Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৬


কাছেআসারমৌসুম__(৫৬)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

তুশি সোফার সাথে হেলান দিয়ে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। সামনে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সার্থ। এত সময় মানুষটার ঠোঁট চললেও,এখন আর টু শব্দও আসছে না। তাও তুশি নিষ্পলক চেয়ে আছে ওই হলদে ফরসা মুখের দিকে।
এদিকে ঘাড়,গলা ঠোঁট প্রচণ্ড জ্বলছে। বাঘের মতো কামড়েছে লোকটা। কত জায়গায় কেটেছে কে জানে! কিন্তু তুশির রাগ হচ্ছে না। বরং নিশ্চল নয়ন মেলে হাঁটুতে মাথা কাত করে রেখে,একধ্যানে সার্থকে দেখল সে। ভেতরের সুপ্ত আঁশ মিটিয়ে নেয়ার প্রয়াসে মেয়েটার সেই দৃষ্টিতে এক টুকরো অন্ধকার নেই।
কী ছোটো বাচ্চাদের মতো ঘুমোচ্ছে সার্থ! দেখতে দেখতে তুশির নয়নজোড়া আরো কোমল হলো। একটু আগের ওসব উষ্ণ মুহুর্ত ভেবে পরপর ভীষণ লজ্জায়, অস্বস্তিতে নুইয়ে এলো ভেতরটা। সার্থর ঠোঁটের চারপাশের কিছু জায়গায় লিপস্টিক লেগে আছে। তুশি আস্তে আস্তে মাথা নুইয়ে আরো এগোলো ওর কাছে। পেলব হাতটা বাড়িয়ে মুছে দিলো সার্থর মুখে লেগে থাকা ওই লাল লাল দাগ। কিন্তু এই কাছে আসাই যে কাল হলো তার। ক্ষণিকের দুরুত্ব ভুলে বসল সে। ভুলে বসল পার্টিতে ওদের আলাদা হওয়ার সেই ঘোষণার কথা। বরং প্রখর ভালোবাসায় তুশির প্রেমিকাসুলভ হৃদয় টলমল করে ওঠে।
বেহায়ার মতো ঠোঁট বাড়িয়ে সার্থর কপালে নিঃশব্দে এক চুমু খেলো সে।
পরপর চুমু খেলো ওর বন্ধ চোখের পাতায়। নজর গেল সাদা শার্টের ওপর হতে চেয়ে থাকা সার্থর ফরসা-নগ্ন বুকে। পার্টিতে অনিচ্ছায় তুশির লেগে যাওয়া ঠোঁটের ছাপ এখনো লেগে আছে সেখানে। তুশি এইবার ইচ্ছে করে ওই চিহ্নতেই ফের চুমু খেলো। মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে বলল,
“ আপনাকে একটু মন ভরে ছুঁয়েছি,জানি ঠিক হয়নি, তাও ছুঁলাম। এরপর তো আর কখনো পারব না!”
তুশি আক্ষেপের লম্বা শ্বাস ফেলল। বলল,
“ আপনি ঠিকই অন্যের হয়ে গেলেন, বিটকেল।
অথচ আমি সারাজীবনের মতো শুধু আপনারই রয়ে গেলাম। আচ্ছা, কেন আমার হলেন না,বলুন তো? একবার শুধু বলতেন আমার মাঝে আপনার কী কী ভালো লাগে না! কী কী পছন্দ না আপনার। আমি তো নিজেকে বদলাতে চেয়েছিলাম। আপনি একবার বললেই পা থেকে মাথা অবধি পালটে ফেলতাম নিজেকে। একদম আপনার মনের মতো হতাম! তাও আমার হতেন, একটু ভালোবাসতেন আমাকে। এই যে আমাকে ছুঁলেন,কেন ছুঁলেন? এবার আমি কী করে আপনার মুখোমুখি হব? আমার অস্বস্তি হবে না? বিব্রত লাগবে না?
আপনার এই ছোঁয়াগুলো তো আমি আপনার সজ্ঞানে চাই, বিটকেল। এরকম মাতাল হয়ে হুশ খোয়ানোর জন্যে নয়। আপনার এই স্পর্শ আমি আমার স্বামী হিসেবে চাই,আইরিনের বাগদত্তা হিসেবে নয়।”

তুশির চোখ থেকে এক ফোঁটা জল টুপ করে সার্থর কপালের ওপর পড়ল। মেয়েটা নিজেই মুছে দিলো সেটুকু। ফিসফিস করে বলল,
“ হয়ত আমার ভাগ্যের পাতায়
আপনার নাম ছিল,
কিন্তু পাশে লেখা হলো,
আপনি আমার নন!”
তুশি আরো অনেকক্ষণ বসে বসে সার্থর মাথায় হাত বোলাল। পরপর চোখ পড়ল তার হাত ঘড়িতে। এ বাবা,এত রাত! ওনাকে তো তুলতে হবে। এই ঠান্ডায় এমন ফ্লোরে পড়ে থাকলে জ্বর-টর বাঁধবে নাহলে। গায়ের কোর্টও এখনো অনেকটা ভেজা!
কিন্তু এই পাহাড়ের মতো বিশাল শরীরটা নিয়ে ও একা কী করবে বুঝল না। মাথায় এলো ইউশার নাম। তুশি হুড়মুড় করে উঠে দরজা খুলতে গেল,থামল হঠাৎ। ফের ছুটে এসে দাঁড়াল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। যা ভেবেছিল তাই! গলার একটা পাশ পুরো ঝাঝড়া হয়ে গেছে। পুরোটা জুড়ে কেবল রক্ত জমাটের মতো ছোপ ছোপ দাগ। ঠোঁটের অবস্থা তো আরো খারাপ! তুশি তড়িঘড়ি করে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল। গাউন ছেড়ে চুরিদার পরল। ওরনাটা মাফলারের মতো প্যাঁচাল গোটা ঘাড়ে। তারপর হাতের কাছে যে লিপস্টিক পেলো চওড়া আস্তরণে ঠোঁটে মাখল সেটাই। কিন্তু ছোঁয়ানোর সময় মনে হয়েছিল ব্যথায় সব অবশ হয়ে যাচ্ছে! সব শেষে ভালো করে নিজেকে দেখল আয়নায়। নাহ,ঠিক আছে এখন।


তুশি হাঁপাতে হাঁপাতে ইউশার ঘরের সামনে এলো। ঝটপট করে ধাক্কা দিলো দরজায়। বাড়ির সবাই ঘুমে কাদা থাকলেও, তনিমার ঘরের আলো জ্বলছে। হয়ত ছেলের জন্যে সজাগ এখনো! আর এসময় ইউশাও জেগে থাকে। হয় পড়ছে,নয় অয়নের শোকে কাঁদছে।
হলোও তাই। দুটো টোকাতেই এসে দরজা খুলল মেয়েটা। ভেজা ফোলা ফোলা চোখগুলো চমকে উঠল তুশিকে দেখে। অবাক হয়ে বলল,
“ তুশি,কী হয়েছে তোমার?”

মনে মনে আঁতকে উঠল তুশি। ইউশা কি কিছু বুঝে ফেলল। ও দু একবার ঘাড়ের ওরনা টানল,ঠোঁটটা হাত দিয়ে ঢাকতে ঢাকতে বলল
“ ককই কিছু না তো।”
“ তুমি এই রাতের বেলা এমন ওভার ড্র করে লিপস্টিক পরেছ কেন? তাও এরকম ক্যাটক্যাটে লাল রঙের। দেখে মনে হচ্ছে কোত্থেকে রক্ত চুষে এসেছ। এই তুমি তুশিই তো। ভূত-টুত না তো?”
অন্য সময় হলে তুশি হাসতে হাসতে গড়িয়ে যেত। কিন্তু আজ চিন্তায় কিচ্ছু পারল না। উলটে কন্ঠ চেপে বলল,
“ ইউশা একবার আমার রুমে আসবে, প্লিজ?”
“ কেন,একা শুতে ইচ্ছে করছে না? তখন আমি কত করে বললাম একসাথে ঘুমাই,শুনলেই না। তাও ভালো জামাটা অন্তত পাল্টেছ। যা ঘাড়ত্যাড়া তুমি,অমন ভেজা জামা নিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়েছিলে। আর মাও তোমার প্রতি কী দূর্বল , তোমাকে কিচ্ছু বলে না। আমি যদি ভেজা অবস্থায় খাটের কোনাতেও বসতাম,আমাকে তক্তা খুলে পেটাতো।”
ইউশা বকবক করতে করতে সামনে সামনে সাথে হাঁটছে। কিন্তু তুশির কানে একটা কথাও গেল না। দুশ্চিন্তায় চুর সে।
ঘরে সার্থকে দেখলে ইউশা যে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে কে জানে!

ইউশা আগে আগে ঘরের ভেতর এলো। ওই চপল- চঞ্চল চোখ ছলকে উঠল অমনি। সার্থ শুয়ে আছে মেঝেতে।
ও আর্তনাদ করে বলল,
“ একী ভা…”
সঙ্গে সঙ্গে মুখ চেপে ধরল তুশি।
“ চ্যাঁচিও না,চ্যাঁচিও না। সবাই শুনে ফেলবে।”
ইউশার মাথা চক্কর দেয়। ঝট করে তুশির দিকে চাইতেই মেয়েটা চোখ নুইয়ে ফেলল। ও হাত সরিয়ে হড়বড় করল,
“ মেজো ভাইয়া এখানে কী করে এলো তুশি? ভাইয়া এখানে কী করছে? এরকম চিৎপটাং হয়ে আছে কেন? তুমি ভাইয়াকে কিছু করোনি তো!”

তুশি পোড়া শ্বাস ফেলল, মনে মনে ভাবল,
“ এত জোরে ঠেলেও যাকে গায়ের ওপর থেকে এক ফোঁটা নড়াতে পারলাম না,তাকে আমি কী করব?”
“ তুশি,প্লিজ কিছু বলো। আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না।”
তুশি মিনমিন করে বলল,
“ আমি জানি না।”
“ তোমার ঘর,তোমার এক্স বর, আর তুমি জানো না?”
তুশি ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
“ ইউশা, ওনাকে ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিতে হবে। আমাকে সাহায্য করবে না?”
ইউশা চোখ কপালে তুলে বলল,
“ আমি আর তুমি!
ইই পাগল হলে? ওই অতগুলো সিঁড়ি দিয়ে আমরা ভাইয়াকে তুলে ওপরে নিয়ে যাব?
ভাইয়ার গায়ে কত ওজন জানো? ভাইয়া ৬.১ তুশি। গায়ে মিনিমাম ৭৮-৮০ কেজি তো হবেই। আমি আর তুমি তো ভাইয়ার পায়ের তলায় ঠাসা পড়ে থাকব।”
তুশি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিড়বিড় করল মনে মনে,
“ তুমি পায়ের ওজন নিয়ে ভাবছো ইউশা? অথচ ওই দৈত্যের মতো শরীরটা একটু আগে আমার ওপর ছিল। আমার রুহুটা যে চ্যাপ্টা হয়ে বেরিয়ে যায়নি সেই অনেক।”
মুখে বলল,
“ প্লিজ ইউশা, এভাবে ফ্লোরে শুয়ে থাকলে ওনার ঠান্ডা লাগবে। আর তাছাড়া, আমার ঘরে কেউ দেখে ফেললে… “

“ আচ্ছা থাক, বুঝেছি। ভাইয়া এখানে কী করে এলো সেসবের জবাব কিন্তু আমি পরে ঠিক নিয়ে নেবো। আপাতত কাজটা সারি,চলো।”
দুজন মিলে সার্থর কাছে এলো। ইউশা হাঁটুমুড়ে বসতেই সবার আগে চোখ গেল সার্থর বুকে। সেই লিপস্টিকের ছাপ দেখে বলল,
“ এমা,এটা তো কিইইসি…”
তুশি কথা কেড়ে নেয়,
“ থাক না এসব, আগে ওনাকে তুলি। তারপর সব বলব।”
ইউশা আর কথা বাড়াল না। সার্থর এক বাহু টেনে ওঠাতে গিয়ে দম বেরিয়ে গেল ওর।
হাল ছেড়ে বলল,
“ আমি পারব না ভাই। আমার গায়ে শক্তি নেই। ভাইয়া রাতে দুটো ডিম খায়,আমি তো ডিমের গন্ধই নিতে পারি না। আচ্ছা মিন্তুকেও ডেকে আনি?”
“ মিন্তু! ও তো বাচ্চা, ও পারবে?”
“ পারবে না কেন? ও একা একটা আস্ত মুরগী খেয়ে ফেলতে পারে। দেখতে ছোটোখাটো হলেও গায়ে খুব জোর। মাঝেমধ্যে আমাকে মারে না? আমি টের পাই।”
“ কিন্তু ও যদি কাউকে বলে দেয়?”
“ মানা করে দেবে। আমি মানা করলে আরো বেশি করে বলে দেবে সবাইকে। আমাদের মাঝে সব সময় ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ চলে তো। তুমি কোরো,তাহলে আর বলবে না।”
তুশি ঘাড় নাড়ল। বলল,
“ তাহলে আমি ডেকে আনি।”

মিন্তু এলো,চোখ ডলতে ডলতে, হাই তুলতে তুলতে। ঘুমে তার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছে। তবে সেই সব উড়ে গেল সার্থর অবস্থা দেখে। হতবাক হয়ে বলল,
“ এইরে, ভাইয়া কি এখানে ফ্লোরিং করেছে নাকি! নাকি ভুলে এই রুমে চলে এলো? নাকি…”
ইউশা কথা টেনে নেয়,
“ আপনাকে এত নাকি নাকি করতে হবে না। যে কাজের জন্যে এসেছেন সেটা করুন,আসুন। তুলুন ভাইয়াকে।”
“ ভাইয়া কি মাল নাকি,যে তুলব?”
ইউশা চোখ রাঙাল,
“ মিন্তুউ,বাজে কথা বললে মেরে গাল ফাটিয়ে দেব কিন্তু।”
তুশি বলল নরম সুরে,
“ মিন্তু ভাইয়া, একটু কাজটা করে দাও না ভাইয়া। তোমাকে আইসক্রিম কিনে খাওয়াব। বাবাকে বলে নতুন সাইকেল কিনে দেয়াব।”
মিন্তু বলল,
“ আরে তুশিপু,সমস্যা নেই। তোমার কাজ তো আমি ফ্রিতে করে দেবো। এসো এখন,সবে মিলে করি কাজ,ভাইয়াকে ধরে তুলি আজ। নাহলে বড়ো মা আবার কখন নিচে আসে বলা যায় না।”


মাথায় বালিশ ঠিক করে দেয়ার সময় সার্থ একটু নড়ল। মাতাল, জড়ানো স্বরে বলল,
“ উম, কে?”
ইউশা ভড়কে বলল,
“ ভাইয়া আমি,আমি ইউশা।”
“ ওহ,হাই ইউশা!”
ইউশা বোকা বনে গেল। পেছন ফিরে বলল,
“ এই তুশি, ভাইয়াতো ড্রাংক মনে হচ্ছে। কী সর্বনাশ,ভাইয়া এসব খায় না কখনো।”
তুশি মুখটা ছোট করে রাখল।
মিন্তু বলল,
“ প্লিজ তাড়াতাড়ি করো,আমার ঘুম পাচ্ছে।”
ইউশা আর কথা বাড়াল না। উঠে আসতেই তুশি বলল,
“ বলছিলাম যে,একবার আব্বাস ভাইকে ডাকলে হতো না?”
মিন্তু বলল,
“ এখন? সে তো এখন ঘুমে কাদা।”
“ আরে না,ঘুমাচ্ছে না। গিয়ে দ্যাখ রেশমীর সাথে ফোনে প্যানপ্যান করছে। কিন্তু তাকে দিয়ে কী কাজ?”
তুশি বলল,
“ ওনাকে চেঞ্জ করাতে বলতাম। পানিতে নেমেছিল যে! ”
“ ওহ, হ্যাঁ বলেই” মিন্তু ছুটে গেল। আব্বাস সত্যিই জেগে ছিল। রুমে আসতেই তাকে বলা হলো সার্থর কাপড় পালটে নতুন কাপড় পরিয়ে দিতে।
এরপর একে একে বেরিয়ে এলো ওরা। তুশি দরজা চাপিয়ে দিতে দিতেও নিষ্পলক চেয়ে রইল বিছানার দিকে। সার্থ ঘুমে জবুথবু। আব্বাস যে ওর শার্টের বোতাম খুলছে,টেরও পায়নি। এই মানুষটা হয়ত কাল সব ভুলে যাবে। ভুলে যাবে আজকের এই ছোঁয়া,এই ঘনিষ্ঠ সময়ের কথা। কিন্তু তুশি? ওর বুকের কোণে পুরোনো ঘা খুচিয়ে যে রক্ত বের করা হলো, ও আবার তা শুকাবে কেমন করে?
জীবনে ভালোবাসার প্রথম পুরুষ,প্রথম এই নারী শরীরে সেই পুরুষের স্পর্শ,এসবই বা ও মুছবে কেমন করে!

তুশির রাতে ঘুম হলো না। এক ফোঁটাও না। বিছানায় ছটফট করে সকাল বানাল। সেই একইরকম ওরনায় গলা প্যাঁচাল,ঠোঁটে লিপস্টিক টানল। কিন্তু জানা নেই,এতে শেষ রক্ষে হবে কিনা। ঘাড়েরটা বাদ গেলেও, খেতে বসলেই তো ঠোঁটের লিপস্টিক সব উঠে যাবে। সবাই নানান প্রশ্ন করবে। তখন কী বলবে ও? কোথাও পরে গিয়ে কাটলে তো আর এমন হয় না। অথচ এই মুসিবত যার জন্যে এলো ওর জীবনে,সে তো দিব্যি আরাম করে ঘুমোচ্ছে। ভাবতেই,তুশি ফের দেওয়াল ঘড়ি দেখল।
এখনো আটটা বাজেনি। উনি নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছেন! একবার দেখবে গিয়ে? এত আকুল হয়ে তো মানুষটাকে দেখার সুযোগ আর পাবে না । কিছুদিন পর সুযোগ তো দূর অধিকারটাই থাকবে না ওর।

ভোরের এক ঝটকা আলো এসে মুখের ওপর পড়তেই সার্থ চোখ কুঁচকে ফেলল। হাত তুলে আড়াআড়ি রাখল,যাতে আলো না আসে। কিন্তু নাহ,হলো না। খোলা জানলা হতে হুহু করা ঠান্ডার সঙ্গে ওই আলোর আনাগোনা বাড়ল আরো। সার্থ বিরক্ত হয়ে চোখ মেলে চাইল। চ সূচক শব্দ করে বসল উঠে। সঙ্গে সঙ্গে মাথার ভেতর দুম করে বাড়ি লাগল একটা। এত ভারি,এত ব্যথা, মনে হলো কেউ পেছনে পাহাড় ঝুলিয়ে দিয়েছে। সার্থ ফোস করে শ্বাস ফেলল। ভাবল, মাইগ্রেন। তবে ওই নিস্পন্দ দৃষ্টি সচেতন হলো ঘরে চোখ পড়তেই।
তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াল সে। এ কী, ও না কাল পার্টিতে ছিল? গায়ের জামাকাপড়ও তো পালটানো। কখন এলো বাড়িতে? কীভাবে এলো? সার্থর কিচ্ছু মনে পড়ল না। কিচ্ছু না। শুধু মাথায় এলো ও ড্রিংক করতে বসেছে। তারপর কী হয়েছিল?
থুত্নি ডলে ডলে ভাবার মাঝেই হঠাৎ খেয়াল পড়ল দরজার নিচে। একটা কালো ছায়া নড়তে দেখা যাচ্ছে। সার্থ কপাল কুঁচকে ফেলল। ঠোঁট টিপে সরু চোখে চেয়ে রইল সে-পথে।

তুশি সন্তর্পণে একবার আশেপাশে তাকাল। কেউ তো ওঠেনি এখনো। শুধু মা আর বড়ো মা নিচে আছেন। খুব সাবধানে আস্তে করে চাপানো দরজাটা ঠেলল সে। এমনিতে প্রতিদিন এই দোর আটকানো থাকে। কাল তো হুশে ছিল না,কে আটকাবে?

তুশি দরজা ঠেলল চুপটি করে। যাতে একটুও শব্দ না হয়। এদিক-ওদিক চেয়ে যখনই পর্দা সরাতে যাবে খপ করে হাতটা চেপে ঘরের ভেতর টেনে নিলো সার্থ। পিলে সুদ্ধ চমকে গেল তুশির। টাল সামলাতে না পেরে একেবারে উড়ে বেড়ানো বালুর মতো ফ্লোরে থুবড়ে পড়ল। গলায় প্যাঁচানো ওরনা নড়বড়ে হয়ে সরে গেল একটু। হকচকিয়ে ফিরতেই,
সার্থ বিরক্ত চোখ বলল,
“ এতটাও জোরে টানিনি যে একবারে মেঝেতে ছিটকে গিয়েছো।”
তুশির সময় লাগল সহজ হতে। দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে চোখটা নামাল সে। তক্ষুনি
সার্থ এগিয়ে এলো৷ এক হাঁটু ভাঁজ করে বসল ওর মুখোমুখি। তড়িৎ আইঢাই করে গলায় চিবুক ঢুকিয়ে নিলো মেয়েটা। সার্থ কিছু বলতে চাইল,হুট করে চোখ পড়ল ওর ঘাড়ের ওপর। সাবলীল চাউনি দপ করে জ্বলে উঠল অমনি। তড়িঘড়ি করে ওর ঘাড় থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিলো কাপড়টা। আঁতকে চাইল তুশি। ওরনা ঠিক করতে গেলে সার্থ হাত চেপে ধরল। স্তম্ভিত বনে ওই চিহ্নের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তুশি খুব নার্ভাস হয়ে পড়ল। ভীষণ লজ্জায় কাঁপছে তার বুক। উনি নিশ্চয়ই সব বুঝে ফেললেন। ইস,কী বলবেন এখন? নিশ্চয়ই খুব লজ্জা দেবেন। এবার তুশি ঐ চোখে চোখ রাখবে কী করে?
অথচ সার্থ দুম করে বলে বসল,
“ কাল তুমি অয়নের সাথে একা কোথাও ছিলে?”
তুশি থমকে যায়। নিস্তব্ধের ন্যায় মুখ তুলে তাকায় সবেগে। সার্থর চোখে বারুদ জ্বলছে। দুধারের চিবুক ফুটিয়ে বলল,
“কোথায় ছিলে তোমরা? কতক্ষণ ছিলে?”
ইঙ্গিত বুঝে তুশির গা গুলিয়ে উঠল। ফের প্রচণ্ড ক্রোধে ধরে গেল মাথাটা। সহসা ঘাড় থেকে ঝারা মেরে সার্থর হাত সরিয়ে দিলো সে। রেগেমেগে বলল,
“ আপনি কোনোদিনও ঠিক হবেন না!”
তুশি তেজি পায়ে বেরিয়ে যেতে নেয়,দরজা অবধি আসে। সার্থ হনহন করে এসেই পেছন থেকে টেনে ধরল ওকে। আক্রোশে সেই হাত উঠে গেল বাহুতে। শক্ত করে চেপে ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
“ পালিয়ে যাচ্ছ?
কেন! যা করেছ সেটা নিয়ে চোখ মেলানোর সাহস নেই? অয়ন তোমাকে ছুঁয়েছে,তুশি? কেন ছোঁবে, হাউ ডেয়ার হি! ছুঁতে হলে তোমাকে শুধু আমি…”
ক্রুদ্ধ ছেলেটার হঠাৎ নজর পড়ল তুশির পেছনে। গোল গোল চোখে চেয়ে আছে মিন্তু। দু একবার পাতা ঝাপটে বলল,
“ তোমরা কি ঝগড়া করছো? করো করো, ঝগড়া দেখতে ভালোই লাগে।”
সার্থ থেমে যায়, তুশিকে ছেড়ে দেয় অমনি। অথচ এক দণ্ডও না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। সার্থ রুষ্ট মেজাজে চাইল মিন্তুর দিকে। মৃদু ধমকে বলল,
“ কী চাই তোর!”
ছেলেটা গুটিয়ে গেল,
“ বলব? দেখে তো মনে হচ্ছে খুব রেগে আছ।”
“ যা বলার বলে ভাগ এখান থেকে।”
মিন্তু হাত কচলে কচলে বলল,
“ আসলে আমি ভাবলাম তোমার থেকে একটু বখশিশ চাইব। আমার হাতটা এখন ফাঁকা তো। পাপা বলেছে এ মাসে আর এক্সট্রা কোনো পকেটমানি দেবে না।”
সার্থ শ্বাস ঝেড়ে রাগ কমায়। টেবিলের ড্রয়ার থেকে ওয়ালেট বের করতে করতে বলে,
“ বখশিশ কীসের?”
মিন্তু একটু সাহস পেলো। উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ কেন, কালকের। কাল যে তুমি কী খেয়েছ ভাইয়া আমি কিন্তু জানি। দিদুন, বড়ো মা, বাবা সবাই যদি জেনে যায় খুব রাগ করবে না? অবশ্য আমি কাউকে বলব না। তুশিপু মানা করেছে তো।”
সার্থ ঝট করে কপাল কুঁচকে চাইল,
“ মানে?”
“ কেন,তুমি কাল ড্রিংক করেছিলে না?”
এইবার আরো আশ্চর্য হয়ে গেল সে,
“ তুই জানলি কী করে?”
“ ওমা আমি, ইউশা আর তুশিপুই তো তোমাকে স্টোর রুম থেকে এই রুমে রেখে গেলাম। কী যে কষ্ট হয়েছিল,ভাইয়া তুমি কত ভারি!”

সার্থ দু সেকেন্ড বোকা চোখে চেয়ে বলল,
“ আমি কাল তুশির ঘরে ছিলাম?”
“ হ্যাঁ। একেবারে ফ্লোরে ঘুমিয়ে গেছিলে। ভুল করে চলে গেছিলে তাই না ভাইয়া? নিজের ঘর ভেবে?”
সার্থর মাথায় বাজ পড়ল। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ভেতরটা অনুতাপে হাহুতাশ করে উঠল এবার। চোখ খিচে চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ শীট! শীট! শীট!”
মিন্তু ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল,
“ কী হলো ভাইয়া?”
সার্থ জবাব দেয় না। মিন্তুকে রেখেই ঝড়ের বেগে বাইরে ছুটে আসে। সিঁড়ি থেকে নামতেই তনিমা সামনে পড়লেন,বলতে গেলেন –
“ সার্থ তুই কাল আইরিনকে পানি…”
ছেলেটা ব্যস্ত স্বরে বলে দিলো,
“ পরে কথা বলব, মা।”

তার ওই শশকের মতো বেগ স্টোর রুমের সামনে এসে থামল। ভেতর থেকে রেহণূমার কথার আওয়াজ আসছে। খুব রেগে রেগে বলছেন,
“ এটা কেমন ফাজলামো, তুশি? কেন যাবি না তুই? ছেলেটা কত আশা করল একটু ঘুরবে তোকে নিয়ে।”
“ এই সকাল বেলা কীসের ঘুরাঘুরি মা?”
“ ওমা অতদূরের রাস্তা,আবার উত্তরায় যা জ্যাম। যেতে আসতেও তো সময় লাগবে। নাস্তাটা করে বেরিয়ে গেলে কী এমন হয় তোর? বাড়িতে বসে বসে করবিই বা কী?”
“ আমার ভালো লাগছে না!”
“ তুশি এখন আর এসব বললে হবে না। বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। ছেলেটা চাইতেই পারে তার হবু স্ত্রী নিয়ে একটু-আধটু ঘুরে বেড়াবে। এসব ভালো লাগা, না লাগা বিয়েতে মত দেবার আগে ভাবিসনি কেন?এই জামা রইল,পরে তৈরি হ। আমি যেন আর কোনো মানা না শুনি। কাল থেকে অনেক জেদ করেছো। সব সময় কিন্তু প্রশ্রয় দেবো না। একদম বাড়িতে অশান্তি তৈরি করবে না, ভাইজান খুব কষ্ট পাবেন।”

সার্থর পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। নির্ঘাত অয়নের সাথে বের হবার কথা বলছে! ও ফিরে এলো, তবে নিজের রুমে গেল না। অয়নের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, একটু পর্দা সরিয়ে দেখল ভেতরে। অয়ন রেডি হচ্ছে। শার্টে পারফিউম মেখেছে, ঘড়ি পরছে হাতে।
সার্থ সরে আসে, ঠোঁটে কামড়ায়। ঘাড় ডলে ডলে ভাবে কিছু একটা। মিন্তু তক্ষুনি এসে দাঁড়াল সামনে। মন খারাপ করে বলল,
“ ভাইয়া, দেবে না?”
সার্থর গোছানো ভ্রু ছড়িয়ে গেল অমনি। এক পল চারপাশ দেখল সাবধানি চোখে। কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“ দেবো,আগে আমার একটা কাজ করে দে,পাক্কা দু হাজার টাকা পাবি!”


ইউশার এখনো ঘুম ভাঙেনি। সে জানেও না,হুট করে অয়নের ইচ্ছে হলো তুশিকে নিয়ে শহর চক্কর দেয়ার। মায়ের কথায়
তুশি তৈরি হলো। একটা সাদা চুরিদার পরল। ওরনা প্যাঁচাল গলায়। চুল গুলো পনিটেইল করে আটকে, ফেলে রাখল সেই দাগ থাকা কাঁধের পাশটাতে। ঠোঁট ভরতি করল লিপস্টিক দিয়ে। তবে গো ধরেছে নাস্তা করবে না। রেহণূমাও কিছু বললেন না এ নিয়ে। বাইরে যাচ্ছে,সেখানেই খাবে না-হয়। অয়ন রেডি-শেডি হয়ে সোফায় বসেছিল। মেয়েটা গোমড়ামুখে হাজির হতেই,উঠে দাঁড়াল সে। মুগ্ধ চোখে বলল,
“ মাশ আল্লাহ! এভাবে চুল বাঁধলে তো তোমায় ভীষণ সুন্দর লাগে!”
সার্থ সিঁড়ির রেলিং- এ দুহাতের ভর দিয়ে নিচে চেয়েছিল। খুব ঠান্ডা মনোযোগে চেয়ে চেয়ে দেখছিল ওদের। অয়ন কপালের থেকে চুল সরিয়ে দিতে যায়,তুশি দেয় না। নিজেই সেই চুল কানে গুঁজে শুধায়,
“ কোথায় যাবেন?”
“ তুমি যেখানে যেতে চাও!”
তুশি শান্ত চোখে হাসল,
“ আমি তো ঘরে যেতে চাই!”
অয়ন নিজেও হেসে ফেলল।
“ সব সময় মজা করো তুশি! চলো…”
রাস্তা দেখাতেই তুশি সামনে সামনে হেঁটে গেল। লনে আগেভাগেই গাড়ি বের করে রাখা। তুশি পেছনে বসতে গেলেই অয়ন বলল,
“ আজ অন্তত সামনে বসো,প্লিজ!”
অনুনয় শুনে তুশি মানা করল না। এসে বসল চুপচাপ। তুরন্ত বিজয়ী হাসল অয়ন। দরজা খুলল গাড়িতে উঠবে বলে,আচমকা ফোন বাজল পকেটে। বের করেই দেখল দিদুনের কল। অয়ন কপাল কুঁচকে একবার বাড়ির দিকে তাকাল। দিদুন ফোন করছে কেন?
রিসিভ করে কানে ধরতেই মিন্তু বলল,
“ ভাইয়া, একটু তাড়াতাড়ি দিদুনের রুমে এসো। তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি।”
তারপর খট করে লাইন কেটে দিলো সে।
অয়নের ভয় হলো। দিদুনের আবার কী হয়েছে? প্রেসার ফল করেছে কি!
“ তুশি তুমি বসো,আমি এক্ষুনি আসছি।”
কোনোরকম বলেই ছুটে গেল ছেলেটা। তুশি কিছু বলতেও পারল না। ডাকার আগেই,
হাওয়ার গতিতে অয়ন বাড়ির ভেতর চলে গিয়েছে। মেয়েটা বিভ্রান্তি নিয়ে চেয়ে রইল সেদিকে, তক্ষুনি পাশের দরজা খোলার শব্দ হয়। কেউ একজন খুব তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠে ধ্রিম করে দোর চাপাল। হঠাৎ শব্দে চমকে পাশ ফিরল তুশি। ড্রাইভিং-এ সার্থকে দেখেই বিহ্বলতায় চোখ বেরিয়ে এলো। পিঠের হাড় শক্ত হয়ে লেগে গেল সীটে । সেই ফ্যালফ্যালে চাউনিতে চেয়ে নিঃশব্দে বাঁকা হাসল সার্থ। ডান চোখটা টিপে ফিসফিসিয়ে বলল,
“ হাই বেইব!”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply