েছে? গাড়ি থামালেন কেন?’
কাব্য বড়বড় শ্বাস ফেলে আচমকা- হঠাৎ, হাত বাড়িয়ে কুহুর কোমরে ছেলে টেনে ওকে একদম নিজের দিকে সামনে এনে বসিয়ে নিলো। কুহু তো রীতিমত চোখ বড়বড় করে তাকাল, আচমকা আক্রমণে ভয়ে ওর আত্মা লাফাচ্ছে।
কাব্যের মুখ রক্তিম; লাল চোখ নিয়ে ও কুহুর কোমরে আঙুল দিয়ে খামচে ধরতেই— ‘আহ!’ — বলে কুহু ব্যথায় চোখ কুঁচকে নিলো, পরপর টলমলে চোখে তাকাল কাব্যের দিকে।
দুজনের বুকের হৃদস্পন্দন চুড়ান্তে: একজন আরেকজনেরটা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। কুহুর শ্বাস একের পর এক ফেলতে ফেলতে কাব্যের মুখের দিকে মাথা তুলে তাকালো, ছটফট করার চেষ্টা করে বললো——-‘বা. . . বাড়াবাড়ি করছেন আ. . আপনি। ছাড়ুন আমাকে।’
‘করলে করছি, কি করবি?’—- কাব্যের ত্যাড়া উত্তর। কুহু ভ্রু কুচকে মাথা তুলে কাব্যের দিকে তাকালো।
কাব্য আজ আর ওসবের ধার ধরল না। কুহুর কোমরের দু’পাশে হাত রেখে ওকে আরও টেনে আনল নিজের দিকে। কুহু আরো ঘনিষ্টভাবে কাব্যের গায়ের সঙ্গে মিশে যেতেই ভয়ার্ত চোখে একবার রাস্তার দিকে চেয়ে আরেকবার কাব্যের মুখের দিকে তাকালো।
কাব্য পরপর কুহুর ঘাড়ে চুমু খেলো একটা; শক্ত একটা চুমু— হতবাক হয়ে গেল কুহু, চোখ খিচে কাব্যকে ধাক্কা দিল; পারলো না।
কাব্য কুহুর কোমর দুহাতে চেপে ধরে ওর কানের কাছে হিসহিস করে, লো ভয়েজে দাতে দাঁত চিবিয়ে শুনিয়ে বললো——‘কি বুঝিস না? হু? আমি এভাবে শুধু তোকে আদর করি, ছুঁই— ওকে না। ওকে কখনোই না।’
কুহু তখনো চূড়ান্ত হতবাক, চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে কাব্যের দিকে। কাব্য তখনও রাগের মাথায় ভারি শ্বাস ফেলতে ফেলতে কুহুর নাকে চুমু খেলো, কুহু আরো বড় চোখ করে কাব্যের দিকে তাকালো।
কাব্য আবারো লো ভয়েজে ঠান্ডা স্বরে বলল— ‘বুঝিস নি এখনো? আমি কাব্য তোকে অ্যাডমায়ার করি— যেভাবে একটা হাজবেন্ড তার ওয়াইফকে করে।’
কাব্য এবার কুহুর চুলে হাত রেখে, কপালের পেছনে চুল গুঁজে দিতে দিতে বলল— ‘আর চুল. .. হু? আমি যখন এই আব্র-থ্যাব্র করে কাটা চুল আঙুল দিয়ে সরাই— মুগ্ধ হয়ে তখন শুধু তোকেই দেখি. . . ওকে না। ওকে কখনোই না।’
কুহুর বুক কাঁপছে অসম্ভব; ও চায়না দুর্বল হতে। কাব্যের থেকে সরে যাওয়ার জন্যে ছটফট করে উঠে কাপা স্বরে বললো———‘ছ. . ছাড়ুন আ. . . আমাকে, এসব এখানে ব. . ব. . বলার জিনিস না।’
কুহু পেছানোর চেষ্টা করতেই কাব্য ওকে সাথেসাথে আরো শক্ত করে ওকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো। কুহু চমকে উঠে কাব্যের বুকে দুহাত ঠেসে তাকাল ওর মুখের দিকে।
কাব্য কুহুর ঠোঁটের কোণে এবার হঠাৎ, শক্ত একটা চুমু বসালো। কুহু সাথেসাথে চমকে উঠে ধাক্কা দিতে চাইল কাব্যকে—পারল না। কুহু চোখ পরপর খিছে শক্ত করে বন্ধ করে ফেলেছে।
কাব্য কুহুর ঠোঁটের কোণে চরম আশ্লেষে চুমু খেয়ে সরে আসলো নিজেই। কাব্য ওর বন্ধ চোখের দিকে চেয়ে এবার ওর বাহু চেপে ধরে ঝাঁকিয়ে রাগে কাপতে কাপতে বলে যেতে লাগলো——‘ওকে. . ওকে কখনোই না। কিন্তু তোকে সবসময়, সবটাসময়! আই… আই লাভ ইউ— জাস্ট ইউ এন্ড ব্লাডি ইউ, ড্যাম ইট।’
কুহু টলমল চোখে ধীরে ধীরে চোখটা খুলে তাকালো সাথেসাথেই। কাব্য রাগে ফুঁসছে রীতিমত তখন।
চলবে
আজকের পর্বে ৭ হাজার রিঅ্যাকশন আসবে? সবাই কমেন্ট করবেন কেমন লাগল।
আপনারা কমেন্ট এত কম করেন কেন? রিঅ্যাক্ট এর তুলনায় মন্তব্য অনেক কম। এইজন্যে আমি রিপ্লাই দেইনাই গত পর্বে. . কেমন যেন অনাগ্রহ কাজ করেছিলো। আজ দেখি কেমন মন্তব্য আসে, রিপ্লাই করব ভালো আসলে।
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৯
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৪