Golpo romantic golpo চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু পর্ব ৫


চন্দ্রবিন্দু

পর্ব_৫

জান্নাতুল_নাঈমা

কল্ললীর কথা শুনে চমকে উঠে চন্দ্র। বিন্দুর বউ ভাত মানে! আর সে বিন্দুর ভাই! এমনিতেই বুকের ভেতর হাসফাস লাগছে। তার ওপর কল্ললীর আবোলতাবোল কথা শুনে মেজাজ তপ্ত হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে চন্দ্র কল্ললীকে বলল,
‘ বিন্দু কোথায় কাকি মা…? ‘

‘ শশুর বাড়ি..।’

কল্ললীর স্পষ্ট উত্তর। মুহুর্তেই চন্দ্র ক্ষেপে গেল।
‘ মুখ সামলে কথা বলুন কাকি মা! শশুর বাড়ি মানে?’

কল্ললী হাসে, বিদ্রুপের হাসি। বুকভরে শ্বাস নিয়ে বলে,
‘ মুখ আমি সামলেই বলছি। এবার তুমি নিজেকে সামলাও। ‘

চন্দ্রকে এ কথা বলেই ঘটককে বিদায় দিলো কল্ললী। ঘটক বিদায় নিয়ে বিন্দুদের গেট পাড় হয়েছে। এমন সময় আচমকা পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে চন্দ্র তার গলা চেপে ধরল। মুহুর্তেই শূন্যে তুলে ফেলল হরি ঘটককে। জান বেরিয়ে যাবে যেন। হরি ঘটক ছটফট করছে। চন্দ্র অত্যন্ত হিংস্র রূপ ধারণ করে বলল,

‘ তুই পাত্র এনে দিয়েছিস বিন্দুর জন্য তুই! এত বড়ো সাহস তোর বল বিন্দু কোথায়? ‘

হরি ঘটক কোনো রকমে বিন্দুর শশুরের গ্রামের নাম বলল। চন্দ্র ছেড়ে দিলো হরি ঘটককে। নিমেষেই মাটিতে পড়ে গেল হরি ঘটক। আর ও বাবা গো, ও মা গো বলে কুঁকাতে লাগলো। চন্দ্রর ভেতর থেকে হৃৎপিণ্ডটা যেন বেরিয়ে আসবে। তার মানে সত্যি বিন্দুর বিয়ে হয়ে গেছে? অন্য কারো বউ হয়ে গেল বিন্দু! না না এ হতে পারে না। বিন্দু তার বউ হবে। তার জন্য বউ সাজবে বিন্দু। বধূ রূপে তার বাসর ঘরেই বসবে বিন্দু। বিন্দুর মাঝে কেবলমাত্র তারই ভালোবাসার অধিকার, ছোঁয়ার অধিকার।

চন্দ্রর মাথা খারাপ হয়ে যায়। বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়। বউ ভাত আজ বিন্দুর বউ ভাত। তবে কি কাল সত্যি বিন্দু অন্য কারো নামে কবুল পড়েছে? অন্য একটা পুরুষের সঙ্গে বাসর ঘটেছে। চোখ বন্ধ করে চিৎকার দেয় চন্দ্র। এটা সে মানতে পারবে না কিছুতেই না৷ এমন দিন আসার আগে সে বিষ খেয়ে মরে যাবে। চন্দ্রর চোখ বেয়ে জল গড়ায়। হরি ঘটক ততক্ষণে পালিয়ে গেছে। চন্দ্রর বন্ধু স্বপন এলো তক্ষুনি। চন্দ্রর মনের অবস্থান টের পেয়ে বলল,

‘ তুই যদি বিয়ে করে সংসার পাততে পারিস। তাহলে বিন্দু কেন পারবে না? ‘

রক্ত বর্ণ চোখ দুটো খুলে তাকায় চন্দ্র। স্বপন ভয় পেয়ে যায়। থতমত খেয়ে বলে,

‘ দেখ চন্দ্র বিন্দুর কোনো দোষ আমি দেখছি না। ও তবুও এতদিন কিছু করেনি। তোর আশাতেই ছিল। কিন্তু কাল যখন শুনল তুই বাবা হচ্ছিস তখন আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। ‘

চন্দ্রর রক্ত বর্ণ চোখ দুটো এক নিমেষেই অশ্রুতে ভরে উঠে। জ্বলন্ত অগ্নিশিখাটা নিভে যায় আচমকা। চন্দ্রর ঠোঁটজোড়া নড়ে। ‘ আমি বাবা হচ্ছি? ‘
পরোক্ষণেই ছুটে যায় নিজের বাড়িতে। সাহেরার কাছে।

সাহেরা ঘরেই চুপচাপ বসে আছে। তার শরীর খারাপ লাগছে খুব। চন্দ্র এসে প্রশ্ন করে।
‘ আমার অনুমতি ছাড়া কেন করলে এটা? ‘

চমকে উঠে সাহেরা। ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়।
‘ উপায় ছিল না। পাঁচ মাস হয়ে গেছে৷ পেট বোঝা যাচ্ছে। এখন না জানালে বিপদ হতো। ‘

চন্দ্র কঠিন গলায় বলে,
‘ নিজের স্বার্থে অন্যের জীবন ধ্বংস করে দিলে? ‘

সাহেরা উঠে দাঁড়ায়। এগিয়ে আসে চন্দ্রের দিকে। চোখে চোখ রেখে বলে,

‘ ধ্বংস নয়। বিন্দু খুব সুখী হবে। ‘

‘ ব্যস, আর একটি কথাও তুমি বলবে না। আমার জীবনে চরম সর্বনাশ বয়ে এনেছো তুমি। দুটো হৃদয়ে আজ রক্তক্ষরণ হচ্ছে কেবল তোমারই জন্য। ‘

‘ আমার জন্য? ‘

সাহেরার চোখ দুটো জলে ভরে উঠে। চন্দ্রর কান দুটোতে ভেসে আসে একটি কথাই।
‘ কথা দে চন্দ্র তুই সাহেরাকে কোনো কষ্ট পেতে দিবি না। আমার সন্তান আর ভালোবাসার মানুষটাকে আগলে রাখবি সারাজীবন? ‘

চন্দ্র কিছু বুঝে উঠতে না পেরে কথা দিয়ে ফেলে তখন।

সেই স্মৃতিটা মনে পড়তেই দু পা পিছিয়ে যায় চন্দ্র। পালিয়ে যায় নিজের বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে।


শশুর বাড়িতে মানিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে বিন্দু। মাঝে মাঝে বুক ফেটে আর্তনাদ বেরুতে চায়। সে দাঁতে দাঁত চেপে আটকায় নিজেকে। ভাগ্যের ওপর কারো জোর চলে না৷ বিন্দুরও চলেনি। ছোটোবেলা থেকে সে স্বপ্ন দেখতো চন্দ্রের বউ হবে। বিয়ের পর চন্দ্রর বুকে ঘুমাবে রোজ। চন্দ্রর সঙ্গে তার মিষ্টি একটা বাসর হবে। সেই স্বপ্নের আজ মৃত্যু ঘটেছে। আজ বিন্দু বিবাহিত। গতরাতে তার বীভৎস একটা বাসর হয়েছে। কত যন্ত্রণায় ছটফট করেছে বিন্দু। তার হৃদয়ে বারবার ধ্বনিত হয়েছে, ‘ বিন্দু তোমাকে সহ্য করতে হবে৷ কারণ তুমি চন্দ্রের বউ নয় তুমি এহসান মাস্টারের বউ। সুখ নয় দুঃখই আজ থেকে তোমার সঙ্গী। ‘

বিন্দুকে আজও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। সকলের মুখে একই কথা, ‘এহসানের কপালে কী মিষ্টি একটা বউ জুটেছে।’

বউভাতে আত্মীয়-স্বজনে ভরে উঠেছে বাড়িটা। প্রথম বৈঠকের খানাদানা চলতেই বিন্দুর বাপের বাড়ি থেকে লোকজন চলে এলো৷ বিন্দুর সাথে দেখা করল সকলে। বিন্দু যতটা সম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু ছোটোবোন বৃন্দাকে দেখে ও আর নিজেকে ধরে রাখতেই পারলো না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। এমন সময় বিন্দুর ননদ এমি এলো বৃন্দাকে খেতে ডাকতে। কনের বাড়ির সকলকে খেতে বসানো হয়েছে। বৃন্দাকে নিয়ে এমি চলে গেল। বিন্দু এখন ঘরে একা। বাড়ির সবাই মেহমানদের নিয়ে ব্যস্ত। এহসান মাস্টারও বউয়ের তরফ থেকে আসা আত্মীয়দের দেখেশুনে খাওয়াচ্ছে।

বিন্দু চুপচাপ বসে আছে। কাঁদতে চাইছে না। তবুও চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়াচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ দরজায় শব্দ হয়। বিন্দু চমকে তাকায়। চন্দ্র এসেছে!

শ্যামলাটে শরীরে কালো রঙের একটি পাঞ্জাবি পড়া। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির লম্বাটে মুখটা যেন ঝুলে পড়ে আরও লম্বা লাগছে। নাকের ডগা কেমন লালচে। চোখ দুটোয় তাকানো যাচ্ছে না। চন্দ্র বোধহয় কেঁদেছে খুব। কেন কেঁদেছে? তার দুঃখ কি বিন্দুর চেয়েও বেশি?

চন্দ্র এগুচ্ছে। অন্যের বউ রূপে বসে থাকা বিন্দুর দিকে এগুচ্ছে। সহসা উঠে দাঁড়ায় বিন্দু। তীব্র উত্তেজনায় বলে,

‘ চন্দ্র!!! ‘

আর একটুও স্থির থাকে না বিন্দু। ছুটে গিয়ে চন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে। খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। যেন পৃথিবীর কোনো শক্তি আজ বিন্দুকে চন্দ্রর থেকে আলাদা করতে পারবে না। বিন্দু কাঁদছে কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে চন্দ্রর। কাঁদছে চন্দ্রও। বিন্দুর মাথায় তোলা ঘোমটাটা ভিজে যাচ্ছে ওর চোখের জলে।

‘ কেন এটা করলে বিন্দু কেন? আর একটু কেন অপেক্ষা করলে না?’

বিন্দুর কান্না বাড়ে। চন্দ্রর দৃষ্টি আচমকা বিন্দুর ঘাড়ে পড়ে। খুব তীক্ষ্ণ একটা চুমুর দাগ সেখানে। চন্দ্র চোখ মুখ খিচে নেয়। মস্তিষ্কে খুন চেপে যায়। বিন্দুকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করে,

‘ কাকে, কাকে খু’ন করব বিন্দু! তোমাকে না ওই জানোয়ারটাকে? ‘

~ক্রমশ~

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply