Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৫


খাঁচায়বন্দীফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৪৫

রাজশাহী তে পৌঁছাতে তুমুলের ভোর হলো। ফজরের আযান হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। সবে ভোরের আলো ফুটলো। জোয়ার্দার বাড়ির বড় বউ ব্যাতিত কেউ এখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। রাশেদা বেগম ফজরের নামাজ পরে সোফায় বসে তসবিহ জপছিলেন। দরজায় কলিং বেল এর শব্দে তার মনোযোগ ক্ষুন্ন হলে। তসবিহ টা কপালে ঠেকিয়ে একবার চুমু দিয়ে টি টেবিলের ওপর রেখে দরজা খুলে দিলো। দরজার সামনে হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাড়িয়ে আছে তুমুল। পাশেই দাড়িয়ে আছে নদী। তবে বউ সাজে নেই। তুমুলের ঢাকাতে নেওয়া ফ্ল্যাটে আগে গেছিলো তারা। যেহেতু এত দূরের পথ আসবে তাই নরমাল থ্রি-পিস পরে নিয়েছিলো। রাশেদা বেগম নদীকে দেখে ভড়কে গেলো
“এই মেয়েকে নিয়ে সাত সকালে কোথা থেকে এলি তুই?”

নদী পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার জন্য এগিয়ে গেলে রাশেদা দুপা পিছিয়ে গেলো। কন্ঠে রাগ নিয়ে বলল
“কিরে? কথা বলছিস না কেনো?”

তুমুল ঠান্ডা স্বরে বলল
“আগে ভিতরে চলো। সব বলছি”

নদী মাথার ওড়না টা ভালো করে টেনে চারিদিকে চোখ বোলায়। ড্রইং রুম টা দেখেই বোঝা যাচ্ছে এবাড়ির মানুষ বড়ই রুচিশীল। মামানসই করে সাজানো যেদিকেই চোখ পড়ছে। তুমুল রাশেদা বেগম কে জড়িয়ে ধরে সোফায় বসালেন। নদীকেও ইশারা দিলো বসতে। নানা জড়তা আর অস্বস্তি বোধ নিয়ে নদী বসলো সোফায়। মাথা নিচু করে হাত গুটিয়ে বসে রইলো। রাশেদা বেগমের ভাবমূর্তি ভালো ঠেকছে না মোটেও। তুমুল মায়ের কাধে হাত রেখে বলল
“মা আমি ওকে ভালোবাসি। বিয়ে করে নিয়ে এসেছি”
ব্যাস, তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো রাশেদা। বসা থেকে উঠে দাড়ালো ফট করে।
“কি? কি…কি বললি তুই? তুই এই মেয়েকে বিয়ে করে এনেছিস? হ্যা?”

“মা। মা শান্ত হও। আস্তে কথা বলো। বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে আছে”

“কিসের আস্তে বলবো? হ্যা? আস্তে কথা কেনো বলবো আমি? এই মেয়ের বাপ আর চাচায় মিলে যে ঘর ভর্তি লোকের সামনে আমাদের অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলো, তার বেলায়? তার বেলায় কি আমাদের ছাড় দিয়েছিলো? নাকি ভদ্র ভাবে কথা বলেছিলো? আজ কেনো এই মেয়ের সাথে আমি ভদ্র ভাবে কথা বলবো?”

তুমুল শত চেষ্টা করেও মা কে বোঝাতে পারছে না। অস্বস্তি তে সিটিয়ে যাচ্ছে নদী। রাশেদা টেবিলে পার করে নদীর সামনে গিয়ে দাড়ালো। নদীও দাঁড়ালো বসা থেকে
“এই মেয়ে? তুমি আমার ছেলে কে কেনো বিয়ে করেছো? এখন কোথায় গেলো তোমার বাপ চাচার সম্মান? ওনাদের কথা দুই হলো কী করে? ওনারা না এক কথার মানুষ। তোমাদের এত সম্মান এত অহংকার। বলি সেসব কই এখন?”

তুমুল রাশেদা কে টেনে সরিয়ে আনলো। দুহাতে গাল আগলে ধরে বলল
“মা! মা একবার আমাকে পুরো বিষয়টা এক্সপ্লেইন করতে দাও প্লিজ”

এক ঝটকায় সরিয়ে দিলো তুমুলকে
“তোর কোনো কথা আমি শুনবো না আজ। কেনো? কেনো করলি এমন? কেনো এই মেয়েকে ফের ঘরে তুললি? আমাদের অপমানে কি তোর কিছু যায় আসেনি?”

“মা ওর বাড়ির লোক দের দিয়ে তুমি কি করবে বলোতো। ও বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে আমার সাথে। ওর বাড়ির লোক যেমনই হোক, ও ভীষণ ভালো, মা”

“না না আমি……

মা ছেলের বাক-বিতন্ডার মধ্যে নদী কোমল, মৃদু স্বরে ডাকলো
“মা!”

রাশেদা এবং তুমুল দুজনই চুপ হয়ে গেলো। তাকালো নদীর দিকে। নদী মাথা নিচু করে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এলো রাশেদা বেগমের সামনে। মাথা তুলে তাকিয়ে বলল
“সবাই আপনাদের সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছে মানলাম। কিন্তু এখানে আমার কী দোষ মা? আমি যে সবাই কে ছেড়ে চলে এসেছি। মা কে, বাবা কে, সবাই কে ছেড়ে এসেছি মা। আমাকে দূরে ঠেলে দিবেন না।”

নদী কান্না করে ফেলল কথা বলতে গিয়ে। রাশেদার পায়ের কাছে বসে পড়লো। রাশেদা অল্প নরম হলেও, মন গলল না তার।
“ওসব ন্যাকা কান্না কেঁদে আমাকে ভোলাতে পারবে না, আমি পুরুষ লোক নই যে তোমার কান্না দেখে গলে যাবো। আমি প্রখর আত্মসম্মান বোধ সম্পন্ন মহিলা। তোমার বাপ চাচার মতো আমার কথার নড়চড় হবে না”

ওদের চেচামেচি তে উঠে এলো জামিল আর তার বউ। নদীকে দেখে তারাও অবাক। কিন্তু রাশেদার ক্রোধ দেখে প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না।

তুমুল মায়ের ব্যাবহার দেখে হতবাক। রাশেদা তুমুল এর দিকে তাকিয়ে বলল
“এ মেয়েকে যেখান থেকে এনেছিস সেখানে দিয়ে আয়।”

“ওকে যেখান সেখান থেকে তুলে আনিনি মা। ও যেখান সেখান কার মেয়ে নয়। আর ওকে দিয়ে আসবো বলেও আনিনি”

“তাহলে তুইও চলে যা”

রাশেদার কথাটা বজ্রপাত এর মতো বিধলো সকলের কানে। যেই রাশেদার ছেলের জন্য মরিয়া, সে এমন কথা বলবে কারও ভাবনায় ছিলো না। তুমুলের চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো
“কি বললে মা? আরেকবার বলো”

তুমুলের গলা ধরে আসে কথাটা বলার সময়। রাশেদা শুকনো ঢোক গিলে বলল
“হয় এই মেয়েকে দিয়ে আয়। না হয় তুইও চলে যা। কিন্তু এই মেয়ে এই বাড়ি থাকবে না।……

“কিন্তু ভাবি…..

রাশেদা হাত উচু করে জামিল কে থামালো।
“ব্যাস, কেউ কোনো কথা বলবে না। যদি এই মেয়ে বাড়িতে থাকে, আমি চলে যাবো বাড়ি থেকে”

“তোমার কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই মা। আমরাই চলে যাচ্ছি”

তুমুল নদীর হাত ধরে টানলো। নদী নড়ছে না। তুমুল হাতের জোর বাড়ালো। টেনে নিয়ে গেলো বাইরে। গাড়ির সমনে নিয়ে দরজা খুলল। নদী বসলো না গাড়িতে। ঝাপিয়ে পড়লো তুমুলের বুকে।
“আমার কপালটা এত খারাপ কেনো বলুন তো? কেনো আমি সব খানে অবহেলিত”

তুমুল নদীর মাথায় চুমু খেলো
“তুমি আমার কাছে অতি আদরের এবং মূল্যবান। আজ থেকে তুমি আর আমি একটা সুন্দর সংসার সাজাবো। সংসারে হয়তো বেশি মানুষ থাকবে না, কিন্তু কথা দিচ্ছি, ভালোবাসার কোনো কমতি থাকবে না। চলবে না তোমার বলো?”

“আর মা?”
“মা যদি কোনোদিন ডাকে, আমরা অবিলম্বে চলে আসবো। এখন চলো। আমাদের অনেক পথচলা বাকি।”
“কোথায় যাবো আমরা?”
“ঢাকাতে। আমার ফ্ল্যাটে”


সকাল সকাল তুযা রেডি সেডি হয়ে বেরিয়েছে বাড়ি যাবে। বাধ সাধলো সকলে। এমন সময় কে বাড়ি ছাড়ে? কিন্তু তুযা এক রোখা, সে যাবেই। কারো কোনো কথা কানে যাচ্ছে না। এক মনে খাচ্ছে। খাওয়া হলেই বেরোবে। ফুলমালা উসখুস করছে। সকলের সামনে বলতেও পারছে না সাথে যাবে। তুযার খাওয়া শেষের দিকে, ফুলমালা মুখ ফুটে বলেই ফেললো।
“তুযা ভাই, খালাম্মা তো যাইবো না। আমনে একলা একলা খাওয়া দাওয়া করবেন কই? আমি আর কবিতা আমনের সাথে যাই?”

“আমার খাওনের চিন্তা করতে হইবো না। যে কয়দিন তোরা না আসিস, বাইরে খাইয়া লমু নে।”

লতিফা মুখ গোমড়া করে বলল
“কথা যখন শুনবি না, যাবিই যখন তখন ফুলমালা কে নিয়ে যা। একা একা কত খাস জানি তো। আমরা সপ্তাহ খানিক থাকমু”

“কোনো দরকার নাই। আমার টা আমি বুঝে নিমু”

ফুলমালা মুখ ভার করে দাড়িয়ে রইলো। তুযা উঠে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আসলো। অদিতি টিস্যু এগিয়ে দিলো। তুযা হাত মুছতে মুছতে অদিতিকে বলল
“সাবধানে থাকিস রহমানের মা। আমি যারে ভালো চোখে দেখি হেই হারায় যায় বুঝলি। তোরেও নদীর মতই ভালো পাই। আসি গা রে। আসি মনি মা, কাকিয়া, আসছি। সাইফ আয় এগিয়ে দে একটু। ও ফুল, সাবধানে থাকিস, বাইরে বাইর হইস না একা একা।

ফুলমালা পিছন থেকে ডাকলো
“আমারে নিয়া যাইতেন তুযা ভাই”

“তুই থাক। কয়দিন পর আইসা আবার নিয়া যামুনি”

তুযা চলে গেলো। ফুলমালার মুখ ঢেকে গেলো বিষন্নতায়। দীঘি উঠে নি বলে তুযার সাথে দেখা হলো না। ফুলমালা খেতে বসেও আর খেতে পারলো না।

তুযার গ্রামে পৌঁছাতে বিকেল হলো। আগেই বাড়ি ফিরলে না। হাওরের পাড়ে বেশ সময় নিয়ে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরলো রাত তিনটায়।

পুরো প্রধান বাড়িটা ফাকা। বিশাল বাড়িটাতে এক তুযা ছাড়া কেউ নেই। ঘরে মন বসে না তুযার। চলে যায় ছাদে।

রাত্রির শেষ প্রহর চলে। প্রকৃতি গুমট ভাব ধারণ করেছে। সূর্যোদয় হতে আরো বেশ খানিকটা দেরি। ছাদের কার্নিশে বসে শূন্যে পা দোলাচ্ছে তুযা। বেশ তো বিরহ আপন করে দিব্যি হেসে খেলে বেড়াচ্ছিলো। জীবনে এমন মোড় টা তো না এলেও পারতো। নিজেকে বহু কষ্টে এমন বানিয়েছে যাতে কোনো কিছু নিয়ে আফসোস না হয়। সেই স্তম্ভের গোড়া যে নড়বড় করছে আজ। নিজের জীবনে আসা সব দুঃখ কষ্টকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়া তুযা, অন্যের দুঃখের কারণ হতে পছন্দ করে না। যত বিরহ আসুক জীবনে, সে একাই যথেষ্ট তার দফারফা করতে। কিন্তু এখানে খেলাটা অন্য দিকে চাল দিয়েছে, তুযার জন্য ফুলমালার জীবন টা বিপাকে পড়তে বসেছে।

তুযা খেয়াল করলো, আজ ফুলমালা কে নিয়ে একটু বেশিই ভেবেছে। এবার তাকে এই বিষয়টাকে দুই দিকে ভাগ করে ভাবতে হবে। একদিকে যদি ফুলমালা কে বিয়ে না করে।
তাহলে হয় ফুলমালা আত্ম’হত্যা করবে, অথবা ফুলমালার অবস্থাও তুযার মতো হবে। কিন্তু সে জাতে নারী। সমাজ তার এই আচরণ কেমন করে গ্রহণ করবে?

আর দ্বিতীয় দিকে, যদি তুযা ফুলমালাকে বিয়ে করে…..
বিয়ের কথা টা মাথায় আসতেই তার চোখে ভেসে উঠলো সেই প্রিয় মুখশ্রী। কাঁচা হলুদের ন্যায় চকচকে গায়ের বরন। টানা টানা অক্ষিযুগল। ঘণ নেত্রপল্লব, চিকন ভ্রু-যুগল। কুচি বিহীন খাড়া কাপড় পরে দুই পাশে দুটো বেণি ঝুলিয়ে নিঃশব্দে হেটে যাওয়া রমনী। কখনো তার মুখে ভালোবাসি শোনার আবদার করলে আগে চোখে হাত দিয়ে লজ্জা আড়াল করতো। যে অভিমানে রাগ করতে পারতো না, কেঁদে ফেলতো। আরো মনে পরে তার হাতের বিরিয়ানির কথা। সেসময় গ্রামের মানুষ ওসব তৈরি করতে পারতো না। তার শহুরে মামির থেকে শিখেছিলো। ক’দিন বাদে বাদেই তুযার জন্য পাঠাতো। কখনো নিজে এসে দিতো, তো জমিদারের চাকর বাকর দের কাছে পাঠাতো। একবার সে নিয়ে এক বায়না করে বসেছিলো তুযা। বাগানের শান বাধানো গাছের গোড়ায় বসে আবদার করেছিলো খাইয়ে দিতে হবে। মুখে এক লোকমা তুলে দিতে সে কি লজ্জা, কি লজ্জা।

লজ্জায় যেনো মরে যায়। তুযা হেসে ফেললো আনমনেই। নিজে হাসছে তা বোধগম্য হতেই হাসি থেমে গেলো। আহহহ জীবন, আজ সে বোধহয় অন্য কাওকে ওমন দরদ ভরে মুখে খাবার তুলে দেয়। সে যে এখন অন্য কারো ঘরণী। সে হয়তো তার কাছে অধিকার নিয়ে আবদার করে খাইয়ে দেওয়ার।

অতঃপর গোটা একটা রাত নির্ঘুম কাটানো চোখ জোড়া বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা নোনা জল। যা এই মানুষটা বড্ড অপছন্দ করে। কিন্তু যার কারণে এমন হয়, তাকে আজও অপছন্দ করতে পারলো না। পিঠ নামিয়ে দিলো ছাদের মেঝেতে। পা দুটো এখনো শূন্যে ঝুলছে। ইশশশ কেউ যদি দেখতো তুযার এই রুপ টা। আনমনেই পুরুষালী গলায় চমৎকার সুর তুলল

“তুমি আরেকবার আসিয়া, যাও মোরে কান্দাইয়া”
“তুমি আরেক বার আসিয়াআআআআ
যাও মোরে কান্দাইয়া”
“আমি মনের সুখে একবার কানতে চাইইইইই”

আজ তুযাকে লিখতে গিয়ে কেনো জানি নিজেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলাম 🙃 মনে হচ্ছিলো আমি চোখের সামনে সবটা দেখতেছি ছাদে বসে। এর আগে এমন হয়নি, এমন লাগেনি আমার। সত্যিই এমন কিছু মানুষ থাকে যারা খারাপ সেজে অনবরত ভালো ভেবে যায় মানুষের জন্য।

কেমন হয়েছে বলিও পাখিরা। গত পর্বে রিয়্যাক্ট খুবই কম 🙂 খারাপ লাগে এই বিষয় গুলা। রিয়্যাক্ট দিতে ভুলো না কিন্তু☺️🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply