Golpo romantic golpo কি আবেশে

কি আবেশে পর্ব ২৩


কি_আবেশে (২৩)

জেরিন_আক্তার

মেরাবের মুখে এই প্রথম কোনো গান গাইতে শুনে স্নেহা তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এলো। অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,

“আপনি গানও বলতে জানেন?”

মেরাব কপাল কুঁচকে বলল,

“এমন করার কি আছে! গান কি জীবনে শোনোনি নাকি?”

“না শুনেছি, তবে আপনার মুখ থেকে শুনে অবাক হলাম।”

“ওহ।”

স্নেহা খুশি হয়েই বলল,

“গানটা কি আমার গেয়েছেন?”

মেরাব গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,

“তোমার জন্য গাইবো কেনো? আমার আরেকটা বউ আছে না। তার জন্যই তো গেয়েছি।”

স্নেহা ভেঙচি দিয়ে কিচেনে চলে গেলো। মেরাবের থেকে অন্যদিকে তাকিয়ে মুখটিপে হাসলো। তার মানে গানটা তার জন্যই গেয়েছে। ইশ, স্নেহার নাচতে ইচ্ছে করছে।

মেরাব স্নেহাকে ডাকলো। স্নেহা সামনে এসে দাঁড়াতেই মেরাব ওকে বসতে বলল। স্নেহা বসলো। মেরাব কফির মগ রেখে স্নেহাকে বলল,

“আমার থেকে তোমার কিছু চাওয়ার নেই?”

“কি চাওয়ার থাকবে।”

মেরাব বোঝানোর কণ্ঠে বলল,

“থাকে না, বিয়ের পরে হাসব্যান্ড তার ওয়াইফকে গিফট দেয়। সেই হিসেবে তোমার বিয়ে হয়েছে আমার সাথে, আমি তো তোমাকে কিছুই দেইনি। তোমার কিছু চাওয়ার নেই।”

স্নেহা মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল,

“আপনাকে ছাড়া কিচ্ছু চাওয়ার নেই।”

“এর বাহিরে কিছু চাওয়ার নেই?”

“আছে। শুধু আপনি।”

“সত্যিই কিছু চাওয়ার নেই?”

স্নেহা দোপাটি দাঁত বের করে হেসে বলল,

“একটা জিনিস চাই দিবেন?”

“কি বলো!”

স্নেহা রিনরিনিয়ে বলল,

“বিয়ের আগে খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম। বিয়ের পরে এখন আর পড়তে ইচ্ছে করছে না, বলতে গেলে কোনো ইচ্ছেই নেই। তাই বলছিলাম….. ”

মেরাব চোখ পাকিয়ে বলল,

“কি বলছিলে বলো থামলে কেনো? বলো বলো!”

স্নেহা ঢোক গিলে বলল,

“না মানে কিচ্ছু বলিনি। আমি পড়তে বসবো।”

মেরাব স্নেহার গালে হাত রেখে বলল,

“বেচে গেলে জান!”

এই বলে মেরাব ঘাড় খানিকটা কাত করে স্নেহাকে বলল,

“আচ্ছা তোমার কি মনে আছে, বাসর রাতে একটা থাপ্পড় মেরেছিলাম।”

স্নেহা গালে হাত রেখে বলল,

“হুম। খুব জোরে দিয়েছিলেন।”

মেরাব বাকা হেসে বলল,

“এরপরে যতবার পড়া ফাকি দেওয়ার কথা মাথায় আনবে এর সাথে সাথে থাপ্পড়টার কথাও মাথায় আনবে।”

স্নেহা বিড় বিড় করে বলল,,, অসভ্য লোক কোথাকার।

যা শুনে মেরাব বলল,

“কিছু বললে জান?”

স্নেহা মাথা দুদিকে নাড়িয়ে বলল,

“না, কিচ্ছু বলিনি।”

স্নেহা উঠে চলে গেলো। মেরাব পেছনে থেকে বলল,

“শুধু বিয়েটা আবার হোক, তোমার বিড়বিড় করা কথাগুলো সুদে-আসলে শোধ দিবো জান।”

মৌরা সবাই ফিরছে। এখনও ওদের আসতে দুই ঘন্টার মতো লাগবে। দুটো গাড়িতে করে আসছে। একটায় মারুফুল খান, ফাহমিদা খান, গাড়ির ড্রাইভার, সাইদা, মৌ। আরেকটায় আরিফুল খান, সাহারা খান, গাড়ির ড্রাইভার, আর সাদাফ। মৌ জানালার ধারে বসে এখনও আসিফের কথাগুলো ভাবছে। সাইদা ওকে সকাল থেকে লক্ষ করছে ও কিছু একটা নিয়ে হয়তো টেন্স। কারণ মৌ অন্যদিনের মতো আজকে হইহুল্লোড় বাঁধিয়ে দেয়নি। কারো সাথে তেমন কথাও বলছে না।

সাইদা আরও কিছুক্ষন মৌকে দেখে বলেই উঠলো,

“কিরে তোর কি হয়েছে রে?”

মৌ ধ্যান থেকে বের হয়ে এসে বলল,

“কই! কিছু তো হয়নি।”

“কই কিছু হয়নি মানে? আমি তোকে সেই সকাল থেকে দেখে যাচ্ছি তু্ই ভালো করে কথা বললি না। এমনকি এখনও কোনো কথা বলছিস না। কি হয়েছে সত্যি করে বলতো।”

মৌ কথা ঘুরিয়ে বলল,

“কি বলোতো, কতদিন পরে গ্রামে এসেছিলাম দাদু-দাদির সাথে ছিলাম। ওদের ছেড়ে চলে আসতে কেমন কষ্ট হচ্ছে। এই নিয়ে কিচ্ছু ভালো লাগছে না।”

মারুফুল খান পেছনে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন,

“মন খারাপ করো না। আগে বলতে আমি রেখেই আসতাম। এমনেতেও তো কলেজ রমজানের বন্ধ।”

মৌ মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না, বাবা আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। কাজ আছে অনেক!”

ফাহমিদা খান হেসে মারুফুল খানকে বললেন,

“শুনেছো মেয়ের কথা। তার নাকি কাজ আছে। অবশ্য বাবা যেমন মেয়েও তেমন। কাজ না থাকলেও কাজ কাজ করেই যাবে তোমরা দুজন।”

সবাই হেসে উঠলো। মৌও হাসলো তবে খুব কষ্টে। ওর মনে মনে চিন্তা হচ্ছে আসিফ কি বলবে এই নিয়ে। রাতের পরে আর কোনো কল দেয়নি বা মেসেজও দেয়নি। শুধু বলেছে বাড়িতে গিয়ে নক করতে।

সবাই বাড়িতে ফিরলো বিকেল চারটার দিকে। স্নেহা ড্রইং রুমেই ছিলো ওদের অপেক্ষায়। আর মেরাব, ওর কি দিনদুনিয়ার চিন্তা আছে। দুপুরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে। যাই হোক,, সাদাফ সবার পেছনে বাড়িতে ঢুকে স্নেহাকে দেখে দাড়িয়ে রইলো। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো। স্নেহা ওর দিকে খেয়াল করতেই বলল,

“সাদাফ ভাইয়া কেমন আছো?”

সাদাফ স্নেহার সাথে কোনো কথা বলতে চায়না বলেই পালিয়ে যেতে চেয়েছিলো কিন্তু সেই স্নেহাই ওকে ডেকে উঠলো। সাদাফ তখন মুখে হালকা হাসি এনে বলল,

“ভালো। তু্ই?”

“ভালো।”

“থাক ফ্রেশ হয়ে এসে কথা বলি। ”

“ঠিক আছে।”

সাদাফ চলে গেলো। পেছনে ফিরে তাকাতে চেয়েও তাকালো না। স্নেহা সেদিকে থেকে নজর সরিয়ে নিতেই মৌ বলল,

“আপু ভাইয়া কোথায়?”

“ঘুমাচ্ছে।”

এই শুনে সাইদা মৌয়ের কানের দিকে এগিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“রাতে ঘুমাতে পারেনি রে!”

স্নেহা লাজুক চোখে তাকিয়ে বলল,

“আপু তেমন কিছুই না।”

সাইদা হেসে হেসে বলল,

“হুম, ওসব বুঝি আমরা।”

মৌ ভাবছে আসিফের কথা তার ভাইকে জানাবে কিনা। জানাতে ইচ্ছে করছে আবার দ্বিধাও হচ্ছে। মৌকে আনমনে দেখে স্নেহা বলল,

“কিরে তোর কি হয়েছে?”

সাইদা বলল,

“আর বলিস না, গ্রামে থেকে এসে পড়েছে বলে মন খারাপ। আমি ভাই বুঝিনা এদের গ্রামে কি হয়েছে। একজনে গ্রামে গিয়ে ফোন-টোন বন্ধ করে বসেছিলো। আর এও গ্রামে থেকে আসতে চায়নি।”

মৌ কোনো উত্তর দিলো না। চুপচাপ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো। নিজের রুমে ঢুকে আসিফকে কল দিলো। প্রথম বারে ধরলো না। এরপরের বারে ধরলো। মৌ থমথমে গলায় বলল,

“ভাইয়া মৌ বলছিলাম।”

“হুম, বলো।”

“আমি বাসায় এসেছি।”

“ওহ, এসে গিয়েছো।”

“আপনি না যেনো কি বলবেন বলছিলেন। এখন বলুন না।”

“দেখা করতে হবে আমার সাথে।”

“কখন?”

“তোমার ইচ্ছা। তবে আজ এতদূর জার্নি করে এসেছো আজ দেখা করা নাই বেটার। কালকে আসো!”

“না ভাইয়া, আজই।”

আসিফ ভ্রু উঠিয়ে বলল,

“শিওর!”

“হুম, শিওর। বলুন কোথায় আসতে হবে!”

আসিফ হেসে বলল,

“এতো উতলা হয়ে আছো! রাতে ঘুমিয়েছিলে কি?”

মৌ তালে তালে তালে বলে উঠলো,

“না।”

“সত্যিই ঘুমাওনি?”

“না মানে ঘুমিয়েছি। তাহলে বলুননা কোথায় আসবো।”

“আসতে হবে না। তুমি রেডি থাকো।”

“কোথাও যেতে বলছেন না, আবার বলছেন যে রেডি থেকো। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“আমি সন্ধ্যার পরে তোমাদের বাড়ি যাবো। সেখানেই কথা বলবো।”

“সবার সামনে কথা বলবেন কিভাবে?”

আসিফ এই পর্যন্ত কাউকে এমন করে জবাবদিহি করেনি। এমনকি এককথা দুইবার বলেওনি। নিজের বাবার সাথেও না। আর সেই একটা মেয়েকে পটাতে এতো কাহিনী।

আসিফ রেগে গিয়েও আবার শান্ত হয়ে বলল,

“ও নিয়ে তুমি কোনো চিন্তা করো না। শুধু মাথায় রেখো এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলবো না।”

“ঠিক আছে।”

“তাহলে রাখছি এখন।”

“ঠিক আছে।”

যেই বলা সেই কাজ,,, আসিফ সন্ধ্যার পরে মেরাবকে না জানিয়েই ওর বাড়িতে আসে। ফাহমিদা খান ওকে দেখে বসতে বললেন। স্নেহা চলে গেলো মেরাবকে বলতে। মেরাব আসিফ এসেছে শুনে একটু অবাকই হলো। ভাবতে লাগলো এখন ও, এই সময় না বলে এলো কেনো? প্রতি বার আসার সময় তো বলেই আসে, না বলার তো কোনো কারণ নেই।

মেরাব নিচে এসে দাঁড়াতেই আসিফ সামনে এসে বলল,

“কিরে কেমন আছিস?”

“ভালো তু্ই?”

“ভালো।”

“তু্ই আসবি একবার কল দিয়ে আসবি না।”

আসিফ বাকা হেসে বলল,

“কেনো এটা কি শশুরবাড়ি যে কল দিয়ে আসবো। এটা তোর বাড়ি মানে আমারও বাড়ি। কি আন্টি ঠিক বলেছি না।”

ফাহমিদা খান কিচেনে কিছু নাস্তা রেডি করতে করতে হেসে বললেন,

“হুম ঠিকই বলছো। যখন মনে চাইবে তখনই আসবে।”

আসিফ চট করে বলল,

“মেরাব তোর বোন মৌ কই? ওর সাথে একটু কথা বলতাম। সেদিন আমার ঝগড়া করাটা ঠিক হয়নি।”

“তোকে না নাম্বার দিলাম।”

“কথা হয়নি। অচেনা নাম্বার ভেবে তোর বোন হয়তো রিসিভ করেনি।”

মেরাব স্নেহাকে বলল আসিফকে মৌয়ের রুমে নিয়ে যেতে। স্নেহা আসিফকে সাথে নিয়ে মৌয়ের রুমে এলো। মৌ ব্যালকনিতে দাড়িয়ে ছিলো। ফাহমিদা খান এর মাঝে স্নেহাকে ডাক দেওয়ায় স্নেহা চলে যায়। এতে আসিফ মনে মনে একটু খুশিই হলো। মৌ ব্যালকনি থেকে রুমে এসে আসিফকে দেখে বলল,

“ভাইয়া এসেছেন!”

“হুম। আসতেই হলো।”

“বসুন না!”

আসিফ বিছানায় বসে বলল,

“তুমিও বসো!”

“না, ভাইয়া ঠিক আছি! কি যেনো বলবেন, এখন বলুন।”

আসিফ মৌয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“কালকে ফ্রি আছো!”

“হুম। কিন্তু কেনো?”

“কালকে একটু বের হতে হবে। তোমার সাথে বাহিরেই কথা বলতে হবে। বাড়িতে হবে না।”

“আমি আগেই বলেছিলাম।”

“হুম। শোনো, কালকে সকালে একটা পার্সেল আসবে। সেটা রিসিভ করে আমাকে কল দিবে।”

“কি পার্সেল?”

“এলেই দেখতে পাবে।”

“ঠিক আছে।”

আসিফ উঠে দাড়ালো। বেশিক্ষণ থাকলে আবার মেরাবই সন্দেহ করবে। আসিফ মৌয়ের দিকে তাকিয়ে গভীর গলায় বলল,

“মৌ আমি মানুষ হিসেবে কেমন?”

মৌ কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলল,

“ভালো।”

“ভেবে বলছো তো? আমাকে ভরসা করা যায়।”

মৌ জবাবে বলল,

“হুম, চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। আপনি তো ভাইয়ার মতোই ভালো মনের মানুষ।”

এই শুনে আসিফ গভীর শ্বাস ছেড়ে বলল,

“নিজের খেয়াল রেখো। আসছি!”

আসিফ রুম থেকে বেরিয়েই দেখলো মেরাব এই দিকেই আসছে। আসিফ মনে মনে ভাবলো,,, ভালোই হয়েছে বের হয়ে। নাহলে মেরাব ঢুকে পড়তো।

আসিফ মেরাবের দিকে এগিয়ে গেলো। দুজনে গলা ধরে আবারও সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। আসিফ যেতে যেতে মেরাবকে ইঙ্গিত করে গান বলল,

              “কইতে আমার শরম লাগে
                 প্রেম আগুনে পুইরা ছাই, 
         সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিতে
           একজন মানুষ নাই! ভাইরে ভাই!”

মেরাব কেমন একটা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো। আসিফ মেরাবের তাকানোর মানে বুঝলো না।

চলবে….

পরবর্তী পর্ব কালকে ইফতারের পরেই দিবো ইনশাআল্লাহ। যারা যারা পড়বে অবশ্যই রিএক্ট দিবে।

ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply