কাছে আসার মৌসুম!
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
(৬০.১)
তুশিকে কেবিনে শিফট করার ঘন্টাখানেক গিয়েছে। আপাতত শঙ্কামুক্ত সে। একেকজন আসছেন,দেখছেন, ঝুড়ি ভরতি ফলমূল আনছেন সাথে। রেহণূমা, হাসনা দুজনেই কান্নাকাটি সেড়েছেন এক চোট। ইউশার তো গলাই বসে গেছে। চোখমুখ ঢুলুঢুলু এখনো। বিকেল নাগাদ কেবিনে সবাই ছিল। শওকত থেকে রোকসানা সকলেই। এমনকি আইরিনও এসেছিল দেখতে। কিছু বলেনি,দূরে দাঁড়িয়ে এক পল দেখেছে, মুখ ফিরিয়ে চলে গেছে আবার। থাকেনি বেশিক্ষণ।
অয়ন উশখুশ করে বারবার কেবিনে আসা-যাওয়া করছে। তুশির আশেপাশে এত মানুষ, এক দণ্ড কথা বলার ফুরসত নেই। শুধু দরজায় দাঁড়িয়ে একবার দেখছে,ফিরে যাচ্ছে আবার। ছেলেটার এসব ব্যাকুলতা বুঝতে পারে ইউশা। কিন্তু আজও সে ঠোঁট টিপে রয়,দুঃখে বাধ দেয়। বলে না কিছু।
সুস্থ হওয়ার পর এত মানুষ এলো-গেল,কত ভালো ভালো কথা বলে কত আদর করল সবাই, কিন্তু তুশির মন পড়ে রইল এক জায়গায়, ওই একজনের কাছে। যখন থেকে ও চোখ মেলেছে সার্থ কোথাও নেই। এতগুলো প্রহর কাটল,উনি কি আসেননি? শোনেনি ওর কথা?
মেয়েটা উদ্বীগ্ন নয়নে বাইরের দিকে চেয়ে রয় শুধু। যখনই দরজা খুলে কেউ আসে, তাকায় আকুল চোখে। ব্যাকুল হয়ে ভাবে,এই বুঝি ফিরল সে। এই বুঝি মনের তৃষ্ণা মিটিয়ে মানুষটাকে দেখবে ও। কিন্তু না,এলো না সার্থ। বাড়ি থেকে অনেকগুলো কল গেল,বন্ধ তার ফোন। জামিল,সাইফুল, ইউশা প্রত্যেকে কল দিলেও কোনো খবর নেই। রাগ-ক্ষোভ ভুলে অয়নও দুটোবার ডায়াল করেছিল ভাইয়ের নম্বরে,উহু খোঁজ পাওয়া গেল না।
যদিও এ নিয়ে ওদের চিন্তা কম। কারণ এর আগেও বহুবার এমন করেছে সার্থ। যতবার কোনো জরুরি কেস নিয়ে বসতো,ফোন-টোন বন্ধ করে রাখতো ও। যাতে কেউ বিরক্ত করতে না পারে। সেবার রুহানকে গ্রেফতার করতে যাওয়ার বেলায়ও হয়েছিল এমন। তাই একটু-আধটু চিন্তা হলেও তনিমা ভেবে নিলেন সার্থ হয়ত কেস নিয়ে ব্যস্ত!
আর যাবেই বা কোথায়? যে ছেলে পরিবারের আগে সর্বদা দায়িত্ব রাখে,আজও তার বিপরীত কিছু হবে না।
তাই আপাতত সবাই ব্যস্ত হলো তুশিকে নিয়ে। ওর কী লাগবে,কী ওষুধ খাবে,কী খেতে ইচ্ছে করছে তাই তাই দিয়ে কেবিনে উৎসব লেগে গেল। টানা চারদিনের শোক-তাপ ভুলে সবাই মেতে উঠল আনন্দ উল্লাসে৷ অথচ কেউ জানতেও পারল না,প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে বাড়ির আরেক ছেলের হুশ হারানোর কথা!
কেবিনে এখন কেউ নেই৷ তুশিকে আগামীকাল রিলিজ দেয়া হবে। ডাক্তার-নার্স বারবার ধন্য ধন্য করছেন ওর এই জ্ঞান ফেরা নিয়ে। এরকম বুলেট থ্রোয়িং কেসে মানুষের বাঁচার সম্ভাবনা কম। তুশির ভাগ্য ভালো সে বাকি ৬০% লোকের ভিড়ে পড়েনি। ফিরে এসেছে সতেজ রূপে। নার্স তো বলেই ফেললেন,
“ নিশ্চয়ই আপনার জন্যে কেউ নিজের সবটুকু দিয়ে দোয়া করেছিল!”
ইউশা ফল কাটছিল ছুরি দিয়ে। পাশে মিন্তুও আছে। তুশির কাছ থেকে এখনো ওরা কেউ নড়েনি। মিন্তু এটা সেটা বলছিল। এ কদিনে মা কেমন করেছে,বড়ো মা কী করেছে,কে কীভাবে কেঁদেছে বাড়িতে, ওকে কেউ সাথে আনেনি সব গল্প,সব অভিযোগ মেলে বসেছে সে। কিন্তু তুশির কানে বোধ হয় কোনো কথা যায়নি। ও এখনো দরজায় দেখছে। ইউশা খেয়াল করল ব্যাপারটা। ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ মেজো ভাইয়াকে খুঁজছো?”
তুশি মাথা নুইয়ে নিলো। ঘাড় নাড়ল দুদিকে। বোঝাল- না।
পরপরই ওপর নিচে নাড়ল – বোঝাল,হ্যাঁ।
খুব মৃদূ গলায় বলল,
“ সবাইকে দেখলাম তো,তাই।”
“ ভাইয়া আজ পাঁচদিন হলো নেই।”
বিস্ময় নিয়ে চাইল মেয়েটা,
“ কেন?”
“ জানি না। জামিল ভাইয়ার কাছে শুনলাম শেষ যখন কথা হয় তখন কাজে আটকে আছে বলেছিল। আর এখন ফোনও বন্ধ।”
তুশি উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ ফোন বন্ধ! কোনো বিপদ হলো না তো?”
মিন্তু বলল
“ আরে না না। ভাইয়ার কাছে নতুন কেস-টেস এলে এরকম করে। বড়ো মা বারবার ফোন করে তো,আবার সাংবাদিকরা ফোন টোন করে ওসবের জন্যে আবার সাইলেন্ট করেও রেখে দেয়।”
তুশি ইউশার দিকে তাকায়। সে মাথা নেড়ে স্বায় বোঝাল,বোঝাল মিন্তুর কথা ঠিক। ও জিজ্ঞেস করল,
“ কখন গিয়েছেন?”
“ তোমাকে আইসিউতে শিফট করার দিন।”
“ আর আসেননি,একবারও না?”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়ল ইউশা।
“ তোমাদের কাউকে ফোনও করেনি?”
“ আমার ফোন বাড়িতে ছিল। বাবা,অয়ন ভাই দুজনেই বলেছেন কারো সাথে কথা হয়নি। জামিল ভাইকে শুধু শেষ কাজের কথা জানিয়েছিল। এরপর আর খবর নেই।”
তুশির ফাঁকা বুকের সাথে মুখখানাও কালো হয়ে গেল৷ যতটা কালোর মাঝে আর কোনো আলো থাকে না,ততটা! ঠিক ততটা আঁধারে ডুবে গেল সেও। ছোট করে বলল – “ওহ!”
ইউশা বলল,
“ অয়ন ভাইকে খেয়াল করেছ? তোমার জন্যে কেমন ছটফট করছে। তুমি সেন্সলেস থাকার প্রত্যেকটা দিন পেশেন্ট ক্যান্সেল করেছে। এক দণ্ডও নড়েনি এখান থেকে। খায়নি ঠিকঠাক। খুব ছোটাছুটি করেছে ভাইয়া। বলেছিলাম না,উনি তোমাকে সত্যিই ভীষণ ভালোবাসে?”
তুশি কাষ্ঠ হেসে ঢোক গিলল। চোখদুটো ছলছল করছে ওর। বুকের কোনো কোণ, বিবশ ব্যথায়।
কেমন হাঁসফাঁস করে বলল তারা,
“ যারে দেখার জন্যে ছটফটিয়ে মরছে আঁখি,
তারে ছাপিয়ে অন্যের খোঁজ কীভাবে রাখি?”
সার্থর জ্ঞান ফিরল পরদিন ঠিক সন্ধ্যে নাগাদ। বুকে,পিঠে ব্যান্ডেজ। তাজা ঘা। অতিরিক্ত রক্ত যাওয়ায় অবসন্ন শরীর। অথচ, হুশ পেতেই বেড থেকে ধড়ফড় করে উঠে পড়ল সে। টান মেরে ক্যানোলা খুলে নেমে দাঁড়াল দ্রুত।
নার্স বললেন,
“ কী করছেন,আপনি এখনো অসুস্থ।”
“ আমি ঠিক আছি।”
ভদ্রমহিলা বিপাকে পড়লেন। ত্রস্ত বেরিয়ে গেলেন ডাক্তারকে জানাতে। কারো অপেক্ষায় না থেকেই টলতে টলতে বাইরে এলো সার্থ। তবে মাথা ঘুরছে ওর। মনে হচ্ছে এক ফোঁটা জোর নেই দেহে। বাইরে কজন পুলিশের লোক ছিলেন। শরিফ এসেছেন মাত্রই, কেবিনে ঢুকতে গিয়েই মুখোমুখি হলেন দুজনে। ঘুমন্ত পেশেন্টকে হঠাৎ সামনে দেখে ভড়কে গেলেন তিনি। অবাক হয়ে বললেন,
“ স্যার! আপনি ঠিক আছেন?”
“ শরিফ, আমাকে হাসপাতালে যেতে হবে। এক্ষুনি…”
“ আপনি হাসপাতালেই আছেন স্যার। পরশুর কথা আপনার মনে নেই?”
“ পরশু!”
“ আপনার তো মাঝের একটা দিন হুশ ছিল না স্যার। অনেক ব্লিডিং হয়েছিল তো!”
সার্থকে দেখে মনে হলো না তার নিজেকে নিয়ে মাথাব্যথা হয়েছে। বরং চ সূচক শব্দ করে অস্থির চিত্তে বলল,
“ ও গড,ওদিকের কী খবর তাহলে! আমাকে এক্ষুনি যেতে হবে।”
“ স্যার আমি খোঁজ নিয়েছিলাম। ম্যাডামকে কাল রিলিজ দিয়ে দিয়েছে।”
সার্থ চমকে চাইল। এক চোট ঝলকে থমকে বসল চোখেরা। কণ্ঠে অবিশ্বাস,আনন্দ একসাথে নিয়ে বলল,
“ এর মানে,এর মানে তুশি সুস্থ হয়ে গেছে?”
শরিফ হাসলেন,
“ জি, হবে না! যেভাবে আসামির পেছনেও ছুটলেন, আবার সাথে সাথে প্রতি ওয়াক্ত নামাজ পড়লেন,স্বামীর দোয়া কখনো বিফলে যায়!”
সার্থ ধৈর্য হারিয়ে ফেলল। ব্যতিব্যস্ত আওড়াল,
“ আমি বাড়ি ফিরব, যাও গিয়ে কথা বলে এসো।”
“ জি জি আপনি একটু বসুন, স্যার। আপনি এখনো অসুস্থ, আমি দেখছি।”
সার্থ বসল চেয়ারে।
শরিফ ফিরলেন কিছুক্ষণ পর। হাসপাতাল থেকে সার্থকে ছাড়তে নারাজ ছিল। এখনো ঘা ঠিক হয়নি,দূর্বল সাথে। কিন্তু অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রিলিজের নিয়ম মানা হয়েছে। শরিফ ওকে নিয়ে নিজেই রওনা করলেন বাড়িতে। এই অবস্থায় তো আর একা ছাড়া যায় না। সার্থর গাড়িতে বসতে কষ্ট হচ্ছে। সীটে পিঠ হেলাতে পারছে না। বুকের থেকেও ওখানকার ক্ষতটা গভীর বেশি! সফেদ ব্যান্ডেজে রক্ত লেগেছে কিছু। শরীর এত ক্লান্ত, গত চারদিন এক ফোঁটা ঘুমোয়নি, ঠিক করে খায়নি,তারওপর দেড়-দিন পড়েছিল হাসপাতালের বেডে! এত কিছু সত্ত্বেও জেদ করে ছুটছে কেবল স্ত্রীর জন্যে। শরিফ একা একাই হাসলেন। আজ এখানে উনি থাকলে ওনাকে খুঁজে পাওয়া যেতো না। এক ঘায়েই মরে পড়ে থাকতেন। অথচ এই মানুষটাকে দেখো! নিজের চেয়েও তার উদ্বেগ বাড়ি পৌঁছানো নিয়ে। সেই পাথর স্যার,ভেবেছিল যার মাঝে আবেগের চিহ্নও নেই সেও যে কাউকে এতটা ভালোবাসে শরিফের দেখে ভীষণ ভালো লাগছে!
সার্থ হঠাৎ বলল,
“ রুহানের কী হলো?”
“ ওহ, স্যার ভুলে গেছিলাম বলতে। স্পট ডেথ, পরশুই মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশের গুলিতে মরেছে তো, তাই নিয়ম মেনে আগে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করতে হয়েছে বুঝলেন। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের উপস্থিতিতে একটা ইনকুয়েস্ট রিপোর্ট শেষ করে পোস্টমর্টেমে পাঠিয়েছিলাম। কী যে ছোটাছুটি গিয়েছে আমার আর সাগরের! একদিকে আপনি অসুস্থ,পারছিলাম না আপনার বাড়ির লোককে জানাতে। আবার ওদিকে ওসব। খুব কষ্টে মিডিয়ার থেকে চেপেচুপে রেখেছি।”
” রিপোর্ট কি পাওয়া গেছে?”
“ কাল সকালেই পোস্টমর্টেম শেষ হয়েছে, স্যার। ডক্টররা তো কনফার্ম করেছেন যে পুলিশের গুলিতেই মৃত্যু। যেহেতু ও ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ছিল, তাই ওপর মহল থেকে প্রেসার ছিল তাড়াতাড়ি সব শেষ করার। ওর পরিবারের লোকজনকে খবর দেওয়া হয়েছে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু…
” কেউ আসেনি?”
“ নিয়ে তো গেছে স্যার। কিন্তু রুস্তম যে কী করে কে জানে! কমিশনার স্যারের মুখ-চোখ ভালো লাগল না। ভেতর ভেতর আমাদের ওপর বেজায় ক্ষেপেছেন। বিশেষ করে আপনার ওপর। বোঝেনই তো আত্মীয় আত্মীয় ব্যাপার। শুধুমাত্র আপনি আহত হয়েছেন না? আবার হাসপাতালে ছিলেন। এসপি স্যার,ডি আইজি স্যার সবাই আপনাকে দেখতে এসেছিল। বলল আজও আসবে। কিন্তু আপনি তো এর আগেই…
যাক গে,গোটা টিম আপনার পক্ষে স্যার, সব তো আপনার ফেবরে। চিন্তা করবেন না। তবে তাও সাবধানে বুঝলেন,স্যার সুযোগ পেলেই ছাই দিয়ে ধরবেন মনে হচ্ছে।”
সার্থ হাসল। উড়িয়ে দিলো এসব। তবে তার হাসিটা দেখাল ফুরফুরে হাওয়ার মতো। যেখানে কোনো চিন্তা নেই,অশান্তি নেই,নেই কোনো ছটফটানি। গাড়ি চলছিল রাস্তার লেন ধরে। এক পাশে সাড়ি সাড়ি সব ফুলের দোকান বসেছে। ও হঠাৎ বলল,
- দাঁড়াও দাঁড়াও।”
ড্রাইভার ব্রেক কষলেন অমনি। শরিফ ছাড়াও গাড়িতে আরো কজন পুলিশের লোক ছিলেন। সার্থ নামতে নিলেই শরিফ বললেন,
“ কী লাগবে স্যার,আমাকে বলুন না!”
“ উহু,ইটস পার্সনাল।”
নেমে গেল সে। অসুস্থ শরীর নিয়ে দুটো পা কোনোরকম টেনেটুনে একটা ফুলের দোকানের কাছে দাঁড়াল। শরিফ বিহ্বল হলেন ওকে ফুল কিনতে দেখে। একটা কালো রঙের কাগজ মুড়িয়ে ভেতরে লাল গোলাপ দিয়ে বুকে তৈরি করা হচ্ছে। সার্থ নিজে বেছে বেছে ফুল নিলো,নিজেই বুকে বানিয়ে দেয়ার নির্দেশনা দিলো। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল বিল দিতে গিয়ে। ওর ফোন,মানিব্যাগ কিছুই তো সাথে নেই। পকেট হাতাতে দেখে শরিফ মুচকি হেসে পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“ আমি দিচ্ছি,স্যার!”
সার্থ অপ্রস্তুত হলো একটু। ব্যাপারটা মাথাতেই ছিল না। শরিফ নিজেই বললেন,
“ এত হেজিটেট করবেন না স্যার। ভালোবাসার জিনিস নিয়ে এত ভাবতে নেই। হয় এরকম!”
গাড়িতে উঠে ফুলের বুকেতে একবার চোখ বোলায় সার্থ। তুশি একদিন অয়নকে বলেছিল, ওর গোলাপ খুব পছন্দ। এখানে চল্লিশটা গোলাপ আছে। তুশির বয়সের দ্বিগুণ!
মেয়েটা খুশি হবে নিশ্চয়ই? হাসবে তো,নাকি আবার অভিমান করে গাল ফুলিয়ে থাকবে!
আচ্ছা,জ্ঞান ফিরে তুশি ওকে খোঁজেনি? জিজ্ঞেস করেনি ওর কথা? জানতে চায়নি ও কোথায়?
তার ভাবনার মাঝেই গাড়ি ভিড়ল বাড়ির আঙিনায়। অথচ গেইট কখন খোলা হলো সার্থ তাও খেয়াল করেনি। ব্রেক কষার শব্দে নড়ে উঠল সে। একজন এসে গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। নামল সার্থ। শরিফ বললেন,
“ স্যার, আমি ধরি প্লিজ। আপনি অসুস্থ এখনো।”
“ আমি পারব।”
“ প্লিজ স্যার,প্লিজ! একটা হাত অন্তত ধরি।”
সার্থ আর মানা করল না। ওকে খুব নিবিড় ভাবে আগলে আগলে শরিফ ভেতরে নিয়ে এলেন। বাকিরা দাঁড়িয়ে রইল বাইরে।
ডোরবেলের শব্দে আসমা দরজা খুলল।
সার্থর মুখটা দেখেই এক চিৎকার দিয়ে বলল,
“ খালাম্মা,ভাইজান আইছে।”
বসার ঘরের মানুষগুলো নড়েচড়ে চাইল সহসা। সাইফুল,জয়নব,রেহণূমা,শওকত ছিলেন এখানে। তনিমা ছুটে এলেন খাবার রুম থেকে।
সার্থর চেহারা দেখে একটু অবাক হলো সবাই। দেখেই মনে হচ্ছে ক্লান্ত, অসুস্থ ভীষণ!
জয়নব বিভ্রান্ত চিত্তে বললেন,
“ দাদুভাই,কোথায় ছিলে তুমি? ফোন বন্ধ রেখেছিলে কেন?”
সাইফুল বললেন,
“ তোকে কতবার ফোন করলাম রে সার্থ? থানাতেও কল করলাম তোর খোঁজ নিতে। ওখানেও নাকি ছিলি না। কেউ বলল না কিছু। এখন কোত্থেকে এলি তুই?”
তনিমা,রেহণূমা সবাই একই কথা বললেন। শওকত চুপ করে রইলেও বোঝা গেল,তার ভেতরেও ওই একই প্রশ্ন ঘুরছে।
শরিফ হেসে বললেন,
“ আস্তে, আস্তে! আপনারা প্লিজ শান্ত হন। স্যার অসুস্থ,একটু বসতে দিন ওনাকে।”
তনিমা আশ্চর্য হয়ে বললেন,
“ অসুস্থ! অসুস্থ কেন? ক-কী হয়েছে ওর?”
শরিফ সার্থকে ধরে ধরে সোফায় বসাল। সার্থর চোখ তখন আশেপাশে। বাড়ির অর্ধেক লোকই এখানে নেই। কিন্তু ও খুঁজছে যাকে, সে কোথায়?
ততটুকু সময়ে সব ঘটনা খুলে বললেন শরিফ। রুহানকে ধরা থেকে পুরোটাই। আর এতেই মাথায় বাজ পড়ল সকলের। হতবাক চোখে সার্থর মুখের দিকে চেয়ে রইল তারা। তনিমা কেঁদেই ফেললেন,হাহুতাশ করে বললেন,
“ হায় আল্লাহ,এত কিছু ঘটে গেল! আর আমরা কিছু জানতেই পারলাম না?”
শওকত বেশ চটলেন শরিফের ওপর। রেগে রেগে বললেন,
“ হোয়াট ননসেন্স! এভাবে একজন আহত হলো,আর আপনারা তার বাড়ির লোককে খবর দিলেন না? কী আনপ্রফেশনাল কাজকর্ম এসব! আমি আজকেই আপনাদের নামে ওপর মহলে কমপ্লেইন করব।”
সার্থ চোখ বুজে চ সূচক শব্দ করল।
শরিফ আঁতকে উঠলেন। মিনমিনিয়ে বললেন – “ স্যার আমি কী করলাম? সার্থ স্যারই তো আমাকে অর্ডার করেছিলেন কাউকে কিছু না জানাতে। আমি আরো কত কষ্টে এসপি স্যারকে বুঝিয়েছিলাম।”
রেহণূমা বললেন,
“ কেন রে সার্থ? কেন এরকম করিস তুই? আমরা কি তোর কেউ না?”
“ এরকম কিছু না ছোটো মা। তোমরা সবাই চিন্তায় ছিলে,আমি আর চিন্তা বাড়াতে চাইনি। আর তুমিও মায়ের মত কাঁদতে শুরু করলে কবে থেকে? শান্ত হও। আমি ঠিক আছি এখন।”
জয়নব ফোস করে শ্বাস ফেললেন।
“ কিছু বলার নেই তোমাদের। সবাই বড়ো হয়ে গেছ। যার যা ভালো লাগছে তাই করছো!”
তনিমা ব্যতিব্যস্ত হয়ে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ ও বাবা,এখন কেমন লাগছে? ব্যথা ট্যাথা আছে আর? একটু স্যুপ করে দেবো?”
সার্থ আশেপাশে দেখতে দেখতেই মাথা নাড়ল দুদিকে। সাইফুল শরিফকে বললেন,
“ আপনি প্লিজ বসুন। রেহণূমা চায়ের ব্যবস্থা করো।”
ভদ্রমহিলা যেতে নিলে থামালেন শরিফ।
“ না না স্যার। আমার এখন থানায় ছুটতে হবে। আসলে আমি টিমে ছিলাম তো,এখন অনেক কাজ। আমি আজ আসি,পরে আবার আসব।”
বিদেয় নিয়ে চলে গেলেন তিনি।
হঠাৎ কাঁধের ওপর একটা হাত পড়ায় মুখ তুলে চাইল সার্থ।
অয়ন খুব নরম সুরে বলল,
“ সরি ভাইয়া!”
ভ্রু বাঁকায় সে,
“ কেন?”
অয়ন ভাইয়ের পাশে বসল।
“ আমি ভেবেছিলা…”
সার্থ কথা টেনে নেয়,
“ তুশিকে বিপদে ফেলে গা বাঁচাতে পালিয়েছি?”
মুখটা ছোটো করল সে। সার্থ বুক ফুলিয়ে শ্বাস ফেলতে ফেলতে হাসল। বলল,
“ ইটস ওকে। আমি এসব ধরিনি।”
“ থ্যাংক ইউ। চলো,তোমাকে ঘরে দিয়ে আসি। আর প্রেসস্ক্রিপশনটা আমাকে একবার দেখিও। এত আগে চলে এলে,অনেক কমপ্লিকেশন হতে পারে এখন। খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। ঘা-ও তো তাজা মনে হয়। কী যে করো না।”
সার্থ ফের আশেপাশে দেখল। ধৈর্য হারিয়ে মাকে শুধাল,
“ তুশি কোথায়?”
ওর বাহুতে থাকা অয়নের হাতটা ছুটে গেল অমনি। কঠোর হলো নম্র মুখ।
তনিমা বললেন,
“ ঘরে। বেড রেস্ট চলছে তো। বের হতে দিচ্ছি না। ইউশা, মিন্তু, হাসনা খালা সব ওখানেই।”
সার্থ পাশে রাখা ছোট্ট বুকেটায় তাকাল এবার। অয়নও খেয়াল করল সেটা। অথচ হেসে বলল,
“ বুকেটা তুশির জন্যে?”
সার্থ রাখ-ঢাক রাখল না। ছোট্ট শব্দে জানাল,
“ হ্যাঁ।”
তারপর ঢোক গিলল সে। প্রথম বার সার্থর নার্ভাস লাগছে। আজ পাঁচদিন পর দেখা হবে ওদের। অথচ এ যেন পাঁচ হাজার দিন। অয়ন বলল,
“ আচ্ছা,যাও দিয়ে এসো।”
সার্থ অবাক হলো একটু। অয়ন এত স্বাভাবিক? ও কি তবে সব মেনে নিলো?
ভালো লাগল সার্থর। বুকেটা হাতে নিয়ে উঠতে যাবে,হঠাৎ চোখ পড়ল সামনের সেন্টার টেবিলে কিছু কাগজের দিকে। একটা নামের লিস্ট! ভ্রু কুঁচকে হাতে তুলল সে। সব ওদের আত্মীয়দের নাম। ওর নানা বাড়ি,তুশির নানা বাড়ি, নাসীরদের পরিবার…
জিজ্ঞেস করল,
“ কী এটা?”
এবারেও অয়ন উত্তর দিলো,
“ গেস্টদের লিস্ট। খুব কাছের যারা তাদের নাম। সবাইকে ফোন করে দিয়েছ, চাচ্চু?”
বড়োরা একবার একবার মুখ দেখাদেখি করলেন। জবাবে ঘাড় নাড়লেন সাইফুল। বোঝালেন-হ্যাঁ।
কিন্তু সার্থ এখনো বোঝেনি। কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো আরো। শুধাল,
“ বাড়িতে কি বিশেষ কিছু হচ্ছে!”
অয়ন পিঠ ছেড়ে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। আত্মগরিমায় চুইয়ে পড়া প্রতাপ নিয়ে বলল,
“ হ্যাঁ,
কাল আমার আর তুশির বিয়ে!”
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৭খ
-
হেই সুইটহার্ট গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২২