খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩৬ এর প্রথমাংশ
কবিতার মুখে জাবেদার নাম শুনে লতিফা বুঝলো এটা জেবা। রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতেই বের হয়ে এলো। যদিও লতিফা এর আগে তুযা কে বলেছিলো জেবা কে যেনো বিয়ে করে। কিন্তু ছেলে যে এত সুন্দর কথা শুনবে, তা ভাবনায় ও ছিলো না লতিফার। ওয়াহাব এর এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তুযার কর্মকাণ্ডে নজর দেওয়া বাদ দিয়ে দিয়েছেন উনি।
লতিফা এগিয়ে গেলো সদর দরজার দিকে।
“হ্যা রে বাপ। তুই সত্যিই বিয়ে করছোস জেবা রে? অনেক ভালো করছোস। আয় আয় ভিতরে আয়”
মৃদু আলোতে লতিফা দেখলো পিছনে আরেকটা ছেলে দাড়িয়ে আছে গুটিশুটি মেরে। কিন্তু মুখটা ভালো চেনা যাচ্ছে না।
“ওটা কে রে তুযা? জেবার কোনো আত্মীয় বুঝি?”
তুযা গা ঝাড়তে ঝাড়তে ভিতরে ঢুকে বলল
“শুধু আত্মীয় না। পরম আত্মীয়। ওই ছিনালের সোয়ামী ওটা”
লতিফার মনের উৎফুল্ল ফাটা বেলুনের মতো ফোস করে বেরিয়ে গেলো।
“বলিস কি? জেবা কে তুই বিয়ে করিস নি?”
তুযা গায়ের শার্ট টা খুলে ফেললে। সোফায় বসে কবিতাকে ইশারা করলো এখানে আসতে।
“খাইয়া তো কাম নাই। ওই গাছ-ছিনাল রে আমি বিয়া করমু।”
ওয়াহাব ছেলের লাগাম হীন কথায় গলা খাকারি দিলো
“উহুম উহুম। এখানে তোমার বাবা আছে।”
“বাল ফেলাইতে রইছো ক্যা বইসা? যাও ঘরে যাও। হোনো মা, এই পাক্কা নচ্ছার ওই যে ওই মাদার”চোদ রে নিয়া পূবের জঙ্গলে ধরা খাইছে। গেরাম বাসি ধইরা হেই রহম পুন্দাইতো। পরে বিয়া করাই নিয়া আইছি। কাইল ও বউ নিয়া বাড়ি চইলা যাইবো”
কবিতা খুব খুশি হলো। এই জাবেদা কে সে কিছুতেই মা মানতে পারবে না। লতিফা বেগম ঝাঁঝিয়ে উঠলো জেবার ওপর
“ছিঃ মাইয়া। তোমারে ভালো ভাবছিলাম। তুমি কামডা ভালো করলা না মোটেও ছিঃ।”
জেবার মুখ অপমানে থমথমে হয়ে গেছে। এতক্ষণ তুযা এক নাগাড়ে মিথ্যা কথা বলে গেলো তার ব্যাপারে। কোথাও ধরা টরা পরে নি জেবা। সুস্থ হয়ে সাইফ অদিতির মধ্যে ঝামেলা লাগাতো। তাই জন্যে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।
জেবা কোনো ভাবেই রাজি ছিলো না এই অপরিচিত ছেলেটাকে বিয়ে করতে। মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বাধ্য কবুল বলিয়েছে। আর বাড়ি এসে মিথ্যা বলছে। বিয়ে না দিলে জেবার কি হাল সাইফ করতো তা ভেবেই তুযা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আগের বার যা শিক্ষা দিয়েছিলো, তাতেই তুযা বুঝে গেছে। সাইফ আসলে কি কি করতে পারে। লতিফা জোরে জোরে বলতে বলতে কিচেনে গেলো আবার
“আইজ রাইত টা থাক, সক্কাল বেহানা যেনো বিদেয় হয় এই আপদ”
তুযা জেবা কে জেবা কে ঘরে যেতে ইশারা দিলে। কারণ এখানে থাকলে লতিফা আরো চারটে কথা শুনিয়ে দেবে।
—
সকাল সকাল নদীকে বাড়িতে আনা হয়েছে। বাড়ির মহিলারা যে যার কাজ করছে। দীঘি বোনের কাছে বসে আছে। নদী কারো সাথে কোনো কথা বলে না। কেউ কিছু বললে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। অদিতি হাবিব চৌধুরীর ভয়ে নদীর কাছে যেতেও পারছে না।
শুধু সুযোগ খুঁজছে কখন হাবিব চৌধুরী বাড়ি থেকে বাইরে যাবে। সেই সুযোগে নদীর সাথে দেখা করবে। আঞ্জুমান এর মন ভাড়। অদিতি জিজ্ঞেস করতে সাহসও পাচ্ছে না। হাসান চৌধুরী কিচেনে এসে বলল
“সব যেনো ঠিক ঠাক হয়। তারা যেন কোন খুঁত ধরতে না পারে।”
অদিতি গোলগোল চোখ করে হাসান চৌধুরী কে বলল
“কারা বাবা?”
সায়রা বলল
“তোমার অত জেনে কাজ কি? সবকিছুতে নাক না গলালেই নয়?”
অদিতি বেশ বুঝতে পারছে, এবাড়ির কেউ তাকে কিছুই বলবে না। এবার সব ওর নিজেকেই খুঁজে বের করে নিতে হবে। কিন্তু তুমুলই কেন নদীর কোন খোঁজ নিতে আসছে না আর নদী বা কি করে সব ভুলে গেলো।
নিজের ঘরে পায়চারি করছে বারবার অদিতি। অসহ্য লাগছে তার এ সমস্ত কিছু। এবাড়ির মানুষজন এমন কেন? প্রথমে যখন সাইফ অদিতিকে বাড়িতে নিয়ে আসলো তখন এই সমস্যার মুখোমুখি অদিতিও হয়েছে। কিন্তু নেহাৎ সাইফের জিদের কাছে কেউ হার মানতে পারেনি।
কিন্তু নদীকে সহজ সরল পেয়ে সবাই ওর সাথে চিট করছে। অদিতির মাথাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যেন সব চিন্তা করতে করতে।
এমন সময় সাইফ এলো। হাতে একটা রঙিন প্যাকেট। আজ থেকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে প্যাকেটটা অদিতির সামনে রাখলো। কিন্তু অদিতির যে মন ভালো না। কোন কিছুতেই তার খুশি লাগছে না আজ। সাইফ বরাবরের মত অদিতির ঘাড়ে চুমু খেয়ে বলল।
“আমার বাচ্চা বিড়ালটার কি হলো? এমন মুখ বেজার করে আছে কেন?”
অদিতি মাথা নিচু করে অভিমানের স্বরে বলল
“কিছু না”
সাইফ শয়তানি করে বলল
“না বললে কিন্তু……”
অদিতির মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা। যেদিন অদিতি বলেনি বলে সাইফ জামা কাপড় খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে চেয়েছিলো। অদিতি মুখ বেঁকিয়ে বলল
“আজ খুলে ফেললেও বলবো না।”
সাইফ আদুরে গলায় বলল
“কেনোওওও?”
অদিতি মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়েই বলল
“বলে লাভ কি? আমার কোনো কথা কেউ কানে নেয় বুঝি?”
সাইফ আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে ধরলো তার স্ত্রী কে। চুলে মুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতে ব্যাস্ত
“বলেই দেখো না”
“আজ বাড়িতে কারা আসবে?”
সাইফ অদিতির ঘাড়ে মুখ গুঁজেই বলল
“নদীকে দেখতে পাত্রপক্ষ আসবে”
অদিতির মুখ আপনা আপনি হাঁ হয়ে গেল। একটা বিবাহিত মেয়েকে পাত্রপক্ষের সামনে বসানোর মত মন মানসিকতা এই বাড়ির লোকের কি করে হতে পারে? চট করে সাইফের দিকে ঘুরলো অদিতি।
“আপনারা জানেন না উনি বিবাহিত?”
সাহেব কিছু বলার আগেই অদিতি দূরে সরে গেল
“একদম ভুজং ভাজং বোঝানোর চেষ্টা করবেন না। আপনি না ওনার ভাই? আপনি নিজের ভালোবাসাটা বোঝেন বোনের টা কেন বোঝেন না? আপনার উচিত ছিল না নিজের বোনকে সমর্থন করা?”
সাইফ অদিতির দিকে একটু এগিয়ে আসে
“তুমি আগে শোনো তো আমার কথাটা”
“কিছু শুনবো না। আমি এক্ষুনি যাবো, আর নদী আপুকে গিয়ে সব বলে দিবো। যে আপনি বিবাহিত। আপনাকে এরা অবৈধ ভাবে বিয়ে দিচ্ছে অন্য জায়গায়। উনার না হয় কিছু মনে নেই কিন্তু আপনারা তো সবটা জানেন। একবার ও ভেবেছেন তুমুল ভাইয়া এসে যখন জানবে তার স্ত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে তাও আবার অন্য কারো সাথে, তখন তার কেমন লাগবে।”
অদিতি রুম থেকে বেরিয়ে যেতে লাগলো
“আমি আর এসব সহ্য করতে পারবো না। আমি এক্ষুনি গিয়ে সব বলে দিবো নদী আপুকে।”
সাইফ ও পেছন পেছন গেল অদিতি কে থামাতে
“অতিথি কথা শুনো। ছেলো মানসি করো না। শোনো আমার কথা”
অদিতি থামছে না
“কিচ্ছু শুনবো না আমি। নদী আপু কী করে সব ভুলে গেলো। আমি তাকে সব মনে করাবোই”
সাইফ গিয়ে অদিতির হাত ধরে ফেলল । অদিতি এক ঝটকা সাইফের হাত সরিয়ে দিল
“ধরবেন না আমায়। ছাড়ুন বলছি। আমি আর সহ্য করবোই না।”
সাইফ অদিতি কে থামাতে না পেরে বলেই ফেললো
“ও কিচ্ছু ভুলে যায়নি অদিতি। ওর সবই মনে আছে”
অদিতির পা থেমে গেলো। সাইফও থামলো সেখানেই। অদিতির হাত শক্ত করে ধরলো। টানতে টানতে নিয়ে এলো রুমে। অদিতি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। সাইফের সাথে চলেও যায়।
সাইফ টেনে অদিতি কে রুমে এনে দরজা বন্ধ করে দেয়।
“হাটে হাড়ি ভাঙবে নাকি? যেখানে সব প্ল্যান মাফিক হচ্ছে।”
অদিতি চোখ ছোট ছোট করে বলল
“আপনিও কথা লুকাচ্ছেন আমার থেকে? বাহহ দারুন দারুন।”
সাইফ কপাল কুচকে বলল
“তো কি করবো? তুমি বাচ্চা মানুষ। তোমাকে সব বলে দিই, তারপর তুমি সবাইকে…..”
“চুপ করুন বেয়াদব লোক। অসভ্য ব্যাটা ছেলে। নিজের স্ত্রীর কাছে কথা লুকান। আপনার মুখে কচু ঢুকিয়ে দেওয়া উচিত”
অদিতির নাকের পাটা লাল হয়ে উঠেছে রাগে। সাইফ অদিতির এমন অবস্থা দেখে মুচকি হাসলো।
আচমকা জড়িয়ে ধরল আদিতিকে
“শোনো বিড়াল টা, তোমার আমার উপর ভরসা আছে না বলো?”
অদিতি ওপর নিচ মাথা নাড়লো।
“তাহলে একদম চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্ত থাকো। আর বাড়ির লোক যেমনটা করছে তুমিও তেমনটাই করো। তুমুল আর নদী কে কেউ আলাদা করতে পারবে না। বুঝেছো তুমি?”
অদিতি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো সাইফের কাছ থেকে
“না বুঝিনি। আগে আমার সব প্রশ্নের উত্তর দিবেন, তারপর আমি শান্ত হবো।”
“আচ্ছা বলো”
“নদী আপু কি তাহলে সত্যিই কিছু ভুলে যায়নি?”
সাইফ দুদিকে মাথা নাড়ে।
“তাহলে এই নাটক করার মানে কি? বলুন না আমাকে”
সাইফ অদিতির হাত টেনে ধরে বিছানায় বসালো। নিজেও বসলো পাশে।
“এটা তোমাকে আগেই বলতে পারছিনা পাখি। তুমি শুধু আমার উপর ভরসা করে ছেড়ে দাও”
অদিতি চোখ মুখ কুচকে নিলো
“তাহলে বলুন তুমুল ভাইয়া এখন কোথায়?”
“হাসপাতালে”
“উনি কেমন আছে এখন আর আসবেই বা কবে?”
“খুব তাড়াতাড়ি আসবে ও। আপাতত আজ তুমি একদম চুপ থাকো। যা হচ্ছে শুধু দেখবে, কিছু বলবে না।”
অদিতি মাথা নিচু করে বলল
“আচ্ছা। তবে সব ঠিকঠাক হবে তো?”
“হ্যা। এখন আদর করো”
—–
সকাল সকাল লতিফা উঠে বাড়িতে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। তুযা বাড়িতে নেই । জেবা আর সেই ছেলেটিও নেই। ফজরের আযান পড়তেই তুযা, জেবা আর সেই ছেলেটাকে নিয়ে গেছে গ্রাম থেকে গাড়িতে তুলে দিতে। তাদের গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে মাত্র ফিরলো বাড়িতে
লতিফা তুযাকে বকাঝকা করছে। তুযা বাইকের চাবি হাতে ঘুরাতে ঘুরাতে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো।
মেহেরজান থাকলে হয়তো তার সাথে লেগে যেত একচোট। তুযা আকবরকে সোফায় বসা দেখলো। দাঁত কেলিয়ে হাসতে হাসতে গিয়ে আকবরের পাশে বসে বলল
“দিন দিন চেহারা এমন শুকনো ছাগলের মতো হচ্ছে কেন?”
আকবর কবিতার দিকে একবার তাকালো। বাচ্চাটার সামনে কি সব বলছে। তুযা সোফায় হেলান দিয়ে বলল
“কাইল জবরদস্ত একখান স্বপ্নে দেখছি আকবর”
আকবর হেসে বলল
“কি ছোট সাহেব?”
“দেখলাম তোমার ছোট বেলা। তুমি পুচকে ট্যাপা এক ঢ্যামনা। টকটকা আকাশি কালার একখান গামছা পিন্দাইছে তোমারে।”
আকবর শুকনো ঢোক গিলল
“থাক ছোট সাহেব, আর বলা লাগবো না”
“আরে শোনো আকবর। তোমারে মুসলমানি করাইতেছে দেখলাম। আযাম কে জানো?”
আকবর বলল
“আমার জানা লাগবো না ছোট সাহেব। থাক”
“আযাম আমি ছিলাম, তোমার পাখি ডা কাটতে যাইয়া…..”
লতিফার ধমকে তুযা চুপ করে গেলো। কবিতা ও হা করে ওদের কথা গিলছে। তুযা গায়ের শালটা মাথায় চড়িয়ে চলে গেলো নিজের ঘরে। যাওয়ার সময় আকবর কে একটা উড়ন্ত চুমু খেলো।
কবিতা তাই দেখে হেসে কুটি কুটি। সিড়ি দিয়ে ওঠার সময় তুযার কল আসলো
“হ্যা বল রে”
ওপাশ থেকল শোনা যায় সাইফের গম্ভীর গলা
“দাদাভাই আজ নদী কে দেখতে আসবে”
তুযা ওখানেই দাড়িয়ে পরলো
“আগে বলতে পারিস নি খাটাশ কোথাকার। এাকন কি আমি যেয়ে পাবো ওদের?”
“তোমার আসতে হবে না। আমি আছি তো”
“দেখিস গড়বড় যেনো না হয়”
কিছু কথা বলি। গত পর্বে আপনাদের রেসপন্স দেখে আমি সত্যিই খুব হতাশ 🙂 আচ্ছা আমি কি একবারও বলেছি? যে আমি ফেসবুকে গল্প দিবো না। আপনারা বিগত পর্ব গুলো যেমন পেয়েছেন। আগামী সকল পর্বও সেভাবেই পাবেন। তাই (আমি বই এনেছি আর গল্প দিবো না। মূল উদ্দেশ্য বই আনা ছিলো, আর লিখার দরকার কি) এ সকল মন্তব্য আমাকে সত্যিই কষ্ট দেয় 🙂। আমি এমনটা কখনোই করবো না এটুকু নিশ্চিত থাকেন 🫶 কেমন হলো বলবেন 😊
খাঁচায়বন্দীফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
৩৬ এর শেষাংশ
বসার ঘর টা কে সুন্দর করে গোছগাছ করেছে অদিতি আর চামেলি মিলে। রান্নার কাজ সায়রা আর আঞ্জুমান ই দেখছে। পাত্রপক্ষ দুপুর নাগাদ আসবে বলেছে। বেলা প্রায় ১২ টার কাছাকাছি। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পরবেন তারা।
নদীকে রেডি করছে দীঘি। নদী আগের মতোই চুপচাপ বসে আছে। এ নিয়ে অবশ্য সায়রা আর হাবিব বেশ চিন্তিত। তারা কি না কি জিজ্ঞেস করে বসবে মেয়েটাকে। নদী আবার ভুলভাল কিছু বলে না দেয়।
অদিতি উশখুশ করছে। সাইফ তাকে ক্লিয়ার করে কিচ্ছুটি বলল না। সাইফের দিকে তাকিয়ে দেখলো, বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে সোফায় বসে কফি খাচ্ছে। অদিতি মনে মনে বকলোও খানিকক্ষণ। হাসান চৌধুরী জানালো পাত্রপক্ষ এসে গেছে।
অদিতির কপালের ভাজ আরো গাঢ় হলো। সাইফ হাসি মুখেই তাদের ওয়েলকাম করলো, টুকটাক কথাও সেড়ে নিলো। পাত্রের সাথে তার মা-বাবা আর বোন এসেছে। চারজনে বসলো। পাত্রের নাম শাওন। হাবিব চৌধুরী হাস্যোজ্জল মুখে বলল
“বাবা শাওন, তোমাদের আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?”
শাওন কে বেশ ভদ্রই মনে হচ্ছে। স্মিত হেসে বলল
“না না আঙ্কেল। আমরা ঠিক আছি। কোনো সমস্যা হয় নি”
শাওন এর মা বললেন
“বেয়াই সাহেব, আমাদের বউ মা কে নিয়ে আসুন”
দীঘি ভেংচি কেটে বিরবির করে বলল
“বিয়ের খবর নেই, বউ মা। হুহহহ”
হাসান চৌধুরী হেসে বললেন
“হ্যা আনছি। বউ মা,দীঘি যাও নদী কে নিয়ে এসো”
অদিতি ছোট করে বলল
“আনছি বাবা।”
দীঘিও গেলো অদিতির সাথে। নদী রুমেই বসে ছিলো। অদিতি আর দীঘি নদী কে নিয়ে ড্রইং রুমে আসে। নদীকে বসিয়ে অদিতি আর দীঘি সোফার পিছনেই দাড়িয়ে থাকে।
দীঘি অদিতির কানে ফিসফিস করে বলল
“ভাবি। ছেলের মা মহিলাটা কেমন যেনো চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখছে। মনে হয় এসব জীবনে দেখেনি”
অদিতি ঠোট টিপে হাসলো। দীঘিকে কনুই দিয়ে মৃদু গুতা দিয়ে বলল চুপ থাকতে। সায়রা আর আঞ্জুমান তাদের খাবার পরিবেশ করলো।
“আরে আরে এত কিছু লাগবে না তো। আমরা শুধু চা ছাড়া কিছুই খাবো না”
শাওনের মায়ের কথা শুনে সায়রা বলল
“আমি এক্ষুনি বানিয়ে আনছি।”
দীঘির মাথায় শয়তানি বুদ্ধি এলো
“আরে দাড়াও মা। তুমি বসো, কথা বলো। আমি আনছি চা”
সায়রা হেসে বসলো। শাওনের মা দীঘির প্রসংশা করতে ব্যাস্ত
“আরে বাহহহ বেয়ান, আপনার ছোট মেয়েও তো দেখছি খুব গুণী”
নদীর দিকে তাকিয়ে বলল
“তুমি কোন ক্লাসে পড়ছো মা?”
নদী কোনো কথা বলে না। মহিলাটা সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল
“ও কথা বলছে না কেন?”
“আসতে পারিইই?”
তুমুলের গলা পেয়ে সবাই দরজার দিকে তাকালো। তুমুল এক গাল হেসে দাড়িয়ে আছে। অদিতির চোখ তো ছানাবড়া। হাবিব চৌধুরীর রাগ তালুতে চড়ে গেলো। হাসান চৌধুরী সহ বাড়ির প্রত্যেকে অবাক। তুমুল আর কোনো কথার অপেক্ষা না করে গিয়ে সোফায় বসলো। পাত্রপক্ষের সামনে হাবিব চৌধুরী বেশ অস্বস্তিতে পড়লো।
চাওনের বাবা জিজ্ঞেস করলো
“ও কে?”
সাইফ তুমুলের কাধে হাত রেখে বলল
“আমার বন্ধু”
পাত্রের মা বলল
“তা বাবা তোমার মাথায় ব্যান্ডেজ করা কেনো?”
তুমুল মাথা নিচু করে লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বলে
“আসলে আমি সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বস্তিতে চাল, ডাল বিতরণ করি। তো সেখানে, বস্তির মহিলারা চাল ডাল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিলো। আমি পরে গেছিলাম মাঝখানে। একজন আরেকজন কে প্রথমে গামলা, বাটি দিয়ে মারছিলো। তারপর হাতা, খুন্তি, কড়াই সব….। এক পর্যায়ে…”
নিজের মাথা ইশারা করে দেখালো তুমুল।
পাত্রপক্ষের সবাই সহানুভূতি দেখালো। শাওনের মা করুনার স্বরে বলল
“আহারে বাবা। তবুও তুমি কত ভালো কাজ করছো। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক বাবা”
নদী পারছে না সবার সামনে হেসে ফেলতে। অদিতি আচল দিয়ে মুখ ঢেকে হাসছে। হাবিব চৌধুরী রাগে কিড়মিড় করছে। বাড়িতে লোকজন থাকায় কিচ্ছু বলতে পারছে না তুমুল কে।
শাওনের বাবা হাসান চৌধুরী কে বললেন
“বেয়াই সাহেব, মেয়ে আমাদের পছন্দ। এখন ছেলে মেয়ে দুজন দুজনকে পছন্দ করলেই ব্যাস।”
তুমুল চারিদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সব দেখছে। সকলে একটু অবাক হচ্ছে তুমুলের এমন ব্যাবহারে। অদিতির সাথে চোখাচোখি হতেই তুমুল বোকা বোকা হাসলো
“হে হে ভাবি ভালো আছেন?”
হাসান চৌধুরী বিরক্তি নিয়ে বলল
“আচ্ছা আমরা বিয়ের কথায় আসি”
“হ্যা কিন্তু, ছেলে মেয়ে তো এখনো একে অপরের সাথে কথা বললো না। জানালোও না তাদের পছন্দ। সংসার তো ওরা করবে তাই না ভাই সাহেব?”
বাবার কথাও শাওন ও সায় দিলো
“হ্যা আঙ্কেল। আমার মনে হয় ওনার, মানে নদীর সাথে আমার একটু আলাদা কথা বলা উচিৎ”
তুমুল দাঁতে দাঁত পিষে কিড়মিড় করে মনে মনে বলল
“শালা আমার বউয়ের সাথে আলাদা কথা বলবে তুমি? বলাচ্ছি তোমাকে আলাদা কথা। এই শালিটা এখনো আসছে না কেনো?”
ইতিমধ্যেই দীঘি চা নিয়ে এলো। তুমুল হাত বাড়িয়ে একটা কাপ আগে নিয়ে শাওনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল
“এই নাও ছোট ভাই। আগে চা খাবে, তারপর সব কথা”
শাওন সৌজন্যে মূলক হেসে বলল
“থ্যাংকস বাট আমি চা খাই না।”
বলেই উঠতে নিলে তুমুল ফের বলল
“আচ্ছা তাহলে তোমার চা টা আমিই খেয়ে নিচ্ছি। ছোট বোন, তুমি ছোট ভাই এর জন্য একটু কনডেন্স মিল্ক গুলে ফিডারে ভরে নিয়ে এসো যাও”
অদিতি আর দীঘি ফিক করে হেসে ফেলল। শাওন বেশ লজ্জা পেলো তুমুলের কথায়। হাবিব চৌধুরী নদীকে বলল
“নদী, ওকে নিয়ে ছাদে যাও”
নদী আড় চোখে একবার তুমুলের দিকে তাকালো। তুমুল চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করলো। নদী উঠে গুটি গুটি পায়ে হেটে গেলো ছাদের দিকে। পিছ পিছ শাওন ও গেলো। ওরা যেতেই তুমুল পেট চেপে ধরে চিৎকার করলো
“আআআআআআ”
এরুপ চিৎকারে হচকচিয়ে উঠলো সবাই। শাওনের মা বলল
“একি। কি হলো তোমার?”
তুমুল চোখ মুখ কুচকে বলল
“আর বলবেন না। পেটটা খুব মোচড় দিলো”
হাবিব চৌধুরী বহু কষ্টে নিজের রাগ সংবরণ করলো। সাইফ কে বলল
“ওকে ওয়াশরুম টা দেখিয়ে দাও”
“না না আঙ্কেল। ওয়াশরুম লাগবে না। একটু হাওয়া খেলেই আমার পেট ক্লিয়ার হয়ে যায়”
অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল
“ভাবি আপনাদের ছাদ টা কোন দিকে?”
তুমুলের কথায় সবাই হা করে তাকিয়ে রইলো। শাওনের বাবা শাওনের মায়ের কানে কানে বলল
“এ ছেলের মাথায় নির্ঘাত সমস্যা আছে। নইলে কে জিজ্ঞেস করে ছাদ কোন দিকে। ছাদ তো ওপরেই থাকে”
শাওনের মা বিরক্ত হয়ে বলল
“তুমি চুপ করো তো। ছেলেটা কিন্তু বেশ সহজ-সরল। দেখো না আমাদের রুমকির বিয়েটা দিয়ে দেওয়া যায় কিনা”
শাওনের বাবা গলা খাকারি দিয়ে বলল
“ইয়ে বাবা। তুমি কি বিয়ে করেছো?”
“আগে পেট টা ক্লিয়ার করে আসি আঙ্কেল”
বলেই আর দেরি করলো না তুমুল। এক দৌড়ে ছাদে চলে গেলো। হাবিব চৌধুরী সায়রার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকাতেই সায়রা দীঘি কে দাত কিড়মিড় করে বলল
“দাড়িয়ে দেখছিস কি? যা গিয়ে দেখ ছেলেটা কোনো গড়বড় না করে”
মায়ের কথা মতো দীঘিও গেলো ছাদে। নদী এক পাশে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাওন একা একা বকবক করেই চলেছে। এতক্ষণে ওর কলেজের সব বান্ধবী গার্লফ্রেন্ড সবার কথা বলা শেষ। কিন্তু নদী একটা কথাও বলছে না। এর মধ্যে তুমুল এসে হাজির।
শাওন বিরক্ত হয়ে বলল
“আমরা পারসোনাল কথা বলতে এসেছি। আপনি এখানে কি করছেন?”
“এটাই বলতে এসেছি যে আপনার শার্টে কাকে ইয়ে করে দিয়েছে”
তুমুল চোখ ইশারা করতেই শাওন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো কাধে সাদা কিছু একটা লেগেছে। নাক মুখ কুচকে বলল
“ওয়াশ রুম কোথায়ায়ায়?”
দীঘি এগিয়ে এসে বলল
“আসুন আমি নিয়ে যাচ্ছি”
শাওন কে দীঘি নিয়ে যেতেই নদী বলল
“এখানে কাক কোথ থেকে আসলো?”
তুমুল দেখলো নদী গোলগাল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মুগ্ধতায় ছেয়ে গেলো তুমুলের চোখজোড়া। আজ কেমন বউ বউ লাগছে নদী কে। কিন্তু সেই মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। নদী অন্যকারো জন্য সেজেছে ভেবেই তুমুলের মুখটা বিষন্ন হয়ে উঠলো। যদিও সাজেনি নদী৷ শুধু সুন্দর একটা জামা পড়ে মাথায় ওড়না দিয়েছে। তাতেই তাকে এত সুন্দর লাগছে তুমুলের চোখে। সায়রা অনেক করে বলেছিলো শাড়ি পরতে। কিন্তু নদীর কোনো হেলদোল নেই। আরো মিইয়ে পরেছিলো নদী ইচ্ছে করে।
কারণ প্রথম শাড়িটা সে তুমুলের জন্যই পরতে চায়। তুমুলের চাহনি দেখে বলল
“ওভাবে কি দেখছেন?”
তুমুল ভ্রু গুটিয়ে নিলো।
“আরেকটু কাছে এসো”
নদী অল্প এগিয়ে আসলো তুমুলের দিকে। তুমুল এখনো সেভাবেই তাকিয়ে আছে। নদী এতদিন পর প্রিয় পুরুষ টা কে দেখে নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পরছে। তুমুল নদীর থুতনি ধরে মুখ উচু করে বলল
“সুন্দর করে সেজে গুজে তুমি অন্য কারো সামনে বসেছো। আমার হৃদয় যে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে প্রিয়তমা। এ তোমার কেমন বিচার?”
নদী আলগোছে জায়গা করে নিলো তুমুলের বুকে। তুমুল ধরলো না আজ। কারণ ধরলে আজ আর ছাড়তে মন চাইবে না বুক থেকে। সময় যে খুব অল্প। তুমুল নদীকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল
“আর কয়েকটা দিন, তারপর……
আর কথা বলার সুযোগ পেলো না। দীঘি আর শাওন চলে এলো। সবাই নিচে গেলো। সবাই মিষ্টি মুখ করছে। তুমুল চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল
“বাহহ দিন তারিখ ঠিক করা হয়েও গেলো এর মধ্যে?”
সামনের মাসের ২ তারিখে বিয়ের দিন ঠিক করা হলো। মোটামুটি ১৭ দিন বাকি বিয়ের। তুমুল পাত্রপক্ষের সাথেই বেড়িয়ে গেলো। সাথে গেলো সাইফও।
–
সেই দুপুর গড়াতে গেলো সাইফ। ফিরলো রাতে। সবাই ঘুমিয়ে গেছে বাড়ির। তুমুলের আসা নিয়ে একটু গোলযোগ ও হয়েছিলো ওরা যাওয়ার পর। অদিতি ব্যালকনি তে বসে আছে সাইফের অপেক্ষায়। আকাশের অবস্থা ভালো না। যে কোনো সময় বৃষ্টি নামবে।
সাইফ বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে নিলো। এরই মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়েও গেছে। এক কাপ কফি আর অদিতিকে নিয়ে ব্যালকনির সোফায় বসলো গিয়ে। তার শখ হয়েছে স্ত্রী কে নিয়ে বৃষ্টি বিলাশ করবার। বেচারা বউ টাও ছোট মানুষ। ঘার ত্যাড়ামিতে পেরে ওঠে না স্বামীর সাথে।
বৃষ্টি নামায় বেশ ঠান্ডাও পড়েছে। সাইফ কম্ফর্টার দিয়ে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিলো অদিতিকে। অদিতিও কম্ফর্টার আর স্বামীর বুকের উষ্ণতায় গুটিয়ে রইলো বিড়ালের মতন। সাইফ কফির কাপে চুমুক দিচ্ছে, তো একবার অদিতি কে চুমু খাচ্ছে।
“আচ্ছা বউ, একটা কথা বলো তো”
“আগে চুমু খাওয়া বন্ধ করুন, আমার সারা মুখে কফির ঘ্রাণ হয়ে যাচ্ছে তো”
সাইফ আরো গাঢ় করে চুমু খেলো অদিতির গালে। অদিতি মনে মনে ভাবলো পাগল কে নৌকা ডুবানোর কথা মনে করিয়েছে।
“বলুন”
“নদী প্রেমের পূর্ণতা দিতে আপনি এত মড়িয়া কেনো ম্যাডাম?”
অদিতির কুঞ্চিত ভ্রু যুগল প্রশস্ত হলো। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“পূর্ণতা তো দিতেই হবে, তার প্রথম ভালোবাসা কে যে আমি কেড়ে নিয়েছি”
চলবে?
সাইফ আর তার বাচ্চা বিড়াল কে ঘরে তুলছেন তো? 🥹🫶
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০