কি_আবেশে (২৯)
জেরিন_আক্তার
মেরাব নামাজ পড়ে অনেক দেরিতে ফিরে এসে দেখে স্নেহা ঘুমিয়ে আছে। রুমের দরজা চাপিয়ে দিয়ে সেও বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষন ফোন স্ক্রল করে নিজেও ঘুমিয়ে পড়লো। বিকেলের দিকে স্নেহার ঘুম ভাঙতেই পাশে মেরাবকে দেখে সেদিকে ঘুরলো। মেরাবকে জ্বালাতন করতে কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছে বার বার। মেরাব ঘুমের ঘোরে মুখে বিরক্তিভাব এনে অন্যদিকে ঘুরলো। স্নেহা আবারও সুড়সুড়ি দিলো। মেরাব বিরক্ত হয়ে বলল,
“আরেকবার সুড়সুড়ি দিলে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবো।”
স্নেহা ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
“দিন, না করেছে কে? রোজা-রমজানের দিনে অন্যের ক্ষতি করতে চাইলে আপনারই পাপ হবে। বুঝেছেন?”
মেরাব কিছু বলল না। এবার উঁবু হয়ে শুয়ে বালিশ মাথার উপরে রাখলো। স্নেহা বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে ফোনটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে নিচে চলে আসলো। ড্রইং রুমে এসে টিভি অন করে বসলো। এর একটু পরে ফোন বেজে উঠলো। স্নেহার মা ফোন করেছে।
“হ্যালো আম্মু কেমন আছো?”
“ভালো। তু্ই কেমন আছিস?”
“ভালো। আব্বু কেমন আছে?”
“ভালো। কি করছিস?”
“বসে টিভি দেখছি। তুমি কি করছো?”
“কিছুনা। রোজা রেখেছিস?”
“হুম, আম্মু রেখেছি।”
“মেরাব কোথায়?”
“ঘুমাচ্ছে।”
“তো তোরা এসে ঘুরে যা।”
“হুম, আমিও তাই ভাবছিলাম যে ঘুরে আসবো।”
“তাহলে আয়। আমি ভাইজানকে ফোন দিয়ে বলছি। তোদের যেনো পাঠিয়ে দেয়।”
“ঠিক আছে।”
মারুফুল খান আর ফাহমিদা খান ড্রইং রুমে এলেন। ফাহমিদা খান স্নেহার পাশে বসে বললেন,
“কে ফোন দিয়েছে?”
“আম্মু, ফোন দিয়েছে।”
“দে কথা বলি!”
স্নেহা ফোনটা দিয়ে দেয়। নাফিসা বেগম ওপাশে থেকে বললেন,
“ভাবি ভালো আছো?”
“হুম, ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“ভালো। ভাবি তোমরা সবাই এসে ঘুরে যাও না।”
ফাহমিদা খান বললেন,
“যাবো, আগে তোমরা এসে ঘুরে যাও তারপরে।”
“আমরা তো যাবো এর আগে তোমরা সবাই চলে আসো।”
ফাহমিদা খান বললেন,
“জানোই তো মৌয়ের ব্যাপারটা। দুই-একের মধ্যে ওদের আনতে চাচ্ছি। ওরা আসলে এরপরে নাহয় যাবো।”
“ওহ আচ্ছা। তাহলে মৌদের সাথে করে নিয়ে এসো।”
“ঠিক আছে।”
ইফতার করে মাগরিবের নামাজ পড়ে মারুফুল খান আর মেরাব বের হলো। উদ্দেশ্য আসিফের সাথে কথা বলা। সেদিন মারুফুল খান যেভাবে আসিফ আর মৌকে বের করে দিলো এরপরে মনে হয়না আসিফ মৌকে নিয়ে এতো সহজে খান বাড়িতে আসবে। মেরাব আসিফকে আসতে বলেছে কয়েকবার এর উত্তরে আসিফ শুধু বলেছে যাবো।
মেরাব তার বাবাকে সাথে নিয়ে আসিফের একটা রেস্টুরেন্টে এলো। কারণ ও থাকলে এখানেই থাকবে। বাড়িতে ওকে সন্ধ্যার পরে পাওয়া যাবে না। মেরাব গাড়ি থেকে নেমে তার বাবাকে বলল,,
“বাবা, তুমি থাকো আমি দেখে আসছি ও ভিতরে আছে কিনা।”
“ঠিক আছে যাও!”
মেরাব রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে একজন স্টাফকে বলল,
“আসিফ আছে?”
“হ্যা স্যার, উনি দেখুন কাউন্টারে আছে।”
“থ্যাংক ইউ।”
মেরাব আসিফের কাছে এগিয়ে গেলো। আসিফ মেরাবকে বলল,
“আরে তু্ই, হঠাৎ এখানে?”
মেরাব রসিকতা করে বলল,
“হুম, আমার একমাত্র দুলাভাইকে দেখতে এলাম।”
আসিফ ভ্রু উঠিয়ে বলল,
“কিসের দুলাভাই। আগে যা বলতি তাই বলবি। এসব বলতে হবে না। আমার ভালো লাগে না।”
“আমার বোনকে বিয়ে করতে পারলি আবার দুলাভাই শুনতে ভালো লাগবে না কেনো?”
আসিফ হেসে মশকরা করে বলল,
“আরে শালাবাবু যে, চলুন এক কাপ চা খাই।”
বন্ধুর মুখ থেকে শালাবাবু শুনেই মেরাব নাক-মুখ কুঁচকে উঠে বলল,
“এই শালাবাবু আবার কিরে! এইটা আবার কেমন ডাক।”
“কেনো তু্ই দুলাভাই বলতে পারলে আমিও বলতে পারি। যতই হোক আমার বউয়ের ভাই তু্ই।”
মেরাব গভীর শ্বাস ছেড়ে বলল,
“তোর চাল বুঝেছি ভাই। যা এই দুলাভাই, শালাবাবু বাদ। আগে যেভাবে ডাকতাম সেভাবেই ডাকবো।”
“যাক মনের কথা বুঝলি তাহলে।”
“এগুলো রাখ, আসল কথায় আসি। বাহিরে বাবা গাড়িতে বসে আছে। উনি তোর সাথে কথা বলতে চাইছে।”
“কেনো?”
“তোকে আর মৌকে বাড়িতে যেতে বলবে।”
“না, ভাই আমি যাবো না। গেলে তোর বোনই যাবে। আমি নামিয়ে দিয়ে আসবো।”
মেরাব মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আমি ভাই এতোকিছু জানি না। তু্ই এগুলো বাবাকেই বলিস। আমি বাবাকে নিয়ে আসছি দাড়া!”
মেরাব চলে এলো। আসিফ পেছনে থেকে ডেকে বলল,
“এই ভাই, শোন না!”
মেরাব কথাটা শুনেও তাকালো না। আসিফ মনে মনে বলল,,, এইরকম বন্ধু থাকলে শত্রুর দরকার হয়না।
মেরাব ততক্ষনে সোজা বাহিরে বের হয়ে গাড়ির কাছে এসে মারুফুল খানকে বলল,
“বাবা, চলো আসিফ ভিতরেই আছে।”
মারুফুল খান গাড়ি থেকে নেমে মেরাবের সাথে ভিতরে ঢুকলো। আসিফের সামনে দুজন আসতেই আসিফ কেবিন থেকে বেরিয়ে বলল,
“আংকেল আমার সাথে আসুন!”
দুজনেই আসিফের সাথে ভিতরে একটা রুমে চলে যায়। আসিফ মারুফুল খানকে বসতে বলে রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে আপাতত স্টাফকে কফি নিয়ে যেতে বলল। এরপরে আবারও রুমে ঢুকলো।
মারুফুল খান আসিফকে রাজি করিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলেন। আসিফ প্রথম প্রথম অনীহা দেখিয়েছে যে কাজের চাপ কয়েকটা দিন পরে যাবে। কিন্তু মারুফুল খান এটা মেনে নেননি। তিনি অবশেষে আসিফকে যেতে বাধ্যই করলেন। কালকে মৌকে সাথে নিয়ে যেতে বলেছেন। আসিফ সম্মতি জানিয়েছে খুব কষ্টে।
মেরাব রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে হতে তার বাবাকে বলল,
“তোমার কি মনে হয় আসিফ যাবে?”
“আল্লাহ ভালো জানে ওর মনের খবর। তুমি এক কাজ করো, মৌকে কল দিয়ে বলো আসিফকে রাজি করাতে।”
মেরাব ফোন বের মৌকে কল দিতে দিতে ড্রাইভিং সিটে উঠে বসতে চাইলে মারুফুল খান বললেন,
“মেরাব আমি ড্রাইভ করি?”
মেরাব গাড়ির চাবি তার বাবাকে দিয়ে অন্যদিক ঘুরে গাড়িতে উঠে বসলো। মারুফুল খান গাড়ি স্টার্ট দিলেন। মেরাব মৌয়ের সাথে কথা বলতে বলতে ফোনটা বন্ধ হয়ে যায়। পরক্ষনেই বুঝতে পারে ফোনে চার্জ নেই। মেরাব নিজের ফোন ডেস্কে রেখে মারুফুল খানকে বলল,
“বাবা, তোমার ফোনটা দাও তো আমার ফোনে চার্জ নেই।”
মারুফুল খান নিজের ফোন এগিয়ে দিয়ে বললেন,
“এই যে নাও!”
“ফোনের লক কি?”
“তোমার বার্থডে ডেট।”
মেরাব ফোনের লকটা খুলতেই দেখলো হোম ওয়ালপেপারে তার মায়ের ছবি। মেরাব মনে মনে ভাবলো,, মানুষটা এতোবছর আগে মারা গিয়েছে তবুও তার ছবি এখনও ওয়ালপেপারে রেখে দিয়েছে। মেরাবকে অন্যমনস্ক থাকতে দেখে মারুফুল খান বললেন,
“কি ভাবছো, তোমার মায়ের ছবি এখনও এখানে রেখেছি কেনো?”
মেরাব ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেনো?”
“তোমার আরেক মা ছবিটা পাল্টাতে না করেছে। ওই রেখে দিয়েছে।”
মেরাব কিছু বলল না। মৌকে ফোন দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে কথা বলা শুরু করলো। কথা বলা শেষে মেরাব ফোনটা ডেস্কে রেখে বলল,
“বাবা, আহনাফ মির্জার ওই হাল তুমিই করেছো তাই না?”
মারুফুল খান আচমকা ব্রেক কোষলেন। মেরাব তবুও তার দৃষ্টি সরালো না। তার বাবার দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রইলো। মারুফুল খান গলার কণ্ঠ ভারী করে বললেন,
“ওইটা ওর প্রাপ্য ছিলো।”
মেরাব নিরেট কণ্ঠে বলল,
“ও বলেনি কেনো করেছে?”
“না বলেনি। আর তাই ওর ওই হাল।”
“চলো না সবাই মিলে উনার কাছে যাই। বেশ শক্তপোক্ত ভাবেই জিজ্ঞেস করি।”
“সবাই মিলে মানে? কাকে কাকে নিয়ে যাবে?”
“আমি, তুমি আর ওই উনি।”
মারুফুল খান উনি শব্দটা শুনে গভীর শ্বাস ছাড়লেন। এরপরে বললেন,
“ঠিক আছে। আর আহনাফ এখন কোথায় আছে সেটা তো আমি জানি না।”
“আমি জানি বাবা!”
“সত্যিই জানো?”
“হুম।”
মেরাব রুমে এসে স্নেহাকে দেখলো ফোন টিপছে। কই একটু এগিয়ে এসে কিছু বলবে তার কোনো নাম গন্ধই নেই ওর মাঝে। মেরাব আচমকাই ধমক দিয়ে উঠলো,
“এই সারাদিন ফোনের মধ্যে কি?”
স্নেহা ধরফড়িয়ে উঠে ফোন রেখে বলল,
“ক কি! এভাবে ধমক দিয়ে বলতে হবে কেনো?”
“তাহলে কিভাবে বলবো? আমি এসেছি চোখে পড়েনি?”
“একটু ভালো করে বলতেও তো পারেন।”
মেরাব এগিয়ে এসে স্নেহার পাশে বসে আদুরে গলায় বলল,
“জান, আমি এসেছি দেখতে পাওনি? একটু কাছে এসে বলতেও তো পারতে, তুমি এসেছো। কিন্তু তুমি তো ফোনের মাঝেই ঢুকে আছো বলবে কি করে? শোনো জান, কালকে যদি কিছু না বলো, যদি দেখি ফোন নিয়ে বসে আছো তাহলে এই ফোন আলমারিতে রেখে তালা দিয়ে রাখবো।”
স্নেহা এরূপ কথা শুনে ভরকে যায়। কথাগুলো ভালো করে বলতে বলেছিলো কিন্তু এতোসুন্দর করে মেরাব যে বলবে তার কল্পনাই ছিলো না। স্নেহা দোপাটি দাঁত বের করে হাসি দিয়ে মেরাবের গলা ধরে গালে চুমু খেয়ে বলল,
“নাহ! আর এরকম কিছু হবে না।”
“ঠিক আছে।”
“একটা কথা বলবো?”
“হুম, বলো!”
“কালকে শপিংয়ে নিয়ে যাবেন?”
মেরাব ভ্রু উঠিয়ে বলল,
“ওও এই জন্যই তো বলি, এই মেয়ে হঠাৎ গলা ধরেছে কেনো?”
স্নেহা মেরাবের পিঠে হালকা চাপর মেরে বলল,
“উফ, এতো কথা বলেন কেনো? নিয়ে যাবেন কিনা সেটা বলেন?”
“ঠিক আছে নিয়ে যাবো।”
“সত্যিই?”
“হুম। এখন আমার ফোনটা চার্জ দাও!”
স্নেহা ফোন চার্জে বসিয়ে বলল,
“খাবেন না এখন?”
“নাহ, ভালো লাগছে না শুয়ে পড়বো!”
“এখনই শুয়ে পড়বেন?”
“জেগেই বা কি করবো?”
স্নেহা হেসে বলল,
“কেনো মুভি দেখবো!”
মেরাব কি যেনো ভেবে বলল,
“ঠিক আছে। লাইটটা নিভিয়ে আমার কাছে এসো।”
স্নেহা দরজা লাগিয়ে লাইট নিভালো। এরপরে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লো। মেরাব স্নেহার ফোনটা নিয়ে বালিশের নিচে রেখে দিলো। স্নেহা বলল,
“কি হলো ফোন রেখে দিলেন কেনো? সেদিনের মতো একটা রোমান্টিক মুভি অন করুন?”
মেরাব অন্ধকারে বাকা হেসে বলল,
“জান, আজ কোনো রোমান্টিক মুভি দেখবো না। আজ রোমান্টিক মুভি আমরাই বানাবো।”
চলবে….
পরবর্তী কালকে রাত আট টায় দিবো। ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]
Share On:
TAGS: কি আবেশে, জেরিন আক্তার
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কি আবেশে পর্ব ২৮
-
কি আবেশে পর্ব ২০
-
কি আবেশে পর্ব ৯
-
চোরাবালির পিছুটানে ৩
-
কি আবেশে পর্ব ১৯
-
কি আবেশে পর্ব ২৬
-
কি আবেশে পর্ব ১৮
-
কি আবেশে পর্ব ১
-
কি আবেশে পর্ব ৮
-
কি আবেশে পর্ব ১৪