Golpo romantic golpo চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু পর্ব ২


চন্দ্রবিন্দু

পর্ব_২

জান্নাতুল_নাঈমা

মিঠাইপুর গ্রামের প্রত্যেকে জানে চন্দ্র আর বিন্দুর কথা। তারা একে-অপরকে ভালোবাসে। তারা একে অপরের বাগদত্তা। দুই পরিবারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার কথাও কারো অজানা নয়। তাই পথে চন্দ্র যখন বিন্দুকে স্পর্শ করল৷ বিন্দুর হাতটা টেনে ধরল। কেউ অবাক হলো না৷ আর না এসে প্রশ্ন করল বা বাঁকা চোখে তাকালো। ভূঁইয়া পরিবারের বড়ো ছেলে চন্দ্রশেখর। খুবই সম্মানিত ব্যক্তি। বি.এ পাশ করেছে চন্দ্র। মিঠাইপুর গ্রামের একমাত্র শিক্ষিত ব্যক্তি। পারিবারিক সূত্র আর শিক্ষাগত যোগ্যতা সবেমিলে চন্দ্র মিঠাইপুর গ্রামে ফেরেশতার মতো বিরাজ করে। সেই ফেরেশতা তুল্য ব্যক্তি যখন বিন্দুর পথ আটকায়। জোরপূর্বক বিন্দুকে ছুঁয়ে দেয়। কেউ প্রতিবাদ করতে আসে না। নীরবে দু-চোখে অশ্রু গড়ায় বিন্দুর। এ গ্রামে সে আর তার পরিবার তো ভূঁইয়া পরিবারের দাপটেই মাথা তুলে সুন্দর ভাবে জীবনযাপন করছে।

চন্দ্র তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ। বিন্দু কাঁদছে। এই কান্নার কারণ অজানা নয়। চন্দ্র ধীরেধীরে বিন্দুকে কাছে টেনে নিলো। মৃদু স্বরে বলল,

‘ চলো বিন্দু বটগাছের নিচে বসি। ‘

মনে মনে যেতে চায় না বিন্দু। তবুও অদ্ভুত এক টানে চন্দ্রর পিছু পিছু পা বাড়ায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে এই ভেবে যে,

‘ সারাজীবন এভাবেই তো হাঁটার ইচ্ছে ছিল তার চন্দ্রের সাথে। ‘

গ্রামের সবচেয়ে বড়ো বটগাছটা তিন পথের মধ্যিখানে অবস্থিত। এখানে চন্দ্র আর বিন্দুর কতশত মধুর স্মৃতি। বিন্দু চোখের পানি থামাতে পারে না। চন্দ্র থামাতে চায়ও না। বিন্দু কাঁদছে। চন্দ্র দেখছে। গোপনে গোপনে তার পুরুষালি চিত্ত গর্বে ফুলে ফেঁপে উঠছে। বিন্দুটা তাকে কত ভালোবাসে। সেও তো বাসে বিন্দুর চেয়ে অনেক অনেক বেশি। স্বপনকে ইশারা দিতেই স্বপন চলে গেল। চন্দ্র বিন্দু পাশাপাশি বসেছে৷ এক পথ দিয়ে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। আরেক পথ দিয়ে অনেক মানুষের আনাগোনা। কেউ শহরে গিয়েছিল ফিরছে বাড়ি৷ কেউ গিয়েছি বাজার করতে। বড়ো বড়ো মাছ কিনে বাড়ি ফিরছে। ওরা দুজন সবই দেখছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। নীরবতায় অনেক কথা বোঝার চেষ্টা মাত্র।

চন্দ্র খুব শক্ত মনের মানুষ। বিন্দুর প্রতি তার অগাধ প্রেম, ভালোবাসা থাকলেও কখনো দুর্বলতা প্রকাশ করেনি৷ আজও করল না। শুধু ভেঙে পড়া বিন্দুর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

‘ নিজেকে শক্ত করো বিন্দু। আমার বউকে এভাবে ভেঙে পড়া মানায় না। তুমি শুধু বিশ্বাস রাখো এই চন্দ্র তোমারই আছে। ‘

চমকে উঠে বিন্দু৷ বিস্মিত হয়ে তাকায় চন্দ্রের পানে। তারপর দু-চোখে অশ্রু ঢেলে দিয়ে বলে,

‘ বিশ্বাস রাখব? জন্ম-মৃত্যু – বিয়ের চেয়ে চিরন্তন সত্য আর কি আছে? ‘

চন্দ্র চমকায়। বিন্দু এভাবে কথা বলছে! বিন্দু তার চমক আরও বাড়ায়।

‘ আপনি অন্যের স্বামী। ঘরে বউ রেখে পাশের বাড়ির মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক রাখাকে কী বলে জানেন? পরকীয়া বলে। আর এই ঘৃণ্য সম্পর্ক আমি রাখতে চাই না। মুখে মুখে বউ বললেই সে আপনার বউ হয়ে যায় না৷ আপনার বউ সেই যাকে বঁধু রূপে গতকাল ঘরে তুলেছেন। ‘

কথার সমাপ্তি দিয়ে অকস্মাৎ চন্দ্রর থেকে হাত ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল বিন্দু। চন্দ্র আঘাত পেলো প্রচণ্ড। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকালো বিন্দুর দিকে। কীভাবে পারলো বিন্দু তাকে এভাবে আঘাত করে কথা বলতে? এভাবে হাতটাই বা ছাড়িয়ে নিলো কোন স্পর্ধায়? চন্দ্রর নিঃশ্বাস অস্থির হয়৷ ত্বরিত উঠে দাঁড়ায়। বিন্দু ততক্ষণে পা বাড়িয়েছে। চন্দ্র ছুটে আসে পিছু পিছু। উৎকণ্ঠিত গলায় বলে,

‘ মাটিতে তাকাও বিন্দু। মাথার রাগ পায়ে ফেলো। ‘

বিন্দু কথা শুনে না। বিন্দুর চোখে এখন আর জল গড়ায় না৷ চন্দ্র ভয় পায়৷ শিউরে উঠে এই বিন্দুকে দেখে। দৃঢ় স্বরে বলে উঠে,

‘ ভালোবাসি বিন্দু। আমি তোমাকে আমার বউ করব বিন্দু৷ বিশ্বাস রাখো। আমার প্রতি বিশ্বাস হারিও না। ‘

বাড়ির সামনে চলে এসেছে বিন্দু। চন্দ্রর অস্থিরতা বাড়ে। বিন্দু তাকাচ্ছে না কেন ওর দিকে? মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে! তার বিন্দু তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মাথায় যেন রক্ত ছলকে উঠে। বিন্দু বাড়ির ভেতর চলে গেছে। চন্দ্রও পেছন পেছন ঢুকল। ঘরে গিয়ে দরজা আঁটকে দিলো বিন্দু। চন্দ্র দরজায় কড়া নাড়ল,

‘ বিন্দু দরজা খোলো। আমি কিন্তু ভেঙে ফেলব দরজা। ‘

কল্ললী রান্না ঘর থেকে ছুটে এলো। তীব্র রাগ, ক্ষোভ প্রকাশ করে বলল,

‘ ভাঙো চন্দ্র ভাঙো। যেখানে আমার মেয়ের মন ভেঙেছো। সেখানে এই দরজা আর বিশেষ কী? ‘

চন্দ্রর অস্থিরতা কমে। ঘুরে দাঁড়ায় কল্ললীর দিকে। দৃঢ় স্বরে বলে উঠে,

‘ আমি বিন্দুকে ভালোবাসি কাকি মা। আমি ওর মন ভাঙিনি৷ ও না বুঝে নিজের মন নিজেই ভাঙছে। ‘

‘ না বুঝে? না বোঝার কী আছে বিয়ে করে বউ তুমি ঘরে তুলোনি? ‘

চন্দ্র থামে। নিশ্চুপ রয় কিছুক্ষণ। তারপর বলে,

‘ হ্যাঁ তুলেছি এর মানে এই না বিন্দুকে আমি ভালোবাসি না বা ওর প্রতি আমার দায়ভার নেই। ‘

কল্ললী ক্ষেপে যায়।

‘ আমার মেয়ের দায়ভার কেবল আমারই। তোমাকে সেসব নিয়ে ভাবতে হবে না। বিয়ে করেছো যাও সুখে সংসার করো। আমার মেয়ের পিছু ছাড়ো। ‘

‘ এই কাকি মা! বিন্দুর পিছু তো দূর ওকে পুরোটার একটুও আমি ছাড়ব না। ‘

সহসা ধমকে উঠে চন্দ্র৷ কল্ললী কেঁপে উঠে। চন্দ্রর রাগ ভয়ংকর খুব। তবুও এই মিছে আবেগ মূল্যহীন। তাই পাল্টা জবাব দেয়,

‘ আমি বিন্দুকে অন্যত্র পাত্রস্থ করব। ‘

‘ খু’ন করে দেবো কাকি মা। ‘

আঁতকে উঠে কল্ললী। পিছিয়ে যায় দু কদম। চন্দ্রর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। যে প্রতারণা করে তার মুখে এত বড়ো বড়ো কথা মানায় না। তাই বিরক্তি নিয়ে কল্ললী স্থান ত্যাগ করল। চন্দ্র দরজা ধাক্কাচ্ছে। চিৎকার করছে,

‘ বিন্দু দরজা খোলো। বিন্দু, বিন্দু, বিন্দু….।’

বিন্দু দরজা খুলল না। চন্দ্রর রাগ, জেদ, আকুতি কোনোকিছুতেই তার মন গলল না।


দুপুর গড়িয়ে বিকাল তখন। উদাস নয়নে বসে থাকা বিন্দুকে ডাকল কল্ললী। বিন্দু মৃদু পায়ে মায়ের ঘরে এলো। কল্ললী বলল,
‘ চল নতুন বউ দেখে আসি। ‘

চমকে উঠল বিন্দু। নতুন বউ দেখতে যাবে সে? কার বউ চন্দ্রর বউ? যে মানুষ, যে ঘর, সংসার তার হবার কথা তা আজ অন্য কারো দখলে। দখল করা সেই নারীকে দেখতে যাবে সে? মা কীভাবে এমন প্রস্তাব দিতে পারে?

‘ এ তুমি কেমন কথা বললে মা? মশকরা করছো? ‘

কল্ললী সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলো,

‘ চন্দ্র তোকে ঠকিয়েছে। বিয়ে করে এনেছে অন্য কাউকে। এরজন্য তুই ঘরে মুখ গুঁজে বসে শুধু কাঁদবিই? পুরুষ মানুষই শুধু নারীকে ভোগাতে পারে নারীরা পারে না? তুই আমার মেয়ে বিন্দু তোকে শুধু কান্না মানায় না। তোর হৃদয় যে ভেঙেছে তার হৃদয়ও তোকে ভাঙতে হবে। যদি চন্দ্র তোকে সত্যিকারের ভালোবেসে থাকে তবে ভাঙবে। যদি ভালোবাসা না থাকে তবে জ্বলবে। ‘

বিন্দু স্তব্ধ। মা কী বলছে এসব? কল্ললী বলল,

‘ সব বুঝতে পারবি। শুধু কথা দে মা এখন থেকে আমি যাব বলব তাই শুনবি। আমার আদেশ ছাড়া একচুল পরিমাণও নড়বি না। ‘

বিন্দু নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে। এই গোটা পৃথিবীতে তার একমাত্র ভরসার স্থল যে শুধুই মা। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোয় বিন্দুর। মায়ের কথা মতো চলে যায় ভূঁইয়া বাড়িতে।

বিন্দুর কত সাহস। সে তার প্রেমিক পুরুষ, ভালোবাসার মানুষ, বাগদত্তা চন্দ্রর বউ দেখতে যাচ্ছে! নিষ্ঠুর আসলে কে চন্দ্র, বিন্দু নাকি কল্ললী?
বিন্দু নিজেকে আর নিজের ভাগ্যকেই নিষ্ঠুর বলল।

চন্দ্রর দাদি মায়ের সঙ্গে গল্প করছে সাহেরা। হঠাৎ শুনতে পেলো, পাশের বাড়ির মেয়ে, বউ তাকে দেখতে এসেছে। লজ্জা পায় সাহেরা। ঘোমটা টানে সুন্দর মতোন। তারপর গুটিগুটি পায়ে দাদির ঘর থেকে বেরোয়। উঠানে দাঁড়িয়ে আছে বিন্দু। কল্ললী চন্দ্রর মা চায়না বেগমের সঙ্গে কথা বলছে। চায়না বেগম ক্ষমা চাইল৷ কীভাবে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছে না বলে হতাশা প্রকাশ করল। তারপর বলল,

‘ জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে এসব তো আমাদের হাতে নেই। ‘

কল্ললী তক্ষনি বলল,

‘ হ্যাঁ ভাবি। আমিও সেটা ভেবেই মনকে শক্ত করে বিন্দুকে নিয়ে এলাম। ‘

চায়না বেগম বললেন,

‘ তোমার বিন্দুর খুব ভালো বিয়ে হবে। আমরা দেখে শুনে ওর বিয়ে দেবো। তুমি চিন্তা করো না। ‘

কল্ললী সঙ্গে সঙ্গে হাসলো একটু। বলল,
‘ হ্যাঁ ভাবি। পাত্র দেখুন। আমিও ঘটককে খবর পাঠাব। ‘

বিন্দু শুনছিল সব কথা। হঠাৎ সাহেরা এসে দাঁড়াল তার সামনে। চন্দ্রর ছোটো বোন চামেলি সাহেরাকে দেখিয়ে বলল,

‘ বিন্দু আপা আমার ভাবি। ‘

আকস্মিক সাহেরাকে দেখে, সাহেরার সৌন্দর্য পরিপূর্ণ ভাবে দৃষ্টিপাত করে বুকের ভেতর দুমড়েমুচড়ে গেল বিন্দুর। তার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাঁপছে। এই তবে কারণ! শেষ পর্যন্ত চন্দ্রও রূপের মোহে পড়ল। তাদের এতদিনের ভালোবাসা তবে এই রূপের কাছেই তুচ্ছ হলো? চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না বিন্দু। আর না এক মুহুর্ত ওর দাঁড়াতে ইচ্ছে করল। সে এক ছুটে পালাতে চাইল। কিন্তু বাঁধা হয়ে পড়ল চন্দ্র। আকস্মিক বিন্দুকে দেখে চমকেছে চন্দ্র৷ যদিও এ বাড়িতে বিন্দুর আসা যাওয়া নতুন নয়। তবুও সাহেরা আসার পর বিন্দুর উপস্থিতি অবাক করেছে তাকে। আর এসে এভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে কেন? কেউ কি বিন্দুকে কিছু বলেছে? মুহুর্তেই চোয়াল দৃঢ় হয় চন্দ্রর। বিন্দু চোখ তুলে এক পলক তাকিয়ে দেখে চন্দ্রকে। টপটপ করে জল গড়ায় গাল বেয়ে। চন্দ্র সে জল মুছাতে উদ্যত হতেই বিন্দু মুখ ফিরিয়ে নেয়। ভাঙা কণ্ঠে বলে,

‘ তোমার বউ খুব সুন্দরী চন্দ্র। দোয়া করি খুব সুখী হও। ‘

আর এক মুহুর্ত দাঁড়ায় না বিন্দু। এক ছুটে বেরিয়ে যায়। চন্দ্র একবার তাকায় সাহেরার দিকে। আর একবার তাকায় বিন্দুর চলে যাওয়ার দিকে। বুকের ভেতর তার উথাল-পাতাল শুরু হয়। বিন্দুকে কবে বোঝাতে পারবে, বিন্দু বুঝবে তো সবটা?

পুকুর ঘাটে বসে বসে সিগারেট ফুঁকছে চন্দ্র। হঠাৎ খবর পেলো বিন্দুকে আজ পাত্রপক্ষরা দেখতে আসছে! এত বড়ো স্পর্ধা কার? কারা আসে বিন্দুকে দেখতে?

~ক্রমশ~
ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্পটা বেশি বড়ো হবে না৷ আমি শুধু রাইটিং ব্লক কাটানোর জন্য ভিন্ন ক্যাটাগরীর একটা গল্প লিখছি…।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply