কাছেআসারমৌসুম!__(৬০)
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
ভূতুড়ে মাঝরাত। নারায়নগঞ্জ এক ঘুমন্তপুরি এখন। চার পাশে উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটা সাদা রঙের পুরোনো ফার্মহাউসের ভেতর কেবল একটি আলো জ্বলছে। সাবেক এমপি রুস্তমের খুব কাছের বন্ধু সরোয়ার হোসেনের ব্যক্তিগত ফার্মহাউস এটা। যা পড়ে ছিল প্রায় বহুদিন যাবত।
জেল থেকে পালানোর পর রুহান এখানেই থাকছে আপাতত। সাথে আছে ৫-৬ জনের মতো সাঙ্গপাঙ্গর দল। রাত এখন অনেক। তবে ঘুমোয়নি কেউ। মদের বোতল,আর সিগারেটের আসরের সাথে জুয়া নিয়ে বসেছে সকলে। রুহান ফোনে কথা বলছিল, ওপাশে রুস্তম স্বয়ং। ছেলেকে ধমকাচ্ছেন তিনি।
সার্থর ওপর এই মূহুর্তে হামলা করতে ওনার বিশদ নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু ছেলে শোনেনি। অন্ধ হয়ে গেছে প্রতিশোধের নেশায়। বাবা-ছেলের বাকবিতণ্ডা অনেকক্ষণ চলছে এনিয়ে!
এদিকে একটা কালো রঙের মাইক্রোবাস নিয়ে সেই ফার্মহাউস থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে এসেই ব্রেক কষল সার্থ। পেছনে আরো একটি মাইক্রোবাস আছে। দেখাদেখি থামল সেটাও। শরিফ শুধালেন,
“ স্যার, কিছু হয়েছে?”
“ নামো।”
বলতে বলতে সার্থ নিজেই নামল আগে। শরীফ নেমে এলেন দ্বিধাদ্বন্দ্ব সমেত।
ওপাশের বাকিরাও নামল। প্রত্যেকের পরনে সিভিল ড্রেস। সার্থ বলল,
“ আমরা এখান থেকে হেঁটে যাব। যে যেভাবে,যতটা দ্রুত পারি ঠিক ততটা। তবে হ্যাঁ, বি অ্যাওয়ার যে আমাদের যাওয়ার খবর ওদের কানে যেন কোনোভাবেই না পৌঁছায়। ইজ ইট ক্লিয়ার?”
একইসাথে ঘাড় নাড়ল সকলে,
“ ওকে স্যার।”
ফার্ম হাউসের গেইটে দুজন লোক পাহাড়া দিচ্ছেন। চাঁদের আলোর সাথে গেইটের সফেদ বাল্বের আলোতে দেখা যাচ্ছে তাদের৷ সার্থ সামনে ছিল। থেমে গেল তুরন্ত। কণ্ঠ চেপে বলল,
“ দাঁড়াও শরিফ! ”
“ কেন স্যার? আবার কী হলো?”
সার্থ চোখ দিয়ে ইশারা করল ওদিকে। সাগর বলল,
“ স্যার, ফটাফট গুলি চালিয়ে দেব,ভেগে যাবে। দুজন তো আর আমাদের এতজনের সাথে পারবে না।”
“ উহু, ওদের পেছনে সময় নষ্ট করতে গেলে ভেতরের বাকিরা সতর্ক হয়ে যাবে। বাড়ির পেছন থেকে যদি পালানোর কোনো পথ থাকে? তীরে এসে তরী ডুবতে দেয়া যাবে না। আমাদের এমন ভাবে যেতে হবে যাতে সাপ মরবে লাঠিও ভাঙবে না।”
শরিফ শুধালেন,
“ তাহলে কী করব স্যার?”
“ সব যদি আমি বলি তুমি এস আই হয়েছ কী করতে? ওদের গেইট থেকে সরানোর ব্যবস্থা করো।”
শরিফ মাথা চুলকালেন।
তার ঘটে বুদ্ধি আসছে না। আপাতত সব দুশ্চিন্তায় ছিড়েখুঁড়ে যাচ্ছে। অনেক কাঠখড় আর সার্থর বুদ্ধির মারপ্যাঁচে এই ফার্ম হাউস অবধি এসেছেন ওনারা। কিন্তু ভেতরে কতজন আছে কে জানে! সাথে বোমা-টোমাও থাকতে পারে। যদি সবাইকে উড়িয়ে দেয়? ইস,বউ বাচ্চার মুখ আর দেখা হবে না তাহলে।
শরিফের এই ভাবনায় বুঁদ স্বভাবে সার্থ বিরক্ত হলো। মেজাজ চটে গেল তার। কিন্তু এই মূহুর্তে চোটপাট দেখালে চলবে না। পিছু ফিরে ঘাড় নেড়ে সাগরকে ইশারা দিয়ে বোঝাল কিছু।
মাথা নাড়ল সে। সাথে আরেকজন নিয়ে দেওয়ালের ওইপাশে চলল। বাকিরা দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকারের আড়ালে।
সাগর একটা বড়ো ইট তুলে পাঁচিল ছাপিয়ে ছুড়ে মারল ভেতরে। সিমেন্টের উঠোনে ধুপ করে পড়ে বেশ শব্দ করল সেটা। অমনি গার্ড দুজন নড়েচড়ে উঠলেন। এক পল দেখলেন একে-অন্যকে। কেউ পাঁচিল টপকে ঢুকেছে ভেবেই,ত্রস্ত বন্দুক নিয়ে ছুটলেন সেদিকে। মোটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা শরিফ বুক ফুলিয়ে হাসলেন অমনি। ফিসফিস করে বললেন,
“ মাইন্ড ব্লোয়িং স্যার,মাইন্ড ব্লোয়িং! ”
ঘরটা মদ-সিগারেটের উৎক গন্ধে ভরা৷
হাসাহাসি আর হইচৈ-এ সরব পরিবেশ। রুহান কথা শেষ করে এসে বসল। মুখটা কালো দেখে আসাদ বলল,
“ কী হইছে ভাই?”
“ চিন্তা হইতাছে রে।”
“ পুলিশ মরে নাই দেইখা?”
তার মৌনতা উত্তর বুঝিয়ে দেয়। কবির বলে,
“ আরে ভাই এত ভাইবেন না। আইজ মরেনাই কাইল মরব৷ আমাগো হাত দিয়া বাঁচব কয়দিন?”
আসাদ স্বায় মেলায়,বলে,
“ নেহাৎ আপনে মানা করলেন,নাইলে আমরাই যাইতাম ওর কাম তামাম করতে। আপনের যে কীসের এত ডর কে জানে!”
রুহান খিটমিট করে বলল,
“ চোপ অজাতের দল, তোরা কি ওরে হালকা ভাবতেছস?
ওই হারামজাদারে গুতা খাইছস তোরা? আমি খাইছি। হারামির বাচ্চায় আমার পেটের নাড়িভুড়ি পর্যন্ত নাড়াই ফালাইছিল। আর আব্বায় তো পাঠাইছিল তগো,পারছিলি কিছু করতে? পুলিশের ঘাও খাইছস,আবার কোন মাইয়ারও মাইর খাইয়া ভাইগা আইলি। অজাতরা আবার আমারে কথা শুনায়।”
অমনি মুখটা ছোটো করে ফেলল ওরা। তবে আসাদের গায়ে লাগল বেশি। সেদিন একটুর জন্যে ও পুলিশের পিঠে ছুড়ি গেঁথে দিতে পারেনি। কোত্থেকে এক শার্ট-প্যান্ট পরা জংলী মেয়ে এসে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। আবার কী করল? এমন লাথি মারল ওকে!
রুহান কটমট করে বলল,
“ ওই শুয়ারের বাচ্চারে তো আমি মারমুই। ওরে না মারতে পারলে আমার শান্তি হইব না। চার মাস জেল খাটছি ওর লইজ্ঞা। ভিতরে কোনো সুবিধাও পাইতে দেয়নাই। একটা বিড়ি পর্যন্ত খাইতে পারিনাই। ওয় আব্বার পজিশন খাইছে। সব খাইছে আমাগো। ওরে আমি শান্তিতে বাঁচতে দিমু না।”
কবির বলল,
“ ওর বাড়িডা বোমা দিয়া উড়াইলে হইত না?”
“ তোরে চুপ থাকতে কইসি।”
পুলিশের পুরা গুষ্ঠি মাইরা আমাগো উড়াবি তুই? আব্বা এখন এমপি নাই। চাচায় কইছে এইসবে জড়াইতে পারব না। আমাগো বাঁচাব কেডা? পুলিশ বাপ মা সহ ওপেন মারলে প্রশাসন আরো খেপব। পরে ক্রসফায়ারে মরমু আমরা। ওরে একারে মারতে হবে চুপে। যাতে লোক টের পাইলেও প্রমাণ না পায়। যাক গা,নতুন প্ল্যান বাইর করতে হইব। আপাতত গায়ে এনার্জি দরকার। মাইয়া এইটা ত্যাড়া,কথা শুনে না। কোত্তে আনছস?”
আসাদ মিনমিন করে বলল,
“ বেশিদূর যাইতে পারিনাই তো। রাস্তায় পাইছি লইয়া আইছি। ১২০০ চাইছে।”
রুহান তিতিবিরক্ত মুখে বলল,
“ এক রাইতে হইব না। থাকুক কয় রাইত।”
“ তাইলে তো ট্যাকা বাড়ব।”
“ ট্যাকা দিবো কেডা? বাইঁচা থাকে কিনা আগে দ্যাখ।”
সবাই খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল। রুহান পৈশাচিক দম্ভ নিয়ে চলে গেল ভেতরের ঘরে।
বেশ কিছু সময় কাটল তারপর। আচমকা
এক বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ল বাতাসে। ঝলক তোলা বিদ্যুতের ছলকানি দরজার কাঠ চিড়ে ফিনকি দিয়ে ভেতরে ছুটে এলো। ঐ আওয়াজে কান জমে গেল সবার।
ধড়ফড় করে ফিরল ওরা। একটা প্রকাণ্ড গুলির তোড়ে সদর দরজার লক ফেটে গেছে। খসে পড়ে গেছে এক পাশের কাঠ। বাকি দাঁড়িয়ে থাকা কাঠটায় দড় পা তুলে এক লাথি মারল সার্থ। বিশাল শক্ত কাঠ অদ্ভুত আর্তনারের সাথে আছড়ে পড়ল ঘরের ভেতরে। সাথে বোম পড়ল কবিরদের মাথায়। এত পুলিশ একসাথে দেখে ভড়কে গেল সবাই। নড়ার আগেই কতগুলো বন্দুক তাক হয়।
শরিফ বলেন,
“ নড়লেই গুলি করে দেবো।”
পুলিশের লোকজন এগোয়,সাথে পিছিয়ে যায় ওরা। আসাদ আড়চোখে এক পল সোফার নিচটায় দেখে। ওখানে ওদের অস্ত্র-শস্ত্র রাখা। পা-টা নাড়িয়ে একটা তোলার চেষ্টা করল,দুম করে সেখানে শ্যুট করল সার্থ। একদম আঙুলে গিয়ে বুলেটটা গেঁথে গেল ওর। আসাদ ব্যথায়-যন্ত্রণায় পা ধরে বসে পড়ল অমনি। আঁতকে উঠল বাকিরা। ওর দিকে যখন সবার মনোযোগ চলে যায়, সেই ফাঁকে কবিররা ধড়ফড় করে ছুট লাগার ফার্মহাউসের বাম দিকের দরজার দিকে। শরিফ সহ বাকি পুলিশরাও পেছনে ছুটলেন অমনি। সাগর বলল,
“ একটাও যেন পালাতে না পারে। সব ক-টাকে ধরতে হবে।”
সার্থ এদিক-ওদিক চাইল। এখানে আর কেউ নেই। আসাদ গুঙাচ্ছে মাটিতে। ও রিভলবার মুঠোতে আগলে সাবধানী পায়ে ভেতরে এগোয়। একেকটা ঘর পেরিয়ে সতর্ক ভাবে দেখে নেয় চারিপাশ। শেষ আরেকটা বদ্ধ ঘর এলো।
ভেতর থেকে লাগানো এটা। এর মানে ওর কাঙ্খিত জিনিস ভেতরেই…
সার্থ রিভলবার নামাল। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে ফের দেখল চারিপাশ। পরপর দুটো আঙুলের উল্টোপাশ দিয়ে টোকা দিলো দরজায়। প্রথম টোকায় উত্তর এলো না।
সার্থ দ্রিমদ্রিম করে বাড়ি দিলো এবার। সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত সুরে চ্যাঁচাল রুহান,
“ কী হইছে?”
ও স্থূল স্বরে বলল – খোল।
জোরে বলেছে। কিন্তু সাউন্ড কম আসায় অল্প শুনলো রুহান। একটু অবাক হলো সাথে। দলের কেউ এভাবে কথা বলে না। নাকি ভুল শুনলো? এই রুম সাউন্ডপ্রুফ বলা যায়। বাইরের আওয়াজ তেমন আসে না। সরোয়ার এখানে এসে আরাম আয়েশ করতেন এক সময়। সে হিসেবে খুব সাহেবি ভাবে বানানো। কিন্তু এখন দেশের বাইরে থাকায় ওনার কাজে লাগে না। রুহান মেয়েটাকে ছাড়ল। লুঙ্গিতে গিট দিতে দিতে এসে টেনে খুলল দোরটা। সঙ্গে সঙ্গে ওর ঘাড় থাবা মেরে ধরে এনেই, মাথাটা দেওয়ালে সজোরে ঠুকে দিলো সার্থ। অতর্কিত আক্রমণে ভড়কে গেল রুহান। ফিরল হকচকিয়ে। সার্থ বুকে লাথি মারে। রুহানের পিঠ সেটে যায় দেওয়ালে। ভেতরের মেয়েটির মুখ ভয় ডরে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। চাদর প্যাঁচানো দেহ নিয়ে এক ছুটে পালিয়ে গেল সে। হঠাৎ কেউ পাশ কাটানোয় সার্থর মনোযোগ সরলো একটু, অমনি সেই সুযোগ লুফে নিলো রুহান। ঝড়ের বেগে সদরের দিকে ছুটল সে। চিতার গতিতে সার্থ ধাওয়া করল পেছনে। কিন্তু দলবল রেখে যাওয়া ঘরে এসে রুহান কাউকেই পেলো না। সেই বোতল,আধখাওয়া সিগারেট আর জুয়ার তাস পড়ে আছে মেঝেতে। ও বুঝল, পালিয়েছে সব। কিন্তু এই পুলিশ এখানে কীভাবে এলো?
এটা এমন জায়গা যেখানে নেটওয়ার্কও ভালো কাজ করে না। তার হতভম্বতার মাঝেই সার্থ উড়ন্ত অস্ত্রের মতো এসে পিঠে লাথি মারল। থুবড়ে মেঝেতে পড়ে গেল রুহান। ব্যথায় অবশ হলো শরীরটা।
সার্থ এগোতে নেয়, ফোনে কল বাজল তখনই। ভাবল ধরবে না,কিন্তু মনে পড়ল জামিলের কথা। ও বলেছিল তুশির খবর জানাবে আজ। তুরন্ত তাড়াহুড়ো করে পকেট থেকে ফোন বার করল ছেলেটা। জামিলই কল করেছে।
রিসিভ করতেই হড়বড়িয়ে বলল –
“ সার্থ,সার্থ তুশি…”
নামটা শুনে সার্থর বুক শুকিয়ে যায়। মাঝপথেই উৎকণ্ঠিত হয়ে বলে,
“ তুশি কী? কী হয়েছে?”
পরেরটুকু আর শোনা হলো না,পূর্বেই পেছন থেকে পিঠের মাঝে ত্যারছা ভাবে রাম দা দিয়ে এক কোপ দিলো রুহান। শার্ট চিড়ে ত্বক ফেটে সেই ঘা বসে গেল ঠিক হাড়ের কাছে।
দুম করে সার্থর হাত থেকে ফোনটা ছিটকে পড়ে গেল কোথাও। টুকরো হয়ে গেল স্ক্রিনের কাচ। সার্থর বলিষ্ঠ শরীরের সাথে মাথাটাও সামনে ঝুঁকে এলো একটু। দু দণ্ড থমকাল শ্বাস। ঘুরে পেছনে চাইতেই,সহসা দা-য়ের দ্বিতীয় কোপটা বুকে বসিয়ে দিলো রুহান। ফিনকি দিয়ে সার্থর তাজা রক্ত দেওয়ালে ছিটকে পড়ল। তুশির রক্তে শুকনো শার্টটা এবার পেলো আরেক নতুন রক্তের স্বাদ। গলগল করে মেঝেতে পড়ল কতক। সার্থর পা হড়কে যায়। টালমাটাল হয়ে আসে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি। চোখদুটোতে নামে ঘোর অমানিশার ছাপ।
রুহান চিড়বিড় করে বলল,
“ মাদারচোদ, অনেক জ্বালাইছস আমারে। অনেক ভোগাইছস। তোরে না মাইরা শান্তি হইত না। আইজ তোর মরণ আমার হাতে!”
সার্থর শরীরটা টলছিল। প্রচণ্ড হাওয়ায় একটা চারাগাছ যেমন এপাশ ওপাশ করে, পা দুটো দুলছিল তেমন। রক্তিম চোখে জল। রুহান যখনই মাথা বরাবর কোপ দিতে দা তুলল,খপ করে এক হাতে ওর কব্জি ধরে ফেলল সে। আরেক হাত দিয়ে রুহানের গলা চেপে ধরল। হাত থেকে দা-টা পড়ে গেল তার। চোখ উলটে যাওয়ার মাঝেই সার্থ দানবীয় লাথিটা ফের বসাল ওর দুই পায়ের মাঝে। জননাঙ্গে এক নিষ্ঠুর ঘায়ে,ছিটকে লুটিয়ে পড়ল রুহান। সার্থ আজ আর ভাবল না। না নিজেকে নিয়ে, না নিয়মনীতি। শুধু মনে হলো,একটা ভাইরাসকে, একটা পশুকে তার দাহ করা উচিত।
নাহলে এর বিষ ছড়িয়ে পড়বে চারিপাশে। আরো অনেক মেয়ে রেইপড হবে,আরো অনেক মানুষ খুন হবে। তুরন্ত রিভলভারটা তুলেই ঠিক ওর কপালের মাঝখানে শ্যুট করল সার্থ।
রুহানের চোখ দুটো থমকে যায়। থমকায় ছটফটানো শরীরটা। আটকে থাকা বাতাসের মতো দু পল থেমে, ওখানেই নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলো সে।
কপাল ফুটো করে গেড়ে যাওয়া বুলেটের ক্ষত থেকে তখনো ধোঁয়া বের হচ্ছে।
একটা জানোয়ারের ইতি ঘটলেও,সার্থর গোটা পৃথিবীটা দুলছে তখন। বুক-পিঠ থেকে ঝর্নার মতো চুইয়ে পড়া রক্তে পা ফস্কে যাচ্ছে বারেবার। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে। অথচ সার্থ নিজেকে শক্ত রাখতে চাইল। চাইল ঠিক থাকতে। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় চারপাশে দেখল একবার। কোথায় পড়ল ফোনটা? তুশির খবর নিতে হবে না! কিন্তু আবছা,জড়ানো দৃষ্টি ছাপিয়ে ও কিচ্ছু খুঁজে পেলো না। বরং দুষ্কর হলো দাঁড়িয়ে থাকা। ঢলে পড়তে নিলেই,কোত্থেকে যেন এসে ধড়ফড় করে ধরে ফেললেন শরিফ।
আঁতকে বললেন,
“ স্যার,স্যার! স্যার আপনার এই অবস্থা হলো কী করে?”
সার্থ শ্বাস টানছে। প্রতিটি শ্বাস যেন ফুসফুস চিড়ে নেয়া করাতের ঘা। চোখদুটো রক্তের মতো লাল। কোনোরকম বলল,
“ ফফোন…”
শরীফ দিশাহারিয়ে ফেললেন। সার্থর শরীর থেকে জলের মতো রক্ত পড়ছে। ভেসে যাচ্ছে সব। উনি উদ্বেগ নিয়ে চ্যাঁচালেন,
“ সাগর সাগর এদিকে এসো।”
সার্থর গলার তেজ কমল না। বিড়বিড় করে বলল,
“ আ-আমার যা-যাই হো-হক না কে-কেন,খবর যেন বা-বাড়িতে না যা-যয়। দিস,দিস ইজ মাই অর্ডার!”
সাগর ওরা ছুটে এলো। সবাই মিলে তুলল সার্থর নিস্তেজ হতে চাওয়া দেহ। একটা মাইক্রোবাসে আসামির বাকিদের তোলা হয়েছে। বাকি একটার পেছনের লম্বা সীটে সার্থকে শুইয়ে দিলো ওরা। শরিফ সার্থর মাথা কোলে নিয়ে বসলেন। হাতের তালু ডলতে ডলতে অস্থির হয়ে বললেন,
“ আপনার কিছু হবে না স্যার,কিছু হবে না আপনার।”
সার্থ দম টেনেটুনে ওই একই কথা বলল,
“ কাউকে কিছু বলো না।”
“ বলব না স্যার, বলব না।”
তারপর সাই সাই করে ছুটল সেই গাড়ি। সার্থ টের পেলো এই যন্ত্রণা আরো তীব্র হচ্ছে। রক্ত পড়তে পড়তে হয়ত চুপসে আসছে ওর ভেতরটা। আস্তেধীরে নিঃসাড় হচ্ছে ওর ফুসফুসের গতি।
তার পুরুষালি হৃদস্পন্দন যখন ধীরে ধীরে কমছিল,শহরের বুকে কোনো আইসিউতে শুয়ে থাকা আরেক তরুনীর হৃদস্পন্দন ফিরছিল সেসময়। সার্থ যখন প্রচণ্ড ব্যথার কাছে আস্তেধীরে হার মেনে নেয় ,
তখন জাদুর মতো একটা একটা করে আঙুল নাড়ল তুশি। নড়ল তার বন্ধ চোখের পাতা। সার্থর লাল চোখের কার্নিশ ছুঁয়ে একটা জল গড়িয়ে পড়ল। আর পারল না চেয়ে থাকতে। খুব ক্লান্তের ন্যায় চোখজোড়া বুজে নিলো সে। এক ঝটকা হাওয়ায় ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“ ত-তুশিইইইইই…..”
চোখ মেলে চাইল তুশি। লম্বা নিঃশ্বাস গলিয়ে প্রায় চারদিন পর দেখল এই ধরণীর মুখ। তার চোখের নড়ন দেখে নার্স ছুটলেন বাইরে। তুশির কানে স্পষ্ট আওয়াজ এলো,
“ পেশেন্টের জ্ঞান ফিরেছে কথাটা!”
ধীরে ধীরে গোটা কক্ষে চোখ বোলায় সে। ঝাপসা ঝাপসা দেখতে পায় সব। খুব আস্তে আস্তে আরো স্পষ্ট হলো তা।
অবচেতন, মলিন মুখে প্রথমেই তুশি খুঁজে বেড়াল প্রিয় সেই মুখ,
“ বিটকেল,ওর বিটকেল….”
চলবে,
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৬
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭খ
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৭
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪