জাহানারা
জান্নাত_মুন
পর্ব :৪৭
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ
নিশ্চল সময় যেন শ্বাস আটকে রেখেছে। পশ্চিম আকাশে বেলা ফুরিয়ে আসছে।শেষ আলোটা রক্তিম হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত জুড়ে; যেন সমস্ত রঙ মুছে যাওয়ার আগে আকাশ নিজেই এক দীর্ঘ, ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। কলোনির নতুন দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে নীরব প্রহরীর মতো।দেয়ালে পড়া সূর্যের শেষ আলো আর ছায়া মিলে আঁকছে এক বিষণ্ণ চিত্রনাট্য।
হঠাৎই একঝাঁক শালিক পাখি আকাশ চিরে উড়ে গেল। তাদের ডানার ঝাপটায় নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হলো;যেন তারা পশ্চিমের ঘন জঙ্গলের দিকে উড়ে গিয়ে দিনের শেষ সংবাদটি পৌঁছে দিতে চলেছে। তারপর চারপাশে নেমে এলো এক অদ্ভুত শূন্যতা!!প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান থেমে আছে এক অনির্বচনীয় অপেক্ষায়।বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে এক গভীর বিষণ্ণতা—যেন পৃথিবীও ঠিক এই মুহূর্তে একটু থমকে গেছে নৈঃশব্দে।
তিনতলা ভবনের চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সর্ব চেনা মুখ মাফিয়া গ্যাংস্টার ইফান চৌধুরী।পড়নে সাদা শার্ট ;তার উপর কালো ওয়েস্টকোট,দুই বাহুতে কালো স্লিভ গার্টার জড়ানো।রেলিঙের উপর পা’য় দৃশ্যমান কালো বুট জুতা।ঘন কালো চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে।চোখে রোদ চশমা। সিগারেটে পোড়া ব্রাউন ওষ্ঠ কোণে তীর্যক বাঁকা হাসির ঝলক।তার এক হাতে কালো ফিতার ব্যান্ডের ঘড়ি।আরেক হাতে গোল্ডেন ব্রেসলেট।দু’হাতে রপ্ত করে ধরে আছে সিলভারের চকচকে ধাতব মারণাস্ত্র।
নিশানার অপর প্রান্তে শেখ বাড়ির ছাঁদে দাঁড়িয়ে আছে জায়ান ভাই।অফ-হোয়াইট পাঞ্জাবিতে লোকটাকে যতটা না শুভ্র লাগছে, তার চেয়েও বেশি কোমলতা ছড়িয়ে নয়ন জুড়ে।মানুষটা মায়াবী চোখ জোড়া ব্যথাতুর চাহনিতে তাকিয়ে আছে ইফানের দিকে।আজ লোকটা বলার সকল ভাষা হারিয়েছে।তার বুকে ক্ষনে ক্ষনে বয়ে যাচ্ছে অব্যক্ত নিদারুণ যন্ত্রণার ঢেউ।
খানিকটা সময় এক জোড়া শান্ত দৃষ্টির সাথে মিলন ঘটলো ইফানের ক্রোধিত নয়নের।সব নিরবতা ভেঙে ইফান চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,”মানা করেছিলাম না আমার জিনিসে হাত দিতে?”
ইফানের কন্ঠ স্বর জায়ান ভাইয়ের কর্ণধার হতেই কানে ফোন ধরে রাখা হাতটা মৃদু কেঁপে উঠলো।যেন এতক্ষণ পর চেতনায় ফিরে আসলো।জায়ান ভাইয়ের ঠোঁট হালকা প্রসারিত হলো।খুব কষ্টে একটা ঢোক গিলে প্রতিত্তর করলো,”তোর জিনিস?”
ইফানের রাগ আরও বাড়লো।সে আগের ন্যায় শক্ত কন্ঠে জবাব দিলো,”হ্যাঁ আমার জিনিস।” ইফানের কথায় জায়ান ভাইয়ের চোখ দুটো ভিজে উঠলো।তিনি নিজেকে কিছুটা সামলে ভাঙা কন্ঠে বললো,”যাকে ছোট থেকে আমি আগলে রাখলাম।মনের গহীনে যত্ন করে যার পবিত্র সত্তাটাকে লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা করলাম এই নিষ্ঠুর কালো দুনিয়া থেকে।আজ সে তোর জিনিস হয়ে গেলো!!”
জায়ান ভাইয়ের ব্যথাতুর কন্ঠে ইফানের বুকটাও হয়তো একটু কেঁপে উঠলো।জায়ান ভাই আবার বললো,”তোকে বন্ধু ভাবা কি আমার অপরাধ ছিলো?তাহলে কেন তুই আমার সাথে এত বড় বেইমানি করলি।কেন আমার ভালোবাসা কে আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছিস?”
ইফান চোখ সরু করে ফেললো।জায়ান ভাইয়ের শেষ কথাটা তার বোধগম্য হয় নি।ইফান একটা ব্রু উঁচিয়ে জায়ান ভাইকে পাল্টা শুধালো,”ভালোবাসা!!” জায়ান ভাই তৎক্ষনাৎ শক্ত কন্ঠে প্রতিত্তর করলো,”হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ,আমার ভালোবাসা।যাকে বাল্যকাল থেকে পাগলের মতো ভালোবেসে এসেছি।যার জন্য এই হৃদয়ে প্রতিনিয়ত প্রেম তৃষ্ণা জাগে।যার সরল পবিত্র চেহারাটা এক নজর দেখার জন্য বুকে চিনচিন ব্যথা হয়।সে আমার ফুসফুস, আমার কলিজা-এই দেহের প্রাণ।তাকে নিয়ে আমি স্বয়নে স্বপনে ঘর বাঁধার স্বপ্ন বুনি।আর তুই আমার থেকে আমার প্রাণকে কেঁড়ে নিতে চাইছিস…….!!”
ক্রোধে ইফানের মস্তিষ্ক ফেটে পড়ার উপক্রম।আমাকে নিয়ে বলা জায়ান ভাইয়ের প্রতিটি বাক্য ইফানের গায়ে গিয়ে বিঁধছে।জায়ান ভাইকে আর বলতে না দিয়ে ইফান হুংকার ছুড়লো,”হারামির বাচ্চা, বেইমান কোথাকার।যেই দেখলি আমি মন হারালাম,অমনি তোর সাউয়া নেচে উঠেছে তাই না?কই আগে তো কোনোদিন বলিস নি কাউকে পছন্দ করিস।তাহলে আজ কোথা থেকে প্রেম উদয় হলো?”
“হ্যাঁ বলিনি।তুই আর তোর মতো অন্ধকার দুনিয়া থেকে আমার পবিত্র ভালোবাসাকে আড়াল করতে বলিনি।জারার থেকে দূরে সরে যা ইফান।”জায়ান ভাইয়ের কথায় দাঁতে দাঁত পিষলো ইফান,”দূরে সরে যাব হ্যাঁ!!দূরে তো তুই সরবি, আমার বউয়ের থেকে।” ইফানের শেষ বাক্যটা জায়ান ভাইকে আরেক দফা ভাংচুর করে দিলো।তিনি শুকনো ঢোক গিলে শুধালো, “বউ!!” তৎক্ষনাৎ ইফানের থেকে প্রতিত্তর ভেসে আসলো,”হ্যাঁ বউ,আমার বিয়ে করা বউ।লিগাল ওয়াইফ বুঝিস? জাহান আমার লিগাল ওয়াইফ।”
জায়ান ভাইয়ের চোখ পুনরায় অশ্রুসিক্ত হলো।ভাঙা কন্ঠে বললো,”মানি না।আমি কিছুতেই মানি না।যার জীবনে তোর কোনো অস্তিত্ব নেই, তাকে তুই তোর বলে কিভাবে দাবি করিস?” জায়ান ভাইয়ের দিকে তাক করে রাখা রিভলবার ইফান নামিয়ে নিলো।চোখের সানগ্লাসটা খুলতেই ক্রোধিত রক্তিম চোখ জোড়া দৃশ্যমান হলো।ইফান কানের ইয়ার প্যাডটায় চাপ দিয়ে ধরে রেখে শক্ত চোয়ালে হিসহিসিয়ে বলতে আরম্ভ করলো,
“বুলবুলির জীবনে আমার অস্তিত্ব থাক বা না থাক,আমার সবটা জুড়ে ওর অঘাট বিচরণ। ও আমার রক্তের প্রতিটি অনু পরমাণুতে মিশে গেছে।আ’ম টোটালি অবসেসড উইথ হার।এবার আমি ওকে কিছুতেই আমার থেকে দূরে সরতে দিবো না।জাহান জাস্ট মাইন।”
“তুই ভুল। জারা তোর নয়, আমার।আমার এতগুলো বছরের গড়ে তোলা ভালোবাসার থেকে তোর আসক্তি বড় ফিকে।তুই ওকে পাবি না।আমি জারাকে যতখানি ভালোবাসি, জারাও ততখানি আমাকে উজাড় করে ভালোবাসে।আমাদের মাঝখানে তুই তৃতীয় ব্যক্তি।কোনো অস্তিত্ব নেই তোর।সরে যা ইফান।জারার ভালোবাসা তুই কোনোদিন পাবি না।তার মনে একটাই নাম জায়ান……..”
ইফান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে গর্জে উঠলো, “ফা*ক ইউর ভালোবাসা।লাগবে না আমার ভালোবাসা।আমার শুধু ঐ মেয়েটাকে চাই।সরে আসার কোনো প্রশ্নয় আসে না।তুই ওকে আমার থেকে আড়াল করে রাখতে পারলি না কেন, এটা তোর ব্যর্থতা।এই মেয়ে এখন আমার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে জায়গা দখল করে নিয়েছে।তাকে এক মূহুর্তের জন্য ভুলা অসম্ভব। সেখানে তাকে ছেড়ে বাঁচা এখন আরও বেশি দুর্লভ।
তোর ভুল।।তুই কেন আগে আমাকে সাবধান করে রাখলি না।এখন কোনো সেকেন্ড ওয়ে নেই।সে কেন হঠাৎ ঝড় হাওয়ার মতো আমার জীবনে চলে আসলো!!আমি কি বলেছিলাম আমার কালো দুনিয়ায় জোনাকি হয়ে ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে বাঁচার নতুন দিশা দেখাতে।
দিব্যি ভালোই তো ছিলাম, আমার পাপের শহরে।যে পথে হেঁটে যেতাম, সেই পথে আবার অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসার কোনো আশা রাখতাম না।আজ প্রতিটি মূহুর্ত আমার হৃদয় শাসিয়ে বলে,আমাকে সব কিছুর উর্ধ্বে গিয়ে হলেও আবারো ফিরতে হবে।কোনো এক জনের জন্য ফিরতে হবে।আমার গন্তব্যহীন জীবনে গোটা একটা নীল আকাশ তৈরি করে আসপাশ শুভ্র কাশফুলে সজ্জিত করলো সে……..”
বলার মাঝে হঠাৎই ইফান থামলো।এই প্রথম হয়তো একনাগাড়ে এত কথা বলেছে।ইফান ঢোক গিললো।জায়ান ভাই পলকহীন তাকিয়ে রইলো ইফানের দিকে।ইফান কিছুক্ষণ থেমে আবার বললো,”আমি নির্দয়, পাষান,পাপে মোড়ানো এক বিভৎস অন্ধকার।গোটা রঙের দুনিয়ায় আমার স্ত্রী ছাড়া আপন বলতে কেউ নেই।তার জন্য যে আমার নতুন করে বাঁচার সাধ জেগেছে।আমার অনিশ্চিত জীবনের শেষ কিছুটা সময় তার কাছে থাকতে চাই।তার বুকে মাথা রাখতে চাই।”
ইফানের কথাগুলো জায়ান ভাইয়ের বুকের ব্যথাটা আরও গাঢ় করে তুললো।চোখদুটো এখনো ঝলঝল করছে।জায়ান ভাইয়ের মনে হচ্ছে তার গলায় কাঁটা আটকে আছে।তাই তো কন্ঠনালি দিয়ে কথা আসতে চাইছে না।তবুও খুব কষ্টে ঢোক গিলে বললো,
–“আমার মনে হচ্ছে তুই সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিস।ভালো লাগলো এটা জেনে যে তোর কঠিন হৃদয় কিছুটা গলেছে।
তবে সে তোর না।সে আমার প্রতিটি নিশ্বাসে মিশে আছে।আমার তিলতিল করে গড়ে তোলা ভালোবাসা আজ এক ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত করে দিলি তুই।আমার পাখিকে নিয়ে যদি তর মতো বলি তাহলে হয়তো এক আলোকবর্ষ পেরিয়ে যাবে।কিন্তু ওকে নিয়ে বলা শেষ হবে না।আমার অন্তর টা দাউদাউ করে জ্বলছেরে।তাকে পাওয়ার সাধনা করলাম আমি আর পেয়ে গেলি তুই।আমি বেঁচে থাকতে এটা কিভাবে সহ্য করবো, আমার পাখি আমার না!উহু অসম্ভব!!
জায়ান ভাই থামলো।চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো।তখনই তপ্ত নোনাজল গাড়ি পড়লো কপোলে বেয়ে।তিনি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নাক টানলেন। অতঃপর ভাঙা কন্ঠে পুনরায় বলা শুরু করলো,”তোর যদি এতই পাওয়ার ইচ্ছে ছিলো,তাহলে আমাকে বাঁচিয়ে রাখলি কেন।আমার অজান্তেই মেরে ফেলতি।কেন আমাকে জানালি জারা এখন তোর।এই কষ্ট আমি কিভাবে নিব!!এটা তো ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। আমি তো তোর মতো বিধ্বংসী নই।আমি ভালোবেসে ভালোবাসা অর্জন করতে জানি।কেঁড়ে নেওয়া আমার ধাচ নয়।
ও আমার অনেক সাধনার ভালোবাসা।আমি তো জারার দাবি কখনো ছাড়তে পারবো না।”
ইফান শক্ত কন্ঠে বললো,”আমি বেঁচে থাকতে আমার বউয়ের ভাগ কাউকে দিবো না।তোকেও না।তাই নিজে থেকে সরে যা নীরব। আমি কিন্তু দয়াশীল নই।নিজের যা, তা কেঁড়ে নিতে জানি।আমি জীবনে কখনো হারতে শিখিনি।জাহানকে পাওয়ার বেলাতেও হারবো না।”
ইফানের কথায় জায়ান ভাই তাচ্ছিল্য করে হাসলো,”ছিনিয়ে নিয়ে জারাকে পাবি কিন্তু ওর মন পাবি না কোনোদিন। “
–আমি সেটাও জিতে নিবো।
–তাহলে তুই জেনে রাখ, শেষ বেলায় এসে গো হারা হারবি।
ইফান রাগে নিজের মাথা নিচে নামিয়ে, এক হাতে নিজের চুল খামচে ধরলো।ঘনঘন বারবার শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলাতে চাইছে।সেভাবেই রাগে রিরি করতে করতে আবারও জায়ান ভাইয়ের দিকে রিভলবার তাক করলো।অতঃপর দাঁতে দাঁতে পিষে বললো,
–আমি এত মহান মানুষ নই যে নিজের বউকে অন্য কারো হাতে তুলে দিব।ভালোয় ভালোয় সরে যা।নাহলে,,,,,
–না হলে কি করবি???
বিয়ে বাড়িতে কানাঘুষা শুরু হয়েছে।কবুল না বলে বর চলে যাওয়ায় বাড়ির লোকদের মুখ থমথমে।বড় আব্বু রাগারাগি করছে।আব্বু আর জিতু ভাইয়া উনাকে শান্তনা দিয়ে বলছে,কোনো ইম্পর্ট্যান্ট ফোন কল হবে।শেষ হলেই চলে আসবে।এতেও বড় আব্বু শান্ত হতে পারছে না।
এদিকে বিছানায় সবার মাঝে আমি বসে আছি।জায়ান ভাই কবুল না বলে উঠে চলে গেছে খবরটা আমার কাছেও এসেছে।আমার চোখ দুটো জলে টইটম্বুর। খুব কষ্টে কান্না আটকে রেখেছি।কবিতা আপু সহ বাকিরা আমাকে শান্তনা দিয়ে বলছে কোনো সমস্যা হয় নি।কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ঠিক হয়ে যাবে।এরই মাঝে রুমে জিয়াদ ছুটে এসে জানালো জায়ান ভাই ফোনে কথা বলতে বলতে ছাঁদে গেছে।কবিতা আপু আমার মাথায় হাত রেখে ভরসা দিয়ে বললো,
–উফফ বোকা এভাবে চিন্তা করছিস কেন হ্যাঁ?শুনেছিস জায়ান ভাই বাড়িতেই আছে।ফোন কল শেষ হলেই চলে আসবে,,,,,,,,
বাকি কথা শেষ করার আগেই কবিতা আপুর বমি চলে আসলো।সে বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি নেমে বমি করার জন্য ওয়াশরুমে যাওয়ার আগেই রুমেই বমি করে দিলো।সকলেই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।এদিকে এত মানুষের মাঝে বেশি কিছু না ভেবে বাড়ির ছাঁদের উদ্দেশ্য রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।
জায়ান ভাই আর ইফান দূর থেকে একে অপরের সাথে স্নায়ু যুদ্ধ করছে।জায়ান ভাই নিজেকে শক্ত করে নিয়েছে।তিনি কিছুতেই আমাকে অন্য কারো হাতে তুলে দিবেন না।জায়ন ভাই চোয়াল শক্ত করে ইফানের উদ্দেশ্য বাক্য ছাড়লো,”অনেক হয়েছে ভি।এখান থেকে তুই চলে যা।আজ আমাদের বিয়ে। “
ইফান চেচিয়ে উঠলো, “লা*শ ফেলে দিবো তর।আমার বউয়ের থেকে নিজেকে সরিয়ে নে।”
–কিসের বউ তোর হ্যাঁ?তুই বললেন জারা তোর বউ হয়ে যাবে।তখন থেকে বউ বউ করছিস।এবার থাম, আর নিতে পারছি না।
–আমার বউকে আমার বউ বলবো না, তাহলে কি তর বউ বলবো।আমি যদি বুলবুলিকে সবার সামনে থেকে তুলে নিয়ে আসি তোদের ক্ষমতা আছে আমায় আটকানোর।
জায়ান ভাই বুকের বাম পাশে হাত বুলিয়ে বারবার দম নিচ্ছে।বুকের বা পাশ অজানা শঙ্কায় ধরফর করছে।কিছুতেই বুঝতে পারছে না, ইফানকে আমার থেকে কিভাবে দূরে রাখবে।জায়ান ভাই মনস্থির করে বুক ফুলিয়ে দম নিলো।অতঃপর কঠোর কন্ঠে বললো,
–এতই সহজ তাই-না!! আমি তোর প্রতি দুর্বল বলে যা খুশি তাই করবি!! তুই যদি ছলচাতুরী করে জারাকে বিয়ে করেও থাকিস, তাহলে সেই বিয়ে আমরা কেউ মানি না।প্রয়োজনে তোদের ডিভোর্স দিবো।
ইফান রাগে আর কথা বলতে পারছে না।তবুও শক্ত চোয়াল করে বললো,”বেশি বাড়াবাড়ি করলে বন্দুকের সবগুলো গুলি তোর বুকের উপর চালাবো।নিজের ভালো নিজে বুঝে নে।আমার মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। কখন কি করি ঠিক নেই।তাই বলছি বালের বিয়ে টিয়ে এখানেই থামা।মেনে নে জাহান আমার বউ।”
জায়ান ভাই অস্থির হয়ে আছে।আমাকে নিয়ে কোনো সাধারণ বিষয়েয় লোকটা পাগলের মতো হয়ে যায়। সেখানে আমাকে অন্য কেউ নিজের করে দাবি করছে!!বুকের ভেতরের উতালপাতাল হয়ে যাচ্ছে তার।কি করবে না করবে সব দিশা হারিয়ে জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজালো লোকটা।গলা তার শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে।তবুও বুজে আসা কন্ঠে বললো,,,,
–নেহ্ শুট কর।এই বুকটাকে গুলি করে ছিঁড়ে ফেল।বিশ্বাস কর তবুও জারার নাম সেখান থেকে মুছতে পারবি না।আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই হৃদযন্ত্রটা শুধু আমার পাখির জন্যই স্পন্দিত হবে।
ইফানের হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে রাগে।তার জীবনের সবচেয়ে বেশি ধৈর্য আজ ধরেছে।এভাবে কোনোদিন কাউকে ঠান্ডা মাথায় কিছু বুঝানো তো দূর,, ভালো ব্যবহারও করে নি কখনো।এদিকে জায়ান ভাইকে নিজের আপোষে আনতে না পেরে আবারও দুটো হাত দিয়ে বন্দুকটা জোড়ালো করে ধরলো।অতঃপর ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুল ট্রিগারে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বললো,
–এই শেষ বার বলছি আমাদের মাঝে বাঁধা হয়ে আসিস না।জানে মারা পড়বি।
জায়ান ভাই তাচ্ছিল্য করে হেসে বললো,”মৃত্যুর দারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও একটা কথায় বলবো,জারা শুধু আমার।আমি বেঁচে থাকতে অন্য কাউকে দিবো না।”
ইফান ট্রিগারে আঙ্গুল টা হালকা করে নাড়িয়ে হুমকির স্বরে বললো,”আমি কিন্তু শুট করবো!!”
ইফানের কথায় বিন্দু মাত্র বিচলিত হলো না জায়ান ভাই।তার দৃঢ় বিশ্বাস ইফান সারাজীবন শত্রু হয়ে থাকলেও তার উপর আঘাত করবে না।জায়ান ভাই নিজের সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই এক আঙ্গুল দিয়ে বুকের বাম পাশে ইঙ্গিত দিয়ে বললো,
–শুট মি,,,,,
ইফান রাগে রিরি করতে করতে কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলটা ট্রিগারে বসানোর আগেই জায়ান ভাইয়ের বুকের বাম পাশে একটা বুলেট আচমকা বিঁধল।জায়ান ভাই তৎক্ষনাৎ এক পা পিছিয়ে পড়লো।তার দৃষ্টি এখনো ইফানে নিবদ্ধ।জায়ান ভাই কিছু আন্দাজ করার আগেই পরপর তার বুকে আরও তিনটি বুলেট এসে সম্পূর্ণ বুকটা ঝাঁঝরা করে দিলো।মূহুর্তেই তিনি মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো।এই মৃদু আর্তনাদ ইফানের কান অব্ধি পৌঁছাতেই ইফান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।ট্রিগারে রাখা আঙ্গুলটা সেখানেই থমকে গেছে।ইফান তো জায়ান ভাইকে ভয় দেখাচ্ছে।আসলে তার রিভলবার তো এখনো আনলোড।ইফানের বুক কাঁপছে এক মাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কি হয়েছে ভেবে।
জায়ান ভাইয়া অসহায় ভাবে এখনো ইফানের দিকে চেয়ে। তার গুলিবিদ্ধ ছিন্নভিন্ন বুকটা রক্তে রঞ্জিত হয়ে উঠেছে।সাথে সাথে মুখ দিয়ে গড়গড়িয়ে রক্ত বমি বের হতে লাগলো।জায়ান ভাই টলতে টলতে আরেক পা পিছিয়ে পড়লো।মুহূর্তেই আমি ছাঁদের দরজার সামনে এসে থামলাম।জায়ান ভাই আমার দিকে পিট করে আছে।আমি দেখলাম উনার কানের সন্নিকটে ফোনটা ধরা।মনে হচ্ছে হালকা ঠুকা লাগলেই হাত ফসকে পড়ে যাবে।তবে এসবে আমার খেয়াল আসলো না।বরং লোকটাকে দেখে ভার হওয়া আমরা বুকটা কিছুটা হালকা হলো।আমার ঠোঁটে মৃদু হাসি রেখা ভেসে উঠতেই আচমকা আমার নজর পড়লো, জায়ান ভাইয়ের পায়ের নিচে লাল তরলে সব ভেসে যাচ্ছে। মূহুর্তেই আমার হৃৎস্পন্দন থমকে গেলো।আমার দম কেন জানি বন্ধ হয়ে আসছে।কোনো কিছু বোধগম্য হচ্ছে না।আমি জায়ান ভাইয়ের সোজাসুজি দৃষ্টি রাখতেই নজরে পড়লো, দূরের ভবনের ছাঁদে জায়ান ভাইয়ের দিকে রিভলবার তাক করে দাঁড়িয়ে ইফান চৌধুরী। আমি লোকটাকে চিনলাম না।আর চেনার চেষ্টাও করলাম না।কারণ এই দৃশ্য দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার পায়ের তলার মাটি কেঁপে উঠলো।আমি ঝটপট জায়ান ভাইয়ের দিকে তাকাতেই দেখলাম, জায়ান ভাইয়ের হাতের ফোনটা মাটিতে পড়ে গেছে। তিনিও সমান তালে হেলে পড়তে নিলে আমি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলাম,
❝জায়ান ভাআআই❞
আমি দৌড়ে গিয়ে জায়ান ভাইকে ধরতে ধরতে বসে পড়লাম।জায়ান ভাইয়ের মাথা ছাঁদে লাগার আগেই বুকে আগলে ধরলাম।আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম।লোকটার রক্তাক্ত বুক দেখে আমার বুকে অসহ্যনীয় ব্যথা শুরু হয়েছে।
অপর দিকে জায়ান ভাই হেলে পড়ার সাথে সাথে ইফানের চোখ দিয়ে টপটপ করে নোনাজল পড়তে লাগলো।ইফান নিজের স-জ্ঞানে আসার আগেই তার পিটে পরপর দুটো বুলেট এসে পিটটা ঝাঁঝরা করে দিলো।সাইলেন্সার গান হওয়ায় আওয়াজ হয় নি কোনো।আমি জায়ান ভাইয়ের এমন অবস্থা দেখে সেই ছাঁদের দিকে তাকানোর আগেই ইফান হেলে পড়ে গেলো।পড়ার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত তার চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রু ঝরছিল।তার সেই ব্যথাতুর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিলো শেখ বাড়ির ছাঁদে।
আমি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে সবাইকে ডাকতে লাগলাম।বিয়ে বাড়ি হওয়ায় এত শব্দের মধ্যে আমার গলা কারো কান অব্ধি পৌঁছাতে পারছে না।জায়ান ভাইয়ের মাথাটা আমার বুকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছি।মনে হচ্ছে হাতটা একটু ঢিলে হলেই জায়ান ভাই আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।আমি হাত দিয়ে জায়ান ভাইয়ের মুখের রক্তটা মুছে দিতে দিতে চিৎকার করে আর্তনাদ করে বলতে লাগলাম,
–আপনার কিছু হবে না জায়ান ভাই।আপনার কিছু হবে না।আমি আপনার কিছু হতে দিবো না। আল্লাহ তুমি আমার জানকে বাঁচাও,,,,,,,,,,,,,,
আমার আর্তনাদ শুনে জায়ান ভাইয়ের চোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু ধারা বইতে লাগলো।লোকটা হা করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে।এটা দেখে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।জায়ান ভাই নিজের রক্তে ভেজা হাতটা তার গালে আমার রাখা হাতটার উপর শক্ত করে চেপে ধরলো।অতঃপর ভাঙা কন্ঠে থেমে থেমে বলতে লাগলো,
–আমার আয়ু যে এত কম সময়ের জন্য লিখেছেন বিধাতা, আমি বুঝতে পারি নি রে পাখি।আমার সময় তো শেষ হয়ে আসছে।আমার যে তোর হাত ধরে অনেকটা পথ হাঁটা হলো না।তোকে বধূ করে আমার ঘরে তোলা হলো না।তোকে আগলে রাখতে পারলাম না।নিয়তি যে আমাকে ঠকিয়ে দিলো পাখি।আমার এক মাত্র সম্বলকে আজ অন্যকাউকে দিয়ে দিলো।আমি যে আজ শূন্য হাতে ফিরে যাব।
আমি হাউমাউ করে কেঁদে উনাকে বলতে লাগলাম,”আপনি এসব কথা বলবেন না।আমি আপনাকে কোথাও যেতে দিব না।”
জায়ান ভাই আমার হাত নিজের গালে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে নিলো।কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
❝প্রিয়ারে তুই তো আমার ছিলি।তাহলে আমার হয়েও কিভাবে অন্যকারো হয়ে গেলি?❞
আমি জায়ান ভাইকে ঝাপটে ধরলাম,”আমি অন্যকারো হইনি। আমি আপনার আছি,আপনারই থাকবো।আপনি আমায় ছেড়ে যাবেন না।তাহলে আমিও মরে যাব।”
❝আমার জান, আমার না হওয়া সঙ্গীনি। আজ যে অপূর্ণতা আমাকে গ্রাস করেছে।চাইলেও যে আর তোকে এক পলক দেখা হবে না।তোকে আমার করে না পাওয়ার যন্ত্রণা আমি কিভাবে সইবো রে জারা?মরার পরেও আত্মা টা তোর লাগি খুব করে কাঁদবে রে।তোর নামের পাশে আমার জায়গা পেলাম না,তাই বলে মন থেকে উঠিয়ে দিসনা আমার জান পাখি।এই ক্ষতবিক্ষত বুকে যে আজ তোকে আমার করে না পাওয়ার ক্ষত তৈরি হলো,বিশ্বাস কর এই মৃত্যু যন্ত্রণাও তার চেয়ে বহুগুণ তুচ্ছ।❞
❝আপনি এসব বলবেন না।আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।আপনাকে আমি যেতে দিবো না।আল্লাহ এত পাষাণ না।আপনাকে আমার থেকে কেঁড়ে নিবে না।আল্লাহ আমার জায়ান ভাইয়ের জান ভিক্ষা দেও। আল্লাহ নিষ্ঠুর হয়ও না।আমার যে তার সাথে এখনো সংসার করা বাকি।আমাদের একসাথে পথ চলায় তো এখনো শুরু হয় নি।তাহলে কেন তাকে তুলে নিচ্ছ।আমার জানের বিনিময়ে আমাকে তুলে নাও……।❞
আমি রক্তাক্ত লোকটাকে ঝাপটে ধরে আর্তনাদ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছি।তখনই লোকটার প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।আমি সকল হুঁশ হারিয়ে পাগলের মতো লোকটার জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি করছি।আমার আর্তনাদে জায়ান ভাইয়ের চোখের জল আপনাআপনি ঝরছে।জায়ান ভাই নিজেকে কিছুটা সামলে,আমার হাতটা মুঠো করে ধরতে চাইলো।তবে আয়ু যে ফুরিয়ে আসছে।হাতটায় জোরও কমে এসেছে।আমি উনার হাতটা শক্ত করে মুঠো করে ধরে চুমু খেতে লাগলাম।আমার দুচোখের পাতায় ছুঁইয়ে দিলাম।লোকটা আমার উন্মাদনা দেখে মৃত্যু যন্ত্রণার মধ্যেও হাসলো।কি মায়াবী, করুন সেই হাসি।আমার বুকটা হুহু করে উঠলো।এমন যন্ত্রণা হচ্ছে সেখানে, মনে হচ্ছে এক পাহাড় সমান ভারী কিছু রাখা হয়েছে এই বুকে।জায়ান ভাই রক্ত মাখা ঠোঁটগুলো জিহ্বা দিয়ে ভিজালো।অতঃপর একটা ঢোক গিললো।লোকটার হাতে জোরটা আরও কমে আসছে।আমি আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম। জায়ান ভাই হু হু করে কেঁদে উঠলো,
❝এত অপূর্ণতার মধ্যে আল্লাহ আমাকেও একটা পূর্ণতা দিলো।তোর এই ছোট্ট বুকে মাথা রেখে ইহকালের শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে পাখি।❞
হঠাৎই জায়ান ভাইয়ের শরীরে খিচুনি উঠলো।আমি লোকটার মাথাটা আমার বুকের সাথে আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরলাম।জায়ান ভাই হা করে শ্বাস নিতে নিতে বললো,
❝আমার সময় হয়ে এসেছে।আজরাইল যে জান কবজ করতে চলে এসেছে।এই শেষ সময়ে তোর বুক ফাটা কষ্ট আমাকে আরও কষ্ট দিচ্ছে।তুই কাঁদিস না আমার জন্য।পৃথিবীতে কারো শূন্যতা থাকে না বেশিদিন। আমার শূন্যতাও তোকে বেশি দিন কাঁদাবে না।হ্যাঁ,আমি জানি তোর বুক থেকে আমাকে কেউ কোনোদিন মুছতে পারবে না।শেষ বেলায় এটাই আমার বড় প্রাপ্তি।
নিজেকে গুছিয়ে রাখিস জান।আল্লাহ আমাকে না দেওয়া হায়াত তোকে দান করুক।দীর্ঘজীবি হ তুই।আমি তোর সাথে সবসময় থাকবো।কষ্ট পাবি না কেমন।ইহকালে আমরা এক হলাম না।পৃথিবীতে যদি কোনো ভালো কাজ করে থাকি ইনশাআল্লাহ পরকালে আমাদের মিলন হবে।তোকে আমার করে নিব।এই জনমে তর সাথে নাই বা হলো একটা সংসার।পরকালেই না হয় ঘর বাঁধব।একদম পাগলামি করবি না।নিজেকে কখনো একা ভাবনি না।আমি সর্বদা তোর সরল পবিত্র হৃদয়ে বসবাস করবো।তুই যেদিকে তাকাবি আমাকে খুঁজে পাবি।বাড়ির সবাইকে দেখে রাখিস কেমন।আর শুন আম্মুকে বলিস আমার জন্য কেঁদে শরীর খারাপ না করতে।আর আমার আদরের বোনটাকে সবসময় বকাঝকা না করতে।ও তোর থেকে বড় হলেও ওর বুদ্ধি তোর চেয়ে কম।আমার অবর্তমানে সবার দায়িত্ব আমি তোর হাতে দিয়ে গেলাম।
কাঁদতে কাঁদতে একনাগাড়ে এতগুলো কথা বলায় মুখ থেকে আবারও রক্ত বমি বেড়িয়ে আসলো।আমি পাগলের মতো চিৎকার করছি।আফসোস কেউ আমার আর্তনাদ শুনতে পারছে না।সকলেই বাড়ির নিচে।আমি জায়ান ভাইয়ের মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে নিতে চাইলে জায়ান ভাই তার শীতল হয়ে আসা হাতটা আমার হাতের উপর রেখে বললো,
❝যাস না পাখি।শেষ নিশ্বাসটা ত্যাগ করতে দে তোর বুকে।আজ যে বিধাতার ডাক এসেছে।কেউ আমাকে ধরে রাখতে পারবে না।আমি খুশি, ভীষণ খুশি।তোকে অন্যকারো সাথে দেখার আগেই চলে যাচ্ছি পরপারে।❞
জায়ান ভাই নিজের প্রায় নিস্তেজ শরীরটা নিয়ে আর্তনাদ করে কেঁদে উঠলো।আমার মস্তিষ্কে ঢুকছে না কেন তিনি বারবার এটা বলছে, আমি অন্য কারো হয়ে গেছি।আমি এত ভাবার মানসিকতায়ও নেই। আমার অন্তরে দহন হচ্ছে।নিজের মতো করে আল্লাহর কাছে ভিক্ষা চাইছি।এরই মাঝে জায়ান ভাই কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলো,
❝ আমার বন্য পাখি, তুই না পাওয়া ব্যথাটা আমাকে আজীবন আর্তনাদ করিয়ে বুকটা পুড়াবে রে। তোর এই ছোট্ট বুকে আমি না থেকে অন্য কেউ থাকবে__ এটা ভেবেই তো আমি মরার পরও বারবার মরবো।❞
জায়ান ভাইয়ের এই কথা শুনে আমি আরও জোরে চিৎকার করে আর্তনাদ করতে লাগলাম,
❝আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন আজীবন পাশে থাকবেন।আমাকে একটা সংসার দিবেন।আজ ফাঁকি দিচ্ছেন কেন?আপনি না থাকলে আমি এই জীবন রেখে কি করবো!!এই তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের তৃষ্ণা কে মিাটবে?কাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখবো?জান ভাই, আপনাকে ছাড়া আমি বাঁচবো কিভাবে?আমার দম তো এখনই বন্ধ হয়ে আসছে। আপনি হীনা এই অন্তর তো ঝলসে যাবে….
লোকটার শরীর আরও নেতিয়ে পড়েছে। আমাকে উন্মাদ হতে দেখে লোকটার গুলিবিদ্ধ ছিন্নভিন্ন বুকটা ঘনঘন উঠানামা করছে।লোকটার শীতল হয়ে আসা কাঁপা কাঁপা ডান হাতটা আমার গালে আল্ত করে ছুঁতেই আবার পড়ে যেতে নিলে, আমি শক্ত করে আমার গালে চেপে ধরলাম।জায়ান ভাই খুব কষ্ট নিজের কাঁপা কাঁপা ঠোঁটগুলো আমার কানের কাছে এনে হিসহিসিয়ে বললো,
❝এই আমারে লাগি পড়ানও পুড়িলে মুনাজাতে
স্মরণ কইরো...!!
প্রিয় নামে ডাকিয়া চান্দের পানে তাকইয়া আকাশের
তারায় তারায় খুইজো..!!❞
জায়ান ভাইয়ের গলা হঠাৎই বুজে গেলো।আমি চিৎকার কারার সাথে সাথে ছাঁদে সকলে ছুটে এসে হাজির হলো।আমাদের এই অবস্থায় দেখে মূহুর্তেই সকালে কান্না করতে করতে ঘিরে ধরলো।এতক্ষণে জায়ান ভাইয়ের শরীরও ঠান্ডা হয়ে এসেছে।আমি আমার বুকের সাথে আরও চেপে ধরে আর্তনাদ করতে লাগলাম।জায়ান ভাই আমার বুকে মাথা রেখে এক নজর সকলের দিকে দৃষ্টি বুলালো।এতএত মানুষের মাঝে লোকটা আরেকটা মুখের সন্ধান করলো।কিন্তু মিললো না।জিতু ভাইয়া সহ সকলে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য উদ্ধত হলো।জায়ান ভাই শেষ বারের মতো বিরবির করলো,
❝আমার রুহুটাকে নিয়ে যাচ্ছে পাখি।আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধর।পরানটা বেরিয়ে যাচ্ছে। খুব কষ্ট হচ্ছে,,,,,,❞
লোকটা হঠাৎ থেমে গেলো।আমি জায়ন ভাইকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেই তিনি জোরে একটা শ্বাস টেনে বলে উঠলো,,
❝লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।❞
কালিমা পাঠ শেষ হতেই জায়ান ভাই দুনিয়ার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো।লোকটার শীতল দেহ বুকে আগলে শান্ত হয়ে গেলাম।আমার প্রণয়ের প্রথম পুরুষটা আমাকে এই দুনিয়ায় একা করে পরলোক গমন করলো।আমি পাথরের মতো স্থির হয়ে তার নিথর দেহ বুকে আগলে ধরে বসে রইলাম।
সময় গড়লো।দিনের আলো ফুরিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।আমার স্বপ্ন, আমার ভালোবাসা সেই তিমিরে আচ্ছাদিত হচ্ছে।।আসেপাশে ঠিক কি হচ্ছে বলতে পারবো না।হঠাৎই সিআইডি অফিসাররা আমার বুক থেকে জায়ান ভাইকে সরাতে লাগলো।আমার চোখের নিচে কাজল লেপ্টে গেছে।সারা মুখে রক্ত মেখে আছে।লাল টুকটুকে লেহেঙ্গা জায়ান ভাইয়ের তাজা রক্তে আরও টকটকে রঙ ধারণ করেছে। আমি অবুঝ চোখে তাদের দিকে তাকালাম। জিতু ভাই এই প্রথম ভেঙে পড়েছে।তবুও আমাকে আগলে ধরে বললো,
–ওদেরকে নিয়ে যেতে দে বনু।
জিতু ভাইয়ার কথায় আমার হুশ আসলো।তারা জায়ান ভাইকে পোস্টমর্টেম করার জন্য নিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা বোধগম্য হতেই আমি আবারো পাগলের মতো চিৎকার চেঁচামেচি করতে লাগলাম। জায়ান ভাইয়ের নিথর দেহকে ঝাপটে ধরে উন্মাদের মতো বলতে লাগলাম,
–আমার জানটাকে আর কষ্ট দিও না।দয়া কর।ওর অনেক কষ্ট হবে।আর কষ্ট দিও না।
জিতু ভাইয়া আমাকে ধরে আটকে বললো,”ওদের কাজ করতে দে বোন।আপাতত ওরা নিয়ে যাক। পরে আমি দেখে নিচ্ছি। “
আমাকে সকলে ধরে আটকালো।আমার সামনে দিয়ে আমার জায়ান ভাইকে নিয়ে যাচ্ছে। সি আইডি লোকেরা যখন বাড়ির বাইরে গাড়িতে জায়ান ভাইকে তুলছে, তখনই আমি সবার বাঁধন ছেড়ে ছুটে চলে আসলাম।আমি পৌঁছাতে পৌঁছাতে জায়ান ভাইকে ওরা গাড়িতে তুলে নিলো।আমি টেনেটুনে মাথার লাল দোপাট্টা খুলে ফেলে লেহেঙ্গার দু প্রান্ত ধরে পাগলের মতো গাড়ির পিছে ছুটতে লাগলাম।
পুরো কলোনিতে সুখের ছায়া পড়েছে।রাস্তার দু প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষ মুখে হাত ধরে হু হু করে কাঁদছে।আমি কাউকে লক্ষ করলাম না।পাগলের মতো গাড়ির পিছনে ছুটতে গিয়ে ইটের টুকরোয় হোঁচট খেয়ে পা রক্তাক্ত হলো।আমি থামলাম না।নিজেকে সামলে চিৎকার করে ছুটতে লাগলাম।অনেকটা দৌঁড়ানোর পর আচমকা লেহেঙ্গায় পা বেজে মুখ থুবড়ে মাঝ রাস্তায় পড়লাম।আমার কপাল ফেটে গেছে। আমার সেসবে হুশ নেই। আমি সামনে হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে ঢেকে উঠলাম,
❝জায়ান ভাআআই।যাবেন না আমায় ছেড়ে।❞
কিন্তু শুনলো না।নিমিষেই আমার চোখের আড়াল হয়ে গেলো।অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে আমার জীবনের সকল আলোও নীভে গেলো।আমি কান্নায় ভেঙে পড়ে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলাম,
❝যে বুকে আপনাকে আগলে রাখতে পারলাম না,সে বুক পুড়ে ছারখার হয়ে যাক__পাহাড় ধসে পড়ুক।।সম্পূর্ণ আমিটাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে এই নিষ্ঠুর পৃথিবী থেকে নিঃশেষ করে দিক।❞
_বর্তমান _____
ইফান আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমি এখনো পিছন ফিরে এই হাজারো স্মৃতি মোড়ানো শেখ বাড়িটাকে দেখছি।চোখের সামনে অতীত ঝলঝল করে ভেসে উঠছে।চোখ দুটোতে অশ্রু এসে জমা হয়েছে। তবে আজ এই অবাধ্য কণাগুলোকে গড়িয়ে পড়তে দেই নি।চোখের কুঠরেই বন্দী করে রেখেছি।
ইফান গাড়ির ডোর অপেন করে আমাকে তার পাশে ফ্রন্ট সিটে বসালো।অতঃপর এক এক করে সবগুলো গাড়ি ছেড়ে দিলো।আমাদের গাড়িটা শেখ বাড়ির পাশের খালি মাঠের দিকে আসতেই ভেসে উঠলো শেখ বংশের কবরস্থানের গেইট।সেখানে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে আমার জায়ান ভাই। আমি অপবিত্র হওয়ার পর আর তার পবিত্র কবরস্থানে যাইনি।তবে দূর থেকে একটু দেখতে চাইলাম। কিন্তু ইফান ড্রাইভিং করতে করতে ঝুঁকে আমার দৃষ্টি থেকে তা আড়াল করে দিলো।আমি মাথা সোজা করে দেখতে নিলে ইফানও সোজা হয়ে আবারও আমার দৃষ্টি আড়াল করে দিলো।আমি ব্যথাতুর নয়নে পাষাণ লোকটার দিকে তাকালাম। ইফান আমার দিকে তাকালো না।তবে ঢোক গিললো।
অতঃপর গাড়িটা চলতে লাগলো নিজ গতিতে।পিছনে পড়ে রইলো আমার বিভৎস অন্ধকার অতীত।সামনে এগিয়ে আসছে নতুন এক গন্তব্যহীন অনিশ্চিত অধ্যায়।এর পরিণতি কি আমার জানা নেই। তবে এটা নিশ্চিত নতুন করে আবারও পড়বে ধ্বংস স্তূপ ।
[১ম খন্ডের সমাপ্তি ]
(কিছুদিনের মধ্যেই ২য় খন্ড শুরু করবো ৪৮ পর্ব থেকে।আর এত দেরিতে পর্ব দেওয়ার জন্য দুঃখিত।আমি দেরিতে দিলেও বড় পর্ব দিয়ে পুষিয়ে দিই। আমি আগে ঠিকই একদিন পরপর গল্প দিয়েছি।ইদানীং এটা সম্ভব হচ্ছে না।আমি অনেক চেষ্টা করেও লেখার সময় বের করতে পারছি না।সামনে আমার পরীক্ষা বুঝতেই পারছেন বিষয়টা।আমি মানসিক ভাবে ডিপ্রেসড এটা নিয়ে।আশা করি আমার সিচুয়েশন টা আপনারা ফিল করতে পারবেন।যাইহোক হ্যাপি রিডিং 💞)
Share On:
TAGS: জান্নাত মুন, জাহানারা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জাহানারা পর্ব ১৫+১৬
-
জাহানারা পর্ব ৪১+৪২
-
জাহানারা পর্ব ৩১+৩২
-
জাহানারা পর্ব ৫৭+৫৮
-
জাহানারা পর্ব ৩৭+৩৮
-
জাহানারা পর্ব ২৭+২৮
-
জাহানারা পর্ব ২৩+২৪
-
জাহানারা পর্ব ৬৩+৬৪
-
জাহানারা পর্ব ১৩+১৪
-
জাহানারা পর্ব ৪৯+৫০