Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৭


কাছেআসারমৌসুম_(৫৭)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

সকাল থেকে থম ধরে বসে আছে শওকত। কটমট করছে ক্ষুব্ধ মুখ। তনিমা ঘরে এলেন তখনই। স্বামীর চেহারা দেখে ফোস করে শ্বাস ফেললেন। পায়ের শব্দ পেয়ে তাকালেন ভদ্রলোক। থমথমে কণ্ঠে শুধালেন,
“ কী? ছেলের কাছে কোনো উত্তর পেলে?”
তনিমা কালো মুখে মাথা নাড়লেন দুপাশে। বললেন,
“ বলতে গেলাম, তাড়াহুড়ো দেখিয়ে চলে গেল।”
“ যাবেই তো। ওর আর কী? কাউকে তো আর মানে না। পুলিশ অফিসার হয়ে নিজেকে খুব লায়েক ভেবে বসেছে। কথা যা শোনার, অপমান যা হওয়ার সেতো আমার হলো। ছি,ছি পার্টির অতগুলো লোকের মাঝে নাসীর আমাকে বলল, আমি নাকি ছেলেকে সঠিক শিক্ষা দিইনি! ছিহ!”

তনিমা ছোটো মুখে চুপ করে পাশে এসে বসলেন। শওকত ফের বললেন,
“ ওই ঠান্ডা পানির মধ্যে মেয়েটাকে ঠেলে ফেলে দিয়েছে তোমার বেয়াদব ছেলে। মেয়েটা সাঁতার জানে না, নাকেমুখে পানি ঢুকে কী অবস্থা হয়েছিল। জ্বরে পড়েছে। বিছানা রেখে উঠতেও পারছে না শুনলাম! রোকসানা একটু আগেও আমাকে ফোন করে কত কী বলেছে জানো?
বলছে ও এখন আর এই বিয়ে দেবে না। তোমার ওই অভদ্র ছেলের কাছে মেয়ে দিতে নাকি ওর রুচিতে বাঁধছে।”
তনিমা বললেন,
“ বুঝতে পেরেছি।”
অমনি ক্ষ্যাপাটে চোখে চাইলেন শওকত,
“ বুঝতে পেরেছ মানে কী? এতগুলো কথার এটা একটা উত্তর হলো? তোমার ছেলে কেন আইরিনকে পানিতে ফেলল তার জবাব আমার চাই তনিমা। তুমি এনে দেবে, নাকি আমি নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করব? আমি কিন্তু এবার মানব না,ও বড়ো হয়েছে। রেগেমেগে মেরে দেবো কিন্তু।”
তনিমা মিনমিন করে বললেন,
“ আচ্ছা, পানিতে তো তুশিও পড়লো,ওর যে কিছুই হলো না। আইরিন একদম জ্বরে কাত হয়ে গেল কেন বলো তো!”
“ এটা কেমন কথা? কীসের সাথে কী মেলাচ্ছ? আরে বাবা,আইরিন এক পরিবেশে মানুষ হয়েছে তুশি আরেক পরিবেশে। আইরিন ওর বাবা মায়ের তুলতুলে মেয়ে। তুশি সেখানে বাবা মাকেই পায়নি। রাস্তায় ওর বয়স বেড়েছে। দুটো এক?”
তনিমা ঘাড় নাড়লেন।
“ বুঝতে পেরেছি।”
“ আবার এক কথা?”
“ আহা,চ্যাঁচাচ্ছ কেন? এখন চ্যাঁচিয়ে লাভ হবে? সার্থ বাড়িতেই নেই। আসুক,আমি জিজ্ঞেস করব। এখন তুমি শান্ত হও। ফ্রেশ হও,নাস্তা করো। তারপর সবাই মিলে গিয়ে আইরিনকে দেখে আসি না-হয়। রোকসানাকেও বুঝানো যাবে। এখন ছাড়ো এসব।
শওকত ফোস করে শ্বাস ফেললেন। শান্ত হলেন একটু।
“ আচ্ছা।”

খুব হূলস্থুল পায়ে বাড়ি ঢুকল অয়ন। তখন মাত্র সকলে নাস্তা করতে বসেছে। রেহণূমা ওকে দেখেই বললেন,
“ কী রে,ফিরে এলি?”
অয়ন একটু অবাক হয়। দিদুনের কিছু হলে,সবাই এখানে থাকবে কেন? জিজ্ঞেস করল,
“ দিদুন?”
“ আম্মা তো ঘরেই। কেন?”
অয়ন এই বিভ্রম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। লম্বা লম্বা পা ফেলে ছুটল সবেগে। বাকিরা চেয়ে রইল,কেউ কিছুই বোঝেনি।

জয়নবের নাস্তার প্লেট তনিমা একটু আগে দিয়ে গেছেন। বৃদ্ধা খেতে বসেছেন সবে। অয়ন চৌকাঠে এসেই হোচট খেলো দৃশ্যটায়। উদ্বেগ নিয়ে ঢুকল ভেতরে।
“ দিদুন! তুমি ঠিক আছ?”
বৃদ্ধা অবাক হয়ে বললেন,
“ ওমা দাদুভাই, তুমি? তুমি নাকি ঘুরতে গেলে?”
“ তোমার তাহলে কিছু হয়নি,দিদুন?”
“ আমার আবার কী হবে?”
অয়নের সব গুলিয়ে গেল৷ মাথায় কিছুই ঢুকল না। জিজ্ঞেস করল,
“ ফোন কই তোমার?”
“ ফোন তো মিন্তু ভাই নিয়ে গেছে। গেমস খেলবে বলল!”
অয়ন যা বোঝার বুঝল এতে। মেজাজটা প্রচণ্ড খারাপ হয়ে গেল। নিশ্চয়ই ওই পাঁজির বাদড়ামো এসব। খিটমিট করে সোজা ওর ঘরে গেল অয়ন। এসে দেখল ঘরে মিন্তু নেই। দুবার নাম ধরে ডাকল, উত্তর এলো না।
অয়ন চোখ বুজে শ্বাস ঝাড়ল৷ কঠিন গলায় বলল,
“ মিন্তুউউ বেরিয়ে আয় । যদি আমি বের করি,খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
খাটের নিচে থাকা মিন্তুর জিভ দাঁতের নিচে পড়ল। এই রে,বুঝে গেল যে!
অয়ন শক্ত কণ্ঠে বলল,
“ ভালোয় ভালোয় এলে কিছু বলব না। নাহলে কিন্তু….”
আর ডাকতে হয়নি। কাচুমাচু মুখে বেরিয়ে এলো ছেলেটা। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারল না, সঙ্গে সঙ্গে কান টেনে ধরল অয়ন। মিন্তু ব্যথায় নুইয়ে গেল,আর্তনাদ করে বলল,
“ আয়ায়া ভাইয়া লাগছে,লাগছে।”
“ মিথ্যে কথা বলেছিস কেন? ফাজলামো হচ্ছে আমার সাথে? এটা ফাজলামোর সময়? গিয়ে বলব চাচ্চুকে?”
“ না না প্লিজ না। ঠ্যাঙাবে ধরে, প্লিজ বলো না।”
“ মিথ্যে বললি কেন তাহলে? কেন বললি বল?”
মিন্তু কাঁদোকাঁদো গলায় বলল,
“ বলা যাবে না,নিষেধ আছে। বললে মেজ ভাইয়াও ঠ্যাঙাবে।”
অয়নের চেহারায় ভাঁজ পড়ল।
সন্দিহান কণ্ঠে বলল,
“ ভাইয়া,ভাইয়ার কথা বললি কেন? ভাইয়াকি তোকে ফোন করতে বলেছিল?”
মিন্তু জিভ কাটল ফের। হায়হায় মুখ ফস্কে সত্যি বেরিয়ে গেল তো। অয়ন কানে টান বসায়,
“ কী বল?”
“ বলছি বলছি আয়ায়ায়া..
মেজো ভাইয়া বলেছিল, তোমাকে কল করে বাড়িতে ঢুকাতে পারলে আমাকে দু হাজার টাকা দেবে। তাই ভাবলাম দিদুনের কথা বলি। যাতে তুমি সাথে সাথে আসো।”
অয়ন স্তব্ধ,বিস্মিত। কান থেকে হাত ছুটে গেল। অস্পষ্ট বলল,
“ কীহ?”
“ সত্যি… গড প্রমিস!”
মুখটা ঝিম মেরে গেল অয়নের। দু সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভ হয়ে। পরপর তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল কোথাও। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়, সামনে পড়ল ইউশা। ক্লাসে যাচ্ছে ও। কিন্তু ওকে অয়ন দেখলই না। পাশ কাটিয়ে ঝড়ের মতো আগে আগে নেমে গেল সে। বসার ঘর থেকে মা,ছোটো মা ডাকলেন দুবার। থামেনি ও । হন্তদন্ত পায়ে সোজা লনে এসে দাঁড়াল। গাড়ি নেই দেখে ধক করে নড়ে উঠল বুক। গেইট খোলা,আর তুশিও নেই। অয়ন হনহন করে দারোয়ানের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সহসা টুল রেখে উঠে দাঁড়ালেন তিনি।
“ গাড়ি কোথায়?”
“ কোনটা, সাদাটা? ওটা তো সার্থ বাবা নিয়ে গেলেন।”
“ সাথে তুশি ছিল?”
“ জি।”
অয়ন চট করে চোখ বুজে ফেলল। দুপাশ থেকে চোয়ালের হাড় ভেসে উঠল অমনি। পরপর দুম করে ক্ষুব্ধ পায়ে একটা লাথি মারল গেইটের পাঁচিলে। আঁতকে উঠলেন দারোয়ান। চোখ ছিটকে বেরিয়ে এলো,যখন দেওয়ালের গা থেকে এক টুকরো সিমেন্ট খসে পড়তে দেখলেন নিচে। হতবাক হয়ে অয়নের ক্রুদ্ধ মুখপানে চাইলেন ফের। হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে অয়ন। চোখ দুটো রক্তিম!
এই ছেলেকে তো কোনোদিন এত রেগে যেতে দেখলেন না,আজ কেন তবে?


গাড়ির গতি হিঁসহিসে। ডানে-বামে না চেয়ে সোজা চালাচ্ছে সার্থ। চোখের পলকে বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে গেল সে। পরপর আড়চোখে তুশির দিকে চাইল। মেয়েটা তখনো নিস্তব্ধ হয়ে বসে। মুখে কথা নেই,চোখে নড়ন নেই।
কী অদ্ভুত! ওকে দেখে এত অবাক হলো যে নড়তেই ভুলে গেছে?
সার্থ গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসল। দু আঙুল বাড়িয়ে তুশির আলাদা হওয়া ঠোঁটজোড়া মিশিয়ে বুজে দিলো হঠাৎ। অমনি নড়ে উঠল মেয়েটা। যেন ফিরল তার ধ্যান। আবার ধড়ফড় করে চোখদুটো ঝাপটাল।
জিজ্ঞেস করল ফ্যালফ্যাল করে,
“ আমি কি ঘুমোচ্ছি,না জেগে আছি?”
সার্থ ভ্রু নাঁচাল,
“ বিশ্বাস হচ্ছে না?”
তুশি উড়ছে কল্পনায়। সার্থ কেন এখানে আসবে,এভাবে ওর সাথে যাবেটা কোথায়?
তক্ষুনি সার্থ এক আশ্চর্য কান্ড ঘটাল। তুশির কোলে রাখা হাতটা নিয়ে চেপে ধরল হাতে।
মেয়েটা ছলকে ওঠে। ঠান্ডা স্পর্শে বুঝে যায় এটা সার্থই হবে। অমনি নিজের মধ্যে ফিরল তুশি। ভীষণ রাগে মাথার কোষ গণগণ করে উঠল। তড়িৎ হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“ আপনি কেন এসছেন?”
“ তাহলে কে আসবে,অয়ন? আমার সামনে দিয়ে ওর সাথে ঘুরতে যাবে,এত সহজ?”

“ এর মানে তখন ওনাকে ওভাবে ঘরে পাঠানোর পেছনে আপনার হাত ছিল? আর সেই সুযোগে আপনি লুকিয়ে এই গাড়িতে এসে বসেছেন? বাহ,কী পুরুষ রে!”
সার্থর হুঙ্কার ছুড়ল মৃদূ স্বরে,
“ তুশি!”
“ গাড়ি থামান। আমি নামব!”
“ গাড়ি থামবে না।”
“ থামবে,একশ বার থামবে। আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না।”
“ যদি না থামাই?”
“ আমি চ্যাঁচাব।”
হাসল সার্থ। কাঁধ উঁচিয়ে বলল,
“ চ্যাঁচাও।”
“ আমি ঝাঁপ দেবো গাড়ি থেকে।”
“ দাও।”
তুশি দরজার হাতল ধরে টানল। খুলল না। বুঝল,লক করে দিয়েছে। দু সেকেন্ড থম ধরে চেয়ে রইল সে। সার্থর চোখ রাস্তায়,মনোযোগ দিয়ে ড্রাইভিং-এ ব্যস্ত। অথচ ঠোঁটের কোণে কেমন মিটিমিটি হাসি। যে হাসিতে মেয়েটার মাথায় আগুন জ্বলে উঠল। হুট করে স্টিয়ারিং-এ ঝাঁপিয়ে পড়ল তুশি। হুড়মুড় করে ঘোরাল এদিক-ওদিক। সার্থ ভড়কে গেল,
“ কী করছো? তুশি,এক্সিডেন্ট হবে।”
তুশি পাগলের মতো বলল,
” গাড়ি থামান। আমি যাব না আপনার সাথে।”
“ তুশি বিহেভ ইয়র সেল্ফ।”
ততক্ষণে গাড়ির চাকা এঁকেবেঁকে গেছে। ব্যস্ত রাস্তায় যে কোনো সময় ঠুকবে কিছুর সাথে। সার্থ বুঝল এ মেয়ে থামবে না। খপ করে তুশির মাথাটা ধরে এনে চেপে রাখল কোলে। তুশি ছটফট করে উঠল। মাথা তুলতে চাইল,আরো বেশি করে ঠেসে রাখল সার্থ।
ও এলোপাথাড়ি হাত-পা ছুড়ে বলল,
“ ছাড়ুন আমায়। লাগছে…উফ, শয়তান পুলিশ! কোন ধরণের অত্যাচার এসব?”
সার্ঘ শুনলো না। এক হাতে গাড়ির হুইল ধরে, আরেক হাতে কোলের ওপর তুশির মাথা ওভাবেই চেপে রাখল সে। মেয়েটার ছটফটানি যখন মাত্রা ছাড়িয়ে গেল বাধ্য হয়ে এক সাইড করে গাড়ি থামাল সে। তুশি ধড়ফড়িয়ে মুখ তুলল৷ শ্বাস নিলো বড়ো করে। ওর পনিটেইল খুলে গেছে। চুল এলোমেলো হয়ে পড়েছে সারামুখে।
দুপাশ থেকে সরিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ আপনি মানুষ না, আওয়ামিলীগ? এমন ভাবে কেউ চেপে ধরে?”
“ তাহলে কীভাবে ধরে?”
সার্থর কেমন কেমন হাসি দেখে তুশির আরো মেজাজ চটে গেল। ছেলেটা হাত বাড়াল সামনের চুল গুছিয়ে দিতে,ঝটকা মেরে সরিয়ে দিলো সে। লক বাটন টিপে দরজা খুলতে গেলে,হাত টেনে ধরল সার্থ,
“ তুশি বেশি হয়ে যাচ্ছে…!”
হাতটা মুচডে ছাড়িয়ে নিলো ও,
“ সকালে কী বলেছেন আমি ভুলিনি। এরপরেও আপনার সাথে এক গাড়িতে আমি বসব? কক্ষনো না।”
মেয়েটা নেমে গেল। বিরক্ত শ্বাস ফেলল সার্থ। নামল নিজেও। তুশি রাস্তা পার হতে চাইছে। তাকাচ্ছে এদিক-ওদিক। এখান থেকে যাওয়ার খুব তাড়া যেন।
জায়গাটা অল্পস্বল্প নীরব। লাইন ধরা কেবল গ্যারেজ,আর কয়েকটা ছোটো ছোটো ভ্যান। কাছেপিঠেই বাইক ওয়াশ করছে।
পানি গড়িয়ে গড়িয়ে এসে জমেছে এক জায়গায়। সার্থ এসে দাঁড়াল,
“ তুশি লিসেন টু মি । আমরা বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে আছি,তুমি এখান থেকে একা যেতে পারবে না।”
“ সেটা আমার ব্যাপার। আপনাকে ভাবতে হবে না।”
সার্থ কপাল কুঁচকে বলল,
“ অয়নের সাথে তো খুব হেসে হেসে বের হচ্ছিলে। আমার সাথে এরকম করছো কেন?”
“ কারণ আপনি মানুষটাই এরকম। উনি আর যাই করুক আপনার মতো আমাকে অসম্মান করে কথা বলে না। আপনি কেন এসছেন? কী করতে?”
“ সেটাও আমার ব্যাপার। তোমাকে বলব না।”
তুশি রেগে হাঁটা ধরল,কনুই চেপে ধরল সার্থ। মেয়েটা দাঁত চেপে বলল,
“ হাত ছাড়ুন।”
ছাড়ল না সার্থ। উলটে তেজি স্বরে বলল,
“ তুমি আজ আমার সাথে ঘুরবে। উই আর গোয়িং ফর আ লং ড্রাইভ। অয়নের সাথে যেখানে যেখানে যেতে,আমি তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব। তার চেয়েও সুন্দর জায়গায় নিয়ে যাব। তাই তোমার এখন কোথাও যাওয়া হবে না।”
তুশি এবার ধৈর্যের খেই হারাল । ঝট করে
ঘুরেই সার্থর পেট বরাবর প্রকাণ্ড ঘুষি মারল সবেগে । কিন্তু,সার্থর পাহাড়ের মতো শরীরটা এই আঘাত টেরও বোধ হয় পেলো না। একটু ভাঁজ হলো না, পিছিয়ে গেল না। বরং অমন শক্ত হয়েই একইরকম দাঁড়িয়ে রইল সে। তুশি আহাম্মক বনে গেল। ওর এই ঘুষি খেয়েই তো বস্তির মতিন চার হাত দূরে ছিটকে গিয়েছিল।
নির্বোধের মতো চোখ ঝাপটায় মেয়েটা। এবার গায়ের জোর আরো বাড়িয়ে সার্থর বুকে ফের আরেকটা ঘুষি মারল ৷ দু-হাতে ধাক্কা দিলো সজোরে। বিধিবাম,এক ফোঁটাও নড়ল না সার্থ । উলটে, ভীষণ চুপ করে চেয়ে রইল ওর দিকে। মেয়েটা ঢোক গিলে অসহায় চোখে চাইল এবার। সার্থ ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ হয়েছে? যাই তাহলে? “

তুশি বিড়বিড় করে বলল,
“ আমি আপনার সাথে ঘুরব না।”
“ কেন? কী সমস্যা? তোমাকে আমি খেয়ে ফেলব? শরীরে আমার দেয়া দাগ নিয়ে ঘুরছো আর আমার সাথে ঘুরতে চাইছ না?”
তুশির মাথায় বোম পড়ল। বিহ্বল হয়ে বলল,
“ এর মানে আপনার সব মনে আছে?”
সার্থর ঠোঁটে চাপা হাসিটা ছুটে এলো ফের। কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“ প্রথমে ছিল না,পরে মনে পড়েছে। কী কী করেছি,কোথায় কোথায় ছুঁয়েছি সব মনে পড়েছে। সব…”
ঐ ফিসফিসে শব্দে কান ধরে গেল তুশির। ভো ভো করে উঠল মাথার কোষ। সার্থ মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
“ আর সিনক্রিয়েট করো না,তুশি। অলরেডি অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। চলো,প্লিজ!”
তুশি তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“ এতই যদি আমায় নিয়ে ঘোরার শখ,তো চোরের মতো এসে গাড়িতে বসলেন কেন? বাড়ির সবার সামনে দিয়ে বসতেন।”
“ যখন সময় হবে,বসব। তোমার ইচ্ছেনুযায়ী আমি কাজ করব না।”
তুশির মাথা ফের তেতে গেল। ওকে জোর করবে,আবার তেজও দেখাবে।
রেগেমেগে বলল,
“ আপনার মতো লোকের সাথে আমি কথাই বলতে চাই না।”
সবেগে ঘুরে হাঁটা ধরল মেয়েটা। দু পা বাড়াল,সামনে থেকে সাইসাই গতিতে একটা গাড়ি ছুটে গেল তখনই। চাকায় পিষ্ট হতেই ছলকে উঠল গর্তে জমে থাকা জল। তুরন্ত সব ছিটকে এসে লাগল তুশির শরীরে। একদম মুখ অবধি ভিজে গেল ওর। মেয়েটা ভ্যাবাচেকা খেল। সার্থ পেছনে থাকায় ওর গায়ে লাগেনি। তবে ব্যাপারটায় শব্দ-হীন হেসে ফেলল সে। পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ বড়োদের সাথে বেয়াদবি করলে এরকমই হয়।”
তুশি খিটমিট করে চাইল।
“ কথা বলবেন না আপনি।”
মেয়েটার শরীরে সোজাসাপটা চোখ গেল সার্থর। আরেকদিক চেয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজের গায়ের ব্লেজারটা খুলল সে। এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ এটা পরো।”
“ কেন?”
“ আমি বলেছি,তাই?”
তুশির ভেতর জেদ। ঠেলে দিলো অমনি,
“ কোনো দরকার নেই।”
সার্থর চাউনি আশেপাশে। বলল শান্ত ভাবে,
“ তুশি পরো এটা।”
“ পরব না। সব সময় আপনি যা বলবেন তাই করতে হবে নাকি? কী ভাবেন নিজেকে? যখন ইচ্ছে হবে আপনি আমাকে এসে বলবেন, তুশি আমি তোমাকে ভালোবাসি না । আবার যখন ইচ্ছে হবে মদ খেয়ে সোফা… “
সার্থ দাঁত চেপে হিঁসহিঁসিয়ে বলল,
“ ভেতরের সব দেখা যাচ্ছে, ডাফার।”

তুশি থমকে গেল। থমকাল তার চোখমুখ। চোরের মতো চোখ নামিয়ে এক পল তাকাল নিজের দিকে। লজ্জায় মাটিতে মিশে গেল অমনি। সাদা জামা ভিজে গায়ে লেপ্টে গেছে। স্পষ্ট শরীরের সব কটা ভাঁজ। হুড়মুড় করে সার্থর থেকে ব্লেজার টেনে নিলো মেয়েটা। তাড়াহুড়ো করে পরল গায়ে। থমথমে কণ্ঠে ছুড়ে ছুড়ে বলল,
“ ধন্যবাদ।”
সার্থ ঘাড় ডলতে ডলতে বিড়বিড় করল,
“ ধন্যবাদ দিয়ে কী করব?
যা দেখার সে-তো দেখেই ফেলেছি।”
আস্তে বললেও তুশি শুনতে পেলো,চাইল হতভম্ব চোখে। সার্থ গাড়ির দরজা খুলে দেয়।
“ এবার অন্তত ওঠো। নাহলে আবার কোত্থেকে পানি এসে বাকিটাও দেখিয়ে দেবে।”
তুশি স্তম্ভিত হয়ে বলল,
“ খা খারাপ লোক। আপনি এত খারাপ? আর আমি ভাবতাম..
নাহ, এবার তো আপনার সাথে আমি আরো বেশি করে যাব না।”
“ তুশি লিট্রেলি এবার খুব রাগ হচ্ছে। শেষ বার বলছি, ওঠো। ”
“ উঠব না বলেছি না? আপনার কথা আমি শুনব কেন? আমি কি আপনার..”
সার্থ চ্যাঁচিয়ে উঠল মাঝপথে,
“ চুপ, ইডিয়ট। আর একটা কথা বললে কাল নেশায় যা যা করেছি, আজ সজ্ঞানে করব সেসব। ঘাড়ের এই পাশটাও কিন্তু আর আস্ত থাকবে না!”
তুশি থ বনে গেল। সার্থ ধমকে বলল,
“ ওঠো…”
ঐ বাজখাই, মেঘমন্দ্র ধমকে লাফ দিয়ে উঠল ওর বুক। আর গাইগুই করল না। চুপচাপ বসল গাড়িতে। ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বাস ফেলল সার্থ। একটা যুদ্ধ করল বোধ হয়!
এই চোরের এত জেদ…

দরজা আটকে নিজেও ঘুরে গিয়ে সীটে বসল সে। ওর পকেটের ফোন সেই থেকে ভাইব্রেট হচ্ছে। সার্থ জানে কে কে কল করবে এখন। হয় অয়ন,নয় বাড়ি থেকে কেউ। আর নাহয় শরীফের কল। গত দুটোদিন সার্থ থানায় যায়নি। আজকেও যাবে না। আজ তো মেয়রের আসার কথা ছিল,সেজন্যেই কি?
গাড়ির ইঞ্জিন চালু হলো ফের। চলতে চলতে আড়চোখে এক পল তুশিকে দেখল সে। মেয়েটা থমকে বসে আছে। মুখে টু শব্দও নেই। যেন পৃথিবী থেকে ধ্যান-জ্ঞান তুলে নেয়া বেদুইন।
সার্থ দাঁতে ঠোঁট কামড়াল,হাসল নিঃশব্দে। হুইল ঘোরাতে ঘোরাতে দুটো লাইন গাইল,
চেনা-শোনা চোখের চাহিদায়,
ধীরে-ধীরে আলাপচারিতায়,
এলোমেলো চিন্তার আসরে,
দেখা হলো মেঘের বাসরে,
জানতে কি বাকি আর কারো?
মানতে কি প্রমাণ চাই আরো?
গালে, চোখে, ঠোঁটে তোর আমি,
চুমু এঁকেছি সবচেয়ে দামি!
তুশির নিভন্ত চোখ চমকে যায়। শিউরে ওঠে শরীরটা। লজ্জায় হাঁসফাস করে তড়িৎ চিবুক নুইয়ে নিলো সে। শিরদাঁড়া সোজা করে, পুরন্ত ঠোঁট টিপে চোখ নামিয়ে রইল। এ কী গান!
হায় আল্লাহ, এ লোকের হলোটা কী? নেশার ঘোর কি এখনো কাটেনি? কী সব বলছে,কী সব করছে। এই সার্থকে তো তুশি চেনে না। কোনোদিন দেখেনি। মাথা-টাথা কি খারাপ হয়ে গেল?
**
জামিল কাল রাত থেকে সার্থকে ফোনে পাচ্ছে না। চিন্তায় তার মাথা ফেটে যাচ্ছে। ছেলেটা অমন রেগেমেগে বেরিয়ে গেল,তারপর থেকে খবর নেই। কী ঝামেলা বাঁধালো আবার? অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় জামিল ঘরে বসে থাকতে পারল না। গাড়ি চালিয়ে সোজা সৈয়দ বাড়ির মূল ফটকে হাজির হয়ে গেল। ইউশাও ক্লাসের জন্যে বের হলো তখনি। মুখোমুখি পড়ল দুজন। অদূর থেকেই হাত নাড়ল জামিল। ত্রস্ত পায়ে নেমে কাছে এসে দাঁড়াল।
এক পল মুগ্ধ চোখে দেখল ইউশার মুখটা। পরনে ঢিলেঢালা কামিজ,ঢিলে জিন্স। গলায় স্কার্ফ প্যাঁচানো। চুলগুলো নিচু করে ঝুটি বেঁধেছে। সাজসজ্জাহীন ললিত একটি মুখ। ইউশা ওকে দেখেই সালাম দিলো। জিজ্ঞেস করল,
“ ভালো আছেন, ভাইয়া?”
জামিল বলল,
“ হ্যাঁ, তোমার কী খবর? ইউনিভার্সিটি যাচ্ছো?”
“ জি।”
“ সার্থ কি বাড়িতে?”
“ বাইক তো লনে দেখলাম। বোধ হয় ঘুমোচ্ছে এখনো।”
“ ওহ। তুশি ঠিক আছে তো? “
“ হ্যাঁ। অয়ন ভাইয়ের সাথে ঘুরতে গিয়েছে।”
জামিল জিভ কাটল। এই রে,সার্থ থাকতে তুশি অয়নের সাথে ঘুরতে গেল? হাউ?
জিজ্ঞেস করল,
“ অয়নও বাড়িতে নেই?”
“ না। আপনি তাহলে ভেতরে যান, ভাইয়া। আমিও যাই, ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছে।”
ও এগোতে গেলেই থামায় জামিল,প্রশ্ন করে,
“ শোনো ইউশা, তোমার কি গিফট পছন্দ হয়েছিল?”
“ হ্যাঁ সুন্দর তো।”
“ ওটার সাথে যে আরো একটা জিনিস ছিল,দেখেছ?”
ইউশা কপাল কুঁচকে চাইল। পার্টিতে অয়ন যখন বাক্সটা খুলেছিল,তখনই যা একটু দেখেছিল ও। এরপর আর খেয়াল নেই। মেয়েটার মুখ দেখেই উত্তর পেয়ে গেল জামিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ দেখোনি, তাই না?”
ইউশা লজ্জা পেয়ে যায়।
“ সরি..ভাইয়া।”
“ সরির কিছু নেই। ইটস ওকে…!”
“ কী ছিল, জরুরি কিছু?”
“ তাহলে কি মুখেই বলব?”
“ বলুন না,আমরা আমরাই তো।”
জামিল জিভে ঠোঁট ভেজাল। দু-পল সময় নিয়ে সোজাসাপটা বলল,
“ আসলে ইউশা, আই লাইক ইউ৷ তুমি রাজি থাকলে আমি মাম্মা-পাপাকে দিয়ে আঙ্কেলের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে চাই।”
ইউশা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে বলল,
“ এসব কী বলছেন!”
“ আমি জানতাম,সামনাসামনি বললে তুমি অকওয়ার্ড ফিল করবে,সেজন্যেই একটা কার্ডে লিখে দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তো দেখলেই না।”

“ কিন্তু জামিল ভাই,আপনার হঠাৎ আমাকে, মানে কীভাবে!”
জামিল ভণিতা ছাড়াই বলল,
“ আমি নিজেও জানি না,ইউশা। আমি তো আগে তোমাকে নিয়ে কখনো এরকম ভাবিওনি। তোমাকে দেখেছিই কত বাচ্চা একটা মেয়ে। ক্লাসে টেনে পড়তে, সেবার যখন দেশ ছেড়ে গেলাম। কিন্তু এইবার তোমাকে দেখেই আমার কী যেন হলো। সার্থর জন্মদিনে সেই যে একটা হলুদ পাখির মতো জামা পরে সেজেগুজে দাঁড়ালে,আমি কিছুক্ষণের জন্যে চোখ ফেরাতে পারিনি।”
ইউশা মাথা নুইয়ে চুপ করে রইল। ও বলল,
“ ইউশা,তুমি কি রাগ করলে?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল দুপাশে।
“ নাহ, রাগ করব কেন? কাউকে ভালো লাগা তো দোষের নয়।”
হাসল জামিল,
“ সাচ আ সুইটেস্ট গার্ল। কত্ত ম্যাচিউর্ড তুমি। এজন্যেই তোমাকে সবাই এত পছন্দ করে।”
ইউশা মাথা তুলে চাইল। সরাসরি বলল,
“ কিন্তু ভাইয়া, আম সরি। আমি আপনাকে কখনো ঐ চোখে দেখিনি।”
জামিল মুখ কালো করে বলল,
“ আমাকে তোমার ভালো লাগে না?”
“ লাগে,কিন্তু মেজো ভাইয়ার বন্ধু হিসেবে লাগে। জামিল ভাইয়া হিসেবে লাগে।”
ছেলেটা উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ তাহলে তো এটা কোনো ইস্যুই নয়। এখন ভাইয়া,পরে না-হয় ছাইয়া হব।”
ইউশা হেসে ফেলল।
“ সেটা সম্ভব না। আসলে আমি একজনকে পছন্দ করি। না, ঠিক পছন্দও নয়। ভালোবাসি! খুব ভালোবাসি।”
জামিল আহত হলো।
চেয়ে রইল মন খারাপ করে।
পরপর ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ ওখেই,তাহলে আর কী করার! ইটস মাই ব্যাড লাক। কিন্তু সেই ভাগ্যবান মানুষটা কে,জানতে পারি?”
“ উহু। সে আমার একান্ত প্রেম। আমার অব্যক্ত কথা,লুকোনো ব্যথা। আমি তাকে কারো সামনে আনতে চাই না।”
“ বাপরে…
এত গভীর প্রেম?
ঠিক আছে। তাহলে আর কী বলব? বেস্ট উইসেস ফর বথ অফ ইউ।”
ইউশা মলিন চোখে হাসল।
“ বথ অফ! এক তরফা প্রেমে আবার বথ অফ…”
ও ঘুরে এক পা বাড়িয়েও থামল আবার। জিজ্ঞেস করল,
“ আমি রিজেক্ট করায় আপনার খারাপ লেগেছে?”
জামিল বলল,
“ একটু তো লেগেছেই।”
“ মরে যাচ্ছেন,কষ্ট হচ্ছে, শ্বাস আটকে আসছে, বাঁচতে পারবেন না এরকম মনে হচ্ছে?”
জামিল শব্দ করে হেসে ফেলল এবার।
“ ধুর, এরকম কেন হবে? এসব বোকা বোকা ব্যাপার, কারো হয় নাকি?”
ইউশা কাষ্ঠ হেসে ভাবল,
“ কিন্তু আমার তো হয়েছিল। এখনো হয়। হয়ত বাকীটা জীবনও এক ব্যর্থ প্রেমের গল্প বারবার এসে আমার গলা চেপে ধরবে। আমাকে বুঝিয়ে যাবে,অয়ন ভাই ছাড়া শূন্য আকাশে উড়ে বেড়ানো গাঙচিলের মতোই একা আমি। ”
“ ইউশা? আর ইউ অলরাইট?”
ইউশা ধ্যান ভেঙে চাইল। বিমর্ষ মুখে হাসি টেনে বলল,
“ জামিল ভাইয়া,আপনি মন খারাপ করবেন না। আপনি আসলে খুবই ভালো ছেলে। দেখবেন, বউ হিসেবে আরো অনেক ভালো মেয়ে পাবেন আপনি।”
“ তাই, দোয়া করে দিচ্ছো?”
“ হু।”
“ তাহলে পেতেও পারি। গুড গার্লদের দোয়া সত্যি হয়।”
“ আমি যাই,আল্লাহ হাফেজ।”
ইউশা বিদায় নিয়ে রওনা করল। বুকের কোণে নিদারুণ রিক্ততা ভেসে উঠল সহসা। টলমলে চোখে ভাবল,
“ একদিন সবাই-ই সব পাবে। শুধু কিছু মানুষের ব্যথা সারাজীবন একই রয়ে যাবে!”

চলবে..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply