জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৭৪
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।
সন্ধ্যা নামলো বোধহয়! অথচ আমি এখনো বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছি। না, এখন আর কান্নার তোড়ে আমার হালকা দেহখানা কম্পিত হচ্ছে না। দুর্বল দেহ এখন নেতিয়ে পড়েছে। আমার মাথার কাছে বসে আছে জুই। আমাকে এই অবস্থায় দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা। ছোট্ট হাতে আমার মাথায় বিলি কাটছে। পাশেই হতাশ হয়ে সুপের বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ফারিয়া। একটু সুপ খাওয়ানো তো দূর, আমি তার সাথে কোনো প্রকার কথাই বলি নি। আর কতক্ষণ আমি না খেয়ে থাকব! আমার কি শরীর খারাপ করবে না এবার! ফারিয়া দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে জুইকে বলল,
–“জুই তখন থেকে না করছি মেডামের সামনে এমন করো না। দেখছই তো মেডামের শরীর ভালো না।”
জুই হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে বললো,“কই কাঁদছি না তো!”
–“আচ্ছা তাহলে একটু সর তো দেখি মেডামকে একটু খাওয়াতে পারি কিনা!”
জুই সরে আরেক পাশে বসল। ফারিয়া বিছানায় এক পা ভাঁজ করে জুইয়ের জায়গায় বসল। আমি বালিশে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে আছি বিধায় মুখ দেখার জো নেই। ফারিয়া সুপের বাটি জুইয়ের হাতে দিয়ে আমার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম কন্ঠে বলল,
–“মেডাম উঠুন না। সেই দুপুরে এসেছেন, এখনো কিছুই খাননি। এভাবে না খেয়ে থাকলে তো আপনার শরীর সুস্থ হবে না।”
আমার মধ্যে কোনো নড়চড় নেই। ফারিয়া আর জুই চোখাচোখি করল। ফারিয়া একটু সময় চুপ থেকে পুনরায় তার মুখ আমার কানের কাছে এনে নিচু গলায় বলল,
–“প্লিজ ম্যাম এমন করবেন না! একটু খেয়ে নেন। তারপর না হয় আপনার মতো শুয়ে থাকেন। আপনি না খেয়ে অসুস্থ হলে স্যার আমাদের সবাইকে কথা শুনাবে। স্যার আমাদের সবাইকে বকাঝকা করলে কি আপনার ভালো লাগবে?”
এবারো আমার থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ফারিয়া হতাশার শ্বাস ছাড়ল। জুই নাক টেনে ভেতরের কান্না আটকে নিল। অতঃপর আমার এক হাত তার হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল,
–“এ আপু একটু খেয়ে নাও না। একটু খেলে তো কিছু হবে না! খেয়ে নাও না একটু।”
জুইয়ের বারবার ডাকে এবার আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। মুদু স্বরে বললাম, “আমার এখন খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বিরক্ত করিস না। সেই কখন এসেছিস ফ্রেশ হয়ে আয় যা। ফারিয়া ওকে নিচে নিয়ে গিয়ে খাওয়াও।”
ফারিয়া সাথে সাথে বলে উঠলো,“আপনি খাচ্ছেন না দেখে তো জুইও খাচ্ছে না। আপনি উঠুন প্লিজ। আপনি খেয়ে নেন, জুইও খাবে।”
–“এক কথা বারবার বলতে কিন্তু আমার মোটেও ভালো লাগে না।”
আমার কথা শুনে ফারিয়া হতাশ চোখে জুইয়ের দিকে তাকাল। জুই মুখ ভার করে বসে রইল কিছুক্ষণ। হঠাৎ জুই ফারিয়াকে ফিসফিস করে বলে উঠল,
–“ফারিয়া আপু ইফান ভাইয়াকে কল দিয়ে বল আপু খাচ্ছে না।”
জুইয়ের কথাটা শুনে এক চিলতে হাসল ফারিয়া। জুইয়ের কথাটা মন্দ না। পরক্ষনেই ফারিয়ার হাসি মিলিয়ে গেল। জুইকে ফিসফিস করে বলল,
–“এটা একটা ভালো আইডিয়া। স্যারই পারবে মেডামকে জোর করে হলেও খাওয়াতে। কিন্তু!!”
ফারিয়া থেমে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল। জুই ফিসফিস করে বলল,“কিন্তু কি?”
–“আরে ভাই, স্যারকে যদি এখন কল করে বলি উনার আদরের বউ এখনো খায় নি তাহলে রাম ধমক একটাও মাটিতে পারবে না। ও বাবা গো! স্যারের একটা ধমকেই আমার কলিজা কেঁপে উঠে। স্যার যাওয়ার সময় আমাকে বলে গিয়েছিল ম্যামকে খাবার খাইয়ে মেডিসিনগুলোও খাইয়ে দিতে। কিন্তু ম্যাম তো এখনো এক বিন্দু পানিও খায় নি!”
জুইও এবার চিন্তায় পড়ে গেল। ফারিয়া কিছু একটা ভেবে চটজলদি বলে উঠল,“একটা আইডিয়া আছে।”
জুই তৎক্ষনাৎ শুধাল,“কি?”
ফারিয়া পায়জামার পকেট থেকে ফোনটা বের করে জুইয়ের হাতে দিয়ে বলল,“আমি কল করলে স্যার আমাকে বকাঝকা করবে। কিন্তু তোমাকে তো আর করতে পারবে না। কারণ তুমি হচ্ছ ম্যামের ছোট বোন। আমাদের গেস্ট। সবচেয়ে বড় কথা স্যারের একমাত্র শালিকা। তাই তুমি বরং তোমার দুলাভাইকে বল, ম্যাম কারো কথা শুনছে না। এখনো না খেয়ে আছে।”
ফারিয়ার কথা শুনে জুই শুকনো ঢোক গিলে বলল,“ইয়ে যদি আমাকেও বকে!”
–“আরে তোমাকে কিছু বলবে না। একবার কথা বলেই দেখ।”
ফারিয়া ইফানের নাম্বারে কল ঢুকিয়ে জুইয়ের কানে ধরিয়ে দিল। প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল। জুই চোখের ইশারায় ফারিয়াকে বুঝাল কল কেটে গেছে। ফারিয়া পুনরায় ইফানের নাম্বারে কল ঢুকিয়ে জুইয়ের কানে ধরিয়ে দিল।
আমাকে নিয়ে ঝামেলার মধ্যে এতোদিন ইফান নিজের বিজনেসের কোনো কাজে হাত লাগায়নি। মাহিন আর ইনান সবটা সামলো নিয়েছে। তবে ইফানের সাক্ষরের জন্য বেশ কিছু প্রজেক্ট আটকে আছে। বর্তমানে ইফান অফিসে নিজের ক্যাবিনে বসে আছে। ইফানের চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ইনান। ইনান ইফানকে একেকটা ফাইল বুঝিয়ে দিচ্ছে আর ইফান ফাইলে সাইন করে দিচ্ছে। একগাদা ফাইলের আড়ালে পড়ে আছে ইফানের ফোন। ফোনটি ভাইব্রেশনে থাকায় ইফানের সেদিকে খেয়াল নেই। ইনান লাস্ট ফাইল সরাতে গিয়ে লক্ষ্য করল ইফানের ফোনে কল এসেছে। ইনান বলে উঠল,
–“ভাই ভাবির পিএ কল করেছে।”
ইফানের কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। সে লাস্ট ফাইলে নিজ সাক্ষর দিয়ে কলমটা রেখে দিল। ইনান ফাইল গুলো এক হাতে সরিয়ে ফোনটা ইফানের হাতে তুলে দিল। ইফান ফোন রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে আসল,
–“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।”
অচেনা কণ্ঠস্বর কানে আসতেই ইফানের ভ্রু কুঞ্চিত হল। সে ফোন কান থেকে নামিয়ে চোখের সামনে ধরল। স্ক্রিনে ফারিয়ার নাম্বারই দেখে আর বেশি ভাবল না। ফোন পুনরায় কানে ধরে গম্ভীর গলায় সালামের জবাব দিল,
–“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
জুই তৎক্ষনাৎ ইফানকে জিজ্ঞেস করল,“ভাইয়া কেমন আছেন?”
ইফানের কুঞ্চিত ভ্রুযুগল আরও কুঞ্চিত হল। ফলে কপালে কয়েকটি সুক্ষ্ম ভাজের সৃষ্টি হয়েছে। ফারিয়া এটা কি ধরণের ফাইজলামি শুরু করেছে! আচ্ছা, ফোনে কি ফারিয়া নাকি অন্য কেউ! কণ্ঠ শুনে তো অপরিচিত লাগছে! ইফান আর না ভেবে গম্ভীর গলায় আওড়ালো,
–“এক্সকিউজ মি!”
ইফানের কণ্ঠ শুনে জুই ঢোক গিলে রিনরিন স্বরে বলল,“ভাইয়া আআমি, জুই।”
জুই ফোনের অপর প্রান্তে আছে শুনে ইফানের কপালের ভাজ সোজা হল। সে এবার একটু নরম কণ্ঠে বলল,
–“হুম জুই বল।”
–“ভাইয়া আপু না খাচ্ছে না কিছু। কথাও বলছে না।”
বলেই জুই একটা বড়সড় ঢোক গিলল। কারণ বাঘের মতো চোখ বড় বড় করে আমি তার দিকে তাকিয়ে। জুই ইফানকে কল করেছে দেখে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে। জুই আমার দিক থেকে চোখ নামিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ইফান জিজ্ঞেস করল,
–“তুমি এখন কোথায় আছ?”
–“জি ভাইয়া আপনাদের বাসায়। আসছি থেকে আপুকে দেখছি শুধু শুয়ে আছে। সবাই বললেও কিছু খাচ্ছে না। কথাও বলতে চাইছে না।”
ইফানের চেহারায় চিন্তার ছাপ ভেসে উঠেছে। সে দু আঙুল দিয়ে কপালের একপাশে ঘষতে ঘষতে জুইকে জিজ্ঞেস করল,“তোমার বোন কি এখন তোমার পাশে আছে?”
জুই চোরাই চোখে আমার দিকে তাকাতেই আমার কড়া দৃষ্টির সম্মুখীন হল। ভয়ে তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে অন্যপাশে ফিরে ফিসফিস করে বলল,
–“জি আমার পাশেই আছে।”
ইফান জিহ্বার ডগা দিয়ে গাল ঠেলে। তারপর চোখ বন্ধ করে তপ্তশ্বাস ছেড়ে বলল,“ওকে ফোনটা দাও।”
–“আচ্ছা।”
জুই আমার দিকে ফোন এগিয়ে দিয়ে বলল,“আপু ভাইয়া কথা বলতে চাইছে।”
আমি কিছুক্ষণ জুইয়ের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে পুনরায় বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লাম। ফারিয়া আর জুই আমাকে কথা বলার জন্য বলছে। ফোনের অপর প্রান্তে ইফানের কানে সকল কথাবার্তায় আসছে। ইফান উঠে দাঁড়াল। অতঃপর ফোন কানে ধরেই গলার টাই লুজ করতে করতে বিশাল থাই কাচের সামনে গিয়ে এক হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়াল। এখান থেকে উত্তরার হাইওয়ে ব্যস্ত শহর দৃশ্যমান। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে সব জায়গায় বৈদ্যুতিক লাইটগুলো জ্বালে উঠছে। ইফান ব্যস্ত শহরের দিকে তাকিয়ে আমার কণ্ঠ শুনার অপেক্ষায়।
জুই আমার এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে কানের কাছে জোর করে ফোন রেখে সরে বসল। আমি কোনো কথা না বলে চুপচাপ আগের মতোই রইলাম। কিছুটা মূহুর্ত নিরবতা বিরাজ করে। ইফান আর আমার কণ্ঠ শুনার অপেক্ষায় রইল না। হাস্কি স্বরে আওড়ালো,
–“বুলবুলি।”
ব্যাস! লোকটার মুখে তাঁর দেওয়া আমার ডাকনাম শুনেই কেমন যেন করে উঠল বুকটা। আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে মন অভিমানী হয়ে কেঁদে উঠল। আমি ফুঁপিয়ে উঠলাম, সেই সাথে দুর্বল দেহটাও কাঁপতে লাগল। জুই আর ফারিয়া নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে নিল। ইফানের কানে আমার ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ পৌঁছাতেই তার বেঈমান হৃদয়টা আবারও গতি হারাল। আমার কানে আসছে তার বুকের সেই ধুকপুকানির আওয়াজ। ইফান প্যান্টের পকেটে রাখা হাত বের করে বুকের বাঁ পাশে চেপে ধরল। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে পুনরায় হাস্কি স্বরে ডেকে উঠল,
–“জান, কি হয়েছে তোমার?”
এবার আরও জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। ইফান চোখ বন্ধ করে হতাশ কণ্ঠে আওড়ালো,
–“বুলবুলি।”
কেন যেন আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না। লোকটার গলার স্বর যত শুনছি ততই যেন ভেতর থেকে আমি ভেঙে পড়ছি। আমি তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিলাম। ফোন কেটে যাওয়ার টুটটুট আওয়াজ শুনে ইফান আটকে রাখা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ফোন কেটে গেছে বুঝার পরও আরও বেশ অনেকটা সময় ফোন কানে ধরেই ইফান সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে।
ইফান পুনরায় ডেস্কের কাছে আসতেই ইনান জিজ্ঞেস করল,“ভাই এখন কি আপনি বাসায় চলে যাবেন?”
–“নোপ। এখনও তো আমার বাপের সাথে বুঝাপড়া করাই বাকি। কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে সেই ভদ্রলোক?”
–“জি ভাই ঢাকাতেই আছে।”
ইনানের কথার পর ইফান আর কোনো কথা বলল না। সে ডেস্ক থেকে ল্যাপটপ নিয়ে সিঙ্গেল কাউচটিতে পায়ের উপর পা তুলে বসল। তারপর ল্যাপটপটি উরুতে রেখে কাজে মনযোগ দিল।
বাইরে থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে। জিতু ভাইয়া বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। জুই বিকেলে রান্না করে দেওয়ার পর চৌধুরী বাড়ি চলে আসে। জুই বলেছিল খাবার খাইয়ে তারপর যাবে। কিন্তু তখন জিতু ভাইয়া মানা করে দিয়ে বলে পরে নিজে বেড়ে খেয়ে নেবে। কিন্তু তারপরই জ্বর আরও বেড়েছে। তাই আর খাওয়াও হয়নি। এখন শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে। জ্বরের কারণে তাঁর শরীর শীতে কাঁপছে। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। জিতু ভাইয়া ঠাহর করেও চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। তাঁর অসুস্থ দেহ নিয়ে বিছানা থেকে নামা এখন সম্ভব নয়। কিন্তু কলিং বেল বেজেই চলেছে। জিতু ভাইয়া ধীরে ধীরে চোখ খুলে দরজার পানে নিভু নিভু চোখে তাকাল। এই ভরসন্ধ্যাবেলা তার কাছে কে আসবে? আবির আসে নি তো! জিতু ভাইয়া না চাইতেও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মূহুর্তেই শীতে শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠল। সেসবে তোয়াক্কা না করে নিজেকে স্ট্রং করে দরজা খুলে দিল। বাইরে চোখ রাখতেই জিতু ভাইয়ার কপাল কুঁচকে গেল। একজন হেংলা পাতলা গড়নের মুন্সি হুজুর লোক দাঁড়িয়ে। পরনে তার সাদা পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। মাথায় পাগড়ি পরে। চোখে একটা কালো চশমা। জিতু ভাইয়াকে দেখা মাত্রই লোকটা ঠোঁট প্রসারিত করে হেসে বলে উঠলো,
–“আসসালামু আলাইকুম। ভালো আছিসরে পাগলা?”
–“ওয়ালাইকুম আসসালাম। কিন্তু কে আপনি?”
জিতু ভাইয়া হুজুর লোকটার কথার ধরন দেখে চোখ সরু করে সালামের জবাব দিয়ে সন্ধিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল। হুজুর লোকটা এক গাল হেসে তাঁর ঘন লম্বা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বলল,
–“আমি হলাম মোহাম্মদ আবদুল রহমান সৈয়দ আকবর করিম ফকির নোহান।”
হুজুর লোকটার নাম শুনে খুকখুক করে কেশে উঠল জিতু ভাইয়া। লোকটা তৎক্ষনাৎ জিতু ভাইয়ার পিঠ চাপড়ে দিতে লাগল। জিতু ভাইয়া তৎক্ষনাৎ নিজেকে স্বাভাবিক করে সরে দাঁড়িয়ে হুজুর লোকটার উদ্দেশ্য বলল,
–“তো হুজুর মোহাম্মদ আবদুল রহমান সৈয়দ আকবর করিম ফকির নোহান আমার কাছে কি দরকার?”
হুজুর লোকটা দাঁড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে দাঁত বের করে হেসে বলল,“হক মাওলা। রাব্বুল আলামিন আমাকে তোর কাছে পাঠিয়েছে রে পাগলা।”
–“হোয়াট!”
জিতু ভাইয়া আশ্চর্য হয়ে আওড়ালো। অতঃপর চোয়াল শক্ত করে বলে উঠল,“আমার সাথে ফাইজলামি পেয়েছেন মিয়া? আপনি জানেন আপনি কার সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন?”
হুজুর লোকটা আবারো দাঁত বের করে হাসল। অতঃপর সহাস্যে বলে উঠল,“কেন জানবনারে পাগলা! তোর সম্পর্কে মাবুদ আমায় সকল জ্ঞান দান করিয়া পাঠিয়াছে। তুই হচ্ছিস একজন সিআইডি লোক। তোর বোনের অসুখ তাই তোর মন খারাপ অনেক। সেজন্য কদিন ধরে অফিসেও যাচ্ছিস না।”
হুজুর লোকটার কথা শুনে জিতু ভাইয়া না চাইতেও অবাক হল। তিনি অস্পষ্টে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
–“এত কিছু কি করে জানে!”
জিতু ভাইয়ার কথা হুজুর লোকটার কর্ণপাত হতেই হো হো করে হেসে উঠল। তিনি আবার বলে উঠলেন,
–“তোর সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানিরে পাগলা। এই যে তোর একটা বড়সড় নুনু আর দুটো বি** আছে।”
হুজুর লোকটার হঠাৎ এমন খাপছাড়া কথা শুনে জিতু ভাইয়ার চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। তিনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই হুজুর লোকটা দাঁত বের করে হেসে বলে উঠলেন,
–“তুই চাইলে তোর ইয়েটা আরেকটু বড় হওয়ার দোয়া পড়ে দিতে পারি।”
হুজুর বলা শেষ করেই চোখের সামনে হাত ধরে আঙুল নাড়িয়ে বলতে লাগলেন,
–“চু মন্তর চু।
কাইল্লয়া কুত্তার গু।
আরেকটু বড় হয়ে যা জিতুর নুনু।”
হুজুর চোখ বন্ধ করে আত্মবিশ্বাসের সাথে মন্ত্র পাঠ করছে। এদিকে আচমকা হুজুরের নকল গোঁফ একদিকে খুলে ঝুলে পড়েছে। এটা দেখা মাত্রই জিতু ভাইয়ার চোখ কপালে। নোহাকে চিনতে জিতু ভাইয়ার আর এক সেকেন্ড সময়ও লাগল না। রাগে জিতু ভাইয়ার শক্ত চোয়াল আরও শক্ত হয়ে উঠেছে। নোহা ভুয়া মন্ত্র পাঠ শেষ করে চোখ খুলে জিতু ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
–“দিয়েছি মন্ত্র পড়ে,
বেড়ে যাবে নু”নু হইহই করে।”
জিতু ভাইয়া দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত পিষে সহাস্যে বলে উঠলো, “এত বড় উপকার করেছন, তো হুজুর মোহাম্মদ আবদুল রহমান সৈয়দ আকবর করিম ফকির নোহান আপনি তো পুরুষ্কার ডিজার্ভ করেন। এক মিনিট, আমি আসছি এক্ষুনি।”
জিতু ভাইয়া ভেতরে যেতেই খুশিতে গদগদ করতে লাগল নোহা। মিনিট হওয়ার আগেই জিতু ভাইয়া হাজির। নোহা জিতু ভাইয়াকে দেখে বলে উঠল,
–“তো কি এনেছিস পাগলা?”
–“তোর ঘাড়ের ভুত ছাড়ানোর মেডিসিন।”
কথাটা বলেই পিছন থেকে ঝাঁটা বের করল জিতু ভাইয়া। এদিকে নোহাকে আর পায় কে! নোহা চোখের কালো চশমা খুলে ফেলে দিয়ে উল্টো দিকে দৌড় লাগাতে লাগাতে চেঁচিয়ে উঠল,
–“পালাআআও..”
নোহার পিছনে ঝাঁটা হাতে নিয়ে দৌড় লাগাল জিতু ভাইয়া। আপাতত তিনি ভুলে বসেছে তিনি যে অসুস্থ। এদিকে করিডর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নোহা নামতে যাবে তার আগেই জিতু ভাইয়া নোহার পরনের লুঙ্গি টেনে ধরল। কিন্তু এই মূহুর্তে কোনো বাঁধায় যেন নোহাকে থামাতে পারবে না। সে সেভাবেই দৌড়ে পালাল। এদিকে নোহার পরনের লুঙ্গি খুলে জিতু ভাইয়ার হাতে রয়ে গেল। জিতু ভাইয়াও থামার লোক নয়। তিনিও হাতের ছেঁড়া লুঙ্গি ফেলে নোহার পিছনে দৌড়াতে লাগলেন। বর্তমানে নোহার পরনে একটা বড় সাইজের পাঞ্জাবি। তার ফাঁক দিয়ে কালো জিন্সের শর্ট প্যান্ট দৃশ্যমান। নোহার সেসবে কোনো হুঁশ নেই। সে প্রাণপণে ছুটছে। এখন জিতু ভাইয়া ধরতে পারলেই কয়েক ঘা তার গালে পড়বে। আর এটা আজ নোহা কিছুতেই হতে দিবে না। নোহা বেশ কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্ল্যাটের গেইটের কাছে চলে আসল। সে পিছনে উঁকি দিতেই লক্ষ্য করল জিতু ভাইয়া নেই। তার মানে কি চলে গেছে! নোহা নখ কামড়ে ভাবতে লাগল। তারপর কিছু একটা ভেবে আবার পিছনে হাঁটতে লাগল। উঁকিঝুঁকি দিয়ে যখন সিঁড়ির কাছে আসল তখনই চোখ দুটো তার কপালে। জিতু ভাইয়া সিঁড়িতে বসে বুকে হাত ধরে হাঁপাচ্ছে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে শ্বাসকষ্ট ভেসেছে। নোহা মুখের নকল দাঁড়ি, গোঁফ আর চুল খুলে ফেলে দৌড়ে জিতু ভাইয়ার কাছে গিয়ে বসল। অস্থির হয়ে জিতু ভাইয়ার বাহুতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“জিতু বেইবি কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ করছে তোমার?”
জিতু ভাইয়া কোনো উত্তর করল না। তার প্রচুর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। নোহা জিতু ভাইয়ার বুকে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিতু ভাইয়ার মাথায় ফুঁ দিতে লাগল। জিতু ভাইয়া নোহার হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়াতে নিলে খেই হারিয়ে পড়ে যাবে তক্ষুনি নোহা ঝাপটে ধরল। জিতু ভাইয়া ঘনঘন শ্বাস ছেড়ে বলল,
–“দূরে সর।”
নোহা মুটেও সরল না। বরং আরও শক্ত করে ঝাপটে ধরে উতলা কন্ঠে বলল,“ওহ্ হলি! তোমার তো ভীষণ ফেবার হয়েছে! এখন কি হবে!”
–“কিচ্ছু হবে না। ছাড় আমায়।”
জিতু ভাইয়া পুনরায় নিজেকে নোহার থেকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। তবে কয়েকটি সিঁড়ি যেতে না যেতেই তার ভারী দেহ নিজের অসুস্থ দেহের ভার নিতে না পেরে পড়ে যেতে নিলে নোহা গিয়ে আবারও ঝাপটে ধরে নিল। জিতু ভাইয়া অনেকবার মানা করার পরেও নোহা কোনো কথা শুনল না। সে জিতু ভাইয়াকে ধরে রুমে নিয়ে আসল। জিতু ভাইয়া রুমে আসতেই বলে উঠলো,
–“তুমি এবার আসতে পার।”
–“জিতু বেইবি তুমি অনেক সিক। ইউ নিড গুড ট্রিটমেন্ট।”
–“তা আমি বুঝে নেব। তুমি এখন আসতে পার।”
নোহা শুনল না। জিতু ভাইয়াকে জোর করে বিছানায় শুইয়ে দিল। জিতু ভাইয়ার আর কথা বলার অবস্থাও নেই। দেহ একদম নেতিয়ে পড়েছে। নোহা জিতু ভাইয়ার কপালে হাত দিয়ে দেখল গা একদম জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। মেয়েটা আঁতকে উঠে বলল,
–“ওহ্ গশ তোমার শরীর তো অনেক গরম। তুমি ঔষধ খেয়েছ?”
জিতু ভাইয়া কোনো উত্তর করল না। নোহা একটু খুঁজতেই ঔষধ পেয়ে গেল। সে সেগুলো রেখে রান্নাঘরে গেল হালকা কিছু খাবার আনতে। আগে থেকেই রান্নাঘরে রান্না করা খাবার দেখে সে খুশি হয়ে গেল। ঝটপট প্লেটে গুছিয়ে জিতু ভাইয়ার কাছে আসল। অতঃপর খানিকটা ভাত মেখে জিতু ভাইয়াকে বলল,
–“একটু খেয়ে নাও তুমি। না খেলে তো খালি পেটে ঔষধ খেতে পারবে না। হা কর হা।”
জিতু ভাইয়া বিরক্তি নিয়ে আধখোলা চোখে নোহার দিকে তাকিয়ে বলল,“প্লিজ তুমি চলে যাও। যতটুকু করেছ তার জন্য থ্যাংক্স।”
–“আচ্ছা ঠিক আছে আমি চলে যাব। কিন্তু তুমি তো অনেক সিক একটু খেয়ে নাও। তারপর ঔষধ খাইয়ে দিয়ে আমি চলে যাব, প্রমিজ।”
জিতু ভাইয়া চোখ বন্ধ করে মৃদু কণ্ঠে বলল,“রেখে চলে যাও পরে খেয়ে নিব।”
–“পরে কিভাবে খাবে! তুমি তো চোখ খুলে তাকাতেই পাচ্ছ না। আমি খাইয়ে দিই।”
নোহা এক দলা ভাত জিতু ভাইয়ার মুখের সামনে ধরতেই জিতু ভাইয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল। শক্ত কন্ঠে বলল,
–“আমার শরীর ঠিক নেই। এক কথা বারবার বলতে ভালো লাগছে না। তুমি চলে যাও।”
নোহা এবার এক প্রকার জেদ ধরে বলল,“তুমি আগে খাও, তবেই আমি যাব।”
জিতু ভাইয়া না চাইতেও এবার নোহার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো, “খাব না বলছি তো।”
–“কেন খাবে না?”
নোহার প্রশ্নে জিতু ভাইয়া এক পলক নোহার খাবার ধরে রাখা হাতের দিকে তাকিয়ে চোখমুখ স্বাভাবিক করে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। নোহা নিজের হাতের দিকে এক পলক তাকাল। চুপচাপ এক মূহুর্ত ভাবল৷ পর মূহুর্তেই এক দু ফোটা তপ্তজল গাল বেয়ে তার হাতে পড়ে গেল। নোহা আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে যা বুঝার বুঝে গেছে বোধহয়! নোহা হাত ধুয়ে উঠে দাঁড়াল চলে যাবে বলে। নোহা বিনা বাক্যে চলেই যাচ্ছিল, তখন জিতু ভাইয়ার মৃদু গো’ঙ্গানির শব্দ শুনে না চাইতেও দাঁড়িয়ে পড়ে। নোহা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবে কি করবে! অতঃপর আবারো জিতু ভাইয়ার কপালে হাত রেখে অনুভব করে জ্বর আরও বেড়ে চলেছে। এদিকে জ্বরের তোপে জিতু ভাইয়ার হুঁশও নেই। নোহা আর সময় নষ্ট না করে জিতু ভাইয়ার কপালে জলপট্টি দিতে লাগল।
রাত হয়েছে অনেকটাই। নাবিলা চৌধুরী আর নুলক চৌধুরী দু’জনেই সন্ধ্যার দিকে আমাকে এসে একবার দেখে গেছে। নাবিলা চৌধুরী এক দুটো কথা বললেও নুলক চৌধুরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। বর্তমানে ড্রয়িং রুমে আছে পলি, জুই আর মনিরা বেগম। জুই আর পলিকে মনিরা বেগম বেড়ে খাওয়াচ্ছে। পলি খেতে খেতে বলল,
–“কাকিয়া তুমিও বসে পড়।”
মনিরা বেগম হেসে বলল,“তোমরা খেয়ে ওঠ আগে। এদিকে মীরা আর ফারিয়াটা জাহানারার ঘরে গেল খাবার নিয়ে। কে জানে মেয়েটা খেল কি না! শুনলাম আসছে থেকেই নাকি একটু পরপর কাঁদছে!”
পলি খেতে খেতে বলল,“আমিও গিয়েছিলাম একবার দেখতে। কিন্তু ভাবি কথাবার্তা বলেনি। আমিই কিছুক্ষণ একা একা এটা-ওটা বলে চলে এসেছি।”
কাকিয়া আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই নজরে পড়ে জুই ওদের কথা শুনে খাওয়া বন্ধ করে মুখ ভার করে বসে আছে। কাকিয়া কথা ঘুরিয়ে বলল,“জুই মা রান্না কি ভালো হয় নি?”
জুই চটজলদি ঠোঁট প্রসারিত করে বলল,“জি আন্টি ভালো হয়েছে।”
–“তাহলে খাচ্ছ না কেন সোনা?”
–“খাচ্ছি তো আন্টি।”
বলে জুই হাসলো। মনিরা বেগম মুগ্ধ নয়নে জুইয়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলে উঠলো, “জুই সোনা তুমি দেখতে মাশাআল্লাহ খুব মিষ্টি। তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে।”
এভাবে প্রশংসা শুনে লজ্জায় লাজুক হেসে মাথা নিচু করে নিল জুই। এদিকে মনিরা বেগম নিজের গলার সোনার চেইনটা খুলে আচমকা পিছন থেকে জুইয়ের গলায় পড়িয়ে দিল। জুই খানিকটা ভরকে গেল। মনিরা বেগম জুইয়ের থুতনিতে আলতো ছুঁইয়ে নিজ হাতে চুমু খেয়ে বলল,
–“মাশাআল্লাহ তোমাকে তো খুব সুন্দর মানিয়েছে?”
পলিও সুর মিলিয়ে বলল,“আরে তাই তো। জুই খুব সুন্দর লাগছে তোমার গলায়।”
জুই এমন পরিস্থিতিতে কি বলবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ কেউ এভাবে কাউকে সোনার দামি চেইন পরিয়ে দেয় নাকি! জুই মনে মনে এটা-ওটা ভাবল। আবার মনিরা বেগমনের প্রশংসাও করল। মহিলাটা অসলেই অনেক সরল মনের আর মিশুক। আসছে থেকে জুই দেখছে এই বাড়ির সবচেয়ে বেশি দায়িত্বশীল আর যত্নশীল একজন মহিলা মনিরা বেগম। জুইয়েরই তো একটু পরপর খেয়াল রাখছে। জুই চুপচাপ বসে রইল। পরনে তার ইতির একটি নতুন গাউন জামা। জুই সেটা পরে আছে। আবার সুন্দর করে মাথায় কাপড়ও দিয়ে রেখেছে। মনিরা বেগম জুইয়ের পাতে খাবার তুলে দিতে দিতে হেসে মজার ছলে বলে উঠলেন,
–“ইশশ কত ইচ্ছে নিজের হাতে ছেলের বউকে খাওয়ানোর। কিন্তু আমার বাদর ছেলে তো বিয়ে করার নামই নেয় না। যাক আজ আমার ইচ্ছে খানিকটা পূরণ হল। এবার ম’রলেও শান্তি পাব।”
মনিরা বেগমের কথাবার্তা জুইয়ের মাথার উপর দিয়ে গেল। পাশ থেকে পলি বলে উঠলো, “এমন করে কেন বলছ কাকিয়া? বউমার এত সখ থাকলে আমাদের ভাবির বোনকেই বানিয়ে নাও। ভারি মজা হবে কিন্তু।”
নিজের কথা শেষ করে খিলখিল করে হেসে উঠল পলি। মনিরা বেগমও মুচকি হাসল। এদিকে পলির কথা শুনে জুই হতবাক। তাকে নিয়ে এসব কি বলছে! মনিরা বেগমের ছেলে মানে ঐ অহংকারী খবিশ লোকটা। আর তাকে কিনা ঐ লোকটার বউ বানানোর কথা বলছে! এসব ভাবতেই চোখমুখ কুঁচকে নিল জুই। তার তো খেয়েদেয়ে কাজ নেই এমন অসভ্য মার্কা লোককে বিয়ে করতে! দেশে কি ভালো ছেলের অভাব নাকি! জুইয়ের ভাবনার মধ্যেই মনিরা বেগম সহাস্যে বলে উঠলো,
–“কি গো সোনা আমি শাশুড়ি হলে কেমন হবে বল? তুমি কিন্তু আমার বউমা হলে দারুণ হবে। সময়ে অসময়ে দু’জনে সুখে-দুঃখের গল্প করব।”
জুই মাথা নিচু করে বসে রইল। কি বলবে তার কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। পলি হেসে বলল,“কাকিয়ার মতো শাশুড়ি পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার জুই৷ তিনি ছেলের বউ না মেয়ের মতো রাখবে। কজনে পায় এমন শাশুড়ি! এই যে দেখ আমার আর তোমার বোনের শাশুড়ি কি সাংঘাতিক! মাকে দেখলেই তো অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।”
শেষের কথা গুলো পলি ফিসফিস করে বলে। অতঃপর উচ্চ স্বরে হেসে দেয়। মনিরা বেগমও পলির কথায় ঠোঁট টিপে হাসে। তারপর তিনি বললেন,“আমার ছেলেও কিন্তু লাখে একটা। নম্র-ভদ্র, মেয়ে দেখলেই দূরে দূরে চলে।”
এই কথাটা শুনে জুইয়ের হাসি পেল। খবিশ লোকটা নাাকি মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে! আহারে তিনি তো জানেনই না তাঁর ছেলে যে মেয়ে দেখলেই খালি গায়ে পড়ে! মনে মনে কথাগুলো উগড়ে দিল জুই। পরক্ষণেই ভাবতে লাগলো, সত্যিই তো মনিরা বেগমের মতো একজন শাশুড়ি পাওয়া ভাগ্যের বিষয়। সে আমার থেকে মনিরা বেগম সম্পর্কে অনেক ভালো ভালো কথা শুনেছে। কিন্তু এত ভালো একজন মানুষের এমন অসভ্য ছেলে কেন হলো? জুই মাথা নাড়িয়ে এসব ভাবনা দূরে ঠেলে দিল। এদিকে ওদের কথাবার্তার মাঝে সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে মীরা আর ফারিয়া নামতে থাকে। মনিরা বেগম মীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,
–“খাওয়াতে পেরেছিস?”
মীরা কথা না বলে ঠোঁট উল্টো মাথা নাড়াল। যার অর্থ না। ফারিয়া হটপট ডাইনিং টেবিলে রেখে ধপ করে বসে পড়ল চেয়ারে। মনিরা বেগম মীরা আর ফারিয়ার খাবার পরিবেশন করতে করতে বলল,
–“আচ্ছা থাক, তোদের আর পরিশ্রম করতে হবে না। রাত অনেকটা হয়েছে। তোরা খেয়ে শুয়ে পড় গিয়ে। আমি দেখছি।”
–“মম তুমিও বসে পড়।”
–“তোরা খেয়ে নে। আমি জাহানকে খাইয়ে খেয়ে নিব। আর তোর বাপ ভাইও তো এখনো আসে নি।”
মীরা খাবার চিবাতে চিবাতে বলল,“কারো জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই। আজ কেউ আসবে না। পাপা আর ইমরান ভাইয়া বড় আব্বুর সাথে আছে। আর তোমার ছেলে একটা কাজে আছে। যখন কাজ শেষ হবে তখন ফিরবে।”
মীরার কথার পরেই ফারিয়া বলে উঠল,“শুনেছি উনিও নাকি ইমরান ভাইয়ার সাথে আছেন।”
ফারিয়ার কথায় সকলে তার দিকে তাকাল। ফারিয়া অপ্রস্তুত হেসে বলল,“না মানে পঙ্কজ স্যারের কথা বলছিলাম।”
পলি উঠতে উঠতে বলল,“আজকাল দেখছি পঙ্কজ ভাইয়ার খোঁজ খবরই বেশি নিচ্ছ! কি ব্যাপার?”
ফারিয়া দাঁত বের করে এক গাল হেসে বলল,“কই না তো!”
পলি তার আর জুইয়ের প্লেট নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে উঠল,“না করায় ভালো। পরে দেখবে তার খুঁজ খবর রাখতে গিয়ে নিজেই নিখোঁজ হয়ে যাবে। হাহাহা।”
হেয়ালির স্বরে কথাগুলো বলে হেসে ফেলল পলি। ফারিয়া চোরের মতো মাথা নিচু করে খেতে ব্যস্ত হলো। এদিকে কোণ চোখে পলির দিকে বেশ কিছুটা সময় মীরা এক ধ্যানে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবনায় তলিয়ে গেল।
রুমের দরজা খোলা থাকায় নক না করেই ভেতরে আসল মনিরা বেগম। আমি শুয়ে আছি অপর দিকে ফিরে। মনিরা বেগম হটপট রেখে আমার পাশে এসে বসলেন। আমার মাথায় হাত রাখতেই আমি বলে উঠলাম,
–“কে?”
–“আমি কাকিয়া।”
আমি এপাশে ঘুরলাম ধীরে ধীরে। আমার শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া চেহারা দেখে মনিরা বেগমের বড্ড মায়া হলো। তিনি এক হাতে আমার সারা মুখে আদুরে পরশ বুলিয়ে বলল,
–“আহা রে! এই কদিনে শরীরের কি দশা হলো! সেই দেখেছিলাম কত তাজা ছিল শরীরটা। আর এখন!”
মনিরা বেগম থেমে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,“আচ্ছা যাক। তুমি বেঁচে ফিরেছ এখন স্বাস্থ্য আবার হবেনে খন। এখন তুমি খাচ্ছ না কেন? এভাবে না খেয়ে থাকলে তো শরীর খারাপ করবে। আর এখন তো তুমি আর একা নেই। ভুলে গেছ তোমার পেটে আরেকজন আছে?”
কাকিয়া বলা শেষ করতে না করতেই আমি উনার গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে উঠলাম,“আমার বাচ্চাটা আর নেই কাকিয়া। আমার বাচ্চাটা আর নেই।”
–“এসব কি বলছ তুমি?”
–“আমি আর কখনো মা হতে পারব না কাকিয়া। আর কোনোদিন পারব না। ও শাস্তি দিয়েছে আমায়। আমার আর মা হওয়ার ক্ষমতা নেই।”
আমি কাকিয়ার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। কাঁদতেও বড্ড কষ্ট হচ্ছে বুকে। মনে হচ্ছে দম আটকে আসছে। কাকিয়া স্তব্ধ হয়ে গেছেন আমার কথা শুনে। তিনি আমার পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শুধালেন,
–“এসব কি অলক্ষুণে কথা বলছ সোনা? কি হয়েছে আমাকে বল?”
–“আমার গুলি লাগায় অনেক র’ক্তক্ষরণ হয়। যার কারণে আমার পেটের ভ্রুণটি নষ্ট হয়ে যায়। আর আমি আগে ইচ্ছে করে ইফানকে শাস্তি দিতে আমার প্রথম ভ্রুণকে মে’রে ফেলেছিলাম। ইফান আমায় শাস্তি দিয়েছে কাকিয়া। আমি আর কোনোদিন মা হতে পারব না।”
আমি কাঁদতে লাগলাম। কাকিয়ার চোখদুটো ভিজে উঠল। আমার আহাজারি শুনে বড্ড মায়া হচ্ছে উনার। তিনি হঠাৎ বলতে লাগলেন,
–“তোমার কপালটাও দেখছি জেসমিনের মতোই পুড়া!”
ফুপির নাম শুনতেই কান্না থামিয়ে এক মূহুর্ত চুপ হয়ে গেলাম। অতঃপর সোজা হয়ে কাকিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আওড়ালাম,
–“মানে?”
মনিরা বেগম উদাস হয়ে গেলেন। হঠাৎ গভীর ভাবনায় তলিয়ে গিয়ে বলতে লাগলেন, “জানো জারা, তোমার কাকাই আমাকে সব কথা বলত। এই যেমন, আমার বিয়ে হওয়ার পর থেকে দেখতাম আপা আর বড় ভাইয়ের ঝামেলা। তোমার কাকাইকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওনাদের মধ্যে কিসের এত ঝামেলা? তখন তিনি বলেন, আগে ঝামেলা ছিল না। কিন্তু যবে থেকে নাবিলা আপার কলেজের ভালো বান্ধবী জেসমিনকে দেখে তবে থেকেই তাদের মধ্যে সম্পর্কে ভাঙন ধরে। বড় ভাই নাকি জেসমিনকে ভালোবেসে ফেলেছিল। তাই সবার আড়ালে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠে। সকলে জানে তাদের মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ঠিক তা না। বড় ভাইয়া জেসমিনকে বিয়ে করেছিল। যা কেউ জানে না আজ পর্যন্ত। শুধু কয়েকজন জানে। এমনকি এই কথা আপাও জানেন না। তিনি শুধু জানেন জেসমিনের সাথে বড় ভাইয়ের অবৈধ সম্পর্ক হয়েছিল। এমনকি জেসমিনের বাচ্চাও হয়েছিল৷ তারপর হাসপাতালে কিছু একটা হয়। বড় ভাই পাগলের মতো জেসমিনকে ভালোবাসতো। বলতে গেলে সেই রুপসীর জন্য উন্মাদ ছিল। উনার ধারনা মতে, হাসপাতালে জেসমিনকে কেউ ভুল ইনজেকশন দিয়ে খু”ন করেছে। এমনকি যে নার্সকে সন্দেহ করা হয়েছিল কদিন পর সেই নার্সও খু”ন হয়। আজও কেউ জানতে পারে নি সেদিন হাসপাতালে জেসমিনের সাথে ঠিক কি হয়েছিল!”
কাকিয়ার কথায় আমি বাক শক্তি হারিয়ে ফেললাম যেন! ফুপির সাথে এতো কিছু ঘটে গেছে! অথচ আমার পরিবার এইটুকু জানে ফুপির মৃত্যুটা অস্বাভাবিক ছিল। তিনি ভার্সিটি স্টুডেন্ট হওয়ায় পড়ালেখার জন্য ঢাকা হোস্টেলে থাকতেন। উনার মৃত্যুর আগে শেষ পাঁচ মাস আমাদের বাড়ির কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ করেনি। একেবারে হসপিটাল থেকে উনার লা”শ শেখ বাড়িতে পৌঁছায়। আর বেশি না ভেবে আমি নিজেকে ধাতস্থ করে অবিশ্বাস্য স্বরে কাকিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম,
–“আমার ফুপি এমন মানুষ ছিলেন না। আমার আব্বু বলেছে, ফুপি অনেক শান্ত আর সুশৃঙ্খল মেয়ে ছিল৷ পড়ালেখার বাইরে তার আর কোনো হুঁশ ছিল না। কারো সংসার ভাঙার তো প্রশ্নই আসে না। তার চেয়েও বড় পয়েন্ট ফুপি অনেক ভীতু প্রকৃতির মেয়ে ছিল। কাউকে না জানিয়ে একজন লোককে বিয়ে করে সংসার! অসম্ভব বিষয়!”
কাকিয়া তপ্তশ্বাস ছেড়ে বললেন, “হ্যা ঠিক বলেছ। জেসমিন অনেক ভালো একটা মেয়ে ছিল। সে লুকিয়ে বিয়ে করতে চায়নি। বড় ভাইয়া ওকে পাওয়ার জন্য অনেক ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়। মিথ্যা বলে তাদের সংসার শুরু করে৷ এমনকি জেসমিনকে পাওয়ার জন্য কবিরাজিরও আশ্রয় নেয়। একটা সত্যি কথা কি জান?”
আমি শুধু আশ্চর্য হচ্ছি কাকিয়ার কথাগুলো শুনে। সবার আড়ালে এতো ঘটনা লুকিয়ে! আমি অবাক স্বরে আওড়ালাম,
–“কি?”
–“ইসলামে কবিরাজি বিশ্বাস করা হারাম হলেও এটা সত্যি, কবিরাজি একজন মানুষকে কবর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে। আর সেইখানে তো জেসমিনকে বিয়ে করার জন্য কবিরাজি করা হয়েছিল। আমি ভুল না হলে, খুব বাজেভাবে জেসমিন কালো জাদুর স্বীকার হয়েছিল। খুব পাগলামি করতো। সবসময় তার সাথে ভাইকে চাইত। সেইজন্যই তো বড় ভাই আপার সাথে ঝামেলা করে দিনের পর দিন জেসমিনের কাছে পড়ে থাকত। কিন্তু কিভাবে জানি একদিন জেসমিন জানতে পারে তাকে ঠকাচ্ছে ইকবাল চৌধুরী। এটা সত্যি ইকবাল চৌধুরী তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে। কিন্তু তাকে পাওয়ার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেয়। জেসমিন তাঁর বেস্ট ফ্রেন্ডের সংসার ভাঙার কারণ হয়ে অনেক অনুতপ্ত ছিল। সে সরে আসার জন্য পাগলামি শুরু করে। তবে সে তখনও কালা জাদুর স্বীকার হয়। ফলে না চাইতেও বড় ভাইয়ের কথা শুনতে বাধ্য হতো।”
–“এতো কিছু ঘটে গেল! আচ্ছা কাকিয়া কে হতে পারে আমার ফুপির খু”নি?”
আমার প্রশ্ন শুনে আড়ালে ঢোক গিলল মনিরা বেগম। তিনি কিছু একটা ভাবনায় মগ্ন। তারপর ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
–“সেটা আসলে আমার জানা নেই গো।”
আমি বিড়বিড় করে আওড়ালাম,“কে হতে পারে তাহল? নাবিলা চৌধুরী!”
এসব ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে কাকিয়াকে পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম,“কাকিয়া তুমি বললে ফুপির বাচ্চা হয়েছিল। তাহলে বাচ্চাটা কোথায়?”
মনিরা বেগম কোমন অস্থির আচরণ করতে লাগলেন। মানে তিনি দ্বিধাবোধ করছেন। আসলে কি বলবেন ,নাকি বলবেন না! আমি উনার দিকে তাকিয়ে আছি উত্তরের আসায়। মনিরা বেগমের গলা শুকিয়ে আসছে। তিনি এখন অনুভব করছেন এতো কিছু বলে ভুল করে ফেলেছেন বড্ড বেশি। অপরদিকে দরজার বাইরে থেকে এক জোড়া র’ক্তাভ চোখ মনিরা বেগমের দিকে স্থির হয়ে আছে। যদি সেই ক্রোধে ফেটে পড়ে লাল হয়ে উঠা চোখ দু’টোতে ক্ষমতা থাকত, তাহলে বোধহয় মনিরা বেগমকে ভস্ম করে দিত। কিন্তু আপাতত পারল না। কারো পায়ের শব্দ কানে আসতেই পিছনের দিকে তাকাতেই দেখল ফোনের দিকে দৃষ্টি স্থির করে ইফান নিজ রুমের দিকে এগিয়ে আসছে। আগন্তুক চটপট সেখান থেকে সরে পরল।
–“কি হলো কাকিয়া? বাচ্চাটা কি বেঁচে আছে?”
মনিরা বেগম ঢোক গিলে নিচু কন্ঠে বলে উঠলো, “হ্যা আছে।”
আমি উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। অস্থির হয়ে জানতে চাইলাম, “কোথায় আছে ফুপির বাচ্চা?”
মনিরা বেগম বলতে যাবে তার আগেই দরজা খোলার শব্দ হতেই আমি আর কাকিয়া তৎক্ষনাৎ সেদিকে দৃষ্টি ঘুরালাম। সাথে সাথে ইফানের সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। আমার কেমন জানি ইফানকে দেখে রাগে-দুঃখে কাঁদতে মন চাইছে। আমি নাকের পাঠা ফুলিয়ে মুখ ভার করে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলাম। ইফান তাঁর শান্ত ধুসর বাদামী চোখ দুটো আমার অভিমানী চেহারায় স্থির করে রাখল। মনিরা বেগম ইফানকে দেখতে পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন যেন। তিনি হেসে বলে উঠলেন,
–“এসেছ তুমি। এই দেখ মেয়েটাকে আসছে থেকে বাড়ির সকলে মিলে জোর করছি খাওয়ার জন্য। কিন্তু কিছুতেই একটুও খাওয়াতে পারলাম না। এখন তুমি একটু চেষ্টা করে দেখ।”
নিজের কথাগুলো বলা শেষ করেই কাকিয়া কোমর থেকে একটা ছোট্ট কাগজ বের করে আমার হাতে মুষ্টিতে পুড়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
–“আরও আগেই দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মাঝখানে তুমি ছিলে না। এই যে, এই কাগজে একটা তাবিজ আছে৷ কোমরে পড়ে নিও। লতাকে দিয়ে অনেক দূর থেকে আনিয়েছি। আল্লাহ ভরসা, কেউ চাইলেও তোমার সাথে কুফরি করতে পারবে না। সাবধানে থেকো কেমন।’
মনিরা বেগম উঠে দাঁড়ালেন। যাওয়ার সময় ইফানকে বললেন,“হটপটে খাবার আছে। ওকে খাইয়ে দিও। আর তোমার খাবার কি রুমে নিয়ে আসব?”
–“উহু লাগবে না।”
–“আচ্ছা, কিছু লাগলে আমাকে ডেকে নিও।”
মনিরা বেগম রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। ইফান রুমের দরজা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল৷ আমি বালিশের নিচে ছোট্ট তাবিজ মুড়ানো কাগজটা গুঁজে নিজেও বালিশের উপর শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিলাম।
ইফান আমাকে কিছুক্ষণ শান্ত চোখে দেখে হাতের একগাদা শপিং ব্যাগগুলো কাউচের উপর রেখে হাতের ঘড়িটাও খুলে নিল। অতঃপর নিঃশব্দে কাভার্ড থেকে টাউজার আর টিশার্ট নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আমি মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকিয়ে আবারও চোখ সরিয়ে নিলাম। ভীষণ কান্না পাচ্ছে আমার ইফানকে দেখে। এত কান্না করার ফলে গা গুলিয়ে আসছে এখন। এবার তো একটু কিছু খাওয়া দরকার। কিন্তু কিছুই খাব না আমি। ফুপিয়ে কেঁদে আবারো বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়লাম।
ইফান ওয়াশরুমে গিয়ে দুটো সিগারেট ধরিয়েছে। তারপর ধীরে সুস্থে ফ্রেশ হয়ে রুমে আসল। টাউয়াল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বিছানায় আমার দিকে দৃষ্টিপাত করল। আমি চুপচাপ শুয়ে আছি। ইফান ভালোই বুজতে পারছে আমি এখনো সজাগ। সে ধীরে সুস্থে নিজেকে পরিপাটি করে নিল। অতঃপর সাথে করে নিয়ে আসা শপিং ব্যাগগুলো থেকে খাবার বের করে টি-টেবিলটি বিছানার কাছে নিয়ে আসল। ইফান বিছানায় এক পা ভাজ করে বসে পিছন থেকে আমার বাহুতে স্পর্শ করতেই আমি ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলাম। ইফান এবার আমার উপর ঝুঁকে পড়ল। পুনরায় বাহুতে ধরে উঠানোর চেষ্টা করতেই আমি ওর হাত ছাড়িয়ে নিলাম। ইফান এবার এক হাতে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কানের কাছে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে ডেকে উঠল,
–“বুলবুলি উঠো।”
এবার যেন আবারও আমার কান্নার বাঁধ ভাঙল। আমার কোমর পিছিয়ে ধরে রাখা ইফানের হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করতে করতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। দেহটা সেই সাথে কম্পিত হতে লাগল। ইফান আমাকে টেনে তার দিকে ঘুরাতে চাইছে। আমি আরও শক্ত করে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলাম,
–“ছুঁবে না আমায়।”
ইফান আমার মাথায় শব্দ করে চুমু খেয়ে আদুরে কণ্ঠে আবারও ডেকে উঠল, “ওঠে খেয়ে নাও জান।”
–“খাব না আমি৷ কিচ্ছু খাব না।”
–“না খেলে তো শরীর খারাপ করবে!”
–“করুক শরীর খারাপ।”
–“জারা!”
হতাশ কন্ঠে ডেকে উঠল ইফান। অতঃপর জোর করে টেনে তুলে বসাল। আমি চোখ বন্ধ করে কেঁদেই যাচ্ছি। ইফান আমার এলোমেলো চুলগুলো কানে গুঁজে দিয়ে চোখ দুটো মুছে দিল। আমি আবারও শুয়ে পড়তে নিলে শক্ত করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে কড়া কন্ঠে বলল,
–“কি সমস্যা? এমন পাগলামি করছ কেন? আমাকে কিছু না বললে বুঝব কি করে!”
আমি ইফানের বুকে হামলে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললাম,“আমার বাচ্চাকে এনে দাও। আমার বাচ্চাকে এনে দাও।”
ইফান দু হাতে আমাকে তার বুকে আগলে নিল। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,“আমি কোথা থেকে এনে দিব! আর বেবি দিয়ে কি করবে তুমি?”
ইফানের বাক্যটা যেন আমার বুকে গিয়ে বিঁধল। আমি কান্না থামিয়ে ওর বুক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাইলে ইফান আমাকে টেনে তার বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। আমি নিজেকে ছাড়াতে চাইছি কিন্তু পারছি না। এক পর্যায়ে দুর্বল দেহ ইফানের উপর ভার ছেড়ে দিলাম। ইফান আমার এমন বেহাল দশা দেখে আর সময় নষ্ট করল না। প্লেট থেকে খাবার তুলে নিল। আমি খাচ্ছিলাম না শুনে বাইরে থেকে আমার পছন্দের সব আইটেম যেমন: কাচ্চি বিরিয়ানি, সি ফুড, ফলমূল সহ আইসক্রিম, চকলেটও নিয়ে আসছে। ইফান আমার মুখের সামনে খাবার ধরে বলল,
–“হা কর।”
আমি ইফানের কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে ঝিমচ্ছি। ভীষণ খারাপ লাগছে শরীর। তবুও হালকা মাথা নাড়িয়ে বললাম,“খাব না।”
ইফান বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছাড়ল। অতঃপর ক্লান্ত কন্ঠ আবারও ডেকে উঠল, “জারা।”
আমি ভাঙা কন্ঠে আওড়ালাম, “আমার বাবু চাই।”
ইফান চোখ বন্ধ করে নিল। কিছুক্ষণ সেভাবেই চুপ থেকে বলে উঠল,“আচ্ছা দিব। এখন খেয়ে নাও।”
–“মিথ্যা বলছ।”
–“আমি মিথ্যা বলি না।”
আমি নিভু নিভু চোখ তুলে ইফানের দিকে তাকালাম। ইফান আমার মুখে খাবার তুলে দিল। গলা আমার শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ঢোক গিলতে পাচ্ছি না। মুখে খাবার নিয়ে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আবারও চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এসেছে। আঁটকে রাখা কান্নার তোড়ে দেহ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। ইফান ক্লান্ত চোখে আমার এলোমেলো ফ্যাকাসে চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল পলকহীন। আমি চোখ বুজে আবারও ইফানের গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলাম। হিসহিসিয়ে বলে উঠলাম,
–“ভেতরের যন্ত্রণায় আমি মরে যাচ্ছি।”
–“আমিও।”
ইফান তৎক্ষনাৎ প্রতিত্তোর করল। আমি চাইলেও আজ নিজের কষ্টগুলো আড়াল করতে পারছি না। ইফানের সঙ্গ পেয়ে যেন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছি। খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। নিজেকে খুব জোরালোভাবে আ’ঘাত করতে ইচ্ছে করছে। আমি আওয়াজ করে কাঁদতে কাঁদতে ইফানকে জড়িয়ে ধরে ওর পিঠ খামচে ধরলাম।
রাতের খাবার খেয়ে রান্নাঘর গোছানো সহ টুকটাক কাজগুলো সেরে মনিরা বেগম নিজের রুমের উদ্দেশ্য রওনা হলেন। সিঁড়ি বেয়ে করিডর অব্ধি আসতেই মনে হলো তার পিছনে কেউ আছে। অজানা শঙ্কায় মনিরা বেগমের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তিনি ভয়ে ঢোক গিলে ধীরে ধীরে পিছনে ফিরতেই দেখলেন কেউ নেই। কাউকে দেখতে না পেয়ে হাঁপ ছেড়ে যেন বাঁচলেন। বুকে তিন বার বিসমিল্লাহ বলে ফুঁ দিয়ে সামনের দিকে ফিরতেই ধরফরিয়ে উঠলেন। মনিরা বেগমকে ভয় পেতে দেখে অদ্ভুত হাসলেন নুলক চৌধুরী। মনিরা বেগম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠলেন,
–“আমি কিছু বলি…”
মনিরা বেগম বাকি কথা সম্পন্ন করে উঠতে পারলেন না। তার আগেই নুলক চৌধুরী মনিরা বেগমের মুখে কাপড় চেপে ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগলেন।
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে রাত প্রায় অনেকটা গভীর হয়ে গেছে। চৌধুরী বাড়ি সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত। ইফান আমাকে খাইয়ে দিয়ে ফ্রেশ করে দেয়। তারপর সেই তখন থেকে আমাকে তার বুকের উপর নিয়ে বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। তার পলকহীন দৃষ্টি আমাতেই নিবদ্ধ। আমার এই সরল মুখশ্রীই যেন তার সকল ক্লান্তি দূর করে দিচ্ছে। ইফানের বলিষ্ঠ দেহে আমার ছোট্ট দেহ লেপ্টে আছে। ইফানের দেহের উষ্ণতা পেয়ে তার বুকে আরও মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার। আমি আরও শক্ত করে লোকটাকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চিন্তে চোখ বুঝে রইলাম। আজ বহুদিন পর আবারও সেই ভায়োলিনের বেদনাদায়ক করুণ সুরটা কানে ভেসে আসছে। এই সুরটা শুনলেই বুকের ভেতরটা কেঁদে উঠে। মীরার কিসের এত যন্ত্রণা! কেনই বা সে এত করুণ সুর তুলে! আজ কি আবারও মীরার মন খারাপ! আমি বেশি ভাবতে পারলাম না। ভীষণ ঘুম পেয়েছে। মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ নিদ্রায় তলিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি শুনতে পাই মীরার ভায়োলিনে তোলা সুর। সেই সাথে আমার কানে আসে ইফানের পুরুষালি মাদকীয় কন্ঠে গুনগুন করা গানের সুর,
Wherever you go, that’s where I’ll follow.
Nobody’s promised tomorrow.
So I’ma love you every night like it’s the last night.
Like it’s the last night.
If the world was ending, I’d wanna be next to you.
If the party was over and our time on Earth was through.
I’d wanna hold you just for a while and die with a smile.
If the world was ending, I’d wanna be next to you.
চলবে,,,,,,
প্রায় ছয় হাজার শব্দের বিশাল এক পর্ব দিয়েছি। আজ অনন্ত কেউ ছোট পর্ব বলবেন না। আর তিন চারদিন পরপর পর্ব দিলেও অনেক বড় করে পর্বগুলো দেই। তাই অভিযোগ করার কোনো সুযোগ নেই।😁 আর যারা পড়েছেন সকলে রিয়েক্ট দিয়ে গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। আপনাদের মন্তব্যগুলো পড়লে লেখার প্রতি আগ্রহ পাই। হ্যাপি রিডিং।🥳🫶
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ৭০
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা পর্ব ৩১+৩২
-
জাহানারা পর্ব ৬৯
-
জাহানারা পর্ব ১৫+১৬
-
জাহানারা পর্ব ১
-
জাহানারা পর্ব ৮
-
জাহানারা পর্ব ৩৭+৩৮
-
জাহানারা পর্ব ৩
-
জাহানারা পর্ব ৫৩+৫৪