ডিজায়ার_আনলিশড
✍️ #সাবিলা_সাবি
পর্ব-২৬
সমুদ্রের অতল গভীরে বিশাল সাবমেরিনটি যখন পানির প্রচণ্ড চাপ ঠেলে এক ভারী যান্ত্রিক গুঞ্জন তুলে এগোচ্ছিল, তান্বীর মনে হচ্ছিল সে কোনো অনন্ত অন্ধকারের দিকে যাত্রা করছে। সাবমেরিনের ভেতরের নিস্তব্ধতা তার বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার মতো বাজছে। দীর্ঘ এক পথ পরিক্রমার পর, হঠাৎ সেই ধাতব যানটি গতি কমিয়ে এক রহস্যময় আন্ডারগ্রাউন্ড ডকিং স্টেশনে এসে ভিড়ল।
এটি কোনো সাধারণ বন্দর নয়; এটি একটি বিশাল প্রাগৈতিহাসিক পাথুরে গুহা, যা অত্যাধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছোঁয়ায় এক নিশ্ছিদ্র দুর্গে পরিণত হয়েছে। সাবমেরিনের হ্যাচ দরজাটি যখন হাইড্রোলিক প্রেসারের হিস হিস শব্দ তুলে খুলে গেল, লোনা বাতাসের সাথে এক অদ্ভুত শীতলতা তান্বীর শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ভ্যালেরিয়া তান্বীর বরফশীতল হাতটা শক্ত করে ধরে তাকে বাইরে নিয়ে এল। সামনে তাকাতেই তান্বীর চোখ ছানাবড়া! সমুদ্রের গর্ভে এমন এক আধুনিক স্থাপত্য থাকতে পারে, তা তার কল্পনারও অতীত। চারপাশটা কৃত্রিম নীল আলোয় উদ্ভাসিত। পাথুরে দেয়ালগুলো এমনভাবে পালিশ করা যে আয়নার মতো ঝকঝক করছে। দেয়ালের প্রতিটি ভাঁজে অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা আর লেজার সেন্সরগুলোর লাল বিন্দুগুলো শিকারি চোখের মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে আছে। ওপরের সুউচ্চ ছাদ থেকে বিশাল ঝাড়বাতিগুলো ঝুলছে, যা দেখে মনে হয় কোনো গোপন পাহাড়ের গভীরে লুকিয়ে আছে এক আকাশছোঁয়া অরণ্যপ্রাসাদ।
তান্বী ফিসফিস করে, গলা শুকিয়ে কাঠ অবস্থায় বললো “আপা,আমরা কোথায় এসেছি?ওই ঝড়তুফান কি আমাদের খুঁজে পাবে না?আর এই জায়গাটা কেমন যেন গা ছমছমে!”
ভ্যালেরিয়া তার চুলে হাত বুলিয়ে অভয় দিয়ে বলল— “নিশ্চিন্ত থাক তান্বী। এই আস্তানার হদিস পৃথিবীর কোনো স্যাটেলাইটেও নেই। এখানে ঢোকার অনুমতি মেইলস্ট্রোমের নিজেরও নেই। এটা পৃথিবীর অন্যতম সুরক্ষিত আস্তানা, যেখানে মৃত্যুর পরোয়ানা ছাড়া বাতাসও ঢুকতে ভয় পায়।”
প্রাসাদের মূল হলরুমে প্রবেশ করতেই তান্বী থমকে গেল। মেঝেতে দামী পার্সিয়ান কার্পেট পাতা, দেয়ালে ঝুলছে দুর্মূল্য সব তৈলচিত্র। কিন্তু সেসব ছাপিয়ে হলরুমের মাঝখানে বসানো একটি ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের রাজকীয় সোফায় বসে থাকা নারীর দিকে তার নজর আটকে গেল।
পঞ্চাশের কোঠায় বয়স হলেও সেই নারীর চেহারায় সময়ের কোনো ছাপ পড়েনি। বরং আভিজাত্য আর ক্ষমতার এক তীব্র তেজ তার চোখমুখে ঠিকরে পড়ছে। পরনে নিকষ কালো সিল্কের এক দীর্ঘ গাউন যা মেঝের কার্পেট ছুঁয়ে আছে। বাম হাতে একটি দামি সিগার থেকে ধোঁয়া পাকিয়ে ওপরে উঠছে। তার ঠোঁটের গাঢ় লাল লিপস্টিক আর চোখের তীক্ষ্ণ চাউনি যে কোনো সাধারণ মানুষের মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিতে পারে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি কোনো রূপকথার সম্রাজ্ঞী।
তান্বী বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো “আপা, উনি কে? উনাকে তো আগে কখনো দেখিনি। উনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
ভ্যালেরিয়া দ্রুত মাথা নিচু করে সেই নারীর প্রতি গভীর সম্মান প্রদর্শন করল। তান্বীর কানে যেন বজ্রপাতের মতো বাজল ভ্যালেরিয়ার পরবর্তী শব্দগুলো।
“উনি হচ্ছেন মেক্সিকোর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সেই কিংবদন্তি, যাঁকে সবাই ‘মাফিয়া কুইন’ বলে চেনে। আর ওনার সবচেয়ে বড় পরিচয়—উনি মেইলস্ট্রোমের জন্মদাত্রী মা,আর আমার একমাত্র আপন খালা ইসাবেলা মোরেলাস।”
‘মেইলস্ট্রোমের মা’ কথাটা তান্বীর কানে বিষাক্ত তীরের মতো বিঁধল। তার মনে হলো মাথার ওপরের ওই বিশাল ঝাড়বাতিটা যেন এখনই খসে পড়বে। যে দানবের হাত থেকে বাঁচার জন্য সে নিজের জীবন বাজি রেখে উত্তাল সাগরে ঝাঁপ দিল, ভবিতব্য কি তাকে শেষ পর্যন্ত সেই দানবেরই গুহায় ফিরিয়ে নিয়ে এল?
তান্বী আতঙ্কে তোতলাতে শুরু করে জিজ্ঞেস করলো “উ… উনি ঝড়তুফানের মা? তাহলে আমাকে এখানে কেন আনলেন আপা? আপনি কি শেষ পর্যন্ত আমাকে ওদের হাতেই তুলে দিলেন?”
তান্বী হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ভ্যালেরিয়ার পেছনে গিয়ে লুকাল। তার ছোট শরীরটা পাতায় ঢাকা পাখির মতো থরথর করে কাঁপছে। ইসাবেলা ধীরপায়ে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার হিল জুতো থেকে নির্গত হওয়া সেই ছন্দময় খট খট শব্দটা পুরো হলরুমে এক ভয়াবহ নিস্তব্ধতা তৈরি করে এগিয়ে আসছে তান্বীর দিকে।
ইসাবেলা তান্বীর একদম সামনে এসে থামলেন। সিগারের ধোঁয়াটুকু বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে তিনি এক মুহূর্ত তান্বীর ভীত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর তার কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য আর হিমশীতলতা নিয়ে বললেন—”এই তবে সেই মেয়? যার জন্য জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী পুরো পৃথিবীকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে পারে? যার এক ফোঁটা চোখের জল মোছাতে জাভিয়ান নিজের সাম্রাজ্য বাজি রাখতেও দ্বিধা করে না?”
তান্বী চোখ বন্ধ করে ভ্যালেরিয়ার পোশাকটা শক্ত করে জাপ্টে ধরল। ইসাবেলা এবার তান্বীর চিবুকটা নিজের ঠান্ডা আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে মৃদু উঁচিয়ে ধরলেন। তাঁর গম্ভীর গলায় এক অদ্ভুত শীতলতা নিয়ে বললেন—”চোখ খোলো মেয়ে, আমাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মেইলস্ট্রোম আমার রক্ত, আমার কলিজা। সারা পৃথিবীর কাছে ও এক অভিশাপ হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে ও কেবলই আমার সন্তান। আর ও আমাকে কতটা ভালোবাসে আর সম্মান করে, তা হয়তো তোমার ধারণারও বাইরে।”
তান্বী বিস্ময় নিয়ে ভ্যালেরিয়ার আড়াল থেকে উঁকি দিল। ইসাবেলার চোখে মেইলস্ট্রোমের জন্য এক অদ্ভুত মমতা খেলা করছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন—”মেইলস্ট্রোম যা করেছে, তা ওর জেদ। কিন্তু এমিলির সাথে আমার সম্পর্কের সমীকরণটা ভিন্ন। ওর প্রতি আমার একটা আলাদা দায়বদ্ধতা আছে। আর ওর আমানত আজ আমার কাছে। আজ থেকে তুমি আমার মেহমান। মনে রাখবে, ইসাবেলা মোরেলাসের আশ্রয়ে থাকা মানেই তুমি এক অদৃশ্য কবচের ভেতরে আছ। মেইলস্ট্রোমও আমার এই সীমা অতিক্রম করার সাহস করবে না।”
তান্বী বুঝতে পারল, এই দুর্ভেদ্য দুর্গের ভেতরে সে কেবল বন্দি নয়, বরং জাভিয়ানের প্রতি ইসাবেলার দায়বদ্ধতা এক জীবন্ত দলিল হিসেবে রক্ষিত হতে যাচ্ছে।
.
.
.
ইসাবেলা তান্বীর থরথর করে কাঁপতে থাকা ভীত শরীরের দিকে একপলক তাকালেন। তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তখন এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা, কিন্তু সেখানে আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি নেই। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারিকার দিকে ফিরে ছোট একটি ইশারা করলেন।
“ওদের গেস্ট রুমে নিয়ে যাও। নোনা জল শরীরে বসে গেলে জ্বর আসবে। আগে ফ্রেশ হয়ে নাও তোমরা, কথা পরে হবে।” ইসাবেলার কণ্ঠস্বরে এমন এক ধরনের শাসন মিশ্রিত আভিজাত্য ছিল যে তান্বী আর টু শব্দটি করার সাহস পেল না। পরিচারিকার পিছু পিছু তারা ওপরতলার একটি বিলাসবহুল কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল। বিশাল সেই ঘরটি মেক্সিকান ঐতিহ্যে সাজানো; মেহগনি কাঠের আসবাব আর দেওয়ালে সূক্ষ্ম কারুকাজ এক রাজকীয় আবহ তৈরি করেছে।
তান্বী তখনো শীতে কাঁপছিল। ভ্যালেরিয়া সময় নষ্ট না করে দেয়াল আলমারিটা টেনে খুলে ধরল। আলমারি খুলতেই তান্বীর চোখ জোড়া বিস্ময়ে কপালে উঠল। সেখানে সারিবদ্ধভাবে ঝুলছে দামী সিল্কের গাউন, মিনি স্কার্ট, করসেট আর ডেনিমের সব চোখধাঁধানো পাশ্চাত্য পোশাক। একটা শাড়ি বা সাধারণ সালোয়ার-কামিজ তো দূরের কথা, সেখানে কোনো ঢিলেঢালা সাধারণ পোশাকের চিহ্নমাত্র নেই। প্রতিটি পোশাকই অত্যন্ত আধুনিক এবং মেক্সিকান উচ্চবিত্ত রুচির পরিচায়ক।
তান্বী আতঙ্কিত গলায় বললো “আপা! এগুলো কী? এই আলমারিতে একটাও সাধারণ কাপড় নেই কেন? আমি… আমি এসব ছোট বা খোলামেলা ড্রেস কীভাবে পরব?” তান্বীর অস্বস্তি দেখে মনে হচ্ছিল সে মেইলস্ট্রোমের ভয়ের চেয়েও এই পোশাকগুলোর কথা ভেবে বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছে। সে সারা জীবন যে পরিবেশে বড় হয়েছে, সেখানে এমন পোশাক কল্পনা করাও পাপ।
ভ্যালেরিয়া একটা ডার্ক মেরুন রঙের স্লিভলেস ড্রেস তান্বীর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো “বোকা মেয়ে, এখন ড্রেস দেখার সময় নয়। আমরা এখন মেক্সিকোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাফিয়া কুইনের দুর্গে আছি। এই দ্বীপের আবহাওয়া আর এই প্রাসাদের পরিবেশ অনুযায়ী এগুলোই এখানে স্বাভাবিক। তাছাড়া, আমরা এখানে অতিথি, অভিযোগ করার সুযোগ নেই।”
তান্বী দৃঢ়ভাবে মাথা নেড়ে বললো “না আপু, আমি পারব না। এসব পরলে জাভিয়ান যদি হঠাৎ চলে আসে? ও আমাকে দেখলে কী ভাববে?”
ভ্যালেরিয়া এবার কিছুটা গম্ভীর হলো। সে তান্বীর কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল “তান্বী, আমাদের কাছে এখন আর কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। আপাতত আমরা এইখান বাইরে বের হতে পারব না যতক্ষণ না পরিস্থিতি জাভিয়ানের নিয়ন্ত্রণে আসছে। আর এখানে থাকতে হলে ইসাবেলার দেওয়া নিয়ম আর আভিজাত্যই তোকে মানতে হবে। নিজেকে পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়াও এক ধরনের লড়াই। এখন এই ভিজে কাপড় ছেড়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে।”
তান্বী আর তর্ক করার শক্তি পেল না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও সে একটি গাউন হাতে নিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। জানালার বাইরে অসীম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল— এই ছোট এক জীবনে কত বড় কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছি আমি?”
.
.
.
.
তান্বী যখন কাঁপাকাঁপা হাতে একটি গাউন নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল, ভ্যালেরিয়া তখন জানালার ভারী পর্দা টেনে বাইরের গহীন অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে, এই দুর্গের হদিস মেইলস্ট্রোম কেন, পৃথিবীর কোনো রাডারও সহজে পাবে না। ইসাবেলা মোরেলাস সবসময় তাঁর ছেলের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকেন—বুদ্ধিতে এবং কৌশলে।
নিচে ড্রয়িংরুমে ইসাবেলা তখন একান্তে বসে তাঁর হাতে থাকা দামী সিগারের ধোঁয়া বাতাসে ছড়াচ্ছিলেন। তাঁর সামনে রাখা একটি প্রাচীন ডায়েরি, যার পাতাগুলো সময়ের আবর্তে কিছুটা বিবর্ণ। মেইলস্ট্রোম তাঁর নিজের সন্তান, আর কোনো মা-ই চান না তাঁর সন্তান ধ্বংস হোক। কিন্তু ইসাবেলা জানেন, মেইলস্ট্রোম জাভিয়ানের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তান্বীকে কেড়ে নিয়ে আসলে নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় নিজেই সই করে ফেলেছে। জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী শান্ত থাকলে কম বিপদজ্জনক, কিন্তু ক্ষিপ্ত হলে সে এক সাক্ষাৎ আজরাইল—যার তান্ডব ঠেকানোর ক্ষমতা কারো নেই।এটা সে বর্তমানে বুঝতে পেরেছে।
পরিচারিকা এসে দাঁড়াতেই ইসাবেলা শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “মেয়েটি তৈরি?”
“জ্বি ম্যাম, ওরা ফ্রেশ হচ্ছে।”
ইসাবেলা মনে মনে ভাবলেন— ‘মেইলস্ট্রোম, তুই বড্ড বেশি ভুল করে ফেলেছিস। জাভিয়ানের স্ত্রীর ওপর হাত দিয়ে তুই শুধু নিজের শত্রু বাড়াসনি, তুই ওই দানবটাকে জাগিয়ে দিয়েছিস যাকে আমি তিলে তিলে শান্ত রেখেছিলাম।’
জাভিয়ানের প্রতি ইসাবেলার এই সহমর্মিতার পেছনে শুধু ন্যায়-অন্যায় নয়, বরং এক গভীর ও রহস্যময় দায়বদ্ধতা।
একটু পরেই সিঁড়ি দিয়ে তান্বী নিচে নেমে এল। পরনে একটি ডার্ক মেরুন রঙের ওয়েস্টার্ন সিল্ক গাউন, ভিজে লম্বা চুলগুলো পিঠের ওপর অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে আছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক বিপন্ন রাজকুমারী, যে ভুল করে এক অন্ধকার প্রাসাদে এসে পড়েছে। ইসাবেলা তীক্ষ্ণ ও বিচারক দৃষ্টিতে তান্বীর দিকে তাকালেন।
তান্বী মাথা নিচু করে নিজের অস্বস্তি লুকানোর চেষ্টা করছিল। ইসাবেলা ধীরপায়ে এগিয়ে এসে তান্বীর চিবুক আলতো করে ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরলেন। “পোশাকটা তোমাকে মানিয়েছে, লিটল গার্ল। মানছি তুমি এসব পরে অভ্যস্ত নও, কিন্তু পরিস্থিতি যখন যুদ্ধের হয়, তখন পোশাক নয়—মনটাকে শক্ত করতে হয়। মনে রেখো, মেক্সিকোর এই রুক্ষ মাটিতে টিকে থাকতে হলে আগে নিজের ভয়কে জয় করতে হবে।”
তান্বী খুব নিচু স্বরে বললো “ম্যাম… আপনি ওই ঝড়তুফানের মা হয়েও আমাদের কেন সাহায্য করছেন? ও তো আপনার নিজের সন্তান। আপনি কি চাইলেই পারতেন না আমাকে ওর হাতে ফিরিয়ে দিতে?”
ইসাবেলার ঠোঁটের কোণে এক বিষণ্ণ অথচ রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল। “কারণ আমি ওকে ভালোবাসি বলেই চাই না ও জাভিয়ানের হাতে শেষ হোক। তোমাকে রক্ষা করা মানেই জাভিয়ানকে শান্ত রাখা। আর তাছাড়া… জাভিয়ানের কাছে আমার এক জীবনের ঋণ আছে যা তুমি বুঝবে না। মেইলস্ট্রোম যা শুরু করেছে, তার শেষটা আমি ওর রক্ত দিয়ে হতে দিতে চাই না। অন্তত জাভিয়ানের স্ত্রীকে তার কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে দিয়ে যদি এই আসন্ন ধ্বংসলীলা থামানো যায়, তবেই একজন মা হিসেবে আমার জয় হবে।”
তান্বী অবাক হয়ে দেখল, একজন ভয়ংকর মাফিয়া কুইনের শক্ত আবরণের ভেতরেও এক কৃতজ্ঞ নারী আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত এক মা লুকিয়ে আছে।
.
.
.
রাতের এক নিস্তব্ধ হাহাকার তখন সেই বিশাল সমুদ্রবেষ্টিত প্রাসাদের প্রতিটি কোণে বিষণ্ণতার মতো জেঁকে বসেছে। বাইরে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন পাথুরে দেয়ালে আছড়ে পড়ে এক গম্ভীর প্রতিধ্বনি তৈরি করছে। তান্বী জানালার ভারী পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে দূরের অন্ধকার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পরনের সেই আধুনিক মেরুন রঙের ওয়েস্টার্ন পোশাকটা তাকে এখনো এক অদ্ভুত অস্বস্তি দিচ্ছে, কিন্তু মনের ভেতরের অস্থিরতা আর হাহাকার সেই অস্বস্তির চেয়েও অনেক বেশি তীব্র।
ভ্যালেরিয়া সোফায় বসে একটি পুরনো ম্যাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। হঠাৎ তান্বীর ভাঙা গলার প্রশ্নে সে স্থির হয়ে মাথা তুলল। তান্বী খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করলো চোখের কোণে জল চিকচিক করছে “আপা… আমরা কি এখানে এভাবেই ছায়ার মতো আটকে থাকব? কতদিন আর ঝড়তুফানের মায়ের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হবে? আমি কি জাভিয়ানকে আর কোনোদিন ছোঁয়ার সুযোগ পাব না?”
ভ্যালেরিয়া ম্যাপটা সরিয়ে রেখে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল। সে তান্বীর কাছে গিয়ে তার কাঁপতে থাকা কাঁধে আশ্বাসের হাত রাখল। তান্বীর শরীরটা এখনো মাঝেমধ্যে কোনো অজানা ভয়ে শিউরে উঠছে।
ভ্যালেরিয়া তখন বললো “একটু ধৈর্য ধর তান্বী। তুই এখন যার ছায়াতলে আছিস, সে মেইলস্ট্রোমের মা হতে পারে, কিন্তু এই অপরাধ জগতের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ও সে-ই এখন। জাভিয়ান এখন পুরো মেক্সিকো আর এই অতল সমুদ্র তন্নতন্ন করে খুঁজছে। ও কল্পনাও করতে পারছে না যে তুই ওর চোখের খুব কাছেই আছিস, কিন্তু অন্য এক দুর্ভেদ্য দুর্গে।”
তান্বী বুকচাপা কান্না নিয়ে বললো “কিন্তু ও তো ভাবছে আমি ঝড়তুফানের পাষবিকতায় বন্দি। ও যদি ভুল করে নিজের জীবনটা বিপন্ন করে ফেলে? আপা, আমার খুব ভয় হচ্ছে। আমি শুধু একবার ওর গলার সেই গম্ভীর আওয়াজ শুনতে চাই।”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর ভেজা চোখ দুটো মুছে দিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল—”শোন তান্বী, জাভিয়ানকে এখন জানানো মানেই মেইলস্ট্রোমকে সিগন্যাল দিয়ে দেওয়া। জাভিয়ান যখনই কোনো বড় পদক্ষেপ নেবে, মেইলস্ট্রোম বুঝে যাবে তুই কোথায় লুকিয়ে আছিস। ইসাবেলা মোরেলাস সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছেন। তুই বিশ্বাস রাখ, জাভিয়ান ঠিক তোকে খুঁজে বের করবে। আর যখন ফিরবি, তখন আর পলাতক হিসেবে নয়, মেইলস্ট্রোমের সাম্রাজ্যের পতন দেখে তবেই ফিরবি।”
তান্বী জানালার কাঁচের ওপর তপ্ত কপাল ঠেকালো। তার মনে হলো রাতের নোনা বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় জাভিয়ানের সেই চিরচেনা পারফিউমের মাদকতাময় ঘ্রাণ মিশে আছে। সে দুচোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে লাগল— “জাভিয়ান, আমি জানি তুমি আসছ। এবার শুধু আমার ভয় নয়, আমাদের দুজনের মাঝখানের এই অদৃশ্য দেওয়ালগুলোকেও তুমি গুঁড়িয়ে দেবে। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকলাম।”
ভ্যালেরিয়া তান্বীকে সান্ত্বনা দিতে লাগল ঠিকই কিন্তু জানালার বাইরে আছড়ে পড়া উত্তাল ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে ভ্যালেরিয়ার নিজের চোখও আজ সিক্ত হয়ে উঠল। সে জানত না, এই রক্তাক্ত যুদ্ধের শেষ গন্তব্য কোথায়।
.
.
.
মাঝরাতের অস্থির দীর্ঘশ্বাসের পর ভোরের স্নিগ্ধতায় যখন কেবল চরাচর শান্ত হতে শুরু করেছে, তখন তান্বীর চোখের পাতায় এক চিলতে তন্দ্রা নেমে এসেছিল। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক গলে ভোরের কাঁচা রোদ তখন রুপোলি রেখার মতো গেস্ট রুমের দামী কার্পেটে আলপনা আঁকছে। তান্বী অঘোরে ঘুমাচ্ছিল, কিন্তু ঘুমের সেই পাতলা আস্তরণ ভেদ করেই এক তীব্র পরিচিত ঘ্রাণ তার স্নায়ুতে ধাক্কা দিল। সেই দামী তামাক আর মূল্যবান আগাডউড (Oud) এবং বিরল ব্ল্যাক মাস্কের এক গূঢ় সংমিশ্রণ, যার সাথে মিশে আছে রোদ পোড়া বালির আদিম ঘ্রাণ আর হিমালয়ের উচ্চতায় জন্মানো নীল জেসমিনের এক অতি সূক্ষ্ম মাদকতা মিশ্রিত তীক্ষ্ণ পুরুষালি সুবাস—যা কেবল একজনের অস্তিত্বেরই জানান দেয়।
চোখ মেলেই তান্বীর হৃৎপিণ্ড যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। বিছানার পাশে নিচু হয়ে বসে একজন মানুষ তার দিকে এক পলকে তাকিয়ে আছে। সেই বিধ্বস্ত সল্প দাড়ি ভরা মুখ নেই, নেই চোখের নিচে জমে থাকা সেই কালচে অবসাদের ছায়া। জাভিয়ানকে আজ ঠিক সেই আগের মতো দুর্ধর্ষ, রাজকীয় আর অসম্ভব সুদর্শন লাগছে। চুলে নিখুঁত নতুন কাট, ক্লিন শেভ করা ফর্সা ধারালো চোয়াল আর চোখে এক সমুদ্র গভীর প্রশান্তি।
আসলে কাল রাতে যখন ইসাবেলার গোপন বার্তা জাভিয়ানের কাছে পৌঁছেছিল যে তান্বী নিরাপদে তার আস্তানায় আছে। জাভিয়ান উন্মাদের মতো তখনই ছুটে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে সে হঠাত করেই গাড়ি থামিয়ে দেয়। রায়হান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল— “কী হলো স্যার?গাড়ি থামালেন কেন?” জাভিয়ান তখন গাড়ির আয়নায় নিজের জীর্ণ চেহারার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত ম্লান হেসে বলেছিল— “আগে স্যালুনে চলো রায়হান। আমার জিন্নীয়া আমায় এভাবে দেখলে ভয় পাবে। ওর কাছে ফেরার সময় আমাকে ওর সেই পুরনো স্ট্রং আর পরিপাটি পারফেক্ট জাভিয়ান হয়েই ফিরতে হবে। আমি চাই না আমার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে ও কষ্ট পাক।”
তান্বী পলকহীন তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো সে কি কোনো স্বপ্ন দেখছে? তান্বী অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বললো “আপনি… আপনি সত্যিই এসেছেন? নাকি আমি কোনো ঘোরের মধ্যে আছি?”
জাভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো যেন তান্বীর মুখাবয়বের প্রতিটা রেখায় নিজের অধিকার খুঁজে ফিরছে। তান্বী সচকিত হয়ে উঠতে গিয়েই হঠাৎ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো থমকে গেল। তার মনে পড়ল, তার পরনে আজ সেই মেক্সিকান স্টাইলের স্লিভলেস গাউন, যার সরু ফিতেগুলো তার ফর্সা কাঁধের ওপর দিয়ে কেবল সুতোর মতো বয়ে গেছে। এমন পোশাকে সে কোনোদিনও জাভিয়ানের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করেনি। লজ্জায় আর এক নামহীন অস্বস্তিতে সে তড়িঘড়ি করে গায়ের ওপর থাকা পাতলা কম্বলটা দিয়ে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়িয়ে নিল।
জাভিয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল। সে তান্বীর সেই চিরচেনা লাজুক অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে নিজের হাত বাড়িয়ে দিল। সে চেয়েছিল কম্বলটা সরিয়ে দিয়ে তান্বীকে এক নিবিড় আলিঙ্গনে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিতে।
জাভিয়ান তখন মৃদু স্বরে বললো “জিন্নীয়া, ওঠো। অনেক হয়েছে লুকোচুরি। এবার আমার বুকের পাঁজরে মিশে যাওয়ার পালা…” বলেই জাভিয়ান যেই না আলতো করে কম্বলটা সরাতে গেল, তান্বী হঠাৎ এক ছোটখাটো আর্তনাদ করে উঠল। সে আরও বেশি গুটিয়ে গিয়ে বিছানার একদম শেষ কোণে সরে গেল এবং দুহাতে কম্বলটা বুকের সাথে পাথরের মতো শক্ত করে চেপে ধরল। তার ডাগর চোখ দুটো তখন অজানা আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেছে।
মুহূর্তের মধ্যে জাভিয়ানের সেই ফর্সা সুদর্শন মুখটা বরফের মতো শীতল আর ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চোখের সেই প্রশান্তি নিমেষেই হারিয়ে গিয়ে সেখানে এক হিংস্র দাবানল জ্বলে উঠল। তার মনে হলো, তান্বী হয়তো কোনো নিদারুণ যন্ত্রণার ক্ষত ঢেকে রাখছে। মেইলস্ট্রোম কি তবে তার আমানতের পবিত্রতায় কলঙ্ক লেপন করেছে?
জাভিয়ান চাপা গর্জনে, কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বললো “কী হয়েছে তান্বী? এভাবে নিজেকে কেন লুকাচ্ছ আমার থেকে? ওই জানোয়ারটা কি… ও কি তোমার গায়ে হাত তুলেছে? কোনো আঘাত কি তুমি আমার থেকে গোপন করছ? সত্যি বলো!”
জাভিয়ানের কণ্ঠস্বরে তখন প্রলয়ঙ্করী ক্রোধ আর হৃদয়ের গভীর হাহাকার এক হয়ে আছড়ে পড়ছে। তার চোখের দৃষ্টিতে ফুটে উঠেছে এক উন্মত্ত প্রতিহিংসার লেলিহান শিখা, সে এখনই পুরো পৃথিবীকে ছাই করে দিতে পারে। তার প্রতিটি শব্দে মিশে আছে হারানোর তীব্র আতঙ্ক আর প্রিয়তমাকে রক্তাক্ত দেখার আশঙ্কায় এক রণংদেহী আতঙ্ক। সে ভাবল, তান্বী হয়তো শরীরের কোনো নীল হয়ে যাওয়া কালচে দাগ বা মেইলস্ট্রোমের পাশবিকতার চিহ্ন আড়াল করতে চাইছে। রাগে আর ক্ষোভে জাভিয়ানের নিশ্বাসের গতি প্রলয়ঙ্করী হয়ে উঠল।
তান্বী দ্রুত মাথা নাড়িয়ে, কান্নারত গলায় বললো “না! না জাভিয়ান, ওসব কিছু না। ওই ঝড়তুফান লোকটা… ও আমার গায়ে হাত দেয়নি। ও আমাকে স্পর্শ করেনি!”
জাভিয়ান তখন মৃদু স্বরে বললো “তবে? তবে কেন এভাবে পিছিয়ে যাচ্ছ? কেন আমাকে সরিয়ে দিচ্ছ? কেন আমাকে ছুতে দিচ্ছ না তোমাকে?”
তান্বী লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে মাথাটা একদম নিচু করে ফেলল। তার ফর্সা মুখটা তখন বিকেলের গোধূলির মতো আগুনের লাল আভায় ছেয়ে গেছে। সে নিজের চিবুকটা বুকের মাঝে গুঁজতে গুঁজতে অস্ফুট স্বরে বলল— “এই কাপড়গুলো… এগুলো খুব অদ্ভুত জাভিয়ান। আমি… আমি আপনার সামনে আসতে পারছি না।”
ভোরের প্রথম আলো তখন মেক্সিকোর রুক্ষ পাথুরে উপকূল আর সমুদ্রের নোনা জলে এক আশ্চর্য নীল আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সেই আবছা আলোর রেখা যখন ইসাবেলার দুর্গের বিশাল জানালার কাঁচ ভেদ করে গেস্ট রুমের কার্পেটে আছড়ে পড়ল, জাভিয়ানের চোখে তখন কোনো সংশয় নেই। সেখানে দানা বেঁধেছে এক অমোঘ অধিকারবোধ আর ঘোরের এক মায়াবী আবেশ।
সে দুই হাত পকেটে রেখে বিছানার ঠিক পাশেই এক রাজকীয় গাম্ভীর্য আর স্থিরতা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তান্বীর এই সলাজ জড়তা তাকে যেমন এক বিচিত্র প্রশান্তি দিচ্ছে, তেমনি তার অবাধ্য মনটাকে তলে তলে দিচ্ছে উস্কানি। জাভিয়ান একটু নিচু হয়ে তান্বীর কানের লতির খুব কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তার কণ্ঠে এক গম্ভীর অথচ শাসনমাখা সুর, যা কেবল ভালোবাসার মানুষটির জন্যই সংরক্ষিত।
“বিছানা থেকে নামো তান্বী। স্বেচ্ছায় নামবে নাকি আমি অন্য কোনো ‘উপায়’ ব্যবহার করে তোমাকে নামাবো? মনে রেখো, আমার কাছে দ্বিতীয় পথটা অনেক বেশি আকর্ষণীয়।”
তান্বী জানে, জাভিয়ান চৌধুরী যখন কোনো কথা এভাবে বলে, তখন তার প্রতিটি বর্ণে এক অলঙ্ঘনীয় আদেশ লুকিয়ে থাকে। এক তীব্র আড়ষ্টতায় সে তার কাঁপাকাঁপা হাতের মুঠো থেকে কম্বলটা আলগা করে দিল। গুটিগুটি পায়ে বিছানা থেকে নেমে যখন সে দাঁড়াল, তখন তার দৃষ্টি জাভিয়ানের ওই প্রখর চাক্ষুষ আবেদন সইতে পারল না। সে তড়িঘড়ি করে নিজের পিঠ ঘুরিয়ে জাভিয়ানের ঠিক উল্টো দিকে মুখ করে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিন্তু বেচারি তটস্থ মেয়েটি এটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে, এই মেক্সিকান সিল্কের গাউনটির সম্মুখভাগের চেয়ে পিছনেরদিকটা অনেক বেশি বিপজ্জনক। সামনের দিকটা ঢাকা থাকলেও পিঠের দিকটা প্রায় পুরোটাই ছিল অনাবৃত। কোমরের নিচ পর্যন্ত বিস্তৃত ঘন কালো চুলের ঢালটি প্রথমে পিঠ ঢেকে রাখলেও, ঠিক সেই মুহূর্তেই জানালার ফাঁক দিয়ে সমুদ্রের এক দমকা মাতাল হাওয়া ঘরের ভেতর আছড়ে পড়ল।
বাতাসের সেই তীব্র ঝাপটায় তান্বীর রেশমি চুলগুলো ডানা মেলে উড়ে গিয়ে দুই কাঁধে ছড়িয়ে পড়ল। আর অমনি আয়নার মতো স্বচ্ছ আর উন্মুক্ত হয়ে উঠল তার ধবধবে ফর্সা পিঠ। ভোরের সেই স্নিগ্ধ রোদে মনে হলো কোনো অমর শিল্পী একখণ্ড শ্বেতপাথর খোদাই করে এক জীবন্ত ভাস্কর্য নির্মাণ করে রেখেছেন।
জাভিয়ান নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখের কাঠিন্য মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উবে গেল, সেখানে ঠাঁই নিল এক আদিম তৃষ্ণা আর গভীর মুগ্ধতা। সে এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তান্বীর পিঠের ওই নিটোল ভাঁজ আর তার ওপর বাতাসের সেই বুনো খেলা জাভিয়ানের মস্তিষ্কে এক প্রলয়ংকরী ঝড় তুলে দিল। তার চোখ এখন আর কোনো ক্ষমতাশীল নয়; তার চোখজোড়া এখন এক তৃষ্ণার্থ প্রেমিকের, যে তার আজন্মের চাওয়াকে হাতের নাগালে পেয়েও ছুঁতে পারছে না। তার পা দুটো যেন অদৃশ্য কোনো সুতোর টানে তান্বীর দিকে এক কদম এগিয়ে গেল।
জাভিয়ান অত্যন্ত নিচু আর গাঢ় কণ্ঠে বললো “জিন্নীয়া…” নিজের এই জাভিয়ানের দেয়া নিকনেইমটা জাভিয়ানের কণ্ঠে এভাবে বেজে উঠতে শুনে তান্বীর মনে হলো কোনো নিষিদ্ধ সুরের মূর্ছনা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সে বুঝতে পারছিল পেছনে জাভিয়ানের স্তব্ধতা কতটা প্রগাঢ় আর ঘনীভূত। সে তার হাত দিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া চুলগুলো ঠিক করার চেষ্টা করতেই, জাভিয়ান তার আগেই বলিষ্ঠ এক হাত বাড়িয়ে তান্বীর নগ্ন কাঁধের ওপর নিজের শীতল অথচ শিহরণ জাগানো আঙুলগুলো রাখল।
তান্বী শিউরে উঠে সজোরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সেই স্পর্শে কোনো কর্কশতা ছিল না, ছিল কেবল এক দীর্ঘ বিরহের পর আপন সত্তাকে ফিরে পাওয়ার ব্যাকুলতা। জাভিয়ান আরও এক কদম এগিয়ে এল, তাদের শরীরের মাঝে এখন এক বিন্দু বাতাস চলাচলের জায়গাও নেই। জাভিয়ান তার মুখটা তান্বীর ঘাড়ের ভাঁজে নামিয়ে আনল। তার উত্তপ্ত নিশ্বাস যখন তান্বীর উন্মুক্ত পিঠে আছড়ে পড়ল, মেয়েটির সারা শরীরে যেন সহস্র ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে গেল।
জাভিয়ান তখন ফিসফিস করে বললো “তুমি হয়তো পিঠ ফিরিয়ে আছো জিন্নীয়া, কিন্তু তুমি এই মুহুর্তে বুঝতে পারছোনা—আমার নেশাটা এখন তোমার ওই মায়াবী মুখটার চেয়েও বেশি তোমার এই সর্বগ্রাসী উপস্থিতিতে? এই অনাবৃত পিঠে আমার নামের মোহর এঁকে দিতে যদি আজ সারা পৃথিবীও ধ্বংস হয়ে যায়, তাতেও আমার কোনো আক্ষেপ নেই।”
জাভিয়ান তার ওষ্ঠ দিয়ে তান্বীর কাঁধের ওপর এক দীর্ঘ, আবেগঘন ভালোবাসার ছাপ এঁকে দিল। তান্বীর হৃৎপিণ্ড তখন কোনো উন্মত্ত ড্রামের মতো ধুকপুক করছে, তার দুই পা কাঁপছে এক অজানা ভালোলাগায়। সে বুঝতে পারছিল সে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে জাভিয়ানের এই ভয়াবহ মায়ার কাছে। জাভিয়ান তার অন্য হাত দিয়ে তান্বীর কোমর জাপটে ধরে তাকে নিজের সুদৃঢ় শরীরের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে পিষে নিল।
জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস তখন তান্বীর ঘাড়ের কাছের রেশমি ছোট চুলগুলোকে অবাধ্য পরশের মতো দোলাচ্ছে। সেই উষ্ণতা তান্বীর শিরদাঁড়া বেয়ে এক নামহীন শিহরণের ফল্গুধারা নামিয়ে দিল। জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর এখন আর সেই পাথুরের মতো কঠোর নয়, বরং সেখানে মিশে আছে এক অদ্ভুত বিষণ্ণ হাহাকার—যেন এক নিঃস্ব সম্রাট তার হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার জন্য আর্তনাদ করছে।
জাভিয়ান অত্যন্ত নিবিড় আর গাঢ় কণ্ঠে বললো “তুমি আমাকে দেখেও কেন এভাবে মুখ ফিরিয়ে আছো জিন্নীয়া?“ আমি কি এতটাই পর হয়ে গেছি? নাকি মেইলস্ট্রোমের কাছ থেকে তোমাকে ছিনিয়ে আনতে গিয়ে আমি নিজেই তোমার কাছে এক অচেনা বিস্বাদে পরিণত হয়েছি?”
কথাটা শেষ করেই জাভিয়ান নিজের ওপর থেকে শেষ নিয়ন্ত্রণটুকু হারাল। দীর্ঘ বিরহের হাহাকার আর কাছে পাওয়ার আদিম তৃষ্ণা তাকে গ্রাস করে নিল। সে আরও একটু অবনত হয়ে তান্বীর সেই ধবধবে ফর্সা, মসৃণ আর অনাবৃত পিঠে নিজের ওষ্ঠাধর সমর্পণ করল। সে এক গভীর, স্পন্দিত এবং তৃষ্ণার্ত চুমু এঁকে দিলো যে চুমুতে মিশে ছিলো সহস্র রাতের বিচ্ছেদ-জ্বালা।
সেই স্পর্শে তান্বীর সারা শরীর এক লহমায় বজ্রাহতের মতো কেঁপে উঠল। সেই এক পলকেই সে বিদ্যুতবেগে টের পেল—তার গাউনের পেছনের দিকটা আসলে পুরোটাই উন্মুক্ত! লজ্জার এক তীব্র ঢেউ তার অস্তিত্বকে তছনছ করে দিল। সে বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে জাভিয়ানকে না থামালে তার হৃদয়ের সকল কপাট ভেঙে পড়বে। জাভিয়ানের এই নেশাতুর চোখ আর জাদুকরী স্পর্শ তাকে ভেতর থেকে বড্ড বেশি অসহায় করে দিচ্ছে।
তান্বী ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে তখন মিথ্যে রাগের এক প্রগাঢ় আবরণ আর গাল দুটো লজ্জায় গোধূলির রক্তিম আভার মতো লাল। সে জাভিয়ানের প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল—”খবরদার! একদম লিমিট ক্রস করার চেষ্টা করবেন না। আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না। আপনার চরিত্রে… আপনার চরিত্রে বিশাল সমস্যা আছে, জাভিয়ান চৌধুরী!”
জাভিয়ান হতভম্ব হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার চোখের মনিতে তখনো সেই আবেশের অবশিষ্টাংশ। সে বিড়বিড় করে অবাক কণ্ঠে বলল, “চরিত্রে সমস্যা মানে? আমার অপরাধটা কী?”
তান্বী তখন বললো “কেন? ভুলে গেলেন? আপনিই তো বলেছিলেন আপনার জীবনে আগে অনেক নারী ছিল, কতজনের সাথে আপনার কত ঘনিষ্ঠতা ছিল—সবই তো ঘটা করে শুনিয়েছিলেন! আপনি আসলে একটা লম্পট! আমি কোনো লম্পট মানুষের ছায়াও মাড়াতে চাই না, ব্যাস!”
বলেই তান্বী এক মুহূর্তের জন্য সেখানে স্থির থাকল না। জাভিয়ান বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার আগেই সে বিদ্যুতবেগে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। পাশের রুমে থাকা ভ্যালেরিয়ার দরজায় আছড়ে পড়ে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল।
জাভিয়ান এক নিস্পন্দ মূর্তির মতো সেই কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের কপালে হাত দিয়ে এক দীর্ঘ, তপ্ত শ্বাস ফেলল। গত কয়েকদিন যমের দুয়ারে কড়া নেড়ে, নিজের সব লণ্ডভণ্ড দশা ঝেড়ে ফেলে, বুকভরা তৃষ্ণা নিয়ে সে জিন্নীয়ার কাছে ফিরেছে—আর এই মেয়েটা তাকে ‘লম্পট’ আর ‘চরিত্রহীন’ অপবাদ দিয়ে দূরে ঠেলে দিল! অথচ সেই কথাগুলো সে কেবল তান্বীকে জেলাস করার জন্য একসময় সাজিয়ে বলেছিল।
জাভিয়ানের ফর্সা ধারালো মুখটা এবার অপমানে আর একগুঁয়েমিতে তামাটে হয়ে উঠল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, চোখের মনিতে জ্বলে উঠল এক নতুন জেদ। সে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে এক কঠিন প্রতিজ্ঞা করল। জাভিয়ান চাপা কিন্তু ইস্পাত-কঠিন স্বরে বললো “ঠিক আছে জিন্নীয়া। তুমি ভাবছো এই কাঠের দরজা জাভিয়ান চৌধুরীকে রুখতে পারবে? এত মরুভূমি পাড়ি দিয়ে তোমাকে ছিনিয়ে আনলাম, আর তুমি একবার জড়িয়ে ধরতে দিলে না? উল্টো দুর্নাম দিলে! এবার দেখো আমি কী করি। তোমাকে কোনো জোর করে নয়, বরং এমন এক মোহজালে জড়াবো যে তুমি নিজেই আমার বুকে আছড়ে পড়বে। এই অপমানের প্রতিশোধ আমি কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেব, জিন্নীয়া—তৈরি থেকো!”
জাভিয়ানের চোখে এখন আর কোনো বিষণ্ণতা নেই, সেখানে এখন এক ক্ষুধার্ত শিকারি বাঘের মতো লক্ষ্যভেদী তৃষ্ণা খেলা করছে। সে জানে, এই দুর্ভেদ্য মেক্সিকান দুর্গে তান্বীর এই পালানোর পথটা আসলে তাকে জয় করার নতুন এক রোমাঞ্চকর খেলা মাত্র।
.
.
.
সারাটা দিন তান্বী এক অদ্ভুত অস্থিরতায় কাটিয়েছে। জাভিয়ানের সেই দহন জাগানো স্পর্শ আর নিজের করা ‘চরিত্রহীন’ অপবাদের পর সে লজ্জায় আর অভিমানে একবারের জন্যও তার সামনে আসেনি। কিন্তু রাত বাড়ার সাথে সাথে তান্বীর বুকের ভেতরের দপদপানি যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল।
প্রাসাদের দোতলায় একই সারিতে তাদের রুমগুলো। তান্বীর এক পাশের রুমে জাভিয়ানের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে, আর তার ঠিক অন্য পাশের রুমে ভ্যালেরিয়ার। মাঝরাতে তৃষ্ণায় যখন তান্বীর বুক শুকিয়ে কাঠ, তখন সে পানি খাওয়ার উছিলায় ঘর থেকে বের হলো। করিডোরে পা রাখতেই তার নজর পড়ল জাভিয়ানের রুমের দিকে—দরজাটা আধখোলা। কৌতূহলবশত উঁকি দিয়ে সে দেখল ঘরটা শূন্য। এরপর সে ভ্যালেরিয়ার রুমের সামনে গেল, সেখানেও একই দৃশ্য—বিছানাটা পরিপাটি পড়ে আছে, কিন্তু কেউ নেই।
মুহূর্তের মধ্যে তান্বীর হৃদপিণ্ডটা সজোরে ধক করে উঠল। এক অজানা আশঙ্কা আর ঈর্ষার বিষাক্ত সাপ তার মাথায় ছোবল দিল। সে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এল। একজন সশস্ত্র গার্ জিজ্ঞেস করতেই সে ইশারায় জানাল— “ভ্যালেরিয়া ম্যাম আর জাভিয়ান স্যার এখন সুইমিংপুলের পাশে আড্ডা দিচ্ছেন।”
তান্বী পা টিপে টিপে অন্ধকারের আড়াল নিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেল। বাইরের নীলাভ জোছনায় সুইমিংপুলের জলরাশি তখন চিকচিক করছে। সেখানে মুখোমুখি বসে আছে জাভিয়ান আর ভ্যালেরিয়া। তাদের মাঝখানে ছড়ানো এক সেট খেলার কার্ড। ভ্যালেরিয়া অত্যন্ত নিপুণভাবে কার্ডগুলো চালছে আর তার কণ্ঠে ঝরে পড়ছে গত কয়েক দিনের সেই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানের গল্প। সে সবিস্তারে বলছে, কীভাবে মেইলস্ট্রোমের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সে তান্বীকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে।
জাভিয়ান নিবিষ্ট মনে সব শুনছিল। সবশেষে সে একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভ্যালেরিয়ার চোখের দিকে তাকাল।”থ্যাংকস ভ্যালেরিয়া। তুমি যদি আজ না থাকতে, হয়তো জাভিয়ান চৌধুরীকে জ্যান্ত লাশের মতো বেঁচে থাকতে হতো। তোমার এই ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।”
ভ্যালেরিয়া তাসের চাল থামিয়ে দিল। তার চোখে তখন এক তীব্র অতৃপ্তি আর দীর্ঘ পাঁচ বছরের জমানো অভিমানের পাহাড়। সে সোজা জাভিয়ানের চোখের মনিতে চোখ রেখে বলল—”ঋণ শোধের কথা বলছ জাভিয়ান? আচ্ছা, একবারও কি ভেবে দেখেছ—ওই সাধারণ মেয়েটার মধ্যে এমন কী আছে যার জন্য তুমি এভাবে পাগল হয়ে আছ? আমি তোমাকে কতটা চেয়েছিলাম, কতটা আরাধনা করেছি—তা কি তুমি সত্যিই কোনোদিন বুঝতে পারোনি? কেন একবারও আমার এই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের দিকে ফিরে তাকালে না?”
জাভিয়ান একটু ম্লান হাসল। পুলের স্থির জলের দিকে তাকিয়ে সে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু পাথর চাপা গলায় বলল— “ভ্যালেরিয়া, তোমার যেটা আমার প্রতি আছে, সেটা হয়তো এক ধরনের সাময়িক মোহ,চোখের নেশা মাত্র। ওটাকে ভালোবাসা বলে ভুল করো না।”
ভ্যালেরিয়া কণ্ঠস্বরে কান্নার আভাস নিয়ে বললো “না জাভিয়ান, আমার প্রেমটা কোনো ভুল নয়। যদি এটা স্রেফ নেশাই হতো, তবে এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে আমি অন্য কাউকে কেন নিজের জীবনে ঠাঁই দিতে পারলাম না? কেন আজও তোমার অপেক্ষায় মেক্সিকোর এই অন্ধকার গলিগুলোতে এক যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়াই?”
জাভিয়ান তখন বললো “আমি জানি না তুমি আমাকে কতটুকু ধারণ করো। তবে আমি এটুকু জানি, আমি তান্বীকে অনেক ভালোবাসি। আমার সেই ভালোবাসার ব্যাপ্তি তোমার এই পাঁচ বছরের প্রতিক্ষার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী আর পবিত্র।”
ভ্যালেরিয়া এবার হার না মানা এক জেদে ফেটে পড়ল। সে মাথা উঁচু করে জাভিয়ানের মুখোমুখি হয়ে বলল— “আর আমি তোমাকে তান্বীর চেয়েও বেশি ভালোবাসি জাভিয়ান! ওর ভালোবাসা তো কেবল কুঁড়ি মেলতে শুরু করেছে, আর আমারটা এক যন্ত্রণাদায়ক মহীরুহ। ও তোমাকে কেবল সুখ দিবে, আর আমি তোমার জন্য ধ্বংস হতেও জানি।”
জাভিয়ান কিছুটা চ্যালেঞ্জের সুরে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে তাসের কার্ডটা টেবিলে সজোরে রেখে বলল— “মুখে বলা তো সহজ ভ্যালেরিয়া। কিন্তু তুমি আমার জন্য ঠিক কি করতে পারবে?”
ভ্যালেরিয়া এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত ও ভয়ংকর দৃঢ়তা ফুটে উঠল। সে খুব ধীরস্থিরভাবে, একদম শীতল গলায় বলল— “যদি কোনোদিন এটা প্রমাণ করার সময় আসে জাভিয়ান, তবে সেদিন আমি শব্দ নয়,কাজ দিয়েই প্রমাণ দেব। মুখে আমি কিছুই বলব না। সেদিন তুমি বুঝবে—ভ্যালেরিয়ার প্রেম কতটা ভয়ংকর আর কতটা উৎসর্গমাখা হতে পারে।”
আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তান্বীর শরীর তখন থরথর করে কাঁপছিল। সে জানত ভ্যালেরিয়া আপা তার জাভিয়ানকে এত বছর ধরে নিজের হৃদয়ে পরম আরাধনায় লালন করে আসছে। একদিকে তার প্রতি অগাধ কৃতজ্ঞতা, অন্যদিকে নিজের একান্ত অধিকারবোধ—তান্বীর মনে হলো সে যেন এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাঝখানে এক নিরুপায় চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
জাভিয়ান অত্যন্ত ধূর্ত এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ। সুইমিংপুলের টলটলে নীল জলে চাঁদের আলো যখন নৃত্য করছিল, তখনই জাভিয়ানের নজরে পড়েছিল পাশের শ্বেতপাথরের মসৃণ ফ্লোরে একটি অস্থির ছায়া। চাঁদের বিপরীতে থাকা দেয়ালের আড়াল থেকে সেই দীর্ঘ ছায়াটি ঠিক তাদের পায়ের কাছ পর্যন্ত এসে থেমেছে। জাভিয়ান এক মুহূর্তেই বুঝে নিয়েছিল—তার জিন্নীয়া আড়ালে দাঁড়িয়ে তিলে তিলে দহন হচ্ছে।
জাভিয়ান জানত তান্বী আড়ালে দাঁড়িয়ে প্রতিটি শব্দ গিলছে। তার ঈর্ষান্বিত নিঃশ্বাসের শব্দ জাভিয়ানের কানে তপ্ত বাতাসের মতো বাজছিল। জাভিয়ান তার ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ধূর্ত হাসিটা ফুটিয়ে তুলল। সে ঠিক করল, আজ জিন্নীয়াকে কেবল পোড়াবেই না, আগুনের লেলিহান শিখায় তাকে ছটফট করতে বাধ্য করবে—যাতে সে নিজের মুখ দিয়ে ভালোবাসার কথা স্বীকার করে নেয়।
জাভিয়ান হঠাৎ করেই তাসের কার্ডগুলো টেবিলে সজোরে আছড়ে ফেলল। তারপর অত্যন্ত মোলায়েম অথচ মাদকতাভরা স্বরে ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল— “ভালোবাসার প্রমাণ তো পরে হবে ভ্যালেরিয়া। আপাতত এই নীল জোছনা আর এই নির্জন রাতটা তো কেবল আমাদের। চলো না, অনেকদিন পর পাবজি (PUBG) খেলি! দেখি তোমার রণকৌশল ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আগের মতো ধারালো কিনা।”
ভ্যালেরিয়া প্রথমে হকচকিয়ে গেল, কিন্তু জাভিয়ানের চোখের গভীর ইশারা আর ঠোঁটের কোণের ওই সূক্ষ্ম হাসি দেখে সে সব বুঝে নিল। জাভিয়ান চৌধুরী তাকে নিয়ে এক নাটক সাজাচ্ছে তান্বীকে পোড়ানোর জন্য। ভ্যালেরিয়াও মুচকি হেসে নিজের ফোনটা বের করল।
ভ্যালেরিয়া একটু বেশিই উত্তেজিত গলায়, যেন তান্বীর কানে প্রতিটি শব্দ বিষের মতো লাগে “জাভিয়ান! জলদি আসো… এনিমিরা আমাকে ঘিরে ফেলেছে! তুমি না আসলে আমি মরে যাব! একদম আমার ক্লোজ হও… আরও কাছে!”
জাভিয়ান তখন বললো “ভয় নেই ভ্যালেরিয়া, আমি থাকতে কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবে না। আমি ঠিক তোমার পেছনেই আছি। একদম গা ঘেঁষে দাঁড়াও আমার…”
ভ্যালেরিয়া খিলখিল করে হেসে, সোহাগী গলায় বললো “হ্যাঁ, এইতো! জাভিয়ান, আরও কাছে এসো… তোমার ব্যাকআপ ছাড়া আমি এক পা-ও নড়তে পারছি না। উফ্! তুমি এতো ভালো প্রটেক্ট করো কেন বলো তো? মনে হচ্ছে এই গেমের ভেতরই সারাজীবন তোমার সাথে এভাবে ক্লোজ হয়ে কাটিয়ে দিই!”
আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তান্বীর ভেতরটা তখন আগ্নেয়গিরির উত্তপ্ত লাভার মতো ফুটছিল। তার মাথা আর কাজ করছিল না। ভ্যালেরিয়া আপু তার জীবনদাত্রী হতে পারে, কিন্তু জাভিয়ান কেবল তার! জাভিয়ানের শরীরের ওই আভিজাত্যময় পারফিউমের ঘ্রাণ আজ অন্য কেউ নিচ্ছে, জাভিয়ানের ওই প্রশ্রয় অন্য কেউ পাচ্ছে—এটা তান্বীর সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে গেল।
সে আর এক মুহূর্তও নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। ঝড়ের বেগে দেয়ালের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সে জাভিয়ান আর ভ্যালেরিয়ার মাঝখানে এক রুদ্রমূর্তিতে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো রাগে আর অভিমানে লাল হয়ে উঠেছে।
তান্বী চিৎকার করে, কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ আর হাহাকার নিয়ে বললো “কী হচ্ছে এসব? মাঝরাতে এখানে ক্লোজ হওয়ার কিসের এতো জঘন্য নাটক চলছে? পাবজি খেলছেন নাকি নোংরামি করছেন?”
জাভিয়ান আর ভ্যালেরিয়া দুজনেই যেন আকাশ থেকে পড়ল। জাভিয়ান অত্যন্ত শান্তভাবে ফোনটা লক করে পকেটে রাখল। তার চোখে তখন শিকারি বাঘের মতো এক তৃপ্তির হাসি। জাভিয়ান এক ভুরু নাচিয়ে বললো “আরে তান্বী! তুমি ঘুমাওনি? তুমি না কিছুক্ষণ আগে বললে আমার চরিত্রে বিশাল সমস্যা আছে, আমি একটা লম্পট! তবে মাঝরাতে এই লম্পট লোকটার পিছু কেন নিচ্ছ? আমরা ক্লোজ হই কিংবা দূরে থাকি—তাতে তোমার কী?”
তান্বী রাগে কাঁপতে কাঁপতে ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকাল। ভ্যালেরিয়া তখন মাথা নিচু করে মুখ টিপে হাসছে, যা তান্বীর গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেওয়ার মতো কাজ করল। তান্বী কান্নাভেজা গলায় বললো “আপা, আপনিও? আপনিই তো আমাকে বাঁচিয়ে এনেছেন, আর আপনিই এখন আমার জাভিয়ানকে… আমার সামনেই আপনি…”
তান্বীর গলার স্বর কান্নায় ভেঙে এল। সে আর কথা বলতে পারল না। জাভিয়ান এবার ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। সে অত্যন্ত রাজকীয় ভঙ্গিতে তান্বীর দিকে এক কদম এগিয়ে এল। তার চোখে তখন এক তীব্র নেশা নিয়ে বললো “তোমার জাভিয়ান? তুমি তো আমাকে ত্যাগ করেছিলে জিন্নীয়া। তুমি তো আমাকে ঘৃণা করো। তাহলে এখন এই ঈর্ষা কেন? এই অধিকারবোধ কোথা থেকে আসছে? বলো…স্বীকার করো যে তুমি আমাকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারছো না!”
তান্বীর চোখে তখন আগুনের ফুলকি, কিন্তু সে তার ভেতরকার সেই আগ্নেয়গিরির মতো ঈর্ষাটাকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে গটগট করে হেঁটে ভ্যালেরিয়ার একদম পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে এক অবাধ্য দৃষ্টিতে জাভিয়ানের দিকে তাকাল।
ভ্যালেরিয়া অত্যন্ত নিপুণভাবে অবাক হওয়ার ভান করে বললো “কিরে তান্বী! তুই এই মাঝরাতে এখানে কি করছিস? তুই না সেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলি?”
তান্বী তখন জাভিয়ানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভ্যালেরিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো “আমি আপনাকে খুঁজছিলাম আপা। ওই বিশাল রাজপ্রাসাদ মার্কা ঘরে আমার একা একা ঘুম আসছে না, বড্ড ভয় করছিল। তাই ভাবলাম আপনার কাছে যাই। আপনি এখানে কী করছেন?”
ভ্যালেরিয়া তার ফোনের ঝলমলে স্ক্রিনটা তান্বীর চোখের সামনে একবার ঘুরিয়ে নিয়ে বললো “আমরা একটা গেম খেলছি রে। তুই যা, আমি এই রাউন্ডটা শেষ করেই আসছি।”
তান্বী চরম জেদ ধরে বললো “না! আমিও খেলবো। আপনারা দুজনে মিলে আনন্দ করবেন আর আমি একা ঘরে পড়ে থাকবো কেন?”
ভ্যালেরিয়া হাসল। সে আড়চোখে জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে তান্বীকে একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আরে পাগলী, এটা পাবজি। এই গেম তোর মাথায় ঢুকবে না। এখানে বন্দুক চালাতে হয়, অনেক রণকৌশল লাগে। তুই বরং ঘরে গিয়ে বালিশ জড়িয়ে ঘুমা।”
তান্বীর মেজাজ এবার সপ্তমে চড়ে গেল। ‘পারবিনা’ শব্দটা তার কানে অপমানের মতো বাজল। সে ঝট করে জাভিয়ানের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ভ্যালেরিয়াকে বলল
“এসব বন্দুক-পিস্তল মারামারি আমি খেলবো না। চলুন, আমি লুডু খেলবো!”
জাভিয়ান এতক্ষণ মূর্তির মতো বসে তাদের কাণ্ড দেখছিল। ‘লুডু’র নাম শুনে সে ঠোঁট কুঁচকে এক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তার মতো একজন ব্যাক্তি যার হাতে শত শত মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হয়, সে কি না খেলবে লুডু!
জাভিয়ান তখন বলে উঠলো “লুডু? সিরিয়াসলি তান্বী? এসব বাচ্চাদের খেলা খেলার মতো সময় জাভিয়ান চৌধুরীর নেই। ওটা স্রেফ সময়ের অপচয়।”
তান্বী এবার সুযোগ পেয়ে গেল জাভিয়ানকে মোক্ষম খোঁচা দেওয়ার। সে কোমরে হাত দিয়ে ত্যাড়ামি করে গলার স্বর উঁচিয়ে বলল—”হ্যাঁ, বলুন না যে আপনি লুডু খেলতে পারেন না! বলুন যে আপনি হেরে যাওয়ার ভয়ে কাঁপছেন। প্রতাপশালী হয়েছেন তো কী হয়েছে? লুডুর ছক্কায় তো আর সাইলেন্সর লাগানো গুলি চলে না, ওখানে মগজ লাগে। আপনার কি সেই সাহসটা নেই?”
জাভিয়ানের ইগোতে গিয়ে সজোরে আঘাত লাগল তান্বীর এই কথা। সে সোফা ছেড়ে সোজা হয়ে বসে তান্বীর চোখের দিকে সরাসরি স্থির দৃষ্টিতে তাকাল “ভয়? জাভিয়ান চৌধুরী লুডু খেলতে ভয় পায়? ঠিক আছে ,আসো বসি। তবে মনে রেখো, আমি কোনো খেলায় হারার জন্য ময়দানে নামি না। তুমি যদি হেরে যাও, তবে কিন্তু সাজাটা বড্ড কঠিন হবে।”
তান্বী তখন বললো “দেখা যাবে কে কাকে সাজা দেয়! আগে হারিয়ে দেখান তো!”
ভ্যালেরিয়া মুচকি হেসে ফোন পকেটে রাখল। সে বুঝতে পারছে, জাভিয়ান আর তান্বীর এই খুনসুটি এখন এক নতুন তুঙ্গে পৌঁছাতে যাচ্ছে। তারা তিনজন মিলে পুলের ধারের সেই মার্বেল টেবিলের ওপর লুডু বোর্ড নিয়ে বসল।
কিন্তু লুডু বোর্ডটা টেবিলের ওপর রাখা মাত্রই ভ্যালেরিয়া এমন এক মারাত্মক শর্ত ছুড়ে দিল যে তান্বীর হাতের ছক্কাটা মেঝেতে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। ভ্যালেরিয়া খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ছক্কাটা চালতে চালতে বলল— “শোন তান্বী, খেলা যখন হবে তখন একটা বাজি তো থাকতেই হবে। নাহলে জম্পেশ ভাব আসে না। শর্ত হলো— যদি তুই এই খেলায় হেরে যাস, তবে আমি তোর সামনে জাভিয়ানকে একটা দীর্ঘ চুম্বন করবো। আর যদি তুই জিতিস, তবে আমি হার স্বীকার করব। রাজি?”
জাভিয়ান অবাক হয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই টেবিলের নিচে ভ্যালেরিয়া তার ভারী বুট দিয়ে জাভিয়ানের পায়ের ওপর সজোরে একটা চাপ দিল। জাভিয়ান ভ্যালেরিয়ার চোখের কুটিল ইশারা দেখে মুহূর্তেই সব বুঝে নিল—এটা স্রেফ তান্বীকে জ্বালানোর আর তার ভেতরে সুপ্ত থাকা সেই ভয়ংকর অধিকারবোধটা টেনে বের করার এক চমৎকার নাটক। জাভিয়ান তখন ধূর্ত এক হাসি ঠোঁটে চেপে চুপ করে রইল।
তান্বী রাগে প্রায় নীল হয়ে বললো “কিহ্! কিস করবেন মানে? আপনি কি লুডু খেলতে বসেছেন নাকি অন্য কিছু? আর জাভিয়ান, আপনি কিছু বলছেন না কেন?”
জাভিয়ান কাঁধ উঁচিয়ে বললো “আরে বাজি তো বাজিই! তাছাড়া আমি তো দুই পক্ষেই লাভ দেখছি। খেলাটা জমবে ভালো।”
তান্বী রাগে গজগজ করতে করতে ছক্কা চালল। কিন্তু খেলা শুরু হতেই সে প্রমাদ গুনল। সে দেখল ভ্যালেরিয়া শুধু রণাঙ্গনেই পারদর্শী নয়, লুডু খেলাতেও সে এক জাঁদরেল খেলোয়াড়। তার একের পর এক ছক্কা পড়ছে আর গুটিগুলো ঝড়ের বেগে বোর্ডের চারপাশ প্রদক্ষিণ করছে। অন্যদিকে তান্বীর শুধু এক আর দুইয়ের গেরোয় জীবন অতিষ্ঠ।
তান্বী দেখল তার গুটিগুলো এখনো শুরুর ঘরের গণ্ডিতে আটকে আছে, আর ভ্যালেরিয়ার গুটি প্রায় গন্তব্যের দুয়ারে। জাভিয়ান আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে মজা দেখছে আর বারবার টিপ্পনি কাটছে “কি হলো তান্বী, ভ্যালেরিয়া তো একদম বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে! প্রিপারেশন নিয়ে নাও দৃশ্যটা লাইভ দেখার জন্য।”
তান্বীর এবার মাথা পুরোপুরি গরম হয়ে গেল। সে আর হিতাহিত জ্ঞান রাখতে পারল না। জাভিয়ানকে অন্য কেউ স্পর্শ করবে—এই চিন্তাতেই তার মস্তিষ্ক অবশ হয়ে আসছে। অগত্যা সে শুরু করল মাফিয়া জগতের চেয়েও ভয়ংকর এক কাজ— ‘চরম নির্লজ্জ চিটিং’!
জাভিয়ান আর ভ্যালেরিয়া যখন এক মুহূর্তের জন্য অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল, তান্বী সুযোগ বুঝে নিজের একটা গুটি তিন ঘর এগিয়ে দিল। একটু পর আবার যখন সুযোগ পেল, তখন তার কাঁচা গুটিটা সুকৌশলে সরিয়ে একদম পাকার নিরাপদ ঘরে বসিয়ে দিল।
ভ্যালেরিয়া হঠাৎ বোর্ডের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল।
“এই! এই গুটিটা তো এখানে ছিল না! এটা তো কেবল ঘর থেকে বের হয়েছিল, এটা এখানে এল কী করে?”
তান্বী চোখ বড় বড় করে একদম সতী-সাধ্বীর মতো মিথ্যে বলে বললো “কী বলছেন আপু! আপনি তো খেলায় মনই দিচ্ছেন না, শুধু জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছেন। এটা তো আমি অনেকক্ষণ আগেই পাকিয়েছি। আপনার কিচ্ছু মনে নেই!”
ভ্যালেরিয়া নিশ্চিত ছিল যে গুটিটা কাঁচা ছিল, কিন্তু তান্বী এমন ইস্পাত-কঠিন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছে যে সে নিজেও নিজের স্মৃতির ওপর দ্বিধায় পড়ে গেল। জাভিয়ান এক পাশে বসে মুচকি মুচকি হাসছিল। সে সব দেখছে, তান্বীর হাতের প্রতিটি কারচুপি তার বাজপাখির মতো চোখে ধরা পড়েছে, কিন্তু সে কিছু বলছে না। সে দেখল তান্বী তার গুটি খাওয়ার ভয়ে জাভিয়ানের একটা ঘুঁটি যখন-তখন আঙুলের টোকায় বোর্ড থেকে সরিয়ে দিচ্ছে।
জাভিয়ান হাসি চেপে বললো “তান্বী, আমার গুটিটা তো লাল ঘরের ওখান থেকে নড়ার কথা নয়। তুমি কি ওটা খেয়ে ফেললে নাকি কৌশলে সরিয়ে দিলে?”
তান্বী তীব্র স্বরে বললো “চুপ করুন তো! নিজের গুটি নিজে সামলাতে পারেন না আর দোষ দিচ্ছেন আমার! আপনারা দুজন মিলে আমাকে হারানোর ফন্দি করছেন, আমি সব বুঝি!”
তান্বী এখন পুরোপুরি মরিয়া। সে কোনোভাবেই ভ্যালেরিয়াকে এই বাজি জিততে দেবে না। দরকার হলে সে পুরো বোর্ডটাই উল্টে সুইমিংপুলে ফেলে দেবে, কিন্তু জাভিয়ানকে অন্য কেউ কিস করবে—এটা সে জান থাকতে হতে দেবে না!
লুডুর বোর্ডে শেষ পর্যন্ত তান্বীর ‘নিপুণ কারচুপি’র কাছেই ভ্যালেরিয়ার দীর্ঘদিনের পারদর্শিতা হার মানল। ভ্যালেরিয়া আড়চোখে দেখছিল, তান্বী কীভাবে সুযোগ বুঝে ছক্কার চাল পাল্টে দিচ্ছে আর অবলীলায় গুটি সরিয়ে নিজের পথ পরিষ্কার করছে। এই অসম যুদ্ধে জেতা অসম্ভব জেনেও ভ্যালেরিয়া মনে মনে এক বিচিত্র তৃপ্তি পেল। সে বুঝতে পারল, তান্বী তার জাভিয়ানকে আগলে রাখার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।
ভ্যালেরিয়া একটা লম্বা হাই তুলে বোর্ড থেকে হাত সরিয়ে নিল। তার চোখেমুখে তখন ক্লান্তির এক কৃত্রিম ছাপ।
“উফ! আর পারছি না। এই অসম লড়াইয়ে আমি সত্যি ক্লান্ত। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে, আমি বরং এবার বিদায় নিই। তোমরা খেল।”
তান্বী বুক থেকে এক বিশাল পাথরের মতো ভার নেমে যাওয়ার নিশ্বাস ফেলল। যাক! অন্তত আজকের মতো জাভিয়ানকে কোনো অঘটন আর ভ্যালেরিয়ার ওই ‘বাজি’ থেকে বাঁচানো গেছে। সে-ও দ্রুত উঠে দাঁড়াল, যেন এখান থেকে পালাতে পারলেই সে সুরক্ষিত।”হ্যাঁ আপা আমারও চোখের পাতা লেগে আসছে। চলুন আমরা একসাথেই যাই। এই মাঝরাতে খোলা আকাশের নিচে থাকা একদম ঠিক না।”
জাভিয়ান এতক্ষণ তান্বীর প্রতিটি হাতের কারসাজি এক অদ্ভুত প্রশ্রয়মাখা হাসি নিয়ে উপভোগ করছিল। কিন্তু তান্বী যেই পালানোর চেষ্টা করল, অমনি তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় সোজা হয়ে বসল। “দাঁড়াও! ভ্যালেরিয়া ঘুমাবে ও ঘুমাক, কিন্তু তুমি কোথাও যাচ্ছ না। মাত্রই তো তঞ্চকতা করে জিতলে, তার বিজয়োৎসব হবে না? চলো আমরা দুজনে মিলে এবার পাবজি খেলি। ভ্যালেরিয়া না থাকলে কী হয়েছে, আমি তোমাকে হাতে-কলমে শিখিয়ে দিচ্ছি কীভাবে ‘ক্লোজ’ হয়ে রণক্ষেত্রে টিকে থাকতে হয়।”
জাভিয়ানের কণ্ঠস্বরে সেই চিরচেনা আধিপত্য আর এক অদ্ভুত মাদকতা মেশানো জেদ। তান্বী মুহূর্তেই ধরে ফেলল, জাভিয়ান তাকে একা পাওয়ার জন্যই এই সুক্ষ্ম জাল বুনছে। বিশেষ করে ওই ‘ক্লোজ’ শব্দটা জাভিয়ান এমন তীব্রভাবে উচ্চারণ করল যে তান্বীর সারা শরীরে অপমানের চেয়েও বেশি এক শিহরণ খেলে গেল।
তান্বী রাগে হরিণীর মতো চোখ পাকিয়ে বললো “আমি কোনো পাবজি-টাবজি খেলব না! আমার ঘুম পাচ্ছে মানে আমি এখন ঘুমাব। আর আপনার ওই ক্লোজ হওয়ার শখ মেটানোর জন্য অনেকেই তো আছে, তাদের কাছেই যান গে!”
জাভিয়ান সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘদেহী অবয়ব মুহূর্তেই তান্বীর ওপর এক দীর্ঘ ছায়া ফেলল। সে এক কদম তান্বীর দিকে এগিয়ে এসে অত্যন্ত নিচু কিন্তু প্রগাঢ় স্বরে বলল “ভয় পাচ্ছ কেন জিন্নীয়া? লুডুর বোর্ডে তো বেশ বীরত্ব দেখালে। এখন কি একা আমার সামনাসামনি হওয়ার সাহসটা হারিয়ে ফেললে?”
তান্বী দেখল জাভিয়ান তাকে তিলে তিলে উসকানি দিচ্ছে, তাকে অস্থির করে তোলার এক নিপুণ খেলায় মেতেছে সে। তান্বী আর কোনো বিতর্কে না জড়িয়ে গটগট করে রাগে পা আছড়ে ওখান থেকে চলে যেতে শুরু করল। তার দৃপ্ত হাঁটার ভঙ্গি আর গতির তীব্রতা বলে দিচ্ছিল যে তার মনের ভেতর এখন কত বড় এক অভিমানের ঝড় বইছে।
জাভিয়ান আড়ালে দাঁড়িয়ে এক তৃপ্তির হাসি হাসল। সে জানে, জিন্নীয়া এখন সারা রাত এপাশ-ওপাশ করবে, জাভিয়ানের প্রতিটি শব্দ আর ভ্যালেরিয়ার ওই উপস্থিতি তাকে কুরে কুরে খাবে।
জাভিয়ান (মনে মনে) বললো “চিটিং করে লুডু তো জিতলে জিন্নীয়া, কিন্তু এই প্রেমের অসম লড়াইয়ে জাভিয়ান চৌধুরীর কাছে তোমার আত্মসমর্পণ কেবল সময়ের ব্যাপার।”
.
.
.
.
রাতের লিভিং রুমের সেই থমথমে নীরবতায় জাভিয়ানের পৌরুষদীপ্ত গাম্ভীর্য যেন এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে। শাওয়ার নিয়ে আসার পর তার ভেজা চুলের দু-একটা গোছা অবাধ্য হয়ে কপালে এসে পড়েছে, যেখান থেকে চুইয়ে পড়া জলের কণা তার ফর্সা ধারালো চোয়াল বেয়ে নিচে নামছে। টিভির পর্দায় হলিউডের কোনো মারকাটারি মুভি চললেও জাভিয়ানের দৃষ্টিতে ছিল এক গভীর শূন্যতা আর চাপা আক্রোশ।
তান্বী দরজার আড়াল থেকে দেখল মানুষটাকে। জাভিয়ানের সেই ভঙ্গি দেখে তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত মায়ায় মুচড়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, জাভিয়ান সত্যিই ভীষণ চটে আছে। নিজের ওপর এক চিলতে অভিমান নিয়েই সে গায়ের চাদরটা ভালোভাবে জড়িয়ে নিয়ে বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে সোফার পাশে এসে দাঁড়াল।
জাভিয়ান আড়চোখে তান্বীর উপস্থিতি টের পেলেও এমন এক নির্লিপ্ত ভাব ধরে রইল, যেন সে ছাড়া এই ঘরে আর দ্বিতীয় কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। তান্বী একটু সাহস সঞ্চয় করে সোফার একদম কিনারায় গিয়ে বসল। জাভিয়ান তখনো পাথরের মূর্তির মতো নির্বিকার।
তান্বী খুব নিচু আর মোলায়েম গলায় বললো “কী দেখছেন এসব? হলিউডের মারপিটওয়ালা মুভি? ধ্যাৎ, কার্টুন লাগান। আমি কার্টুন দেখব।”
জাভিয়ান এবার হঠাৎ করেই টিভির রিমোটটা পাশের কাঁচের টেবিলে সশব্দে আছড়ে রাখল। সে ঝট করে তান্বীর দিকে ফিরল। তার চোখের মনিতে তখন এক আদিম নেশা আর ক্রোধের প্রলয়ংকরী সংমিশ্রণ।
জাভিয়ান গম্ভীর আর অস্বাভাবিক কর্কশ গলায় বললো “কার্টুন দেখবে? এই মাঝরাতে তোমার কার্টুন দেখার শখ জেগেছে? জিন্নীয়া, তোমার এখন প/র্ন দেখার বয়স হয়েছে, কার্টুন দেখার নয়। বুঝলে?”
কথাটা কানে যেতেই তান্বীর সারা শরীর যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো। লজ্জায় আর অপমানে তার মুখটা বিকেলের গোধূলির মতো টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে চাদরটা গায়ের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়িয়ে নিয়ে আর্তনাদ করে উঠল। “ছিঃ জাভিয়ান! আপনার মুখে কিচ্ছু আটকায় না? আপনি একটুও বদলাননি! সেই আগের মতোই অসভ্য রয়ে গেছেন। আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো বিপদে পড়ে কিছুটা সংযত হয়েছেন, কিন্তু আপনার ওই লম্পট চরিত্রটা বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি!”
জাভিয়ান এবার এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। সে শিকারি বাঘের মতো হঠাৎ করে সোফায় তান্বীর দিকে অনেকটা ঝুঁকে এল। তান্বী আতঙ্কে সোফার গদির সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করল। জাভিয়ান তার খুব কাছে—এত কাছে মুখ নিয়ে এল যে তাদের নাসারন্ধ্রে একে অপরের নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে।
জাভিয়ান চাপা আর হাড়কাঁপানো স্বরে বললো “হ্যাঁ, আমি এমনই লম্পট। আর বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, এই লম্পট লোকটাকেই তুমি পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসো, তাই না জিন্নীয়া? নাহলে মাঝরাতে নিজের নিরাপদ ঘর ছেড়ে আমার সাথে এখানে দেখা করতে আসতে না। বলো, উত্তর দাও আমার কথার… ভুল বলছি?”
তান্বী সম্পূর্ণ নিরুত্তর হয়ে গেল। জাভিয়ানের নিশ্বাসের তপ্ত উষ্ণতা তার ওষ্ঠ ছুঁয়ে যাচ্ছে। একদিকে জাভিয়ানের সেই অবাধ্য কথাগুলো তাকে বিদ্ধ করছে, অন্যদিকে তার এই সম্মোহনী পুরুষালি আকর্ষণ তান্বীর সমস্ত যুক্তি তছনছ করে দিচ্ছে। তার হৃৎপিণ্ড তখন কোনো উন্মত্ত ড্রামের মতো ধুকপুক করছে।
জাভিয়ান এবার তার বলিষ্ঠ হাতটা তান্বীর পেছনে সোফার ওপর রেখে ওকে সম্পূর্ণ বন্দি করে ফেলল। সে চাইল আজ তান্বীর ওই জেদটা এক নিমেষে চুরমার করে দিতে। জাভিয়ানের চোখে তখন এক অদ্ভুত বিজয়ী হাসি।
জাভিয়ানের ভেতরের সেই দাহ্য ক্রোধ হঠাৎ করেই এক ভয়াবহ শয়তানিতে রূপ নিল। সে টিভির রিমোটটা হাতে নিয়ে অত্যন্ত ক্ষিপ্রতায় একটি প্রাপ্তবয়স্ক ওয়েবসাইটের নিষিদ্ধ দৃশ্য চালিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে লিভিং রুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে এক অত্যন্ত অস্বস্তিকর আর নিষিদ্ধ শব্দাবলি আছড়ে পড়ল। তান্বীর কান-মুখ মুহূর্তেই লজ্জায় আগুনের মতো লাল হয়ে গেল। সে কল্পনাও করতে পারেনি যে জাভিয়ান চৌধুরী সত্যিই এত বড় একটা ‘অসভ্যতা’ সবার অলক্ষ্যে করে বসবে।
তান্বী দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠল “ছিঃ ছিঃ! এটা কী করছেন আপনি? এখনই বন্ধ করুন বলছি! যদি কেউ চলে আসে তবে কী ভাববে? আপনি কি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাগল হয়ে গেছেন?”
জাভিয়ান সোফায় আয়েশ করে হেলান দিয়ে এক হাত দিয়ে রিমোটটা মাথার ওপরে উঁচিয়ে ধরল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চরম অবাধ্য আর বিজয়ী হাসি। সে রিমোটটা এমনভাবে নাগালের বাইরে রাখল যাতে তান্বী সহজে তা ছিনিয়ে নিতে না পারে। “বন্ধ করব কেন? তুমিই তো বললে আমি একটুও বদলাইনি। তো আজ না-বদলানো এই লম্পট জাভিয়ানকেই একটু সহ্য করো। দেখি তোমার কার্টুন দেখার শখ আর কতক্ষণ টিকে থাকে!”
তান্বীর ধৈর্যের বাঁধ এবার পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে জাভিয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল রিমোটটা কেড়ে নেওয়ার জন্য। জাভিয়ান অত্যন্ত চতুরতার সাথে রিমোটটা এপাশ-ওপাশ করতে লাগল, যেন তান্বীকে নিয়ে এক মরণপণ খেলায় মেতেছে। এক পর্যায়ে রিমোটের নাগাল পেতে গিয়ে তান্বীর পা পিছলে গেল এবং সে ভারসাম্য হারিয়ে সরাসরি জাভিয়ানের ইস্পাত-কঠিন চওড়া বুকের ওপর আছড়ে পড়ল।
ঠিক সেই মোক্ষম মুহূর্তেই জাভিয়ান তার অন্য হাত দিয়ে তান্বীর কোমর জাপটে ধরল। এক নিপুণ ঝটকায় সে তান্বীকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। তান্বী হকচকিয়ে গেল, তার বুক তখন কোনো বুনো ঘোড়ার মতো দুরুদুরু কাঁপছে।
জাভিয়ানের বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধন এতটাই সুদৃঢ় যে তান্বীর নড়াচড়া করার বিন্দুমাত্র উপায় রইল না।পরক্ষণেই জাভিয়ান এক হাত দিয়ে রিমোটের পাওয়ার বাটন চেপে দিল। সেই নিষিদ্ধ শব্দ আর দৃশ্যপট নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। ঘরটা এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল, যেখানে কেবল দুজনের ঘন তপ্ত নিশ্বাসের শব্দই এখন প্রধান হয়ে উঠেছে।
জাভিয়ান তান্বীর কানের খুব কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। তার কণ্ঠস্বর এখন আর রুক্ষ নয়, বরং অসম্ভব গভীর, মাদকতাভরা আর নেশাতুর। জাভিয়ান অস্ফুট স্বরে বললো “রিমোট তো পেয়ে গেলে জিন্নীয়া। এখন এই যে আমার ওপর প্রলয় হয়ে আছড়ে পড়ে আছো, এখান থেকে মুক্তি পাবে কীভাবে? আমি কি তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দেব?”
তান্বী জাভিয়ানের কাঁধে নিজের কাঁপাকাঁপা হাত রেখে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে গিয়েও থমকে গেল। জাভিয়ানের চোখের ওই তীব্র সর্বগ্রাসী দৃষ্টি তাকে যেন সম্মোহিত করে ফেলেছে। সে অত্যন্ত দুর্বল স্বরে বিড়বিড় করে বলল— “ছাড়ুন জাভিয়ান… কেউ দেখে ফেলবে। আপনি… আপনি সত্যিই খুব পচা!”
জাভিয়ান তখন বললো “পচা বলেই তো তুমি আমাকে ছাড়া আর দ্বিতীয় কাউকে ভাবতে পারো না। এই তোমার শরীরের ঔঅবাধ্য চাদরটা সরিয়ে দিলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে জিন্নীয়া?”
জাভিয়ান অত্যন্ত আলতো করে তান্বীর গায়ের চাদরটার এক কোণ নিজের আঙুলের ডগায় টেনে ধরল। তান্বীর সারা শরীরে তখন সহস্র ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। একদিকে লজ্জা, অন্যদিকে জাভিয়ানের এই অমোঘ অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ—তান্বী যেন পুরোপুরি জাভিয়ানের মায়াবী এক গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে গেছে। উত্তেজনার পারদ এতটাই বেড়ে গেল যে তান্বীর চারপাশটা আবছা হয়ে আসতে লাগল।
লিভিং রুমের সেই আধো-অন্ধকার পরিবেশে জাভিয়ানের চোখের দৃষ্টি এখন আর কেবল দুষ্টুমিতে সীমাবদ্ধ নেই; সেখানে দানা বেঁধেছে এক আদিম তৃষ্ণা আর সহস্র রজনীর বিরহ-জ্বালা। জানালার ভারী পর্দার ফাঁক দিয়ে আসা রুপালি চাঁদের আলো তাদের অবয়বে এক মায়াবী রহস্যের প্রলেপ মেখে দিয়েছে। জাভিয়ান হাতের রিমোটটা তাচ্ছিল্যের সাথে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল এখন আর কোনো কৃত্রিম শব্দের প্রয়োজন নেই।
সে তার বলিষ্ঠ হাত বাড়িয়ে তান্বীর চিবুকটা পরম মমতায় উঁচিয়ে ধরল। তান্বী লজ্জায় আর অজানা এক আবেশে চোখ বুজে ফেলল। তার দীর্ঘ ঘন চোখের পাতাগুলো কোনো বনহরিণীর মতো থরথর করে কাঁপছে।
জাভিয়ান অত্যন্ত নিচু আর প্রগাঢ় স্বরে বললো “কতদিন… কতদিন এই মুহূর্তটার জন্য আমি নরক যন্ত্রণা সয়েছি, তুমি জানো জিন্নীয়া? যখন সাগরের উত্তাল ঢেউ চিরে তোমাকে খুঁজে ফিরছিলাম, প্রতিটা লহমায় মনে হতো আমার ফুসফুস বাতাসহীন হয়ে আসছে।”
তান্বীর কণ্ঠে কোনো ভাষা সরল না। সে কেবল তার দুহাত দিয়ে জাভিয়ানের শার্টের কলারটা এক অলীক অধিকারবোধে জাপটে ধরল। জাভিয়ান ধীরে ধীরে তান্বীর গায়ের সেই বড় চাদরটা একপাশে সরিয়ে দিল। নিশিরাতের সেই আবছা আলোয় পাতলা ফিতের গাউনে তান্বীকে আজ কোনো অপার্থিব রূপসী মনে হচ্ছে। জাভিয়ানের আঙুলগুলো তান্বীর কাঁধের ওপর দিয়ে স্লাইড করে নিচে নেমে আসতেই মেয়েটির সারা শরীর শিউরে উঠল।
তান্বী আকুতি মাখা স্বরে বললো “জাভিয়ান… আমি আপনাকে বড্ড ভয় পাই।”
জাভিয়ান তখন মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলো “ভয় পাও, না ভালোবাসো জিন্নীয়া?”
জাভিয়ান আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা করল না। সে তান্বীর ললাটে একটি প্রগাঢ় চুমু খেল, তারপর তার ওষ্ঠাধর নেমে এল তান্বীর বন্ধ চোখের পাতায়। তান্বীর সারা শরীর এক অদ্ভুত মাদকতায় অবশ হয়ে এল। সে অনুভব করল জাভিয়ানের তপ্ত নিশ্বাস এখন তার উন্মুক্ত গ্রীবায় আছড়ে পড়ছে। জাভিয়ান তার মুখটা তান্বীর ঘাড়ের সেই স্নিগ্ধ জায়গায় ডুবিয়ে দিল। তান্বী অস্ফুট এক আর্তনাদ করে জাভিয়ানকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেইলস্ট্রোমের সেই বন্দিশালা, সাগরের লোনা জল আর মৃত্যুর হিমশীতল আতঙ্ক—সবই যেন জাভিয়ানের এই উষ্ণ স্পর্শে কর্পূরের মতো উবে গেল।
জাভিয়ান তান্বীকে নিজের কোলেই রাখা অবস্থায় সোফার নরম গদিতে আরও একটু হেলান দিয়ে শুইয়ে দিল। তান্বী এখন পুরোপুরি জাভিয়ানের শরীরের সাথে মিশে আছে। জাভিয়ানের এক হাত তান্বীর পিঠের সেই অনাবৃত অংশে চলে গেল। এবার আর কোনো লুকোচুরি নয়, জাভিয়ান তার ঠোঁট দিয়ে তান্বীর ওষ্ঠাধরের খুব কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। তাদের নিশ্বাস এখন এক হয়ে মিশে যাচ্ছে। তান্বী ধীরে ধীরে নিজের চোখ মেলল। জাভিয়ানের চোখে সে এক অমোঘ অধিকারবোধ আর উম্মত্ত ভালোবাসা দেখতে পেল। তান্বী নিজেই নিজের মাথাটা একটু উঁচিয়ে জাভিয়ানের ঠোঁটের নিচের ডানপাশের তিলটায় যেটা তার সবচেয়ে প্রিয় সেখানটায় আলতো করে এক স্বর্গীয় ছোঁয়া দিল নিজের অধরে ধারা।
সেই এক মুহূর্তেই জাভিয়ান যেন সব নিয়ন্ত্রণ হারাল। সে তান্বীর কোমরে নিজের হাত শক্ত করে গেঁথে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের সাথে পিষে ধরল। পুরো রুমের নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে কেবল তাদের দ্রুত হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। বাইরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ যেমন বারবার তীরে আছড়ে পড়ে, জাভিয়ানের প্রতিটি স্পর্শও তান্বীর হৃদয়ে ঠিক তেমনি ভালোবাসার প্রলয়ংকরী ঢেউ তুলছিল। জাভিয়ান তান্বীর ঘাড় থেকে শুরু করে কানের লতি পর্যন্ত তার ঠোঁট বুলিয়ে আনল। প্রতিটি ছোঁয়ায় তান্বীর সারা শরীরে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।
জাভিয়ান ফিসফিস করে বললো “তুমি জানো না জিন্নীয়া, তোমাকে ছাড়া কাটানো প্রতিটা রাত আমার কাছে কবরের মতো ছিল। আজ আর কোনো বাঁধা থাকবে না আমাদের মাঝে…”
জাভিয়ান এবার তান্বীর দুই গাল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে তার ঠোঁটের খুব কাছে মুখ নামিয়ে আনল। তান্বীর নিশ্বাস তখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে জাভিয়ানের চোখের ওই প্রখর চাউনি আর ভালোবাসার এই আকাশছোঁয়া তীব্রতা সহ্য করতে পারছিল না। তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু এক অদ্ভুত উত্তেজনায় কাঁপছে। জাভিয়ান যেই না তার ঠোঁট তান্বীর ওষ্ঠাধরে ডুবিয়ে দিতে চাইল, ঠিক তখনই তান্বীর পুরো পৃথিবীটা বনবন করে দুলতে শুরু করল। অতিরিক্ত ভয়, লজ্জা আর এই নতুন অনুভূতির অসহ্য তীব্রতায় তার মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল যেন থমকে গেল।
তান্বী অত্যন্ত অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো”জা… ভিয়ান… আমার কেমন যেন…” বলেই তান্বীর মাথাটা টলে জাভিয়ানের বলিষ্ঠ কাঁধে হেলে পড়ল। জাভিয়ান প্রথমে ভাবল তান্বী হয়তো লজ্জায় নিজেকে লুকিয়ে ফেলছে, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই সে অনুভব করল তান্বীর শরীরটা পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গেছে। তার হাতের মুঠি আলগা হয়ে গেছে। জাভিয়ান এক মুহূর্তেই সচেতন হয়ে উঠল। সে তান্বীর মুখটা তুলে ধরল, কিন্তু দেখল তান্বী গভীর ঘুমে নয়, বরং উত্তেজনার আতিশয্যে সংজ্ঞাহীন হয়ে গেছে।
জাভিয়ান তীব্র আতঙ্কে ডাকতে লাগল “তান্বী? তান্বী! চোখ খোলো! কী হলো তোমার?”
জাভিয়ান দ্রুত তান্বীকে সোফায় শুইয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, এই কোমল মেয়েটার ওপর দিয়ে গত কয়েকদিন যে ঝড় গিয়েছে, আজ তার এই তীব্র রোমান্স আর আবেগের ভার সইবার মতো ক্ষমতা তান্বীর দুর্বল শরীরের ছিল না।
জাভিয়ান নিজের ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হলো। সে পাগলের মতো তান্বীর মুখে পানির ছিটা দিতে লাগল।
জাভিয়ান নিজের কপালে হাত দিয়ে বললো “শিট! আমি সবসময় এমন উম্মাদ হয়ে যাই! মেয়েটা এমনিতেই দুর্বল, তার ওপর আমি…”
জাভিয়ান তান্বীকে নিজের দুই বাহুতে পাঁজাকোলা করে পরম আদরে তুলে নিল। তার চোখে এখন রোমান্সের বদলে এক অতলান্ত মায়া আর দুশ্চিন্তা। সে তান্বীকে নিয়ে ধীরপায়ে তার নিজের বেডরুমের দিকে এগোতে লাগল।
চলবে…………..
বিশেষ নোট: প্রিয় পাঠকগণ আপনাদের আমি একটা টার্গেট দিয়েছিলাম যে ২ হাজার রিয়েক্ট হলেই আমি পরের পর্ব দিবো আপনারা ২৪ ঘন্টা পর হওয়ার আগেই ২.২ করে ফেলছেন আর এখন লাস্ট পর্বে ২.৪ কে রিয়েক্ট। আজকের পর্বে ৮৫০০ শব্দ আছে।যা লিখতে সত্যি আমার পরিশ্রম হয়েছে অনেক।এতো বড় পর্ব দিয়েছি এবার আমি কিছুদিন রেস্টে থাকতে চাই তাই আপনাদের আমি নতুন চ্যালেঞ্জ দিলাম আর তার জন্য আমি দুঃখিত কিন্তু আমি রেস্ট করবো তাই এই পর্বে ৩ হাজার রিয়েক্ট হলেই আমি ২৭ নাম্বার পর্ব দিবো তার আগে নয় এবার যতদিনে হয়।
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৭
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৬
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৭
-
ডিজায়ার আনলিশড গল্পের লিংক
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৩
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৯