কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ⚠️
খাঁচায় বন্দী ফুল
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব- ২৪
অদিতি যখন ল্যাভেন্ডা রঙের শাড়ি পরে ঝলমলে চুল গুলো গামছা দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে সিড়ি দিয়ে নামছিলো, জেবার মুখ তখন শৈল মাছের মতো হা হয়ে যায়। ওর ব্যাগে থাকা ৩ টা শাড়ির একটা জেবা নিয়ে নিয়েছে। আর বাকি দুটোও কেটে রেখে এসেছিলো। আর নিচে এসে তো সিড়ির কাছেই বসে আছে জেবা। কেউ ওপরে গেলে তো দেখতে পেতো। কেউ তো যায় নি।
তার মানে অদিতি মিথ্যা বলেছিলো। ওর কাছে আরো একটা শাড়ি ছিলো। বড় লম্বা চুল গুলো অদিতি মুছতে মুছতে লতিফার পাশে গিয়ে বসলো। লতিফা অদিতির থুতনি হাত দিয়ে স্পর্শ করে নিজের হাতে চুমু খেলো। বড্ড স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে অদিতিকে। লতিফা অদিতির হাত ধরে বলল
“মা তোমাকে দেখলে যে কি খুশি হতো। খালি তোমাকে দেখতে চাইতো। তোমার বড় আব্বু এসে যখন তোমার প্রশংসা করছিলো। মা তো মরিয়া হয়ে উঠেছিলো তোমায় দেখবে বলে”
অদিতি মনোযোগ দিয়ে শুনছে লতিফার কথা গুলো। লতিফা একটা ছোট্ট গোল বক্স অদিতির হাতে দিলো। অদিতি সেটা হাতে নিয়ে বলল
“ এটাতে কি বড় মা?”
“মা তার নাত-বউ এর জন্য বানিয়েছিলো আমাদের গ্রামের সবচেয়ে দক্ষ সোনার কাটিগর দিয়ে।”
অদিতি সেটা খুলে দেখলো তাতে এক জোড়া চওড়া নুপুর আর মোটা এক জোড়া হাতের বালা।
লতিফা বলল
“ পরো তো দেখি, কেমন লাগে তোমাকে”
অদিতি নুপুর জোড়া পায়ে দিলো। হাতে বালা জোড়াও পরলো। একদম গিন্নী লাগছে তাকে। লতিফা অদিতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল
“মাশাল্লাহ। কারো নজর না লাগুক”
জেবা অদিতিকে প্রশংসা করতে দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। ঢং করতে করতে নিজেও এগিয়ে গেলো লতিফার পাশে। সোফায় বসে বলল
“ আন্টি আমায় কেমন লাগছে?”
লতিফা জেবার দিকে তাকিয়ে বলল
“ এই তো, আজ ভালো লাগছে। এমনি তে তো কিসব প্যান্ট – শার্ট পরে ব্যাটা ছেলে সেজে থাকো। দেখো তো শাড়ি পরে কতো ভাল্লাগছে।”
জেবা মনে মনে লতিফা কে কতগুলো গালি দিলো। লতিফা উঠে গেলো গোসল করবে বলে। জেবা অদিতিকে বলল
“ তুমি আমাকে মিথ্যা কেন বললে?”
“ আমি আবার আপনাকে কখন মিথ্যা বললাম?”
“ কেন তুমি না বললে যে এই তিনটে শাড়িই এনেছো। এখন এই শাড়িটা কোথায় পেলে?”
কবিতা হাতে এত্তগুলা সিঙারা, চপ আর চকলেট হাতে করে ফিরলো। চিকন কন্ঠে বলল
“ এই কাপড় ডা আমি আর আব্বায় যাইয়া কিনা লই আইছি ছুডো মার লাইগ্যা।”
কবিতা অদিতির কাছে এসে গা ঘেষে দাঁড়িয়ে বলল
“ দেখো ছুডো মা, কত্ত খাওন লই আইছি। এডি খালি তোমার আর আমার।”
জেবার দিকে তাকিয়ে বলল
“ আর কাওরে দিমু না হুহহ। চলো”
কবিতা অদিতির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো। তুযা বসলো গিয়ে জেবার পাশে। সোফায় দুহাত মেলে দিয়ে শরীর এর ভাজ ভাংলো। জেবা দেখলো তুযা ওর ই দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। জেবা কপাল কুচকে বলল
“ ওমন করে তাকিয়ে আছেন কেন? জীবনে মেয়ে দেখেন নি বাকি?”
তুযা জেবার দিকে ঘুরে বসে বলল
“ জীবনে মাইয়া তো বহুতই দেখছি। তয়, তোমারে দেখলে না আমার খালি গোয়ালের সেই সাদা গাভিন গাই টার কথা মনে পরে। আহহহ, ম্যালা দুধ দিতো গরু ডা। কিন্তু অকালে মইরা গেলো”
জেবার মেজাজ তখন আকাশে উঠে গেছে। এই লোকটা এত্ত ফালতু কথা বলতে পারে বাপরে। উঠে চলে গেলো সেখান থেকে।
—-
বেলা ১২ টা বাজে। দীঘি সকালের নাস্তা বানিয়েছে। ড্রইং রুমে বার বার এদিক থেকে ওদিক পায়চারি করছে। নদী আর তুমুল এখনো উঠে নি ঘুম থেকে। দীঘি রাগে গজগজ করতে করতে সোফায় গিয়ে বসলো। এত বেলা ওবদি কে ঘুমায় ভাই?
“ দুটো মরে টরে রইলো নাকি ঘরের মধ্যে?”
দীঘি ভেবে পায় না। কয়েকবার ডাকতে গিয়েও ফিরে এসেছে। একা একা বিরবির করতে লাগলো
“ কাল ১০ হাজার টাকা কম হয়ে গেছে। আরো বেশি চাইতে হতো। হতচ্ছাড়া টা এতক্ষণ আমার বোন টাকে নিয়ে করছে টা কি ভিতরে”
নদীর ঘুম ভাঙলো মাত্রই। কিন্তু মাথাটা খুব ধরে আছে। ঘুমের রেশ কাটতেই খেয়াল হলো তুমুলের কথা। এখনো বিভোরে ঘুমোচ্ছে লোকটা। নদী নিজের অবস্থান খেয়াল করতেই হুড়মুড় করে উঠতে নেয়। তুমুলের উদাম বুকে শুয়ে আছে নদী। কিন্তু তুমুল এমন আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে রেখেছে, সেখান থেকে ছুটতে পারছে না।
দুজনের গায়ে কেবল একটা কম্ফোর্টার। এ অবস্থায় যদি তুমুলের ঘুম ভেঙে যায় নদী শেষ। এমন অবস্থায় সে কখনোই তুমুলের চোখের সামনে থাকতে পারবে না। আস্তে আস্তে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে নদী। তুমুল চোখ বন্ধ রেখেই বলে
“ এত ঢং করার কিছুই নেই। আমার ঘুম সকালেই ভেঙেছে। এতক্ষণ দেখছিলাম তোমায়। রাতে তো অন্ধকারে ঠিক করে দেখতে পারিনি”
নদীর চোখ চড়কগাছ। ইশশশ কি বজ্জাত লোক। নদী রেগে বলল
“ ছাড়ুন, ছাড়ুন বলছি আমায়”
তুমুল খিলখিল করে হেসে বলে
“ছাড়তে পারি একটা শর্ত আছে”
“ নিকুচি করেছে আপনার শর্তের। ছাড়ুন আমায়”
তুমুল আরো আষ্টেপৃষ্টে জরিয়ে নিলো নদী কে।
“এমন করছো কেন বউ? কত্ত ভালোবাসলাম তোমায়”
নদী তুমুলের দিকে তাকিয়ে বলল
“ হয়ে গেছে ভালোবাসা? এখন ছাড়ুন”
“ না হয়নি, আরো……”
নদী হাত দিয়ে তুমুলের মুখ চেপে ধরলো।
“ আমার বোন কে কিন্তু চেনেন না। এখন কিন্তু তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে বাড়িতে। ভালোয় ভালোয় উঠে পড়ুন বলছি”
“ চলো একসাথে গোসল করবো।”
তুমুল খেয়াল করতেই দেখতে পেলো নদীর গলার নিচটায় অনেকগুলো লালচে দাগ। তুমুল হাত বুলিয়ে দিলো সেখানে।
“ এগুলো শালিকা দেখলে তো আমায় এক দৌড়ে বাড়ি ছাড়া করবে বউ”
নদী মেজাজ দেখিয়ে বলল
“আপনি আগে গোসলে যান, তারপর আমি যাচ্ছি”
“ওকে”
প্রায় আধা ঘন্টা পর নদী আর তুমুল বাইরে আসলো। দীঘি বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে। ওরা আসেই দীঘি রুমে চলে গেলো। তুমুল কে নাস্তা করতে বলল নদী। কিন্তু তুমুল খাবে না বলল। দরকারি কাজ আছে। এমনিতেই লেট করে ফেলেছে। চলে গেলো নদীকে বিদায় জানিয়ে।
—-
সাইফ রুমে এসে অনেকক্ষণ হলো বসে আছে। অদিতি লাপাত্তা। এই মেয়েটা স্বামীকে ছেড়ে সারাদিন মুরব্বিদের সাথে ঘোরে। সাইফ হাজার বুঝিয়েও কোনো লাভ হয় না। অসহ্য পুরা।
সাইফ ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ায়। গ্রামটা অনেক সুন্দর। তিনতলার ব্যালকনি থেকে ফসলের জমি, ছোট্ট ছোট্ট ঘর বাড়ি বেশ ভালোই দেখা যায়। একবার মনে হয় শহরে না গেলেই ভালো হতো। গ্রামের জীবনটাই ভালো।
সাইফের ভাবনার ছেদ ঘটে নুপুর এর আওয়াজে। এদিকেই এগিয়ে আসছে নুপুর পরে। কিন্তু কে আসছে। সাইফ রুমে ঢুকতেই অদিতি এসে দাড়ালো। সাইফ ঈষৎ কপাল কুচকে অদিতির পায়ের দিকে তাকায়। অদিতি মুচকি হেসে বলে
“ বড় মা দিয়েছে। দাদি আমার জন্য রেখে গেছে বলল”
সাইফ অদিতির হাত ধরতেই অদিতি উফফফ করে উঠলো। হাতে রান্না করতে গিয়ে ইয়া বড় একটা ফোসকা পরেছে। ফর্সা হাতটা তে কালচে ফোসকা বড্ড খারাপ লাগছে দেখতে। সাইফ রাগ করতে লাগলো অদিতির সাথে
“ দেখে কাজ করতে পারো না? আর এত কাজ করতে কে বলে তোমাকে?”
সাইফ মলম লাগিয়ে দিলো অদিতির পোড়া স্থান এ।
বাড়িতে ১০-১২ জন বাবুর্চি এসেছে। দই ভরার জন্য দুধ জ্বাল করা হচ্ছে বড় বড় ডেকচি তে। তুযা, হাবিব আর সাইফ সেগুলো দেখাশোনা করছে। জেবা বার বার যাচ্ছে ওদিকে, কিন্তু তুযাকে দেখে ফিরে আসছে। এই ছেলেটা একদম অসহ্য। মুখের লাগাম নেই। জেবা অন্দরে ঢুকার সময় ধাক্কা লাগলো কবিতার সাথে। বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে গেলে কবিতা পিছন থেকে ডাকলো
“এই জাবেদা আন্টি”
জেবা পিছনে ফিরে বলল
“ কি বললে তুমি? আবার বলো কি বললে”
কবিতা অকপটে উত্তর দিলো
“ জাবেদা আন্টি, তোমাকে বড় দাদু ডাকছে”
“ জাবেদা মানে? আমার নাম জেবা। বুঝেছিস? ছোটলোক কোথাকার”
কবিতা কোমরে হাত দিয়ে বলল
“ আমাকে বকবি না একদম জাবেদা। আব্বায় রে কইয়া দিমু। সকালে চুল ধইরা মারলো ভুইলা গেছোত জাবেদা কোথাকার”
জেবা তেড়ে আসতে নিলেই পিছন থেকে সাইফ এসে ধমক দিলো
“ এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দিবো অসভ্য মেয়ে। একটা বাচ্চার সাথে কেমন ব্যাবহার করতে হয় সেটুকুও জানিস না”
জেবা রাগে ফুসতে ফুসতে বলল
“ আর ও যেটা করলো আমার সাথে তার বেলায়?”
সাইফ দাতে দাত পিষে বলল
“ মন টা চাচ্ছে তোরে গরম দুধে একটা চুব দিয়ে উঠাই। কিন্ত অত দুধ নষ্ট হবে ভেবে কিছু বলছি না। ভূতনি কোথাকার”
কবিতার হাত ধরে নিয়ে চলে গেলো সাইফ। কবিতার ওপর খুব রাগ হচ্ছে জেবার। অদিতির সাথে পারেনি তো কি। এই পিচ্চি শয়তান টাকে শিক্ষা দিতেই হবে। জেবার মাথায় আবারো শয়তানি বুদ্ধি এলো। বাকা হেসে গেলো অন্দরে। এই বাচ্চা শয়তান টাকে আজই বিদায় করবো। আমার সাথে বেয়াদবি করার ফল আজকে ওকে বুঝাবো”
জেবা জগে করে পানি নিয়ে আসে অন্দরে। তাতে বেশ করে মরিচের গুড়ো মেশায়। তারপর সেটাকে নিয়ে ঢেলে দেয় ড্রাম ভরে দুধে। মনে মনে বলে
” এবার জমবে দই”
কবিতা কে যে করেই হোক ফোসফাস দিয়ে নিয়ে গিয়ে জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসতে হবে। কিন্তু সাইফ ওখান থেকে সরছে না। জেবা অনেক ক্ষন ধরে সুযোগ খুজছে। কিন্তু সাইফ টা সরছেই না।
মনে মনে ভাবলো
” এটাকে পড়ে দেখছি, আগে অদিতি কে দেখে নিই।”
রান্না ঘরে কেউ নেই। সেই সুযোগে অনেকটা শুকনো মরিচের গুঁড়ো গ্যাসের চুলায় দিয়ে রাখে। এবার রান্না করতে এসে অদিতি শিক্ষা পাবে।
চলবে?
লেখিকা অসুস্থ। দোয়া করো যেন তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাই আর বড় করে গল্প দিতে পারি 🥹🫶
আপনাদের বেশি বেশি সাপোর্ট আমাকে লিখতে উৎসাহিত করে 🫶🥰
Share On:
TAGS: খাঁচায় বন্দী ফুল, জান্নাতুল ফেরদৌস
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০