Golpo কষ্টের গল্প খাঁচায় বন্দী ফুল

খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১


কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠

খাঁচায় বন্দী ফুল

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৩১

রাত ১১ টা। কম্বল গায়ে জড়িয়ে গুটিশুটি মেরে সোফায় বসে আছে কবিতা। আজ কতগুলো দিন হয় তুযার সাক্ষাৎ পায় না। তাই আজ এঁটে বসেছে বসার ঘরে। তুযা আসবে, তবেই আজ ঘুমাবে। তুযা এলো আরও আধা ঘন্টা পরে। কবিতার চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। তুযা ভিতরে ঢুকতেই স্বভাব সুলভ চেঁচাতে শুরু করলো।
“ রহৃানের মা। ও রহমানের মা। ভাত কই আমার?”

তুযা ফের ডাকতে যাবে ওমনি মনে পড়লো, রহমানের মা তো আর নেই। তুযার বুকের ভিতর আচমকা কেমন মোচর দিলো। আজ একদম ই মনে ছিলো না যে মেহেরজান আর বেঁচে নেই। পরশু সকালেও এমন টা হয়েছে। পানের খিলির জন্য মেহেরজানের ঘরে ঢুকে গেছিলো। যাওয়ার পরে মনে পরেছে। পান বানানোর মানুষ টা আর নেই। পুরুষালী কঠোর চোখ জোড়া কেমন ভিজে ভিজে অনুভূত হয় তুযার।

আলগোছে তা মুছে এগিয়ে যায় কবিতার দিকে।
“ আম্মা! এত রাইতে তুমি এইহানে করো কী?”

কবিতা মলিন মুখে তাকিয়ে আছে তুযার দিকে
“তোমার বড় মা রে মনে পরতাছে না আব্বা?”

তুযা কবিতাকে দুঃখ দিতে চায় না। প্রসঙ্গ পাল্টালো
“এত রাইতে না ঘুমিয়ে বইসা রইছস ক্যান তাই ক। অসুখ করবো পরে”

“তোমার লগে দেখা করবার জন্যে”

“ আয় খাবি”

“আমি খাইছি। তুমি খাও”

তুযা খাচ্ছে। কবিতা গোল গোল চোখ করে দেখছে ওর খাওয়া। আচমকা বলল
“আইচ্ছা আব্বা, তুমি কখনো সিনেমা দেখছো?”

তুযা খাবার মুখে নিয়েই বলল
“সিনেমা ভালো না আম্মা”

“কেরে ভালো না? তুমি তার মানে দেখছো। না দেখলে বুঝলা ক্যামনে, যে ভালো না”

তুযা মুখ ভর্তি ভাত নিয়ে কবিতাকে বলল
“একবার এক জলসার আয়োজন করছিলাম গেরামে। ওই খানে সিনেমা দেখছি একটা। প্রথম সিনেমা দেইখাই রুচি শ্যাষ।”

কবিতা কৌতূহল নিয়ে বলল
“কেন কী হয় সিনেমা তে?”

তুযা হাত ধুতে ধুতে বলল
“সাবানা জসিম রে ঘুম থেকে ডাইকা তুইলা বলতেছে, এই ন্যান আপনার ঘুমের ওষুধ টা খাইয়া নেন”

কবিতা কি বুঝলো কে জানে। খিল খিল করে হেসে উঠলো। পরক্ষনেই হাসি থামিয়ে বলল
“আব্বা সাবানা কে?”

“ও তুমি চিনবা না মা। ওগোরে কয় নায়িকা। যাও ঘুমাইতে যাও”

কবিতা উঠে না। তুযা কবিতার কাছে এগিয়ে যায়
“উঠস না ক্যান। চল তোরে মার ঘরে দি আই।”

“তোমারে তো আব্বা ডাকি, আমি আম্মা ডাকমু কারে?”

কবিতার কথায় অসহায়ত্ব ফুটে উঠলো। তুযা শান্ত চোখো তাকায় কবিতার দিকে। কবিতার কৌতূহলি চোখ জোড়া এখনো অপেক্ষায় তুযার জবাবের।
“তুই কারে মা ডাকবার চাস কবিতা?”

কবিতা অবুঝের মতো তাকিয়ে থাকে। তুযা বেশ বুঝেছে, কথাটা কবিতার হলেও শেখানো লতিফা বেগমের। ছোট্ট কবিতার মাথায় উনিই ঢুকিয়েছেন এসব। তুযা বসলো সোফায়
“সবার আম্মা থাকে না রে মা। এই যে দেখ তোর বড় মায় মইরা গেলো। এহন আব্বায় কাওরে মা কইতে পারবো আর?”

কবিতা দুদিকে মাথা নাড়ায়। তুযা কবিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
“হোন আম্মা, তোর আমি আছি – আর আমার তুই। আমগো আর কাওরে লাগবো না হুমম?”

কবিতা ঘাড় কাত করে সম্মতি জানায়। তুযা ফের বলে
“আমরা বাপ বেটি তে মিলা ঠিইইইইক থাকতে পারমু। তুই ম্যালা পড়বি। লাগলে তরে পড়তে বিদ্যাশ পাঠামু। তুই ম্যালা বড় হবি। আমার তাতেই চলবো। তর চলবো না?”

কবিতা আবারও ঘাড় কাত করে। তুযা আস্তে করে বলে
“কথা ডা দাদু শিখাই দিছিলো না?”

কবিতা দাত দিয়ে জিভ কেটে কানে ধরলো। তুযা খিলখিল করে হেসে দেয়। কবিতাও হাসে
“তয় তুমি এত রাইত কইরা বাড়ি ফিরো ক্যান?”

“কাইল থিকা জলদি জলদি ফিরমু”

—-

বেলা ৯ টা। ঢাকার কোলাহল পূর্ণ রাস্তায় যে যার মতো ছুটছে। কলেজের মাঠে থ হয়ে বসে আছে তিনটি মুখ। রোহান, মুশফিক আর পরের জন আফিয়া। অদিতি বিবাহিত? কই বলল না তো প্রথম দিন। রোহান বলছে ওর স্বামী কল ধরেছিলো। কিন্তু মুশফিক বলছে কেউ কল ধরে বললেই বিশ্বাস করতে হবে? আফিয়া বলেছে অদিতি ওকে কল করে বলেছিলো কাওকে নম্বর দিয়েছে কিনা?

কোনো কিচ্ছু মিলাতে পারছে না তিনজন। সাইফের গাড়ি এসে কলেজের গেটে থামলো। অদিতির সাথে সাথে নামলো সাইফও। আজ তাকে আরো বেশি সুদর্শন লাগছে যেন। সানগ্লাস টা খুলে গাড়িতেই রাখলো। অদিতির ফর্সা হাতটা নিজের মুঠোয় চেপে ধরে হাটা দিলো কলেজের ভিতরে।

আফিয়া রোহান আর মুশফিক তিনজনেই উঠে দাঁড়িয়েছে। সাইফ অদিতির হাত ধরে টেনে এনে ওদের তিনজনের সামনে দাড়ালো। অদিতির ভিতর টা শুকিয়ে যাচ্ছে ভয়ে। না জানি কি করতে চলেছে সাইফ। অদিতির দিকে একবার তাকিয়ে, ওদের দিকে তাকালো। ভাড়ি গলায় বলল
“কাল কে কল করেছিলো ওকে?”

আফিয়া একবার অদিতির দিকে তাকালো আরেকবার রোহানের দিকে। কারও উত্তর না পেয়ে ধমকে উঠলো সাইফ
“ কথা বলছো না কেন? কে কল করেছিলো?”

তিনজনই ছিটকে উঠলো ভয়ে। মুশফিক তড়িঘড়ি করে বলল
“আমি এর মধ্যে নেই বিশ্বাস করুন। যা করার ওরা দু’জন করেছে”

সাইফ তীক্ষ্ণ চোখে রোহানের দিকে তাকালো
“এটা আমার স্ত্রীর ব্যাপারে মিথ্যা বলার জন্য”

বলেই এক ঘুষি মারলো রোহানের নাক বরাবর। আফিয়া চিৎকার করে উঠলো। মুশফিল লাগালো এক দৌড়। রোহানের নাকের কার্নিশ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে লাগলো। ফের টেনে তুললো রোহানকে
“এটা আমার স্ত্রীকে রাত-বিরেতে কল দিয়ে ডিস্টার্ব করার জন্য”

লাগালো আরেক ঘুষি পেট বরাবর। এবার সাইফ আফিয়ার দিকে তাকালো। আফিয়া ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেল
“ওকে নাম্বারটা তুমি দিয়েছিলে তাই না?”

আভি আ পিছাতে পিছাতে আমতা আমতা করে বলল
“ভা…ভাইয়া…ভাইয়া আমরা সত্যিই জানতাম না অদিতি বিবাহিত। নইলে এমনটা জীবনেও করতাম না। আমি অন্তত করতাম না”

সাইফ কড়া চোখে এবার অদিতির দিকে তাকালো। অদিতি শুকনো ঢোক গিলল।
“তোমার হিসেব টা পরে করছি।”

সাইফ আফিয়াকে কড়া গলায় বলল
“পরবর্তী তে যদি এমন কিছু শুনেছি_
মাইন্ড ইট”

সাইফ অদিতির হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো আবার। গাড়ির ডোর ওপেন করে ছুড়ে মারলো এক প্রকার। নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি খুব স্পিডে চালিয়ে বাড়িতে আসলো। অদিতিকে এভাবে টেনে নিয়ে যেতে দেখে সায়রা, আঞ্জুমান দুজনেই এগিয়ে গেলো
“ কি করছিস সাইফ। বউ মা কে কেন এভাবে….”

আঞ্জুমান এর কথা শেষ হওয়ার আগেই সাইফ বলল
“এই ব্যাপারে একটা কথাও বলবে না মা। ওর সাথে যা বলার আমি বলবো”

অদিতিকে রুমের ভিতর টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো ভিতর থেকে। অদিতি ফ্লোরে গিয়ে পরলো সাইফের ধাক্কার দরুন।
সাইফ অদিতির ঘাড়ের পিছনে ধরে টেনে তুলল। গাল দুটো নিজের শক্ত হাতে চেপে ধরে মুখের কাছে এনে হিসহিসিয়ে বলল
“নিজেকে বিবাহিত পরিচয় দিতে ভালো লাগে না বুঝি? লাগবে কেন? এই যে সৌন্দর্য, এগুলোর দিকে মানুষ নজর দিবে না তো বিবাহিত হলে”

অদিতির গাল দুটো তে আঙুলের দাগ বসে যাচ্ছে। কাদতে কাদতে বলল
“এরকম কিছুই না বিশ্বাস করুন। কলেজে গেলাম ই তো দুইদিন”

সাইফ এবার অদিতির গলা টিপে ধরলো
“পরশু রাতে কি বোঝালাম তোকে? কোনো বন্ধু-বান্ধব বানানোর দরকার নেই। বলেছিলাম কি না?”

অদিতি ওপর নিচ মাথা নাড়লো। সাইফ আবার দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“এটা তোর গ্রাম নয়। এটা শহর। ঢাকা শহর। এখানে অঘটন ঘটতে দুই দিন কেন? দুই মিনিটও সময় লাগে না। তুই প্রথম দিন কেন বলিস নি তুই বিবাহিত। তোর যে স্বামী আছে”

“ওদের সাথে তেমন কথা বলি না আমি। জিজ্ঞেস করলে কিছু বলি। নয়তো…..

“চুপ”

সাইফের হুংকারে কেপে উঠে অদিতির ছোট্ট শরীর। ওর রক্তচক্ষুর দিকে তাকানোরও সাহস হচ্ছে না অদিতির। সাইফ পিছন থেকে অদিতির চুল মুঠো করে ধরলো। অদিতি ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো। সাইফ নিজের রাগ সংবরণ করতে পারছে না কোনো ভাবে। গায়ের ওড়না টা হাতে পেচিয়ে ছুড়ে মারলো ফ্লোরে।

অদিতিকে আরো নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে বলল
“তুই থাকতে চাস আমার সাথে আজীবন?”

অদিতি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
“তাহলে আমি যা বলবো তাই শুনবি সব সময়। যেমন বলবো তেমন চলবি। পারবি?”

অদিতি তাতেও সম্মতি দেয়
“গুড। আপাতত আমার রাগ কমাতে সাহায্য কর। খুশি করে দে আমায়”

সেই যে গেলো সাইফ অদিতি কে নিয়ে রুমে। এখনো বের হয় নি। আঞ্জুমান খালি পায়চারি করছে টেনশনে। এই ছেলের যা জিদ। না জানি কত মারছে মেয়েটাকে।

হাবিব বাকা হেসে আঞ্জুমান কে বলল
“আমি জানতাম একদিন এমনই হবে ভাবি। ভালো লাগা কয়দিন থাকে বলুন তো। এ মেয়ে কে নিয়ে সাইফ জীবনেও সংসার করবে না।”

“কে বলেছে তোমায় কাকা?”

সাইফের গলা পেয়ে সবাই সিড়ির দিকে তাকালো। সাইফ সিড়ি দিয়ে নিচে আসতেই আঞ্জুমান ধরলো ওকে
“কোথায় অদিতি? কেন মেরেছিস তুই ওকে?”

সাইফ মায়ের কাধে হাত দিয়ে কিচেনের দিকে নিয়ে গেলো
“চলো কফি বানিয়ে দেবে”

নদী তুমুলের দেওয়া গাউন টা পরেছে। সায়রা কেও রাজি করিয়ে নিয়েছে, সিমির সাথে শপিং এ যাবে বলে। আয়নায় নিজেকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে নদী। নিজের কাছেই নিজেকে ভালো লাগছে তার। তুমুল না জানি আজ কত প্রসংশা করবে তার প্রিয়তমার। এ কথা ভেবেই নদী আরো লজ্জায় লাল হয়ে উঠছে বারংবার।অনেকক্ষণ বসে আছে। কল আসছে না তুমুলের।

নদী কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করলো। ভাবলো নিজেই কল করবে। এর মধ্যেই কল আসলো নদীর ফোনে। তবে সেটা তুমুলের নয়। অন্য কারো নম্বর। নদী ফোনটা ধরলে ওপাশ থেকে শোনা যায় তুহিনের আতঙ্কিত কন্ঠ
“ভা….ভাবি। ভাবি ভাইয়া অ্যাক্সিডেন্ট করেছে”

নদীর কানে বজ্রপাতের মতো শোনালো কথা খানা। তুমুল অ্যাক্সিডেন্ট করেছে মানে?
“ কি বলছো? কোথায় উনি?”

“হাসপাতালে ভাবি। অবস্থা ভালো না ভাইয়ার। আপনি তারাতাড়ি আসুন”

চলবে?
আগের পর্বে একদম রেসপন্স নেই 🙂
আমার পাঠিকারা কি আমাকে সাপোর্ট করছে না নাকি 😑

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply