Golpo ডার্ক রোমান্স ডিজায়ার আনলিশড

ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩০


ডিজায়ার_আনলিশড

✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব: ৩০

মাফিয়া সম্রাট মেইলস্ট্রোমের মেক্সিকান সাম্রাজ্য আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু পরাজয়ের এই চরম মুহূর্তেও তার অহংকার যেন হিমালয়ের চূড়া ছুঁয়ে আছে। ধুলো আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে আসা বাতাস চিরে যখন ইন্টারপোলের হাই-প্রোফাইল চিফ ইনভেস্টিগেটর এবং তার বিশেষ কমান্ডো বাহিনী এলাকাটি ঘিরে ধরল, তখনো মেইলস্ট্রোমের চোখে পরাজয়ের কোনো চিহ্ন নেই। তার আভিজাত্যমাখা কালো কোটটা রক্ত আর ধুলোয় মলিন, কিন্তু শিরদাঁড়া টানটান।

হাতকড়া পরানোর সময় সে একবার আড়চোখে তাকাল জাভিয়ানের দিকে। তারপর এক পৈশাচিক শান্ত গলায় বলল, “জাভিয়ান, এই লোহার শিকল দিয়ে বাঘ পোষ মানানো যায় না। আমাকে আটকে রাখার মতো কোনো নরক বা জেলখানা আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। মনে রাখিস, আমি ফিরে আসব। আর যেদিন ফিরব, সেদিন এই হিসাবের খাতা আমি শুধে আসলে ফিরিয়ে দিবো।”

আন্তর্জাতিক বাহিনীর প্রধান তখন ঠান্ডা চোখে মেইলস্ট্রোমকে একবার দেখলেন আর ইশারায় তাকে প্রিজন ভ্যানে তোলার নির্দেশ দিলেন। জাভিয়ান সেদিকে ভ্রুক্ষেপও করল না। তার সমস্ত পৃথিবী তখন আবর্তিত হচ্ছে তার থেকে একটু দূরে থাকা নিথর প্রায় শরীরটাকে ঘিরে।

জাভিয়ান সেখানে দৌড় গিয়ে বসে পড়লো তারপর পরম মমতায় ভ্যালেরিয়ার মাথাটা নিজের কোলের ওপর তুলে নিল। ইসাবেলা অদূরেই বসে ডুকরে কাঁদছিলেন, তাঁর পৃথিবীটা আজ দুই ভাগে ভেঙে গেছে—একদিকে তার ছেলে,অন্যদিকে মৃত্যুপথযাত্রী ভাগ্নী। ভ্যালেরিয়ার ক্ষতবিক্ষত দেহ থেকে তখনো রক্ত ঝরছে, ভিজিয়ে দিচ্ছে জাভিয়ানের শার্ট।

নিথর ভ্যালেরিয়ার মুখে কোনো স্পন্দন ছিল না। কিন্তু হঠাৎ, কয়েক মুহূর্তের জন্য ওর শরীরটা একটু কেঁপে উঠল। যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো সামান্য নড়ে উঠল। জাভিয়ান অস্ফুট স্বরে ডাকল, “ভ্যালেরিয়া? ভ্যালেরিয়া, কথা বলো!”

ভ্যালেরিয়া যেন অনেক দূর থেকে নিজের প্রাণটুকু কুড়িয়ে এনে চোখ মেলে তাকাল। ওর দৃষ্টি তখন ঝাপসা, কিন্তু জাভিয়ানের মুখটা চিনতে ওর একটু ও কষ্ট হলো না। সে কাঁপাকাঁপা, রক্তমাখা হাতটা কোনোমতে তুলে জাভিয়ানের শুভ্র গালে স্পর্শ করল। জাভিয়ানের গাল ভ্যালেরিয়ার রক্তে লাল হয়ে গেল, কিন্তু ও সরাতে পারল না।

ভ্যালেরিয়া খুব ক্ষীণ স্বরে, ভাঙা গলায় বলল, “জীবনের… অন্তত শেষ পর্যায়ে… তোমার বুকের এই উষ্ণতা অনুভব করার সুযোগ পেলাম, জাভিয়ান। যদি মৃত্যু হলেই তোমার বুকে এভাবে থাকা যেত… তবে আমি সারাজীবন বারবার জন্ম নিয়ে প্রতিবার মৃত্যু বরণ করতে চাইতাম।”

কথাগুলো বলতে বলতে ভ্যালেরিয়ার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে জাভিয়ানের হাতে পড়ল। জাভিয়ান কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ওর গলা বুজে এল। ও শুধু ভ্যালেরিয়ার রক্তাক্ত হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে রাখল।

দুর্গের বাইরের সেই বিষণ্ণ প্রান্তরে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর বারুদের কটু গন্ধ। জাভিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে আছে, তার শক্তপোক্ত দুই বাহুর মাঝখানে ভ্যালেরিয়া ঠিক যেন শরতের ঝরে পড়া একটি শিউলি ফুলের মতোই। জাভিয়ানের চোখেমুখে অপরাধবোধ আর হারানোর তীব্র যন্ত্রণা। সে ভ্যালেরিয়াকে ভালোবাসেনি ঠিকই, কিন্তু এই মেয়েটি তার জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যার অভাব সে আজ প্রতিটা নিঃশ্বাসে অনুভব করছে।

ভ্যালেরিয়া তার র/ক্তভেজা, শীতল হাত দিয়ে জাভিয়ানের গালটা আরেকবার আলতো করে ছুঁলো। তার চোখ দুটো আধবোজা, কিন্তু সেখানে ছিলো অদ্ভুত একটা মায়া। সে খুব কষ্টে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের শেষ কথাগুলো বলতে শুরু করল।

“শোনো জাভিয়ান… ছোটবেলায় সেই আটলান্টিক আর প্যাসিফিক মহাসাগরের গল্পটা মনে আছে? মানচিত্রে সবাই দেখে তারা একই মোহনায় মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। কিন্তু গভীরে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, তাদের জলরাশি কোনোদিন একে অপরের সাথে মেশে না। তারা আজীবন একই সাগরের অংশ হয়েও দুটো আলাদা সত্তা হয়ে বয়ে চলে।”
সে একটা দীর্ঘ তপ্ত শ্বাস নিল। রক্তের অভাবে তার শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসছে, কিন্তু তার কথাগুলো তীরের মতো জাভিয়ানের হৃদয়ে বিঁধছে।

“গত পাঁচ বছর আমি তোমার ঠিক ততটাই কাছে ছিলাম জাভিয়ান, যতটা আটলান্টিক থাকে প্যাসিফিকের কাছে। আজ প্রথমবার আমি তোমার বাহুবন্ধনে এসেছি ঠিকই, কিন্তু তোমার হৃদস্পন্দন আমার জন্য বাজছেনা। আজ মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারছি আমি ছিলাম সেই মহাসাগর, যে তোমার তট ছোঁয়ার নেশায় আজীবন গর্জে মরেছে। আর তুমি ছিলে সেই স্থির জলরাশি, যে আমার ঢেউগুলো গ্রহণ করেছে ঠিকই, কিন্তু আমায় নিজের ভেতরে মিশিয়ে নেওয়ার অনুমতি কোনোদিন দেয়নি।”

ভ্যালেরিয়ার ঠোঁটে এক বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল, যে হাসি দেখার চেয়ে অনুভব করা অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক।

“আমাদের এক হওয়াটা কোনো মানুষ রুখে দেয়নি জাভিয়ান, রুখে দিয়েছে স্বয়ং নিয়তি। আসলে কিছু গল্প কেবল সমান্তরাল বয়ে চলার জন্যই তৈরি হয়, মিলনের পূর্ণতা পাওয়ার জন্য নয়। আমি তোমার সহযাত্রী হতে পেরেছি, তোমার ছায়া হতে পেরেছি… কিন্তু তোমার জীবনসঙ্গিনী হতে পারিনি। কারণ আমাদের ডেসটিনিতে ‘আমরা’ শব্দটা কোনোদিনও লেখা ছিল না।”

জাভিয়ান পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। ভ্যালেরিয়া ভাঙা গলায় শেষবারের মতো বলল

“আটলান্টিক আর প্যাসিফিক যেমন অনন্তকাল ধরে পাশাপাশি থেকেও চিরকাল একে অপরের কাছে অচেনা রয়ে যায়… তোমার এই পাঁচ বছরের জীবনে আমি ঠিক তেমনই এক অস্পৃশ্য মেঘ হয়ে রয়ে গেলাম। আমায কোনো অভিযোগ নেই জাভিয়ান… একতরফা প্রেমের এটাই বোধহয় শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য যে, এখানে হারানোর ভয় থাকলেও পাওয়ার কোনো দাবি থাকে না…”

ভ্যালেরিয়ার শরীরটা হঠাৎ একবার ধনুষ্টঙ্কারের মতো কেঁপে উঠল। এক তীব্র যন্ত্রণার মাঝে ও বড় একটা শ্বাস নিল, যেন পৃথিবীর শেষ বাতাসটুকু বুকের ভেতর জমিয়ে নিতে চায়। ওর ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো জাভিয়ানের ওপর স্থির হয়ে রইল।

খুবই ক্ষীণ স্বরে ভ্যালেরিয়া বলল, “জাভিয়ান… আমার একটা শেষ ইচ্ছে পূরণ করবে?”

জাভিয়ান ওর হাতটা শক্ত করে ধরে ধরা গলায় বলল, “বলো… কী চাও তুমি?”

ভ্যালেরিয়া এক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর অতি সন্তর্পণে, প্রায় অস্ফুট স্বরে আবদার করল, “আমার কপালে… শেষবারের মতো একটা চুমু দিবে?”

জাভিয়ানের হাতটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। ওর চোখে রাজ্যের বিষাদ ভর করল। ও ধীরে ধীরে চোখ দুটো বন্ধ করল। চারপাশের রণক্ষেত্রের নিস্তব্ধতা যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। জাভিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ খুলল। ওর দৃষ্টিতে কঠোর সততা আর তান্বীর প্রতি অগাধ ভালোবাসার ছায়া। সে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু স্থির গলায় বলল, “আই এম সরি, ভ্যালেরিয়া।”

ভ্যালেরিয়া থমকে গেল না, বরং ওর রক্তহীন ঠোঁটে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। ওর দুচোখ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ও ফিসফিস করে বলল, “ইউ আর সো লয়াল, জাভিয়ান।”

সে একটু থামল, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তারপর আবার বলল, “তান্বীর ভাগ্যটা সত্যিই ঈর্ষণীয়। সব মেয়ে যদি এমন ভাগ্য নিয়ে জন্মাতো! আমি ওকে আর হিংসে করি না… একদম না। কারণ ও আমাকে মন থেকে ‘বোন’ ডেকেছিল।”

ভ্যালেরিয়ার দৃষ্টি এবার আকাশের দিকে চলে গেল। ও শেষবারের মতো প্রাণশক্তি সঞ্চয় করে বলল, “ওকে বলে দিও… ওর বোন আর নেই। ওকে নিজেকে এখন এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে ও একাই লড়াই করতে পারে। আমি তো আর থাকব না ওকে আগলে রাখতে কিংবা শেখাতে… জীবনটা বড় নিষ্ঠুর জাভিয়ান, ওকে লড়াইটা শিখিয়ে দিও।”

কথাটা শেষ হতেই ভ্যালেরিয়ার চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। তার সেই রক্তমাখা হাতটা জাভিয়ানের কাঁধ থেকে নিঃশব্দে খসে পড়ল মাটির ধুলোয়। এক মহৎ আত্মত্যাগ আর একতরফা ভালোবাসার এক নিঃশব্দ সমাপ্তি ঘটল।ওর সেই তৃপ্ত হাসিমাখা মুখটা জাভিয়ানের বাহুবন্ধনে চিরতরে শান্ত হয়ে রইল। জাভিয়ান পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল; সে এক অসামান্য শত্রুর বিরুদ্ধে জয় পেলেও, আজ নিজের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে।

জাভিয়ান তখনওস্তব্ধ হয়ে রইল,ও বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এই পাহাড়সম প্রাণশক্তির মেয়েটা এত সহজে হারিয়ে যেতে পারে।

জাভিয়ান নিচু স্বরে ডাকল, “ভ্যালেরিয়া? ভ্যালেরিয়া, শোনো…”

কোনো উত্তর নেই। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ সেখানে পৌঁছাল না। জাভিয়ান আবার ডাকল, এবার ওর কণ্ঠে কিছুটা অস্থিরতা, “ভ্যালেরিয়া, জেদ করো না। চোখ খোলো!”

কিন্তু ভ্যালেরিয়া তখন সব জেদ আর অভিমানের ঊর্ধ্বে চলে গেছে। তার শরীরটা ক্রমশ শীতল হয়ে আসছে।

এই দৃশ্য দেখে ইসাবেলা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি মাফিয়া কুইন হতে পারেন, অপরাধ জগতের সম্রাজ্ঞী হিসেবে তাঁর নামে হয়তো একসময় শহর কাঁপত, কিন্তু দিনশেষে তিনিও একজন মা অথবা খালা। নিজের ছেলের কারনে নিজের ভাগ্নীর এই নির্মম পরিণতি তাঁর ভেতরের সব পাথর চাপা দেওয়া মায়াগুলোকে আজ আগ্নেয়গিরির মতো বের করে আনল।

ইসাবেলা আকাশের দিকে মুখ তুলে এক বুক ফাটানো চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর সেই আর্তনাদ দুর্গের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তিনি টলতে টলতে ভ্যালেরিয়ার নিথর দেহের ওপর আছড়ে পড়লেন। “ভ্যালেরিয়া! মা আমার! এভাবে তুই চলে যেতে পারিস না? জাভিয়ান, ও কেন কথা বলছে না? ও তো কথা বলতে খুব ভালোবাসত, ও কেন চুপ করে আছে?”

জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করলেও সে তা পড়তে দিল না। সে বুঝতে পারল, এই মহিয়সী লড়াকুর শেষ যাত্রার সময় হয়ে গেছে। জাভিয়ান অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তার বলিষ্ঠ হাতটা ভ্যালেরিয়ার মুখের ওপর নিয়ে এল। যে চোখ দুটো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জাভিয়ানকে খুঁজেছিল, সেই অপলক চোখ দুটোর ওপর হাত রেখে জাভিয়ান আলতো করে তা বন্ধ করে দিল।

রণক্ষেত্রের কোলাহল এখন এক ভারী নিস্তব্ধতায় রূপ নিয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের নীল-লাল আলো অন্ধকারে ভুতুড়ে আভা ছড়াচ্ছে। পুলিশের ফরেনসিক দল এসে ভ্যালেরিয়ার রক্তে ভেজা দেহটি সসম্মানে একটি স্ট্রেচারে রাখলো।

জাভিয়ান পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দেখল, কীভাবে তার সবচেয়ে কাছের ছায়াটিকে একটি ধবধবে সাদা কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। সাদা চাদরের নিচ দিয়ে ভ্যালেরিয়ার নিথর অবয়বটা দেখে জাভিয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। স্ট্রেচারটা যখন অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো পোস্টমর্টেমের উদ্দেশ্যে, জাভিয়ান কেবল একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল।

অন্যদিকে, গাড়ির সেই অন্ধকার ডিকির ভেতর তান্বীর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সময় যেন কাটতেই চাইছে না। বাইরে মুহুর্মুহু সাইরেন আর মানুষের আর্তনাদ শুনে সে আর স্থির থাকতে পারল না। ভ্যালেরিয়ার সেই ‘নিরাপদ থাকার’ নির্দেশ ছাপিয়ে এক অজানা আশঙ্কা তাকে গ্রাস করল। সে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে পেছনের ঢাকনাটা ধাক্কা দিয়ে খুলে ফেলল।
গাড়ি থেকে বেরিয়েই সে দিশেহারা হয়ে দৌড়াতে শুরু করল। ওর আলুথালু চুল, রক্তমাখা মুখ আর বিধ্বস্ত চেহারায় তখন কেবল জাভিয়ানকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র আকুতি। দৌড়াতে দৌড়াতে সে মূল চত্বরে এসে থমকে দাঁড়াল।

পুরো চত্বরটা তখন লাশের মিছিলে পরিণত হয়েছে। চারদিকে মেইলস্ট্রোমের বাহিনীর নিথর দেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। প্রচুর পুলিশ অফিসার আর ফরেনসিক দল ব্যস্ত হয়ে কাজ করছে। তান্বীর চোখ প্রথমেই পড়ল জাভিয়ানের ওপর। জাভিয়ান একা দাঁড়িয়ে আছে, ওর শার্টের অর্ধেকটা রক্তে ভেজা। মেইলস্ট্রোমকে সেখানে দেখা গেল না, শুধু অদূরে দেখা যাচ্ছে ইসাবেলাকে যিনি মাটির ওপর বসে বুক ফাটানো কান্নায় ভেঙে পড়েছেন।

জাভিয়ানকে জীবিত দেখে তান্বীর বুক থেকে যেন একটা হিমশীতল পাথর নেমে গেল। কিন্তু আশপাশের এই ধ্বংসলীলা আর জাভিয়ানের গায়ের রক্ত দেখে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। জাভিয়ান যখন ধীরপায়ে তান্বীর দিকে ফিরে তাকাল, তান্বী দেখতে পেল জাভিয়ানের সেই চিরচেনা কঠোর চোখে আজ এক গভীর শূন্যতা।

তান্বী কাঁপতে কাঁপতে অস্ফুট স্বরে ডাকল, “জাভিয়ান…?”

জাভিয়ান কোনো কথা বলল না। সে শুধু তার রক্তমাখা হাত দুটো বাড়িয়ে দিল তান্বীর দিকে। তান্বী বুঝতে পারল না এই রক্ত কার, রণক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপের মাঝে জাভিয়ানকে দেখা মাত্রই তান্বী তার সমস্ত আতঙ্ক ভুলে ছুটে এল। জাভিয়ানের বুকে আছড়ে পড়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় ছিল এক দীর্ঘ উৎকণ্ঠার অবসান।

তান্বী কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে বলল, “আপনি ঠিক আছেন? আমি… আমি ভেবেছিলাম আর বোধহয় আপনাকে দেখতে পাব না। ওই ঝড়তুফান লোকটা কোথায়? সে কি এখনো আছে?”

জাভিয়ান ওর মাথায় হাত রেখে শান্ত করার চেষ্টা করল। ওর কণ্ঠস্বর পাথরের মতো ভারী, কিন্তু তাতে এক ধরনের আশ্বাস ছিল। সে বলল, “শান্ত হও তান্বী। ওকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। মেইলস্ট্রোম এখন পুলিশের কবজায়।”

তান্বী অবাক হয়ে জাভিয়ানের বুক থেকে মাথা তুলে তাকাল। অবিশ্বাসের সুরে বলল, “ওনার মতো একজন মাফিয়া সম্রাটকে সত্যিই অ্যারেস্ট করাতে পেরেছেন? আমি তো ভাবতেই পারছি না!” কথাটি বলেই সে আবার জাভিয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। এক গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল, “এতক্ষণ ডিকির ভেতর দম আটকে আসছিল। অজানা এক ভয়ে শরীর জমে যাচ্ছিল। এখন যে কী শান্তি লাগছে, তা আমি আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।”

জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে আলতো করে তান্বীকে নিজের বুক থেকে সরাল। তারপর ওর বিধ্বস্ত মুখটার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। চাঁদের আলো আর পুলিশের গাড়ির ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় জাভিয়ান লক্ষ্য করল, তান্বীর ফর্সা গালের একপাশটা কেটে রক্ত জমাট বেঁধে আছে, হাতের কনুই থেকেও রক্ত চুইয়ে পড়ছে।

জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে পরম মমতায় তান্বীর সেই ক্ষতবিক্ষত গালের ওপর হাত রাখল। ওর স্পর্শে এক অদ্ভুত কাতরতা ছিল। নিচু স্বরে সে বলল, “আই অ্যাম সরি তান্বী। আমি তোমাকে পুরোপুরি প্রটেক্ট করতে পারিনি। তুমি এতভাবে আহত হয়েছ কীভাবে?”

তান্বী মৃদু হাসল, যদিও সেই হাসিতে যন্ত্রণার রেশ ছিল। সে জাভিয়ানের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, “এতো বড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল, আপনার জানের ওপর দিয়ে কত কি বয়ে গেল… সেখানে আমার এই সামান্য একটু কাটাছেঁড়ায় কী আসে যায় জাভিয়ান?”

জাভিয়ান এবার সরাসরি তান্বীর চোখের দিকে তাকাল। ওর চোখে তখন আগুনের মতো সংকল্প আর অতল ভালোবাসা। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “আসে যায় তান্বী। আমার আসে যায়। পুরো দুনিয়া একদিকে, আর তোমার শরীরের একটা লোমও একদিকে। আমি বলেছিলাম তোমার গায়ে একটা ফুলের টোকাও পড়তে দেব না, অথচ আমি সেখানে ব্যর্থ হয়েছি। এই সামান্য রক্তটুকুও আমার সহ্য হচ্ছে না।”

জাভিয়ানের এই কথায় তান্বী চুপ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, এই কঠোর মানুষটার হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে কেবল তারই আধিপত্য। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তান্বীর নজর গেল চারপাশের নিস্তব্ধতার দিকে। সে লক্ষ্য করল ইসাবেলা দূরে বসে এখনো কাঁদছেন। তান্বীর মনে হঠাৎ এক বিজাতীয় আতঙ্ক খেলে গেল। সে এদিক-ওদিক তাকিয়ে অস্থির হয়ে উঠল।

“জাভিয়ান… ভ্যালেরিয়া আপা কোথায়? তিনি তো আমাকে গাড়িতে রেখে আবার আপনার কাছে ফিরে এসেছিলেন। তিনি কোথায়?”

চত্বরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে এল। তান্বী জাভিয়ানের দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, “তাড়াতাড়ি বলুন না ভ্যালেরিয়া আপা কোথায়? ওনাকে জড়িয়ে ধরে একটা থ্যাংক ইউ বলা বাকি আছে। কত কথা জমা হয়ে আছে! আমরা যে জিতে গেছি, এটা শুনে নিশ্চয়ই উনি সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন, তাই না?”

জাভিয়ান কোনো কথা বলল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, দৃষ্টি মাটির দিকে। জাভিয়ানের এই অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে তান্বীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, “কী হলো? কিছু বলছেন না কেন? আচ্ছা, ঠিক আছে, আমিই খুঁজে নিচ্ছি।”

তান্বী হন্যে হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। পুলিশের জটলা, লাশের স্তূপ, ভাঙা দেওয়াল সব জায়গায় সে ভ্যালেরিয়াকে খুঁজল, কিন্তু কোথাও সেই তেজস্বী মেয়েটিকে দেখতে পেল না। ঠিক সেই মুহূর্তে, দুজন পুলিশ কর্মী একটি স্ট্রেচারে করে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি দেহ অ্যাম্বুলেন্সের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ এক দমকা বাতাস বয়ে গেল, আর সেই বাতাসের ঝাপটায় লাশের মুখ থেকে সাদা কাপড়ের পর্দাটা সরে গেল।

এক মুহূর্তের জন্য তান্বীর হৃৎপিণ্ড থমকে গেল। সে অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইল সেই মুখটার দিকে। পরক্ষণেই সে উন্মাদের মতো দৌড় দিল স্ট্রেচারটার দিকে। “থামুন! আপনারা থামুন!”

তান্বীর চিৎকারে পুলিশ কর্মীরা থমকে দাঁড়াল। সে জোর করে স্ট্রেচারটা নিচে নামাতে বাধ্য করল। কাপড়ের নিচে শান্ত হয়ে শুয়ে আছে ভ্যালেরিয়া। তার সেই মায়াবী মুখে এখন চিরস্থায়ী নিস্তব্ধতা। তান্বী হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল স্ট্রেচারের পাশে।

“একি! ওনার কী হয়েছে? আপনারা আমার ভ্যালেরিয়া আপাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? এই যে আপা, কী হয়েছে আপনার? কথা বলছেন না কেন? আপনি কি খুব বেশি আহত হয়েছেন? খুব ব্যথা করছে?”

তান্বী ভ্যালেরিয়ার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা। সে পাগলের মতো ভ্যালেরিয়ার গায়ে হাত বুলিয়ে ডাকতে লাগল, কিন্তু কোনো সাড়া নেই।

জাভিয়ান ধীরপায়ে তান্বীর পেছনে এসে দাঁড়াল। সে তান্বীর কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত ভারী গলায় বলল, “তান্বী… নিজেকে সামলাও। ভ্যালেরিয়া আর নেই। আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ও নিজের শরীরে পাঁচ পাঁচটা গুলি নিয়েছে। ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।”

তান্বী এক ঝটকায় জাভিয়ানের হাত সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “কী যা তা বলছেন আপনি! ভ্যালেরিয়া আপা মরতে পারে না! ওনার মতো শক্তিশালী মেয়ে এতো সহজে মরতে পারেনা!”

তান্বী এবার ডুকরে কেঁদে উঠে ভ্যালেরিয়ার বুকের ওপর মাথা রাখল। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করল সেই হৃদস্পন্দন, যা কিছুক্ষণ আগেও তার সাহসের উৎস ছিল। কিন্তু কোনো শব্দ নেই, কোনো স্পন্দন নেই। ভ্যালেরিয়ার বুকটা তখন পাথরের মতো স্থির।

তান্বীর ভেতরটা এক নিদারুণ ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, যে বোনটি তাকে আগলে রেখেছিল, যে তাকে লড়াই করার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সে আজ নিজের জীবনের বিনিময়ে তাদের এই বিজয় উপহার দিয়ে গেছে।

রাতের সেই নিথর প্রান্তরে তান্বীর প্রতিটি কথা যেন এক একটি ধারালো ছুরির মতো জাভিয়ানের হৃদয়ে বিঁধছিল। তান্বী ভ্যালেরিয়ার বরফশীতল গাল দুটো নিজের দুই হাতের তালুতে নিয়ে পাগলের মতো নাড়াতে লাগল। ওর চোখের জল ভ্যালেরিয়ার রক্তমাখা মুখে পড়ে রক্তের দাগ ধুয়ে দিচ্ছে।

তান্বী ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “এই যে আপা… কথা বলছেন না কেন? আপনি কি সত্যি আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন? ওহ, আমি বুঝতে পেরেছি, আপনি আমার ওপর রাগ করেছেন তো? কারণ আপনি যখনই জাভিয়ানকে নিয়ে কথা বলতেন, আমি হিংসে করতাম, আপনাকে থামিয়ে দিতাম। আমি কান ধরে প্রমিজ করছি আপা, আর কোনোদিন হিংসে করব না। আপনি যতো খুশি জাভিয়ানকে নিয়ে কথা বলুন, আমি কিচ্ছু বলব না। শুধু একবার চোখটা মেলুন, প্লিজ!”

বাতাসে তখন শুধু দূর থেকে ভেসে আসা পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ। ভ্যালেরিয়া তখন সব মান-অভিমানের ঊর্ধ্বে। তান্বী এবার ভ্যালেরিয়ার নিথর দেহটা নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ওর আর্তনাদে যেন ওই দুর্গের পাথরগুলোও কেঁপে উঠল।

“আপা, আপনি একবার উঠুন না! কী করলে আপনি উঠবেন, বলুন? জাভিয়ানকে দিয়ে দিলে আপনি উঠবেন? ঠিক আছে… আপনি শুধু একবার নিজের মুখে বলুন ‘তান্বী, জাভিয়ানকে আমায় দিয়ে দে’। আমি সত্যি বলছি আপা, আমি ওনাকে আপনার হাতে তুলে দিয়ে চিরতরে দূরে সরে যাব। তবুও আপনি এভাবে শুয়ে থাকবেন না, প্লিজ একটা বার কথা বলুন!”

তান্বীর এই করুণ আকুতি শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জাভিয়ান চোখ বুজলো। ওর শক্ত চোয়ালটা যন্ত্রণায় কাঁপছে। ইসাবেলা অদূরে বসে এই দৃশ্য দেখে নিজের মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলেন। তান্বী তখনো ভ্যালেরিয়ার নিস্তেজ বুকে মাথা ঠুকে চলেছে, যেন ওর বুকের উষ্ণতা দিয়ে ও ভ্যালেরিয়ার থেমে যাওয়া হৃদস্পন্দন ফিরিয়ে আনবে।

“আপনি তো বলেছিলেন আমাকে একা লড়াই করা শেখাবেন… তাহলে মাঝপথে এভাবে ফাঁকি দিলেন কেন? জাভিয়ানকে প্রটেক্ট করতে গিয়ে আপনি নিজেকে শেষ করে দিলেন, আপনি আমার বোন ছিলেন,কোনো বোন কি তার বোনকে এভাবে কাঁদিয়ে চলে যায়?”

তান্বীর চোখের নোনা জল আর ভ্যালেরিয়ার নিথর শরীর—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। জাভিয়ান ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তান্বীর কাঁধে হাত রাখল। ওর কণ্ঠস্বর আজ ভীষণ ভাঙা, কিন্তু তাতে এক অমোঘ সত্যের ভার। সে বলল, “তান্বী… ওকে যেতে দাও। ও একটা বীরের মতো গেছে। ও ওর ভালোবাসার মানুষকে আর ওর বোনকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে। এখন ওর শান্তি পাওয়ার সময়।”

তান্বী তখনো ভ্যালেরিয়ার ঠান্ডা হাতটা নিজের গালে চেপে ধরে ডুকরে কাঁদছে। সে আজ বুঝতে পারল, ভালোবাসা শুধু পাওয়ার নাম নয়, ভালোবাসা মানে এক মহাসাগরের মতো নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যে মহাসাগর তটরেখাকে ছুঁতে না পেরেও আজীবন তাকে রক্ষা করে যায়।

অ্যাম্বুলেন্সের কর্মীরা যখন স্ট্রেচারটা তোলার জন্য প্রস্তুত হলো, তখন জাভিয়ান তান্বীর অবস্থা দেখে ইশারায় তাদের কাজ শুরু করতে বলল। কিন্তু তান্বী তখনো ভ্যালেরিয়ার নিথর দেহটা আঁকড়ে ধরে আছে, কোনোভাবেই সে তাকে ছাড়বে না।

জাভিয়ান দেখল এভাবে চললে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। সে তান্বীর দুই বগলের নিচে হাত দিয়ে তাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে স্ট্রেচার থেকে সরিয়ে নিল। তান্বী তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে জাভিয়ানের লোহার মতো শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য হাত-পা ছুড়তে লাগল।

“না! ওনাকে নেবেন না! ছেড়ে দিন বলছি! আপনারা ওনাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?” তান্বীর গগনবিদারী চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিল। সে উন্মাদের মতো জাভিয়ানের বুকে ধাক্কা দিচ্ছে আর বারবার ভ্যালেরিয়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

জাভিয়ান ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে টেনে দূরে সরিয়ে আনতে লাগল। তান্বীর দুচোখ দিয়ে প্লাবনের মতো জল বইছে। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, “জাভিয়ান, আপনি ওদের থামান! ওনাকে নেবেন না! আমার বিশ্বাস উনি বেঁচে ফিরবেন, উনি আবার চোখ মেলবেন! আমাকে ওনার কাছে যেতে দিন… আমার বোনের কাছে যেতে দিন! ও একা ভয় পাবে জাভিয়ান, ও শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না!”

তান্বীর ছটফটানি আর আর্তনাদ দেখে জাভিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল, বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু তাকে শক্ত থাকতে হবে। সে তান্বীর কানে কানে নিচু স্বরে বলতে লাগল, “তান্বী, শান্ত হও। নিজেকে সামলাও। ও আর ফিরবে না। আমাদের ওকে যেতে দিতে হবে।”

অ্যাম্বুলেন্সের দরজাটা যখন এক বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল আর গাড়িটা সাইরেন বাজিয়ে দূরে সরে যেতে লাগল, তান্বী তখন জাভিয়ানের কোলের ভেতর নিস্তেজ হয়ে এল। তার সমস্ত শক্তি যেন নিমিষেই শেষ হয়ে গেল। সে শুধু অস্ফুট স্বরে বিলাপ করতে লাগল, “আমার বোনটা চলে গেল…ও সত্যি সত্যিই চলে গেল…”

জাভিয়ান তখনো তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ধরে রইল। দূরে ইসাবেলা অপলক দৃষ্টিতে সেই চলে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন যেখানে তাঁর অতীত, বর্তমান আর অর্ধেক ভবিষ্যৎ ধুলোয় মিশে গেছে।

তান্বী তখন জাভিয়ানের বুক থেকে মাথা সরিয়ে এক ঝটকায় তার থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালো। ওর টলটলে চোখ দুটোতে এখন শোকের চেয়েও বড় এক জিজ্ঞাসার অগ্নিদাহ। সে সরাসরি জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে বলল, “আপনি ওনাকে কেন ভালোবাসেননি জাভিয়ান? কেন? আপনি যদি ওনাকে একটু ভালোবাসতেন, ওনার দিকে ফিরে তাকাতেন তাহলে আজ অন্তত উনি এভাবে লাশ হয়ে ফিরে যেতেন না। কেন ভালোবাসলেন না ওনাকে?”

জাভিয়ান স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তান্বীর বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ওর কণ্ঠস্বর আজ অনেক বেশি শান্ত, কিন্তু তাতে এক অমোঘ সত্যের ভার। সে নিচু স্বরে বলল, “ভালোবাসা বলে-কয়ে আসে না তান্বী। মানুষের হৃদপিণ্ড কি নিজের বুদ্ধিতে চলে? চাইলেই কি কাউকে নিজের হৃদয়ে জায়গা দেওয়া যায়?”

তান্বী এক পা এগিয়ে এল। ওর গলার স্বর রাগে আর অভিমানে কাঁপছে। “কেন চলবে না? কেন? আপনি আমাকে তো ঠিকই ভালোবাসেন, তাহলে ওনাকে কেন বাসলেন না? উনি তো আমার অনেক আগে আপনার লাইফে এসেছিলেন। ওনার কোনো দিক দিয়েই তো কোনো কমতি ছিল না। বরং আপনার সাথে ওনার পারফেক্ট ম্যাচ ছিল। আপনার মতোই ওনার পারসোনালিটি ছিল, আপনাদের জগৎটা এক ছিল… তবে কেন বাসলেন না ভালো?”

জাভিয়ান এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে এক পা এগিয়ে তান্বীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার দৃষ্টিতে তখন এক গভীর দর্শন। সে শান্ত গলায় বলল, “মানুষ সবসময় তার বিপরীত পার্সোনালিটির প্রতি আকৃষ্ট হয় তান্বী। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমাদের ভালোবাসাটা আগে থেকে কোনো স্ক্রিপ্ট লিখে রাখা নাটক নয় যে চাইলেই চরিত্র বদলে নেওয়া যাবে। আমার ভালোবাসা কেবল তোমার জন্য তৈরি হয়েছে।”

জাভিয়ান তান্বীর চোখে চোখ রেখে পুনরায় বলল, “আমার আশেপাশে শত শত মেয়ে ছিল, কিন্তু কেউ আমার হৃদয়ে সেই কম্পনটা জাগাতে পারেনি যেটা তুমি পেরেছ। তুমি বলছ কেন ওকে বাসলাম না? তবে তুমিই বলো… আমার আগে যদি মেইলস্ট্রোম তোমার লাইফে আসত, তবে কি তুমি আমাকে রেখে ওই দানবটাকে ভালোবাসতে পারতে?”

তান্বী এই প্রশ্নে থমকে গেল। তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল কিন্তু কোনো উত্তর বেরোল না। জাভিয়ান ওর কপালে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “কে, কখন, কাকে, কীভাবে ভালোবাসবে তার উত্তর পৃথিবীর কোনো ডিকশনারিতে নেই তান্বী। ভ্যালেরিয়া আমাকে ভালোবেসেছিল সেটা যেমন সত্য, আমার হৃদয় কেবল তোমার নামে স্পন্দিত হয় এটাও তেমনই ধ্রুব সত্য। এটার ওপর আমার বা তোমার কারোর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।”

তান্বীর সবটুকু জেদ যেন এক নিমেষে জল হয়ে গেল। সে জাভিয়ানের এই যুক্তি আর ভালোবাসার গভীরতার সামনে নিজেকে খুব অসহায় অনুভব করল। বাতাসে তখন শুধু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শেষ সুরটুকু প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।

পরক্ষণেই তান্বী উন্মাদের মতো জাভিয়ানের জামা খামচে ধরে বিলাপ করতে লাগল, “আমার লাইফটা এমন কেন হলো জাভিয়ান? আমার সব কাছের মানুষ কেন হারিয়ে যায়? আমার জীবনটা তো কত সুন্দর ছিল, তবে কেন সব এমন ওলটপালট হয়ে গেল?”

সে ভাঙা গলায় বলতে লাগল, “নিজের আপন বোনকে হারালাম, ভাই থেকেও নেই, বাবা-মা কত দূরে! আর যাকে একবার বোন ভেবে একটু শান্তিতে ছিলাম, সেও আমাকে ছেড়ে চলে গেল। জাভিয়ান… আপনিও কি আমাকে রেখে চলে যাবেন?”

জাভিয়ান স্থির দৃষ্টিতে তান্বীর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু অটল গলায় বলল, “না।”

তান্বী ডুকরে উঠে বলল, “প্রমিজ করুন! প্রমিজ করুন আপনি আমার কাছ থেকে কোনোদিন হারাবেন না!”

জাভিয়ান তান্বীর দুই গাল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ধীর স্বরে বলল, “আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না তান্বী। আর যদি মরতে হয়, তবে একসাথেই মরব তোমাকে নিয়েই। তুমি কি পারবে আমার সাথে মরতে?”

তান্বী এক মুহূর্ত দেরি না করে জাভিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “পারব না কেন? আপনি না থাকলে আমার তো কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।” এটুকু বলেই তান্বী আবার জাভিয়ানের বুকে আছড়ে পড়ল। কিন্তু অতিরিক্ত মানসিক চাপ আর শরীরের যন্ত্রণায় এবার সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। জাভিয়ানের কোলেই সে ধীরে ধীরে জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ল।

জাভিয়ান চিৎকার করে উঠল, “তান্বী! তান্বী চোখ খোলো!”

ততক্ষণে রায়হান সব কাজ গুছিয়ে জাভিয়ানের গাড়িটা একদম সামনে নিয়ে এসেছে। সে দ্রুত ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। জাভিয়ান হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তান্বীকে কোলে তুলে পেছনের সিটে বসাতে যাবে, ঠিক তখনই এক পুলিশ অফিসার দৌড়ে এসে বলল, “স্যার, আপনাকে এক্ষুনি থানায় যেতে হবে। মেইলস্ট্রোমের কেসটা নিয়ে খুব জরুরি কিছু ফর্মালিটি বাকি আছে।”

জাভিয়ান দাঁতে দাঁত চিপে বিরক্তি প্রকাশ করল। সে তান্বীকে পেছনের সিটে না রেখে, পরম মমতায় পাঁজাকোলা করে সামনে নিয়ে এল। রায়হানের পাশের সিটে ওকে খুব সাবধানে বসিয়ে সিটবেল্ট বেঁধে দিল। যাওয়ার আগে ওর কপালে একটা দীর্ঘ ও আবেগী চুমু খেল জাভিয়ান।

রায়হানের দিকে তাকিয়ে সে কঠোর স্বরে নির্দেশ দিল, “রায়হান, ওকে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যাও। এক মুহূর্ত দেরি করবে না।”

জাভিয়ান গাড়ি থেকে দু-পা দূরে গিয়ে আবার ফিরে এল। রায়হানের চোখের দিকে তাকালে জাভিয়ানের চোখে সেই চিরচেনা ঈর্ষা আর অধিকারবোধ ফুটে উঠল। সে আঙুল উঁচিয়ে সাবধান করে বলল, “শোনো রায়হান, হাসপাতালে পৌঁছে ওকে আবার তুমি নিজে কোলে করে ভেতরে নেবে না, বলে দিলাম!”

রায়হান কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু স্যার… মিস গজদন্তনি তো অজ্ঞান, আমি না নিলে ভেতরে নেবে কীভাবে?”

জাভিয়ান শীতল গলায় উত্তর দিল, “নার্সদের বলবে স্ট্রেচার নিয়ে আসতে। তারা ওকে ধরে বেডে নেবে। কিন্তু তুমি টাচ করবে না। কথাটা যেন মনে থাকে!”

রায়হান মাথা নিচু করে সায় দিল। ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গাড়িটা হাসপাতালের দিকে ছুটে চলল। জাভিয়ান এক দৃষ্টিতে সেই চলে যাওয়া গাড়ির ধুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, আর তার চোখের কোণে রয়ে গেল ভ্যালেরিয়ার জন্য এক বিন্দু শোক আর তান্বীর জন্য অগাধ ভালোবাসা।

পুলিশের জিপটা স্টার্ট দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে জাভিয়ান হাত দিয়ে থামার সংকেত দিল। ওর চোখ দুটো তখন শান্ত কিন্তু তাতে এক গভীর বিষাদ। সে ডিউটি অফিসারের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আমি পুলিশের গাড়িতে যাব না। আমি ভ্যালেরিয়ার সাথে ওই অ্যাম্বুলেন্সেই যেতে চাই।”

অফিসার কিছুটা অবাক হলেও জাভিয়ানের চোখের কাঠিন্য দেখে না করতে পারলেন না। জাভিয়ান ধীরপায়ে অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে গিয়ে উঠল। ভেতরে স্ট্রেচারের ওপর সাদা চাদরে ঢাকা ভ্যালেরিয়া ঠিক যেন এক শান্ত ঘুমন্ত পরী। জাভিয়ান ওর পাশে লোহার বেঞ্চটাতে বসলো। অ্যাম্বুলেন্সটা যখন ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করল, তখন ঝাঁকুনিতে হঠাৎ ভ্যালেরিয়ার একটা হাত সাদা কাপড়ের নিচ থেকে বেরিয়ে এল। হাতটা একপাশে ঝুলে আছে, ঠিক যেন শেষবারের মতো জাভিয়ানের স্পর্শ চাইছে।

জাভিয়ান পরম মমতায় সেই শীতল হাতটা তুলে কাপড়ের ভেতরে ঢকিয়ে দিল। তারপর আলতো করে ভ্যালেরিয়ার মুখের ওপর থেকে সাদা চাদরটা সরিয়ে দিল। চাঁদের আলো জানলা দিয়ে এসে ওর ফ্যাকাশে মুখে পড়েছে। জাভিয়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলতে লাগল “কেন ভালোবাসতে গেলে আমায় ভ্যালেরিয়া? কেন নিজের সুন্দর জীবনটা এভাবে নষ্ট করলে? আম সরি… সত্যিই খুব সরি যে আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারিনি। তোমার এই পাহাড়সম ভালোবাসার পরেও আমি তোমাকে আমার মনে সেই বিশেষ জায়গাটা দিতে পারিনি।”

জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী হয়ে এল। ও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুনরায় বলল, “কিন্তু তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে যেভাবে নিজের জীবন দিয়ে দিলে, আমি কথা দিচ্ছি… আমি তোমাকে সারাজীবন মনে রাখব। ভ্যালেরিয়া নামে একটা মেয়ে আমার জীবনে ছায়ার মতো ছিল, এটা আমি কোনোদিন ভুলব না।”

সে ভ্যালেরিয়ার কপাল ছূঁয়ে থাকা অবিন্যস্ত চুলগুলো হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। “তুমি যেমন আমাকে ভালোবেসে আজ প্রাণ দিয়ে দিলে, আমিও ঠিক তেমনি আমার তান্বীর জন্য জীবন দিতে পারি। আসলে ভালোবাসা খুব দুর্বল একটা জিনিস জানো ভ্যালেরিয়া। সারাজীবন এই দুর্বলতা থেকেই বাঁচতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আজ বুঝেছি আমিও সেই একই জালে আটকে গেছি।”

জাভিয়ান শেষবারের মতো ভ্যালেরিয়ার মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে আবার সাদা চাদরটা দিয়ে ওর মুখটা ঢেকে দিল।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনটা রাতের নিস্তব্ধতা চিরে সামনে এগিয়ে চলল, আর জাভিয়ান অন্ধকার কেবিনে বসে রইল এক মৃত এক তরফা প্রেমিকার স্মৃতি আর এক জীবিত ভালোবাসার দায়বদ্ধতা নিয়ে।
.
.
.
.

অন্যদিকে লুসিয়া ওর ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে সেই ডার্ক শেডের লিপস্টিকটা বের করল, যেটা সে সবসময় পার্টিতে ব্যাবহার করতো। ফারহানকে পাওয়ার জন্য সে তার মেক্সিকান আভিজাত্যর সেই অন্ধকার জগত, নাইট ক্লাব, আর বেপরোয়া জীবন সবকিছু তুড়ি মেরে বিসর্জন দিয়েছিল। কিন্তু ফারহান? সে বারবার লুসিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছে, ওর ভালোবাসাকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে। আজ সেই সব অবহেলার উত্তর দেওয়ার সময় এসেছে।

লুসিয়া আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে একটা নিষ্ঠুর হাসি হাসল। ওর বান্ধবী মার্তা তখন পাশে দাঁড়িয়ে কার্যত তোতলাচ্ছিল, “লুসিয়া… তুই সত্যি এটা করবি? তুই তো ফারহানের জন্য মদ, ক্লাব, এমনকি তোর সেই গ্যাংস্টার ফ্রেন্ডের সাথে যোগাযোগও বন্ধ করে দিয়েছিলি। আবার সেই পুরোনো মেক্সিকান লাইফ স্টাইলে ফিরবি? কেন লুসিয়া?”

লুসিয়া এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়াল। ওর চোখে এখন আর ভালোবাসা নেই, আছে এক বুক জ্বালাময়ী ঘৃণা। সে গর্জে উঠে বলল, “ফারহান আমাকে বারবার রিজেক্ট করেছে! আমি নিজেকে ভালো করতে চেয়েছিলাম ওর জন্য, কিন্তু ও কি তার দাম দিয়েছে? না! এখন আর ভালো হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমি আমার মেক্সিকান রক্তকে আর কতক্ষণ দমিয়ে রাখব? আমি আমার সেই পুরোনো লাইফেই ফিরছি, যেখানে আমি ছিলাম কুইন!”

সে আইলাইনারের শেষ টাচটা দিয়ে ফোনটা মার্তার হাতে ঠেলে দিল। “আরে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমাকে গ্রুপে আবার অ্যাড কর। সবাইকে মেসেজ কর যে লুসিয়া ইজ ব্যাক! আজ রাতে মেক্সিকান ক্লাবে বিশাল পার্টি হবে। আমি চাই আজ রাতে শহরের সব মাথাভরা মানুষ সেখানে আসুক। আমি দেখতে চাই ফারহান ছাড়া পৃথিবীটা কত বড়!”

মার্তা ভয়ে ভয়ে টাইপ করতে লাগল। সে বুঝতে পারছিল, ফারহানের প্রতি এই অন্ধ প্রেম আজ লুসিয়াকে এক ধ্বংসাত্মক পথে নিয়ে যাচ্ছে।মেক্সিকান পার্টি কুইন লুসিয়ার ফেরার খবরটা যখন পৌঁছাল, তখন চারদিকে এক থমথমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। লুসিয়া আজ আর কারো প্রেমিকা হতে চায় না, সে ফিরতে চায় তার সেই পুরোনো ‘লেডি ক্রাশ’ ইমেজে।

মেক্সিকোর সেই নামকরা নাইট ক্লাবটি আজ যেন কোনো উৎসবের অপেক্ষায় সাজানো হয়েছে। নিওন আলোর ঝলকানি আর কানফাটা মিউজিকের মাঝে লুসিয়া যখন পা রাখল, চারদিকের ভিড় কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। একটি কালো রঙের অফ-শোল্ডার বডিকন ড্রেসে ওকে মোহময়ী এবং ভয়ংকর সুন্দর লাগছিল। ড্রেসটি তার পায়ের হাঁটুর নিচ পর্যন্ত দীর্ঘ হলেও অফ-শোল্ডার কাটিংটা ওর মেক্সিকান আভিজাত্যকে স্পষ্ট করে তুলছিল।

পুরো ক্লাব জুড়ে আজ একটাই কানাঘুষো আজকের প্রধান অতিথি কোনো সাধারণ মানুষ নন, আন্ডারওয়ার্ল্ডের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন বিশেষ ব্যক্তি। লুসিয়ার পুরোনো বন্ধুরা ওর চারপাশে এসে ভিড় জমালো। মদ আর ধোঁয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা বন্ধুরা উস্কানি দিয়ে বলতে লাগল, “কী রে লুসিয়া? একজনের জন্য তো এতদিন অনেক সাধু সাজলি। আজ ওই স্পেশাল গেস্টের টেবিলে গিয়ে তোর পুরোনো জলবাটা দেখিয়ে আয় তো দেখি! সাহস আছে তোর?”

ওর বেস্ট ফ্রেন্ড মার্তা পাশে থেকে বাধা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, “লুসিয়া, দয়া করে জেদ করিস না। তুই এর আগে কখনো কোনো গেস্টের কাছে যাসনি। তুই তো জানিস ওই লোকটা কতটা বিপদজনক! ফিরে আয় লুসিয়া, এটা তোর পুরোনো লাইফ হলেও পরিস্থিতি এখন অন্যরকম।”

লুসিয়া জুসের গ্লাসের শেষ চুমুকটা দিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। ফারহানের রিজেকশন ওর বুকের ভেতরটা জ্বালিয়ে দিচ্ছে, আজ ও কোনো নিয়ম মানতে রাজি নয়। সে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “আগে যাইনি তো কী হয়েছে? আজ যাব। নতুন অভিজ্ঞতা হবে। নিজেকে আজ একটু পরীক্ষা করে দেখতে চাই।”

বলেই লুসিয়া খুব ধীরপায়ে, ছন্দময় ভঙ্গিতে গেস্টের ভিআইপি জোনের দিকে এগিয়ে গেল। নিরাপত্তা রক্ষীরা ওকে আটকাতে চেয়েছিল, কিন্তু গেস্টের এক ইশারায় তারা সরে দাঁড়াল। লুসিয়া সরাসরি গিয়ে ওই রহস্যময় ব্যক্তির ঠিক সামনের টেবিলে গিয়ে বসল।

লোকটি তখন দামী চুরুটের ধোঁয়া ছাড়ছিল। লুসিয়ার অফ-শোল্ডার ড্রেস, ওর উদ্ধত চাহনি আর আগুনের মতো সৌন্দর্য দেখে সে এক নিমেষেই আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। তার চোখে কামনার চেয়েও বেশি ফুটে উঠল শিকার ধরার আনন্দ। লোকটি মৃদু হেসে সোফার পাশের ফাঁকা জায়গাটা নির্দেশ করে বলল, “এমন সৌন্দর্য এই ক্লাবে আগে কখনো দেখিনি। এখানে বসে কেন দূরে সরে আছ? আমার পাশের এই স্পেশাল সোফাটায় এসে বসো।”

লুসিয়া এক মুহূর্ত ভাবল না। সে উঠে গিয়ে সরাসরি লোকটির একদম পাশে বসল। মার্তা তখন বিস্ময়ে বিমূঢ়—ফারহানের জন্য যে লুসিয়া একদিন সব ছেড়েছিল, সে আজ এক রহস্যময় পুরুষের বাহুবন্দী হতে একটুও দ্বিধাবোধ করছে না।

মেক্সিকোর সেই ধোঁয়াটে এবং রহস্যময় ভিআইপি জোনে সময়টা লুসিয়ার জন্য বিষ হয়ে উঠছিল। সেই আগন্তুক পুরুষটি পরম আদরে লুসিয়াকে খাবারের অফার করলে লুসিয়া নির্লিপ্তভাবে কিছু খাবারের অর্ডার দিল। কিন্তু খাবারের চেয়ে নেশার দিকেই তার ঝোঁক ছিল বেশি। পরপর দুই প্যাগ কড়া মদ গলায় ঢেলে নিল সে, এরপর আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে শুরু করল। ফারহানের দেওয়া ক্ষতগুলো সে এই বিষাক্ত ধোঁয়ায় উড়িয়ে দিতে চাইছিল।

হঠাৎ লোকটা পকেট থেকে হিরোইনের একটা ছোট প্যাকেট বের করে লুসিয়াকে অফার করল। লুসিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে সরাসরি মানা করে দিল, “আমি শুধু ড্রিংকস আর স্মোকিং করি। এই ড্রাগস আমি কখনো ট্রাই করিনি, আর করতেও চাই না।”

লোকটা কুটিল হাসল। সে নাছোড়বান্দা, বারবার লুসিয়াকে জোর করতে লাগল, “আগে করোনি বলেই তো আজকে করবে। দেখো না, সব যন্ত্রণা এক নিমেষে উধাও হয়ে যাবে।”

কিন্তু অনেক জোরাজুরির পরেও লুসিয়া যখন রাজি হলো না, তখন লোকটা প্যাঁচ বদলাল। সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, ড্রাগস নিতে হবে না। ড্রিংকস তো করবে? এসো, চিয়ার্স করি।”

সে আরও ড্রিংকস অর্ডার করল এবং লুসিয়া যখন অন্য দিকে তাকিয়ে ছিল, তখন অতি সন্তর্পণে গ্লাসের ভেতর নীলচে রঙের কিছু একটা মিশিয়ে দিল।

দূর থেকে মার্তা সবটা লক্ষ্য করছিল। তার অভিজ্ঞ চোখ বলে দিচ্ছিল সামনে বড় বিপদ। সে অস্থির হয়ে প্রথমে জাভিয়ানকে ফোন করল, কিন্তু জাভিয়ান তখন অ্যাম্বুলেন্সে ভ্যালেরিয়ার লাশের পাশে থাকায় ফোন রিসিভ হলো না। এরপর সে মার্কোকে ট্রাই করল, সেখানেও ব্যর্থ। কোনো উপায় না দেখে সে শেষ ভরসা হিসেবে ফারহানকে কল করল। ক্লাবের প্রচণ্ড মিউজিকের শব্দে ফারহান ফোনে কিছুই বুঝতে পারছিল না, তাই মেয়েটি দ্রুত সবটা মেসেজে লিখে পাঠাল।

ফারহান মেসেজ দেখে ফিরতি রিপ্লাই দিল, “ও যা খুশি করুক। আমাকে এর মধ্যে টেনোনা।”

মেয়েটি কেঁদে ফেলে আবার টাইপ করল, “ভাইয়া, প্লিজ আসুন! ও একটা বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে। ও আজ যা করছে সব রাগের বশে করছে। ওই লোকটা ওর ড্রিংকসে কিছু মিশিয়েছে। ওর সাথে আজ খারাপ কিছু হয়ে গেলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। প্লিজ ভাইয়া, ও আপনার জন্যই পাগল, অন্তত একবারের জন্য হলেও আসুন!”

ফারহান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল। অন্যদিকে লুসিয়া তখন সেই বিষ মেশানো গ্লাসে চুমুক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ড্রাগস মেশানো পানীয়টা শেষ করার কয়েক মিনিটের মধ্যেই লুসিয়ার শিরায় শিরায় এক অদ্ভুত আগুনের প্রবাহ শুরু হলো। চোখের সামনে ক্লাবের নিওন আলোগুলো ঝাপসা হয়ে ধোঁয়াটে আকার ধারণ করছে। ওর শরীরটা কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে, কিন্তু হৃৎপিণ্ডটা চলছে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুত গতিতে। ড্রাগস আর অ্যালকোহলের সেই প্রাণঘাতী মিশ্রণ ওর ভেতরে কামনার এক তীব্র অস্থিরতা তৈরি করল যেটা ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।

ওর মাথাটা টলতে টলতে একসময় লোকটার চওড়া কাঁধের ওপর গিয়ে পড়ল। লোকটা ওর গায়ের ওপর হাত রাখতেই লুসিয়া আর বাধা দেওয়ার শক্তি পেল না; ও কেবল ঘোরের মধ্যে ফারহানের মুখটা দেখার চেষ্টা করছিল।

দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে লুসিয়ার বান্ধবীর রক্ত হিম হয়ে গেল। সে আর অপেক্ষা করতে পারল না। ভিড় ঠেলে সরাসরি সেই ভিআইপি সোফার সামনে গিয়ে লুসিয়ার হাতটা ধরে নিজের দিকে টানতে শুরু করল। সে চিৎকার করে লোকটাকে বলল, “ছাড়ুন ওকে! দেখছেন না ও অসুস্থ হয়ে পড়ছে? আমি ওকে বাসায় নিয়ে যাব।”

লোকটা এবার তার আসল রূপ দেখাল। সে এক ঝটকায় লুসিয়ার বান্ধবীকে সরিয়ে দিয়ে ক্রুর হাসি হাসল। ওর চোখে তখন বন্য পশুর হিংস্রতা। সে হিসহিসিয়ে বলল, “আরে কী করছো? সস্তা হিরো হওয়ার চেষ্টা করো না। তোমার ফ্রেন্ড নিজে থেকে এখানে এসে আমার পাশে বসেছে। ও এখন আমার গেস্ট।”

মার্তা আবার এগোতে চাইলে লোকটার দুই বডিগার্ড এসে তাকে পথ আগলে ধরল। লোকটা লুসিয়ার কাঁধে শক্ত করে ধরে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “শোনো মেয়ে, একবার যে আমার টেবিলে এসে বসেছে, তাকে ফেরত নেয়ার কোনো অধিকার এই দুনিয়ায় কারোর নেই। ও এখন আমার সাথে যাবে।”

লুসিয়া তখন যন্ত্রণায় আর নেশার ঘোরে অস্ফুট স্বরে কিছু বলছিল, কিন্তু তার সেই কথাগুলো কানফাটা মিউজিকের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিল। তার বান্ধবী নিরুপায় হয়ে আবার ফোনের দিকে তাকাল—ফারহান কি আদৌ আসছে? নাকি আজ লুসিয়ার জীবনের সব আলো এই ক্লাবের অন্ধকারেই নিভে যাবে?

মেক্সিকোর সেই ধোঁয়াটে নাইট ক্লাবে তখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। লোকটা নেশায় চুর লুসিয়ার কাঁধে জড়িয়ে ধরে প্রায় নিয়ে যেতেই উদ্যত হয়েছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের বেগে সেখানে এসে হাজির হলো ফারহান। ওর চোখেমুখে তখন খু/নের নেশা, চোয়াল শক্ত।

ফারহান বজ্রকণ্ঠে গর্জে উঠে বলল, “লুসিয়াকে ছেড়ে দাও!”

লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ফারহানকে ওপর-নিচ একবার দেখে নিয়ে বলল, “হু আর ইউ? এই ড্রামা করার সময় আমার নেই।”

ফারহান এক পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “ওর বয়ফ্রেন্ড আমি! এবার ওকে ছাড়ো।”

লোকটা অট্টহাসি দিয়ে উঠল। “বয়ফ্রেন্ড? সেই খবর আমার জানার দরকার নেই। এই মেয়ে নিজে থেকে আমার টেবিলে এসে বসেছে, ও এখন আমার গেস্ট। আমার গেস্টকে আমি কোথায় নিয়ে যাব সেটা আমি ভালো করেই জানি।”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ফারহান লোকটার কলার ধরে এক দানবীয় ঘুষি বসিয়ে দিল। শুরু হলো এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ক্লাবের বাউন্সাররা ফারহানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, কিন্তু ফারহান আজ অপ্রতিরোধ্য। সে হাতের কাছে থাকা মদের বোতল আর আসবাবপত্র দিয়ে পুরো ক্লাব তছনছ করে দিল। নিওন আলোগুলো ভেঙে চারদিকে কাঁচের বৃষ্টি হচ্ছে, মিউজিক থেমে গিয়ে মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
মারামারির এক পর্যায়ে সেই লোকটা যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে কোমর থেকে পিস্তল বের করতে চাইল। কিন্তু ফারহানের ক্ষিপ্রতা ছিল চিতার মতো। লোকটা ট্রিগার চাপার আগেই ফারহান তার নিজের অস্ত্র বের করে লোকটার পায়ে লক্ষ্য করে গুলি চালাল।

গুলির আওয়াজটা ক্লাবের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হলো। লোকটা আর্তনাদ করে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ঠিক তখনই বাইরে পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ পাওয়া গেল। পুলিশ ভেতরে ঢোকার আগেই ফারহান দ্রুত অবশ হয়ে পড়া লুসিয়াকে পাজাকোলা করে তুলে নিল।

পুলিশ যখন ক্লাবের সদর দরজা দিয়ে ঢুকছে, ফারহান তখন পেছনের সিক্রেট এক্সিট দিয়ে লুসিয়াকে নিয়ে অন্ধকারের মাঝে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে তখন ঠান্ডা বাতাস বইছে, কিন্তু ফারহানের বুকের ভেতর তখনো লুসিয়াকে হারানোর ভয়ে এক আগ্নেয়গিরি জ্বলছে।

ক্লাবের পেছনের অন্ধকার গলিতে ফারহান লুসিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দিতেই সে টালমাটাল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নেশার সেই নীল বিষ তখন লুসিয়ার স্নায়ুর ওপর রাজত্ব করছে। সে নিজের দুহাতে চোখ ডলতে ডলতে বিড়বিড় করে উঠল, “ছাড়ুন আমাকে! কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আর আপনি কে?”

ফারহান কোনো কথা না বলে ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে পাশের পার্ক করা একটা গাড়ির বডির সাথে মিশিয়ে চেপে ধরল। লুসিয়া অতিকষ্টে চোখ মেলে তাকাল। সামনে ফারহানের সেই চেনা মুখ, সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। লুসিয়া একটা অবজ্ঞার হাসি হেসে মাথা নাড়ল, “উফ! এই ছেলেটা আমার মাথাটা পুরোপুরি খারাপ করে দিয়েছে। এখন এই বজ্জাত লোকগুলোর ভিড়েও আমি ওকেই দেখছি? হে কল্পনার ফারহান, এবার দয়া করে আমার সামনে থেকে সরে যাও। আমি তো আর তোমাকে ডিস্টার্ব করছি না, তবে কেন বারবার আসো?”

ফারহান ওর বাহু দুটো শক্ত করে চেপে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “আমি কল্পনা নই লুসিয়া, আমি সত্যি ফারহান।”

লুসিয়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল বাস্তবের সাথে খাপ খাওয়াতে। পরক্ষণেই সে চিৎকার করে উঠল, “তুমি! তুমি এখানে কেন এসেছ? ছাড়ো আমাকে, ভেতরে যেতে দাও। সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমি আজ পার্টি করব!”

ফারহানের রাগে রগ ফুলে উঠল। সে এক ঝটকায় লুসিয়ার হাতটা মুচড়ে ওর পিঠের পেছনে নিয়ে গিয়ে ওকে আরও শক্ত করে গাড়ির সাথে চেপে ধরল। ওর কানে কানে ঘৃণাভরা স্বরে বলল, “আমি জানতাম তুমি কোনোদিন শুধরাবে না! ছি লুসিয়া! তোমার শরীরে ওই লোকটা স্পর্শ করেছে ভাবতেই আমার ঘৃণা লাগছে। আমি আজ না আসলে আর কী কী হয়ে যেত কল্পনা করতে পারছ?”

লুসিয়া ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলেও দমে গেল না। সে সর্বশক্তি দিয়ে ফারহানের বুকে একটা ধাক্কা মেরে নিজেকে কিছুটা ছাড়িয়ে নিল। টলতে টলতে নেশাতুর চোখে তাকিয়ে বলল, “ঘৃণা লাগছে? তবে চলে যাও এখান থেকে! কে ডেকেছে তোমাকে? আমার শরীর নিয়ে আমি যা খুশি করব। একটা কেন, আরও দশটা পুরুষের ছোঁয়া নেব আমি! নাও, গেট লস্ট!”

লুসিয়া এলোমেলো পায়ে আবার ক্লাবের দিকে হাঁটা দিতে চাইলে ফারহান এক সেকেন্ডে ওর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে আবার গাড়ির সাথে আছড়ে ফেলল। ফারহানের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সে লুসিয়ার খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে হিসহিসিয়ে বলল, “ওই লোকটা তোমার কোথায় কোথায় স্পর্শ করেছে শুনি?”

লুসিয়া তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে ফারহানের জেদ দেখে আরও উসকে দেওয়ার জন্য বলল, “যদি বলি সব জায়গায় করেছে, তবে কী হবে? কী করবে তুমি?”

ফারহান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে লুসিয়ার ঠোঁটের দিকে তাকাল। গাঢ় রঙের লিপস্টিকটা তখনো অবিকল অটুট। ফারহান কুটিল হাসল, “মিথ্যে বলছ। তোমার ঠোঁটের লিপস্টিক এখনো একদম ঠিক আছে কীভাবে?”

লুসিয়া নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন কণ্ঠে, আধো-আধো বোল ফুটিয়ে বলল, “কারণ এটা কিস-প্রুফ লিপস্টিক… সহজে মোছে না।”

ফারহানের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। তার ভেতরের সুপ্ত অধিকারবোধ আর ঈর্ষা আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। সে লুসিয়ার গলার কাছে মুখ নামিয়ে অত্যন্ত নিচু আর গাঢ় স্বরে বলল, “ওহ… কিস-প্রুফ? ওকে, আমিও দেখি এটা ঠিক কেমন কিস-প্রুফ।”

কথাটা শেষ হতে না হতেই ফারহান তার তপ্ত ঠোঁট দিয়ে লুসিয়ার ঠোঁটজোড়া দখল করে নিল। মেক্সিকোর সেই অন্ধকার গলিতে, এক মায়াবী বিষাদে ঘেরা রাতে ফারহানের সেই বন্য চুম্বনে লুসিয়ার নেশার ঘোর যেন এক নিমেষে কয়েক গুণ বেড়ে গেল। পৃথিবীর সব কোলাহল ম্লান হয়ে এল, আর ফারহান যেন এই একটি চুম্বনের মাধ্যমেই লুসিয়ার ওপর নিজের অধিকারের চূড়ান্ত সিলমোহর এঁকে দিল।

মেক্সিকোর সেই নির্জন গলির অন্ধকার যেন হঠাৎ তপ্ত হয়ে উঠল। লুসিয়ার রক্তে মিশে থাকা সেই মাদক আর ফারহানের অবাধ্য চুম্বনের স্পর্শ—এই দুই মিলে লুসিয়াকে এক অদম্য উন্মাদনার শিখরে পৌঁছে দিল। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফারহানের ঘাড়ের পেছনের চুলগুলো নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল। তার প্রতিটি নিশ্বাসে তখন কেবল ফারহানকে পাওয়ার তীব্র হাহাকার। সে যেন আজীবন এই মুহূর্তটার জন্যই প্রতীক্ষা করছিল; ফারহানকে আরও কাছে টেনে নিয়ে সে এক প্রখর, দহনকারী চুম্বনে লিপ্ত হলো।

ফারহান অনুভব করল লুসিয়ার শরীরটা কাঁপছে। সে বুঝতে পারল ড্রাগসের প্রতিক্রিয়ায় লুসিয়া এখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। ওর এই উন্মাদনা এখন আর স্বাভাবিক নেই। ফারহান অত্যন্ত কষ্টে নিজেকে সংযত করল এবং আলতো করে লুসিয়াকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল।

লুসিয়া তখনো হাপাচ্ছে, ওর চোখের মণি দুটো ঘোরের মধ্যে এদিক-ওদিক দুলছে। ফারহান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। মেক্সিকোর এই কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর লুসিয়ার এই বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে সে নিজের গায়ের কালো লেদারের জ্যাকেটটা খুলে ওর গায়ে জড়িয়ে দিল। চেইনটা একদম ওপর পর্যন্ত টেনে দিতে দিতে ফারহান গম্ভীর গলায় বলল, “অনেক হয়েছে লুসিয়া। এবার চলো এখান থেকে।”

লুসিয়া টলতে টলতে দেয়ালে হেলান দিয়ে আধো-অস্পষ্ট স্বরে বলল, “কোথায় যাব? আমার বাড়িতে? না… আমি ওখানে যাব না। ড্যাড আমাকে এই অবস্থায় দেখলে মেরে ফেলবে।”

ফারহান ওর চোখে চোখ রেখে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “আমার ফ্ল্যাটে চলো। আজ রাতটা ওখানেই থাকবে।”

কথাটা শুনে লুসিয়ার ঠোঁটে এক ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ফারহান নিজের হেভিওয়েট বাইকটা স্টার্ট দিয়ে সিটে বসলো। লুসিয়া কোনোমতে পা টেনে টেনে বাইকের পেছনে গিয়ে বসল। ফারহান পেছন ফিরে ওর দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় নির্দেশ দিল, “আমাকে শক্ত করে ধরে বসো লুসিয়া। পড়ে গেলে কিন্তু হাড়গোড় আস্ত থাকবে না।”

লুসিয়া এবার কোনো জেদ করল না। সে দুই হাত দিয়ে ফারহানের কোমর জড়িয়ে ধরল এবং নিজের তপ্ত কপালটা ফারহানের চওড়া পিঠে ঠেকিয়ে দিল। ইঞ্জিনের গর্জন তুলে বাইকটা যখন হাইওয়ের বুক চিরে ছুটতে শুরু করল, লুসিয়া তখন ফারহানের পিঠের সেই চেনা ঘ্রাণে নিজেকে সঁপে দিল।
রাতের নিওন আলোয় দ্রুতগতিতে ছুটে চলা এই যুগলকে দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোনো এক মায়াবী বিষাদের শহর থেকে চিরতরে পালিয়ে যাচ্ছে।

চলবে…………..

(১০০ রিয়েক্ট বাকি ছিলো আগের পর্বে তবুও দিয়েছি এতোদিন ২ দিনের মধ্যে ৩ হাজার করে ফেলতেন আপনারা আর আমিতো সেই কথামতোই গল্প দিতাম এবার তাড়াতাড়ি ৩ হাজার রিয়েক্ট কমপ্লিট করবেন তাহলেই গল্প পাবেন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply