Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ


খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৪২ এর প্রথমাংশ

সিড়ি দিয়ে একা একা বকতে বকতে উপরে যাচ্ছে ফুলমালা। গন্তব্য ছাদে। নদীর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান ছাদে করা হবে। সকালে কাচা হলুদের আয়োজন। হলুদ গোসলের পর রাতে আয়োজন করা হয়েছে অনুষ্ঠানের। কিন্তু ছেলের বাড়ি থেকে এখনো হলুদ আসেনি। আরো কিছুক্ষণ দেরি হবে বলল তারা। ফুলমালা আর অদিতি অনেক গুলো মাটির সরা এঁকেছে। সেগুলো শীতল পাটি তে সাজাচ্ছে। দীঘি এলো ঢুলতে ঢুলতে। ঘুম পাচ্ছে ওর খুব। রিশা সব কিছুর ছবি তুলছে। ফুলমালার একদম পছন্দ হচ্ছে না রিশা কে। অদিতির কানে কানে বলল
“এই মাইডা রে আমার ভালো ঠ্যাহে না গো ভাবি। কেমন জানি হায়ে পড়া। ব্যাডা মাইনসের গায়ে হাত দিয়া কতা কয়, দ্যাখছো দ্যাখছো?”

তুযা ফুল দিয়ে স্টেজ সাজাতে সাহায্য করছে ডেকোরেশন এর লোক দের। রিশা ও সব জায়গা ছেড়ে তুযার পিছ পিছ ই ঘুরছে। ফুলমালা অনেকক্ষণ সহ্য করলেও এবার আর সহ্য হলো হলো না। রিশা তুযার গা ঘেষে দাড়িয়ে সেলফি নিচ্ছে। পাটি তে বসা থেকে উঠে গটগট করে হেঁটে গেলো ফুলমালা তুযার সামনে। রাগে মুখশ্রী লাল হয়ে আছে তার। কপট রাগ দেখিয়ে বলল
“তুযা ভাই! আমনে এইহানে কি করেন হ্যা? আহেন, আহেন আমার লগে কইতাছি।”

তুযা কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফুলমালা তুযার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে এলো। দীঘির সামনে দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে গেল। দীঘি ওইদিকে একবার তাকিয়ে অদিতিকে চোখে ইশারা করলো সেদিকে দেখতে। অদিতি মুচকি হাসলো দীঘি কপোট রাগ দেখিয়ে বলল
“এমন ভোদাই এর মত শুধু হাসবেই। দেখেছিলাম যখন জেবাপু এসে ভাইয়ার গা ঘেষছিলো, কেমন অফ ফুলে টপ হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতে। ফুলমালাকে দেখেও তো কিছু শিখতে পারো তাই না”

তুযা কে ফুলমালা টেনে নিয়ে যাওয়ায় রিশার খুব রাগ হলো। দাঁত কিটমিট করে ঐদিকে এগিয়ে যেতে নিলে দীঘি বাহু টেনে ধরলো
“আরে আরে কই যাও আপু? গার্লফ্রেন্ড বয়ফ্রেন্ড আলাদা টাইম স্পেন্ড করলে তাদের ডিস্টার্ব করাটা খুউউউউব বাজে দেখায় আপুউউউ”

রিশা চোখ ছোট ছোট করে ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলে
“কি বললি? কে কার বয়ফ্রেন্ড আর কে ই বা কার গার্লফ্রেন্ড?”

দীঘি বোকা সাজার নাটক করে বলল
“ ওমা তুমি জানো না নাকি? দাদাভাই আর ফুলমালা তো লিভটুগেদার করছে”

“কীইইইইই?”

“হ্যাঁ”

রিশা এক ঝাটকায় দীঘির থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল
“আমাকে বোকা পেয়েছিস? আমি কিছু বুঝিনা নাকি? গ্রামের ওসব হয় নাকি?”

“ওমা হবে না কেন? ওদের তো আরো ভালো করে হয়। তুমি জানো না তাই। ওরা আসলে লিভ টুগেদার বলে না, ওরা লিভ টুগেদারকে মন দেওয়া নেওয়া বলে। তুমি বিশ্বাস করছ না তো? দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি ফুল মালা কে ডেকে তোমাকে ক্লিয়ার করে দিচ্ছি”

দীঘি নাটকীয় ভঙ্গিতে ফুলমালাকে ডাকতে লাগলো
“ফুউউউল, এই ফুউউউল, এই এদিকে এদিকে, এদিকে এসো”

ফুলমালা মুখ ভর করে গটাগট কটা পা ফেলে দীঘির কাছে এগিয়ে এলো। দীঘি ফুলমালার দিকে তাকিয়ে বলল
“একদম মিথ্যা বলবে না। আমি যা বলছি তার একদম সত্য সত্য উত্তর দেবে।”

ফুলমালা সম্মতি জানায়। দীঘি একবার রিশার দিকে তাকিয়ে ইশারা করে ফুলমালার কথা শুনতে
“তুমি দাদাভাই কে মন দিয়েছো?”

ফুলমালা মাথা নিচু করে থাকে কিছুক্ষণ তারপর বলে
“ওসব আমি কইতে পারবো না। আমার শরম লাগে।”

রিশা তেতে উঠে বলল
“ইস ফষ্টিনষ্টি করার সময় মনে থাকে না? এখন মুখে বলতে খুব সরম করছে না? তোমাকে খুব ভালো ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম গ্রামের মেয়েরা সহজ সরল হয় কিন্তু তুমি তো….”

রিশার কথা শেষ হওয়ার আগেই দীঘি মুখ চেপে ধরে থামিয়ে দিলো। ফুলমালা অগ্নি চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে রিশার দিকে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি খেয়ে ফেলবে। দীঘি ফুলমালা কে বলল
“তুমি সত্যিটা বলে দিলেই পারো ফুল”

ফুলমালা খুব ক্ষেপে গেছে। নিজের সর্বাঙ্গের সমস্ত শক্তি দিয়ে জোরে জোরে বলতে শুরু করল
“হ হ দিছি, মন দিছি আমি আমার তুযারে। মন দিয়েছি আর আমি হেরে ভালোবাসি হের ঘরের বউ ও হমু, কবিতার মাও হমু। তোর কোনো সমস্যা? বেদ্দপ ছেড়ি, বান্দরের লাহান চেহারা। মন চাইতেছে জুতা দিয়ে কয়েকটা মারি তোর মুখে”

রিশাও খুব ক্ষেপে গেল ফুল মালার উপর
“হাউ ডেয়ার ইউ। গাইয়া ভূত কোথাকার। আগে নিজের ভাষা সংযত কর তারপর প্রেম করতে আসিস অসভ্য মেয়ে ছেলে”

ফুলমালা দু হাতে নিজের শাড়ি খানিকটা উঁচু করে তেড়ে গেল রিশার ওপর
“কি কইলি তুই নচ্ছার মেয়ে লোক? আমারে তুই কস অসভ্য? আজ তোর একদিন কি আমার একদিন”

ফুলমালা রিশার চুলগুলো মুঠো করে ধরে গালে ধামাধাম কয়েকটা চড় বসিয়ে দিল। রিশা শক্তিতে মোটেই পেরে উঠলো না বয়সে কম ফুলমালার সাথে। এরা ধানের বস্তা কোমরে বাধিয়ে জমি থেকে বাড়িতে আনার মেয়ে। এদের সাথে শক্তিতে পারা এত সহজ বুঝি? দীঘি দুজনকে চেঁচিয়েও থামাতে পারলেন না, ফুলমালা মেরেই চলেছে রিশাকে। অবশেষে তুযা দৌড়ে এসে দুজনের দ্বন্দ্ব থামালো
“ফুল ছাড় ওকে। ফুল আমার কথা শোন ফুল। ছাড় ওকে। ছেড়ে দে ছেড়ে দে বলছি।”

তুযা ফুলকে জাপটে ধরে একরকম টেনে সরালোরে রিশার কাছ থেকে। ফুলমালা এখনো শান্ত হয়নি। তুযার দুহাতের বাঁধনের থেকেও ছটফট করছে ছোটার জন্য। কিন্তু তুযা কি আর ছাড়বে? ছেড়ে দিলেই আজ রিশার রক্ষে নেই। দীঘি তুযাকে বলল
“দাদাভাই বাড়ির লোকজন জড়ো হওয়ার আগে ওকে নিয়ে চলে যাও এখান থেকে। রুমে নিয়ে যাও ওকে দ্রুত”

তুযা ফুলমালা কে টেনে রুমে নিয়ে গেলো। রিশাও জিদ দেখাতে দেখাতে নিজের ঘরে চলে গেলো।

অদিতি দীঘির কাছে এগিয়ে এসে বলল
“আপু তুমিও না, পারও বটে, কি দরকার ছিল এত ঝামেলা লাগানোর?”

দীঘি অদিতির দিকে ঠোঁট চোখা করে দুবার চুকচুক করলো
“আমার ঝামেলা দেখতে খুব ভালো লাগে”

অদিতি তাকিয়ে রইলো দীঘির চলে যাওয়ার দিকে। এই গোষ্ঠী তে তুযা আর দীঘির ব্যাবহার এমন। বাকী সবাই বেশ ভদ্রই। বোনের বাড়ি থেকে হলুদ নিয়ে লোকজন এসেছে। সাথে এসেছে শাওনের ভাই শুভ। কালকে ফুলমালার সাথে ফ্লার্ট করলেও আজকে শুভর মনে ধরেছে দিঘীকে। কিন্তু ও তো জানে না, এই যে ধানি লঙ্কা। কাছে গেলে পুড়ে যাবে। পাত্রপক্ষ থেকে আনারল মিষ্টি, হলুদ এবং ফলমূল সকল কিছু ভেতরে নিয়ে রেখে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো ছাদে। নদীর জন্য সাজানো স্টেজে, ওখানেই তারা নদীকে হলুদ দেবে। দীঘি রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে হলুদ একটা গাউন পরে নিলো।

নদীকে লাল পাড় হলুদ শাড়ি পড়ানো হয়েছে। নকশা আঁকা পিড়ির ওপর বসিয়ে নদীকে হলুদ দিতে শুরু করলো সকলে একে একে। সবার প্রথমে দিল সায়রা। আগে বরণ ডালা দিয়ে বরণ করে তারপর দু’গালে হলুদ লাগালো। মেয়েকে হলুদ লাগানোর সময় সায়রার চোখের পানি আর বাঁধ মানলো না। আদরের শান্তশিষ্ট বড় মেয়েটা তার পরের বাড়ি চলে যাচ্ছে। অদিতি সায়রা কে ধরে সরিয়ে আনলো। নদীও কাদছে মায়ের কান্না দেখে।

দীঘি অল্প দূরে মন খারাপ করে দাড়িয়ে আছে মা বোনের কান্না দেখে। শুভ অনেকক্ষণ হলো ফলো করছে দীঘি কে। হাতে হলুদ লাগিয়ে নিয়ে দীঘির কাছে দাঁড়ালো। মৃদু গলা খাকারি দিয়ে বলল
“উহুম উহুম, হ্যালো বেয়াইন”

দীঘি একবার তাকিয়ে আবার নদীর হলুদের দিকে তাকালো। কিছু বলল না। শুভ আরেকটু ঘেষে দাঁড়িয়ে বলল
“বেয়াইন এর সুন্দর গালে একটু হলুদ লাগাই? দেখি কেমন সুন্দর লাগে”

দীঘি দাঁত কিড়মিড় করে বলল
“হলুদ তোর পাছায় লাগাতাম মান্দির পোলা। খালি বাড়িতে মানুষ আছে বলে। আর আমি বুঝলাম না, চিড়িয়াখানার লোকেরা কি তোর খোজ পাচ্ছে না? তুই এখনো বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?”

শুভর খুব ইগোতে লাগলো কথাটা।
“আমার মতো হ্যান্ডসাম ছেলে কেনো চিড়িয়াখানায় যাবে বেয়ান? কি বলেন না বলেন”

“হ্যা তোমার মতো হ্যাডারসাম জীবনেও দেখি নাই মাইরি বলছি। হ্যান্ডসাম নামটা নিজের সাথে জুড়ে বেচারা হ্যান্ডসামের ই ইজ্জত মেরে দিলা নাটকের পো হুমুন্দির নাতি।”

শুভ খানিকটা সরে যায় দীঘির থেকে। অবাক হয়ে বলে
“এটা মেয়ে না কি রে ভাই? গালাগালির গোডাউন। কি বলে এসব?”

দীঘি ব্যাঙ্গাত্বক হেসে বলল
“ধন্যবাদ দিতে হবে না”

শুভ রাগ করতে করতে চলে গেল সেখান থেকে। আজ ভীষণ ইগোতে লেগেছে তার, এর প্রতিশোধ সে নিবেই। রাগ করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ধাক্কা লেগে গেল ফুলমালার সাথে। ফুলমালাও ঝাড়ি মেরে বললো
“দেখে চলতে পারেন না নাকি? মাইয়া মাইনষের গায়ে আইসা ঢইলা পড়েন। খাচ্ছর মর্দা লোক কোনহান কার। ইশশ গায়ে কি গন্ধ”

দুই আঙ্গুল দিয়ে নাক চেপে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলো ফুল মালা। শুভ সেদিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল
“এ বাড়ির সব মেয়েলোক এমন কেন? আবার ভাইয়া যাকে বিয়ে করছে যদি সেও এমন হয়?”

শুভর একা একা বলা কথাটা শুনে ফেলল দীঘি। পিছন থেকে বলল
“হ্যাঁ, তরকারিতে থুথু মিশিয়ে খাওয়াবে, বুঝতেও পারবেনা।”

শুভ তাড়াতাড়ি করে নিচে চলে এলো। এদের সাথে কথা না বাড়ানোই ভালো। ভীষণ ভয়ঙ্কর এরা। তুযার কপালে গাঢ় চিন্তার ভাঁজ। চিন্তাটা অন্য কিছু না ফুল মালাকে নিয়ে। মেয়েটার ব্যবহার দিনকে দিন এমন হচ্ছে, শেষমেষ তুযার জন্য মেয়েটার কি পরিণতি হবে সেটা ভেবেই তুযা অস্থির। আজকাল অন্য কাউকে তুযার পাশে সহ্য হচ্ছে না ফুলমালার। তুযা খেয়াল করেছে অনেকবার। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে মেয়েটার সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে। নদীর বিয়ে শেষ করে বাড়িতে ফিরে ফুল মালার বাবার সাথে কথা বলতে হবে। ওকে ভালো কোন ঘরে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দিতে পারলেই যেন এবার তুযা বাচে।

সকলের হলুদ মাখা শেষ হলো এখনো মেয়ের বাবাকে পাওয়া যায়নি হলুদ দেওয়ার জন্য। দু’নম্বরি করে ব্যবসা করতে গিয়ে সেখানে বহু টাকা লস খেয়েছে হাবিব। এখন হাসান চৌধুরীর কাছে চাওয়ার মত মুখটাও তার নেই। উপায় না পেয়ে নিজের মেয়ের বিয়ের গয়না চুরি করে চামেলীর উপর দোষ দিতে গিয়েছিল। কিন্তু সাইফ আর তুযার চতুরতার কাছে সে হেরে গেছে। এ নিয়ে ওয়াহাব চৌধুরী নানান কথা শোনায়। তাই সে কোথায় চলে গেছে এখনো তার হদিস মেলেনি। কিন্তু তাই বলে তো আর মেয়ের বিয়ে ফেলে রাখা যায় না। সেই চিন্তায় ওয়াহাব চৌধুরী আর হাসান চৌধুরী নদীর বিয়ের কোন কার্যক্রম এখনো বাদ রাখেনি।

নদীর হলুদ দেওয়া শেষ এখন গোসল হবে। শাওনের মা নদীর মাকে বলল
“বেয়াইন আর কারও বাকি নেই তো হলুদ দেওয়ার?”
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো এক পুরুষশালী কণ্ঠস্বর
“আছে”

সবাই পিছন দিকে তাকালো সাথে সাথে। নদীর চোখ তো কপালে উঠে গেলো। আঞ্জুমান অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলো
“তুমুল?”

চলবে?

অবশ্যই ১.৭k পূরণ করবেন 💜

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply