কাছেআসারমৌসুম”
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
[ ৫০]
“ রিডিকিউলাস সার্থ, যাস্ট রিডিকিউলাস। এরকম একটা বোকামো তুই কীভাবে করলি? তোকে আমি হাতেনাতে সবটা বুঝিয়ে দিলাম,আর তুই সেটা এক ঝটকায় শেষ করে দিলি ভাই! হাউ?”
সার্থ চুপ করে আরেক দিক চেয়ে রইল। হাতে সিগারেট। চোখদুটো লাল। গাড়ির জানলা মাড়িয়ে উষ্ণ, নিশ্চল চাউনিরা পিচের রাস্তায় আটকেছে। এই মুহুর্তে গাড়িতে বসে দুজন। জামিলেরই গাড়ি। ইঞ্জিন বন্ধ করে রাস্তার এক সাইড করে থামানো। পাশেই ছেলেটা অর্নগল হাহুতাশ করছিল। সার্থ নজর ফিরিয়ে হাতের সিগারেটে ফেলল এবার। জ্বলন্ত পোড়া মাথাটা আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নিস্পৃহ বনে রইল। জামিল অতীষ্ঠ হয়ে বলল,
“ কী? চুপ করে আছিস কেন? আমার দিকে তাকা। উত্তর দে, এইভাবে সব ঘেটে দিয়ে তুই কী প্রমাণ করলি? আর এখন,এখন স্মোক করেই বা কী বোঝাতে চাইছিস?”
সার্থ পাশ ফিরে তাকাল ,
“ কী বোঝাব?”
“ আমি কিন্তু বোকা নই। তোর বন্ধু আমি। আমি জানি খুব প্যারা না খেলে তুই সিগারেট খাস না। কিন্তু এখন তোর প্যারার কারণ কী? যেচে পুরো ব্যাপারটা এলোমেলো করেছিস,এখন তো তোর আনন্দে ধেইধেই করে নাচার কথা। ”
সার্থ ভারি স্বরে বলল,
“ তোকে আমি এইজন্য ডাকিনি জামিল। আমাকে ব্লেইম দিবি না।”
জামিল অবাক হয়ে বলল,
“ তোকে ব্লেইম দেব না, তো কাকে দেব? দেশের সরকার কে?”
সার্থ চটে বলল,
“ কেন,কী করেছি আমি? এখানে আমার অন্যায়টা কোথায়? আমি তো ভুল কিছু বলিনি। বরং ঐ আমাকে যা ইচ্ছে তাই বলে অপমান করেছে। মুখের ওপর অস্বীকার করেছে ও আমাকে ভালোবাসে না।”
জামিল পালটা তেতে বলল,
“ তো আর কী করবে? থালাবাসন সাজিয়ে রান্নাবাটি খেলবে তোর সাথে?
অপমান তো তুই-ই আগে মেয়েটাকে করেছিস। তুই আসলে কী আশা করেছিলি সার্থ,এত আজেবাজে কথা শোনানোর পরেও, ও তোকে যারা যারা টাচ মি টাচ মি গান গেয়ে শোনাবে?”
সার্থ ধমকে বলল,
“ চুপ!”
“ পারব না। এসব চোখ রাঙানো টাঙানো গিয়ে তোর আসামীদের দেখাবি। শালার ইউনিভার্সিটিতে তোর বুদ্ধির তারিফ করতাম সবাই। কেউ কোনো ক্যাঁচালে পড়লে তোর থেকে আইডিয়া ধার নিতাম। আর এখন! এখন বয়স বাড়ার সাথে সাথে তুই তো একটা আস্ত পাঠা হয়ে যাচ্ছিস।”
সার্থ গর্জে বলল,
“ জামিল! আর একটাও উল্টোপাল্টা কথা বললে জিভ ছিড়ে ফেলব। তোকে আমি কথাগুলো এইজন্যে বলিনি। বুঝতেই যখন পারছিস সব ঘেটে গেছে,তাহলে এখন সলিউশান বল।”
জামিল ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ দ্যাখ দোস্ত,ভুল কিন্তু আগে তুই করেছিস। ইভেন তোর কোনো দরকারও ছিল না তোর কাজিনকে বিয়ে করতে হ্যাঁ বলে দেয়ার। এখন যা হয়েছে তাতো আর বদলানো যাবে না। ওসব ভুলে গিয়ে বাড়ি যা,আর সুন্দর করে তুশিকে কাছে ডেকে একটা সরি বলে দে।”
হেসে ফেলল সার্থ। মহাভারত অশুদ্ধ হওয়া হাসি। দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ সরি? আমি বলব?
ফাক দ্যোস লাইন। আমি ভুল ছিলাম না,ও স্বীকার করেছে ও অয়নকে পছন্দ করে।”
“ আর তুইও বিশ্বাস করে নিয়েছিস! বাহ, তোর বুদ্ধির এত দৌড় ভাই?”
“ কী বলতে চাইছিস?”
জামিল মাথা ঠান্ডা করে বলল,
“ দ্যাখ সার্থ,মেয়ে মানুষ এরকমই হয়। ওদের হ্যাঁ মানে না, আর জানি না মানে ওরা সব জানে।
আর এটাত পরিষ্কার যে মেয়েটা রাগের মাথায় তোকে ওসব কথা বলেছে।”
“ ওর রাগ রাগ,আর আমার রাগ রাগ নয়? আমি বিয়েতে হ্যাঁ বলেছি বলে,ওকেও হ্যাঁ বলতে হবে? কম্পিটিশান হচ্ছে এটা? আমি ওর কম্পিটিটর?”
সার্থ চ্যাঁচাতেই জামিল দুকান চেপে ধরল।
“ আস্তে ভাই আস্তে,কান ফেটে যাবে।”
সার্থ ফোসফোস করে শ্বাস ফেলল। জামিল বলল,
“ তাহলে তুই সরি বলবি না?”
ওর কণ্ঠে অটল জেদ,
“ না।”
“ একটা কথা বলি?”
সার্থ সামনের রাস্তায় চেয়ে রোবটের মতো আওড়াল,
“ জামিল তুই আমার বন্ধু। তুই যা বলবি আমি শুনব। কিন্তু করব সেটাই, যেটা আমার ইচ্ছে হবে।”
জামিল হতাশ,আহত। বলল নিরাশ স্বরে,
“ থাক, তাহলে চুপ করেই থাকি।”
সার্থ দরজা খুলে নেমে গেল হঠাৎ। ও ডেকে বলল,
“ আরে কই যাস? পৌঁছে দিই।”
“ নিজের কাজে যা।”
সার্থ এগিয়ে যায়। জামিল চিল্লিয়ে বলল,
“ দেশে মেয়ে দেখা ছাড়া আমার তো আর কোনো কাজ নেই। আরে সার্থ,শোন পাঠা, সরি শোন দোস্ত… শালার এত মেজাজ! এত ইগো! কোনদিন এই ইগোর চাপে পড়ে মরবি নিজেও বুঝবি না ব্যাটা।”
দুপুরের প্রখর রোদটা মাথায় নিয়ে ইউশা পার্কের ভেতর ঢুকল। বিধ্বস্ত নয়ন মেলে এক পল তাকাল চারিপাশ। অদূরে ঠিক নাক বরাবর সোজা একটা বেঞ্চ পাতানো। পুরোনো খুব,জায়গায় জায়গায় সিমেন্ট খসে গেছে। শুকনো পাতার মড়মড়ে শব্দটা পায়ে মাড়িয়ে টলটে টলতে সেখানে এসে বসল ইউশা।
বড্ড গরম পড়েছে আজ। সূর্যের তাপে মাটির বুক পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। অথচ ইউশার দুটো মেদূর গাল ছুঁয়ে শ্রাবণের ঘন বর্ষা নামল। চিবুক নুইয়ে ঝরঝর করে কেঁদে উঠল সে।
কখনো অয়নের হাসিমুখ ভেবে বুক মুচড়ে ওঠে। কখনো তুশির অসহায় আবেদন মনে করে করে অনুতাপে ইউশা ছারখার হয়ে যায়। যন্ত্রণার বিষে কামড়ে ধরে সারা শরীর। ইউশা আকাশের দিকে মুখ তুলে কেঁদে কেঁদে বলল,
“ আম সরি তুশি, আম সরি। আমি তোমাকে বাধ্য করছি অয়ন ভাইকে বিয়ে করার জন্যে। জোর করছি অন্যের হতে। তুমি আমায় ভুল বুঝো না তুশি। আমাকে খারাপ ভেবো না। আমি যা করেছি শুধু তোমার ভালোর জন্যে। মেজো ভাইয়া তোমাকে কোনোদিন বুঝবে না,কিন্তু আমি জানি অয়ন ভাই তোমাকে মাথার তাজ বানিয়ে রাখবেন। যে মানুষ তোমার পরিচয় না জেনেই তোমাকে ভালোবেসেছিল, তার ভালোবাসা কখনো ভুল হতেই পারে না। এই ভালোবাসা তো অন্য কারো থেকে তুমি পাবে না তুশি। কারো কাছে অতটা যত্নেও থাকবে না।
তুশি, তোমাকে আমি পৃথিবীর সবার চেয়ে খুশি দেখতে চাই। তার জন্য যদি আমাকে তোমার চোখে খারাপ হতে হয়, যদি নিজের ভালোবাসা,ভালো থাকাকে বিসর্জন দিতে হয়,তাহলে তাই সই। কিন্তু তাও তুমি সুখে থাকো তুশি। অয়ন ভাইয়ের খুব আদরের বউ হও তুমি!”
জায়গাটা সুনসান,নীরব। চারদিক গাছ,আর লতাপাতায় ভরা। এমনিও লোকজন কম আসে তার ওপর এই ভরদুপুরে ডালে একটা কাকও বসেনি। ইউশা বসে বসে মন ভরে কাঁদল। এই জন্যেই তো বাড়ি থেকে মিথ্যে বলে এসেছে এখানে। ঘরে এত আহাজারি করে কাঁদা যায় না। দেওয়ালগুলো হাসে। কথা শোনায়। ওরাই বা আর কত চোখের জলের সাক্ষি বয়ে বেড়াবে?
ইউশা টলমলে চোখ ঘুরিয়ে দুপাশের গাছগুলোকে দেখল। এক ফোঁটা বাতাসও নেই। কেমন পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে ওরা। আচ্ছা, ওরা আবার হাসছে না তো ওকে নিয়ে! এই কান্নাকাটি দেখে বিরক্ত হচ্ছে নাতো!
ইউশা কব্জি উলটে স্যাঁতসেঁতে চোখদুটো মুছল। ব্যাগ খুলে একটা র্যাপিং করা বাক্স তুলে আনল হাতে। এর ভেতর একটা কালো শার্ট,আর একটা স্থেটোস্কোপ আছে। অয়নের আগামী জন্মদিনের জন্যে একটু একটু করে টাকা জমিয়ে কিনেছিল ইউশা। কালো শার্টে অয়ন ভাইকে সবথেকে বেশি সুন্দর লাগে। আর যখন গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে হাঁটেন ইউশা তখন চোখই সরাতে পারে না।
কিন্তু এখন আর এসবের কোনো দরকার হবে না। ইউশা তো আর প্রেম প্রেম নজরে দেখবে না ওনাকে। অয়ন ভাই এখন আগাগোড়া তুশির!
ইউশা বাক্সটার গায়ে হাত বোলাল একবার। পরপর দুপা উঠে এসে একটা ছোট্টো ডোবার ভেতর ছুড়ে ফেলে দিলো।
চোখের জলে নিঃশ্বাস মিশিয়ে বলল,
“ এই বাক্সের সাথে সাথে আমার অনুভূতিও আজ আমি ডুবিয়ে দিলাম অয়ন ভাই। সাথে তোমার জন্যে আমার সব অনুভূতি আমি দাফন করে দিলাম।
পৃথিবীর এক কোনে থাকা ইউশা নামের একটা মেয়ে যে তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো তা তুমি কোনোদিন জানবে না।”
ইউশা কিছুক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। মানস্পটে অতীতের স্মৃতি নিয়ে দিশাহারা পথিকের মতো ছটফট করে খুব। সেই যে ওর জ্বরের দিন অয়ন ভাই মাথার কাছে বসেছিলেন,ওর পরীক্ষার হলে কেমন বুকে মিশিয়ে মিশিয়ে নিয়ে গেলেন ওকে, সেসব ইউশা কেমন করে ভুলবে?
চাইলেই কি সব কিছু ভুলে যাওয়া সম্ভব! তাই অয়ন ভাইকেও ও ভুলতে পারবে না। কক্ষনো না। অয়ন ভাই থাকবেন, যতদিন ও বাঁচবে ততদিন ওর হৃদয়ের খুব গভীরে থাকবেন তিনি। যার হদিস কেউ হৃদপিণ্ড কেটেকুটে ফেললেও কোনোদিন পাবে না।
ইউশা ফের চোখ মুছে বড়ো করে শ্বাস নিয়ে মাথা তুলল। চমকে,থমকে শক্ত হয়ে গেল অমনি। সানগ্লাস পরা এক পুরুষ, গায়ে পুলিশের ইউনিফর্ম জড়িয়ে খুব দ্রুত হেঁটে আসছে। মেয়েটা শিরদাঁড়া সোজা করে ফেলল। এই রে,মেজো ভাইয়া এখানে কেন! সার্থ এসে দাঁড়াল সামনে। কপালে গাঢ় ভাঁজ নিয়ে বলল,
“ তুই এখানে কী করছিস?”
ইউশার গ্রহ নক্ষত্র ভয়ে জট বেঁধে গেল। তুতলে বলল,
“ আমি মানে আমি…”
সার্থ সন্দেহী চোখে চেয়ে থাকে। ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকায়। ইউশা মিনমিন করে বলল,
“ আমি একাই এসেছি ভাইয়া। কোনো ছেলের সাথে আসিনি।”
সার্থ তপ্ত কণ্ঠে বলল,
“ আমি বলেছি সে কথা?”
ইউশা দুপাশে মাথা নাড়ল। বোঝাল, না।
“ তোর এখানে কী কাজ?”
ও জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ ক্লাসটা হঠাৎ ক্যান্সেল হয়ে গেছিল। এত রোদ দেখে ভাবলাম একটু এখানে এসে বসি।”
তারপর ভয়ে ভয়ে তাকাল ওর পানে। সার্থর চিবুক শক্ত। ইউশা উদ্বেগ নিয়ে বলল
“ সত্যি বলছি।”
“ সত্যি না মিথ্যে, সেটা বাড়ি গিয়ে দেখছি। আপাতত এখান থেকে যা। জায়গাটা ভালো নয়।”
ইউশা ঘাড় কাত করল।
“ তুমি এখানে কেন ভাইয়া? জানলে কী করে আমার কথা?”
“ শরীফ দেখেছে। পাশের রোডে সম্মেলন আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জামশেদ তালুকদার আসছেন। রাস্তায় জ্যাম বাড়বে,তুই ব্যাগ নিয়ে আয়।”
“ আচ্ছা।”
“ দাঁড়া। গেইটের বাইরে অপেক্ষা কর। একা যেতে হবে না, আমি জিপ পাঠাচ্ছি।”
ইউশা মাথা নাড়ল।
বেঞ্চের ওপর থেকে ব্যাগটা তুলতে তুলতে ফিরল হঠাৎ। কণ্ঠে উৎকণ্ঠা অথচ খুব বিনয় নিয়ে শুধাল,
“ ভাইয়া,তুমি কি সত্যিই আইরিন আপুকে বিয়ে করবে?”
সার্থ এক পা বাড়িয়েছিল যেতে। থমকে দাঁড়াল অমনি। গম্ভীর গলায় বলল,
“ তা দিয়ে তোর কোনো দরকার?”
“ তুশি তোমা…
সার্থ মাঝপথেই কেমন হুঙ্কার ছেড়ে বলল,
“ ইউশা তোকে আমি যেতে বলেছি।”
ইউশার খুব রাগ হলো এবার।
তার বোনের জীবন নিয়ে ছেলে খেলা করছে, আবার তাকেও ধমকাচ্ছে। চোখেমুখে একটু মায়া,একটু অনুশোচনাও নেই। আসলে একদম ঠিক নামই দিয়েছে তুশি,ভাইয়া সত্যিই একটা বিটকেল….
*** নিস্পন্দ,ফাঁকা রাত। বাঁকা চাঁদটাও কেমন মলিন ভাবে শুয়ে আছে আকাশে। ছাদজুড়ে হুহু বেগে ছুটতে থাকা বাতাসের ঝাপটায় তুশির ওরনার মাথা উড়ছিল। সেপ্টেম্বরে সারাদিন গরম পড়লেও রাতে টুকটাক শীত পড়ে। তুশি ছাদে দাঁড়িয়ে আছে অনেকটা সময়। চিলেকোঠার বাল্ব ছাড়া এখানে কোথাও আর কোনো আলো নেই। বসার ঘরে বড়োদের আড্ডার আসর বসেছে । হাসিঠাট্টার আওয়াজ এখানে দাঁড়িয়েও শুনছে সে। কিন্তু সেসবে তুশির আগ্রহের ছিঁটেফোঁটাও নেই। ও বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ভিন্ন অনুভূতি শুষে নিতে ব্যস্ত।
এই ছাদ তার কাছে খুব প্রিয় একটা জায়গা। পাঁচিল ছোঁয়া শরীরটা ঘুরিয়ে একপল ঐ দোলনার দিকে চাইল সে। এই দোলনায় বসে প্রথম সার্থ ওর সাথে সুন্দর করে কথা বলেছিল। একটা গোটা রাত কেমন চোখের নিমিষে কেটে গেল তাতে। আর তারপর, তারপর এখানে বসেই তো মানুষটা প্রথম ছুঁয়েছিল ওকে। পেশিবহুল হাত ছড়িয়ে কেমন আষ্ঠেপৃষ্ঠে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল!
সেই দিন আর কোনোদিন আসবে না। তুশির চোখ জ্বলে ওঠে। অশ্রুতে কার্নিশ ডুবে যায়। ঠোঁট ভেঙে কঁদে ফেলে সহসা।
আচমকা টের পেলো কেউ একজন এদিকেই আসছে। জুতো নিয়ে সদর্পে হেঁটে আসার শব্দ স্পষ্ট পাচ্ছে তুশি। অমনি তাড়াহুড়ো করে চোখ মুছল সে। হুট করে চেহারা টানটান করে ফেলল। এক আশার প্রদীপ ঝলকে দিলো বুকের ধার। বিটকেল!
চকিতে পিছু ঘুরে চাইল তুশি। প্রত্যাশায় ঝলমলানো দৃষ্টিরা মুষড়ে পড়ল সহসা। হাস্যোজ্জ্বল মুখে এসে থামল অয়ন।
ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ কী ম্যাডাম,এত রাতে ছাদে কী করছেন?”
অয়নের কথার সুর বদলে গেছে।
তুশি মাথা নোয়াল। মনের শত আপত্তি,অস্বস্তি চেপে জানাল,
“ এমনিই দাঁড়িয়েছিলাম। আপনি এখানে?”
“ তোমাকে না দেখে খুঁজছিলাম। পরে তোমার দাদি বললেন তুমি ছাদে।”
খুব নিসংকোচে বলল অয়ন। আজ কথায় সামান্য তম রাখ-ঢাক নেই।
তুশি কিছু বলল না। ও নিজেই শুধায়,
“ নিচে সবাই কী নিয়ে আলোচনা করছে জানো?”
“ না।”
“ আমাদের বিয়ের তারিখ নিয়ে।”
তুশি অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে চোখ বুজে শ্বাস ফেলল। অয়ন এসে পাশে দাঁড়াল তখনই। বলে গেল নিজের মতোন,
“ সবাই ভাইয়া, আইরিন আর আমাদের বিয়ে একই দিনে ঠিক করতে চাইছে। ফুপিরা সেজন্যে কাল ওনাদের বাড়ি ফিরে যাবে। এ সপ্তাহেই সেখানে একটা গেট টুগেদার পার্টি রাখবেন শুনেছি। পার্টিতে ভাইয়া আর আইরিনের বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হবে।”
তুশির বুকের পাঁজর টনটন করে উঠল। ছোটো করে বলল,
“ ওহ।”
অয়ন ধীর স্বরে ডাকল
“ তুশি?”
মেয়েটা না তাকিয়েই জবাব দেয়,
“ বলুন।”
“ তুমি খুশিতো?”
তুশি মলিন হেসে বলল,
“ আপনার কী মনে হয়!”
পাঁচিলের ওপর তুশির হাত রাখা ছিল। আচমকা সেটা খপ করে মুঠোয় ধরল অয়ন। তুশি চমকে গেল। তাকাল হতবুদ্ধি চোখে। অয়ন উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ তুশি আমি জানি না ইউশা তোমাকে কী বলেছে,বা সবটা ও তোমাকে বোঝাতে পেরেছে কিনা! কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কিন্তু ভাইয়ার সাথে আগে কথাবার্তা বলেই নিয়েছিলাম। আমি ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,ও তোমাকে নিয়ে সিরিয়াস কিনা।
ও যখন বলল,ওর মনে তোমাকে নিয়ে কিচ্ছু নেই তখনই আমি এগিয়েছি। আর সেই এগিয়ে যাওয়া অনুভূতিতে আমি আর রাশ টানতে পারিনি। আমি সত্যিই তোমাকে খুব পছন্দ করি তুশি। আই ট্রুলি লাভ ইউ উইথ অল মাই হার্ট!”
তুশি স্তব্ধ চোখে চেয়ে রইল কিছু পল। টের পেলো সমস্ত শরীর ঘেন্নায় অস্বস্তিতে রিরি করে উঠছে।
যাকে ও শুধুমাত্র নিজের বোনের জন্যে ভেবেছে, বোনের ভালোবাসার মানুষ হিসেবে দেখেছে তার মুখে এসব কথায় কেমন জঘন্য লাগল সব কিছু। তুশি হাতটা মুচড়াল। শক্ত কণ্ঠে বলল,
“ হাত ছাড়ুন অয়ন ভাই।”
“ কেন তুশি,এখন তো আমাদের বিয়ে হচ্ছে। উড বি হয়ে তোমার হাত ধরতে পারি না আমি?”
“ যখন বিয়ে হবে, তখন দেখা যাবে। তার আগে এসব আমার পছন্দ নয়। ছাড়ুন।”
অয়ন ছাড়ল না। বলল,
“ আগে বলো,আমাকে নিয়ে তোমার অনুভূতি কী? তারপর!”
সার্থ হাজির হলো তখনই। থানা থেকে ফিরেছে অনেকক্ষণ। পরনে টিশার্ট,কালো ট্রাউজার। হাতে কফি মগ নিয়ে যখনই ছাদের চৌকাঠে এলো,সামনের দৃশ্যে পা জোড়া থমকে গেল সহসা। তুশির হাত অয়নের মুঠোয়। একেবারে ছেলেটার বুকের কাছে নিয়ে ধরা! কয়েক পল
স্তম্ভিত চোখে চেয়ে রইল সে। পরপরই ভীষণ ক্রোধে শরীরের রক্ত সুদ্ধ টগবগ করে উঠল। ফুটন্ত দাবানলের আঁচে যেন ছিঁড়ে গেল মাথাটা।
তুরন্ত কফি মগটা ধরেই সজোরে এক আছাড় মারল সে।
ছাদের শক্ত মেঝেতে পড়া মাত্র একটা বিকট শব্দ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। আঁতকে ফিরল ওরা দুজন। অয়ন সঙ্গে সঙ্গে হাতটা ছেড়ে দিলো তুশির। দ্রুত পায়ে এসে ভাইয়ের কাছে দাঁড়াল। ফ্লোরে গড়িয়ে যাওয়া কফি , ছড়িয়ে থাকা মগের ভাঙা টুকরো দেখে অবাক হয়ে বলল,
“ ভাইয়া, এটা ভাঙল কী করে? ”
সার্থর রক্তিম চোখ তখন তুশির ওপর। দুপাশের চিবুকের কটমটে ভাবের মাঝেই,তুশি চট করে মুখ ফিরিয়ে নিলো। এই সরাসরি অবজ্ঞার তীর সাইসাই করে এসে বসল সার্থর বুকে। বলিষ্ঠ দেহ রাগে থরথর করে উঠল। অথচ দাঁত পিষে খুব আস্তে বলল,
“ হাতে থেকে পড়ে গেছে।
ইউ গাইস ক্যারি অন।”
তারপর ঘুরে নেমে গেল সে। তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলল,চোখের জল গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছল ত্রস্ত বেগে।
চলবে…
কাছেআসারমৌসুম!
নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি
(৫০_খ)
“ একা রাত,বাঁকা চাঁদ,
লাগে না ভালো যে আর,
নেই রোদ, নেই রং
জানি নেই কিছুই করার!
পড়ছে মনে,মুখের আদল,
ভাঙে বুক,ভাঙছে পাহাড়…..
মন মাঝিরে,বল না কোথায়!
মন মাঝিরে,আয় ফিরে আয়…
আয় ফিরে আয়…
অদূরের কোনো বাড়িতে ফুল ভলিউমে কেউ একজন গান শুনছিল। রাতের সুনসান হাওয়ায় ভেসে ভেসে কথাগুলো পৌঁছে গেল সার্থর বারান্দা অবধি। এই রাত বারোটা বাজে নয়নতারা গাছের মরা পাতা,মরা ফুল কাঁচি দিয়ে ছাটতে বসেছে সে মানুষ । অথচ কাজের মধ্যে সামান্য একটু মনোযোগ যদি থাকতো! যতবার সার্থ গাছের পাতার দিকে তাকায়,কোনো না কোনোভাবে তুশির হাত অয়নের হাতে, দৃশ্যটা ধুপধাপ করে ভেসে ওঠে চোখে।
শেষ মূহুর্তে যখনই তুশির ওই মুখ ফিরিয়ে নেয়া মনে পড়ল, ঝট করে ক্ষুব্ধ হাতে ফুলের টব শেল্ফ থেকে ঠেলে ফেলে দিলো সার্থ। সেই কফি মগের মতো অবলা এই বস্তুটাও এবার স্বীকার হলো বলির! মাটির সাথে সাথে টবের টুকরোগুলো ভেঙে ছড়াল চারিপাশে।
তক্ষুনি দরজায় খটখট শব্দ হয়। কেউ এসেছে। সার্থ চোখ বুজে নিজের হিঁসহিঁসে শ্বাসের গতি কমাল। বলল চিল্লিয়ে,
“ কাম ইন!”
সেকেন্ড দুয়েকে নরম পায়ে এসে দাঁড়াল আইরিন। অথচ মুখের হাসি উবে গেল বারান্দার মেঝেটা দেখে। আর্তনাদ করে বলল,
“ এ বাবা,টবটা ভেঙে গেল দেখি। তোমার লাগেনি তো?”
সার্থ আগুন চোখে এমন ভাবে চাইল, তড়িঘড়ি করে কথাটা শুধরে ফেলল সে। মিনমিন করে বলল,
“ মানে আপনার লাগেনি তো!”
সার্থ উঠে আসে। ওর পাশ কাটিয়ে চুপচাপ ঘরে ঢুকে যায়। বেসিনে হাত ধোয়ার মাঝেই আইরিন সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। নিজেই উদ্বেগ নিয়ে বলল,
“ মাম্মাম তখন নিচে যা বলল আপনি তো শোনেননি। তাই ভাবলাম আপনাকে একবার জানিয়ে যাই।”
সার্থর দরাজ কণ্ঠ রুক্ষতার সীমা পেরিয়ে গেল উত্তরে,
“ আমি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি?”
“ না, আসলে, ভাবলাম ব্যাপারটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো কাল আমাদের বাসায় ফিরে যাব। বৃহস্পতিবার পাপা ইভেন্ট রেখেছেন। বললেন সেখানে বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হবে!”
“ তো?”
সার্থ এমন ভাবে তাকাচ্ছে,এমন তেজি তার কণ্ঠ আইরিন নিজেই ভুলে গেল ও আর কী কী বলতে এসেছে! নার্ভাস হয়ে পড়ল মেয়েটা।
জিভে ঠোঁট চুবিয়ে বলল,
“ কিছু না।”
সার্থ মুখের ওপর বলে দেয়,
“ দেন ইউ’ল গো নাউ।”
ঝুঁপ করে আইরিনের মনটা খারাপ হলো খুব। বিমর্ষ কণ্ঠে বলল,
“ আপনি সব সময় আমার সাথে এত রুড কেন সার্থ ভাই ! এখন তো আমাদের বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে,এখন অন্তত একটু নরম হন! অয়ন ভাই কেমন সারাক্ষণ তুশির আগে-পিছে ঘুরঘুর করে দেখেছেন!”
দিয়েছে সার্থর রাগের মশাল জ্বেলে। তুরন্ত দাঁত কপাটি পিষে, রক্তিম চোখে ফিরল সে।
আইরিন বলেই গেল,
“ তাও তো আমি তুশির চেয়ে কত কোয়ালিটিফুল। পড়াশোনা জানি, স্মার্ট! কিন্তু তুশি তো একটা বস্তি! ও আমার….”
সার্থ গর্জে উঠল অমনি,
“ আইরিন, আর একটা বললে তোমার অবস্থাও ওই ফ্লাওয়ার ভাসটার মতো হবে। তুমি তাই চাও?”
আইরিন হতবুদ্ধি হয়ে গেল। এর মানে কী? বারান্দার ওই ফুলের টবটা যেমন ভেঙে টুকরো হয়ে আছে, ওকে অমন টুকরো করে ফেলবে!
তার প্রকট চোখে চেয়ে সার্থ ভণিতাহীন বলে যায়,
“ আমি মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া পছন্দ করি না। নাহলে এক্ষুনি তোমাকে গলা ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের করে দিতাম। তুশিকে নিয়ে ফার্দার তোমার মুখে যেন আর একটাও বাজে কথা আমি না শুনি! ক্লিয়ার? গেট লস্ট নাউ।”
আইরিনের চোখে জল চলে এলো। ভেজা কণ্ঠে বলল,
“ তুশিকে কিছু বললে আপনি এখনো নিতে পারেন না? কেন,আর আমার প্রতি আপনার…. “
কথার মাঝেই চ্যাঁচিয়ে উঠল সার্থ,
“ আই সেইড গো….”
ভারি ওই হুঙ্কারে কেঁপে উঠল সে। এর পর আর এক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার সাহসে কূলালো না। ত্রস্ত ছুটে বেরিয়ে গেল আইরিন।
অমনি সামনে পড়ল ইউশা। প্রথমে আইরিনকে দেখে একটু ভ্যাবাচেকা খেলেও পরপর খেয়াল করল ও সার্থর ঘর থেকে বেরিয়েছে।
আইরিন থামেনি। এক দৌড়ে নিজের ঘরের পথে ছুটল। কিন্তু কপাল কুঁচকে চেয়েই রইল ইউশা। আইরিন আপু কাঁদছিল না? তাও মেজো ভাইয়ার ঘর থেকে এসে! ব্যাপারটা কী?
বড়ো বড়ো লাগেজগুলো টেনেটুনে ড্রাইভার গাড়িতে তোলার জন্যে নিয়ে যাচ্ছেন। একটু বাদেই বের হবেন নাসীররা। সবাই তৈরি, বিদেয় দিতে ঘরের প্রত্যেকেই আছেন এখানে। নাস্তা শেষে সোফাসেট ভরতি করে চা নিয়ে বসেছেন সকলে। সার্থ থানায় যাবে বিকেলের পর। কিন্তু যেহেতু ফুপিরা চলে যাচ্ছে তাই ভদ্রতার খাতিরে ঘরে না গিয়ে বসে রইল এখানে। অথচ এই এতটুকু চার কোণা জায়গায় দফায় দফায় চোখা-চোখা চলল। অয়ন,তুশি,ইউশা,আইরিন আর সার্থ…. তাদের নির্বাধ চোখাচোখির ভিড়ে কারো দৃষ্টিতে প্রেম,কারো ক্ষোভ আর কারো হাহাকারে চুবানো নয়নতারায় এক বুক জ্বালা!
এর মাঝেই ডোরবেল বাজল। দরজা খুলতেই হইহই করে ভেতরে এলো জামিল। প্রফুল্ল স্বরে বলল,
“ হ্যালো এভ্রিওয়ান, কেমন আছেন আপনারা? ”
তনিমা বললেন,
“ আরে জামিল,তোমার তো খবরই পাওয়া যাচ্ছিল না। কী অবস্থা, কেমন আছো?”
“ ভালো নেই আন্টি। আসলে আমার একটা পাঠা হারিয়ে গেছে। খুব খুঁজছি ওটাকে। সাইন্স বলল, আপনাদের বাড়িতেই যেহেতু পুলিশ আছে, একটা জিডি করে যাওয়া দরকার।”
বিভ্রান্ত চোখে চাইল সকলে। ব্যাপারটা পরিষ্কার করে কেউই তেমন বোঝেনি। অয়ন কপাল কুঁচকে বলল,
“ পাঠা! আপনি তো সেদিন এলেন ভাইয়া,এর মধ্যে কি পশুপাখিও কেনা শুরু করে দিয়েছেন?”
“ আরে না না, ওটা আসলে খুব নতুন প্রজাতির পাঠা। বেশ হৃষ্টপুষ্ট, গায়ে অনেক শক্তি। দেখতেও সুন্দর। তাই না সার্থ?”
সার্থ নাক ফুলিয়ে চেয়ে রইল।
জামিল ঠোঁট চেপে হাসতে হাসতে গিয়ে পাশে বসল ওর। ছেলেটাকে দেখেই তনিমা চায়ের সাথে পুডিং আর ব্রেড এনে দিলেন। জামিল মুখে তুলতে তুলতে বলল,
“ এ বাড়িতে নাকি জোড়া বিয়ের আয়োজন চলছে! আমাকে তো কেউ ইনভাইট করলেন না আঙ্কেল।”
শওকত হেসে বললেন,
“ ওমা,তুমি কি আমাদের পর নাকি! তুমি তো এ বাড়িরই ছেলে। তোমার বন্ধুর বিয়ে,তোমার ছোটো ভাইয়ের বিয়ে, সব কাজ তো তোমাকেই সামলাতে হবে বাবা। তাছাড়া ডেট তো ফিক্সড করিনি। আগে এনগেজমেন্ট হোক,তারপর।”
জামিল ঘাড় নেড়ে হাসল। তারপর তাকাল রোকসানার দিকে। প্রশংসার ঝুরি মেলে বলল,
“ আরে বাহ আন্টি… আপনাকে তো ভারি সুন্দর লাগছে। দেখলে কিন্তু মনেই হয় না আপনার একটা মেয়েও আছে।”
রোকসানা ভারি লজ্জা পেলেন,গদগদ হয়ে বললেন,
“ কী যে বলো না! অবশ্য, এটা আমাকে অনেকেই বলে।”
পরপরই মুখ কালো করে ফেললেন তিনি। বিরক্ত গলায় বললেন,
“ আমি তো এজন্যেই তোমার আঙ্কেলের বাসায় যেতে চাই না। এই বিয়ের ব্যাপার না এলে এখান থেকেই সোজা ডেনমার্কে চলে যেতাম। ওখানে গেলে আমার শাশুড়ী, ননাশ উফ ওদের জন্যে সারাক্ষণ শাড়ি টাড়ি পরে বুড়ি সেজে থাকতে হয়। তখন বয়স অর্ধেক বেড়ে যায় আমার। এখন তো আবার চুল কেটেছি,এ নিয়ে কতক্ষণ বক্তৃতা শুনব কে জানে! খুব বিরক্তিকর!”
কথাটা সবাই শুনল,কেউ কেউ হাসল ঠোঁট টিপে,কিন্তু টু শব্দও হলো না।
তবে জয়নব মৃদূ স্বরে ধমকে বললেন,
“ আহ,থামো। শ্বশুর বাড়ি নিয়ে এভাবে বলতে আছে? গুরুজনরা যা বলে,খারাপের জন্যে বলে না।”
আইরিন আড়চোখে তুশিকে দেখছিল। মেয়েটার কালো মুখ তার ঠোঁটের হাসি বাড়িয়ে দেয়ার কারণ।
হঠাৎ-ই আগ বাড়িয়ে বলল,
“ তুশি,তুমি কিন্তু পার্টিতে এসো। তুমি না এলে আমার খুব খারাপ লাগবে।”
তুশি চুপ। ওর কথা বলতে ভালো লাগছে না।
ইউশা বলল,
“ বাড়ির সবাই যখন যাবে, তখন কি তুশি একা ঘরে বসে থাকবে আপু? ওকে নিয়েইত যাব।”
জয়নব অবাক হয়ে বললেন,
“ বাবাহ,তুমি আমার কবে থেকে তুশিকে নিয়ে ভাবতে শুরু করলে আইরিন? আমার হিসেব মতে ও না গেলেই তুমি সবথেকে বেশি খুশি হবে।”
মেয়েটা গলা ঝেরে প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ মাম্মাম তুমি এমন হুট করে পার্টিটা থ্রো করলে না, আমি বেশ ঝামেলায় পড়ে গিয়েছি। এখন এই তিনদিনের মধ্যে স্পা,ফেসিয়াল থেকে শুরু করে কত্ত কী করতে হবে বলো তো। ”
“ বেশ তো কিউটি,আজই চলে যাও। বললে একটা এপোয়েন্টমেন্ট নিয়ে রাখি?”
রেহণুমা এসে তুশির পাশে দাঁড়ালেন। চুলে হাত বুলিয়ে বললেন,
“ তুইও একটু পার্লারে যাবি নাকি তুশি? তোরও তো মুখচোখের অবস্থা ভালো দেখাচ্ছে না। একটু ফ্রেশ লাগতো তাহলে।”
মেয়েটা বিরস গলায় বলল,
“ না মা,আমার ইচ্ছে নেই।”
জামিল বলল,
“ আন্টি সাইন্স তো বলছে , এ বাড়িতে মুখচোখ অনেকেরই ঠিক নেই। এইত ইউশা,কী ব্যাপার তোমার চোখের নিচে এক গাদা কালি কোত্থেকে এলো? কিছু নিয়ে টেন্সড?”
সবার মধ্যে হুট করে বলায় মেয়েটা একটু নড়েচড়ে তাকাল।
আমতা-আমতা করে বলল,
“ আসলে ঐ…”
তুশি কথা কেড়ে নেয়। দুম করে বলে দেয়,
“ ওর সামনে পরীক্ষা না,সেজন্যে চিন্তায় ঘুমই হয় না। রাত জেগে জেগে মাথা ঝুলিয়ে পড়ে। দেখুন,চোখের সাথে সাথে মুখটাও কেমন শুকিয়ে গেছে দেখুন।”
কটমটিয়ে বলতে বলতে ইউশার দুগাল চেপে, জামিলের দিকে ঘুরিয়ে ধরল তুশি।
ব্যথায় ইউশার মাড়ির হাড় ক্ষয়ে পড়ল বোধ হয়। তুশি গালটা ছাড়ল ঠিক ছুড়ে ফেলার মতো। মেয়েটা যে ওর ওপর কীসের রাগ ঝারছে বেশ বুঝল ইউশা। কিচ্ছুটি না বলে অসহায়ের মতো ঠোঁট উলটে বসে রইল বেচারি। জয়নব বললেন
“ তাহলে তুশির সাথে ইউশাও যা, চেহারায় একটু পলিশ করে আয়। তোর দুই ভাই আর এক মাত্র বোনের বিয়ে,তোকেই তো সব থেকে বেশি সেজেগুজে থাকতে হবে।”
ইউশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসল। এবারেও কিছু বলল না!
আইরিন স্ফূর্ত কণ্ঠে বলল,
“ আচ্ছা, পার্টির থিম কিন্তু ব্ল্যাক। তাই সবাই কালো পরবে কেমন! শুধু আমি আর সার্থ ভাই হোয়াইট পরব। আমাদের জন্যেই পার্টিটা রাখা হচ্ছে তো। আমরাই শো-স টপার। তুশি, তুমিও কিন্তু কালো কিছু পরে এসো।”
সাথে ফের পৈশাচিক আনন্দে ঠোঁট চেপে হাসল সে।
উত্তরে তুশি নিজেও হাসল। স্পষ্ট গলায় বলল,
“ তুমি আমাকে নিয়ে এত ভেবো না। আমি খুব সেজেগুজেই যাব। তুমি বরং এখন শুধু তোমাদের নিয়ে ভাবো। ” তারপর
মায়ের দিক ফিরে বলল,
“ আমি পার্টিতে কী পরে যাব মা? আমার তো কোনো ভালো জামা কেনা হয়নি।”
সার্থর মেজাজ অমনি খারাপ হয়ে গেল। ওর বিয়ের এনাউন্সমেন্ট হবে যেখানে,সেখানে এই চোর নাকি সেজেগুজে যাবে!
রেহণুমার আগেই কথা কেড়ে নিলো আইরিন। টেনে টেনে বলল,
“ ওমা কেন তুশি,ইউশার আছে তো। ওর পুরোনো জামাগুলো থেকে একটা নিলেই পারো। আই থিংক তোমার কাছে ওগুলো স্টিল নতুনই লাগবে।”
হঠাৎ ওর চোখ পড়ল সার্থর দিকে। লাল, খ্যাপাটে চাউনিতেই ভয়ে শুকিয়ে গেল মুখটা।গত রাতের ঐ হুমকির কথা মনে পড়তেই থতমত খেয়ে বলল,
“ না মানে আমি সেভাবে কিছু বলিনি।”
তবে ভারি চটে গেল অয়ন। রেগে রেগে বলল,
“ আইরিন, প্রথমত বোনের জামাকাপড় পরলে কেউ ছোটো হয়ে যায় না। আর দ্বিতীয়ত,তুশির বাবা- চাচা আর ওর উড বি হাজবেন্ডের এতটুকু সামর্থ্য নিশ্চয়ই আছে যাতে তোমাদের পার্টিতে পরার মত কাপড় ওকে কিনে দিতে পারবে।”
আইরিন উত্তর দিতে যাচ্ছিলই, রোকসানা চোখের ইশারায় থামালেন। সবার মাঝেই অয়ন তুশিকে বলল,
“ তুশি যাও,তৈরি হও। আমরা এক্ষুনি শপিং-এ বেরোব।”
তুশি না করতে গিয়েও থামে। ঠোঁট টিপে ভাবে কিছু একটা। পরপরই স্ফূর্ত গলায় বলে,
“ আচ্ছা,যাচ্ছি।
তাহলে ইউশা, তুমিও আমাদের সাথে চলো।”
মেয়েটা তাজ্জব বনে তাকাল। সজোরে মাথা নেড়ে বলল,
“ না না। তোমাদের মাঝে আমি কেন?”
“ এ আবার কী কথা? তোমারও তো কেনাকাটার দরকার। চলো সবাই মিলে যাই,বেশ মজা হবে।”
“ আমি যাব না তুশি।”
রেহণূমা বললেন,
“ যা না,ভালো লাগবে।”
“ না মা,আমি যাব না।”
কিন্তু এসব আপত্তি তুশি শুনলই না। একেবারে জবরদস্তি ওর হাত টেনেটুনে হাঁটা ধরল ঘরে। মেয়েটার মুখের টইটম্বুর হাসি সার্থর মাথায় ফের ক্রোধ চড়িয়ে দেয়। অয়নের সাথে শপিং-এ যাবে,হাসি ধরছে না! তার ঐ ক্ষিপ্ত চাউনির মাঝেই,খাবার চিবোতে চিবোতে গুনগুন করল জামিল,
“ ভাই যখন বউ লইয়া
আমার চোখের সামনে দিয়া,
শপিং করতে যাইতে চায়,
ফাইট্টা যায়, ওরে বুকটা ফাইট্টা যায়!”
সার্থ জ্বলন্ত চোখে চাইতেই সাফাই দিলো হড়বড়িয়ে,
“ আরে, মাই ফেভ্রেট সং ইয়ার। আমার বাবার বিয়েতে শুনেছিলাম। লাইন ঠিকঠাক মনে নেই,তাই নিজের মতো গেয়েছি। কিন্তু তুই এভাবে তাকাচ্ছিস কেন,গানটা ভাল্লাগেনি?”
সার্থ জবাব দিলো না। ঝট করে বলে বসল,
“ আইরিন,তাহলে তুমিও তৈরি হয়ে এসো। আজ নাহয় আমরাও শপিং- এ যাই।”
তুশি হাঁটা থেকে থামল,তড়িৎ চাইল ঘুরে। আনন্দে লাফিয়ে উঠল আইরিন,
“ ওয়াও, সত্যি! আমিত রেডিই আছি । আপনি বললেই যাব।”
রোকসানা হেসে বললেন,
“ ভালোই হবে। তোমরাও ঘুরে এসো তাহলে। সার্থ বেটা, তুমি কিন্তু শপিং শেষে ওকে একেবারে আমাদের বাসায় পৌঁছে দিও, কেমন!”
সার্থর চোখ তখন তুশির ওপর। দৃষ্টির পূর্ণ জেদের ভিড়ে আবেগের ছাঁয়া মাত্র নেই।
অয়ন বলল,
“ তাহলে আমি আরিফ চাচাকে বড়ো গাড়িটা বের করতে বলে দিই। জামিল ভাই,আপনি আর বসে থেকে কী করবেন? আপনিও চলুন।”
” আমি? উম,আচ্ছা চলো যাই।”
আইরিন বলল,
“ আমাদের তো গাড়ি দরকার নেই। সার্থ ভাইয়ার বাইক আছে না। আমরা দুজন নাহয় আলাদা করে বাইকে যাব!”
তুশির চেহারা আর চাউনির বদল হলো না। খুব ঠান্ডা দৃষ্টি সার্থর উত্তপ্ত নয়ন পানে মেলে রাখল সে। পরপর ঠোঁট এক পাশে বেঁকিয়ে নৈশব্দে হেসে ফেলল মেয়েটা ।
সার্থর নাকের পাটা ফুঁসে উঠল সহসা। ওই তীর্যক হাসি নোংরা পানির মতো ছিটকে এসে লাগল তার শরীরে। মনে হলো হাসি নয়, তাকে প্রচণ্ড মাত্রায় তুচ্ছ করল তুশি। বোঝাল,সে যাকে ইচ্ছে বাইকে নিক ওর কিচ্ছু এসে যায় না। অমনি চিবুক ফুটিয়ে বলল,
“ অফকোর্স,আইরিন। আমার উড বি ওয়াইফ তো আমার বাইকেই যাবে। অয়ন, তোরা বরং তোদের মতো চলে যা।”
ইউশা নাক-মুখ খিচে চেয়ে থাকে কিছু পল। তারপর মায়া মায়া চোখে দেখে তুশির মুখটা। মেয়েটার ভেতরের বিধ্বস্ততা ও বোঝে। ইস,না জানি কত কষ্ট পাচ্ছে! ইউশা আস্তে করে হাতটা ধরল বোনের। তুশি নড়ে উঠল, তাকাল, হাসল ঠোঁট টেনে। বুকে দীর্ঘশ্বাস মিটিয়ে ঘুরে হাঁটা ধরল পরপর।
একেরপর এক হযবরল কাণ্ডে মাথায় হাত দিয়ে হতাশ শ্বাস ফেলল জামিল। দুপাশে ঘাড় নেড়ে ভাবল,
“ সাইন্স বলছে, এই পাঠা মৌসুমের ভেতর কাছে আসার মৌসুমটা বোধ হয় আর হবে না!”
চলবে…
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৯(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬০.১
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৫৩(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১