Golpo কাজরী

কাজরী পর্ব ২৪


কাজরী-২৪

সাবিকুননাহারনিপা

ইশান সানগ্লাস টা চোখ থেকে খুলে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়ালো।

“হ্যালো মিস্টার। “

দুর্জয়ের মুখের রঙ পাল্টে গেছে। ইশানের বাড়িয়ে রাখা হাতটাকে জ্বলন্ত চুল্লি ভেবে দ্বিধা দ্বন্দে ভুগছে। কাজরী হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। যে হাসির অর্থ হলো এই খেলায় শেষ চালটা দুর্জয় নয় ও দিবে।

দুর্জয় শুকনো মুখে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করলো। ইশান কাজরীকে অনুসরন ঘরের দিকে এগুলো।

ঘরের সাজসজ্জা ইশান ভালো করেই দেখলো। টি টেবিলে নকশাখচিত গ্লাসে বাদামী রঙের পানীয়। ইশান ঠোঁট উল্টে বলল,

“ইন্টেরেস্টিং তো! তুমি তো বলেছিলে সারপ্রাইজ। কিন্তু হোস্ট তো আগে থেকেই সারপ্রাইজ জেনে বসে আছে! “

কাজরী দুর্জয়কে খুঁজলো। বেচারা কিছু না বলেই ডাইনিং স্পেসে গেছে। টুংটাং শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, এটার অর্থ হলো অস্থিরতা কাঁটাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে। বেচারা কাজরীর সঙ্গে একা সন্ধ্যেটা উপভোগ করবে বলে প্ল্যান করেছিল। কাজরী সঙ্গে করে সারপ্রাইজও নিয়ে এসেছে।

দুর্জয় নিজেকে চটজলদি সামলে নিলো। কিভাবে স্মার্টলি সবটা সামলানো যায় সেটা ভাবছে। দ্রুত ভাবতে হবে, শুধু যে এই দুজন এসেছে তা নাও হতে পারে। নিচে হয়তো আরও লোকজন নিয়ে এসেছে।

দুর্জয় নিজেকে ধাতস্থ করে ওদের সামনে এলো। পরিস্থিতি হালকা করতে জোর করে শুকনো হাসি দিলো, যেটার কারণে ও’কে বোকা লাগছে। কাজরীর মনে হলো ছেলেটা ইশান কে দেখে সমস্ত সঞ্চারিত কনফিডেন্স হারিয়ে ফেলেছে।

“কী ব্যাপার দুর্জয়? আমরা কী অসময়ে চলে আসলাম?”

দুর্জয় ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,

“না, না ইটস ওকে। আসলে ভাবছিলাম ডিনার দিয়ে দেব কী না!”

ইশান ঘড়ি দেখে বলল,

“এতো তাড়া কিসের? আপনি আমার ডার্লিং ওয়াইফ এর এতো ক্লোজ ফ্রেন্ড! গল্প, আড্ডা হোক আগে।”

দুর্জয় বসে পড়লো। মনে মনে সাহস সঞ্চার করছে। এদের সামনে নিজেকে লুজার হিসেবে প্রেজেন্ট করা যাবে না। শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“কাজরী তারপর কী খবর? তোমার বিয়েতে তো ইনভাইট করলে না, আমি কিন্তু এক্সপেক্ট করছিলাম। “

ইশান সরু চোখে কাজরীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“ভেরি ব্যাড কাজরী… ওনাকে বিয়ের উইটনেস রাখার কথা ছিলো নাকি!”

কাজরী আলগা হাসি দিয়ে বলল,

“দুর্জয় যেভাবে প্রেজেন্ট করছে একচুয়েলি সেরকম কিছু নয়। আমরা অতো ক্লোজও না। আমাদের বিয়ে কোন সিচুয়েশনে হয়েছে সেটা ও ভালো করেই জানে। কথাটা বোধহয় তোমাকে শুনানোর জন্য বলছে। “

দুর্জয় বোকা বোকা একটা হাসি দিয়ে বলল,

“ডিনার দিয়ে দেই এখন?”

ইশান এবার কাজরীর দিকে তাকালো। কাজরী বলল,

“আগে কাজের কথায় আসি দুর্জয়!”

“কাজের কথা?”

দুর্জয় দুর্বল গলায় প্রশ্নটা করলো। ওর চোখ ইশানের দিকে। কাজরীর বোন আল্পনাকে কৌশলে ফ্ল্যাটে এনে আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটালেও এই মুহুর্তে ও ইশান চৌধুরীকে ভয় পাচ্ছে। ভয় অবশ্য পাওয়ারই কথা, ওয়াজেদ চৌধুরী টাকা ও ক্ষমতায় বেশ বড় মাপের মানুষ। ক্ষমতাবানদের দুই একটা লা*শ ফেলে দেয়া বা হাতের খেল। অবশ্য দুর্জয়ের কাছে একটা কাজরীকে ঘায়েল করার অস্ত্র আছে। একসঙ্গে সময় কাটানোর সময় ও কাজরীর কাছ থেকে জানতে পেরেছিলো আল্পনার কথা। আল্পনাকে নিয়ে ও খানিকটা পজেসিভ। দুর্জয় তাই সহজ টার্গেট করেছিল।

আমার সঙ্গে একান্তে কেন দেখা করতে চেয়েছিলে দুর্জয়?”

ইশান যেন আঁতকে ওঠার ভান করলো!

“ওপস! আমি তাহলে কাবাব মে হাড্ডি! “

দুর্জয় একমুহুর্তেই যেন সাহস ফিরে পেল।

“ঢাকায় ফিরে মনে হলো একটা মিট আপ হয়ে যাক… দ্যাটস ইট। আর আমার মনে হয়েছিল তোমার হাজবেন্ড ব্যাপার টা পছন্দ করবে না।”

দুর্জয়ের মুখ হাসি হাসি। হারানো কনফিডেন্স ফিরে পেয়ে গর্বে বুক ফুলে উঠলো যেন।

“সেটা তো মিস্টার আমি আমার রিসিপশন পার্টি স্পয়েল করাটাও পছন্দ করি নি। “

দুর্জয় যেন আকাশ থেকে পড়লো।

“আমি? কিভাবে? “

ইশান কাজরীর দিকে তাকালো। কাজরী বলল,

“আমাকে যে ভিডিও টা পাঠিয়েছিলে চলো সেটা একবার বড় স্ক্রিনে সবাই মিলে দেখি। “

দুর্জয়ের মুখের রঙ বদলে গেল। তবে সামলে নেয়ার চেষ্টা করে ও ঠান্ডা গলায় বলল,

“ওকে কাজরী। আমি কিন্তু আল্পনার কাছে যাই নি, বরং ও আমাকে পাগলের মতো খুঁজেছে। “

ইশান হাত মুঠো করে দাঁড়াতে গেলে কাজরী ওর হাত ধরে বলল,

“রিলাক্স ইশান। আমি ওর সঙ্গে ঝামেলা করতে আসি নি। দুর্জয় আমি জানি সাইকোলজি তোমার খুব পছন্দ। মানুষ নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও তোমার খুব ভালো লাগে। একচুয়েলি ম্যারিড লাইফে আমি আমার গোল্ডেন পিরিয়ডে আছি। তোমার কিংবা আল্পনার রোমান্টিক মোমেন্ট নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তুমি ভিডিও টা পাব্লিক করে দাও। তোমার মুখটা ব্লার করে দিও, আই হ্যাভ নো অবজেকশন। আর আমাকে যে ভয় দেখাচ্ছিলে না মান সম্মান যাবে! মান সম্মান তো যাবে আল্পনার, ও কয়েক মাস দেশের বাইরে ঘুরে আসবে। কিংবা দেশে থেকেই বোরখা পরে চলাফেরা করবে। কোনো ব্যাপার না। আর আমার মান, সম্মান! সেটা আমার হাজবেন্ডই দেখবে। “

শেষ কথাটা বলে কাজরী ইশানের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি দিলো। ইশান ওভার স্মার্ট কাজরীকে দেখে স্বাভাবিক থেকে গোপন মুগ্ধতা প্রকাশ করলো। দুর্জয় রাগে দিশেহারা হলেও কিছু করতে পারছে না। কাজরী নিজের উঠে ইশানকে হাত ধরে টানলো। ইশান উঠে দুর্জয়ের কাছাকাছি গিয়ে শীতল চোখে দেখে বলল,

“এরপর যদি কাজরীর কললিস্টে তোর নাম্বার দেখি শু*য়োরের বাচ্চা!”

দুর্জয় মূর্তির মতো বসে রইলো। সারাদিনের সমস্ত পরিশ্রম, আয়োজন মাটি করে দিয়ে কাজরী বেরিয়ে গেল। ওর চোখে এক ফোঁটা ভয়, সংকোচ, চিন্তা কিছু নেই। ইশান চৌধুরী পাশে আছে বলেই!


“এই শু*য়োর টা তোমার বয়ফ্রেন্ড ছিলো? “

কাজরী হালকা হেসে বলল,

“স্ল্যাং ইউজ কেন করছ? বয়ফ্রেন্ড ছিলো না, ও প্রোপোজ করেছিল আমি রিজেক্ট করেছিলাম পোলাইটলি। “

“ও অ*সভ্যের মতো তাকিয়ে ছিলো তোমার দিকে। “

কাজরী ইশানের দিকে তাকালো। ড্রাইভিং সিটে আজ ইশান, পাশে ও বসে আছে। কাজরী হালকা গলায় বলল,

“ও ভরকে গেছে। ও প্ল্যান করে, ছক কষে চলা মানুষ। প্ল্যানের বাইরে কিছু ঘটলেই প্যানিক অ্যাটাকের মতো হয়। আমরা যাবার পর অনেকক্ষন সামনে আসে নি। “

ইশান প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে কাজরীর দিকে তাকালো। বলল,

“গ্রেট! তুমি তো দেখি ওর সম্পর্কে সব জানো। “

“অল্প সময়ের জন্য আমি ওর সঙ্গে মিশেছিলাম। হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে আগ্রহ ছিলো বলেই জেনেছি। বাই দ্য ওয়ে ইশান তুমি কী অন্য মিনিং খুঁজছ। সরি, হি ওয়াজ নট মাই বয়ফ্রেন্ড। “

“আচ্ছা। “

প্যালেসে ঢোকার আগে ইশান কাজরীর কাছ থেকে ফোনটা নেবার সময় বলল,

“নতুন ফোন ঘন্টাখানেক এর মধ্যে পেয়ে যাবে। আর হ্যাঁ তুমি এরপর একা কোথাও যাবে না।”

কাজরী একটা শব্দও বলে নি। ইশান খানিকটা আদেশের সুরেই বলেছে। এই কথা অন্য কেউ বললে প্রতিক্রিয়াও অন্যরকম হতো।


কাজরী দুর্জয়কে তেমন গুরুত্ব দেয় নি। ওর সাইকোলজি কিছুটা জানে বলেই গুরুত্ব দেয় নি। যে বারবার থ্রেট দেয়, সে আসলে ধ্বংসাত্মক কিছু করতে পারে না। দুর্জয় এখন যে আচরণ করছে সেটা শয়তানের ন্যায়। ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে অনিষ্ট করা শয়তানের কাজ। ও আল্পনার কাছে অতি চমৎকার মানুষ হিসেবে ধরা দিয়েছে, যাতে আল্পনা ওর পাতা ফাঁদে পা দেয়। উদ্দেশ্য সফল হয়েছে, এরপর প্ল্যান করেছে ব্ল্যাকমেইলের। কাজরী তাতে ভয় পায় নি। আল্পনার প্রতি ক্ষোভ তৈরী হয়েছে ঠিকই কিন্তু দুর্জয়কে অতোটা থ্রেট ভাবেনি। এদিকে কাজরীর কাছে রেসপন্স না পেয়ে দুর্জয় ভাবছে ও ভয় পাচ্ছে! কাজরীর মনে হলো ওর ভুল ধারণাটা ভেঙে দেয়া দরকার। কিন্তু একা যাওয়া মানেই তো আবারও ওর পাতা ফাঁদে পা দেয়া। তাই এবার ইশানকে কাজে লাগলো। ইশানকে সমস্তটা খুলে বলার পর ও প্রথমে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে ছিলো। কাজরী টেক্সট গুলো দেখালো। আল্পনার সঙ্গে ক্লোজ ফটোগুলোও দেখালো। ইশান তার প্রোটেক্টিভ নেচার দেখালো কাজরীর প্রতি। আশ্বাস দিলো যে ভয়ের কিছু নেই, ও সামলে নিবে।

দুর্জয় চ্যাপ্টার টা কাজরীর কাছে সত্যিই গুরুত্বহীন। তবে ইশান ওর জন্য কতটা প্রোটেক্টিভ হয় সেটা জানা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। সেটা জেনেছে।

কাজরী প্যালেসে ঢুকেছে ফুরফুরে মেজাজে। যখন এডাল্ট ছেলে মেয়েরা সামথিং স্পেশাল ফিল করে তখন যেমন মেজাজ হয় তেমন। রোদেলা করিঢোরে পথ আটকালো। আমতা আমতা করে বলল,

“খালামনি জানতে চাইছিলো মিলাদের অনুষ্ঠানে তুমি যাবে কী না?”

কাজরী মিষ্টি করে হেসে বলল,

“ইশান আসুক, ও যদি যেতে বলে যাব।”

রোদেলা কাজরীকে আগে অপছন্দ করতো, এখন ভয় পায়। মিষ্টি হাসিটা হজম হলো না।

চলবে…..

(সরি রিডার্স, এই পর্বটা ছোট হলো।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply